অপদেবতারা : হে চাপ চাপ ঘনান্ধকার, তোমরা সবাই ওঁর মাথার উপর থেকে সরে যাও। শূন্য বায়ুমণ্ডল হতে উজ্জ্বল আলোকমালা নির্গত হয়ে ঘন-কৃষ্ণ মেঘমালাকে অপসরিত করতে দাও। শান্ত ও স্থিরায়ত সূর্য সুদূর আকাশে তির্যকভাবে কিরণ দান করছে। উজ্জ্বল পোশাক পরিহিত স্বর্গের সন্তানস্বরূপ আলোকতরঙ্গগুলো সুদূর আকাশ হতে নেমে এসে মর্ত্যভূমির সব কিছুকে আলোকিত করে তুলছে। তাদের গতিপথে যে সব বনস্থলী ও নিভৃত কুঞ্জবন পড়ে, যেখানে মোহমুগ্ধ প্রেমিক-প্রেমিকারা অলস প্রেমচিন্তায় একান্তভাবে হয়ে ওঠে মগ্ন সেই সব বন ও কুঞ্জবনও আলোকিত হয়ে উঠুক আলোকতরঙ্গগুলোর দুর্বার আঘাতে। কুঞ্জবনে কত আঙ্গুরলতা অবাধে সুন্দরভাবে বেড়ে উঠছে। সে লতায় একদিন কত আঙ্গুর ধরবে। সেই আঙ্গুর থেকে যে উত্তম মদ হবে তা অসংখ্য স্বচ্ছ সুন্দর ঝকঝকে পাত্রে শোভা পাবে। মাঠে মাঠে কত সবুজ শস্য পান্নার মতো শোভা পাচ্ছে। বহু কীটপতঙ্গ ফুলের মধু পান করে সূর্যের পানে উড়ে চলেছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন তারা আলোর মহাসমুদ্রে ভাসতে ভাসতে কোনও দ্বীপের সন্ধান করছে উদভ্রান্ত চিত্তে। ঐ শোনো, তাদের উড়ে চলার শব্দ শোনা যাচ্ছে। তাদের চক্রাকার নৃত্যের মোহপ্রসারী ছন্দ বড় মধুর। দূর আকাশে ও শূন্য বাতাসে ভাসমান পাখিগুলো কত মুক্ত ও সুন্দর। কেমন চমৎকারভাবে তারা উড়ে বেড়াচ্ছে। তাদের কারো কারো গতি চক্রাকার, আবার কারো কারো গতি উধ্বায়িত। তারা সকলেই। বাঁচতে চায়। উৎকেন্দ্রিক আনন্দময় ও প্রেমময় এক জীবনাস্তিত্বের চিরউজ্জ্বল নক্ষত্রলোকের উর্ধভিসারে উধাও হয়ে যেতে চায় তারা সবাই।
মেফিস্টোফেলিস : ও এখন ঘুমোচ্ছে। যথেষ্ট হয়েছে। হে সুন্দরী পরীগণ, তোমাদের বায়বীয় উপস্থিতির ফলে চারদিকে যে গতিময় আবহাওয়ার সৃষ্টি হয় তাতে অভিভূত হয়ে ও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। তোমাদের এ কাজের জন্য আমি ঋণী তোমাদের কাছে। তুমি আর এখন মানুষ নও। তুমি আর এখন আমার মতো কোনও শয়তানকেও ধরে রাখতে পারবে না।–হে আমার প্রিয় পরীগণ, যত সব সুখস্বপ্নের চিত্রকল্প দিয়ে ওকে ঘিরে ফেলে এক মধুর মিথ্যার সমুদ্রে ওকে ডুবিয়ে দাও। তবু ওর ঘরের মেঝের উপর অঙ্কিত সেই ঐন্দ্রজালিক ছাপটা তোলার জন্য তীক্ষ্ণদন্ত এক বড় ইঁদুরের প্রয়োজন। আমি কোনও দীর্ঘ আবাহন ভালোবাসি না। কোনও চঞ্চলমতি ইঁদুর এখানে শীঘ্র এসে আমার মুক্তির জন্য পথ করে দেবে।
হে ছোট-বড় ইঁদুর, মাছি, ছারপোকা, ব্যাঙ ও উকুনের দেবতা, আমি এই ঘরের দ্বারপ্রান্তে তোমার উপস্থিতি কামনা করে তোমাকে এখানে আসার জন্য আহ্বান করছি। আমাকে বন্দি করার জন্য ও যেখানটায় একটা ঐন্দ্রজালিক ছাপ এঁকে তার উপর তৈল লেপন করেছে, তুমি এই মুহূর্তে সেখানে লাফিয়ে চলে এস। আমার মুক্তির পথ প্রশস্ত করো। আমি অনেকটা এগিয়ে আছি। তুমি এসে একটা কামড় দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, ছাপটা উঠে যাবে। সুতরাং হে ফাউস্ট, তুমি তোমার স্বপ্ন দেখে যাও। পরে আমাদের আবার দেখা হবে।
ফাউস্ট : (জেগে উঠে) আমাকে কি আবার মোহমুগ্ধ করে প্রতারিত করা হয়েছে? এখন আর সেই অপদেবতাটা নেই। আমাকে স্বপ্ন দিয়ে ভূলিয়ে সারমেয়রূপ শয়তানটা পালিয়ে গেছে কোথায়।
চতুর্থ দৃশ্য
পড়ার ঘর। ফাউস্ট। মেসিস্টোফেলিস।
ফাউস্ট : দরজায় করাঘাত? ভিতরে এস। আবার আমার নীরব নির্জনতা ভঙ্গ হলো।
মেফিস্টোফেলিস : আমি।
ফাউস্ট : ভিতরে এস।
মেফিস্টোফেলিস : একথা তিনবার বলতে হবে।
ফাউস্ট : ভিতরে এস।
মেফিস্টোফেলিস : এবার আমি তোমার ব্যবহারে খুশি হয়েছি। আশা করি, এবার থেকে আমরা দুজনে মিলেমিশে চলতে পারব। আমি তোমার স্বপ্নের ঘোর কাটাবার জন্য সোনার জরির কাজ করা বেগুনি রঙের কোটপরা এক উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন জমিদারের। বেশে এসেছি। আমার মাথার টুপির উপর শোভা পাচ্ছে এক লম্বা মোরগের পালক। লোককে দেখানো বা ঝগড়া-বিবাদের সময় প্রয়োগের জন্য আমরা কটিবন্ধে ঝুলিয়ে রেখেছি এক লম্বা তীক্ষ্ণ তরবারি। আমি তোমাকেও এই ধরনের উজ্জ্বল পোশাক পরিধান করার জন্য উপদেশ দান করেছি। এই প্রায়ান্ধকার পাঠকক্ষ থেকে নিজেকে মুক্ত করে তুমি একবার বাইরে বার হলেই জীবনের আসল সত্যটি উঘাটিত হয়ে উঠবে তোমার কাছে।
ফাউস্ট : আমার পোশাক যত উজ্জ্বলই হোক না কেন, এই প্রথাগত পার্থিব জীবন দুঃসহ হয়ে উঠবে আমার কাছে। আমার বয়স বর্তমানে এমনই এক স্তরে উপনীত যে আমি একদিকে যেমন কামনা-বাসনাকে একেবারে ত্যাগ করতে পারছি না, আবার অন্য দিকে সেই কামনার আবেগানুভূতিগুলোকে বেশি প্রশ্রয় দিতেও পারছি না। আমার বয়স যেমন খুব একটা বেশিও নয়, আবার খুব একটা কমও নয়। পৃথিবী থেকে আর আমি এখন কি পাব? ত্যাগ ও সংযমের পথে ঠেলে দেব নিজেকে? এই একটিমাত্র গানই নিত্যকাল ধরে সকল মানুষের কানে কানে ধ্বনিত হয় আসছে। সারা জীবন ধরে এ গান শুনে আসছি আমরা। প্রতিদিন সকালে আমি ভয়ে ভয়ে উঠি। ভাবি আশাভঙ্গের বেদনায় সিক্ত আর একটি প্রভাতের সূচনা হলো। এ কথা ভেবে চোখে জল আসে আমার সেই একটি আশাও সফল হয়নি আমার জীবনে। যত কিছু আশার আনন্দ সব ক্ষীণ হয়ে আসে দিনে দিনে। জীবনের সব হাসি মুখোশের মতোই নকল বলে কোনও ভালো কাজও করতে চাই না। আবার যখন রাত্রি আসে তখনও এক গভীর উদ্বেগের। বোঝা নিয়ে শুয়ে থাকি বিছানায়। তখনও শান্তি পাই না মনে। তখন যত সব দুরন্ত স্বপ্ন কার নির্দেশে ভিড় করে আসে যেন আমার মনে। আমার বুকের মাঝে যে ঈশ্বর বিরাজ করেন তিনি আমার অন্তরকে আলোড়িত করতে থাকেন। আবার আমার শক্তির বাইরে ঊর্ধ্ব জগতে যে ঈশ্বর বিরাজ করেন তিনিও বহিরাগত অশুভ শক্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারেন না। এইভাবে আমার হতভাগ্য জীবন ধারণের গ্লানি দিনে দিনে বেড়ে আমাকে পীড়িত করে চলেছে বলে আমি মৃত্যুকে কামনা করি নিবিড়ভাবে।
