ফাউস্ট : আমি তোমার মতলবের কথা বুঝতে পেরেছি। তুমি সাধারণভাবে সমগ্র বিশ্বের উপর কোনও ধ্বংসকার্য ঘটাতে পার না বলেই ছোটখাটো ধ্বংসের কাজ চালিয়ে যেতে চাও।
মেফিস্টোফেলিস : কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, এত করেও কিছু করতে পারলাম না। আমার সমস্ত সংগ্রামী প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে বসেছে। এই কুৎসিত অবাঞ্ছিত পৃথিবীটার অতি ক্ষুদ্র একটা অংশকেই আমি আমার ধ্বংসকার্যের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত করেছি। অবশ্য মাঝে মাঝে ভূমিকম্প, ঝড়, বন্যা, আগ্নেয়গিরির অগ্নদগার প্রভৃতির মাধ্যমে ধ্বংসের দুর্বার ধারা নেমে আসে পৃথিবীতে। কিন্তু তা শুধু ক্ষণকালের জন্য। ক্ষণকাল পরেই আবার শান্ত হয়ে ওঠে বিক্ষুব্ধ জল ও স্থল। আর হতভাগ্য পশুসুলভ মানুষগুলোকে নিয়ে খেলা করেই বা কি হবে? আমি কত মানুষের জীবনাবসান ঘটিয়েছি। কিন্তু আবার
অসংখ্য নূতন মানুষ সৃষ্ট হয়েছে। জলে-স্থলে-বাতাসে-শীতে-গ্রীষ্মে সর্বত্র সর্বক্ষণ। অসংখ্য জীবকণা জন্মলাভ করে চলেছে। তা দেখে এক প্রচণ্ড ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠি আমি। আমার এই অলৌকিক শক্তির শিখাটুকু না থাকলে আমিও তাদের সঙ্গে মিশে যেতাম।
ফাউস্ট : সৃষ্টিশীল যে প্রাণশক্তি বিশ্বের প্রতিটি কন্দরে কাজ করে চলে সর্বত্র জীবনের ধারাকে চিরপ্রবহমান ও অবিচ্ছিন্ন রেখেছে, তুমি এক নারকীয় ঘৃণা ও বিতৃষ্ণাসহযোগে সে শক্তির বিরোধিতা করছ। কিন্তু জেনে রেখো, ব্যর্থ হবে তোমার সব বিরোধিতা। বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলার হে ঘৃণ্য সন্তান, এভাবে বিরোধিতা করে কিছু করতে পারবে না। অন্য কোনও উপায় খুঁজে বার করো।
মেফিস্টোফেলিস : ঠিক আছে। ভেবে দেখো। তুমি এখনও আমার আসল মনোভাবটা বুঝতে পারনি। আমি কি এখন যেতে পারি?
ফাউস্ট : একথা জিজ্ঞাসা করার কি আছে? এর কোনও কারণ দেখি না আমি। যদিও অবশ্য আমাদের পরিচয় খুব একটা বেশি দিনের নয়। এর পরেও তুমি যখন খুশি আসতে পার। আমার ঘরের জানালা খোলা, অদূরে ঐ দরজাও ভোলা আছে। ওখানে একটা চিমনিও আছে।
মেফিস্টোফেলিস : আমি একথা স্বীকার করছি আমি আর এগিয়ে যেতে পারছি না। একটা সামান্য বাধা আমার গতিকে নিয়ন্ত্রিত করছে। তোমার ঘরের মেঝের উপর কোনও এক ঐন্দ্রজালিকের পায়ের যে ছাপ রয়েছে সেই ছাপই হলো সে বাধা।
ফাউস্ট : ঐ ছাপটা তোমাকে ঢুকতে বাধা দিচ্ছে। নরকের হে ঘৃণ্য সন্তান, বলো আমার ওটাতে বাধা পেলে তুমি কি করে আমার কাছে আসবে? তোমার মতো এক বিরাট অপদৈব শক্তি সামান্য ঐ বাধার দ্বারা হবে প্রতারিত ও প্রতিহত।
মেফিস্টোফেলিস : ভালো করে পরীক্ষা করে দেখো। ছাপটা এখনও ঠিক মতো আঁকা হয়নি। বাইরের দিকে রেখাগুলো এখনও স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি।
ফাউস্ট : ঠিক আছে, তাতে ভালোই হয়েছে। তাতে আমাদের আসল উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে। এখন তুমি আমার কাছে বন্দি।
মেফিস্টোফেলিস : একদিন যে রোঁয়া ওঠা কুকরটা তোমার পিছু নিয়েছিল, আজ সেটা আর বোরোতে পারছে না। শয়তানটা দেখছি বন্দি হয়ে পড়েছে।
ফাউস্ট : খোলা জানালাটা তার জন্য ব্যবহার করে দেখতে পার।
মেফিস্টোফেলিস : শয়তান ও ভূতপ্রেতের ক্ষেত্রে একটা নিয়ম প্রচলিত আছে। তারা একবার যদি কোনও জায়গায় ঢুকে পড়তে পারে তাহলে সেখান থেকে বেরোতেও পারবে। আমরা একটা পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হয়েছি। কিন্তু আর একটা বাকি আছে।
ফাউস্ট : নরকেও তাহলে নিয়মকানুন মেনে চলা হয়? ভালো কথা। তাহলে তোমার মতো এক ভদ্রলোকের সঙ্গে এক চুক্তি করা যেতে পরে। আশা করি সেটা অবশ্যই মেনে চলবে।
মেফিস্টোফেলিস : আমি যা যা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি তা সব ঠিকমতো পালন করব এবং তাতে তুমি আনন্দ পাবে। চিন্তাভাবনাহীন ব্যস্ততার মধ্যে গৃহীত কোনও সিদ্ধান্তের মতো এ চুক্তি ব্যর্থ হবার নয়। আমরা এ বিষয়ে শীঘ্রই আবার আলোচনা করব। এখন আমি শুধু তোমার কাছে একটামাত্র বর প্রার্থনা করি–এখন থেকে চলে যাবার অনুমতি দাও।
ফাউস্ট : আর কিছুক্ষণ থাকতে বলব তোমায়। আমাকে অন্তত কিছু সুসংবাদ শোনাও।
মেফিস্টোফেলিস : এখন আমাকে মুক্তি দাও। শীঘ্র আবার আসব আমি। তখন আমাকে প্রশ্ন করে অনেক কিছু জেনে নিতে পারবে তুমি।
ফাউস্ট : আমি তো তোমাকে ধরার জন্য জাল বিস্তার করিনি তোমার চারিদিকে। তুমি তো নিজে থেকেই এ ফাঁদে ধরা দিয়েছ। কেউ যদি শয়তানকে একবার ধরতে পায় তাহলে তাকে শক্ত করে ধরে রাখে, কারণ এত বড় দামী শিকার দ্বিতীয়বার কখনও পাওয়া না যেতেও পারে।
মেফিস্টোফেলিস : আমার সাহচর্যে তুমি আনন্দ পাবে জেনে আমি খুশি। আমি তোমার সামাজিক পরিবেশের মধ্যে থেকে তোমার সেবা করে যাব। আমি আমার কলাকৌশলের দ্বারা তোমাকে আনন্দদান করতে পারব ভেবে আমি সব সময় খুশি মনে কাজ করে যাব। তোমার সেবা করে যাব।
ফাউস্ট : এ বিষয়ে আমার কোনও অমত নেই, তবে অবশ্য তোমার আনন্দ দানের বিষয়বস্তুর মধ্যে সত্যি সত্যিই যদি আনন্দের খোরাক থাকে।
মেফিস্টোফেলিস : হা বন্ধু, পাবে। সারা বছরের একটানা নীরস জীবনযাপনের। পর এক অনাবিল আনন্দের খোরাক অনেক পাবে। আমার অধীনস্থ অতিপ্রাকৃত শক্তিরা যে গান তোমায় শোনাবে, যে ছবি তারা তোমাকে দেখাবার জন্য আনবে তা সামান্য ইন্দ্রজাল-খেলার থেকে অনেক বেশি। তোমাকে অতি উপাদেয় যে সুখাদ্য দেওয়া হবে তার সুবাস তোমাকে দেবে অভূতপূর্ব আনন্দ। তাদের স্পর্শে কত মাধুরী কত আবেগের রোমাঞ্চ জাগাবে তোমার দেহের স্নায়ুতে। কোনও প্রস্তুতি না থাকা সত্ত্বেও আমরা এইখানেই সব কিছু উপস্থাপিত করব এখনি।
