অপদেবতাবৃন্দ (বারান্দায়) : ঘরের ভিতর একজন মানুষ আমাদের জালে ধরা পড়েছে। তোমরা সব বাইরে থাকো, তার কাছে যেও না। ফাঁদে পড়া খেকশিয়ালের মতো সে ছটফট করছে। এধার-ওধার করতে করতে সে নিজেই বেরিয়ে আসবে। তবে এ কাজে যদি তোমাদের সাহায্যের প্রয়োজন হয় আর তাহলে তাকে দিও, কারণ সে আমাদের খুশির শিকার হিসাবেই এভাবে ধরা পড়েছে।
ফাউস্ট : এই জন্তুটার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হলে চারটি ভৌতিক দেবতাকে আবাহন করতে হবে। সে সালামান্দার বা অগ্নিদেবতা, তুমি উজ্জ্বলভাবে কিরণ দান করে যাও। হে জলদেবতা, তুমি বেগে প্রবাহিত হও। সে সিলফ বায়ু, তুমি আপাতত লুক্কায়িত থাকো; হে নম বা মৃত্তিকা, তুমিও কাজ করে যাও, চুপ করে থাকো না।
এই সব ভৌতিক দেবতাদের গুণের কথা কে জানে না। তাদের শক্তি ও গুণের কথা সবাই জানে। অপদেবতাদের দমন করার কোনো ক্ষমতাই তাদের নেই।
এই চার ভৌতিক দেবতা কোনও প্রভাবই বিস্তার করতে পারল না ঐ জন্তুটার উপর। সে অবাধে শুয়ে শুয়ে অহেতুক ঘৃণাসূচক চিৎকারে ফেটে পড়ছে। এখনও পর্যন্ত আমি তাকে কোনও কষ্ট দিইনি। এবার আয়, শোন হীন জার্নোয়ার, এবার আমি তোর মুখোশ খুলে ফেলে প্রকৃত স্বরূপ উঘাটিত করার জন্য ইন্দ্রজাল প্রয়োগ করব তোর উপর। তুই কি নরক হতে বিতাড়িত হয়ে আমার কাছে এসেছিস? এবার আমি তোকে এমন এক চিহ্ন দেখাব যার কাছে নরকের সব জীবই মাথা নত করে।
গায়ের লোমগুলো খাড়া করে জার্নোয়ার ফুঁসে উঠছে।
শোন রে হীন ঘৃণ্য পশু, তুই কি সেই নামহীন অন্তহীন যদি শক্তিকে জানিস যে শক্তি সমগ্র দ্যুলোকে ভুলোক ব্যাপ্ত করে আছে? সূক্ষ্ম অথচ অপরিহার্য যে শক্তির প্রভাব হতে সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোনও কিছুই মুক্ত হতে পারে না।
ঐ চুল্লীটার পাশে এখন ওকে একটা বিরাট হাতির মতো দেখাচ্ছে। আরও বড় হও। ফুটে ওঠো। হ্যাঁ হ্যাঁ। এখন ওটা কুয়াশার মতো সারা বায়ুমণ্ডলকে আচ্ছন্ন করে আছে। আবার দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ঠিক আছে, আর উঠতে হবে না। এবার তোর প্রভুর পায়ের কাছে বসে থাক। এবার বুঝতে পারছিস তো? আমি তোকে বৃথা ভয় দেখাইনি। আমার ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা সত্যিই আছে কিনা দেখ। এবার এক মন্ত্রপূত অগ্নির দ্বারা তোকে দগ্ধ ও বিদ্ধ করব। এখন জানতে চাস না যে তিনটি জ্যোতি আমার মাথার চারদিকে উজ্জ্বলভাবে শোভা পাচ্ছে তা আসলে কি। জানতে চাস না কি শক্তিশালী বিদ্যা আয়ত্তাধীন আছে আমার।
(কুহেলিসদৃশ বাষ্প ক্রমশ বিলীন হয়ে যেতেই ভ্রাম্যমাণ এক পণ্ডিতের বেশে মেফিস্টোফেলিস প্রবেশ করল।)
মেফিস্টোফেলিস : গোলমাল কিসের? আমার প্রভুর কি হুকুম তামিল করতে হবে?
ফাউস্ট : তাহলে এই হলো সেই রোঁয়া ওঠা কুকুরটার আসল রূপ? একদা ভ্রাম্যমাণ পণ্ডিত ব্যক্তি। এই হলো তার পরিবর্তিত রূপ।
মেফিস্টোফেলিস : হে সুপণ্ডিত ভদ্রমহোদয়, আমার প্রণাম গ্রহণ করো। তুমি আমাকে রীতিমতো কষ্ট দান করেছ।
ফাউস্ট : তোমার নাম কি?
মেফিস্টোফেলিস : এ তো সামান্য প্রশ্ন দেখছি। জেনে রাখো, আমি এমনই একজন যে বেশি কথা বলতে ঘৃণা বোধ করে, যে কোনও বস্তুর বাইরের রূপের জৌলুসকে তুচ্ছ জ্ঞান করে তার গভীরতর সত্তাকেই মূল্য দেয় বেশি।
ফাউস্ট : সব তো জানলাম। তবু বলব, নামের মধ্যে দিয়ে যে কোনও বস্তু বা ব্যক্তির আসল পরিচয় অনেকটা প্রকাশিত হয়। যেমন ধরো, ‘বীলজীবাব’, ‘ডেস্ট্রয়ার’ বা সর্বসংহারকর্তা, বা ফাদার অফ লাইজ’ বা মিথ্যার জনক। তোমার নামটি তাহলে কি?
মেফিস্টোফেলিস : যে শক্তি সব সময় মন্দ ও অমঙ্গল পরিকল্পনা করা সত্ত্বেও সব সময় মঙ্গল করে চলে সে শক্তিকে কোনও নামের মাধ্যমে ঠিক বোঝা যাবে না। সে। শক্তির সবটুকু বোঝা যায় না।
ফাউস্ট : এই জটিল হেঁয়ালিপূর্ণ কথার মধ্যে কি গভীর অর্থ লুকিয়ে আছে।
মেফিস্টোফেলিস : আমি এমনই এক অপদৈবশক্তি যে সব কিছুকেই অস্বীকার করে। আর তার যথেষ্ট কারণও আছে, কারণ শূন্য থেকেই সকল বস্তুর সৃষ্টি হয়, আবার তা ধ্বংসের পর শূন্যেই বিলীন হয়ে যায়। সুতরাং কার সত্যতাকে স্বীকার করব? তাই বলি, আমার জন্ম না হলেই ভালো হতো। তোমরা যাকে বলো পাপ, যাকে বলল অশুভ আসলে তা ধ্বংস ছাড়া অন্য কিছুই না। সেই ধ্বংস বা সংহারকারিণী শক্তিই হলেই আমার আসল রূপ।
ফাউস্ট : তুমি নিজেকে কোনও এক শক্তির অংশ বললে কেন? আমার তো মনে হচ্ছে তুমি এক পূর্ণায়ত অখণ্ড শক্তি।
মেফিস্টোফেলিস : আমি এক মহতী সত্যের কথা তোমায় বুঝিয়ে বলছি। মানুষ হচ্ছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক নির্বোধ এক সত্তা। সেই মানুষ কখনও তার সত্তার পূর্ণতা বা অখণ্ডতাকে কখনই বুঝতে পারবে না। তা সম্ভব নয় তার পক্ষে। বিশ্বজগৎ সৃষ্টির আগে এক আদিম অন্তহীন অন্ধকারের দ্বারা পরিব্যাপ্ত ছিল সব কিছু। তারপর এক সময় সেই চিররাত্রিরূপিণী আদিম অন্ধকারের সঙ্গে আলোর সংগ্রাম বাধে এ জগতের অধিকার নিয়ে। সেই আলোই অন্ধকারের এক অতি ক্ষুদ্র অংশ ছিন্ন করে আমাকে সৃষ্টি করেছে। আলো থেকেই সব কিছুর সৃষ্টি। কিন্তু সৃষ্টির আদি যুগ থেকে এই অনন্তশক্তিসম্পন্ন আলো-অন্ধকারের সঙ্গে সংগ্রাম করেও সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্থান কালের অর্ধাংশের বেশি অধিকার করতে পারেনি, আলোর মতো অন্ধকারও সত্য হয়ে আছে আজও। আজও প্রতিদিন সৌরমণ্ডলের হিংসাশ্রয়ী শরসন্ধানকে ব্যর্থ করে সেই আদিম অন্ধকার রাত্রিরূপে আসে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে। সমগ্র বিশ্বের সমগ্র ভূখণ্ড ও কালখণ্ডের অর্ধাংশের উপর জানিয়ে যায় তার অপ্রতিহত প্রতিষ্ঠাকে। বিশ্বের সকল বস্তু বা শক্তির অবয়ব আলোর দ্বারাই গঠিত হয়। আলোই সমস্ত দেহাবয়বকে উজ্জ্বলতা দান করে, তাদের সুন্দররূপে করে তোলে প্রতিভাত। তথাপি সে দেহাবয়বকে সুন্দর ও উজ্জ্বল করে তোলে আলো সেই দেহের দ্বারা ব্যাহত হয় তার গতি। সৃষ্টির এই হলো নিয়ম। তাই প্রতিহতগতি এই আলোর অভিশাপেই হয়ত এমন ক্ষণজীবী ও ক্ষণভঙ্গুর হয়ে উঠেছে প্রতিটি দেহাবয়ব। জন্মের পর হতে সকল দেহই দ্রুত এগিয়ে যার মৃত্যুর দিকে। প্রতিটি দেহের পতনে বা মৃত্যুতে তার সম আয়তন স্থান আলোর অধিকার আসে। সে স্থানে আলোর গতি হয় স্বচ্ছ এবং অবাধ।
