ওয়াগনার : ওটা একটা কুকুরমাত্র, আপনি যা ভাবছেন সে ধরনের কোনো অলৌকিক বস্তু নয়। ওই দেখেন ও থেমে গেছে। এখন ও বুকের উপর ভর দিয়ে শুয়ে আছে। ওর লেজ নড়ছে। ঠিক সাধারণ পশুর মতোই অবিকল ওর আচরণ।
ফাউস্ট : কই এস, আমাদের পিছু পিছু এস। আমাদের অনুসরণ করো। কাছে এস।
ওয়াগনার : এ এক আশ্চর্য অদ্ভুত পশু। আপনি দাঁড়িয়ে থাকলে ও বসে থেকে অপেক্ষা করবে। আর ওকে কোনও কথা বললেই সঙ্গে সঙ্গে ও সে আদেশ পালন করবে। যদি কোনও জিনিস আপনার হারিয়ে যায়, যদি জলস্রোতে আপনার হাতের বেতের ছড়িটি পড়ে যায় তাহলে ও হয়ত তৎক্ষণাৎ তা এনে হাজির করবে।
ফাউস্ট : তুমি যে এ বিষয়ে ঠিক সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আমি ঐ পশুটার মধ্যে মন বলে কোনও পদার্থ দেখতে পাচ্ছি না। শুধু দেখছি অভ্যাসের গুণ।
ওয়াগনার : কোনও কুকুর যদি উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পায় তাহলে সে জ্ঞানীলোকেরও সঙ্গী হতে পারে। এখন দেখছি কুকরটা সত্যিই আপনার সঙ্গলাভের যোগ্য। মেধাবী। ছাত্রের মতোই ও চতুর। (তারা নগরদ্বারের ভিতর দিয়ে চলে গেল।
তৃতীয় দৃশ্য
পাঠাগার
ফাউস্ট : (লোমছাঁটা একটি কুকুরসহ প্রবেশ) আমার পশ্চাতে মাঠ-ঘাট-প্রান্তর সব ঘুমোচ্ছে। এই গভীর রাত্রিতে আমি সম্পূর্ণ একটা। নিশীথ–নিবিড় রাত্রির এই স্তব্ধ অবকাশে চিন্তাশীল বহু মনীষী অনেক জ্ঞানের আলো খুঁজে পান তাঁদের মগ্নচৈতন্যের গভীরে। যত সব দুর্বার কামনা ও উদ্ধত উত্তপ্ত আবেগানুভূতিরা শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে একে একে। এখন তাদের জায়গায় মনের মাঝে জেগে উঠছে উদার মানবপ্রেম। ও ঈশ্বরপ্রেমের প্রশান্ত গম্ভীর এক অনুভূতি।
শান্ত হও হে সারমেয়। অশান্ত হয়ে চঞ্চলতা প্রকাশ করো না অকারণে। ওখানে তক্তপোশের কাছে কি কছ? ঐ চুল্লিটার কাছে শান্ত হয়ে বিশ্রাম করো। আমি তোমাকে আমার একটি নরম আরামপ্রদ আসন দান করেছি। কিছুক্ষণ আগে তুমি ঐ অদূরবর্তী পাহাড়ে ছোটাছুটি ও লাফালাফি করে আমাদের অনেক আনন্দ দান করেছ। তাই এখন আমি চাই তুমি আমার ঘরে শান্ত হয়ে বিশ্রাম করো আমার কাছে।
আমার এই সংকীর্ণ পরিসর কক্ষটিকে বাতিটি শান্তভাবে জ্বলছে। এক-একটি অগ্নিশিখা বুকে নিয়ে জ্বালানী কাঠগুলো ক্রমশই স্তিমিত হয়ে পড়ছে। আমি আমার অন্তরের অন্ধকারে অনুভব করলাম সহসা উদ্দীপিত হয়ে উঠেছে এক দুর্মর আশার আলো। নূতন উৎসাহে উৎসাহিত করছে আমায়। স্তিমিত তন্দ্রাহত যুক্তিবোধ জেগে। উঠেছে আবার। সত্তার শ্লথগতি নদীগুলো জীবনের উৎস সন্ধানে তীব্র বেগে প্রবাহিত হয়ে চলেছে অদম্য আশায়।
গর্জন করো না হে সারমেয়। জগৎ ও জীবনের অশ্রুত অথচ পবিত্রমধুর যে ঐকতান, যে শান্ত সুরসঙ্গতি আমার অন্তরাত্মা তার গভীরে খুঁজে পেয়েছে, তাকে আগ্রহভরে আলিঙ্গন করছে সে বারবার। তার সঙ্গে তোমার এই পাশবিক গর্জন মোটেই মানায় না। আমরা জানি মানুষ যা বুঝতে পারে, তা তার বোধগম্য হয়ে ওঠে। উপলব্ধির জগতে, তাকেই সে ঘৃণার চোখে দেখে। জীবনে যা কিছু শুভ, যা কিছু সুন্দর, যা কিছু সত্য, তার বুদ্ধিবৃত্তির স্বল্পতাহেতু তার যথার্থ মূল্য অনেক সময় নিরূপণ করতে পারে না মানুষ। তবে কি তার বোধাতীত সুন্দরকে বুঝতে না পেরেই তার প্রতি এই অশান্ত গর্জনের মাধ্যমে এক তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করছে এই সারমেয়?
আমি বেশ বুঝতে পারছি কামনার প্রবলতর প্রতিকূলতার সন্তোষের নদীটি সহজ সাবলীল গতিতে প্রবাহিত হতে পারছে না আগের মতো। এক জ্বলন্ত কামনার বিস্তীর্ণ মরুপথে যেতে সম্পূর্ণরূপে বিশুদ্ধ ও নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়েছে সে নদী। এক বিশাল তৃষ্ণার জ্বালাময়ী শুষ্কটা নিঃশেষে শোষণ করে নিচ্ছে আমার সত্তার সব রস। আমি জীবনে অনেক জ্ঞানবিদ্যা অর্জন করেও এই জ্বলন্ত কামনার বেগকে জয় করতে পারিনি। তাই আজ আমি চাই কোনও না কোনও অতিপ্রাকৃত শক্তির অলৌকিক সহায়তা। নিউ টেস্টামেন্টে বর্ণিত ঈশ্বরপ্রেরিত বোধি বা এক অধ্যাত্ম অনুভূতি ব্যাকুলভাবে কামনা করি। আজ আমি। আমি তার অর্থ আজ নূতন করে উপলব্ধি করতে চাই। মূল ভাষায় লেখা। ঈশ্বরের সেই পবিত্র অলৌকিক বাণী আজ আমি আমার প্রিয় জার্মান ভাষায় অনুবাদ করতে চাই।
(একখানি গ্রন্থ খুলে পড়তে লাগল)
এতে লেখা আছে, সৃষ্টির আদিতে ছিল শুধু শব্দ। কিন্তু একথা আমি মানতে পারি না। শব্দ? –অসম্ভব। শব্দকে এতখানি গুরুত্ব দেওয়া কখনই উচিত হবে না। দৈবের। কাছে যে শিক্ষা আমি লাভ করেছি তা যদি সার্থক হয় তাহলে আমি ঠিকই বলছি, কথাটাকে ঘুরিয়ে বলছি। সৃষ্টির আদিতে শুধু ছিল চিন্তা। তবে কথাটাকে ভালো করে তলিয়ে দেখতে হবে, আমি আবার অধৈর্য হয়ে তাড়াহুড়ো করে কিছু বলে ফেলছি না। তো? আচ্ছা, চিন্তাই তো সকল ধর্ম ও সৃষ্টিশীলতার মূলে। আমি পড়েছি, সৃষ্টির আদিতে ছিল শক্তি। কিন্তু কথাটাকে আমি ভালো করে পরীক্ষা করে দেখিনি। দৈবানুকূল্যে এখন আমি আলো দেখতে পাচ্ছি এ বিষয়ে। আমি বুঝেছি। তাই লিখছি, সৃষ্টির আদিতে ছিল কম।
হে সারমেয়, আমার এই ঘরে একান্তই যদি তুমি থাকতে চাও, তাহলে তোমাকে অবশ্যই গর্জন থামাতে হবে। তুমি আর চিৎকার করো না। এমনভাবে গোলমাল করলে। আমি তোমাকে থাকতে দেব না আমার কাছে। শোনো আমার কথা। তোমাকে যেতেই হবে। আর আমি তোমাকে আমার আতিথেয়তা দান করতে পারব না। আমার ঘরের দরজা খোলা, তুমি যেতে পার। কিন্তু আমি কি দেখছি? এটা কি স্বাভাবিক, বাস্তব সত্য। না কল্পনা? সেই সামান্য কুকুরটা কি বিরাট লম্বা হয়ে উঠেছে সহসা। এখন ওকে দেখে। পশু বলে মনে হয় না। কী অদ্ভুত দৃশ্যই না আমি দেখছি। ওকে দেখে এক ভয়ঙ্কর। জলহস্তী বলে মনে হচ্ছে। ওর চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে। ওর দাঁতগুলো খুবই ভয়ঙ্কর! এবার আমি তোমায় চিনতে পেরেছি। তোমার অর্ধ-নারকীয় ভয়ঙ্কর আকৃতি। সত্ত্বেও সলোমনের জ্ঞানের চাবিকাঠির সাহায্যে আমি তোমার স্বরূপ জানতে পেরেছি।
