কিন্তু হায়, সে গৌরব কত ক্ষণভঙ্গুর। হায়, আমার এই মাটির দেহটিকে এই মাটির পৃথিবী থেকে তুলে নিয়ে যাবার মতো কোনও পাখা সৃষ্ট হয়নি আজও। কিন্তু তা সত্ত্বেও যখনি এই পৃথিবীর নদীতে হ্রদে সমুদ্রে পাল তুলে কোনও জাহাজ ভেসে যায় দূর আকাশে, কোনও উদ্ধত পাখা মেলে কোনও ঈগল উড়ে যায় অথবা ঊর্ধ্বগগনে উড্ডীন কোনও লার্ক পাখি মুঠো মুঠো গান ছড়িয়ে দেয় পাহাড়ে প্রান্তরে ঠিক তখনই প্রতিটি মানুষের অন্তরের মধ্যে জেগে ওঠে সীমাহীন ঊর্ধ্বগতির এক অভ্রভেদী উন্মাদনা। অবুঝ উচ্চাকাঙ্ক্ষী পাখির মতো সে তখন আকাশের ওপারে গিয়ে নীল আলোর গভীরে হারিয়ে যেতে চায় নিঃশেষে।
ওয়াগনার : আমার মনের মাঝে সময়ে সময়ে এই ধরনের এক অদ্ভুত খেয়াল জাগত বটে, কিন্তু কখনও আপনার মতো এমন উন্মাদনা অনুভব করিনি আমি। কোনও অরণ্য বা প্রান্তর যত মনোরমই হোক না কেন তার পানে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে ক্লান্তি অনুভব করি আমি। কোনও আকাশগামী পাখির গানের যত মায়াই থাক না কেন সে পাখির পাখা আমি কখনও কামনা করি না। বই পড়তে পড়তে যে কল্পনা প্রসারিত হয়ে ওঠে আমার মনে, আমি তাতেই পাই আনন্দ আর নবজীবনের আস্বাদ। শীতের রাত্রিতে আমি যখন কোনও আরামশয্যায় ডুব দিয়ে থাকি, তখন আমার অঙ্গ প্রত্যঙ্গের শিরায় শিরায় কৃত্রিম তাপের যে বন্যাপ্রবাহ খেলে যায় তাতে মনে হয় আমার চারিদিকে তখন স্বর্গ নেমে এসেছে। এক অফুরন্ত স্বর্গসুখ ঘন হয়ে উঠেছে আমার এই পার্থিব জীবনে।
ফাউস্ট : একটা কথা ভালোভাবে মনে রেখো, অপর কোনও মানুষকে যেন জানতে যেও না। আমার নিজের বুকের মধ্যেই দুটো আত্মা আছে। আমি ভেবেছিলাম এই দুই আত্মার মধ্যে ভ্রাতৃসুলভ এক গভীর ও অবিচ্ছিন্ন সম্প্রীতি বিরাজ করবে। কিন্তু হায়, একে অন্যকে ঘৃণার সঙ্গে এড়িয়ে চলে। একজন যদি সমগ্র বিশ্বজগৎকে এক গভীর ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করতে চায়, অন্য আত্মাটি তখন সে ভালোবাসার বন্ধনকে ঘৃণাভরে ছিন্নভিন্ন করে ধুলোর মতো উড়িয়ে দিতে চায় শূন্যে। স্বর্গ আর মর্ত্যলোকের মধ্যবর্তী কোনও জগতে যদি কোনও প্রেতাত্মা থাকত যদি সে আমার নির্দেশ মতো আকাশে-বাতাসে অবাধে ছুটে বেড়াতে পারত, তাহলে আজ সে এক সোনালী ইন্দ্রজাল বিস্তার করে আমাকে এক নূতন সত্তা দান করতে পারত। আমি যদি আমার সেই ঐন্দ্রজালিক শক্তি আবার ফিরে পাই, যদি সে শক্তির প্রভাবে জগতে ইচ্ছামতো ঘুরে বেড়াতে পাই তাহলে রাজ-ঐশ্বর্যের বিনিময়েও আমি সে শক্তি হারাতে চাইব না কখনও।
ওয়াগনার; অতিলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত আত্মাদের এভাবে আবাহন করো না। তারা তাহলে তাদের অশুভ শক্তিবলে এ দেশের সমস্ত আকাশ-বাতাসকে কলুষিত করে। তুলবে। তাদের জাতিকে সব দিক থেকে বিপদাপন্ন ও বিব্রত করে তুলবে তারা। তাদের একটি দল যখন উত্তর দিক থেকে তীক্ষ্ণ কাঁটাতার দিয়ে বাঁধবার চেষ্টা করবে, পুব দিক থেকে আর একটি দল নিয়ে আসবে ভয়াবহ উত্তাপ আর শুষ্কতা। আবার একটি দল যখন দক্ষিণের মরু অঞ্চল থেকে নিয়ে আসবে অগ্নিপ্রবাহ, তখন সে আগুন নির্বাপিত করার জন্য পশ্চিম দিক থেকে একদল নিয়ে আসবে প্রবল বন্যার ধারা। সে বন্যার স্রোতে মাঠ-ঘাট পাহাড়-প্রান্তর সব ভেসে যাবে। ঐ সব অতি প্রাকৃত আত্মার দল সব সময় মানুষের ক্ষতি করার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। ওরা সানন্দে আমাদের সাদর আহ্বানে সাড়া দেয়, কারণ ওরা তার ফলে সহজেই প্রতারিত করতে পারে আমাদের। তারা এমন ভাব দেখায় যাতে মনে হয় তারা স্বর্গ হতে দেবতাদের প্রতিনিধি। হিসাবে দেবদূতরূপে নেমে এসেছে। কিন্তু আসলে তারা ছলনা করে আমাদের সঙ্গে। যাই হোক, চলুন, এখন যাওয়া যাক। এখন সন্ধে হয়ে গেছে। শিশির পড়ছে। শীতের রাতে গৃহকোণই সবচেয়ে মূল্যবান। কিন্তু চোখ দুটো অমন বিস্ফারিত করে তাকিয়ে রয়েছেন কেন? কী এমন কারণ থাকতে পারে যার জন্য এই সন্ধ্যার প্রাক্কালে বিষাদে কাতর হয়ে উঠেছে আপনার মন?
ফাউস্ট : অদূরে শস্যক্ষেত্রের উপর দিয়ে একটা কালো কুকুরকে হেঁটে যেতে দেখছ?
ওয়াগনার : অনেকক্ষণ আগে থেকেই দেখছি। কিন্তু কোনও গুরুত্ব দিইনি।
ফাউস্ট : ভালো করে দেখো দেখি। কি মনে হয় পশুটাকে?
ওয়াগনার : কোনও একটা সামান্য কুকুরমাত্র যে তার প্রভুকে দেখতে না পেয়ে পথ শুঁকে শুঁকে তার বাড়ি ফিরছে।
ফাউস্ট : দেখছ না, একটা অগ্নিগোলক কুকুরটাকে রহস্যময়ভাবে অনুসরণ করে চলেছে। কুকুরটা যতই এগিয়ে আসছে ততই সেটাকে দেখা যাচ্ছে না আর ঐ অগ্নিগোলককে কেন্দ্র করে যে আলোকবৃত্ত গড়ে উঠেছে তার পরিধিটা ক্রমশই ছোট হয়ে আসছে।
ওয়াগনার : আমার তো মনে হচ্ছে আপনার চোখ কিছুটা প্রতারিত করছে আপনাকে। কারণ আমি একটা কালো লোমাটা কুকুর ছাড়া আর কিছু দেখছি না।
ফাউস্ট : আমার মনে হচ্ছে এক মোহপ্রসারী কৌশলের দ্বারা ঐ পশুটা আমাদের চলৎশক্তিটাকে বিকল করে দিচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে হয়ত আমাদের গতিশক্তিকে শৃঙ্খলিত করে দেবে একেবারে।
ওয়াগনার : আমি দেখছি পশুটা আমাদের কাছে এসে সংশয়াচ্ছন্ন মনে ইতস্তত ছোটাছুটি করছে। কারণ ও ওর প্রভুর খোঁজে এসে দেখছে তার জায়গায় দুজন অপরিচিত ব্যক্তিকে।
ফাউস্ট : আলোকবৃত্তটার পরিধি আরও সংকীর্ণ হয়ে উঠেছে। ও এসে গেছে আরও কাছে।
