জনৈক বৃদ্ধ কৃষক : হে মহাশয় ডাক্তার ফাউস্ট, আপনার মতো একজন সুপণ্ডিত ব্যক্তি যে এই উল্লসিত জনতার মাঝখানে দয়া করে নেমে এসেছেন সেটা আপনার মহানুভবতার পরিচায়ক। যদি এসেছেন তাহলে সবচেয়ে সুন্দর পানপাত্রটি ধরুন, আমি তাতে মদ ঢেলে দিই। আমার বিনীত ইচ্ছা, আপনি এখন পান করুন এবং অসংখ্য মদের বিন্দুর মতোই আপনার জীবনের আয়ুর দিন বেড়ে যাক।
ফাউস্ট : তুমি ভালোবেসে যে পাত্র দিচ্ছ, আমি ধন্যবাদের সঙ্গে তা গ্রহণ করছি। তোমাদের স্বাস্থ্য কামনা করি আমি।
(ফাউস্টের চারপাশে জনতা ভিড় করে দাঁড়াল)
বৃদ্ধ কৃষক : সত্যি কথা বলতে কি, আপনি আমাদের আনন্দের দিনেই এসে পড়েছেন। খুব ভালো হয়েছে। আপনি যিনি আমাদের দুঃখের দিনে আমাদের প্রচুর সাহায্য করেন, আজ সুখের দিনে তাকে পেয়ে আমাদের বড় ভালো লাগছে। এখানে আজ এমন অনেক লোক দাঁড়িয়ে আছে যাদের প্রাণ আপনার পিতা সুদক্ষ হাতে ভয়ঙ্কর জ্বরে বা প্লেগের কবল থেকে রক্ষা করেন। আপনি নিজেও যত সব দীন-দুঃখীর বাড়ি বাড়ি ঘুরে অনেক অনেক সাহায্য দান করেন। বহু মৃতদেহ নিজের ঘাড়ে করে সৎকার করেন। তাতে আপনার কোনও ক্ষতি হয়নি। জীবনের কোনও পরীক্ষাই এড়িয়ে যাননি আপনি। আপনার সাহায্যের অফুরন্ত ভাণ্ডার যেন কোনও দয়ালু দেবতার আশীর্বাদে ধন্য ও সমৃদ্ধ ছিল।
সকলে : আমরা সেই সুদক্ষও বহু পরীক্ষিত সুমহান ডাক্তারের স্বাস্থ্য কামনা করি। আমাদের সকলের উপকার ও সাহায্য দানের জন্য তিনি যেন দীর্ঘকাল জীবিত থাকেন।
ফাউস্ট : যিনি স্বর্গ থেকে আমাদের সমস্ত সাহায্য দান করেন, যিনি আমাদের সমস্ত বিষাদ থেকে উদ্ধার করেন, হে বন্ধুগণ, তোমরা তার উদ্দেশ্যে মাথা নত করে তাঁকে প্রণাম করো।
(ফাউস্ট ওয়াগনারের সঙ্গে এগিয়ে চলল)
ওয়াগনার : হে মহান, জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধার্ঘ্য কিভাবে কি মনে গ্রহণ করবেন তা জানি না, তবে এইটুকু জানি যে যিনি আপন গুণে ও যোগ্যতায় এই ধরনের শ্রদ্ধা ও সম্মানে ভূষিত হন তিনি নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান ব্যক্তি। তরুণদের কাছে। ওরা আপনাকে পরিচিত করে দিচ্ছে। আপনার জন্য ওদের নৃত্যগীত থেমে গেছে। ওরা আপনার দিকে তাকিয়ে আপনার কথা বলাবলি করছে। আপনি যাচ্ছেন আর ওরা ওদের মাথায় টুপি খুলে উঁচুতে তুলে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে তা দেখছে। আপনি যদি ওদের কাছে আর একটু এগিয়ে যান ওরা হয়ত নতজানু হয়ে আপনার বন্দনা করবে, মনে। হবে যেন কোনও দেবদূত এসেছে ওদের কাছে।
ফাউস্ট : আর একটু উপরে উঠে চলো। ঠিক ঐ পাথরটার কাছে ওখানে গিয়ে আর আমরা এগোব না। ওখানেই আপাতত কিছুক্ষণ থাকব। আগে যখন আমি উপবাস আর উপাসনায় নির্বোধের মতো দিন কাটাতাম তখন কতদিন গভীরভাবে চিন্তামগ্ন অবস্থায় ঐ পাথরটার কাছে একা বসে থেকেছি আমি। ওখানে আমি কতদিন মনেতে এক বলিষ্ঠ আশা আর ধর্মবিশ্বাস নিয়ে চোখে অশ্রু আর বুকভরা দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে করজোড়ে ঈশ্বরের কাছে কত মৃত্যুকামনা করেছি। অনন্ত প্রসারিত মৃত্যুর শান্তিময় অঞ্চলভাগটাকে কোনও রকমে একটুখানি স্পর্শ করার জন্য কত কাতর প্রার্থনা করেছি ঈশ্বরের কাছে।
আজ জনগণের এই উচ্ছ্বসিত শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনে ঘৃণাবোধ করছি আমি। আমার ও আমার পিতার উদ্দেশ্যে ওরা যে প্রশংসার উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল তাতে আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে কি অনুভূতি জাগছে তা যদি তুমি একবার বুঝতে পারতে। আমার পিতা ছিলেন একজন গম্ভীর প্রকৃতির চিন্তাশীল লোক। তিনি শুধু প্রকৃতির রাজ্য থেকে কল্যাণকর উপাদানগুলো ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করে তাই দিয়ে মানুষের রোগ-যন্ত্রণার প্রতিকার হিসাবে কিছু ওষুধ প্রস্তুতের জন্য নির্বোধের মতো শ্রম ও সংগ্রামে মেতে উঠতেন। তিনি তাঁর প্রায়ান্ধকার দোকানঘরে সব সময় কুঁজো হয়ে বসে বিচিত্র উপাদানের সংমিশ্রণে ওষুধ তৈরি করার কাজে ব্যস্ত থাকতেন। তৈরি ওষুধটার মধ্যে রঙের জৌলুস থাকলেই তা দেখার সঙ্গে সঙ্গেই যেন রোগীদের রোগ সেরে যেত। কিন্তু কেউ জানতে চায়নি সঠিকভাবে কার্যত কার কার রোগ সেরেছে সেই ওষুধে। আমাদের প্রদত্ত সে ওষুধ অনেক সময় বিষের মতো কাজ করত আর তাতে অসংখ্য লোক মারা যেত। এইভাবে পার্শ্ববর্তী এই সব পার্বত্য এলাকায় আমরা দুজন এক জীবন্ত মহামারীরূপে ঘুরে বেড়াতাম। আজ সেই নির্লজ্জ নরঘাতকদেরই ওরা প্রশংসা করছে আর আমাকে তা শুনতে হচ্ছে।
ওয়াগনার : তার জন্য আপনি চিন্তাৰিত হচ্ছেন কেন? পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রদত্ত কোনও পেশার উন্নতি সাধনে সর্বপ্রযত্নে চেষ্টা করা যে কোনও সৎ লোকেরই উচিত। আপনি একজন যুবক; আপনি নিশ্চয় আপনার পিতাকে শ্রদ্ধা করেন। তাহলে তার দেওয়া পেশাগত শিক্ষা থেকে অবশ্যই আপনার আনন্দ পাওয়া উচিত। মানুষ হিসাবে আপনি নিশ্চয় আপনার জীবনের লব্ধ সত্যের ভাণ্ডার বর্ধিত করতে চান। তাহলে আপনি অবশ্যই আপনার পুত্রকেও এই পেশা শেখাবে যাতে সে আপনাকেও যোগ্যতায় ছাড়িয়ে যেতে পারে পরবর্তীকালে।
ফাউস্ট : ভ্রান্তিজনিত অধঃপতনের গভীরে পতিত হয়েও পুনরুত্থানের আশা রেখে যারা নূতন আশায় সঞ্জীবিত হয়ে আবার ওঠার চেষ্টা করে তারা সত্যিই সুখী। ভবিষ্যতের যে সত্য তার কাছে অজ্ঞাত সেই সত্যই আস্থা স্থাপন করে চলে মানুষ ইচ্ছা করে; কিন্তু যে সত্য তার জ্ঞাত তা সে মেনে চলতে চায় না। কিন্তু সে যাই হোক, এই সব হতাশার কথা ভেবে আজকেই এই মুহূর্তের আনন্দকে তিক্ত করে লাভ নেই। ঐ দেখো, প্রাকসন্ধ্যার এই অস্তগত প্রায় সূর্যের শেষ সোনালী আলোয় সবুজ বাড়িগুলো কেমন চকচক করছে। এখন ক্রমশই ম্লান হয়ে আসছে সূর্যের আলো। অবসান ঘটেছে সারাদিনের যত সব কাজকর্মের। এখন শেষ সূর্যরশ্মি এ জগৎ ছেড়ে নূতন কোনও জগৎ ও জীবনের আশায় যাত্রা শুরু করেছে। হায়, এমন কোনও পাখা নেই যার উপর ভর করে আমি এখান থেকে বহু ঊর্ধ্বে উঠে গিয়ে এই সূর্যরশ্মির যাত্রাপথটির অনুসরণ করতে পারি। তাহলে অনন্ত এক স্বর্ণোজ্জ্বল সূর্যাস্ত দেখে ধন্য হতাম আমি। অস্তম্লান স্বর্ণরশ্মির আভায় পরিপ্লাবিত হয়ে উঠত আমার নিম্নস্থ ধরণীতল। এক আগ্নেয় দীপ্তিতে প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠত পর্বতশৃঙ্গগুলো। সেই অমিত দীপ্তিরাশি ঝরে পড়ে রূপালি নদীজলধারাগুলোকে স্বর্ণপ্রভ করে তুলত চিরকালের জন্য। চিরশান্তি বিরাজ করত পার্বত্য উপত্যকাগুলোতে। তখন আমি হয়ে উঠতাম দেবতাদের মতোই অবাধ ও অপ্রতিহত গতি। অসংখ্য পর্বতমালা সংলগ্ন গভীর খাদগুলো কোনওক্রমেই গতিরোধ করতে পারত না আমার। আমার চক্ষুর সামনে অনন্তপ্রসারিত মহাসমুদ্রের বিক্ষুব্ধ তরঙ্গ মালাগুলো কোন যাদুমন্ত্রে যেন এক চির উজ্জ্বল ও আয়তনীল মুখে সমাহিত হয়ে থাকত। মরণশীল মানবজীবন সুলভ অবসাদ মুহূর্তে দূরীভূত হয়ে যেত আমার দেহমন থেকে। অনন্ত স্বর্গীয় আলোকসুধা পান করে জরামৃত্যুহীন এক দৈব প্রাণের উন্মাদনায় আশ্চর্যরূপে সপ্রতিভ হয়ে উঠতাম আমি। অবিরাম অনাবিল সুখে সমৃদ্ধ সেই স্বর্গবাস গৌরবময় এক স্বপ্নমাধুরী নিয়ে পরিপূরিত করে তুলত আমার দিনরাত্রিগুলোকে।
