হে আমার স্ফটিকস্বচ্ছ পানপাত্র, তুমি যেন বহু যুগের ওপার হতে উঠে আসছ আমার কাছে। তোমার সঙ্গে সঙ্গে বহু দিনের বহু বিস্মৃত কথা উঠে আসছে আমার মনে। সুদূর অতীতে একদিন তুমি আমার পূর্বপুরুষদের কত ভোজসভা উজ্জ্বল করে। তুলতে। কত গণ্যমান্য অতিথিদের প্রীত করতে তুমি। তুমি তখন এক হাত হতে অন্য হাতে ফিরতে। সেই সব নৈশ্যভোজসভায় কত ধনী ও সুদক্ষ ব্যক্তি তোমাকে পেয়ে মত্ত হয়ে উঠত। অনেক সময় আমি এক চুমুকে একটি পূর্ণ পাত্র নিঃশেষিত করতাম। আবার অনেক সময় নিজে না খেয়ে একটি পাত্র অপরের হাতে তুলে দিতাম। আমার। যৌবনকালের সেই সব আনন্দোচ্ছল উৎসব রজনীর কত স্মৃতি ছন্দোবদ্ধ হয়ে বেরিয়ে আসছে আমার মন থেকে। আর কিন্তু কখনও কোনও ভোজসভায় আমার পার্শ্ববর্তী কোনও অতিথির হাতে তোমায় তুলে দেব না। তোমার গর্ভনিহিত সমস্ত মদ্য পান করেও কিভাবে আমার চেতনা ও বুদ্ধি অক্ষত থাকে তার পরীক্ষা আর কোনওদিন করব না। আজ তোমার স্ফটিকস্বচ্ছ গর্ভে বাদামী রঙের যে রসমাধুরী বিরাজ করছে তা পান। করার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত নিদ্রা নেমে আসে চোখে। আমি সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে রসমাধুরী নিঃশেষে পান করতে চাই। তারপর সুগভীর সুখনিদ্রায় নিবিড় নিশাকাল যাপন করে এক উজ্জ্বল প্রভাতকে বরণ করে নিতে চাই আমি।
(পান পাত্রটি মুখের কাছে নিয়ে গেল)
(মৃদু ঘণ্টাধ্বনি ও সমবেত সঙ্গীত)।
দেবদূতদের সমবেত গান
খ্রিস্টের পুনরভ্যুত্থান ঘটেছে
সমগ্র মানবজাতির পক্ষে এ এক বিপুল আনন্দের কারণ।
অসংখ্য প্রয়োজনের বন্ধনে
খ্রিস্টকে নতুন করে আবদ্ধ করতে চাইছে
অযোগ্য মানুষ।
ফাউস্ট : আমার ওষ্ঠাধরের সঙ্গে পানপাত্রের মিলনের সঙ্গে সঙ্গেই কিসের এক মৃদুমধুর গুঞ্জনধ্বনি চমকিত করে তুলছে আমায়। তবে কি এ ধ্বনির মধ্যে খ্রিস্টের জন্মমূহূর্ত ঘোষণাকারী সানন্দ ঘন্টাধ্বনিই ঘোষিত হয়ে উঠেছে নূতন রূপে? হে অস্কুট সঙ্গীত, খ্রিস্টের মৃত্যুর পর সারা রাত্রিব্যাপী দেবদূতের কণ্ঠনিঃসৃত সান্ত্বনা বাণী ছড়িয়ে পড়েছিল স্বর্ণ ও মর্তের আকাশে-বাতাসে। ঈশ্বরের নূতন আদেশ-বিধৃত যে দৈববাণী বার বার ঘোষিত হয়েছিল, তোমার মধ্যে আজ কি সেই বাণীই ধ্বনিত হয়ে উঠছে। বারবার?
নারীদের সমবেত গান
মূল্যবান ওষধি আর মশলা দিয়ে প্রলেপ তৈরি
করে লাগিয়ে দিলাম তাঁর ক্ষতস্থানে।
যথাযোগ্য শ্রদ্ধা আর সম্মানের সঙ্গে
তাঁকে আমরা শুইয়ে দিয়েছিলাম।
পরিষ্কার বস্ত্রখণ্ড দিয়ে বেঁধে দিয়েছিলাম ক্ষতগুলো।
কিন্তু পরিশেষে চোখ মেলে দেখলাম
খ্রিস্ট নেই; আমাদের এতগুলো চক্ষের
প্রহরাকে ফাঁকি দিয়ে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল তাঁর দেহাবয়ব!
দেবদূতদের সমবেত গান
পুনরভ্যুত্থিত হয়েছেন খ্রিস্ট
পরম স্বর্গীয় সুখে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে তার নবজীবন।
যে দুঃখকষ্টে একদিন তিনি প্রপীড়িত হন,
যে অপমানে একদিন তিনি অপমানিত হন
যে পরীক্ষায় একদিন তিনি পরীক্ষিত হন,
আজ তার সব কিছুর অবসান ঘটেছে
এক অভিনব গৌরবে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে তার দেহ।
ফাউস্ট : স্বর্গলোকাগত হে শান্ত অথচ বলিষ্ঠ শব্দসুষমা, কেন তুমি এই ধূলিমলিন জগতে এসে আমাকে প্রলুব্ধ করতে চাইছ? তার থেকে বরং তুমি আমার থেকে দুর্বলমনা ব্যক্তিদের কাছে যাও। তোমার অন্তর্নিহিত সুরময় বাণী আমি শুনেছি। কিন্তু যে ধর্মবিশ্বাস হতে দৈববাণীর প্রতি এক ঐন্দ্রজালিক আসক্তি ও ভক্তির জন্ম হয় সে ধর্মবিশ্বাস ঈশ্বর আমাকে দেয়নি। যেখান হতে উৎসারিত হচ্ছে এই পরমানন্দ অভিনিষ্যন্দী বাণী সেই স্বর্গলোকে আমি উঠে যেতে চাই না। তথাপি আমার সুদূর শৈশবকাল হতে আমি এ বাণী এ গান শুনে আসছি। আজ আমার সেই গান সেই বাণী আনুগত্যের এক নূতন দাবি নিয়ে এসেছে আমার জীবনে।
আজও আমার মনে আছে অতীতে কোনও এক ছুটির দিনে সহসা স্বর্গীয় প্রেমের এক উত্তপ্ত চুম্বন নেমে আসে আমার ললাটদেশে। এক পবিত্র ধর্মভাবের আভাসে উদভাসিত হয়ে ওঠে আমার অন্তর। কোথা হতে ভেসে আসা চার্চের মৃদু ঘণ্টাধ্বনি সমন্বিত প্রার্থনার অশ্রুত সঙ্গীত ধ্বনিত হয়ে ওঠে আমার কর্ণকুহরে। এক পরম স্বর্গীয় সুখানুভূতির অতলে নিঃশেষে বিগলিত হয়ে যায় আমার সমগ্র অন্তরসত্তা। এক মধুর। অথচ দুর্বোধ্য ব্যাকুলতার মদাবেশাকুলা অরণ্যপ্রান্তচারিণী বনহরিণীর মতো লঘু হয়ে। ওঠে আমার পদযুগল। অজস্র অশ্রুবিন্দুর তপ্ত জ্বালা সত্ত্বেও আমার মনে হলো স্তবকিত আশা ও আনন্দের অমিত ঐশ্বর্যভাবে সজ্জিত এক বিরাট পৃথিবী প্রতীক্ষায় রয়েছে আমার জন্য।
আমার যৌবনে এই গান একদিন আনত বসন্তের আনন্দোচ্ছ্বাস। কিন্তু আজ সে সব কথা মনে পড়লে মনে হয় শিশুসুলভ এক বাতুলতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম তখন আমি। স্থিতপ্রজ্ঞ এই পরিণত বয়সে সে পথ থেকে ফিরে এসেছি। সে স্বর্গসুধাসিক্ত সুমধুর দৈববাণী, তুমি গীত হয়ে চলো এমনি করে অবিরাম। তোমার অন্তর্নিহিত গীতিরসসুধাপানে চোখে জল আসছে আমার। তবু তোমাকে সহজ বিশ্বাসের দ্বারা বরণ করে নিতে পারছি না। আমি মাটির পৃথিবীর সন্তান। আমার সেই কল্পলোকবিহারিণী সুউচ্চ স্বর্গসুখদ্বার হতে আমি আমার পৃথিবীমাতার মাটির কোলেই ফিরে এসেছি। আবার।
শিষ্যগণের গান
