আমার এই ধুলিমলিন পার্থিব দেহসত্তার প্রাচীরবেষ্টনী আর তার অসংখ্য স্তরভেদ বাস্তব জগত ও জীবনের বিচিত্র ঐশ্বর্য ও অলংকৃত বাগবিন্যাসের অর্থহীন জৌলুস আমার অন্তরাত্মাকে প্রতিনিয়ত প্রপীড়িত করে চলেছে। সেই অন্তরাত্মার মুক্তির ব্যাপারে আমি কোন শাস্ত্রপাঠ বা পুঁথিগত বিদ্যালাভ হতে সাহায্য পাব? অসংখ্য বই পড়ে আমি কি শুধু এই শিক্ষাই পাব না যে এই পৃথিবীর সর্বত্র আত্মনিপীড়িত মানুষের হৃদয় হতে রক্ত ঝরছে? হয়তো কোন অজ্ঞাত নির্জনে দুই-একজন সুখী মানুষ নির্বিঘ্নে দিনাতিপাত করছে। বোকার মতো হাসছ কেন? তুমি আমি–আমরা সবাই নির্বোধ, অসার অনুর্বর আমাদের মস্তিষ্ক। জেনে রাখো, আমার মতো তোমার মস্তিষ্কও অস্বচ্ছম্লান দর্পণের মতো আলোকদীপ্ত এক উজ্জ্বল দিবসের জন্য মুহূর্ত গণনা করে পরিশেষে ক্লান্ত ও ব্যর্থ হয়ে গোধূলির প্রায়ান্ধকার ধূসরতার দ্বারাই আচ্ছন্ন হয়ে আছে। সত্যের প্রতি তার পিপাসা তীব্র হলেও মিথ্যার প্রতি তার অধোগমন অব্যাহত রয়েছে।
হে যন্ত্রসমূহ তোমরা তোমাদের অদ্ভুত আকৃতি ও বিচিত্র রূপ নিয়ে আমাকে যে বিদ্রূপ করছ তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আমি অনেক কষ্টে আমার গন্তব্যস্থল এক বিরাট সৌধের দ্বারদেশের সন্ধান পেয়েছিলাম। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি প্রবেশ করতে পারিনি তার মধ্যে। হায় চাবি, তুমি ব্যর্থ হয়েছ। তুমি কোনও সুদক্ষ কারিগরের দ্বারা কৌশলে নির্মিত হলেও আমার সম্মুখস্থ সেই রুদ্ধদ্বার উঘাটিত করতে পারনি। তোমরা যান্ত্রিক শক্তির সমস্ত ক্রিয়াশীলতা এই স্পষ্ট দিবালোকেও উঘাটিত করতে পারেনি সেই রুদ্ধদ্বারের রহস্যকে। আমাদের সকল চিৎকার ও তর্জন-গর্জন সত্ত্বেও প্রকৃতির যথার্থ স্বরূপ ও শক্তি এইভাবে অবগুণ্ঠিত ও রহস্যাবৃত হয়ে থাকে আমাদের কাছে। প্রকৃতি তার অন্তর্নিহিত কোনও রহস্য যদি স্বেচ্ছায় নিজে থেকে উঘাটিত না করে তাহলে কোনও জটিল যন্ত্রশক্তিই তা করতে পারে না। হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে বা স্কু ঢুকিয়ে সে রহস্য উঘাটিত করা কোনওক্রমেই সম্ভব নয়। হে প্রাচীন যন্ত্রসমূহ, এক আমার পিতা তোমাদের ব্যবহার করতেন। তারপর হতে তোমরা অব্যবহৃতই রয়ে গেছ, কারণ আমি তোমাদের ব্যবহার জানি না। আজ এই অস্পষ্ট দীপালোকে আমার দেবরাজের উপর অবস্থিত তোমাদের অবয়বগুলোকে বড় বিবর্ণ মনে হচ্ছে আমার। আমি এখন স্বীকার করছি, এই সব যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করতে গিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলার থেকে আমি যদি আলস্য সহকারে জীবনযাপন করতাম তাহলে অনেক ভালো হতো। পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত কোনও বিদ্যা না শিখলে তা আয়ত্ত করতে পারা যায় না। আর কোনও যন্ত্রের প্রয়োগ না হলে তা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। অবশ্য সাময়িক প্রয়োজনই মানুষকে কোনও যন্ত্র প্রয়োগে বাধ্য করে। মানুষের প্রয়োজন মেটাবার ক্ষমতার উপরেই নির্ভর করে কোনও যন্ত্রের যোগ্যতা বা জনপ্রিয়তা।
কিন্তু সহসা আমার দৃষ্টি ওদিকে নিবন্ধ হলো কেন? ঐ ফ্লাস্ক বা জলপাত্রটি চুম্বকের মতো আকর্ষণ করছে কেন? চন্দ্রলোকদীপ্ত নৈশ বনভূমির মতো আমার অন্ধকার গৃহাভ্যন্তর সহসা আলোকিত হয়ে উঠল কেন?
হে বিরল বিস্ময়কর জলপাত্র, তোমাকে স্বাগত জানাই। তোমাকে পরীক্ষা করার অভিপ্রায়ে শ্রদ্ধা সহকারে গ্রহণ করলাম তোমাকে। তোমার মধ্যে আমি পেয়েছি মানুষের বুদ্ধি ও কলাকৌশলের মিলিত পরিচয়। তুমি হচ্ছ মানুষের সুখনিদ্রার সুমধুর রসনির্যাস। তার ভয়ঙ্করসুন্দর শক্তির সার তুমি। তোমার প্রভুর কাছে অকপটে তোমার প্রকৃত গুণের পরিচয় দাও। তোমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে আমার সমস্ত যন্ত্রণার উপশম ঘটছে। তোমাকে হস্তে ধারণ করার সঙ্গে সঙ্গে আমার সমস্ত অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বের ঘটছে নিঃশেষিত অবসান। আমার অন্তরের বিক্ষোভের জোয়ারে ভাটা পড়ছে। এক বিশাল মহাসমুদ্রের উপর পাখা মেলে যতই উড়ে চলেছে আমার স্বপ্ন ততই মনে হচ্ছে অসংখ্য আলোর ঢেউ উচ্ছলিত হয়ে উঠছে আমার পদতলে। ততই মনে হচ্ছে সেই সব আলোর ঢেউগুলো যেন অঙ্গুলি নির্দেশ করে দূরস্থিত এক নতুন তটভূমির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে আমার।
আজ উজ্জল বাতাসে ভর দিয়ে এক আগ্নেয় রথ আমার কাছে এসে পড়েছে। আমি সেই রথে চেপে সুদূর আকাশমণ্ডলের কত অজানা স্তর ভেদ করে এক নূতন কর্মলোকে গিয়ে উপনীত হবার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠছি। দেবতাসুলভ এক উচ্চাভিলাষের দ্বারা যখন আমার প্রাণময় স্পন্দিত, উর্ধ্বায়িত এক মহান অস্তিত্বে আমি যখন উন্নীত হতে চলেছি তখন আমি সামান্য এক কীটের মতো কোনও পথচারীর দ্বারা পদদলিত হতে পারি না। উজ্জ্বলতর ও সুদূরতর কোনও আলোর জগতে যাবার জন্য আমি পৃথিবীর সূর্যের প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করছি। এ বিষয়ে আমি কৃতসংকল্প। আজ একথা বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করার সময় এসেছে যে আমি মানুষ হয়েও নিজেকে উন্নীত করে মানব জগতের বহু আকাঙ্ক্ষিত স্বর্গদ্বার উঘাটন করতে পারি। আমি দেখিয়ে দিতে পারি মানুষও তার যোগ্যতার দ্বারা দেবতার স্তরে উন্নীত হয়ে দেবতাদের সমমর্যাদা লাভ করতে পারে। মানবপোক ও দেবলোকের মধ্যে অন্ধকার যে অন্তহীন শূন্যতা চিরবিদ্যমান, যার চারদিকে প্রজ্বলিত নরকাগ্নির লেলিহান শিখা ঊর্ধ্বায়িত হয়ে ওঠে প্রতিনিয়ত, সে শূন্যতার ব্যবধান অতিক্রম করার জন্য মানুষের কল্পনা এক নিষ্ফল বেদনার সংগ্রাম করে আসছে চিরকাল। আমি কিন্তু ভীত হয়ে সেখান থেকে ফিরে আসব না। যদিও জানি এর পরিণামে এক নঞর্থক শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই নেই তথাপি আমি সানন্দে এ সিদ্ধান্ত এ সংকল্প গ্রহণ করেছি।
