ওয়াগনার : হা ভগবান! জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু শিল্প অক্ষয়, চিরস্থায়ী। সমালোচক হিসাবে আমার পবিত্র কর্তব্যের খাতিরে আমি প্রায়ই দেখতে পাই আমাদের মাথার চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তি আর বুকের অনুভূতির মাঝে কোথায় যেন বড় রকমের একটা গলদ আছে। সৃষ্টির মূল উৎস সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান লাভ করা সত্যিই কত কঠিন। উৎসের পথে যেতে যেতে অর্ধেক রাস্তাতেই অসহায় মানুষকে তার মরদেহ ত্যাগ করতে হয়।
ফাউস্ট : তৃষ্ণার্ত শুষ্কতাই কি তোমার কাছে পবিত্র ঝর্নাধারা বলে মনে হয় যে ধারা থেকে মাত্র এক অঞ্জলি জল পান করলেই তোমার সকল তৃষ্ণার শান্তি হবে? জেনে রাখবে, তোমার আপন আত্মা থেকে স্বতোৎসারিত কোনও রসধারা ছাড়া। বাইরের কোনও জলধারাই তা যতই স্নিগ্ধ বা শীতল হোক না কেন, তোমার তৃষ্ণাকে। যথাযথভাবে পরিতৃপ্ত করতে পারবে না।
ওয়াগনার : ক্ষমা করো আমায়, অতীতের কথা ভেবেও অনেক সময় আনন্দ পাই। যুগের আত্মার মধ্যেও অনেক আনন্দ নিহিত আছে। যখন আমরা দেখি আমাদের আগের যুগ দূর অতীতে অনেক বিজ্ঞ মুনিঋষিরা কত ভালো কথা ভেবে গেছেন, কত বড় কাজ করে গেছেন এবং আমরা তাদের চিন্তাধারার উত্তরসাধক, তখন মনে মনে অনেক আনন্দ পাই।
ফাউস্ট : তাহলে তো তুমি দেখছি নক্ষত্রের জগতে বিচরণ করছ। শোনো বন্ধু, যে যুগ অতীত হয়ে গেছে তা মুখবন্ধ বই-এর মতোই অর্থহীন। তুমি যাকে যুগের আত্মা বলছ তা হলো তোমাদের সকলের সম্মিলিত আত্মা যার মধ্যে যুগগুলো প্রতিফলিত। হয়। সুতরাং যারা মনে করে যুগ গতিশীল এবং ক্রমবিলীয়মান, তারা ভুল করে। আসলে বিভিন্ন যুগে তথাকথিত মহাপুরুষেরা যে সব বড় বড় কথা বলে মানুষের মনকে নাড়া দেবার চেষ্টা করেন তা পুতুলের মুখেই শোভা পায়।
ওয়াগনার : কিন্তু মানুষের অন্তরে আবেগ অনুভূতি আছে, তার মস্তিষ্কে বুদ্ধি আছে। এবং এগুলো খারাপ জিনিস নয়। কিন্তু এসব বিষয়ে অনেকে জানতে চায় না।
ফাউস্ট : হ্যাঁ, মানুষ অন্তর দিয়ে অন্তরকে জানতে চায় না, চায় শুধু গোপনতা। কেউ তার সন্তানের আসল গুণের কথা, তার প্রকৃত স্বরূপকে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে চায় কি? একমাত্র যারা শুথু নির্বোধের মতো সরল ও অকপট এবং যে কোনও রকমের গোপনতাকে ঘৃণার চোখে দেখে তারাই আপন সন্তানের দোষের কথা সর্বসমক্ষে প্রকাশ করতে দ্বিধা করে না। তারাই বারবার লোকের কাছে ধিকৃত হয়েছে, জ্বালাময়ী অপমানের শিকার হয়ে এসেছে চিরকাল। আমার কথা শোনো বন্ধু, এখন আর না, এখন মধ্যরাত্রি। আমাদের আলোচনা এখানেই সমাপ্ত হওয়া উচিত।
ওয়াগনার : তোমার কথা শুনে আমি খুশি হতাম যদি আমাদের এই মনোজ্ঞ আলোচনাকে দীর্ঘায়িত করতে পারতাম। আগামীকাল ঈস্টারের ছুটি আছে। তোমার আপত্তি না থাকলে এ বিষয় ও আরও কিছু বিষয় আলোচনা করা যাবে। বিশেষ আগ্রহ ও উদ্যম সহকারে আমি বিদ্যা অর্জন করতে চাই। যদিও আমি অনেক কিছুই জানি তথাপি আমি আরও অনেক কিছু জানতে চাই এবং জ্ঞানার্জন সম্পর্কে আমার উচ্চাভিলাষের অন্ত নেই। (প্রস্থান)।
ফাউস্ট : (এক) আমাদের মস্তিষ্ক কখনও কোনও অবস্থাতেই আশা ছাড়ে না। তার সে মস্তিষ্কের প্রবলতার স্রোত চিরকাল অগভীর তুচ্ছ বস্তুর প্রতিই প্রবাহিত হয়ে থাকে। সেই অগভীর তুচ্ছ বস্তুর গভীরে কোনও সোনার খনি আবিষ্কারের এক দুর্মর আশায় আর অপরিসীম আগ্রহের সঙ্গে আমাদের মন যেন মাটি খুঁড়ে চলে। এমন মানুষ পৃথিবীতে কি কেউ নেই যার দৃপ্ত কণ্ঠস্বর আমার সম্মুখস্থিত এই অতিপ্রাকৃত অপদেবতার অবাঞ্ছিত উপস্থিতির অশুভ প্রতিক্রিয়ার মাঝে বিঘ্ন ঘটাতে পারে? যদি এমন কেউ থাকে তাহলে সে সর্বাপেক্ষা দরিদ্র ও নির্বোধ ব্যক্তি হলেও আমি তাকে অজস্র ধন্যবাদে ভূষিত করব। কারণ তাহলে এক নিদারুণ অস্বস্তিকর অবস্থা হতে উদ্ধার পাব আমি। যে অপদেবতা তার দৈত্যসূলভ বিরাট ছায়াবয়ব নিয়ে আমার সমস্ত ইন্দ্রিয়চেতনাকে অভিভূত করে দিয়েছে, আমার আত্মার সমস্ত ক্রিয়াশীলতাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে সেই অপদেবতার হাত থেকে আমাকে মুক্ত করবে সেই মানবিক কণ্ঠস্বর।
যে আমি ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি, যে ভাবে চিরন্তন সত্যের সন্ধান যে পেয়ে গেছে, যে ভাবে স্বর্গীয় জ্ঞানের প্রদীপ্ত স্বচ্ছতা আর স্বর্গীয় আলোর সুবিরল সুষমায় অন্তরাত্মা তার স্বতোদভাসিত, আপন মদমত্ততার আতিশয্যে পৃথিবীর অন্য সব মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করত, সে ভাবত চেরাবের থেকে যে বেশি শক্তিধর। যে সামান্য মানুষ হয়েও তার মানবিক সীমাকে ছাড়িয়ে দিয়ে এই মর্ত্যভূমির মাঝে থেকেই ঐশ্বরিক জীবনযাপন করতে চেয়েছিল, সেই আমির আজ অবস্থা দেখো। শুধূ এক অপদেবতার বগম্ভীর একটি শব্দ আমার স্বাভাবিক অবস্থা থেকে কেন্দ্রচ্যুত করছে।
আজ আমি নিজেকে তুলনা করতে সাহস পাচ্ছি না। যদিও তোমাকে আকর্ষণ করা ও কাছে টানার মতো প্রভূত ক্ষমতা আমার হাতে ছিল তথাপি তোমাকে আমার কাছে রেখে দেওয়ার ক্ষমতা আমার হাতে শেষ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। যখন সেই আবেগঘন মুহূর্ত আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল আবার, নিজেকে একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মহান বলে মনে হয়েছিল আমার। কিন্তু তুমি আমাকে নির্মমভাবে প্রত্যাখান করে সাধারণ মানবজীবনের অনিশ্চিত ভাগ্যের কঠিন ভূমির উপর নিক্ষেপ করেছিলে। কী আমি বর্জন করব? কার নির্দেশ আমি মেনে চলব? আমি কি সেই দুঃখ আর দ্বন্দ্বের জীবন মেনে নেব? শুধু আমাদের মতো সব দুঃখ নয়, আমাদের যে কোনও কর্মই আমাদের জীবনের অগ্রগতিকে ব্যাহত করে তোলে। যখনই আমাদের মন কোনও মহৎ ও সুন্দর বস্তুর প্রতি প্রধাবিত হয় তখনি কোথা হতে সম্পূর্ণ বিরূপ বিপ্রতীপ এক ভাবসত্তা সে মনের অখণ্ডতাকে দীর্ঘ-বিদীর্ণ করে তার গতিবেগকে প্রতিহত করে দেয়। যখনই এ জগতে আমরা ভালো কিছু লাভ করতে যাই, তখন আরও ভালো কিছুর প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে এইভাবে জীবনের সব শুভ প্রয়াসকে ব্যর্থ করে দেয়। যে সূক্ষ্ম সুকুমার আবেগানুভূতি আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করে ক্রমোন্নতির পথে নিয়ে যায় সেই সব আবেগানুভূতি প্রায়ই পার্থিব উন্মত্ততার অসংখ্য কলরবের স্থূপান্তরালে এক হিমশীতল স্তব্ধতায় মূক হয়ে থাকে। আমাদের আশান্বিত কল্পনা যদি এক স্পর্ধিত কামনার অনন্ত প্রসারিত উচ্ছ্বাসে উধ্বে উত্তীর্ণ হতে চায় তাহলে সে বাস্তব অবস্থার সীমায়িত বন্ধন ও বেষ্টনীকে অতিক্রম করতে পারে না কখনও। কালের দুর্বার স্রোত অনেক মানুষের ভাগ্যকেই ব্যর্থতায় চরায় ফেলে দিয়ে যায় ও আটকে দিয়ে যায়। আসলে সকল মানুষের অন্তরের তলদেশে বিরাজ করছে অন্তহীন অবিচ্ছিন্ন দুঃখ। না পাওয়ার এক গোপন বেদনা নীরবে কাজ করে চলেছে সব অন্তরের মধ্যে। আশাহত কল্পনার পৌনঃপুনিক আঘাতে অস্থির ও চঞ্চল হয়ে ওঠে আমাদের জীবন। সমস্ত আনন্দ, আরাম ও বিরাম হতে বিচ্যুত হয়ে একই জীবন বিচিত্র রূপ পরিবর্তনের মাধ্যমে বিভিন্ন জীব বা জড় অবস্থা প্রাপ্ত হয়। একই জীবন কখনও পত্নী, কখনও পুত্র, কখনও পথ, কখনও ঘর, কখনও তরল, কখনও কঠিন, কখনও জল, কখনও অগ্নি প্রভৃতি বিচিত্র রূপ পরিগ্রহ করে থাকে। যে আঘাত আমরা কখনও অনুভব করি না সে আঘাতের কল্পনা করে ভীত হয়ে পড়ি অনেক সময়। যে বস্তু আমরা হারাই না তার জন্যও শোক প্রকাশ করে থাকি অনেক সময়। আমি দেবতাদের মতো নই–এই সত্যটি নিবিড়ভাবে অনুভব করি আমি। আমার শুধু এই কথাটি মনে হয় যে আমি পথের ধূলির মধ্যে বসবাসকারী এক ক্ষুদ্র জীব। পথের ধূলির মধ্য হতেই আমার খাদ্য আহরণ করে জীবন। ধারণ করি আমি এবং একদিন কোনও পথচারীর পদচাপেই নিষ্পেষিত হবে আমার দেহ। ধূলিরাশির মধ্যেই অকালে সমাধিলাভ করব আমি।
