(বইটি ভালো করে শক্ত করে ধরে অপদেবতার নাম করতেই এক লালাভ অগ্নিশিখা সহসা প্রজ্বলিত হয়ে উঠল আর সঙ্গে সঙ্গে সেই শিখার মাঝে আবির্ভূত হলো পৃথিবীর অধিষ্ঠাতা অপদেবতা)
অপদেবতা : কে ডাকে আমায়?
ফাউস্ট : (কম্পিত ও বিচলিত অবস্থায়) এই দৃশ্য সত্যিই ভয়ঙ্কর।
অপদেবতা : আমাকে তুমি দীর্ঘ দিন ধরে আকৃষ্ট করে এসেছ। আমার রাজ্য থেকে তোমার খাদ্য সংগ্রহ করেছ।
ফাউস্ট : বড় দুঃখের কথা। আমি তোমাকে সহ্য করতে পারছি না।
অপদেবতা : কিন্তু আমাকে দর্শন করার জন্য তুমি ব্যাপক হয়েছ, আমার কণ্ঠস্বর শুনতে ও আমার মুখমণ্ডল দেখতে চেয়েছ। তোমার ইচ্ছার নিবিড়তা বিচলিত করে তোলে আমায়। আমি তাই এসেছি। এতে এত বিচলিত হবার কি আছে তোমার? তুমি না অতিমানব, ভয়ে কাঁপছ? তোমার আত্মার সেই গর্বোদ্ধত ভাব কোথায় গেল? কোথায় গেল সেই বুক, যে বুক নিজেই সমগ্র পৃথিবীকে ধারণ ও বহন করার বড়াই করত। আমাদের মতো সমস্ত দেবতা-অপদেবতা সমন্বিত এমন এক বিরাট পৃথিবী গঠন করে তাকে ইচ্ছামতো রূপ দিতে চেয়েছিলে যে পৃথিবীতে চির আনন্দে বিরাজ করবে অন্তহীন প্রসারতায়। কোথায় তুমি ফাউস্ট যার কণ্ঠস্বর আমার মর্মকে ভেদ করে, যে তুমি তোমার সমস্ত শক্তির নিবিড়তা দিয়ে চাপ দিতে থাকো আমার উপর। আমাদের প্রভু হতে চাও। হ্যাঁ, তুমিই সেই ফাউস্ট যে আমার উপস্থিতিতে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছ আর তার সমগ্র অস্তিত্ব আমূল কেঁটে উঠছে সেই ভয়ে। তোমার শঙ্কাপীড়িত দেহই এ কথার প্রমাণ।
ফাউস্ট : তোমাকে মানে এই ক্ষীণ অগ্নিশিখাটুকুকে ভয় করব আমি? হ্যাঁ, আমি ফাউস্ট, আমিই তোমার পরিচালক,তোমার প্রভু।
অপদেবতা : উত্থানপতনসঙ্কুল বিচিত্র জীবনতরঙ্গ ও বিভিন্ন কর্মের ঝঞ্ঝাসমন্বিত জন্ম-মৃত্যুর চক্রাবর্তনে চির আবর্তিত এক বিক্ষুব্ধ বিশাল সমুদ্র চিরকাল প্রবাহিত হয়ে চলেছে। কালের চরকায় আমি নিজের হাতে সুতো কেটে যে সব জীবনের পোশাক তৈরি করি, দেবতা ও অপদেবতারা তাই পরিধান করে থাকে।
ফাউস্ট : যে তুমি সমগ্র পৃথিবীর সঙ্গে সঙ্গে তার চারদিক থেকে আবর্তিত হচ্ছ, সেই তোমাকে কত কাছে আজ অনুভব করছি আমি।
অপদেবতা : তুমি আমাকে বুঝতে পারনি বা ধরতে পারনি। তুমি তোমার বোধায়ত এক দেবতার মতো হবার চেষ্টা করছ। (অন্তর্হিত হলো)।
ফাউস্ট : (অভিভূত অবস্থায়) তোমাকে পাইনি আমি! তাহলে কে এসেছিল আমার কাছে? যে আমি ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি সেই আমার মতো হতে পারলাম না, তোমাকে ধরতে পারলাম না। (দরজায় করাঘাত) মৃত্যু ভালো ছিল এর থেকে। আমি জানি–যে এসেছে সে হচ্ছে আমার প্রিয় ফেমুলাস। হায়, সৌভাগ্য লাভ করেও কোনও ফল হলো
আমি যখন আমার মধুর স্বর্গরাজ্যে পরিপূর্ণ ভাবে নিমগ্ন ছিলাম তখন এই নির্মম লোকটা আমায় বাধা দিল।
(রাত্রিকালীন টুপি ও ড্রেসিং গাউন পরিহিত অবস্থায় ওয়াগনারের প্রবেশ। ফাউস্ট অধৈর্য সহকারে মুখ ঘুরিয়ে নিল)
ওয়াগনার : ক্ষমা করো। আমি তোমার বিরক্তিসূচক চিৎকার শুনে এলাম। মনে হয় গ্রীক ট্রাজেডি পড়ছিলে। যেহেতু এই সব নাটক পাঠ করে মানুষ অনেক কিছু শিখতে পারে সেই হেতু এ নাটক পড়তে জানা চাই। তার জন্য প্রস্তুতি দরকার। আমি অনেকবার একটা কথা শুনেছি যে কোনও ধর্মপ্রচারক হাস্যরসের অভিনেতার কাছ থেকে অনেক কিছু শিক্ষালাভ করতে পারে।
ফাউস্ট : হ্যাঁ, এখন যেমন হয়েছে অর্থাৎ ধর্মযাজক নিজেই যখন হাস্যরসের অভিনেতা।
ওয়াগনার : তোমার মতো যে লোক পিঞ্জরাবদ্ধ জীবনের মতো শুধু ঘরের মধ্যে বসে বসে বই পড়ে দিনরাত, যে একমাত্র ছুটির দিন বা উৎসবের দিন চশমার ভিতর দিয়ে ছাড়া বইয়ের জগৎটাকে একবারও দেখে না, সে লোক কোনও মানুষকেই কিছু বোঝাতে পারবে না।
ফাউস্ট : মানুষকে বোঝানো অত সহজ কাজ নয়। মানুষকে তুমি বোঝাতে কিছুতেই পারবে না যদি না এক নিবিড় অনুভূতি তোমার অন্তরাত্মার গভীরতম প্রদেশ থেকে জেগে উঠে প্রশান্ত অথচ আদিম অদৃশ্য শক্তিতে তোমার অন্তর হতে শ্রোতাদের অন্তরে সঞ্চারিত হয়। তা না হলে তুমি শুধু অপরকে বোঝাবার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাবে চিরকাল, অপরের খাদ্যদ্রব্যের অবশিষ্ট টুকরো বৃথাই রান্না করে যাবে আর ছাই-এর গাদা হতে ফুঁ দিয়ে অনেক কষ্টে একটা ক্ষীণ শিখা জাগিয়ে তুলে শুধু কিছু শিশু আর বাঁদরকে মুগ্ধ করতে পারবে। কিন্তু আগে তোমার অন্তর যদি অনুভূতির রসে সিক্ত ও সোচ্চার না হয়ে ওঠে তাহলে অন্তর দিয়ে অপরের অন্তরকে স্পর্শ করতে বা অপ্রপ্রাণিত করতে পারবে না।
ওয়াগনার : তবু বলার ভঙ্গিমার জোরে বাগীরা অনেক ক্ষেত্রেই সাফল্য লাভ করে। আমি অবশ্য এখনও সে সাফল্য লাভ করতে পারিনি।
ফাউস্ট : সে সাফল্য সম্ভাবে লাভ করার চেষ্টা করো। নির্বোধের মতো কাজ করো না। যথাসম্ভব কম কলাকৌশল অবলম্বন করে স্পষ্ট বুদ্ধি ও অনুভূতির দ্বারা শ্রোতাদের ভাবপ্রকাশের ক্ষমতাকে জাগিয়ে তুলবে। যদি সত্যি সত্যিই তাদের কিছু বলার জন্য গভীরভাবে আগ্রহ বোধ করো এবং শ্রোতাদের মধ্যে আগ্রহ জাগাতে পার তাহলে তার কি চাই? কিন্তু তোমার বক্তব্য বিষয় যদি জাঁকজমকপূর্ণ ও অলঙ্কারবহুল হয় তাহলে মোচড়ানো কাগজের মতো তোমার সে বক্তব্য বিকৃত হয়ে যাবে। গাছের পাতাদের হাড় কাঁপিয়ে তোলা হেমন্তের কুয়াশা ভেজা ঠাণ্ডা কনকনে বাতাসের মতোই সে বক্তব্য বিষয় অবাঞ্ছিত ও অস্বস্তিকর মনে হয় শ্রোতাদের কাছে।
