আজ আমি নিজেকে নিজে প্রশ্ন করি, কেন আমার হৃদয়ে আজ এত দ্বিধা ও কুণ্ঠা, কেন আজ কতকগুলো অপার্থিব অতিসূক্ষ্ম প্রয়োজনের সুতীক্ষ্ণ আঘাতে ক্ষণে ক্ষণে। বিকম্পিত হচ্ছে সে হৃদয়? অনির্বচনীয় সে আঘাত আমার স্বচ্ছন্দপ্রবহমান প্রাণপ্রবাহকে স্তব্ধ ও অবরুদ্ধ করে দিতে চাইছে কেন? হায়, জীবন্ত প্রকৃতির যে রাজ্যে ঈশ্বর তাঁর সৃষ্ট মানবজাতিকে সংস্থাপিত করেছেন সে রাজ্য বড় ভীষণ। ধূমায়িত বিষবাষ্পে ভরা বিদেহী মানুষ ও পশুর করোটি কঙ্কালের সে এক অদ্ভুত জগৎ।
হে আত্মা, এই দুঃসহ জগৎ থেকে পালিয়ে চলো। মুক্ত আকাশের এক আয়ত উদার বিশালতায় আপন মুক্তিকে খুঁজে নাও এবং এ বিষয়ে নীডামাস রচিত রহস্যের বইটির সুনিবিড় সাহচর্য ও সহায়তাই যথেষ্ট মনে করি। আমি যখন গ্রহনক্ষত্রদের গতিবিধি জানি এবং আমার ভবিষ্যৎ জীবনধারা সম্পর্কে নিয়মিত কাছ থেকে নির্দেশের সন্ধান করি তখন আমি যদি মৃত আত্মাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে আমার মনের কথা তাদের বোঝাতে পারি তাহলে এক নিগূঢ় অতিপ্রাকৃত শক্তির অত্যাশ্চর্য আলোকোজ্জাসের চকিত উদ্ভাসে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে আমার আত্মা। কিন্তু এখানে বসে বসে শুধু ব্যর্থ চিন্তায় সময় নষ্ট করার কোনও অর্থ হয় না। সেই সব আত্মাদের পবিত্র প্রতীকগুলোর সঙ্গে শুধু নিষ্প্রাণ অনুমানের মাধ্যমে পরিচিত হওয়াতেও কোনও লাভ নেই। তার চেয়ে হে আত্মারা, তোমরা আমার কাছে এস, আমার অনেক কাছে এস। যদি আমার কথা শুনতে পেয়ে থাক তাহলে তার উত্তর দাও।
(ফাউস্ট সেই রহস্যের বই খুলে আত্মাদের লক্ষণ দেখতে পেল। হায় আমার স্বতঃ প্রবাহিত ইন্দ্রিয়চেতনাগুলোকে অতিক্রম করে সহসা এক অদম্য আবেগ কেন উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে আমার অন্তরে? সহসা এক যৌবনসুলভ শক্তি অনুভব করছি আমি দেহে। আমার এ দেহের প্রতিটি শিরায় ও স্নায়ুতে অনুভব করছি এক পবিত্র পরমানন্দের বৈদ্যুতিক প্রবাহ। তবে কি কোনও দেবতা আমার বিক্ষুব্ধ বিভ্রান্ত চিত্তের গভীরে অন্তহীন এক প্রশান্ত আনন্দকে সঞ্চারিত করে বিশ্বপ্রকৃতির নিগূঢ় শক্তির রহস্যকে উদঘাটিত করছেন আমার জীবনে? এই কি তার অভ্রান্ত অভিজ্ঞান? তবে আমিই কি দেবতা হয়ে উঠেছি? আমার দৃষ্টি কত স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে সহসা আমার দেহমনের এক অভূতপূর্ব অকৃত্রিম পবিত্রতায় আমি এক সৃষ্টিশীল শক্তির বিরাট রহস্যকে ক্রমোদঘাটিত দেখছি আমার অন্তরাত্মার মধ্যে। ধর্মসাধকদের বাণীর মর্মার্থ আজ আমি বুঝতে পারছি। তাঁরা বলতেন, রুদ্ধদ্বার ইন্দ্রিয়ের মধ্যে মৃত অন্তরের অধস্তন স্তরে তোমার আত্মজগৎকে সীমায়িত ও অবরুদ্ধ করে রেখো না। হে আমার প্রিয় শিষ্য, ওঠ, নূতন আশায় বুক বাঁধ। নিশাশেষে নবারুণ উষালোকে অভিস্নাত হয়ে নবজীবন লাভের জন্য ছুটে চলো অক্লান্ত গতিতে।
(অলৌকিক অতিপ্রাকৃত লক্ষণ সম্পর্কে চিন্তা করতে লাগল ফাউস্ট) কেমন সুন্দরভাবে প্রতিটি বস্তুই তার প্রতিটি অংশে তার অন্তর্নিহিত শক্তির অংশবিশেষ দান। করে আর সেই অংশগুলো কেমন চমৎকারভাবে পরস্পরে মিলেমিশে বাস করে ও কাজ করে। দেখে মনে হয় যেন অনন্ত স্বর্গীয় শক্তিপূর্ণ এক স্বর্গপাত্র থেকে মর্ত্য ও মর্ত্য থেকে স্বর্গে ক্রমাগত উঠানামা করতে করতে বিশ্বের সকল বস্তুকেই এক স্বকীয় সামর্থ্য, মূল্য ও সঙ্গতি দান করছে। এ দৃশ্য বড়ই মহান। তবু শুধু দৃশ্য। হে অসীম বিশ্বপ্রকৃতি, আমাকে তোমার আপন করে নাও, আমাকে একান্ত করে নাও। বিশ্বের সকল বস্তুসত্তার উজ্জ্বল উৎসস্বরূপ, কোথায় তুমি?
যে উৎস হতে স্বর্গ-মর্ত্যের সকল কামনা উৎসারিত হয়, যে উৎসস্থল আমাদের সকল অতৃপ্ত উচ্চাশার প্রাণকেন্দ্র সেই উৎস হতে আজ অমিত অমৃতধারা ঝড়ে পড়ুক আমার চিত্তে। আমার সকল ক্ষুধা তৃপ্ত হোক চিরতরে। নিবৃত্ত হোক আমার সকল প্রবৃত্তির সকাম উচ্ছ্বাস। তা না হলে বুঝব ব্যর্থ হলো আমার সকল দুঃখভোগ।
(অধৈর্য সহকারে বই-এর পাতা ওলটাতে ওলটাতে পৃথিবীর অধিষ্ঠাতা অপদেবতার চিহ্ন দেখতে পেল)
এই চিহ্ন বা লক্ষণটি আমার উপর পরোক্ষভাবে কাজ করে। হে ধারিত্রীরূপী অপদেবতা, তুমি আমার আরও কাছে এস। আমার অন্তবৃত্তিগুলো আগের থেকে আরও সমুন্নত হয়ে উঠেছে। আরও স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে আমার দৃষ্টিশক্তি। সদ্যপ্রস্তুত মদ্যপানে মত্ত ব্যক্তির মতো আকস্মিক এক শক্তিতে উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছি আমি। এক নূতন শক্তি অন্তরে সঞ্চারিত হয়ে সমগ্র জগতের মুখোমুখি হবার জন্য অনুপ্রাণিত করছে আমায়। পৃথিবীর সুখদুঃখ আকর্ষণ করছে আমায় দুর্বার বেগে। সামুদ্রিক ঝঞ্ঝার প্রবল আঘাত যতই ভীতি প্রদর্শন করুক না আমায়, আমার জীবনতরীকে কোনও দিন নিমজ্জিত করতে পারবে না তা আমি বেশ বুঝতে পারছি, আমার চারদিকে পুঞ্জীভূত হচ্ছে কৃষ্ণকুটিল মেঘমালা। ঢেকে ফেলেছে পূর্ণচন্দ্রের সব আলোকে। সব আলো নির্বাপিত হয়ে যাচ্ছে। আকাশ থেকে এক ভীতিপ্রদ কুয়াশা নেমে আসছে। কার ক্রোধারুণ দৃষ্টির সুতীক্ষ্ণ তীর নেমে আসছে যেন আমার উপর। এক অজানিত শঙ্কার শিহরণ আচ্ছন্ন করে ফেলছে আমার চেতনাকে। হে অপদেবতা, আমি তোমার উপস্থিতি অনুভব করছি আমার মর্মের মাঝখানে। আমি তোমাকে আবাহন করে এনেছি। এবার স্বচ্ছন্দে আত্মপ্রকাশ করো। হায়, আমার অন্তরে এক মৃদু অথচ মর্মভেদী আঘাতের মাধ্যমে আমার ইন্দ্রিয়চেতনাকে আলোড়িত করে তুলছে কে যেন। আমি বুঝতে পারছি তুমি আমার অন্তরে এসে গেছ, নিঃশেষে আত্মসাৎ করে নিয়েছ আমার সমগ্র সত্তাকে। বেশ করেছ, আমি তাই চাই। তাতে এ জীবন গেলেও ক্ষতি নেই।
