মেফিস্টোফেলিস : রাজি। কিন্তু এটা আমার পক্ষে স্বল্পকালের কাজ। এজন্য আমি কোনও ভয় করি না। যদি আমি আমার আশানুরূপ কাজ করতে পারি, যদি আমি সফল হই তাহলে যেন বিজয়গৌরব আমার বুকটাকে স্ফীত করে তুলল। আমার এক নিকট আত্মীয় যেমন একবার হাসিমুখে আমার পায়ের ধুলো চেটেছেন সেও তাই করবে।
ঈশ্বর : এ ব্যাপারে যা ভালো বোঝ করো। এ বিষয়ে তুমি স্বাধীন। তোমার মতো আর কোনও আত্মা আমার মধ্যে এতখানি ঘৃণা সঞ্চার করেনি। তোমার মতো আরও যে সব দুঃসাহসী নাস্তিক শয়তান আছে তারা কেউ আমাকে এতখানি বিরক্ত করেনি কখনও। নিয়ত ক্রিয়াশীল মানুষের স্বরূপ এমনই যে তার চিত্ত কামনায় মাঝে মাঝে উত্তাল ও অশান্ত হয়ে উঠলেও আসলে সে চিত্ত শান্তি চায়। নিঃশর্ত শান্তি। সে অশান্ত চিত্ত শীঘ্র শান্ত হয়ে ওঠে; যে মানুষ মাঝে মাঝে কামনা-বাসনায় উত্তেজিত হয়ে। শয়তানের মতো কাজ করে অনেক কিছু অশুভ বস্তু ও ঘটনা সৃষ্টি করে তাকেও আমি শান্তি দিই। কিন্তু যারা ঈশ্বরের প্রকৃত সন্তান, কর্তব্যপরায়ণ ও প্রেমময়, সেই তোমরা সকলে একমাত্র যা কিছু অক্ষয় ঐশ্বর্য ও অনন্ত সৌন্দর্যে ভরা সেই সব বস্তুকেই উপভোগ করবে, কামনা করবে। এমন সৃষ্টিশীল শক্তির উপাসনা করবে যার দ্বারা চিরন্তন কিছু সৃষ্টি করে যেতে পারবে। চঞ্চল উচ্চাশার বিকম্পিত প্রেক্ষাপটে যা কিছু উজ্জ্বল মনে হয় সেই সব আপাত-উজ্জ্বল বস্তুর জায়গায় সুচিরকালীন অক্ষয় ভাবসত্যগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করো।
(স্বর্গদ্বার রুদ্ধ হয়ে গেল : পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল প্রধান প্রধান দেবদূতেরা।)
মেফিস্টোফেলিস (একাকী) : যে কথা শাশ্বত সনাতন তা আমার এক এক সময় বড় ভালো লাগে। তখন আমার ইচ্ছা জাগে আমি যেন খুব ভালো ও ড্র হয়ে উঠি। আমার মতো এক শয়তানের সঙ্গে মানুষের মতো কথা বলা মহান ঈশ্বরের পক্ষে কত বড় দয়া ও মহানুভবতার কাজ তা ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়।
ফাউস্ট (কাব্য-নাটক) ১
ট্রাজেডির প্রথম অংশ
প্রথম দৃশ্য
রাত্রিকাল
(একটি উন্নত ধরনের ফুলবাগানের মাঝে পথিক ধাঁচের এক অপ্রশস্ত কক্ষে দেবরাজের সামনে একটি চেয়ারে অশান্ত অবস্থায় উপবিষ্ট ফাউস্ট।)
ফাউস্ট : আমি দর্শনশাস্ত্র, আইনবিদ্যা ও চিকিৎসাবিদ্যা পড়েছি। হায়, এমনকি বহুকষ্ট স্বীকার করে প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত ধর্মতত্ত্বেও ব্যুৎপত্তি লাভ করেছি। কিন্তু আমার এত সব অধীত জ্ঞানবিদ্যা থাকা সত্ত্বেও আজ আমি আগেই মতোই মূর্খ রয়ে গেছি। কখনও শাসক ও কখনও ডাক্তাররূপে আমি দীর্ঘ দশ বছর ধরে তর্কবিতর্কের মাধ্যমে সোজা বা বাঁকা পথে ন্যায়সঙ্গত বা অন্যায়ভাবে বহু পণ্ডিতকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছি; কিন্তু পরিশেষে শুধু এই কথাই জেনেছি যে কিছুই ঠিকভাবে জানা যায় না। উপরন্তু জ্ঞান আমার ক্ষতিসাধনই করছে। আমার অধীত জ্ঞানবিদ্যার ফলে আমি শিক্ষক, ডাক্তার, শাসক, কেরাণি ও ধর্মপ্রচারক থেকে বেশি চতুর হয়ে উঠেছি। কোনও কুণ্ঠা বা সংশয় এখন আমায় আঘাত করতে পারে না। কোনও নরক বা শয়তানের কোনও ভয় আমাকে আর ভীত করে তুলতে পারে না। তার ফলে জীবনে কোনও আনন্দই উপভোগ করতে পারছি না আমি। জগতে আমি কোনও কিছুই জানার যোগ্য বলে ভাবতে পারছি না। কোনও মানুষকে জ্ঞানলাভে সাহায্য করা অথবা সৎপথে টেনে আনার ব্যাপারে শিক্ষকদের ভূমিকার কোনও সার্থকতা দেখতে পাচ্ছি না আমি। আমার অধিকারে কোনও জমি-জায়হা বা টাকাকড়ি নেই। কোনও সম্পদ, ঐশ্বর্য বা সম্মান কিছুই নেই আমার। এই হীন অভিশপ্ত জীবন কোনও কুকুরেও সহ্য করতে পারবে না। এই দুঃখে বর্তমানে আমি যাদু বা ইন্দ্রজালবিদ্যা শিক্ষা করে এই জীবন থেকে মুক্তি পেতে চাই, যাতে আমি আত্মতত্ত্ব ও অভূতপূর্ব এক আত্মশক্তি অধিগত করে প্রভূত বাকশক্তি অর্জন করতে পারি। যে বিষয়ে আমি কিছু জানি না সে বিষয়ে যতসব মিথ্যা অসার কথা বলে মানুষকে আর ভোলাতে চাই না আমি। বিশ্বের অন্তর্নিহিত যে নিগূঢ় নিবিড় শক্তি সব কিছুকে আবদ্ধ করে রেখেছে, যে শক্তি তার গতি-প্রকৃতিকে পরিচালিত করছে, সেই সৃষ্টিশীল অন্তঃশায়ী শক্তির রহস্যকে উদগাটন করতে চাই আমি। আর আমি যত সব শূন্য অসার কথার ফুল ঝুরি ছোটাব না মুখে।
আয়ত উজ্জ্বল হে পূর্ণচন্দ্র, সন্ধ্যা হতে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত কতদিন আমার এই জানালা থেকে দেখেছি তুমি ধীরে ধীরে দিগন্ত থেকে উঠে গেছ মধ্য গগনে। জানি না, তোমার রশ্মির মাধ্যমে আমার সর্বশেষ দুঃখের কথা জেনেছ কি না। হে আমার দুঃখের বন্ধু, বিষাদের সাথী, তোমার উজ্জ্বল চক্ষু কত রাতে বই-এর উপর ঝুঁকে পড়ে শাস্ত্রপাঠে নিবদ্ধ আমার নজ দেহটিকে নিরীক্ষণ করেছে। আমার এই বদ্ধ গ্রন্থজগতের বিষবাষ্প হতে নিজেকে মুক্ত করে তোমার আলোর দ্বারা পরিপাবিত কোনও পর্বতের আধিত্যকাপ্রদেশে যার চারদিকের পর্বতকন্দরে প্রেতাত্মারা ঘুরে বেড়ায়, সেইখানে আমি গিয়ে এখন দাঁড়াতে পারতাম। তোমার ঝাপসা-ধূসর ঝর্নাধারা প্রবাহিত প্রতিটি প্রান্তরে আমি যদি ভেসে বেড়াতে পারতাম, আমি যদি সে ধারায় অবগাহন করে অভিস্নাত হতে পারতাম তাহলে সত্যিই কত আনন্দ লাভ করতাম।
হায়, আমি এখনও সেই অন্ধকার কক্ষটিতে বিরাজ করছি। সেই নীরস নিরানন্দ অট্টালিকার একটি প্রায়ান্ধকার কক্ষ যার বহুবর্ণচিত্রিত কাঁচের রুদ্ধ গবাক্ষপথ দিয়ে প্রবেশ করতে গিয়ে দিবালোকও ম্লান হয়ে যায়, সে কক্ষের ভিতরে চারদিকে স্তূপকৃত বইগুলো উদ্ধত স্পর্ধায় কড়িকাঠটাকে স্পর্শ করে, যে কক্ষের মধ্যে সর্বত্র ছড়ানো আছে গ্লাস, বাক্স, নানা রকমের যন্ত্রপাতি আর কিছু পৈত্রিক পুরনো আমলের আসবাবপত্র। এই সব নিয়ে আমার জগৎ আর এই জগতে আমি বাস করি।
