মাইকেল : এই বিশ্বসৃষ্টির মাঝেই চলছে ধ্বংসের লীলা। কখনও সমুদ্রবক্ষ হতে স্থলভাগে, আবার কখনও বা স্থলভাগ হতে সমুদ্রবক্ষে প্রতিকূল বাতাসের ঘনীভূত রূপ প্রচণ্ড ঝঞ্জার উন্মত্ত আলোড়নে ফুলে ফুলে ওঠে। ক্ষান্তিহীন ধ্বংসের তাণ্ডব একের পর এক ফেটে পড়ে ভয়াবহ ক্রোধাবেগে। কোথাও বজ্রাগ্নিপ্রজ্বলিত বিরাট অগ্নিকাণ্ড বিধ্বস্ত করে দেয় অনেক কিছু। তথাপি হে ঈশ্বর, হে প্রভু, তোমার দূতেরা তোমার সৃষ্টিলীলার প্রশংসা করে চলেছে।
তিনজন একসঙ্গে : যদি দেবদূতেরা নিজেরা বিশ্বসৃষ্টির দুর্বোধ্য রহস্যজাল ভেদ করতে পারে না, তথাপি তারা হে ঈশ্বর, তোমারই সৃষ্ট সৌরলোক হতেই সঞ্চয় করে তাদের সমস্ত শক্তি। হে ঈশ্বর, তোমার এই বিশাল বিশ্বসৃষ্টি চির ঐশ্বর্যবর্তী যুবতী। সেই আদিকাল হতে তার অক্ষয় উজ্জ্বলতা ম্লান হয়ে পড়েনি আজও।
মেফিস্টোফেলিস : হে ঈশ্বর, যেহেতু আমার মতো এক অধমের উপর সদয় হয়ে আমরা এই পৃথিবীতে এখন কেমন আছি তা জানতে চেয়েছ সেই হেতু এখন আমার মুখটা দেখো। আমাকে ক্ষমা করো। আর আমি এই সব হীন মানুষদের নিয়ে পারছি
। ওরা আমায় ঘৃণা করে, অবজ্ঞার চোখে দেখে। তবু আমি ওদের মহান ভাব সমন্বিত বড় বড় কথা বলে ওদের বোঝাতে পারি না। আমার এই সব দুঃখের সকরুণ কথাগুলো নিশ্চয় তোমার মধ্যে হাসি জাগাবে। আনন্দ বা হাসিখুশির তো অভাব নেই তোমার জীবনে। তা তোমার বেশই জানা আছে। আমি কিন্তু আমাদের অবস্থার কথা জানাতে গিয়ে সৌরলোক বা বিশ্বপ্রকৃতির কথা কিছু বলব না। বলব শুধু মানুষের সেই সব দুঃখকষ্টের কথা যা আমি নিজের চোখে দেখেছি। এই মানবজগতের একটি নিজস্ব দেবতা আছে। সৃষ্টির আদিকাল থেকে সে দেবতা আপন মতে চলে আসছে একই পথে। যদি তুমি তোমার স্বর্গীয় আলোর একটি উজ্জ্বল রশ্মি সে দেবতাকে না দিতে তাহলে জীবনটা তার কাছে আর একটু বেশি আনন্দদায়ক ও বেশি উপভোগ্য হতো। মানুষ বলে সে দেবতা হলো যুক্তি। বলে এই যুক্তিবোধ হতে শক্তি সঞ্চয় করে বড় হয়েছে তারা। বড় হয়েছে মানে পশুর থেকেও হীন হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয় তোমার সুমহান সর্বব্যাপী উপস্থিতি ছাড়া এই বিশ্বজগৎ ও জীবনের কোনও অর্থ নেই। তুমি ছাড়া মানুষকে আমার দৃষ্টিতে লম্বা লম্বা ঠ্যাংওয়ালা ফড়িং বলে মনে হয়, সে ফড়িং ঘাসের বনে আর ঝর্নার ধারে চিরদিন ধরে সেই একই গান গেয়ে বেড়ায়। সেই ঘাসের বনে নাক ডুবিয়ে মানুষ কি আজও শুধু গোবরের দানা খুঁজে যাবে?
ঈশ্বর : তোমার কি আর কিছু বলার নেই? এইরকম কুমতলব নিয়ে কেন এসেছ? এই বিরাট পৃথিবীতে ভালো ও চিন্তন কিছু পেলে না?
মেফিস্টোফেলিস : না প্রভু! আমি পৃথিবীতে সব কিছু আগের মতোই খারাপ দেখছি। মানুষের দুঃখ আমার মতো শয়তানের হৃদয়কেও বিগলিত করে তুলেছে। এই সব হতভাগ্য মানুষদের নতুন করে দুঃখ দিতে আমার প্রাণ চায় না।
ঈশ্বর : তুমি ফাউস্টকে চেন?
মেফিস্টোফেলিস : ডাক্তার ফাউস্ট?
ঈশ্বর : হ্যাঁ, আমার সেবক।
মেফিস্টোফেলিস : তা বটে! সে কিন্তু অদ্ভুতভাবে তোমার সেবা করে। তাকে যত বেশি পরিমাণেই মাংস বা মদ দাও না কেন সে তাতে তৃপ্ত হবে না। কিন্তু তার চির উত্তপ্ত চিত্তের আশা আরও অনেক কিছু চাইবে। সে তার উন্মত্ত অশান্ত চিত্তাবস্থায় অর্ধাবগুণ্ঠিত চেতনায় অনেক সময় দূর আকাশের সুন্দরতম নক্ষত্রকেও কামনা করে বসবে। লঘু ও সর্বাপেক্ষা আরামদায়ক আমোদপ্রমোদ ছাড়া দূরস্থিত ও নিকটস্থ এমন অনেক কিছু ভোগ্য দ্রব্যকে সে চায়। কিন্তু কোনও কিছুই তার বিক্ষুব্ধ বুকের উত্তাল কামনারাশিকে তৃপ্ত অবদমিত করতে পারে না।
ঈশ্বর : যদিও এখনও পর্যন্ত আমার প্রতি তার সেবার নিষ্ঠা ও একাগ্রতায় সন্দেহের অবকাশ আছে তথাপি শীঘ্রই আমি তাকে সমস্ত অশুভ শক্তির তমিস্রাবসানে এক উজ্জ্বল প্রভাতের আলোয় নিয়ে যাব। যে বাগানের গাছে গাছে ফুল ফোঁটাবার জন্য। কুঁড়িগুলোকে প্রস্তুত করে তুলছে সে বাগানের মালীকে সে আজও দেখেনি। অদূর ভবিষ্যতে সে ফুল ও ফল একই সঙ্গে পাবে। সে ফুলে ও ফলে সমৃদ্ধ ও শোভিত হয়ে উঠবে তার ভবিষ্যৎ জীবন।
মেফিস্টোফেলিস : কি বাজি তুমি রাখবে প্রভু তুমি তাকে ভালো করতে পারবে না। তবে তাকে উদ্ধার করার, শোধন করার একটা মাত্র পথ আছে। সে পথ হুলো তাকে আমার উপর ছেড়ে দেওয়া। আমার মতে তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে নেবার জন্য যদি আমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দাও তাহলেই তার পুনর্জীবন সম্ভব।
ঈশ্বর : যতদিন সে পৃথিবীতে জীবিত থাকবে আমি তাকে কোনও বিষয়ে বাধা দেব না। কোনও নিষেধাজ্ঞা জারি করব না তার উপর। মানুষ জীবনে যতদিন কামনা-বাসনার দ্বারা চঞ্চল হবে ততদিন সে ভুল করবেই। কামনা কবলিত মানুষ ভুল না করে। পারে না।
মেফিস্টোফেলিস : ধন্যবাদ। আমি কোনও মৃত ব্যক্তির আত্মাকে চাই না। তাতে আমার কোনও প্রয়োজন নেই। আমি চাই জীবন্ত মানুষকে যার গণ্ডভিত্তিক উজ্জ্বল ত্বকের উপর লাল তাজা রক্ত উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে। যখন কোনও মৃতদেহ আমার বাড়ির কাছ দিয়ে তখন মনে হয় যেন কোনও ইঁদুর কোনও বিড়ালের দ্বারা নিহত হয়েছে।
ঈশ্বর : যথেষ্ট হয়েছে। তুমি যা চেয়েছিলে তা পেয়েছ। তার মাথা থেকে তাহলে বর্তমানের যত সব সুবুদ্ধি ও যুক্তিবোধ অপসারিত করে দাও। তার পরিবর্তে তার মাথায় পেতে দাও তোমার অশুভ শক্তির ফাঁদ। তাকে সঙ্গে নিয়ে তুমি আরও নিচে নেমে যাও। তারপর একসময় তুমি নিজেই লজ্জা পাবে। দেখবে তার যত সব জটিল অতৃপ্ত কামনা-বাসনা সত্ত্বেও আসলে লোকটা ভালো। ন্যায়পথে, সৎপথে চলার এক নিগূঢ় প্রবৃত্তি আজও রয়ে গেছে তার বাসনাবিক্ষুব্ধ চিত্তের তলায়।
