কবি : তাহলে আমাকে আবার সেই বিগত যৌবনের আনন্দোচ্ছল দিনগুলো ফিরিয়ে দাও। যখন আমি মনের আনন্দে গান গাইতাম আর স্বতোৎসারিত ঝর্নাধারার মতো অসংখ্য সুললিত সাবলীল ছন্দের স্রোত অবাধে অপ্রতিহত বেগে বেরিয়ে আসত আমার মন থেকে। সেদিন এক শুচিশুভ্র কুয়াশার মোহপ্রসারী অবগুণ্ঠন সতত আচ্ছন্ন করে রাখত আমার সামনের জগৎটাকে। সেদিন বনে প্রান্তরে উপত্যকায় যেদিকেই তাকাতাম সেদিকেই দেখতাম অজস্র অচিরোদগত কুসুমকোরক অস্ফুট লাবণ্যে টলমল করছে, অমিত পরিমাণে এক স্বর্গীয় সুবাস ছড়াচ্ছে চারদিকে। এক তরল বিস্ময়ে ভরে যেত আমার মন। যৌবনে মানুষের এমনিই হয়। কিছু না পেয়েও সব পেয়ে যেতাম আমি। ভ্রান্ত অথচ এক মধুর আনন্দে সত্যানুসন্ধানের এক আবেগোেচ্ছাসে ক্ষণে ক্ষণে শিহরিত হয়ে উঠত আমার হৃদয়, আমার সমস্ত প্রাণমন। আমাকে আবার সেই অতীতের অবাধ আনাবেগকে ফিরিয়ে দাও যার যাদু স্পর্শে মধুর হয়ে উঠত আমার জীবনের সমস্ত বেদনা, ঘৃণা, ভক্তি, ভালোবাসা। আমার সেই হারিয়ে যাওয়া যৌবনকে ফিরিয়ে দাও।
মেরি অ্যান্ড : হা বন্ধু, যুদ্ধক্ষেত্রে যখন শত্রুরা এগিয়ে আসছে তোমার দিকে তখন অবশ্যই যৌবনের শক্তি তোমার প্রয়োজন। যখন সুন্দরী যুবতীরা এক মধুর কামনার আবেগে ঢলে পড়ছে তোমার বুকে, আদরে চুম্বনে বিব্রত করে তুলছে তোমায় তখন দূরস্থিত লক্ষ্যস্থলবর্তী কষ্টার্জিত এক জয়মালা এক নীরব উজ্জ্বলতায় প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্য। যখন একের পর এক নৃত্যোচ্ছল বিনিদ্র যামিনী যাপন করতে হয় শ্বাসরুদ্ধ হৃদয়ে তখন অবশ্যই যৌবন তোমার একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু হে প্রৌঢ় কবি মহাশয়, তোমার হৃত যৌবনের পুনরুদ্ধারের আশা ত্যাগ করে তোমার বর্তমানের স্বাভাবিক সৃষ্টিশক্তিকে সম্বল করেই একটি সুনির্বাচিত লক্ষ্যকে খাড়া করে এগিয়ে যেতে হবে সাহসের সঙ্গে। তোমার প্রকাশনৈপুণ্য ও সৃষ্টকর্মে কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি থাকতে পারে। কিন্তু তার জন্য আমরা কিছুমাত্র কম শ্রদ্ধা করব না তোমায়। লোকে বলে বার্ধক্য শিশুসুলভ নির্বুদ্ধিতা নিয়ে আসে, বলে বৃদ্ধ বয়সে শিশু হয়ে ওঠে মানুষ। কিন্তু একথা ঠিক নয়। আমি বলি বার্ধক্যের সুপক্ক ও সুপরিণত অভিজ্ঞতায় সিদ্ধ হয়েই আমরা বয়োবৃদ্ধরা প্রত্যেকে প্রকৃত শিশু হয়ে উঠি। প্রকৃত শিশুর মতো সরল এবং সৎ হয়ে উঠি মনে-প্রাণে।
ম্যানেজার : অনেক কথা বলেছ তোমরা দুজনেই। এবার আমি কাজ চাই। যুক্তিজালমণ্ডিত বাক্যবিস্তারে দুজনেই সিদ্ধ তোমরা। এবার প্রকৃত শক্তির পরিচয় দিয়ে কাজের কাজ করো। প্রেরণার কথা বলে সময় নষ্ট করে কি লাভ? কোনও অভাব কখনও বিলম্বের সঙ্গত অজুহাত হিসাবে গণ্য হতে পারে না। কাব্যরচনা যদি তোমার পেশা হয় তাহলে কাব্য অবশ্যই তোমার ইচ্ছা ও আদেশ মেনে চলবে। তুমি ভালোভাবেই জান কি ধরনের নাটক এখানে দরকার। এখানকার দর্শকসাধারণ চায়। কড়া মদের মতো এমন এক ধরনের নাট্যরস যা তাদের সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেবে। এবং আমিও তোমাক সেই ধরনের নাটক লিখতে অনুরোধ করি। আজ যদি এ ধরনের নাটক লেখা না হয় তাহলে আজকের এ প্রয়োজন কখনও ভবিষ্যৎ মেটাবে না। সুতরাং বৃথা বাক্যব্যয়ে আর একটি দিনও নষ্ট না করে মনের মধ্যে সদ্যসম্ভুত প্রতিটি ভাবের সদ্ব্যবহার করে সাহস ও সঙ্কল্পের সঙ্গে কাজে নেমে পড়ো। এ কাজ তোমাকে করতেই হবে, কারণ এটাই তোমার জীবিকা। তুমি জান আমাদের জার্মান দেশের মঞ্চ জগতের বর্তমান অবস্থা। সেখানে ইচ্ছামতো যে যা খুশি নাটক লিখে বা মঞ্চস্থ করে যাচ্ছে। সুতরাং তুমি তোমার ইচ্ছামতো নাট্য-উপাদান সংগ্রহ করে নাটক লিখে ফেলো। ঈশ্বর প্রদত্ত কবি-কল্পনার আলো অল্প-বিস্তর প্রয়োগ করে প্রয়োজন মতো নাট্যচরিত্র সৃষ্টি করে পশু পাখি, পাহাড়, পর্বত, জল, আগুন, অন্ধকার, দিন-রাত্রি প্রভৃতি সব কিছুর থেকেই উপাদান গ্রহণ করে বিশাল বিশ্বসৃষ্টির অনুরূপ এমন এক নাট্যজগত সৃষ্টি করতে পার যা সুদূর স্বর্গালোক হতে কল্পনার পাখায় ভর দিয়ে মর্ত্যলোকে নেমে এসে সে লোক ভেদ করে নরক পর্যন্ত গমন করবে অর্থাৎ স্বর্গ, মর্ত্য, নরক ত্রিভুবন প্রতিভাত ও প্রকটিত হয়ে উঠবে সে নাটকে।
স্বর্গলোকের অবতরণিকা
ঈশ্বর ও স্বর্গের দেবতাবৃন্দ
মেফিস্টোফেলিস
(তিনজন প্রধান দেবদূতের আবির্ভাব)
রাফায়েল : সূর্য তার আপন কক্ষপথে অন্যান্য গ্রহনক্ষত্রদের সঙ্গে অনন্তকাল ধরে আবর্তিত হয়ে চলেছে। এ পথ যেদিন তার শেষ হবে সেদিন এক মহাপ্রলয় নেমে আসবে সর্বধ্বংসী বজ্রপাতে। সেই সৌরলোক হতে দেবদূতের তাদের আপন আপন। যে শক্তি সঞ্চয় করে তার পরিমাণের কথা কেউ বলতে পারে না। এই বিশ্বসৃষ্টির নির্মাণ পদ্ধতি এমনই সূক্ষ্ম সুজটিল ও মহান যে তা কেউ কল্পনাও করতে পারে না। এই সৃষ্টির উজ্জ্বলতা প্রথম দিন হতে আজ পর্যন্ত ম্লান হয়নি কিছুমাত্র।
গ্যাব্রিয়েল : এই বিশ্বসৃষ্টি তার অমিত-ঐশ্বর্যসম্ভার নিয়ে এত দ্রুত তার কক্ষপথে আবর্তিত হচ্ছে যে তার গতিবেগ অকল্পনীয় প্রতীত হয় প্রতিটি মানুষের কাছে। ভয়াবহ রাত্রির গুমোট গভীর অন্ধকারের পর দিবসকালের স্বর্গীয় উজ্জ্বলতার তপ্ত আস্বাদন পেয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে মানুষ। শুভ্রফেশীর্ষ সমুদ্রতরঙ্গমালা অটল পর্বতমালার নিষ্ঠুর পাদদেশে বারবার প্রতিহত হয়ে ফিরে যায়। বিশ্বের দুটি গোলার্ধ আর তার মানুষ এক অনাদ্যন্ত চক্রবর্তনে বিমূর্ণিত হচ্ছে ক্রমাগত।
