ম্যানেজার : তোমার এই তিরস্কারবাক্য কোনওক্রমেই রুষ্ট করতে পারবে না আমায়। কোনও মানুষ যখন কোনও কর্মকে ফলপ্রসূ করে তুলতে চায় তখন সে অবশ্যই এমন এক পদ্ধতি গ্রহণ করে যা সবচেয়ে কার্যকরী হয়ে উঠবে তার সে কর্মের পক্ষে। ভেবে দেখো, একটা নরম কাঠকে টুকরো টুকরো করার জন্য তোমাকে দেওয়া হয়েছে। আরও ভেবে দেখো। তুমি কাজের জন্য লিখছ। একই নাটক দেখে কেউ যখন বিরক্ত বোধ করে, ক্লান্তি বোধ করে তখন আর একজন এক নিবিড় তৃপ্তি নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। আবার কেউ বা খবরের কাগজ পড়ে কেবল কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে এক অলস ঔদাসিন্য সহকারে আসে নাটক দেখতে। আসে তাদের উজ্জ্বল পোশাক-পরিহিতা অর্ধাঙ্গিনীদের সঙ্গে নিয়ে। তোমার মধ্যে যে কাব্যপ্রতিভা রয়েছে। তার দ্বারা আর কি মহৎ কার্য সম্পাদন করতে চাও? আমার কাছে এসে দেখ, তোমার অনুরাগীদের মুখমণ্ডলগুলো দেখো। তাদের মধ্যে অর্ধেক হলো বড় নীরস ও স্কুল প্রকৃতির, নাটকাভিনয় শেষ হয়ে গেলে তারা বাড়ি ফিরে কোনও বারাঙ্গনার অঙ্কশায়ীরূপে পান-ভোজন ইত্যাদি সহকারে এক উন্মত্ত রাত্রি যাপন করবে। দর্শকদের অপর অর্ধেক নাট্যরস আস্বাদনে সক্ষম। তাই বলি, হে নির্বোধ কবির দল, তোমরা কাব্যনাট্যগুলোতে এমন সব রসোত্তীর্ণ উত্তম নাট্যবস্তু দান করবে যা স্বচ্ছন্দে দর্শকদের প্রতাশ্যার সীমাকে যাবে ছাড়িয়ে। এইভাবে তোমরা পার্থিব ধনসম্পদ ও গৌরব একই সঙ্গে দুই-ই লাভ করবে। দর্শকদের মনে এমন বিপুল পরিমাণ সন্তোষ উৎপাদন করবে যে তারা যেন বিহ্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু এ কাজে কুণ্ঠা কেন? এ কাজ করতে গিয়ে আনন্দ না বেদনা কি অনুভব করছ?
কবি : যাও, অন্যত্র কোথাও গিয়ে তোমার এক অনুগত দাসানুদাসের সন্ধান করো। কী! যে কবিকে প্রকৃতি স্বয়ং এক সৃষ্টিশীল প্রতিভা দান করে সর্বশ্রেষ্ঠ মানবসন্তানরূপে সৃষ্টি করেছেন এবং যাকে সর্বাপেক্ষা বড় মানবিক অধিকারে ভূষিত করেছেন। সেই কবি কখনও তোমার আনন্দ বৃদ্ধির জন্য আপনার প্রতিভার অপব্যয় করবে না। যে কবি জীবনের যত সব উপাদানগুলো করায়ত্ত করে তার হৃদয়ের উপর তাই দিয়ে এক স্বাধীন সাম্রাজ্য স্থাপন করে, সে কবি কখনও কারও দাসত্ব করবে না। সকল কবির মধ্যে এমনই এক অগ্রপ্রসারী সত্তা আছে যা তার আপন অন্তর্নিহিত প্রেরণায় এক বিশ্বব্যাপী সূত্রজাল বিস্তার করে জগতের বিচিত্র বস্তুর সঙ্গে তার অন্তরের যোগসাধন করে। প্রাকৃতিক যত সব বাধাবিপত্তি দূর করে বিভেদ ও অনৈক্যের মধ্যে ঐক্য আনে। কবিরা ছাড়া আর কে ছন্দের নৃত্যের দ্বারা বিশ্বের অপরিবর্তনীয় জীবনধারার মধ্যে বৈচিত্র আনে? একমাত্র কবিরাই প্রতিটি ব্যক্তি-মানুষকে বিশাল বিশ্বজীবনের সঙ্গে যুক্ত করে। সকলকে এক মধুর মিলনের মধ্যে আবদ্ধ করে একসঙ্গে মিলে মিশে থাকতে প্রেরণা দেয়। কবি ছাড়া আর কে মানুষের বিষাদগ্রস্ত অন্তরে সহসা নিয়ে আসে বিক্ষুব্ধ কামনার ঝড়? প্রেমের উজ্জ্বল পথে কবি ছাড়া আর কেই বা বসন্তের ফুল ছড়ায়, একমাত্র কবিরাই সামান্য গাছের পাতা দিয়ে তৈরি মুকুটকেও রাজমুকুটের গৌরব দান করতে পারে। এতিয়নের প্রান্তরের মতো উষর মরুভূমির মাঝেও ফুল ফোঁটাতে পারে। তাদের কল্পনার শক্তি দিয়ে দেবতাদের দ্বারা অধর্ষিত স্বর্গের অলিম্পাসকে তারাই জীবন্ত করে তুলতে পারে। চারণ কবিরা যুগে যুগে মানুষের কীর্তি ও মহত্ত্বকে অমর করে রাখে, বর্ণনার দ্বারা সজীব করে তোলে তাদের।
মেরি অ্যান্ড : সুতরাং এই সব সূক্ষ্ম শক্তিগুলোই সম্মিলিতভাবে উচ্চতর কবি প্রতিভাকে চালিত করে। এই সব সূক্ষ্ম শক্তিগুলোই কবিদের হৃদয়ে ক্ষণে ক্ষণে নিয়ে আসে আনন্দ-বেদনার ঝড়। ঠিক যেমন প্রেমের ব্যাপারে হয়। প্রেমের ক্ষেত্রে একটি পরিষ্কার রোমান্সের ঘটনা ঘটে যায় প্রেমিক-প্রেমিকাদের জীবনে। প্রথমে দুজনের দেখা-সাক্ষাৎ, পরে সঙ্গপ্রবণতা, এইভাবে দুজনের অন্তর অপনা-আপনি আবদ্ধ হয়ে পড়ে এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে। প্রথমে আনন্দ, পরে বেদনায় জর্জরিত হয় উভয়ের অন্তর। এই ধরনের প্রেমকাহিনী সম্বলিত একটি নাটক উপহার দিতে পার দর্শকদের। যে জীবন অসংখ্য মানুষ অহরহ যাপন করছে সেই জীবনের এক পূর্ণাঙ্গ রূপকেও ফুটিয়ে তুলতে পার নাটকে। প্রতিটি মানুষ যে জীবনযাপন করছে সেই জীবন যখন শিল্পে বা কাব্যে তুলে ধরা হয় তখন খুব কম লোকেই বুঝতে পারে সে জীবনের কথা। বিচিত্র রং ও রূপের ছবিতে জীবনকে শিল্পীরা উপস্থাপিত করেন তাতে সত্যের আলোর থেকে ভুলের কালিমাই থাকে বেশি। তবু জগতের লোকে শিল্প বা সাহিত্যবর্ণিত সেই জীবন কাহিনীকে উপভোগ করে। এইভাবে নাটকের মধ্যে এমন অনেক ভালো উপাদানও পরিবেশন করতে পার যার থেকে লোকে আনন্দের সঙ্গে কিছু শিক্ষাও পেতে পারে। আবার দেখবে তোমার এই নাটক দেখে কত সুন্দর সুন্দর যুবক-যুবতী সংযত করতে শিখছে তাদের প্রমত্ত যৌবনের উদ্দাম গতিবেগকে। ভাবাবেগপ্রবণ তরুণ-তরুণীরা কত বিষাদের উপাদান খুঁজে পায় এই সব নাটকে।
আসল কথা, বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন দর্শক তাদের আপন আপন প্রবৃত্তি ও রুচি অনুসারে বিভিন্ন রকমের উপাদান খুঁজে নেয় একই নাটক থেকে। কেউ হাসে, কেউ কাঁদে, কেউ বা তোমার কল্পনার প্রসারতা ও ঔদ্ধত্য দেখে বিস্ময়ে বিমুঢ় হয়ে পড়ে। তবে সকলেই যে নাটকের নাট্যরস উপভোগ করে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। মনের ধাতু একবার গঠিত হয়ে গেলে পরে আর পরিবর্তিত বা অন্য পরিবেশে খাপ খায় না। তাই তরুণদের উপর নাট্যবস্তুর প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
