ম্যানেজার : তোমরা দুজনে আমাকে বিপদে-আপদে অনেক সাহায্য করেছ। আমার অনেক প্রয়োজন মিটিয়েছ। আজ আমি আমাদের জার্মান দেশের জন্য সে নাট্যপরিকল্পনা গ্রহণ করেছি সে বিষয়ে তোমাদের দুজনের অভিমত জানতে চাই। এ বিষয়ে আমার ইচ্ছা হলো এই যে জনতা বা দর্শকবৃন্দ হচ্ছে অসংখ্য জীবন্ত মানুষের সমষ্টি এবং তাদের দয়াতেই আমরা বেঁচে আছি। সুতরাং তাদের প্রতি যেন সুবিচার করা হয়। এখন মঞ্চ নির্মাণের কাজ শেষ। আমাদের অনুষ্ঠানের জন্য এক নীরব প্রতীক্ষায় স্তব্ধ হয়ে আছে দর্শকরা। কৌতূহলবিহ্বল তাদের দ্রুযুগল উত্তোলিত করে বিস্ময়কর অনেক কিছু দেখার প্রত্যাশায় এরই মধ্যে বসে আছে তারা। আমি জানি দর্শকদের কিভাবে খুশি করতে হয়। কিন্তু সেক্ষেত্রে এক অস্বস্তিসিক্ত কুণ্ঠা অনুভব করছি আমি। তারা কি ভালোবাসে, প্রচলিত কোন শব্দদৃশ্যে তারা অভ্যস্ত সেটা আমার কাছে বড় কথা নয়। তবে একথাও ঠিক আজকের দর্শকরা অনেক কিছু পড়েছে। অনেক কিছু খবর রাখে। তাহলে কেমন করে আমরা আমাদের নাট্য-পরিকল্পনায় এক অভিনব ও অভূতপূর্ব বস্তুকে উপস্থাপিত করব যা একই সঙ্গে অভিনব হয়েও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে দর্শকদের কাছে এই দর্শকরা যখন দলবদ্ধভাবে বেগবান নদীস্রোতের মতো মঞ্চাভিমুখে এগিয়ে আসে অথবা যখন তারা দিনের বেলায় রুটির দোকানের সামনে ভিড় করতে থাকা দুর্ভিক্ষপীড়িত বুভুক্ষু জনগণের মতো টিকিট কেনার জন্য অফিস ঘুরে ভিড় করে তখন তা দেখতে আমার সত্যিই খুব ভালো লাগে। বিভিন্ন প্রকৃতির অসংখ্য মানুষকে এক বিশেষ উদ্দেশ্যে এক জায়গায় এভাবে সমবেত করার ইন্দ্রজাল একমাত্র কবিরাই সৃষ্টি করতে পারেন। হে কবি, সেই ইন্দ্রজাল এবার সৃষ্টি করো।
কবি : বিচিত্র বর্ণের পোশাক পরিহিত বিচিত্র মনোভাবাপন্ন ঐ জনগণের কথা আর আমায় বলল না। ওদের দেখার সঙ্গে সঙ্গে গীতিকাব্য রচনার সমস্ত জ্বলন্ত প্রেরণা আমার নির্বাপিত হয়ে যায় মুহূর্তে। আমার দৃষ্টিসীমার অন্তরালে চলে যেতে দাও ঐসব চলমান জনতার স্রোতকে। ওদের অস্থির মানসিকতার অশান্ত ঘূর্ণাবর্তে আমাকে যেন ওরা জোর করে কখনও না ফেলতে পারে। তার চেয়ে আমাকে নিয়ে চলো সেই স্বর্গীয় নীরবতার রাজ্যে। যেখানকার আকাশে-বাতাসে এক আশ্চর্য অসীম স্বচ্ছতায় প্রতিফলিত হয় কবিসুলভ এক বিমল আনন্দের জ্যোতি। যেখানে এক অপরিসীম প্রেম আর বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয় সব মানুষ আর সেই প্রেমের রঙে রাঙা হয়ে ওঠে মানুষের বাসনার সব আবেগ।
মানুষ তার অন্তরের গভীর থেকে ভীরুতার সঙ্গে আমতা আমতা করে যা প্রকাশ করে তার বেশির ভাগ উন্মত্ত মূহূর্তের লোভাতুর বক্ষের মধ্যে নিঃশেষে তলিয়ে যায়। যা কিছু অস্থায়ী ও আপাত-উজ্জ্বল তা ক্ষণভঙ্গুর মুহূর্তের সঙ্গে সঙ্গেই নিঃশেষিত হয়ে যায়। যা কিছু খাঁটি, যা কিছু সত্য ও চিরায়ত তাই ভাবীকালের সম্পদ হয়ে বিরাজ করে যুগ যুগ ধরে।
মেরি অ্যান্ডরু : ভাবীকালের কথা আমি যদি জোর করে প্রচার করে চলি তাহলে সমকালীন জীবনের রস কেমন করে উপভোগ করব? সব মানুষেরই উচিত এই জীবনের রস উপভোগ করা। এই রস উপভোগ করার জন্য কোনও এক প্রাণোচ্ছল জীবনরসরসিক যুবকের সাহচর্য প্রত্যেক মানুষেরই দরকার। যে যুবক তার নিরন্তর পরিহাস রসিকতার মাধ্যমে তার অনর্গল স্বভাবের মাধুর্য ছড়িয়ে চলে, তার প্রতি কেউ কখনও বিরূপ হয় না, কেউ কখনো ক্রুদ্ধ হয় না। এইভাবে তার বন্ধু ও অনুরাগীর সংখ্যা যতই বেড়ে চলে ততই সে পরিহাসরস পরিবেশনে প্রেরণা পায়। সুতরাং সাহস সঞ্চয় করো, হাস্যরস পরিবেশনে তোমাদের কল্পনাশক্তিকে পূর্ণমাত্রায় নিয়োজিত করো। তোমাদের নীতিজ্ঞান, যুক্তিবোধ, ভাবপ্রবণতা, আবেগ, অনুভূতি সব কিছু মিলিত হয়ে সেই কল্পশক্তির সহায়তা করুক।
ম্যানেজার : যে নাটক তোমরা মঞ্চস্থ করবে তা প্রধানত ঘটনাবহুল হবে। মনে। রাখবে দর্শকবৃন্দ নাটকের মধ্যে ঘটনাপরস্পর্যের একটি অবিচ্ছিন্ন সূত্রকে তাদের চোখের সামনে ক্রমোদঘাটিত দেখতে চায়। দেখতে দেখতে তারা সম্মোহিতের মতো এক অপার বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে মঞ্চের দিকে। এইভাবে তাদের আগ্রহ ও আবেগ আকর্ষণ করেই বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারবে। মনে রাখবে, একমাত্র সম্মিলিত প্রার্থনার দ্বারাই সমবেত জনগণের হৃদয় স্পর্শ করা যেতে পারে, কারণ এই ধরনের প্রার্থনায় প্রত্যেকে আপন আপন কণ্ঠের সুর মিলিয়ে তৃপ্তি অনুভব করে। তেমনি। একই নাটকের মধ্যে বিভিন্ন রুচির মানুষ বিভিন্ন রকমের আগ্রহের উপাদান খোঁজে। আর তা পেলেই তারা এই রসতৃপ্তি নিয়ে বাড়ি ফিরে যায় অভিনয় শেষে। একই ধরনের এক অখণ্ড ভাববস্তুকে সম্বল করে নাটক নাই বা লিখলে। নাটকে যদি বিভিন্ন ধরনের ভাব ও রসের উপাদান ছড়িয়ে থাকে তাহলে দেখবে বিভিন্ন রুচিসম্পন্ন দর্শকরা। তার থেকে এক-একটি উপাদান কুড়িয়ে নেবে আপন আপন রুচি অনুসারে।
কবি : তুমি বুঝতে পারছ না কোনও কবির পক্ষে এ কাজ কত অসম্মানজনক। যে শিল্পী যত আত্মসচেতন এবং সব সময় সত্য বস্তু দিয়ে তাঁর সৃষ্টিকর্মকে সমৃদ্ধ করেন। সেই শিল্পীর পক্ষে এ কাজ মোটেই শোভা পায় না। যে সব ছলনাময় কুশলী শিল্পী। অসত্য বস্তুকে সত্য বলে তাঁদের সৃষ্টিকার্য চালিয়ে দিতে সিদ্ধহস্ত একমাত্র তাঁদের কাজই তোমার নীতির সঙ্গে খাপ খাবে।
