গ্যেটের ঔপন্যাসিক প্রতিভার সার্থক পরিচয় পাই তাঁর কাইন্ডার্ড বাই চয়েস বা ‘সিলেকটিভ অ্যাফিনিটি’ উপন্যাসটিতে। একই পরিবেশে লালিত কয়েকটি নর-নারীর স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির সঙ্গে নিয়তির অপরিহার্য দ্বন্দ্ব এবং তার বিস্তারই এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু। এ উপন্যাসে এডওয়ার্ড ও ওতিলে চরিত্র দুটি অস্বাভাবিকভাবে আবেগপ্রবণ। তাই তারা যখন দেখেছে তাদের স্বাধীন ইচ্ছা আপন আপন আকাক্ষার বস্তুকে লাভ করতে পারেনি তখন তারা আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। কিন্তু অপরদিকে শার্লোতে ও ক্যাপ্টেনের চরিত্র অসাধারণ আত্মসংযমের জীবন্ত প্রতীকরূপে এক চমৎকার বৈপরীত্য সৃষ্টির মাধ্যমে উপন্যাসে ভাবগত ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। অটল অটুট আত্মসংযমের দ্বারা মানুষ কিভাবে তার অদশ্য উদ্দাম ইচ্ছাশক্তিকে দমন করে অবস্থার অবাঞ্ছিত প্রতিকূলতাকে জয় করতে পারে, শার্লোতে ও ক্যাপ্টেন তার প্রমাণ দিয়েছে তাদের জীবনে। আবেগের স্রোতে কোনও অবস্থাতেই গা ভাসিয়ে না দিয়ে সব সময় তাদের যুক্তি ও বুদ্ধিগত প্রাধান্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই উপন্যাসে ক্লাসিক ও রোমান্টিক এই দুটি পরস্পর বিরুদ্ধ মননশীলতার সার্থক রূপায়ণ বড় একটা দেখা যায় না। ভিন্ন জটিল পরিবেশের মধ্যে ফাউস্টের মধ্যেও এই দুটি মননশীলতার রূপায়ণ এক আশ্চর্য সার্থকতা লাভ করেছে। ফাউস্ট এক জায়গায় বলেছে :
I am so far away, yet so near
Still I am so fain to say here I am here.
কখনও মনে হয় আমি দূরে চলে গিয়েছি, আপনার আত্মার কেন্দ্রগত শক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। কিন্তু পরক্ষণেই ভুল ভেঙে যায়। মনে হয় আমি আছি, এখানেই আছি, আপন অন্তরাত্মার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছি আমি আর সেই সুসমন্বিত অন্তরাত্মা হতে বিচ্ছুরিত আলোকে অর্থময় হয়ে উঠছে জগতের সব বস্তু, অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে নিকট-দূরের সব ব্যবধান। আপন মৃগনাভির গন্ধে আত্মহারা আকুল বনহরিণী যেমন দিক হতে দিগন্তের পথে ছুটে বেরিয়ে অবশেষে তার আরণ্যক বাসায় এসে। আবিষ্কার করে এ গন্ধ তার নাভিদেশনিঃসৃত, তেমনি মাঝে মাঝে আমাদের রোমান্টিক উন্মার্গগামী মনও সমস্ত দিগন্ত পিপাসার অবসানে ফিরে এসে আপন আত্মার চৈতন্যালোকিত বৃত্তসীমার মধ্যেই বিশ্বের বিপুল পরিধিটাকে অনিবার্যভাবে সীমায়িত ও বিন্যস্ত দেখতে পায়। আমাদের অসংযত রোমান্টিক মন ক্লাসিকাল সংযমে আবদ্ধ হয়ে ওঠে।
এই গ্রন্থ প্রকাশের ব্যাপারে সাহিত্যরসিক, বন্ধুবর ডক্টর বিষ্ণু বসু সাহায্য করে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন আমাকে।
–সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ
ফাউস্ট (কাব্য-নাটক)
উৎসর্গ
আবার এসেছ হে ছলবিলাসিনী মায়াবিনীরা! মেঘাচ্ছন্ন স্মৃতির কুয়াশা সরিয়ে আমি বেশ দেখতে পাচ্ছি সুদূর অতীতে আর একবার এসেছিলে তোমরা তোমাদের আপাত উজ্জ্বল রূপ দিয়ে আমায় মোহমুগ্ধ করতে। আজ আবার এক মোহপ্রসারী মায়াবরণ দিয়ে আবৃত করে দিতে এসেছ আমার অন্তরকে? এবার কি তোমাদের আমি বেঁধে দেব। তোমাদের এই প্রকটিত রূপে এলে যদি আরও কাছে এস! আমার জীবন-যৌবনের। সার্বভৌম কর্তৃত্বভার গ্রহণ করো। তোমাদের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে যাদুমন্ত্রসুলভ এক ক্ষণ-উন্মাদনায় ছায়ান্ধকার যে রহস্যের কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় আমার ইন্দ্রিয়চেতনা, যে অশান্ত যৌবনাবেগের মেঘভারে মৃদু বিকম্পিত ও শিহরিত হয়ে ওঠে আমার সমগ্র অন্তরাত্মা, সে কুয়াশা সে মেঘ থেকে মুক্ত করো আমায়। একান্তভাবে পার্থিব বিশাল বস্তুপুঞ্জমণ্ডিত বর্তমান দিয়ে ঘেরা প্রায়ান্ধকার এই অস্বচ্ছ চেতনার রাজ্য হতে আমাকে নিয়ে চলো আরও উজ্জ্বল এক ভবিষ্যতের পানে।
তোমরা আসার সঙ্গে সঙ্গে আমার অতীত দিনের অনেক সুখস্মৃতি ভিড় করে আসছে আমার মনে। প্রেম ও কত বন্ধুত্বের স্মৃতি সকরুণ বেদনার এক একটি মূর্তি ধরে গোলোকধাঁধা সদৃশ আমার জীবনের সুপ্রাচীন কক্ষপথে আবর্তিত হচ্ছে আবার। কেলিকপটিনী ভাগ্যদেবী অতীত জীবনের চলমান সুখস্রোত হতে অকস্মাৎ আমায় বিচ্ছিন্ন করে দিলেও স্মৃতিসিক্ত এক অবিচ্ছিন্ন মানসপ্রক্রিয়া এক দুঃসহ বেদনার জাল বুনে চলেছে আজও। সুদূর অতীতে একদিন যাদের আমি গান শোনাতাম তারা আজ। আমার গান শোনে না। তারা সবান্ধবে চলে গেছে আমার জীবন থেকে আর তার সঙ্গে সঙ্গে শূন্যে বিলীন হয়ে গেছে সে গানের সব ধ্বনি-প্রতিধ্বনি। হয়ত তারা আজও বেঁচে আছে, কিন্তু আমার কাছে আর আসে না। তারা সব পৃথিবীর জনারণ্যে ছড়িয়ে আছে। এখানে-সেখানে। আজ যারা আমার গান শোনে, শুনে আনন্দ পায়, তাদের আনন্দ আমাকে বেদনা দেয়। সে বেদনা যত বাড়তে থাকে, বহু-আকাক্ষিত এক আত্মিক প্রশান্তির জন্য ততই প্রবল হয়ে উঠে আমার ব্যাকুলতা।
তবু আমি গান গেয়ে যাই। আইওনিয়ার গানের ধ্বনিকে ছাপিয়ে যাবার জন্য এক আকাশচুম্বী উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়তে চায় আমার গান। বাতাসের প্রতিটি কম্পনে ঝঙ্কৃত হয়ে ওঠে আমার গানের বীণা। কম্পিত হয়ে উঠে আমার সারা দেহ। একের পর এক করে উত্তপ্ত অশ্রুবিন্দু ঝরে পড়ে আমার চোখ থেকে। অশান্ত অধীর হয়ে ওঠে আমার হৃদয়। আমি যা পেয়েছি তারা আমাকে ফাঁকি দিয়ে দূরে সরে যায় আর যা কিছু আমি হারিয়েছি তাদের অশরীরী স্মৃতিরা আমার চোখের সামনে এসে মূর্ত হয়ে উঠে বিব্রত করে তুলছে আমায়।
মঞ্চ সম্পর্কে মুখবন্ধ
ম্যানেজার কবি-নাট্যকার মেরি অ্যান্ড
