কিন্তু ফাউস্টের এই মোক্ষলাভের আগে তাকে যাদুবিদ্যার মোহ ত্যাগ করতে হয়েছে। যে যাদুবিদ্যা মানুষের কাছে প্রাকৃত-অপ্রাকৃতের সীমারেখাঁটিচকে বিলুপ্ত করে দেয়, তাকে বিধির বিধান লঙ্ঘন করতে উৎসাহ দেয়, সে বিদ্যা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে এক প্রত্যক্ষ বিদ্রোহ ছাড়া আর কিছুই নয়।
সে বিদ্যা ত্যাগ না করা পর্যন্ত নিজের মুক্তি বা জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পায়নি ফাউস্ট। এই জন্য সে বলেছে,
Not yet have I my liberty made good
If I could banish Magic’s fell creations
And totally unlearn the incantation
Stood I, O Nature’ Man alone in thee,
Then were I it worth one’s while a man to be!
শতবর্ষপূর্তির পর জীবনসায়াহ্নে এসে ফাউস্ট বুঝতে পেরেছে যাদুবিদ্যার মোহে ধরা না পড়লে সে জগতের মাঝে মানুষের মতো এক মানুষ হয়ে উঠতে পারত। যখন সে তার নিজের ভুল বুঝতে পারল তখন তার কোনও উপায় নেই। উনিশ শতকের অনেক সমালোচক মনে করেন ফাউস্টের মতো বিরাট ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষের পক্ষে মেফিস্টোফেলিসের হাতে ধরা দেওয়া উচিত হয়নি। আমার মতে ফাউস্টের ট্রাজেডি এইখানে। শুধু ফাউস্ট নয়, আধুনিক মানব জীবনের ট্রাজেডিও এইখানে। বিজ্ঞান আজকের মানুষকে যে শক্তি দান করেছে, মানুষ সে শক্তির সীমাকে মানতে চায় না। অসাধ্যসাধনের যে উদ্ধত প্রয়াস মানুষের জ্ঞান ও শক্তিগত সীমাকে অস্বীকার করে। আধুনিক মানুষের আত্মার সংকটকে ঘনীভূত করে তুলেছে, দ্বিধাবিভক্ত করে তুলেছে তার অন্তরাত্মাকে, মেফিস্টোফেলিস হলো সেই প্রয়াসেই প্রতীক। ফাউস্টের মতো আমরা যখন বুঝতে পারি, আমাদের সংগ্রামশীল আত্মশক্তি বৃথা অপচয় করে সীমাহীন তলহীন শূন্যতার মাঝে যে অলীক নিশ্চয়তাকে হাত বাড়িয়ে ধরতে গিয়েছি সে নিশ্চয়তা হলো আত্মপ্রতারণারই নামান্তর মাত্র, তখন কোনও উপায় থাকে না। সারাজীবনের সকল ভুলভ্রান্তির প্রান্তভূমিতে এসে আমরা যখন উপনীত হই তখন দেখি দিগন্তের পটে ফুটে উঠেছে তিমিরাঙ্কিত মৃত্যুর এক ভয়াল মূর্তি। দেখি, ক্লান্ত প্রাণের নদীটি আগেই ঢলে পড়েছে কুয়াশালীন সমুদ্রের ইন্দ্রনীল কোলে।
ফাউস্ট শুধু এক সাধারণ নাট্যকাব্য নয়, ফাউস্ট আধুনিক জীবনের এক সাহিত্য মহাকাব্য। গ্যেটের মতো আর কোনও কবি বা নাট্যকার তাঁর রচনার মধ্যে আধুনিক মানবজীবনের আশা-নিরাশা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, ধর্ম-অধর্ম, পাপ-পুণ্য নিয়ে, আত্মিক ও আধ্যাত্মিক সংকটের বিচিত্র দিকগুলো নিয়ে এমন করে ভাবেননি। তবে ফাউস্টের শেষদৃশ্যে দান্তের ডিভাইন কমেডিয়ার প্রভাব প্রকটিত হয়ে তাঁর ভাবকল্পনার মৌলিকতাকে ক্ষুণ্ণ করেছে। দান্তের বিয়াত্রিসের মতো মার্গারেটের মৃত্যুহীন প্রেম ফাউস্টের আত্মাকে নিয়ে গেছে ঐশ্বরিক মার্জনা আর মোক্ষলাভমণ্ডিত স্বর্গের সর্বোচ্চ লোকে। আমার মনে হয় যে গ্যেটে একদিন শুধু বিশুদ্ধ যুক্তিবাদের উপর নির্ভর করে ধর্মনিরপেক্ষ চূড়ান্ত জীবনসত্যটিকে ধরার চেষ্টা করেছিলেন, সেই গ্যেটে মিস্টিক বা মরমী খ্রিস্টান সাধক ল্যাভেতারের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে জীবনের চূড়ান্ত সত্য ও পরম অর্থটি খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন।
গ্যেটের অন্য দুটি নাটক আয়রন হ্যান্ড ও এগমঁত ট্রাজেডি হিসাবে সার্থক। দুটি নাটকেরই পটভূমি হলো সমকালীন রাজনৈতিক সংকট। আয়রন হ্যান্ড নাটকের নায়ক বার্লিশিঞ্জেনের জীবনে ট্রাজেডি নেমে এসেছে এক ভ্রান্তি থেকে যে ভ্রান্তি বলে সে ভেবেছে দেশের কৃষকবিদ্ৰোহজনিত অরাজকতার মাঝেও তার শক্তি, সামর্থ্য, সততা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতা সমানভাবে কার্যকরী হবে। বিপ্লবী অশিক্ষিত অসংযত কৃষকরা তার নেতৃত্ব অস্বীকার করে তাকে আঘাত করেছে। এগমঁত নাটকের পটভুমি হলো স্পেনীয় সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডবাসীদের বিদ্রোহ। এই নাটকের নাটক কাউন্ট এগমঁত এক অসঙ্গত দুঃসাহসের বশবর্তী হয়ে শত্রুদের শক্তিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে উপযুক্ত আত্মরক্ষা বা প্রতিরক্ষাগত কোনও ব্যবস্থা অবলম্বন করেনি, বন্ধুদের সতর্কবাণীতে কান দেয়নি। এগৰ্মতের এই বিচারবুদ্ধিগত ত্রুটিই ট্রাজিক পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে তার জীবনকে।
গ্যেটের উপন্যাস তিনটির মধ্যে তাঁর জীবনের প্রথম রচনা সাফারিংস অফ ইয়ং ওয়ার্দার’ উপন্যাসটি একান্তভাবে কাব্যগুণান্বিত। মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের পটভূমিকায় নায়ক ওয়ার্দারের আবেগানুভূতির বিস্তারের মধ্য দিয়ে তার আত্মজীবনের কিছু কিছু উপাদান প্রতিফলিত হয়েছে। লোত্তের প্রতি তার ব্যর্থ প্রেমের অসংযত অদম্য বেদনা অন্তরাবর্তন-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আত্মঘাতী হয়ে উঠেছে। গ্যেটে নিজেও একবার আত্মহতার কথা চিন্তা করেন এবং এই আত্মহত্যার স্বপক্ষে উদ্ভাবিত যুক্তিগুলো এই উপন্যাসে পরিব্যক্ত করেন।
‘উইলেম মেস্তার’ উপন্যাসটি ঘটনাপ্রধান। অসংখ্য ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে জীবন সম্পর্কে যে বিচিত্র অভিজ্ঞতা লাভ করেছে মেস্তার, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তার নাট্যপ্রতিভা প্রাণরস আহরণ করে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। এই উপন্যাসের নায়কের মধ্যে গ্যেটের আত্মগত প্রতিফলন পড়েছে। গ্যেটে একের পর এক করে যেমন ব্যক্তিজীবনে গ্রেচেন, ফ্রেডারিক ও লিলি এই তিনটি মেয়েকে ভালোবাসলেও তিনটি প্রেমের ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হন তেমনি ইউলেম মেস্তারও একের পর এক কয়েকটি মেয়েকে ভালোবেসে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু সেই ব্যর্থ প্রেমের বেদনা তার নিরন্তর পথচলার গতিকে ব্যাহত করতে পারেনি। তবে উপন্যাসের মধ্যে অহেতুক অসংখ্য ঘটনাজাল বিস্তার করায় নায়কের চিন্তাভাবনাগত মানব প্রক্রিয়ার অবিচ্ছিন্ন ধারাটি ক্ষুণ্ণ হয়েছে মাঝে মাঝে।
