প্ৰথম খণ্ডে ফাউস্ট মার্গারেটকে ভালোবেসেছে। কিন্তু মার্গারেটের মতো সাধারণ একটি মেয়ে ফাউস্টের মতো এক বেগবান সত্তাকে কখনও ধরে রেখে দিতে পারে না। বর্তমানের সীমায়িত কালখণ্ডে ও ভূমিখন্ত্রে মধ্যে জীবনের চূড়ান্ত সার্থকতাকে যে খুঁজে পায় না কখনও, মন যার আকাশগামী পাখির মতো বৃহত্তর জীবনসত্যের এক স্বপ্নলীন পিপাসায় সতত উড্ডীয়মান সেই ফাউস্ট কোনও এক শান্ত গৃহকোণে এক সাধারণ নারীর বস্ত্রাঞ্চলে আবদ্ধ থাকতে পারে না কখনও। এজন্য প্রতিকূল ঘটনার স্রোত এসে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে দুজনকে নির্মমভাবে। এই কারণেই পরে দেখা যায় কোনও এক নির্বোধ রাজার অসংযত কামনা চরিতার্থ করতে গিয়ে শ্রেষ্ঠ নারীসৌন্দর্যের ক্লাসিকাল প্রতীক হেলেনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে ফাউস্ট।
দ্বিতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় অঙ্কে ফাউস্টের সহকারী ওয়াগনার যে কৃত্রিম নলজাতক সন্তান সৃষ্টি করেছে, সে সন্তান শক্তিধর হলেও যার সমস্ত শক্তি চৈতন্যসর্বস্ব এক নিরাবয়ব সত্তামাত্র, সে সন্তানের মধ্য দিয়ে গ্যেটে দেখাতে চেয়েছেন মানুষ শত সৃষ্টিশীল প্রতিভার অধিকারী হলেও দেহমনের সুষম সম্বন্ধে গড়া সার্থক মানুষ সৃষ্টি করতে পারে না। সেই কৃত্রিম সন্তান হোমুনকালাসের সাহায্যে হেলেনের দেখা পেয়েছে ফাউস্ট। মার্গারেটের প্রতি তার যে প্রেম একদিন ছিল কেন্দ্রানুগ সে প্রেম জৈব ইন্দ্রিয়চেতনায় সব স্তর পার হয়ে বহু যুগের কালগত ব্যবধান জয় করে হেলেনের কাছে গিয়ে সহসা হয়ে উঠেছে কেন্দ্রাতিগ। যে সর্বাত্মক দুর্লভ নারীসৌন্দর্য সর্বগ্রাসী কালের কুলিশ প্রভাবকে অগ্রাহ্য করে এক অখণ্ড সত্যের অম্লান ভাবমূর্তিতে পর্যবসিত, সে সৌন্দর্যকে লাভ করার জন্য ফাউস্টের কেন্দ্রাতিগ প্রেম স্বচ্ছন্দে উঠে গেছে এক নিষ্কাম বায়বীয়তার প্রতীকী ভাবরাজ্যে। এই ভাবরাজ্যেই হেলেনের সঙ্গে তার বিবাহ হয়েছে। এ বিবাহ যেন কল্পনার সঙ্গে এক ভাবসত্যের মানসপ্রতিমার। এই ভাবসম্মিলনের ফলস্বরূপ যে সন্তান প্রসূত হয়েছে সে সন্তানও স্বাভাবিকভাবেই হয়ে উঠেছে অলীক ভাবসর্বস্ব এক কল্পনামাত্র। সে উড়তে গিয়েও উড়তে পারেনি। উড়তে গিয়ে তার মৃত্যু হয়। হেলেনের সন্তান ইউফোরিয়নের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে হেলেনের পার্থিব দেহটা সহসা বাষ্পীভূত হয়ে উবে যায় ফাউস্টের চোখের সামনে দিয়ে। শুধু তার পোশাকগুলো তার হাতে থাকে। ফাউস্টের চৈতন্য হয়। fluechger Tage grossen Sinn. নশ্বর জীবনের ক্ষণভঙ্গুর অস্তিত্বের এক বিরাট তাৎপর্য সহসা উদঘাটিত হয়ে উঠল ফাউস্টের কাছে। ফাউস্ট আবার বুঝল, নশ্বর দেহকে ফেলে যাওয়া অবিনশ্বর আত্মার মতো সকল সৌন্দর্যের ভাবমূর্তি তার বাস্তব অস্তিত্বের বাহ্য রূপায়বটি সাপের খোলসের মতো ত্যাগ করে চলে যায় এবং তখন হেলেনের পরিত্যক্ত উজ্জ্বল পোশাকের মতোই সে সৌন্দর্যের এক উজ্জ্বল স্মৃতি শুধু পড়ে থাকে আশাহত বিহ্বল মনের কোণে। সকল প্রেম ও সৌন্দর্যের একটি আত্মিক তাৎপর্য আছে এবং সেই তাৎপর্য আত্মিক বা তুরীয় তাৎপর্যের আলোকে মৃত মাগারেটের স্মৃতিটি ফাউস্টের মনে উজ্জ্বল হয়ে উঠল সহসা। গ্যেটে এখানে পাপপুণ্যগত নৈতিক বিচার থেকে হেলেনকে মুক্ত করে এক পরিপূর্ণ আত্মিক সৌন্দর্যের প্রতীক হিসাবে উপস্থাপিত করেছেন। যে সৌন্দর্য মানুষের আত্মাকে প্রসারিত করে অন্তঃকরণকে বিশুদ্ধ করে সেই শুচিশুদ্ধ সৌন্দর্যের নির্বিশেষে সত্তার কছে । মেফিস্টোফেলিসের মতো কোনও অশুভ শক্তি সশরীরে যেতে পারে না। এই জন্য শয়তান মেফিস্টোফেলিস ক্ল্যাসিকাল ওয়ালপার্গিস নৈশভোজের সভায় প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত না হয়ে অশুভ দৈবশক্তির প্রতীক ফোর্সিয়ার মুখোশ পরে হাজির হয়। ফোসিয়া ও মেফিস্টোফেলিস হেলেনের বাহ্য রূপটিকেই বড় করে দেখেছিল; তারা তার রূপসৌন্দর্যের অবিনাশী অতীন্দ্রিয় ভাবমূর্তিটি দেখতে পায়নি, কারণ সে অন্তদৃষ্টি তাদের ছিল না।
হেলেনের পরিপূর্ণ সর্বাত্মক সৌন্দর্যের সংস্পর্শে ফাউস্টের আত্মা যে প্রসারতা লাভ করে তাতে তার মধ্যে জেগে ওঠে এক অননুভূতপূর্ব বীরত্ব ও সামাজিক দায়িত্ববোধ। মেফিস্টোফেলিসের যাদুর সাহায্যে যুদ্ধ জয় করে সম্রাটের কাছ থেকে পুরস্কারস্বরূপ এক বিরাট জলা জায়গা নিয়ে সমুদ্রে বাঁধ দিয়ে তাকে উর্বর শস্যক্ষেত্রে পরিণত করার পরিকল্পনা করে সে। যত সব অলস রোমান্টিক ভাবকল্পনাকে বিদায় দিয়ে ফাউস্ট এবার সৃজনাত্মক এক কর্মোদ্দীপনায় ফেটে পড়তে চায়। এই উদ্দীপনার আতিশয্যে সমুদ্রের মতো এক অসংযত অনুৎপাদিকা প্রাকৃতিক শক্তিকে সংযত ও উৎপাদিক শক্তিতে পরিণত করে মানবকল্যাণে নিয়োজিত করতে চায় তাকে।
আপাতশান্ত আপাতনিস্পৃহ প্রকৃতির অন্তঃস্থলে আবদ্ধ থাকে উল্লঙ্ঘন-অভিলাষী এক বিদ্রোহাত্মক শক্তির প্রচণ্ডতা যা মাঝে মাঝে ফেটে পড়ে পর্বতশৃঙ্গের অপ্রধৃষ্য উতুঙ্গতায়, সমুদ্রতরঙ্গের সর্বগ্রাসী উত্তালতায় ও প্রভঞ্জনের বৈপ্লবিক মত্ততায়। ফাউস্টের দ্বন্দসঙ্কুক্ষিত দ্বৈতসত্তাটি যেন প্রকৃতির এই দুটি শক্তির প্রতীক। যে ফাউস্ট একদিন হতাশা আর বিষাদে মুহ্যমান হয়ে পৃথিবীর সব আশা, বিশ্বাস ও সহিষ্ণুতাকে অভিশাপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছে, সে ফাউস্ট একদিন মেফিস্টোফেলিসের শয়তানী প্রভাবের শান্ত ক্রীড়নক হিসাবে কাজ করে গেছে, সেই ফাউস্টই আবার অতিমানবিক কামনার স্পর্ধিত উচ্ছ্বাসে এক মহাজাগতিক অভিলাষে ফেটে পড়েছে। তার বিষণ্ণ। প্রতিহত প্রাণের পথহারা প্রস্রবণটি সহসা তার চারদিকের সমস্ত প্রস্তরশৃঙ্খল ও গুহান্ধকার হতে নিজেকে মুক্ত করে মানবকল্যাণবোধের এক বিশ্বাত্মক সমুদ্রসত্তায় বিলীন হয়ে গেছে। এই জন্যই মেফিস্টোফেলিসের সব বাধাকে ব্যর্থ করে দিয়ে ফাউস্টের আত্মাকে স্বর্গে নিয়ে গেছে মার্গারেটের আত্মা।
