এমন সময় তার এই দুর্বল মুহূর্তে ছদ্মবেশে উপস্থিত হলো মেফিস্টোফেলিস। ফাউস্টের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তার ভোগবাসনা চরিতার্থ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক প্রলোভনজাল বিস্তার করল তার সামনে। সে জালে সহজেই ধরা পড়ল ফাউস্টের আত্মা। মেফিস্টোফেলিস এটা জানত। সে জানত ফাউস্ট তার আত্মাকে বাঁচাবার জন্য কেলিকপটিনী নারীর মতো যে সব যুক্তি উপস্থাপিত করবে সে সব যুক্তি আসলে কোনও ভিত্তি নেই, তা মানুষের অন্য সব যুক্তির মতোই এক শাশ্বত দুর্বলতায় ও দ্বৈত্য সত্যের সংঘাতে খণ্ডিত।
মেফিস্টোফেলিস প্রথমে ফাউস্টকে ডাইনিদের রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে দেখাল, ডাইনি বা যাদুকরেরা কিভাবে প্রাকৃত বস্তুর সাহায্যে এক অতিপ্রাকৃত আবেশ ও ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করে। এ বিদ্যার মোহে ধরা না দিয়ে পারে না কোনও মানুষের আত্মা, কিন্তু কেউ যদি মনে করেন, ফাউস্টের যে আত্মা মেফিস্টোফেলিসের হাতে পাতা প্রলোভনজালে আকাশ থেকে ঝরেপড়া ভোরের শিশিরের মতো পড়ে গিয়েছিল, সে আত্মার নিঃশব্দ অধঃপতনের নীরব ইতিহাসটিকেই দুটি খণ্ডে বিভক্ত এই নাট্যকাব্যের মধ্যে ব্যক্ত করতে চেয়েছেন গ্যেটে, তাহলে তিনি ভুল করবেন। তা যদি হতো তাহলে এ নাটকের মধ্যে এ সব সুজটিল ঘটনাজাল সংস্থাপন করতেন না গ্যেটে, এত বুদ্ধি, কল্পনা ও আবেগানুভূতি দিয়ে ফাউস্টের মনোজগৎকে সমৃদ্ধ করে মেফিস্টোফেলিসের মতো অসাধারণ দুঃখবাদী ও ধ্বংসাত্মক শক্তিসম্পন্ন পুরুষের সমকক্ষ করে তুলতেন না ফাউস্টকে।
ফাউস্টের বিষয়বস্তু সম্পর্কে ১৮২৭ সালের ৬ই মে তারিখে একারম্যানকে গ্যেটে নিজের একটি কথা বলেছিলেন, কারণ অনেকেই তাকে জিজ্ঞাসা করত এ বিষয়। তিনি Boccia They come and ask what idea I meant to embody in my Faust as it I know myself and could inform them. From heaven through the world to hell could indeed be something; but this is no idea, only a course if action. And further, the devil loses the wager and that a man continually struggling from difficult errors towards somthing better, should be redeemed, be an effective and to many a enlightening thought; but it is no idea at the foundation of the whole or of every individual scene. It would have been a fine thing indeed, if I had strung so rich, varied and highly diversified a life as I have brought to view in Faust upon the slender string of one pervading idea.
তিনি বলেছেন, শয়তানের সঙ্গে সংগ্রামরত মানবাত্মার মুক্তিলাভ এবং শয়তানের পরাজয় এ নাটকের বিষয়বস্তু হলেও নাটকের মধ্যে সমস্ত দৃশ্যের ঘটনাগুলো এই একটিমাত্র বিষয়বস্তুর সঙ্গে সংগতি রেখে সমাবিষ্ট হয়নি। যদি তিনি একটিমাত্র উজ্জ্বল ভাববস্তুর সুতো দিয়ে নাট্যবর্ণিত সকল ঘটনাজালকে গ্রথিত করতে পারতেন তাহলে খুবই ভালো হতো।
ফাউস্টের দুটি খণ্ডেই পাঁচটি করে অংশ আছে। অনেকের মতে প্রথম খণ্ডের থেকে দ্বিতীয় খণ্ডটি আরও দুর্বোধ্য। কিন্তু আমার মনে হয় আবেগানুভূতির প্রাধান্য বেশি থাকায় নাট্যবস্তু অপেক্ষাকৃত সহজবোধ্য হলেও দ্বিতীয় খণ্ডে ফাউস্ট মেফিস্টোফেলিসের অবাঞ্ছিত আধিপত্য হতে অনেকাংশে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারায় তার চরিত্রটি সঠিকভাবে বিকাশ লাভ করতে পেরেছে; এ দিক দিয়ে এ খণ্ডের নাট্যমূল্য অনেক বেশি এবং নাটকীয় উদ্দেশ্য সাধনের দিক দিয়ে সমধিক তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে দুটি খণ্ডের রচনকালের মধ্যে পঁচিশ বছরের ব্যবধান থাকায় দুটি খণ্ডের রচনারীতি ও জীবনবোধের মধ্যে কিছু পার্থক্য পরিলক্ষিত হওয়া স্বাভাবিক। ১৮৩১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের গ্যেটে একারম্যানকে বলেন, It all issues from a more composed more passionate individual, and this twilight may well explain its great appeal. But in the second part there is scarely anything subjective, here there appears a higher, broader, brighter, less passionate would and those who have not knocked a lot of gathered experience will not be able to make much of it.
মোহনাবিলীন কোনও অবসন্ন নদীর কুয়াশা যেমন সমুদ্রনীল এক বৃহত্তর সত্যকে আভাসিত করে তোলে, জীবনসায়াহ্নে উপনীত ফাউস্টও তেমনি যথাসম্ভব যত সব আবেগানুভূতির উচছলতাকে সরিয়ে দিয়ে এক বৃহত্তর জীবনসত্যের সাধনায় নৈর্ব্যক্তিকভাবে এগিয়ে গেছে।
দ্বিতীয় খণ্ডের প্রারম্ভেই তার পার্থিব অভিজ্ঞতার স্বল্পতা ও সীমাবদ্ধতার প্রতি পূর্ণমাত্রায় সচেতন হয়েও এক বৃহত্তর ও মহত্তর জীবনসত্যকে পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে ফাউস্ট। শিশুর মতো এক অবুঝ কামনায় আতিশয্যে এমন বিহ্বল হয়ে পড়েছে। তার দুচোখের দৃষ্টি যে সে বিহ্বল দৃষ্টির সামনে সম্ভব-অসম্ভবের বাস্তব সীমারেখাঁটি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে কখন নিঃশেষে। কোনও প্রতিকূল অবস্থায় বিচলিত করতে বা হার মানাতে পারেনি তাকে। তার পরাভূতপ্রায় আত্মশক্তি নির্বাপিতপ্রায় দীপশিখার মতো এক বিরল উজ্জ্বলতায় জ্বলে উঠেছে বারবার।
