যে ফাউস্টের অদ্ভুত জীবনকাহিনী আকৃষ্ট করেছিল গ্যেটের মনকে, সে ফাউস্ট কিন্তু নিছক কল্পনার সৃষ্টি নন, তিনি হলেন জার্মানির ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের নেতা মার্টির লুথারের সমসাময়িক এক রক্ত-মাংসের মানুষ। মোড়শ শতকের ইউরোপে প্রথাগত ক্যাথলিক ধর্মের অনাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে যে বিপ্লব দেখা দেয়, সুগভীর জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের সাধক ডক্টর জর্জ ফাউস্ট ছিলেন সেই বিপ্লবের মূর্ত প্রতীক। তাঁর চিন্তার স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা ছিল অসাধারণ। তিনি আবার মধ্যযুগীয় রসায়নবিদ্যা ও যাদুবিদ্যায় ছিলেন পারদর্শী। একই ধাতুকে অন্য এক ধাতুতে রূপান্তরিত করার রহস্য আয়ত্ত করার ফলে তিনি একই সঙ্গে প্রকৃতি জগত ও মানব জগতের উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণক্ষমতা বিস্তার করে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখেন। যে ক্ষমতা একান্তভাবে ঈশ্বরের করতলগত, যা কোনও মানুষ অর্জন করতে পারে না অথবা করাটা নীতি ও ধর্মসম্মত নয় তার পক্ষে, ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস হারিয়ে শয়তানের কাছে তার আত্মাকে হীনভাবে বিক্রি করে সেই ক্ষমতা অর্জন করেন ফাউস্ট। এর জন্য ঐশ্বরিক অভিশাপও নেমে আসে তার জীবনে। এইভাবে দেখা যায়, মধ্যযুগের ফাউস্টকে নিয়ে যে কবিতা, নাটক লেখা হয় তার মূল পরিকল্পনার সঙ্গে খ্রিস্টীয় পাপচৈতন্য ও নাস্তিকের শাস্তিভভাগের ব্যাপারটি যুক্ত হয়।
কিন্তু যুক্তিবাদী আবহাওয়ায় লালিত গ্যেটের মন অপরাজেয় পৌরুষের প্রতীক ফাউস্টের মতো অসাধারণ পুরুষের জীবনকাহিনীর সঙ্গে খ্রিস্টীয় পাপপুণ্যতত্ত্বকে যুক্ত করে দেখার রীতিটিকে মেনে নিতে পারে না কিছুতেই। গ্যেটে ফাউস্টকে দেখেন অন্য দৃষ্টিতে। তার জীবনকাহিনীতে বিবৃত করতে চান সম্পূর্ণ এক ভিন্ন আঙ্গিকের মাধ্যমে। তাঁর মতে ফাউস্টের আত্মিক বিদ্রোহের বিক্ষুব্ধ তরঙ্গোচ্ছাস শুধু খ্রিস্টীয়-ধর্মতত্ত্বের বিরুদ্ধেই প্রবাহিত হয়নি, ব্যক্তি ও সমাজজীবনে প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত সকল রকম জীবনবোধ ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধেও তা পরিচালিত হয়। মানুষের জ্ঞান ও বুদ্ধি যতই উল্কর্ষ লাভ করুক না কেন, তার একটি সীমা আছে, যেমন সমুদ্রতরঙ্গ যতই ঊর্ধ্বে উত্তল হোক না কেন, তার সার্বিক ব্যাপ্তির পথে বাধা থাকবেই, তা কখনও বেলাভূমি অতিক্রম করতে পারবে না। কিন্তু ফাউস্ট এই সীমাটি না মেনেই তার অতিমানবিক বুদ্ধির স্পর্ধিত তন্তুর সমন্বয়ে বিশ্বব্যাপী এক লালসার জাল বিস্তার করে। ধীরে ধীরে নিজেই জড়িয়ে পড়ে সে জালে।
ফাউস্টের প্রারম্ভিক প্রস্তুতি হিসেবে গ্যোটে যে উৎকর্ষ ও মঞ্চসম্পর্কিত ভূমিকার অবতারণা করেছেন তার সঙ্গে মূল নাটকের কোনও অঙ্গগত সম্পর্ক নেই। ‘প্রিলিউড’ বা মঞ্চের ভূমিকা অংশে শুধু দেশের প্রচলিত নাট্যধারা ও আদর্শ নাট্যরীতি সম্পর্কে গ্যেটের কিছু মতামত আছে। কিন্তু ‘প্রোলোগ ইন হেভেন’ অংশে ঈশ্বর ও শয়তান মেফিস্টোফেলিস-এর যে সব কথাবার্তা হয় তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ঈশ্বর বললেন, বাস্তব কার্যক্ষেত্রে মেনে চলা কঠিন হলেও ন্যায়-অন্যায়বোধই মানব চরিত্রের প্রধানতম ধর্ম। যতদিন এই ন্যায়-অন্যায়বোধ মানুষের বিচারবুদ্ধির মর্মমূলে থেকে তার সকল কর্মপ্রচেষ্টাকে নিয়ন্ত্রিত করে চলে ততদিন ঈশ্বরের করুণা ও মোক্ষলাভ সহজ হয়ে ওঠে তার পক্ষে। দৃষ্টান্তস্বরূপ ঈশ্বর নাম করলেন নরলোকের আদর্শ মানুষ ফাউস্টের। কিন্তু বাইবেলের স্যাটানের মতো মেফিস্টোফেলিস এমনই এক শয়তান যে বিশ্বসৃষ্টির কোথাও কোনও সত্য বা সৌন্দর্যকে স্বীকার করতে চায় না। এক অকারণ বিতৃষ্ণার অমিত বিষমিশ্রণে বিশ্বের সকল সত্যকে বিকৃত করে দেখাই ছিল তার ধর্ম। এইভাবে তার অসাধারণ বুদ্ধি ও চাতুর্যের সকল তীক্ষ্ণতা এক দুঃখবাদী ও ধ্বংসাত্মক মানসপ্রক্রিয়ার মধ্যে সংহত ও সংবদ্ধ হয়ে ওঠে। মেফিস্টোফেলিস তাই ফাউস্টের ন্যায়-অন্যায়বোধের সততায় স্পষ্টত সন্দেহ প্রকাশ করে ঈশ্বরের আত্মপ্রসাদাত্মক ধারণাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে দিল। তখন ঈশ্বর বললেন, মানুষ তার বাস্তব কার্যক্ষেত্রে সকল সময় নীতিচেতনানিঃসৃত বিচারবুদ্ধির সর্বাত্মক ও সুসংহত পরিচয় দান করতে না পারলেও স্বতোৎসারিত এই নীতিচেতনা ভালোমন্দ সকল কর্মকর্মকে স্পর্শ ও নিষিক্ত করে তার জীবন ও পশু জীবনের মধ্যে এক শাশ্বত ও অলঙ্নীয় ব্যবধান রচনা করে চলেছে।
এরপর নাটকের প্রথম দৃশ্যে ফাউস্টকে আমরা প্রথম দেখি তখন তাকে অতুলনীয় পাণ্ডিত্যে সমৃদ্ধ এমনই এক ব্যক্তি বলে মনে হয় যে জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় লাভ করেছে অসাধারণ ব্যুৎপত্তি, অথচ যে কোনও বস্তু বা ঘটনার চূড়ান্ত অর্থ উপলব্ধির উপযুক্ত অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী হয়ে উঠতে পারেনি। তাই এই বিশ্বসৃষ্টির মহাজাগতিক তাৎপর্যটি উপলব্ধি করতে গিয়ে ফাউস্ট বুঝতে পারে, সে জ্ঞানবিদ্যার মৃঢ় অহঙ্কারে স্বাধিকারপ্রমত্ত হয়ে উঠেছে সে, আপাত বিশাল সেই জ্ঞানবিদ্যার সকল ব্যাপ্তি ও গভীরতা শুধু তার পার্থিব অভিজ্ঞতার মধ্যেই শোচনীয়ভাবে সীমাবদ্ধ। তার যুক্তিবাদী সহকারী ওয়াগনারের সহায়তায় ফাউস্ট আরও বুঝতে পারে, অপার্থিক তুরীয় জগতের কথা তো দূরের কথা, পার্থিব জগৎ সম্পর্কেও তার জ্ঞান খুবই সীমাবদ্ধ। জ্ঞানবিদ্যার যে বিপুলতায়ন অহঙ্কারের মধ্যে তার জীবনগত অস্তিত্বের সমস্ত সার্থকতাকে কেন্দ্রীভূত দেখেছিল ফাউস্ট, সেই জ্ঞানবিদ্যার শোচনীয় অপূর্ণতা ও ব্যর্থতার দুঃখে মুহ্যমান হয়ে উঠল সে। অপরিসীম হতাশার নিবিড়তায় আত্মহত্যার কথাও ভাবল। কিন্তু অকস্মাৎ শৈশবের স্মৃতির এক মধুর উত্তাপে ও নগরদ্বারে জনতার সংস্পর্শে বাঁচার এক দুর্মর এষণা এক প্রভাবসুলভ স্নিগ্ধ স্বচ্ছতায় সমীরিত হয়ে উঠল তার মনের মধ্যে। জীবনের যে অর্থ সে হারিয়ে ফেলেছিল সেই হারানো অর্থটি এক অনাস্বাদিতপূর্ণ মাধুর্যে দ্যোতিত হয়ে উঠল তার কাছে, মূৰ্ছিত হয়ে উঠল অশ্রুত ধ্বনিতে। মনে মনে সংকল্প করল ফাউস্ট, প্রাকৃত বা অতিপ্রাকৃত যে কোনও উপায়ে জীবনের সেই সতত অপসৃয়মান অর্থটিকে এবারে সে তার প্রতিটি জীবকোষের খণ্ডিত জৈবচেতনায়, তার ইন্দ্রিয়যন্ত্রের প্রতিটি তন্ত্রীতে ধরে রেখে দেবে অক্ষয়ভাবে।
