আয়রন হ্যান্ড ও এগমঁত সার্থক ট্রাডেজি নাটক। সমকালীন-রাজনৈতিক সংকট এর পটভূমি হলেও আজও তার আবেদন শেষ হয়ে যায়নি–কখনো যাবেও না। প্রথম নাটকটির নায়ক ভরসা স্থাপন করেছে বিপ্লবী-অশিক্ষিত অসংযত কৃষকদের ওপরে। একান্তভাবে সে বিশ্বাস করেছে তার শক্তি সামর্থ-সততা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ঐ কৃষকরা বিনা দ্বিধায় মেনে নিবে। কিন্তু ঘটেছে তার উল্টো। মানুষ অ্যাকাডেমিক শিক্ষায় যতবড় অশিক্ষিত হোক-পৃথিবীর পাঠশালা তাকে যে কিছু শিক্ষা দিতে পারে সেই সত্য এখানে দেদীপ্যমান আভায় উদ্ভাসিত হয়েছে। মানুষ সাদা দৃষ্টিতে যাকে মূর্খ মনে করে-প্রকৃতভাবে সে তা নাও হতে পারে।
এগমঁত এক দুঃসাহসী বীরের কাহিনী। স্পেনীয়-সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডবাসীদের বিদ্রোহ। সমকালীন ইতিহাসের এটা এক প্রত্যক্ষ দলিল। তার প্রতিটি রচনাই জীবনধর্মী ও হৃদয়গ্রাহী। গ্যেটের জীবনকাল থেকে আজকের দিন পর্যন্ত যে সত্য সূর্যকিরণের মতো জাজ্বল্যমান তাহলে কোনো স্বৈরাচারী দুর্ধর্ষ শাসকের কাছে গণতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধা বা অধিকারের কোনো মূল্য নেই। কতকাল আগে কতবড় সত্য তিনি মানুষের সামনে উপস্থিত করলেন তা বিস্ময়কর নয়কি!
সগ্রামী এই মহান লেখক জীবনের পথ পরিক্রমায় অনেক আলোকিত রাজপথ ছায়ান্ধ গলিপথে হেঁটেছেন একাধারে জীবনের জয়গান ও যেমন গেয়েছেন একেকসময় জীবন থেকে পালাতেও চেষ্টা করেছেন। জীবন সায়াহ্নে এসে তার বলা আমি কোথায় চলেছি-তা আমি জানি না। শৈশব হতে বাল্যে, বাল্য থেকে যৌবনে আমার সারা জীবন ধরে কী খুঁজে চলেছি? পাহাড়ে প্রান্তরে, জলে-স্থলে, সুন্দরে-অসুন্দরে, রূপে অরূপে, ইন্দ্রিয় ও অতীন্দ্রিয়ের মাঝে কি খুঁজেছি আমি? যা খুঁজেছি তা কি আমি পেয়েছি কোনোদিন! তাকি কেউ পায়? গাড়ি এগিয়ে চলেছে। চালকের হাতে লাগাম ধরা। আমার মনে হলো, কোনো এক অদৃশ্য দেবতার দ্বারা প্রহৃত হতে হতে অবিরাম কালের অশ্ব ছুটে চলেছে সারা বিশ্ব জীবনের বিপুলায়তন বেগভার নিয়ে। সেই আশ্চর্য অশ্বের লাগাম ধরার শক্তি সবার নেই। হয়তো কোনো মানুষের নেই। তবু মানুষের মতো বাঁচতে হলে সে লাগামটা শক্ত মুঠিতে ধরে রাখতেই হবে। জীবনের সার সত্য জানতে হলে গ্যেটের রচনার সাথে পরিচিত হওয়া আবশ্যক-সেই তাগিদেই আমাদের এহেন উদ্যোগ। পাঠক যদি তাতে সামান্যতম উপকৃত হন আমাদের পরিশ্রম সার্থক বলে মনে করব।
তপন রুদ্র
ভূমিকা
কবিতা, নাটক, গল্প-উপন্যাস প্রভৃতি সাহিত্যের বিচিত্র খাতে গ্যেটের প্রতিভা সমান সাবলীলতার সঙ্গে প্রবাহিত হলেও তাঁর অমর কাব্য-নাটক ফাউস্ট তাঁর এমনই এক শীষস্থানীয় সৃষ্টি যার জন্য এক বিশ্ববিশ্রুত মর্যাদায় আজও অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন। তিনি। দান্তে এবং মিলটনের মতো গ্যেটেও শুধু একটি বিশেষ সৃষ্টির জন্যই এক সুচিরকালীন আবেদনের অক্ষয় গৌরবতিলকে পরিচিহ্নিত হয়ে আছেন আজও। ফাউস্টের আবেদনের এই অন্তহীন বিপুলতা ও বিশ্বজনীনতার প্রধানতম কারণ এই যে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ হতে উনিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত এক শতাব্দীকাল ধরে যে যুগমানস আধুনিক ভাবধারা ও জীবনাদর্শের প্রেক্ষিতটিকে গড়ে তোলে সে যুগমানসটিকে তার আনুষঙ্গিক আত্মিক সমস্যা ও সংকটসমূহের সঙ্গে এই কাব্য নাটকটির মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রতিভাত করে তোলেন গ্যেটে।
ইউরোপীয় নবজাগরণ সত্যানুসন্ধিৎসার এক সুতীব্র সার্চলাইট ফেলে যুগান্তব্যাপী কুসংস্কারের অন্ধকার ছিন্নভিন্ন করে মানুষের স্বাধীন চিন্তার বিকাশের পথে বাধাগুলোকে অপসারিত করতে থাকে। বিজ্ঞানের আবিষ্কার ও বিজ্ঞানজনিত যুক্তিবাদ এক বিরাট ব্যাপ্তি দান করে সে অনুসন্ধিৎসার আলোকে। গ্যেটে যে যুগের আবহাওয়ায় মানুষ হন সে যুগের আকাশে-বাতাসে জীবনজিজ্ঞাসার এক সর্বব্যাপী আবেগ ভেসে বেড়াত অশান্ত তীব্রতায়। লিপজিগ ও স্ট্রসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় যুক্তিবাদী চিন্তাভাবনা ধীরে ধীরে সংশয়বাদের দিকে নিয়ে যায় তাঁর মনকে। প্যারাসেলসাস ও ব্রুনোর প্রকৃতিবাদী দর্শনের দ্বারা বেশকিছুটা প্রভাবিত হয়ে ধর্মগত সত্যের সর্বাত্মকতায় ও সার্বভৌম ক্ষমতায় সন্দিহান হয়ে ওঠে তার মন। ধর্মের প্রথাগত নিরাপদ সীমার মধ্যে জীবন ও জগতের যে সত্য একদিন এক সুস্থিত অস্তিত্বে প্রকটিত ও এক সুদীর্ঘকালীন নিশ্চয়তার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল সে সত্যের ভাবমূর্তিটিকে এক সুতীক্ষ্ণ প্রশ্নের শায়ক দিয়ে বার বার বিদ্ধ করতে থাকেন গ্যেটে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় এই সময় বলেন তিনি ঈশ্বরবিশ্বাসী হলেও ধর্মান্থতা পছন্দ করেন না।
১৫৮৭ সালে প্রকাশিত ফ্রাঙ্কফুট ফাউস্ট বুক’ ও মার্লোর লেখা ‘ট্রাজিকাল হিস্ট্রি অফ ডক্টর ফস্টাসে’ ফাউস্টের উদ্ভুত জীবনকাহিনী পড়ে ছাত্রাবস্থা থেকেই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন গ্যেটে। শুধু ফাউস্ট নয়, যে সব পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক পুরুষপ্রবর তাঁদের সুমহান ব্যক্তিত্বের আশ্চর্য বলিষ্ঠতাটিকে প্রথাগত ধর্মের একাধিপত্য হতে মুক্ত হতে প্রচলিত মূল্যবোধকে হেলাভরে অস্বীকার ও অগ্রাহ্য করে আত্মস্বাতন্ত্রের উদার উন্মুক্ত আকাশে মাথা তুলে এক অন্তহীন স্পর্ধায় দুহাত বাড়িয়ে জীবনের সত্যকে নূতনভাবে বুঝতে চেয়েছেন, জীবন ও জগৎকে নূতনভাবে বুঝতে চেয়েছেন, সেই প্রমিথিয়ুস, সিজার, মহম্মদ প্রমুখদের দ্বারাও আকৃষ্ট হয়েছেন তিনি। তাঁদের নিয়ে কিছু না কিছু লিখতে চেয়েছেন।
