সিনক্লেয়ার বলল, প্রথম তিন শ্রেণীর নারীরা সংসারে ও সমাজে বিভিন্ন প্রভাব বিস্তার করে।
হেনরিয়েত্তা বলল, আর যে কোনও দিকে আমাদের কর্মক্ষেত্র প্রসারিত হতে পারে?
সিনক্লেয়ার বলল, হতে পারে অনেক দিকে। আমি বলছি এক শ্রেণীর মেয়েদের কথা যারা কোনও কাজই করে না। যারা কুঁড়ে অকর্মণ্য, তারা কোনও কাজ না করেও শুধু অন্যদের কাজে বাধা সৃষ্টি করে এক ধরনের প্রভুত্ব অর্জন করে।
হেনরিয়েত্তা বলল, কিন্তু তোমার চতুর্থ শ্রেণীর নারীর খবর কি? তার কথা বলো।
সিনক্লেয়ার বলল, আমাদের দেশের কথা বলছি না। কিন্তু এখনও এমন অনেক দেশ আছে সেখানকার নারীরা স্বাধীনতা পায়নি। তারা সব সময় বিষাদে আচ্ছন্ন। থাকে। অবশ্য আমাদের প্রতিবেশী কোনও কোনও দেশে এমন অনেক মেয়ে আছে যাদের অকারণে মুখটা সব সময় ভার-ভার থাকে। তারা কাউকে শান্তি দিতে পারে না। নিজেরাও শান্তি পায় না। এই বিষাদ একটা রোগ, এই রোগ কিছুটা শারীরিক, কিছুটা মানসিক। আমি এ বিষয়ে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম।
সিনক্লেয়ার বলল, কিন্তু আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হলো। আমি ভেবেছিলাম এই ক্লাবে বিভিন্ন রকমের লোক আসে। তাদের কেউ না কেউ আমার ছবিগুলোর অর্থ ঠিকমতো ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেবে। কিন্তু এর আগে মেয়েদের এই ছবিগুলোকে সবাই শুধু অহেতুক গালাগালি দিল। কেউ বোঝার চেষ্টাও করল না। সুতরাং আমি বিদায় নিচ্ছি।
আর্মিদোরো সিনক্লেয়ারকে লক্ষ করে বলল, তোমার ইচ্ছাই পূরণ হলো। আজকে যা যা আলোচনা হয়েছে আমি তার সব নোট নিয়ে রেখেছি। পরে সেগুলো সম্পাদনা করলে দেখা যাবে শিল্পী মেয়েদের অকারণে আক্রমণ করেননি। মেয়েদের ব্যঙ্গ করে যে ছবিগুলো এঁকেছেন আর একটা করে অর্থ আছে। সবাই ভালো মেয়ে নয়।
হেনরিয়েত্তা প্রতিবাদের সুরে বলল, এটা কিন্তু ঠিক কাজ করনি আর্মিদোরো। আমরা সহজভাবে ভোলা মন নিয়ে মেলামেশা করি। কিন্তু অসতর্ক মুহূর্তে বলে ফেলা আমাদের কথাগুলো যদি লিখে রাখো এবং সেগুলোকে ছেপে আর পাঁচজনকে মজা দান করো তাহলে সেটা কিন্তু ভালো হয় না।
প্রসঙ্গ কথা / ভূমিকা
আমরা গ্যেটের রচনাসমগ্র প্রকাশ করছি। বিশ্বের ধ্রুপদী সাহিত্যের যে সিরিজ প্রকাশনার সংকল্প করেছি তার অন্যতম এই রচনাসমগ্র। মহামতি গ্যেটের রচনা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকলে একটা শতাব্দীকাল সময়ের ভাবনার সাথে পাঠকের অসম্পৃক্ততা থেকে যাবে। ইউরোপে এমন এক ক্রান্তিকালে গ্যেটে জন্মগ্রহণ করেছিলেন–যে সময় গির্জা ও যাজকদের ছিল অপ্রতিবোধ্য দাপট। ভালোমন্দ যাই হোক তাদের বিরুদ্ধে মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেশের রাজন্যবর্গেরও সাধ্যে কুলাতো না। ইতোপূর্বে গির্জার সিদ্ধান্তে বিশ্ব স্বীকৃত মহান মানুষদেরও কারাভোগ, নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। অনেককে অগ্নিদগ্ধ কিংবা বিষ পান করিয়ে জীবন হনন করাও হয়েছিল। প্রাচীন দুটি গ্রন্থ ফ্রাংকফুট ফাউস্ট বুক এবং ট্র্যাজিক্যাল হিস্ট্রি অব ডকটর ফন্টাসে থেকে গ্যেটে ফাউস্টের অভূতপূর্ব জীবনকাহিনী অবগত হন। প্রথাগত ধর্মের আচার-আচরণের বাইরে বেরিয়ে আত্মস্বাতন্ত্রের বিশাল প্রান্তরে জীবনের জয়গান গেয়েছেন যাঁরা তাঁদের সকলের প্রতিই গ্যেটের সীমাহীন শ্রদ্ধা ছিল। ফাউস্ট সেই চিন্তার ফসল। ফাউস্ট ও মেফিস্টোফেলিস বিপরীত প্রান্তের দুটি প্রতীক-যথাক্রমে তারা শুভ ও অশুভের পতাকাবাহী। সত্যের বিরুদ্ধে অসত্য তা–সে যতবড় ক্ষমতাধারী হোক না কেন কোনো কালেই বিজয়ী হবে না ‘ফাউস্ট’ গীতিকাব্য মানুষের সম্মুখে এই উদাহরণ স্থাপন করেছে। তাই ফাউস্ট না জানলে মানব জীবনের সার সত্যটি জানা দুষ্কর।
প্রথাবদ্ধ ধর্মের ধ্বজাধারীরা যখন প্রবল বিক্রমে ইউরোপে আধিপত্য বিস্তার করেছিল–সেই সময়ের জাতক মহামতি গ্যেটের মনে সংশয়বাদের উদ্ভব হয়। এরজন্য তাঁকে কম মূল্য দিতে হয়নি। ফাউস্টের দুটি খণ্ড রচনা করতে তার প্রায় তিরিশ বছর সময় ব্যয় করতে হয়। দীর্ঘ সেই সময়ে দেশ, কাল, প্রথা ও জীবনযাপনে, নিত্য-প্রক্রিয়ায় তাঁকে লড়াই করতে হয়েছে প্রতিদিনই।
ফাউস্টের ভূমিকায় অনুবাদক অতি সত্য যে কথাটি বলেছেন–তাহলো বিজ্ঞান আজকের মানুষকে যে ক্ষমতা দান করেছে, মানুষ সে শক্তির সীমাকে মানতে চাইছে না। অসাধ্য সাধনের যে উদ্ধত প্রয়াস মানুষের জ্ঞান ও শক্তিগত সীমাকে অস্বীকার করে আধুনিক মানুষের আত্মার সংকটকে ঘনীভূত করে তুলেছে, দ্বিধাবিভক্ত করে তুলেছে তার অন্তরাত্মাকে, মেফিস্টোফেলিস হলো সেই প্রয়াসের প্রতীক। ফাউস্টের মতো আমরা যখন বুঝতে পারি–আমাদের কর্মময় সংগ্রামশীল-আত্মশক্তির বৃথা অপচয় করে-সীমাহীন-তলহীন উদ্দেশ্যহীন শূন্যতার মাঝে যে অলীক নিশ্চয়তাকে হাত প্রসারিত করে ধরতে যাচ্ছি সে নিশ্চয়তা হলো আত্মপ্রতারণারই নামান্তর। তখন আর কোনো উপায় থাকে না। সারা জীবনের সকল ভ্রান্তির প্রান্তসীমায় এসে আমরা যখন উপস্থিত হই তখন দেখতে পাই-দিগন্ত যেথায় উদ্ভাসিত তিমিরাবৃত মৃত্যুর এক ভয়াল মূর্তি–মৃত্যু তো অজ্ঞতা ছাড়া কিছু নয়। দেখি–ক্লান্ত জীবনের একদার বহমান নদীটি আগেই ঢলে পড়েছে কুয়াশালীন-সমুদ্রের গভীর ইন্দ্রনীল কোলে। এরচেয়ে চরম সত্য আর কী হতে পারে।
