আর্মিদোরো তখন বলল, আর লিখতে গিয়ে সে হয়তো দোয়াতটাকে রাখতে ভুলে গিয়েছিল।
আমেলিয়া বলল, মেয়েটির সব চিঠিগুলো আমার কাছে আছে। এই সব চিঠিতে তার বাস্তব অভিজ্ঞতার কথাগুলো, যেমন তার প্রেম, মা হবার ভয়, তার সন্তানপ্রসব, তার স্বামীর ফিরে আসা এবং তার বিয়ে কল্পনাসমৃদ্ধ করে লেখা হয়েছে। তার বিয়ের দিনে শেষ হয় তার কাহিনী যে কাহিনী আপনারা গতকাল শুনেছেন।
লিটল বলল, আগেকার কালে ডায়েরি রাখার প্রচলন ছিল। কিন্তু এখন এটা সেকেলে ব্যাপার হয়ে গেছে। আমি জানি এক শিক্ষয়িত্রী ডায়েরি রাখত। রোজকার ঘটনা যথাযথভাবে ডায়েরিতে লেখা তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। কোনও কথা সে গোপন রাখত না। সব ডায়েরিতে লিখত আর মাঝে মাঝে তা পড়ে সবাইকে শোনাত। কিন্তু ডায়েরিটা হাতছাড়া করত না কখনও। কাউকে দিতও না। একদিন ডায়েরিটা তার স্বামীর হাতে পড়ে এবং সে কৌতূহলবশত তা পড়তে পড়তে এমন কতকগুলো কথার সম্মুখীন হয় যাতে তার ডায়েরি পড়ার সব আনন্দ চিরদিনের মতো চলে যায়।
হেনরিয়েত্তা বলল, আমাদের আলোচনা কিন্তু সৎ মেয়েদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। অবাঞ্ছিত মেয়েদের কোনো কথা আমরা বলতে বা শুনতে চাই না।
লিটন বলল, কেন, ভালো-মন্দ সব রকম মেয়ের কথাই ধরা উচিত।
সিনক্লেয়ার বলল, তাহলে তো ক্যালেন্ডারের এই ছবিগুলো ঠিকই নির্বাচিত হয়েছে। এতে ভালো-মন্দ সব রকম মেয়ের ছবিই আছে।
আমেলিয়া বলল, এই ক্যালেন্ডারের শিল্পী যেমন বাজে মেয়েদের ছবি নিয়ে আমাদের নারীজাতির অপমান করেছে তেমনি আমি চাই এমন কতকগুলো মেয়ের ছবি ও ইতিবৃত্ত সংগ্রহ করতে যারা সংসারের মুকুটমণি, যে সব নারীদের সদগুণাবলি সংসারকে সুন্দর করে তোলে।
লিটন বলল, তাহলে বলি শোনো। একবার একটি যুবক একটি হোটেল লিজ নিয়ে চালাতে শুরু করে। সে সকলের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করত। তবে তার মদ খাওয়ার অভ্যাস থাকায় রোজ একবার করে মদের দোকানে যেত। কিন্তু নিজের দৈনন্দিন কাজকর্মে কোনও অবহেলা করত না। সে যথাসময়ে বিয়ে করে। তার স্ত্রী ছিল খুব বুদ্ধিমতী আর হিসেবী। যুবকটি কিন্তু ব্যবসাগত লেনদেন বা টাকা-পয়সার কোনও হিসাবে রাখত না। তার উপর কিছু বাজে খরচ এবং দানও করত। হোটেলের বাসিন্দারা যখন কোনও মোটা টাকা দিত যুবকটিকে, সে তখন সে টাকা জমা করে ব্যাঙ্কে রাখার ব্যবস্থা করত না, তার থেকেই খরচ করতে শুরু করে দিত। খরচ করতে করতে টাকাটা ফুরিয়ে যেত। এইভাবে সে সমস্ত আয় খরচ করে ফেলত। একটা পয়সাও সঞ্চয় করতে পারেনি কারবার থেকে। তার বুদ্ধিমতী স্ত্রী এইসব ভালোভাবে দিনের পর দিন লক্ষ করে একটা মতলব আঁটল। সে তার স্বামীর টাকা থেকে রোজ কিছু করে গোপনে সরিয়ে রাখতে লাগল। তার স্বামী কিছুই টের পেল না। এইভাবে সে অনেক টাকা জমাল। প্রথমে অল্প অল্প পরে বেশি করে সরাতে লাগল। একদিন তার স্বামী টাকার টানাটানিতে পড়ল। তার স্ত্রীর কাছে এসে যুবকটি বলল, বাড়িওয়ালার ভাড়া দিতে হবে, অথচ টাকা নেই ক্যাশে। কি করে কি হলো, কি করে সব টাকা ফুরিয়ে গেল তা বুঝতে পারছি না। কোন হিসেব না রাখার জন্য তার স্ত্রী তাকে অনেক তিরস্কার করল। লোকটি তার ভুল স্বীকার করল। তারপর স্ত্রী ঘর থেকে অনেক টাকা বার করে আনল। সে যত টাকা এতদিন ধরে সরিয়েছে তা সব হিসেব করে গুছিয়ে রেখেছে। সে টাকায় সব ঋণ শোধ করেও অনেক বেচে রইল। এরপর থেকে যুবকটি টাকা-পয়সার সব ভার তার স্ত্রীর উপর ছেড়ে দিল। তার স্ত্রীর তার হিসেবী বুদ্ধির দ্বারা সঞ্চয়ের মাত্রা বাড়িয়ে সেই টাকায় গোটা হোটেলটা বাড়িওয়ালার কাছ থেকে কিনে নিল। সুখে-শান্তি উজ্জ্বল হয়ে উঠল তাদের সংসার। মেয়েটির নাম ছিল মার্গারেট।
সিনক্লেয়ার বলল, এখন দেখছি মেয়েটির সমস্ত প্রেম, সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততার উদ্দেশ্য হলো সংসারের সব কর্তৃত্বভাব অর্জন করা। নারীদের প্রভুত্বপৃহা সম্বন্ধে তোমার মতামত আমি জানতে চাই।
আর্মিদোররা বলল, আমেলিয়া, তুমি লেখিকা হিসাবে নিজের জাত সম্পর্কে নিরপেক্ষ। তোমার লেখায় নারীজাতিকে বড় করার বা তাদের দোষ ঢাকার কোনও প্রচেষ্টা নেই।
আমেলিয়া বলল, দেখুন, আপনারা যাকে প্রভুত্ব বলছেন তা এক স্বাধীনতা কামনা বা স্বাতন্ত্র্যবোধ ছাড়া কিছুই নয়। নিজের প্রভুত্ব সবাই উপভোগ করতে চায়। সব মানুষই তাই চায়। নারীরাও মানুষ। কিন্তু সমাজে পুরুষের স্বাধীনতা ও প্রভুত্ব বেশি বলে নারীদের কোথাও কোনো প্রভুত্ব দেখলে সেটা বেশি চোখে পড়ে। তাই নারীরা একবার অতি কষ্টে কোনওরকমে প্রভুত্ব পেয়ে গেলে জোর কামড় দিয়ে ধরে থাকে, ছাড়তে চায় না।
লিটন বলল, যে সব মেয়েরা কর্মঠ, পরিশ্রমী এবং সঞ্চয়ী তারা ঘরে প্রভুত্ব অর্জন করে। সংসারের সব কর্তৃত্ব তাদেরই হাতে আসে। আর যারা সুন্দরী তাদের প্রভুত্বের ক্ষেত্র প্রসারিত হয় সারা সমাজের সর্বত্র। তাদের সব জায়গায় জয়। আবার যারা কোনও না কোনও বিষয়ে কৃতিত্ব অর্জন করছে তারাও সমাজের এক বিশেষ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা ও প্রভুত্ব লাভ করে।
আমেলিয়া বলল, তাহলে আমরা তিন শ্রেণীতে বিভক্ত।
সিনক্লেয়ার বলল, কিন্তু সব নারী এই তিন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত নয়। এর বাইরেও এক শ্রেণীর নারী আছে। তাদের কথা ধরলে নারীজাতির প্রতি আমাদের সব প্রশংসা নিন্দায় পরিণত হবে।
