ফার্দিনান্দ আর কার্দানো ছিল সামন্ত পরিবারের দুটি যুবক। ছোট থেকেই বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে তাদের মধ্যে। রাজসভার লোক থেকে সামরিক অফিসার হয় তারা দুজনেই। একসঙ্গে দুজনে নানা ধরনের প্রচুর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে। কার্দানোর কাছে একমাত্র আকর্ষণের বস্তু ছিল সুন্দরী মেয়ে। ফার্দিনান্দ ভালোবাসত খেলাধুলা। কার্দানো ছিল উদ্ধত ও দাম্ভিকপ্রকৃতির। অন্য বন্ধুটি ছিল সন্দেহপ্রবণ এবং স্বল্পভাষী।
কার্দানোর স্বভাবটা ছিল বড় অদ্ভুত। সে একের পর এক এক-একটি মেয়েকে ভালোবাসত আর কিছুদিন পর তাদের ছেড়ে দিত। আর প্রতিবারই একটি মেয়েকে ছেড়ে যাবার সময় একটি কুকুরকে রেখে যেত তার কাছে।
ক্রমে ফার্দিনান্দ কার্দানোর এই স্বভাবের কথা জানতে পারে। কিন্তু সেদিকে তার কোনও আগ্রহ ছিল না। সে নিজে যথাসময়ে বিয়ে-থা করে ঘর-সংসারে মন দেয়। এমন সময় কার্দানো একবার তার বাড়িতে ও তাদের পাড়ায় এসে কিছুদিন থাকে।
কার্দানো তার বাড়ি থেকে চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে তার স্ত্রীর কাছে একটি মনোরম কুকুর দেখে আশ্চর্য হয়ে যায় ফার্দিনান্দ। সঙ্গে সঙ্গে আগ্রহ সহকারে তার স্ত্রীর কাছে জানতে চায় এ কুকুর কোথায় সে পেল। তার স্ত্রী তখন বলে, কার্দানো যাবার সময় এটা তাকে দিয়ে গেছে।
মুহূর্ত মধ্যে মাথাটা ঘুরে যায় ফার্দিনান্দের। কুকুরটা কোল থেকে সজোরে ফেলে দেয় মাটিতে। রাগে গর্জন করতে করতে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। কার্দানোর নোংরা স্বভাবের কথাটা মনে পড়ে যায় তার আর সঙ্গে সঙ্গে সন্দেহ জাগে স্ত্রীর চরিত্রের উপর। তার মনে হয় নিশ্চয় কার্দানো গোপনে আসক্ত ছিল তার স্ত্রীর প্রতি। তার স্ত্রীকে ভালোবাসত সে এবং অন্যক্ষেত্রের মতো এক্ষেত্রেও সে তার ব্যর্থ প্রেমের প্রতীকস্বরূপ রেখে গেছে এই কুকুরটা।
কারো কোনও আবেদন-নিবেদনে কাজ হলো না। প্রকাশ্যে বিবাহবিচ্ছেদ না করলেও দাম্পত্যসম্পর্ক ছিন্ন করে চলে গেল ফার্দিনান্দ।
আর্মিদোরোর গল্প শেষ হতেই ঘরে ঢুকল আমেলিয়া। সে একজন গুণবতী মহিলা এবং নামকরা লেখিকা। তার সঙ্গ সবাই চায়। সে ঘরে ঢুকতেই ছবিগুলো তাকে দেখিয়ে তার মতামত চাওয়া হলো।
আমেলিয়া বলল, এই ছবিগুলো ক্যালেন্ডারে ছাপার জন্য ঠিক হয়েছে। তবে কোনও লেখক এর অর্থ বলতে পারবে না।
সিনক্লেয়ারও তাই মনে করে। ছবিগুলো একেবারে নিন্দার যোগ্য নয়। প্রত্যেকটা ছবির একটা করে নাম আছে। কিন্তু সেগুলো ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিতে হবে। তা না হলে শিল্পীর উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।
আমেলিয়া বলল, প্রথমেই একটি ছবির কথা ধরো। এতে আছে এক যুবতী কোনও কিছু লিখতে লিখতে তার আর্মচেয়ারে ঘুমিয়ে পড়েছে। আর একটি নারী তার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে একটি ছোট্ট বাক্স তার সঙ্গীর হাতে তুলে দিচ্ছে। এর অর্থ কী?
সিনক্লেয়ার বলল, আমি এর অর্থ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে দেখব কি? আমার মনে হয়, যে মেয়েটি ঘুমিয়ে পড়েছে সে একজন লেখিকা আর তার পাশে যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে সে তার মহিলাভৃত্য, তার হাতে আছে একটা দোয়াত যাতে লেখিকা ঘুম থেকে উঠেই আবার তার লেখা শুরু করতে পারে।
কিন্তু ক্লাবের অন্যতম সদস্য প্রতিভাবান শিল্পী আর্বন এ অর্থ মেনে নিতে পারল না। সে বলল, প্রত্যেক লেখক বা লেখিকার দোয়াত রাখার জায়গা থাকে। কিন্তু এখানে একজন ভৃত্যের হাতে দোয়াত রাখার প্রয়োজন কি? তাছাড়া যখন তার কোনও প্রয়োজনই নেই, যখন লেখিকা লেখার কাজ করছে না তখন তার দোয়াত ধরে দাঁড়িয়ে থাকার অর্থ কি এবং তার চোখের জল মোছারই বা অর্থ কি হতে পারে?
হেনবিয়েত্তাও একথা সমর্থন করল। সিনক্লেয়ার বলল, আমি শিল্পীর সমর্থনে শুধু এই কথাই বলতে চাই যে শিল্পী ইচ্ছা করেই একটা হেঁয়ালি রেখেছে যাতে দর্শকরা ও সমঝদারেরা কিছু একটা কল্পনা করতে পারে।
আর্বন বলল, আমার মতে যাদের ছবি আঁকা হয়েছে সেই সব মূর্তির মুখে অল্প করে কথা লিখে দিতে বলো। তাহলে ব্যাপারটা বুঝতে পারা যেত।
সিনক্লেয়ার বলল, এমন ছবি বুদ্ধিমানের জন্য। যে-সে এমন ছবির অর্থ বুঝতে পারবে না। একমাত্র বুদ্ধিমানরাই এর থেকে বুদ্ধিগত আনন্দ লাভ করতে পারে।
আর্মিদোরো বলল, ঐ অশ্লীল ছবিগুলো নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে? ওগুলো ভালো ছবি হলে এতক্ষণে সরিয়ে রাখা হতো।
আমেলিয়া বলল, এই ছবিগুলো ক্যালেন্ডারে ছাপা হলেও একবার দেখার সঙ্গে সঙ্গেই এ ক্যালেন্ডার কেউ কারও হাতে উপহার হিসাবে তুলে দিতে পারবে না। কোনও লোক ছেলেমেয়দের জন্য ঘরে নিয়ে যাবে না।
আর্মিদোরো বলল, আমার একটা প্রস্তাব আছে। আমাদের যে লেখিকা রয়েছে। সেই আমেলিয়া এর ব্যাখ্যা করে এই ছবিগুলোর ভালো দিকটাকে দেখাবে।
সিনক্লেয়ারও এ প্রস্তাব সমর্থন করল। বলল, ওঁর ফেয়ারি টেল গল্পটা আমরা গতকাল বিশেষভাবে উপভোগ করেছি।
আমেলিয়া বলল, গল্পটা আমার নয়। আমার এক বান্ধবীর।
আর্মিদোরো বলল, এ গল্পের উৎসের কথা জানতে আশ্চর্য হয়ে যাবেন আপনারা।
আমেলিয়া সে কাহিনী শুরু করল।
আমি একবার এক জায়গায় বেড়াতে গিয়ে একটি মেয়ের সঙ্গে পরিচিত হই। তার কতকগুলো সদগুণ ছিল। সে একবার দারুণ বিপদে পড়ে। মেয়েটি এক ভদ্রলোকের। সঙ্গে কয়েকটি কারণে বাধ্যবাধকতার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। লোকটি অবশ্য মেয়েটিকে বিয়ে করবে বলে কথা দেয়। কিন্তু বিয়ের আগেই মেয়েটির মনে বিশ্বাস উৎপাদন করে দেহসংসর্গে লিপ্ত হয় ভদ্রলোক।এমন সময় অবস্থার তাড়নায় ভদ্রলোককে ফ্রান্স যেতে হয়। অথচ মেয়েটি তখন তার গ্রামের বাড়িতে সব সময় এই ভয় করছিল যে বুঝিবা সে মা হতে চলেছে। মেয়েটি তার সব কথা চিঠির মাধ্যমে আমাকে জানাত। আমি তাকে ধৈর্য ধারণ করতে উপদেশ দিতাম। আমি তাকে প্রায়ই এই কথা বলতাম যে যদি তার সন্তান হয় তাহলে বিচলিত হলে চলবে না। তাকে তার মার কর্তব্য পালন করে যেতেই হবে। আমি তাকে কতকগুলো রূপকথার গল্প সাজিয়ে দিয়েছিলাম। ফলে সে এইগুলো পড়ে সময় কাটাতে পারত। বর্তমান জীবনের দুর্বিষহ অবস্থায় ও নানারকমের দুশ্চিন্তায় মনটা যখন তার হাঁপিয়ে উঠেছিল তখন আমার পাঠানো রূপকথাগুলো পেয়ে সে খুশি হলো। সে একজন কল্পনার জগৎ খুঁজে পেল। সে তখন তার অতীত জীবনের যত সব সুখ-দুঃখের কথা লেখার চেষ্টা করতে লাগল।
