লিটন বলল, আমার মতে এখানে এক কুকুরপ্রীতির পরিচয় দেওয়া হয়েছে, তাও কোনও শিল্পসম্মত উপায়ে হয়নি।
আমেলিয়া বলল, এ কথায় আমার কোনও আপত্তি নেই। আমি আবার ঐ জন্তুটাকে দেখতে পারি না।
সিনক্লেয়ার বলল, তাহলে বলতে হবে আপনি ব্যঙ্গচিত্রের শত্রু। আর কুকুর জাতিরও মিত্র নন।
আমেলিয়া বলল, কেন কুকুররা তো মানুষদেরই এক ব্যঙ্গাত্মক রূপ।
লিটন বলল, তোমার হয়ত মনে আছে কোনো এক নাবিক এক শহর সম্বন্ধে বলেছিল সে শহরে শুধু কুকুর আর আধ-পাগলা কতকগুলো বোকা লোক থাকে।
সিনক্লেয়ার বলল, পশুদের প্রতি আমাদের আসক্তি আমাদের স্বাভাবিক স্নেহমমতার আবেগকে কমিয়ে দেয়।
আমেলিয়া বলল, কুকুরদের সামনে আমাদের আবার যুক্তিবোধ বজায় থাকে না।
সিনক্লেয়ার বলল, একমাত্র মাদাম লিটন ছাড়া এখানে আর কারও কুকুরের প্রতি আসক্তি নেই। উনি ওঁর সুন্দর গ্ৰেহাউন্ডটার প্রতি খুব বেশি আসক্ত।
লিটন বলল, এ আসক্তি আমারও আছে। আমি একটা প্রমাণ দিতে পারি জন্তুরা কি ভাবে মানুষের মনকে তাদের প্রেমের বস্তু হতে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
এই বলে লিটন তার স্ত্রীর মত নিয়ে গল্প বলতে শুরু করে দিল।
আমি একটি মেয়েকে ভালোবাসতাম। আমাদের বিয়ের একরকম ঠিক হয়ে গিয়েছিল। এমন সময় হঠাৎ কোনো এক জরুরি কাজের জন্য দূর দেশে যেতে হলো আমায়। সেখানে আমাকে বেশ কিছুদিন থাকতে হলো। যাবার সময় আমি আমার গ্ৰেহাউন্ড কুকুরটাকে নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিলাম। কুকুরটা আমার প্রেমিকার বাড়িটা জানত। আমার সঙ্গে সে বহুবার তাদের বাড়ি গিয়েছে। তাই আমার অবর্তমানে সে আমার প্রেমিকার বাড়িতে রয়ে গেল। আমার প্রেমিকাও কুকুরটাকে খুব ভালোবাসত। তার সাহচর্যে আনন্দ পেত। আর কুকুটার নাম ছিল মেটা। প্রথম প্রথম সে আমার প্রেমিকার কাছে ভালোই ছিল। সে জানত আমি শীগগির ফিরে আসব। কিন্তু আমার যখন ফেরার কথা ছিল তখন ফিরতে পারলাম না। অনেক দেরি হতে লাগল। তখন কুকুরটা আমার জন্য ভেবে ভেবে মারা গেল।
এদিকে আমি আর আমার কুকুরটা না থাকায় আমার প্রেমিকার নিঃসঙ্গতা অসহ্য হয়ে উঠল। বাড়িতে মন টিকত না তার। এমন সময় একটি যুবক তার বাড়িতে প্রায়ই আসা-যাওয়া করত। বাড়িতে ও বেড়াতে যাবার সময় তাকে সঙ্গ দান করত। তবু কিন্তু কুকুরটার কথা ভুলতে পারল না আমার প্রেমিকা।
আমাদের পাড়ায় আমার এক বিচক্ষণ বন্ধু ছিল। তারও একটা গ্ৰেহাউন্ড কুকুর ছিল। কুকুরটা দেখতে ছিল আমার কুকুরের মতো। সে একদিন কুকুরটা নিয়ে আমার প্রেমিকার বাড়িতে যেতেই আমার প্রেমিকার মনে হলো সেই মরা কুকুরটা যেন আবার ফিরে এসেছে। সে খুশি হয়ে কুকুরটাকে বাড়িতে রেখে দিল। কুকুরটাকে দেখে আমার কথা ও আমার সেই কুকুরটার কথা তার মনে হলো। তার সব দুঃখ দূর হয়ে গেল।
আমি ফিরে এসে দেখলাম আমার কুকুরটাই যেন আমার প্রেমিকার বাড়িতে রয়েছে। কিন্তু সে আমাকে আসতে দেখে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল। তা দেখে বললাম প্রাচীনকালের সেই বিশ্বস্ততা আমাদের কুকুরটা ভুলে গেছে। বিশ বছর পরেও ইউলিসেসকে দেখে চিনতে পেরেছিল তার কুকুর। আমার প্রেমিকা তখন বলল, তবে ওই কুকুরই তোমার পেনিলোপের সতীত্ব রক্ষা করেছে।
কথাটার মানে পরে আমাকে বুঝিয়ে বললে আমি সব বুঝতে পারলাম। আমার প্রেমিকার বিশ্বস্ততায় আমি খুশি হলাম। আমাদের প্রেমসম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়ে উঠল।
এমন সময় মাদাম লিটন তার স্বামীকে বলল, তুমি তো এখন নিশ্চয়ই তাস খেলবে, আমি ইতিমধ্যে ঘণ্টাখানেকের জন্যে বেড়িয়ে আসি।
লিটন তার স্ত্রীর হাত ধরে দরজার কাছ পর্যন্ত এগিয়ে বলল, কুকুরটাকেও নিয়ে যাও প্রিয়তমা।
তখন উপস্থিত সকলে এ গল্পের তাৎপর্য বুঝতে পেরে হাসতে লাগল। সিনক্লেয়ার বলল, তুমি এমন একটি কাহিনী বললে, যা তোমাদের বিবাহে সাহায্য করেছে। কিন্তু আমি একটি কাহিনী জানি যাতে দেখবে কুকুরের প্রভাব একটি প্রেমসম্পর্ককে নষ্ট করে বিবাহের প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। গল্পটা বলি।
আমি একটি মেয়েকে ভালোবাসতাম। আমার ভাগ্যেও এমনি বাইরে যাবার ঘটনা ঘটে। আমিও যাবার সময় একটি কুকুর রেখে যাই আমার প্রেমাস্পদের কাছে। তবে আমাদের বিয়ের কথাটা পাকা হয়নি। আমি যথাসময়ে ফিরে এসে আমার প্রেমাস্পদের কাছে যাই। আমার ভ্রমণের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা থাকে শোনাতে ইচ্ছা হয় আমার। আমি বিশেষ উৎসাহ ও আগ্রহ নিয়ে তাকে সব কথা বলি। আমার ধারণা ছিল এ সব শুনে সে খুশি হবে। কিন্তু আমি দুঃখের সঙ্গে দেখলাম, আমার প্রেমিকা শুধু কুকুর নিয়েই ব্যস্ত। আমি তখনকার মতো চলে গিয়ে আবার ফিরে এলাম। এবারও দেখলাম তার সমস্ত মন জুড়ে আছে তার কুকুরের প্রতি এক অস্বাভাবিক প্রীতি আর মমতা। এমত অবস্থায় আমাদের প্রেমসম্পর্কে সমস্ত উত্তাপ ক্রমশ শীতল হয়ে এল। আমি একদিন সে সম্পর্ক ছিন্ন করে করে দিলাম এবং বুঝলাম এর একমাত্র কারণ হলো একটা কুকুর।
আর্মিদোরো পাশের ঘর থেকে এসে আলোচনায় আবার যোগদান করল। সে বলল, মানুষের উপর ইতর প্রাণীর প্রভাব নিয়ে যত গল্প আছে সেগুলো এক জায়গায় সংকলন করা উচিত। আমি একটি গল্প বলব যাতে দেখা যাবে একটি প্রাণী কিভাবে এক মর্মান্তিক ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
