সিনক্লেয়ার কোনও উত্তর না দিয়ে নীরবে শুধু হাসল। আমেলিয়া প্রথমে ধীর স্থিরভারে সিনক্লেয়ারকে দেখে নিয়ে বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে বলল, আমি ওর মুখ দেখে বুঝতে পারছি ও এমন কিছু দেখাবে যা আমাদের ভালো লাগবে না। পুরুষ মানুষরা সব সময় মেয়েদের এমন একটা কিছু খুঁজে বেড়ায় যা তাদের হাস্যস্পদ করে তুলবে।
সিনক্লেয়ার বলল, তুমি কথাটাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছ অ্যামেলিয়া, এবং বিদ্রূপ করতে চাইছ। আমি তাহলে দেখাব না ছবিগুলো। আমার প্যাকেট খুলব না।
হেনরিয়েত্তা বলল, না না, দেখাও, ছবিগুলো।
সিনক্লেয়ার বলল, আমরা ওদের শ্রেণীভুক্ত নই। ওদের সমাজ যেমন আমাদের ভালো লাগে না তেমনি ওদের ছবিগুলো না দেখলেও চলবে।
তবু সিনক্লেয়ার দেখতে চাইল ছবিগুলো আর হেনরিয়েত্তা সঙ্গে সঙ্গে সিনক্লেয়ারের হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে তার থেকে ছটা ছবি খুলে টেবিলের উপর রাখল। ছবিগুলো একবার দেখে তাসের মতো গুটিয়ে রাখল হেনরিয়েত্তা। নাকে এক টিপ নস্য নিয়ে বলল, চমৎকার! ছবিগুলো জীবন্ত দেখাচ্ছে। এই ছবিটা দেখে মনে হচ্ছে মাদাম অমুকের যার সঙ্গে আজ সন্ধের সময় দেখা হবে আমাদের। এই ছবিটা দেখে মনে হচ্ছে আমাদের বাবার পিসির মতো। এই সব ছবির মেয়েগুলো আকারে কুৎসিত হলেও মনে হচ্ছে এগুলো আমাদের চেনাজানা কোনও না কোনও মেয়ের থেকে তোলা।
আমেলিয়া কিন্তু কোনো আগ্রহ দেখাল না ছবিগুলোর উপর। সে তার চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল, এই সাদৃশ্যের কোনও মানে হয় না। কোনও কুৎসিত বিকৃত মেয়ের সঙ্গে কোনও কুৎসিত চেহারার মেয়েরই সাদৃশ্য থাকতে পারে, সুন্দরের সঙ্গে সুন্দরের সাদৃশ্য হয়। এদের সঙ্গে আমাদের কোনও মেয়েদের কোনও সাদৃশ্য থাকতে পারে না।
সিনক্লেয়ার বলল, কোনও কুৎসিত ও বিকৃত চেহারার লোকের ছবি থেকে আমরা যা মজা পেতে পারি, তত মজা কিন্তু কোনও সুন্দর লোকের ছবি থেকে তা পেতে পারি না।
আর্মিদোরো এতক্ষণ জানালার ধারে বসে সব কিছু শুনছিল। সে হঠাৎ বলে উঠল, সৌন্দর্য আমাদের মন উন্নত করে। কিন্তু অসুন্দর বা কুৎসিত আমাদের মনকে নিচে নামিয়ে আনে।
কথাটা বলেই সে আলোচনার টেবিলে না এসে পাশের ঘরে চলে গেল। সামার ক্লাবের সদস্যসংখ্যা এখন অনেক বেড়েছে। বিভিন্ন ধরনের ও বিভিন্ন বয়সের মানুষ এখানে আসে। একজনের সঙ্গে একজনের বন্ধুত্ব ও মেলামেশার সম্পর্ক ক্ষণস্থায়ী। কার প্রতি কার আগ্রহ বা আসক্তি কতদিন থাকবে তা কেউ বলতে পারে না। তবে যারা এখানে আসে তারা সাধারণ সূক্ষ্ম রুচির লোক। তারা পরস্পরের গুণ বা যোগ্যতার মূল্য দিতে কুণ্ঠিত হয় না। প্রত্যেক আপন আপন রুচি অনুসারে আমোদ-প্রমোদের উপকরণ গ্রহণ করে। তবে এখানে যে সব সাধারণ আলোচনা হয় তা প্রায় সকলেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
এই সময় লিটন নামে এক ভদ্রলোক তার স্ত্রীকে নিয়ে এসে হাজির হলো। ব্যবসার ব্যাপারে লিটনকে নানা জায়গায় ঘুরতে হয় এবং নানা লোকের সঙ্গে কথা বলতে হয়, এজন্য লিটনের অভিজ্ঞতা প্রচুর। তবে তাস খেলায় তার ভালো হাত আছে। তার স্ত্রীও একজন সুযোগ্য মহিলা। স্বামীর বিশেষ বিশ্বাসভাজন। তবে সে বাড়িতে একা একা থাকতে পারে না। তাই সময় পেলেই ক্লাবে বা কোনও সংগঠনে চলে আসে।
ক্লাবের সদস্যরা পরস্পরের পরিচিত হলেও এখানে তারা পাঠকের কাছে অপরিচিত আগন্তক হিসাবেই গণ্য হবে। আমরা তাদের সঙ্গে একে অনেক পরিচয় করিয়ে দেব।
লিটন টেবিলের কাছে এগিয়ে এসে ছবিগুলোর পানে তাকাল। হেনরিয়েত্তা বলল, আমাদের মধ্যে তর্ক বেধেছে। আমার মতে হাস্যকর কোনও বিকৃত চেহারার লোকের ছবির মধ্যে এমন কিছু একট আছে যা ছবির ভেতর আকর্ষণ করে আমাদের।
আমেলিয়া বলল, কারও অনুপস্থিতিতে নিন্দা করতেও খুব ভালো লাগে। সে নিন্দার একটা আকর্ষণ আছে।
হেনরিয়েত্তা বলল, কিন্তু যাই বলল, এই ছবিগুলো কি মনে রেখাপাত করে না?
আমেলিয়া বলল, আর এই জন্যই তো আমি এগুলো ঘৃণা করি। অবাঞ্ছিত বস্তু দুর্বার আকর্ষণই কি অশুভ শক্তির তো আমাদের জীবনকে বৃহত্তর আনন্দের ক্ষেত্র বলে টেনে নিয়ে সরিয়ে নিয়ে যায় না?
হেনরিয়েত্তা বলল, তোমার মতামত ব্যক্ত করো লিটন।
লিটন বলল, আমি তোমাদের মধ্যে শান্তি স্থাপন করব, বিরোধের অবসান ঘটাব। আমার কথা হলো, মানুষের মধ্যে ভালো-মন্দ দুই-ই আছে। শিল্পীরা যেমন সুন্দর দেবদূতের ছবি আঁকবে তেমনি তারা কালো কুৎসিত শয়তানদের ছবিও আঁকবে। সুতরাং তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই।
আমেলিয়া বলল, আমার কথা হচ্ছে ব্যঙ্গচিত্রের শিল্পীরা নিজেদের অধিকারের সীমা ছাড়িয়ে যায়। আমার আপত্তি সেইখানে।
লিটন বলল, তোমার কথা ঠিক। তবু আমি বলব যে সব শিল্পীরা শুধু সুন্দরের কারবার করে তারা নিজেদের সীমা অনেক সময় ছাড়িয়ে যায়।
আমেলিয়া বলল, কিন্তু যে সব ব্যঙ্গচিত্রশিল্পী মহাপুরুষদের ছবি বিকৃত করে আঁকে তাদের প্রতি আমার কোনও সহানুভূতি নেই।
হেনরিয়েত্তা বলল, এটা আমারও মনের কথা। এই ধরনের শিল্পীরা বড় বড় প্রতিভাবান মানুষদের ছবি বিকৃত করে মানুষের মনে রেখাপাত করতে চায়। এই ভাবে মানুষকে আনন্দ দিতে চায়।
সিনক্লেয়ার এতক্ষণ চুপ করে বসেছিল। এবার সে বলল, হে মহিলাবৃন্দ, এবার আমার ছবিগুলোর কথা হোক।
