কিন্তু এডওয়ার্ডের এ প্রতিজ্ঞা, এ শপথ ওতিলে আর শুনতে পেল না তার প্রাণবায়ু তার আগেই বেরিয়ে গেছে।
ওতিলের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে শোকে উন্মাদের মতো হয়ে গেল এডওয়ার্ড। শার্লোতে আকুলভাবে কাঁদতে লাগল সারারাত ধরে। পরদিন সকালে একটি কফিনে করে ওতিলের মৃতদেহ শোভাযাত্রা সহকারে চ্যাপেলে নিয়ে যাওয়া হলো, চার্চসংলগ্ন সে চ্যাপেলের উন্নতির জন্য স্থপতি তার সাহায্যে অনেক কাজ করেছে। কফিনের উপরে। ছিল কাঁচের ঢাকনা। ফলে ওতিলে সুসজ্জিত মৃতদেহ ও তার সুন্দর মুখখানা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। কেমন যেন এক স্বর্গীয় দ্যুতি খেলা করছিল তার মুখে।
শোভাযাত্রায় গাঁয়ের অনেকেই যোগদান করেছিল। শোভাযাত্রাটি যখন একটি বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তখন হঠাৎ তার ছাদ থেকে ন্যানি শোভাযাত্রার সামনে পড়ে যায়। দেখে বোঝা গেল তার দেহের সব হাড় গুঁড়িয়ে গেছে। সবাই ভাবে সে মরে গেছে। ছাদের উপর থেকে তার প্রিয় দিদিমণির মৃত মুখখানি দেখে সে থাকতে পারেনি। বিচলিত হয়ে পড়ে যায়।
কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ওতিলের কফিনটা ছুঁয়ে হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে ন্যানি নতজানু হয়ে বসে বলে, হা হা, আমার দিদিমণি, আমাকে ক্ষমা করেছে। আমার সব অপরাধ ক্ষমা করেছে। এইমাত্র আমার কানে কানে বলল।
কবরের কাছে মৃতদেহটি নিয়ে গিয়ে নামিয়ে রাখা হলো। দলে দলে অসংখ্য নরনারী আসছিল। ন্যানির আশ্চর্য জীবনলাভের ঘটনা শুনে সবাই তাদের ছেলেমেয়েদের এনে কফিনটাকে ছোঁয়াচ্ছিল। তাদের ধারণা তাদের সব দুরারোগ্য রোগ ভালো হয়ে যাবে।
রাত্রিতে একটি জ্বলন্ত বাতির পাশে বসে একা মৃতদেহ পাহারা দিতে লাগল ন্যানি। সে কাউকে সামনে থাকতে দেবে না। কেউ তাকে চটাতে সাহস পেল না। রাতের অন্ধকারে কোথা হতে স্থপতি এসে শেষবারের মতো ওতিলের মুখখানা দেখে গেল। সার্জেন বসে ছিল চার্চের এক কোণে ন্যানির অলক্ষ্যে অগোচরে।
ওতিলের সমাহিত হবার পর থেকে এডওয়ার্ড সম্পূর্ণ বিমুখ হয়ে উঠল জগৎ ও জীবনের প্রতি। বাঁচার সব আনন্দ যেন সে হারিয়ে ফেলেছে নিঃশেষে। মানুষের সঙ্গে মেলামেলা প্রায় ছেড়ে দিয়েছে। প্রায় সব সময় একা একা ঘরেই থাকে। খাওয়া দাওয়াতও কোনও রুচি বা আগ্রহ নেই।
এই সময় এডওয়ার্ডের একমাত্র সান্ত্বনার উৎস ছিল একটি পানপাত্র অর্থাৎ একটি কাঁচের গ্লাস। সেই গ্লাসে তার ও ওতিলের স্বাক্ষর ছিল। এই গ্লাসটি পরম যত্নের সঙ্গে কাছে রেখে দিয়েছিল এডওয়ার্ড। এতেই সে রোজ মদ খেতে ওতিলের মৃত্যুর পর থেকে।
হঠাৎ একদিন এডওয়ার্ডের মনে হলো এটা ঠিক সেই গ্লাস নয়। দেখতে এক মনে হলেও কোথায় একটা পার্থক্য আছে। চাকরকে ডেকে চাপ দিতেই সে স্বীকার করল সেটা ভেঙে যাওয়ায় অন্য একটা আনা হয়েছে তার জায়গায়। একথা শুনে রাগল না এডওয়ার্ড। শুধু সেই দিন থেকে পানাহার ত্যাগ করল একেবারে।
অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই তার ঘর দেখা গেল এডওয়ার্ড মরে পড়ে রয়েছে। বিছানায়। মিটলার প্রথমে তা দেখে ডাক্তার ও সকলকে ডাকে।
শার্লোতে বলল, ওতিলের পাশেই সমাহিত করা হবে এডওয়ার্ডকে এবং ভবিষ্যতে সেখানে আর কোনও মৃতদেহ সমাহিত করা হবে না। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার প্রিয়তমার সঙ্গে মহামিলনের যে স্বপ্ন দেখেছিল এডওয়ার্ড সে স্বপ্ন যেন তার কোনওভাবে বিঘ্নিত না হয় কোনওদিন।
গুড ইউমেন (গল্প)
হেনরিয়েত্তা আর আর্মিদোরো ওরফে আমেলিয়া আজ কিছুদিন হলো এ বাগানে বেড়াতে আসছে। এখানে সামার ক্লাবের সদস্যরাও আসে। কিন্তু অন্য সদস্যরা আসার আগেই ওরা চলে আসে, কারণ এই নির্জন অবকাশে ওরা দুজনে পরস্পরের একান্ত নিবিড় সান্নিধ্যে পরস্পরের কাছে আসার সুযোগ পায়, ওদের আসক্তি আর আনন্দলিন্সার উত্তাপটা বেশ কিছুটা শীতল হয়। ওরা আশা করে শীঘ্রই ওরা মিলিত প্রেমসম্পর্কের স্থায়ীবন্ধনে।
হেনরিয়েত্তার মনটা ছিল হাসিখুশিতে ভরা। সে তার বান্ধবী আমেলিয়াকে দূর থেকে দেখতে পেলেই ছুটে যেত তাকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য। কিন্তু প্রায় দিন দেখা যেত সামার হাউসের বসার ঘরে অ্যামেলিয়া একমনে বই ও পত্রপত্রিকাগুলো উল্টে পাল্টে দেখতে অথবা পড়তে শুরু করে দিয়েছে। এটাই তার অভ্যাস। এই জন্যই সন্ধ্যার দিকে প্রায় দিন সে এখানে আসে। আসে শুধু পড়ার জন্য। অন্য সবাই যখন গল্পগুজব করে, পাশা খেলে, ও তখন কোনো দিকে না তাকিয়ে কোনও শব্দে বিচলিত না হয়ে একমনে বই পড়ে যায়। কোনও যুক্তিপূর্ণ কথা কথা ছাড়া অন্য কথায় যোগ দেয় না।
হেনরিয়েত্তা কিন্তু বেশ কথা বলত। অল্পতেই খুশি হতো সে আর যাকে-তাকে যখন-তখন প্রশংসা করত। পরে সিনক্লেয়ার নামে তৃতীয় এক ব্যক্তি এসে যোগ দেয় তাদের সঙ্গে।
সেদিন সামার হাউসে হেনরিয়েত্তা ও আমেলিয়া দুজনেই যখন বসেছিল তখন সিনক্লেয়ার এসে হাজির হতেই হেনরিয়েত্তা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, কি খবর?
সিনক্লেয়ার তার ব্যাগটা খুলতে খুলতে বলল, একটু পরেই দেখতে পাবে। একটা খবর তোমাদের দিচ্ছি। তোমাদের দেখাবার জন্য কয়েকটা যুবতী মেয়ের ছবি বার করছি। এ বছরের ক্যালেন্ডারের বারোটা পাতায় ওদের ওই ছবিগুলো ছাপা হবে।
হেনরিয়েত্তা হাসিমুখে বলল, তুমি নিশ্চয় আমাদের বুদ্ধি পরীক্ষা করছ না। আমি ভাবছি কি এমন নূতন ঘটনা ঘটল যার অভিজ্ঞতা মেয়েদের সম্বন্ধে তোমার ধারণাটা খুব উঁচু করে দিল।
