ওদের দেখে অবাক হয়ে গেল শার্লোতে। যেতে যেতে ফিরে এল ওতিলে এবং তার সঙ্গে এডওয়ার্ডকে আসতে দেখে কিছুই বুঝতে পারল না সে। ওতিলে কোনও কথা বলল না। শুধু এডওয়ার্ড ও শার্লোতের হাতদুটো ধরে এক এক করে তার উপর চাপ দিয়ে ছুটে তার নিরে ঘরে চলে গেল।
এডওয়ার্ড তাকে আবেগের সঙ্গে শার্লোতেকে জড়িলে ধরল। বলল, তুমি ওতিলের উপর নজর দাও। ওকে তুমি ভুল বুঝো না।
ওরা ওতিলের ঘরে গিয়ে দেখল ওতিলে মেঝের উপর শুয়ে আছে। সেই থেকে সম্পূর্ণরূপে মৌব্রত পালন করে যেতে লাগল ওতিলে। সে খুব অল্পাহার করতে লাগল। বেঁচে থাকার জন্য যেটুকু দরকার। এ বিষয়ে কার কথা শুন্যতা না সে।
এডওয়ার্ড আগের মতো তার ঘরে থাকতে লাগল। শার্লোতের সঙ্গে এখন খুব ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করলেও ওতিলের আশা একেবারে ত্যাগ করতে পারল না।
মিটলার ও ক্যাপ্টেনের কাছে চিঠি পাঠানো হলো। এডওয়ার্ড শার্লোতের উপর চাপ দিতে লাগল ক্যাপ্টেনকে বিয়ে করার জন্য। শার্লোতে বলল, করতে পারি একটা শর্তে। করতে পারি ওতিলে যদি তোমাকে বিয়ে করতে চায়।
এমন সময় ওতিলে একদিন চিঠি লিখে তার মনের কথা জানিয়ে দিল। সে লিখল, আমাকে তোমরা কেউ বিরক্ত বা বিব্রত করো না। আমি আমার আত্মাকে খুঁজে পেয়েছি। তার পথে এডওয়ার্ড বাধা সৃষ্টি করছে। আমার এই তপশ্চর্যামূলক আত্মনিগ্রহ ও মৌত যতদিন প্রাণ চাইবে চলবে। এতে তোমরা কেউ বাধা সৃষ্টি করবে না। বন্ধুর মতো সব করে যাবে।
ওতিলের চিঠি পেয়ে এডওয়ার্ড আর কিছু বলল না। ক্যাপ্টেনের কি একটা জরুরি কাজ ছিল। সে তা সেরে এল।
আবার ওরা চারজনে আগের মতো দিন কাটাতে লাগল প্রাসাদে। কারও প্রতি কারও ঘৃণা বা বিদ্বেষ নেই। ওতিলে কথাটা বললেও অনেকটা সহজ হয়ে উঠেছে। সন্ধের সময় ওরা চারজনে এক জায়গায় বসে বসে গল্প করে। কোনওদিন বই পড়ে এডওয়ার্ড। কোনওদিন গান বাজনার আসর বসায়। শার্লোতের পিয়ানোর সঙ্গে বেহালা বাজায় ক্যাপ্টেন। ওতিলের পিয়ানোর সঙ্গে বাঁশি বাজায় এডওয়ার্ড।
সেদিন শার্লোতে আর ক্যাপ্টেন বসে ছিল। মিটলার তার সামনে পায়চারি করছিল। এডওয়ার্ড ঘোড়ায় চেপে বাইরে গেছে। ওতিলে তার ঘরে ছিল। মিটলার আপন মনে ওল্ড সেস্টামেন্টের দশটি উপদেশের এক-একটি বলে যাচ্ছিল ও ব্যাখ্যা করছিল। মিটলার বলতে চাইছিল আমরা ছেলেদের মাতাপিতার প্রতি ভক্তি করতে শেখাই। কিন্তু আমরা নিজেরা আমদের দাম্পত্য সম্পর্কেকে শ্রদ্ধা করে চলি না। যে বৈবাহিক বন্ধন বিধিনির্দিষ্ট ও জীবনের এক পবিত্র সম্পদ তা ছিন্ন করে আমরা ব্যভিচারে মত্ত হয়ে উঠি। সে সম্পর্কের মধ্যে কখনও কোনও কারণে ভুল বোঝাবুঝি বা বিরোধ বাধলে তা অবিলম্বে মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করা উচিত এবং এ বিষয়ে অপরকে যথাসম্ভব সাহায্য করা উচিত।
মিটলার লক্ষ করেনি ওতিলে তার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তার কথা শুনছে। এক বিষাদক্ষিণ আগ্রহে মিটলারের কথা শুনতে শুনতে তন্ময় হয়ে পড়েছিল ওতিলে। শার্লোতের শিশুপুত্রের মৃত্যুর পর থেকে তার মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে উঠেছিল সে এডওয়ার্ড ও শার্লোতের দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরিয়ে সে পাপ করেছে, এক অমার্জনীয় অপরাধে অপরাধিনী হয়ে উঠেছে। তার সেই পাপের জন্য শিশুটির অকাল মৃত্যু ঘটেছে তার হাতে। সেই পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য অপরিসীম আত্মনিগ্রহের মাধ্যমে দিনে দিনে নিজেকে ক্ষয় করে স্বেচ্ছামৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে চায় সে।
হঠাৎ ওতিলে তার ঘরে চলে যেতে শার্লোতে বিরক্ত হয়ে মিটলারকে বলল, আপনার ঈশ্বরের নীতি উপদেশ ব্যক্ত করা হলো?
এই বলে শার্লোতে ওতিলের ঘরে ঢুকতেই ওতিলের সহচরী ন্যানি নামে মেয়েটি চিৎকার করে উঠল, ছুটে আসুন, আমার দিদিমণি মরে যাচ্ছে।
মিটলার, ক্যাপ্টেন, শার্লোতে সকলেই ব্যস্ত হয়ে ছুটে গিয়ে দেখল, সোফার উপরে শুয়ে পড়েছে ওতিলে। তার অবস্থার সত্যিই বড় ক্ষীণ দেখাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার ডাকা হলো। ডাক্তার এসে বুঝলেন, অনাহারজনিত দুর্বলতা ও কোনও দুশ্চিন্তার প্রবল চাপই এর কারণ। ন্যানি বলে যে বাচ্চা মেয়েটিকে গ্রামের এক গবির পরিবার থেকে এনে ওতিলে তার কাছে রেখেছিল এবং তাকে বড় ভালোবাসত ডাক্তার তাকে পাশের ঘরে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন ওতিলে আজ কিছু খেয়েছে কিনা।
ন্যানি বলল, সে কিছুই খায়নি। সব আমাকে দিয়ে দিয়েছে।
ডাক্তার তাকে আরও চাপ দিলে সে বলল, সে কোনওদিনই কিছু খায় না।
কথাটা বলেই কাঁদতে লাগল ন্যানি, কারণ তার দিদিমণি একথা বলতে নিষেধ করেছে তাকে। কাঁদতে কাঁদতে কোথায় পালিয়ে গেল সে। তার আর বাড়িতে পাওয়া গেল না।
এদিকে ওতিলের অবস্থা ক্রমশই খারাপের দিকে যাচ্ছিল। খবর পেয়ে এডওয়ার্ড ছুটে এসে ওতিলের কাছে গিয়ে বাম্পবেগে আকুল হয়ে বলল, তুমি কি আমার সঙ্গে কোনও কথা বলবে না ওতিলে? তাহলে আমিও তোমার সঙ্গে মরব! মরে একসঙ্গে স্বর্গে গিয়ে দুজনে ভাষাহীন নীরবতায় অনেক কথা বলব যুগ যুগ ধরে।
ওতিলে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে অতিকষ্টে ঠোঁট দুটো কাঁপিয়ে ক্ষীণকণ্ঠে বলে উঠল, তুমি বাঁচবে। প্রতিজ্ঞা করো।
এডওয়ার্ড কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, প্রতিজ্ঞা করছি বাঁচব।
