ক্যাপ্টেন চলে গেলে ওতিলে চোখ মেলে তাকাল। তার জ্ঞান ফিরল। জ্ঞান ফিরলে সে দেখল শার্লোতের কোলের উপর সে শুয়ে আছে। সে উঠে বসে আবেগের সঙ্গে বলল, এই দ্বিতীয়বার আমি তোমার কোলে শুলাম। আর একবার আমার মা মরে গেলে আমি তোমার কোলে শুয়েছিলাম। আমি এক উদার আশ্রয় লাভ করেছিলাম।
শার্লোতে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। ওতিলে বলল, আমি তোমাদের সব কথা শুনেছি। যে আত্মঘাতী আশার খবরটা আমি ক্যাপ্টেন চলে তার বিরুদ্ধে চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছা করছিল আমার। আমি এ ব্যবস্থা মানব না। এই দুর্ঘটনার মাধ্যমে ঈশ্বর আমার চোখে আঙুল দিয়ে আমার ভুল ভেঙে দিয়েছে। আমি অন্যায় করেছিলাম, পাপ করেছিলাম এডওয়ার্ডকে ভালোবেসে। আমার সেই পাপের প্রতিফল এইভাবে ভোগ করতে হলো আমার। সে পাপের প্রতিকার আমি নিজেই করব। তুমি এখনি ক্যাপ্টেনকে ডেকে আমার কথা তাকে জানিয়ে দাও।
চতুর্বিংশ পরিচ্ছেদ
দুর্ঘটনার ফলে দেহ-মন অনেকটা ভেঙে গিয়েছিল ওতিলের। মার্লোতে তার দিকে অনেক বেশি নজর দিয়ে সুস্থ করে তুলল তাকে। সুস্থ হয়ে তার পরিকল্পনার কথা বলল ওতিলে। শার্লোতের ইচ্ছা ছিল, এখানকার পরিবেশ তাদের শোকাবেগকে জাগিয়ে দেয় সব সময়; তাই তারা দূরে কোথাও বেড়াতে যাবে দুজনে। কিন্তু ওতিলে বলল অন্য কথা। সে বলল, আমরা যদি এমনভাবে বসে থাকি তাহলে যত নির্জন ও শান্তিপূর্ণ জায়গাতেই যাই না কেন, আমরা কোনওমতেই পরিত্রাণ পাব না কোনো শোকাবেগ বা অশুভ অবাঞ্ছিত কোনও স্মৃতির প্রভাব থেকে। এসব থেকে মুক্তি পেতে চাইলে আমাদের কাজের মুধ্যে ডুব দিতে হবে। বৃহত্তর কর্তব্য সাধনই মানুষকে মুক্ত করতে পারে তার সকল দুঃখ বা অপরাধ চেতনা থেকে।
শার্লোতে তার মনের কথা বুঝতে পেরে বলল, তাহলে তুমি কি বোর্ডিং স্কুলে ফিরে যেতে চাও?
ওতিলে বলল, হ্যাঁ সেখানেই ফিরে যেতে চাই আমি। অবসর সময়ে আমি শিশুদের দেখাশোনা করব। তাদের মাঝে আনন্দ পাব।
শার্লোতে বলল, কিন্তু সেখানে গেলে সহকারী ভদ্রলোক আরও নিবিড়ভাবে তোমায় চাইতে পারেন। তিনি তোমাকে ভালোবাসেন।
ওতিলে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, আমাক যারা ভালোবাসবে তারা ভাগ্যের কাছে কোনও সুখই আশা করতে পারবে না। তাদের জীবনে দুঃখ আর হতাশা নেমে আসতে বাধ্য। এটা আমি ভালোই জানি। সুতরাং এ বিষয়ে কোনও ভয় নেই আমার।
শার্লোতের মনে কিন্তু এক ব্যাপারে আর একটা ভয় ছিল। সেটা হচ্ছে। এডওয়ার্ডের ভয়। এডওয়ার্ড প্রতিজ্ঞা করেছিল যতদিন ওতিলে শার্লোতের কাছে থাকবে ততদিন সে কিছু করবে না। কিন্তু ওতিলে অন্য কোথাও চলে গেলেই সে তাকে ছিনিয়ে আনবে সেখান থেকে। সে ভয়ঙ্করভাবে দুর্বার হয়ে উঠবে তাই এ বিষয়ে এডওয়ার্ডের মত জানার জন্য তার কাছে মিটলারকে পাঠাবার মনস্থ করল শার্লোতে।
কিন্তু মিটলার গেল না। না গিয়ে সে শার্লোতেকে পরামর্শ দিল, তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দাও ওতিলেকে। এটা খুব ভালো ব্যবস্থা।
মিটলার দেখল এই সুযোগ। এডওয়ার্ড ও শার্লোতের সব বাধাগুলো আপনা থেকে অর্থাৎ অনুকূল ঘটনার আঘাতে সরে যাচ্ছে।
শার্লোতেও তাই মনে করে। তাই ওতিলে প্রাসাদ থেকে চলে গেলে সে ঘরগুলোকে আগেকার মতো সাজাল। যখন ক্যাপ্টেন বা ওতিলে কেউ আসেনি তখন যেখানে যা ছিল তা আবার সেখানে রাখল। অতীত সুখের দিনগুলোকে মাঝে মাঝে আমাদের বর্তমান জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রবল কামনা জাগে আমাদের মনে। শার্লোতের মনেও সেই কামনা জেগেছিল।
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
ওতিলে রওনা হতেই মিটলার সত্যি সত্যিই একদিন এডওয়ার্ডের খামারবাড়িতে গিয়ে হাজির হলো। সে সব কথা এডওয়ার্ডকে বলল, ওতিলের সিদ্ধান্ত, তার বোর্ডিং স্কুলে যাওয়ার খুঁটিনাটি সব বলল এডওয়ার্ডকে।
মিটলার চলে গেলেই এডওয়ার্ড তার ঘোড়া তৈরি করতে বলল চাকরকে। তারপর তার বিশ্বাসী চাকরকে সঙ্গে নিয়ে পথে যে হোটেলে রাত কাটাতে হবে ওতিলেকে, সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলো। হোটেলের মালিক একজন মহিলা। সে এডওয়ার্ডকে চিনল। এডওয়ার্ড এমন একটি ঘর ভাড়া নিল যার পাশের ঘরে ওতিলে থাকবে। প্রথমে এডওয়ার্ড ভাবল ওতিলের কাছে সে সরাসরি হাজির হবে না। আগে চিঠি দিয়ে তার মন জানবে।
তাই সে একটি চিঠি লিখে ওতিলের টেবিলে রেখে দিল। তাতে লিখল সে ওতিলের উপর জোর করবে না। তবে সে কাছেই আছে। ওতিলে ইচ্ছা করলেই সে আসবে।
কিন্তু ঘটনাক্রমে ওতিলে তার ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল এডওয়ার্ড। এডওয়ার্ডকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে দুপা পিছিয়ে গেল তিলে। তার মুখ-চোখ গম্ভীর হয়ে উঠল। তাকে স্পর্শ করার কোনও সাহস পেল না এডওয়ার্ড। কোনও কথাও বলতে চায় না ওতিলে।
ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে বাইরে সারাবাত পায়চারি করতে লাগল এডওয়ার্ড। ভোরে ওতিলের ঘরে গিয়ে দেখল ওতিলে ঘুমোচ্ছে পোশাক পরেই। কিছুক্ষণ পরে সে উঠলে এডওয়ার্ড তাকে নৃতন করে সব কিছু ভেবে দেখতে বলল। কিন্তু ওতিলে কোনও কথার জবাব দিল না। তাকে অসুস্থ মনে হচ্ছিল। অবশেষে এডওয়ার্ড তাকে জিজ্ঞাসা করল, বোর্ডিং স্কুলে যাবে?
ওতিলে ঘাড় নেড়ে অসম্মতি জানাল। এডওয়ার্ড যখন তাকে বলল, প্রাসাদে শার্লোতের কাছে ফিরে যাবে?
ওতিলে তখন ঘাড় নেবে সম্মতি জানাল। ওতিলে তাড়াতাড়ি নেমে গিয়ে গাড়িতে বসে গাড়ি ছেড়ে দিল। গাড়ির পিছু পিছু ছোঁড়ায় চেপে যেতে লাগল এডওয়ার্ড।
