ক্যাপ্টেন বলল, তুমি ব্যাপারটা যত সহজ ভাবছ ততটা সহজ নয়। তোমার। আমার দুজনেরই একটা চরিত্রগত সুনাম আছে। এ কাজের দ্বারা সে সুনাম ক্ষুণ্ণ হবে। তাত সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠবে।
এডওয়ার্ড বলল, সাধারণ মানুষ প্রথম প্রথম হয়ত নিন্দা করবে। পরে তারা ধীরে ধীরে সব ভুলে যাবে। যেমন যায়। তখন সব ঠিক হয়ে যাবে।
এডওয়ার্ডের দারুণ পীড়াপীড়িতে অবশেষে আর বাধা দিতে পারল না ক্যাপ্টেন, সে যেমন সমর্থন করতে পারছিল না এডওয়ার্ডকে, তেমনি একেবারেই উড়িয়ে দিতও পারছিল না তার কথাটাকে।
অবশেষে এডওয়ার্ড ক্যাপ্টেনকে সঙ্গে নিয়ে তার পরিকল্পনাকে কার্যে রূপায়িত করার পথে প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে বাড়ির দিকে রওনা হলো। দুর থেকে পাহাড়ের উপর নির্মিত তাদের নূতন বাড়ির চূড়াটাকে দেখে আনন্দের আবেগে ফেটে পড়ল এডওয়ার্ড। ওতিলোকে মনে পড়ল তার। ভাবল আজই সন্ধ্যার সময় সব কথা পাকা করে ফেলতে হবে।
এডওয়ার্ড বলল, সে একটা পাশের গায়ে লুকিয়ে থাকবে। ক্যাপ্টেন ঘোড়ায় চেপে প্রাসাদে গিয়ে শার্লোতেকে সব কথা বুঝিয়ে বলবে। তারপর তার মতামত নিয়ে এডওয়ার্ডকে এসে খবর দেবে। এডওয়ার্ডের বিশ্বাস তার এই প্রস্তাবে শার্লোতে রাজী হবেই, কারণ এতে তার স্বার্থ কিছুমাত্র ক্ষুণ্ণ হচ্ছে না।
ক্যাপ্টেন সোজা প্রাসাদে গিয়ে দেখল শার্লোতে সেখানে নেই। খবর নিয়ে জানল সে এখন পাহাড়ের উপর নূতন বাড়িতে বাস করে। এখন সে কোথায় বেড়াতে গেছে। বিকেলের দিকে আসবে। তাই ক্যাপ্টেন তার পান্থশালায় ফিরে গেল।
এদিকে এডওয়ার্ড আপন মনে ঘুরতে ঘুরতে এক গোপন পথ দিয়ে তাদের লেকের পার্কের কাছে এসে গাছের আড়ালে লুকিয়ে রইল। হঠাৎ দেখতে পেল ওতিলে একটা গাছের তলায় ঘাসের উপর বসে রয়েছে একটা ছেলে কোলে নিয়ে। তখন সূর্য অস্ত গেল। কিন্তু অন্ধকার ঘন হয়ে ওঠেনি। এডওয়ার্ড চারদিক নির্জন দেখে সোজা তার কাছে গিয়ে তার পায়ের কাছে নতজানু হয়ে বসে পড়ল। ওতিলেও তাকে জড়িয়ে ধরল। এডওয়ার্ড তার পরিকল্পনার কথা সব জানাল। তার উত্তরে তিলে বলল, শার্লোতের কাছে আমি ঋণী। তিনি যদি মত দেন তাহলেই এ বিয়ে সম্ভব। তা না হলে আমি তোমায় ত্যাগ করব।
হঠাৎ শিশুটির মুখপানে তাকিয়ে এডওয়ার্ড আশ্চর্য হয়ে বলল, ওর মুখের সঙ্গে ক্যাপ্টেনের মুখের কি আশ্চর্য মিল। শার্লোতের বিরুদ্ধে অভিযোগের ব্যাপারে এই শিশুই সবচেয়ে বড় সাক্ষী।
ওতিলে বলল, অনেকে বলে, ওর চোখদুটো আমার মতো।
এডওয়ার্ড ওতিলেকে এবার পূর্ণভাবে আলিঙ্গন করল। ওতিলেও তাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করল। ওতিলে বলল, এবার তুমি ফিরে যাও ক্যাপ্টেনের কাছে। আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে। শার্লোতে শিশুর জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছে।
এডওয়ার্ড চলে গেলে দেখল পাহাড়ে যেতে অনেকখানি পথ পার হতে হবে। কিন্তু লোকটা যদি নৌকোয় পার হয় তহলে একেবারে বাড়ির গোড়ায় গিয়ে পৌঁছবে। তখন। মুখ আঁধার হয়ে এসেছে।
নৌকোয় উঠে ছেলে কোলে চেপে নৌকোটা ছেড়ে দিল। ছেলে কোলে থাকায় দাঁড় বাইতে অসুবিধা হচ্ছিল। নৌকোটা টলমল করছিল। হঠাৎ একসময় বাতাসে। নৌকোটা দুলে উঠতেই ওতিলের হাত থেকে দাঁড় ও ছেলে পড়ে গেল। ওতিলে ছেলেটার জামা ধরে অতিকষ্টে টেনে তুলল। কিন্তু এরই মধ্যে সে অনেক জল খেয়েছিল। আর শ্বাস রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। নৌকোটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল লেকের মাঝখানে। ওতিলে জলে ডোবা ছেলেটিকে বাঁচাবার জন্যে অনেক চেষ্টা করল। নিজের গরম অনাবৃত বুকের উপর বারবার তার ছোট্ট শীতল দেহকে চেপে ধরল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না।
অনুকূল বাতাসে অবশেষে যখন নৌকোটা ঘাটের কাছে এসে গেল তখন রাত অনেক হয়েছে। ছেলেটা কোলে তুলে সার্জেনের কাছে গেল ওতিলে। সার্জেনও অনেক চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। তখন হতাশ হয়ে শোকে মেঝের উপর। অচৈতন্য হয়ে পড়ে গেল ওতিলে।
এদিকে খবর পেয়ে শার্লোতে ছুটে এল বাড়ি থেকে। কিন্তু কোনও অবস্থাতেই আবেগে অভিভূত হয় না সে। অসাধারণ আত্মসংযমের সঙ্গে যে একবার শিশুটির মুখপানে তাকাল। তারপর ওতিলের মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিল।
এদিকে ভোরের দিক পান্থশালার এই দুর্ঘটনার খবরটা পৌঁছলে ক্যাপ্টেন সোজা। চলে এল ঘটনাস্থলে। শার্লোতে ওঠে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে তাকে অভ্যর্থনা জানাল। তার গম্ভীর মুখে শান্ত করুণ একটি হাসির রেখা ফুটে উঠল। পরে বলল, জানতে পারি কি ঠিক ঠিক এই দুর্ঘটনার সময়ে কোথা হতে কেমন করে এলে?
ক্যাপ্টেন তখন সব কথা খুলে বলল। এডওয়ার্ডের পরিকল্পনা ও প্রস্তাবের কথাও বলল। সব শুনে শার্লোতে বলল, আর আমি বাধা দেব না এডওয়ার্ডকে। আমি যদি আমাদের বিবাহবিচ্ছেদের আগেই মত দিতাম তাহলে আমার ছেলেকে হারাতে হতো না। এডওয়ার্ডকে বলবে সে যে কোনও কাগজে বলবে আমি সই করে দেব।
ক্যাপ্টেন বলল, তাহলে আমাদের বিয়ের কি হবে?
ক্যাপ্টেন উঠে পড়ল। মৃত ছেলেটির মুখ খোলা ছিল। সে দেখল সত্যিই ছেলেটির মুখের সঙ্গে তার মুখের সাদৃশ্য আছে। শার্লোতে বলল, নিয়তিই তো আপন উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য সব কাজ করিয়ে নেয় মানুষকে দিয়ে। সেখানে মানুষের যুক্তি নীতি বা বুদ্ধির কোনও দাম নেই।
