এদিকে যাবার আগে ছেলেটি এক স্টিমার পার্টির আয়োজন করল। একটি বড় নদীতে স্টিমার ভাড়া করে সবাই মিলে বেড়াতে যাবার ব্যবস্থা করল। তাতে তাদের দুজনের বাবা-মা ছাড়াও মেয়েটির সেই নূতন প্রেমিকও ছিল। মেয়েটি এই প্রমোদ ভ্রমণের মধ্যে পেয়ে গেল তার আত্মহত্যার সুবর্ণ সুযোগ। স্টিমার যখন দুটি দ্বীপের মাঝখানে খরস্রোতা এক জায়গা দিয়ে যাচ্ছিল তখন হঠাৎ মেয়েটি ছেলেটির কাছে গিয়ে বলল, আমি তোমার জন্যই মৃত্যুবরণ করছি। আমার কোনও খোঁজ করো না। আমাকে বাঁচাবার চেষ্টা করো না।
এই বলে ডেকের উপর থেকে জলে ঝাঁপ দিল মেয়েটি। ইতিমধ্যে স্টিমারটি প্রায় একটি দ্বীপের কূলে এসে পড়েছে। ছেলেটি তখন আর দেরি না করে পোশাক খুলে। জলে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কেটে মেয়েটির কাছে চলে গেল। মেয়েটি তখন জলের মধ্যে ডুবছিল আর উঠছিল। ছেলেটি মেয়েটির অচেতন দেহটি কোনওরকমে জলের উপর ভাসিয়ে স্রোতের টানে ভেসে যেতে লাগল। নদীর মুখটা সেখানে আরও চওড়া। অবশেষে তারা নদীর ওপারে কূলে গিয়ে উঠল। সেখানে ঘন বন। ছেলেটি দেখল তার মাঝে পায়ে চলার একটি পথ আছে। সেই পথে কিছুদূর গিয়ে দেখে কোনও এক চাষির কুঁড়ে রয়েছে তার মধ্যে। মেয়েটির মধ্যে কোনও প্রাণের সাড়া ছিল না।
ছেলেটির কাছ থেকে সব কথা শুনে চাষি দম্পত্তি আগুন জ্বেলে মেয়েটির হাত পা সেঁকতে লাগল। অবশেষে তার মধ্যে চৈতন্য সঞ্চার হলো। সে চোখ মেলে তাকিয়ে তার প্রার্থিত বহু আকাঙ্ক্ষিত মানুষকে দেখে তার গলাটা জড়িয়ে ধরল। তার চোখ। দিয়ে প্রবল ধারায় আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। ছেলেটিও এবার সব অনাসক্তি ও উচ্চাশার আবেগ ঝেড়ে ফেলে মেয়েটিকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। চাষিরা পরার। জন্য কাপড় দিল তাদের।
চাষিই ডিঙি বেয়ে ওপরে গিয়ে সেই স্টিমারে খবর দিল।
ওরা তখন খুব ভাবছিল। খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিয়েছিল। ভেবেছিল হয়ত দুজনেই স্রোতে ভেসে গেছে। চাষির কাছে সুখবর পেয়ে ওরা সবাই এসে গেলে ছেলেটি ও মেয়েটি তাদের বাবা-মায়ের কাছে আশীর্বাদ চাইল বরবধূরূপে।
গল্পশেষ করে ভদ্রলোক থামতেই দেখা গেল শার্লোতে তার বিষাদ-গম্ভীর মুখখানা নিয়ে উঠে গেল। এই ধরনের এক ঘটনা ক্যাপ্টেনের জীবনে ঘটে এবং এ কাহিনীর। সঙ্গে তার আশ্চর্য মিল আছে।
শার্লোতে উঠে গেলে ইংরেজ লর্ড ভদ্রলোক ওতিলেকে বলল, আমরা বুঝতে পারিনি আমাদের এ কাহিনী শুনে উনি দুঃখ পাবেন মনে। যাঁর আতিথ্যে আমরা পরম সুখে এখানে বাস করছি, কত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছি তিনি কোনওভাবে মনে দুঃখ পান তা আমরা চাই না।
কিন্তু দু-একদিনের মধ্যে ওঁরা বিদায় নিলে সত্যিই মনে দুঃখ পেল শার্লোতে। ওঁদের সাহচর্যে দিনগুলো ভালোই কেটে যাচ্ছিল। ওতিলেরও বেশ ভালো লাগত।
এয়োবিংশ পরিচ্ছেদ
যুদ্ধের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় যুদ্ধ থেকে সসম্মানে ছাড়া পেল এডওয়ার্ড ছাড়া পেয়ে সরাসরি সে তার খামার বাড়িতে চলে গেল। সেখানে গিয়ে তার বাড়ির সব খবরাখবর আগ্রহসহকারে শুনল। অনেক খবর তার জন্যে জমে ছিল অনেকদিন ধরে।
এডওয়ার্ড তার খামার বাড়িতে আসার পরেই একদিন তার পুরনো বন্ধু ক্যাপ্টেন তার সঙ্গে দেখা করতে এল। ক্যাপ্টেনকে কাছে পেয়ে খুব খুশি হলো এডওয়ার্ড। ক্যাপ্টেনই তাকে খবর দিল তার একটি পুত্র সন্তান হয়েছে। কথাপ্রসঙ্গে এডওয়ার্ড তাকে ঠাট্টা করে বলল, বিয়ে থা করলে?
ক্যাপ্টেন বলল যে সে তখনও বিয়ে করেনি এবং সে বিষয়ে কিছু ঠিক করেনি।
এডওয়ার্ড বলল, কথাটা বলার আমার একটা কারণ আছে। তুমি জান আমি ওতিলেকে ভালোবাসি। তাকে না পেলে জীবনে বেঁচে থেকে কোনও লাভ নেই বলেই আমি এ জীবন ত্যাগের জন্য যুদ্ধের যোগদান করি। কিন্তু সম্প্রতি যুদ্ধে থেকে ফিরে এসে ওতিলের প্রতি আমার কামনা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। এ কামনা আমি সংযত বা দমন করতে পারছি না। আমার একান্ত বিশ্বাস আমি ওতিলেকে একদিন লাভ করবই।
ক্যাপ্টেন বলল, এইভাবে মোহের বশবর্তী হয়ে সব সম্ভাব্য বাধা ভেঙে এগিয়ে যাওয়া উচিত নয়। তার থেকে তোমার দাম্পত্য সম্পর্ক ও কর্তব্যের কথা ভেবে স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হওয়া উচিত। তোমাদের নবজাত পুত্রসন্তান তোমাদের মিলনকে আরও দৃঢ় ও আনন্দদায়ক করে তুলবে। তোমাদের দাম্পত্য সম্পর্কে আরও মধুর করে তুলবে।
এডওয়ার্ড তার পুত্রসন্তানের কথায় কোনওরূপ বিচলিত না করে বলল, দেখো, ছেলের জন্য ভাবি না। আমাদের যা বিষয় সম্পত্তি আছে তাতে ছেলে ভালোভাবে মানুষ হয়ে উঠবে। যাদের বিষয় সম্পত্তি নেই, বাবা-মা নেই সেই সব ছেলেরাও মানুষ হয়।
এডওয়ার্ডকে তার কামনা পূরণের পথে অবিচল দেখে ক্যাপ্টেন বলল, কেন যে। অতীত যৌবনের উদ্দাম দিনগুলোকে ফিরে পেতে চাইছ তা জানি না। জানবে জীবনের যে কোনও স্তরে যে কোনও বয়সের সীমার মধ্যেই মানুষ তার জীবনকে উপভোগ করতে পারে। প্রকৃতি তার সব ব্যবস্থা করে রেখেছে। এই উপভোগের জন্য তাকে অতীত বা ভবিষ্যতের পানে তাকাতে হবে না।
সে কথায় কান না দিয়ে এডওয়ার্ড বলল, দেখো, যুদ্ধে যেয়ে একটা কথা আমার প্রায়ই মনে হতো। তোমার কথাও মনে হতো। আজ এসেছ ভালোই হয়েছে। আমি যেমন ওতিলেকে ভালোবাসি তুমিও তেমনি শার্লোতেকে ভালোবাস। আমি ওতিলেকে বিয়ে করব। তুমি শার্লোতেকে বিয়ে করো। শার্লোতের শিশুপুত্র তার কাছেই থাকবে। তুমি তাকে মানুষ করবে। আমি ওতিলেকে বিয়ে করেই দেশভ্রমণে বেরিয়ে যাব। বিষয়ে সম্পত্তি ভাগ বাটোয়ারা তোমরা দুজনে মিলে ঠিক করবে।
