প্রসঙ্গক্রমে এডওয়ার্ডের কথা শুনে ওতিলের মনে কষ্ট হলো। তার মনে হলো যুদ্ধে যোগদান করে এডওয়ার্ড এখন কোথায় কত কষ্ট করছে। কতখানি বিপদের ঝুঁকি নিয়েছে কে জানে।
ইংরেজ ভদ্রলোক একদিন তার দেশভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে মেয়েদের বিভিন্ন জায়গায় তোলা ছবি দেখালেন। তিনি সব সময় কোনও ভালো প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখলেই তার ছবি তুলতেন। এই নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন তিনি। কিন্তু তার সঙ্গী ভদ্রলোকটি সব দিকে নজর ও খেয়াল রাখতেন। তিনি এই কদিনের মধ্যেই এ বাড়ির সব খবরাখবর নিয়ে ফেলেছেন। তিনি রোজ সন্ধ্যার সময় একটা করে গল্প শোনাতেন। মেয়েরা বেশ উপভোগ করত তাঁর বলা গল্প।
একদিন ভদ্রলোক বললেন, আজ আমি আমার একটা গল্প বলব। কিন্তু কারও কোনও কথা বলা চলবে না। সবাই রুদ্ধশ্বাসে মনোযোগ দিয়ে শুনবেন।
ভদ্রলোক এবার বলতে শুরু করলেন, কোনও এক শহরের পাশাপাশি দুটি বাড়ির দুটি ছেলেমেয়ে একই ঘরে একই সঙ্গে বেড়ে ওঠে। ছোট থেকে তাদের দুজনের মধ্যে এত ভালোবাসা ছিল যে তাদের বাবারা ঠিক করেছিলেন তারা বড় হলে তাদের বিয়ে দেবেন।
কিন্তু কিছুদিন পর দেখা গেল মেয়েটি ও ছেলেটির মধ্যে আর সেই ভাব ভালোবাসার সম্পর্ক নেই। তার পরিবর্তে কেমন যেন ঘৃণা ও শত্রুতার ভাব গড়ে উঠেছে দুজনের মধ্যে। একদিন তারা আরও কয়েকজন ছেলেমেয়ে মিলে যুদ্ধের খেলা খেলছিল। ছেলেটি যেমন একদল ছেলের নেতৃত্ব করছিল সেনাপতি রূপে মেয়েটিও তেমনি একদল মেয়ের সামনে নেতৃত্ব করতে লাগল। সে কিছুতেই হার মানবে না। যুদ্ধে ছেলেটির জয় হলো। কিন্তু মেয়েটি সে জয় স্বীকার করল না। সে ভয়ঙ্করভাবে আক্রোশভাবাপন্ন হয়ে ছেলেটিকে আক্রমণ করল। তার তখন একমাত্র লক্ষ্য যে কোনও প্রকারে ছেলেটিকে আঘাত করা। সে তখন খেলার কথা ভুলে গেল। ছেলেটির জোর বেশি থাকায় সে অতিকষ্টে মেয়েটির হাত দুটি ধরে বেঁধে ফেলল।
এই ঘটনার পর মেয়েটির মনে ঘৃণার ভাব আরও বেড়ে গেল আগের থেকে। এটা তাদের অভিভাবকরাও লক্ষ করলেন। তখন তারা বাধ্য হয়ে তারা বিচ্ছিন্ন করে দিলেন। পরস্পরের কাছ থেকে।
ছেলেটিকে পাঠানো হলো সামরিক স্কুলে। নূতন পরিবেশের মাঝে গিয়ে সব কিছু ভুলে গেল সে। ধীরে ধীরে বড় হবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা জাগল তার মনে। সাফল্যের সঙ্গে গড়ে তুলতে লাগল সে তার ছাত্রজীবন।
এদিকে মেয়েটি একা একা বাড়ির মধ্যে থাকতে থাকতে ক্রমশই নিজের ভুল বুঝতে পারল। ক্রমে সে সব ঘৃণা ত্যাগ করে শান্ত ও সুস্থ মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠল। কিন্তু ছেলেটি তার থেকে দূরে চলে যাওয়ায় তার কাছে ক্ষমা চাওয়ার বা মানসিক পরিবর্তনের কথাটা জানাবার কোনও অবকাশ পেল না।
এইভাবে কয়েক বছর কেটে গেল। এমন সময় মেয়েটি বাল্যবন্ধুর থেকে বয়সে বড় একটি লোক তাদের বাড়িতে আনাগোনা করতে করতে তার প্রতি আকৃষ্ট হলো। প্রথম প্রথম মেয়েটি তার প্রতি কোনও আগ্রহ দেখাল না। তারপর যখন দেখল তার দেহসৌন্দর্যের প্রতি লোকটি অতিমাত্রায় আসক্ত এবং তার থেকে আরও পরিণত বয়স্ক, শিক্ষিতা ও সুন্দরী মেয়েদের থেকে লোকটি শুধু তার সাহচর্যই কামনা করে তখন বাধ্য হয়ে লোকটিকে সঙ্গদান করতে লাগল। তার সঙ্গে ক্রমে এক প্রেমসম্পর্ক গড়ে উঠল। তখন মেয়েটি বাবা ভাবল তাদের মেয়ে হয়ত ভবিষ্যতে এই লোকটিতেই বিয়ে করবে।
হয়ত তাই হতো। কিন্তু মাঝখানে হঠাৎ আবার একটা ঘটনা ঘটল। এই সময় হঠাৎ একদিন মেয়েটির সেই বাল্যবন্ধু পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরে এল দীর্ঘদিন পরে। বাড়িতে এসেই মেয়েটির বাড়িতে গেল তার সঙ্গে এক সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকারের জন্য।
ছেলেটি কিন্তু তখন মেয়েটির প্রতি তেমন কোনও বিদ্বেষভাব ছিল না, তেমনি প্রেমাসক্তিও ছিল না। তার মনে তখন শুধু একান্তভাবে বিরাজ করছিল বড় হবার কামনা, এক বিরাট উচ্চাশার সমুন্নত আবেগ।
মেয়েটি কিন্তু ছেলেটিকে দীর্ঘদিন পর কাছে পাবার সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্লেখিতের মতো জেগে উঠল। ভাবল মনের নিভৃতে এতদিন যার স্বপ্ন দেখছিল, এতদিন যাকে কামনা করছিল সে স্বয়ং তার সামনে এসে গেছে। সে আরও স্বীকার করল, আসলে তার এই বাল্যবন্ধুই তার আকাক্ষিত পুরুষ। ছোট থেকে তাকেই সে কামনা করে এসেছে। ছেলেবেলায় তার প্রতি যে ঘৃণা বা বিদ্বেষভাব দেখিয়েছে আসলে তা শুধু তার দৃষ্টি আরও নিবিড়ভাবে আকর্ষণ করার জন্য। একদিন সূদূর বাল্যে তার অপরিণত মনের অবচেতনে এক অন্ধ আবেগে যাকে আঁকড়ে ধরেছিল আজ পরিণত মনের সমস্ত যুক্তিবোধের আলোকে তার উজ্জ্বল ভাবমূর্তিটি দেখে অবাক হয়ে গেল মেয়েটি।
কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে মেয়েটির এই নবজাগ্রত প্রেমের ডাকে সাড়া দিতে পারল না। ছেলেটি। বড় জোর সে তাকে বোনের মতো ভালোবাসতে পারে। মেয়েটির প্রতি তার কোনও কামনা ছিল না বলেই তার নতুন প্রেমিক ভদ্রলোকটির সঙ্গেও যেচে আলাপ। করেছিল এবং কোনও ঈর্ষাবোধ করেনি সে। এমন কি সে একদিন তার কার্যক্ষেত্রে চলে যাবার কথাও ঘোষণা করল সবার সামনে।
মেয়েটি যখন দেখল কোনও রকমেই ছেলেটির মন জয় করতে পারবে না, তখন সে মনে মনে আত্মহত্যা করার জন্য মনস্থির করে ফেলল। এইভাবে ছেলেটির মন পরোক্ষভাবে মৃত্যুর পর জয় করার বাসনা করল। সে মারা গেলে তার মৃত মুখ দেখে ছেলেটি নিশ্চয় আঘাত পাবে এবং তার কথা বেশি করে মনে করবে। এই ধরনের এক আত্মঘাতী বিকৃত জয়ের আকাঙ্ক্ষা পেয়ে বসল মেয়েটি।
