অনুষ্ঠানের দিন শিশুটি ছিল ওতিলের কোলে। মিটলার বৃদ্ধ পুরোহিতের সঙ্গে ঘরে ঢুকল। মন্ত্র বলতে লাগল। হঠাৎ শিশুটির মুখপানে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল ওতিলে। এমন আশ্চর্য সাদৃশ্য দেখাই যায় না। ওতিলের কোল থেকে মিটলার ছেলেটিকে কোলে নিয়ে মিটলারও অবাক হয়ে গেল বিস্ময়ে। ছেলেটির মুখের সঙ্গে ক্যাপ্টেনের মুখের আশ্চর্য সাদৃশ্য ছিল।
পুরোহিত অতিশয় বৃদ্ধ হওয়ায় একজনের উপর ভর দিয়ে এসেছিলেন। সমগ্র অনুষ্ঠানটি তিনি অতি সংক্ষেপে সারলেন। মিটলার তাকে সাহায্য করতে লাগল নানাভাবে। মিটলার হলো শিশুর ধর্মপিতা এবং ওতিলে হলো ধর্ম মাতা। ধর্মপিতামাতার কর্তব্য সম্বন্ধে এক আবেগময় বক্তৃতা দিল মিটলার। তারপর শিশুটিকে বৃদ্ধ পুরোহিতের কোলে দিতেই পুরোহিতের মাথাটা টলতে লাগল। তিনি পড়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তাকে ধরে একটা চেয়ারে বসিয়ে দেওয়া হলো।
কোনওমতেই বাঁচানো গেল না পুরোহিতকে। সেইখানেই তাঁর মৃত্যু ঘটল সেই মুহূর্তে।
এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় ওতিলের মনটা বড় ভেঙে পড়েছিল। রাত্রিতে শোবার সময় হঠাৎ এডওয়ার্ডকে মনে পড়ল তার। মনে পড়ল অনেকদিন পর। মনে হলো। এডওয়ার্ড তখনও তার সামনে গিয়ে ঘোড়ার চেপে যাচ্ছে। অথবা সামরিক পোশাকে সজ্জিত হয়ে রয়েছে। অথবা পোশাক খুলে বিছানায় শুতে যাওয়া। এইভাবে একের এক করে বিচিত্ৰবেশী এওয়ার্ডের কাল্পনিক মূর্তিগুলো মনের পর্দায় ফুটে উঠল ওতিলের। আর মনে হলো আজও সে এডওয়ার্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে। এত সব ঘটনা ঘটা সত্ত্বেও তার মর্মমূল হতে এডওয়ার্ডকে সরাতে পারেনি কেউ।
দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ
সেদিন ঘুরতে ঘুরতে বাগানের মালীর কাছে এল ওতিলে। বসন্তকাল এসেছে, গাছে গাছে কচি পাতা গজিয়ে উঠেছে। ফুলগাছে ফুল ধরেছে রং বেরঙের। মালী কাজ করছিল ফুলবাগানে। সে বুড়ো হয়েছে। প্রচুর বয়স হয়েছে, তবু এর অপত্যস্নেহের নিবিড়তা আর নিষ্ঠা নিয়ে গাছগুলোকে লালন-পালন করে চলেছে সে। গাছগুলোকে যেন সন্তানের মতোই ভালোবাসে।
মালীকে আর একটা কারণে ভালো লাগে ওতিলের। সে অতিমাত্রায় প্রভুভক্ত। এডওয়ার্ডের প্রত্যাবর্তন সে মনেপ্রাণে কামনা করে প্রতি মুহূর্তে।
কোনও ধাত্রী না রেখে ওতিলের উপরেই শিশুকে মানুষ করার ভার দিয়েছে শার্লোতে। ওতিলে ছেলেটাকে প্রায়ই কোলে নিয়ে বেড়ায়। সে ঘুমিয়ে গেলেও তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় বয়ে বেড়ায়।
সেদিন শার্লোতে ছেলেটাকে ওতিলের কোলে দিয়ে পাহাড়ের উপর তাদের নবনির্মিত গ্রীষ্মবাসে বেড়াতে গেল। পাহাড়ের উপর নির্মিত বাড়িটার ছাদে চলে গেল শার্লোতে। সেখান থেকে চারদিকের শোভা বড় মনোরম। পাহাড়ের কোলঘেঁষা বন, সামনের লেক, গ্রামের বাড়ি, খামার, বাগান সবকিছুই বড় চমৎকার ও মনোরম দেখায়।
ওতিলে একবার তার কোলের শিশুটার দিকে তাকাল। শিশুটার মুখখানা ক্যাপ্টেনের মতো দেখতে মনে হলো। তার প্রতি মমতা হচ্ছিল তার। এই বিশাল বিষয় সম্পত্তির সব তারই। সহসা তার মনে হলো, এডওয়ার্ড এসে শার্লোতের সঙ্গে আগের মতো মিলিত হয়ে পুত্ৰসুখ উপভোগ করুক। সে শেষ জীবনে সুখী হোক। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল ওতিলে সে স্বেচ্ছায় ও সানন্দে এডওয়ার্ডের প্রতি তার সব আসক্তি ও তার উপর তার সব দাবি ছেড়ে দেবে। তার এই কল্পিত ত্যাগের মধ্যে তার প্রেমের এক অনাস্বাদিতপূর্ণ রস আর অকল্পনীয় মহত্ব খুঁজে পেল।
এদিকে শার্লোতে তখন ভাবছিল ওতিলের বিয়েটা কোথায় কিভাবে দেওয়া যায়। বিয়ে হয়ে গেলে সে প্রাসাদ থেকে চলে যাবে। এডওয়ার্ড এসে তখন বাধ্য হয়ে মনের শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য তার সঙ্গে পুনর্মিলিত হবে। তবে ওতিলের বিয়েটা ক্যাপ্টেনের সঙ্গে হলেই সে খুশি হতো বেশি।
পাহাড়র উপর গোটা বাড়িটার নির্মাণকার্য শেষ। শুধু অলঙ্করণের কাজ বাকী আছে। কোনও এক শিল্পী এসে সে কাজ সম্পন্ন করবে। উপরতলার ঘরগুলো বেশ উঁচু বলে বেশ ঠাণ্ডা। এখান থেকে চারদিকের দৃশ্যবলি সুন্দর দেখা যায়।
হঠাৎ একদিন এক ইরেজ পথিক দেশভ্রমণ করতে করতে প্রাসাদে এসে আতিথ্য গ্রহণ করল। ভদ্রলোকের বয়স হয়েছিল। সঙ্গে একজন লোক ছিল। সেই আলাপ পরিচয়ের সূত্র ধরেই তিনি এসে হাজির হন।
শার্লোতে ও ওতিলে তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানায় এবং তাঁর থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। তাঁকে দিনকতক থেকে যেতে বলে। ইংরেজ ভদ্রলোক পাহাড়ের উপর বাড়িটা ঘুরে দেখে পাহাড়টার চারপাশও দেখলেন ভালো করে। দেখে তিনি কতকগুলো পরামর্শ দিলেন। তিনি বললেন, এই পাহাড়ের ভিতর ঝোপে ঢাকা একটি ঝর্না আছে। ঝোঁপঝাড়গুলো কেটে ঝর্নাটা বার করে তার আশেপাশে বসার জায়গা করে দিলে জায়গাটা চমৎকার দেখাবে। তিনি আরও বললেন, বনের ভিতর পাহাড়ের গায়ে একটা গুহা আছে। বন কেটে সেখানে যাবার পথ করলে সেখানে একটি সুন্দর বিশ্রামাগার করা যেতে পারে।
ইংরেজ ভদ্রলোককে পেয়ে খুশি হলো শার্লোতে ও ওতিলে। কথা বলার একজন বিদগ্ধ লোক পেল ওরা। ভদ্রলোক কথায় কথায় একদিন বললেন, এডওয়ার্ডের মতো উনিও দেশভ্রমণ করতে ভালোবাসেন। তবে এডওয়ার্ডের মতো নিশ্চিন্ত নন। ওঁর একটি পুত্র আছে। তার উপর বিষয়সম্পত্তির ভার দিয়ে উনি দেশভ্রমণে বার হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা হয়ে উঠেনি কারণ ওর একমাত্র পুত্র ভারতবর্ষে গিয়ে বসবাস করছে। সেখানেই জীবন কাটাবার মনস্থ করেছে। এজন্য তাঁর বিষয়সম্পত্তি দেখাশোনার কোনও লোক নেই।
