তখন এডওয়ার্ড বাধ্য হয়ে আবার ফিরে আসবে। ঘটনার আঘাতে ওতিলের প্রতি তার যত সব অবৈধ মোহ ও আসক্তি অপগত হয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই সে ফিরে আসবে শার্লোতের কাছে। সব বাধা বিপত্তির অবসানে তাদের পুরনো প্রেম মেঘমুক্ত চাঁদের মতো আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সেই দিনটির প্রতীক্ষায় আজও মুহূর্ত গণনা করলে শার্লোতে পরম আগ্রহে। আজো সে এডওয়ার্ডের পথ চেয়ে বসে আসে। তার বিশ্বাস এডওয়ার্ড একদিন তার ভুল বুঝতে পারবেই। সে তার কাছে ফিরে আসবেই। তাদের প্রথম প্রেম যখন একবার প্রতিকূলতার সঙ্গে সংগ্রামে জয়ী হয় তখন এবারও নিশ্চয়ই জয়ী হবে।
অব্যবহিত পূর্বে যে ঘটনা ঘটে যায় তার কথা মনে রাখে না মানুষ। হয় বর্তমান জীবনের স্রোত আর ঘটনার মাঝে দুর্বার বেগে ঠেলে নিয়ে গিয়ে তাকে সে কথা মনে রাখতে দেয় না অথবা অতীতের মধ্যে তার মনটা ডুবে যায়।
প্রাসাদ থেকে বিদায় নিয়ে স্থপতির চলে যাওয়ার ঘটনা অথবা লুসিয়ানার এত সব দাপাদাপির ঘটনা কোনওটাই বিশেষ করে রেখাপাত করতে পারল না শার্লোতে বা ওতিলের মনে। ওরা সে সব স্বচ্ছন্দে ভুলে গেল। সহজভাবে সহকারী জ্বলোকের উপর নজর দিল।
তাছাড়া মেয়েদের মনের প্রকৃতিটা অন্যরকম। বড় অদ্ভুত। সে প্রকৃতিতে আছে অদ্ভুত ভাবের লীলা। তাদের মনের গভীরে এক বিশেষ পুরুষের প্রতি গভীরতম আসক্তি এমনভাবে বাসা বেঁধে থাকে যা বাইরের সমাজ সম্পর্কের কোন ঘাতপ্রতিঘাত বা কোনও প্রতিকূল অবস্থা সে আসক্তিকে বিলুপ্ত বা নিশ্চিহ্ন করতে পারে না। কিন্তু আবার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাক্রমে সব পুরুষরা তাদের বহুবার বহু নিবিড় সংস্পর্শে আসে যাদের চিন্তা বা কর্ম এবং জীবনের গতি প্রকৃতি ভালো লাগে তাদের প্রতিও একেবারে উদাসীন বা অনাসক্ত থাকতে পারে না তারা।
সহকারী ভদ্রলোকটির সঙ্গে কথা বলে শার্লোতে ও ওতিলে দুজনেই প্রীত হলো। তার স্বাধীন ও স্বচ্ছ চিন্তা, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ শক্তি ও বিচারবুদ্ধি আকর্ষণ করল তাদের মনকে।
সেদিন সহকারী প্রসাদের বাগানে সেই সব পুরনো আমলের গাছগুলো দেখছিল যা এডওয়ার্ডের বাবা একদিন রোপণ করেছিল। সেই সব গাছগুলোর পানে আজ আর কেউ তাকায় না। আজকাল প্রাসাদের লোকেরা নূতন নূতন কায়দায় গাছ রোপণে ব্যস্ত।
হঠাৎ ঘুরতে ঘুরতে শার্লোতে সেদিক গিয়ে পড়ায় তার সামনে অতীত ও বর্তমানের অপরিহার্য দ্বন্দ্ব সম্বন্ধে কথা তুলল সহকারী। এই দ্বন্দ্ব সম্বন্ধেই এতক্ষণ ভাবছিল সে।
সহকারী বলল, অতীত ও বর্তমানের চিরাচরিত দ্বন্দ্বটা পিতাপুত্রের জীবন ও ভাবধারার মাধ্যমে বোঝা যাবে ভালোভাবে। কোনও পুত্র যদি বর্তমানের সাধারণ জীবনধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে থাকে তাহলে তার পিতার ভাবধারার সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাধবেই। কারণ প্রায় পিতাই অতীতের ভাবধারাকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চান। তাদের আত্মকেন্দ্রিকতা, সঞ্চয়প্রবণতা ও রক্ষণশীলতার যত সব আতিশয্য এ কালের ছেলেরা সহ্য করতে পারে না। মানতে পারে না। তারা সেই কুটরিটাতে সব দরজা জানালা বন্ধ করে নিজেদের আবদ্ধ করে রাখতে পারে না যে কুটরিটা আত্মকেন্দ্রিকতায় অন্ধকার, রক্ষণশীলতায় শীতল এবং সঞ্চয়প্রবণতায় একান্তভাবে সংকীর্ণ।
শার্লোতে বলল, ছেলেদেরও দোষ আছে। তারা তাদের পিতামাতার আরদ্ধ কাজকর্মগুলোকে একেবারে নষ্ট না করে সেগুলোকে পূর্ণতার পথে নিয়ে যেতে পারে। সেগুলোকে সার্থক করে তুলতে পারে।
সহকারী বলল, যুগে যুগে মানুষের রুচি পাল্টে যায়। ভাবধারা বদলে যায়, আপনি যে বাগানবাড়ি ও তার পথঘাট কত যত্ন করে পরিকল্পনা করে নির্মাণ করেছেন আপনার পুত্র হয়ত তা আর ভালোবাসবে না।
একথা শার্লোতের ভালো না লাগলেও তার পুত্রসন্তান’ এই কথাটা শুনে সত্যিই বড় ভালো লাগল তার। সেদিন খ্রিস্টের জন্মোৎসব’ অভিনয় দেখতে গিয়ে ওতিলের কোলে একটি স্বাস্থ্যবান শিশুপুত্র দেখে ঐ বয়সের এক পুত্রলাভের বাসনা জাগে তার মনে। সে বাসনাটাই যেন আরও তীব্র হয়ে উঠল সহকারীর কথায়। শার্লোতে হঠাৎ দেখল তার প্রসবকাল আসন্ন হয়ে আসছে। তার প্রসব না হলে ওতিলেকে এখন ছাড়া চলবে না।
শার্লোতে উঠে পড়েছিল। সহকারী বলল, আসল কথা কি জানেন? সব পিতার উচিত পুত্রদের নিয়ে সব ব্যাপারে যৌথ কারবার খুলে বসা। তাহলে কোনও হাঙ্গামাই হবে না। সব ব্যাপারে পুত্রদের ডেকে তাদের মতামত চাইতে হয়। পরিকল্পনা খাড়া করার কথা বলতে নেই। নিজ সব দায়িত্ব নিতে নেই। তাহলে পুত্ররাও খুশি হয়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়। পিতার উপর অযথা দোষ দেয় না।
যথাসময়ে নির্বিঘ্নে একটি পুত্রসন্তান প্রসব করল শার্লোতে। যে সব মেয়েরা প্রসবের সময় শার্লোতের কাছে ছিল তারা বলল, ছেলেটি হয়েছে অবিকল এডওয়ার্ডের মতো। কিন্তু ওতিলে একথা মোটেই মানতে পারল না। অবশ্য সে মুখে কোনও কথা বলল না। শুধু শার্লোতকে অভিনন্দন জানাল।
খবর পেয়ে মিটলার এল। এসে শিশুপুত্রের নামকরণ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে লাগল। বৃদ্ধ পুরোহিতকে ডাকা হলো। শার্লোতে এডওয়ার্ডের অভাবটা অনুভব করল। লুসিয়ানের বিয়ের কথাবার্তার সময় এডওয়ার্ড ছিল না আবার পুত্রের জন্মের সময়ও সে নেই।
বৃদ্ধ পুরোহিত শিশুপুত্রের নাম রাখলেন অট্টো।
