ওতিলের অভিনয় দেখে শার্লোতে নিজেও মুগ্ধ হয়ে গেল। এই অভিনয় দেখে তার একটি অতৃপ্ত গোপন বাসান খোঁচা দিতে লাগল তার মনকে। শার্লোতে আশা করেছিল আরও একটি শিশুপুত্র জন্মলাভ করবে। তার কন্যা সন্তান আছে, কিন্তু পুত্র নেই। একটি শিশুপুত্র লাভে তার মাতৃত্ব সার্থক হবে। কিন্তু সে আশা হয়ত পূরণ হবে না তার।
এদিকে স্মৃতি চলে গেলে তার জায়গায় প্রাসাদের বিভিন্ন কাজকর্ম দেখাশোনা করার জন্য একজন নূতন লোক নিয়োগ করেছে শার্লোতে। লোকটি এক সহকারী বিদ্যালয় শিক্ষক। অনুষ্ঠানের দিনই লোকটি এসে হাজির হলো।
স্থপতিকে বিদায় দেবার সময় শার্লোতে ও ওতিলে দুজনে মিলে তাকে একটা হাতে বোনা ওয়েস্টকোট উপহার দিল। এছাড়া আরও কিছু উপহার আগেই তারা দিয়েছিল।
একবিংশ পরিচ্ছেদ
ওতিলে যে বোর্ডিং স্কুলে পড়ত, যেখান থেকে পড়তে পড়তে হঠাৎ চলে এসেছে। তার পড়া শেষ না করেই, সেই স্কুলের একজন সহকারী শিক্ষককে কিছুদিনের জন্য এখানে বেড়াতে আসার জন্য আহ্বান জানিয়েছিল শার্লোতে। সেই আহ্বানে সাড়া দিতে এখানে এসেছেন তিনি। তিনি আসাতে ওতিলে ও শার্লোতে দুজনেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে বিশেষভাবে।
এই সহকারীর বয়স অল্প হলেও শিক্ষণকার্যের দক্ষতায় ও শিক্ষাতত্ত্ব সম্পর্কিত বিজ্ঞতার দিক থেকে খুব নির্ভরযোগ্য। ওতিলে তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখত আগে থেকেই। যে বোর্ডিং স্কুলে সহকারী হিসাবে কাজ করত তার হেডমিস্ট্রেস তার যোগ্যতার জন্য তাকে খুবই ভালোবাসতেন। তাঁর বয়স হয়েছিল। অথচ স্কুলটাকে
তিনি নিজের হাতে গড়ে অতি যত্নসহকারে তা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। হেডমিস্ট্রেসের তাই একান্ত ইচ্ছা, তিনি তাঁর এই সুযোগ্য সহকারীর উপর স্কুলের সব ভার অর্পণ করে অবসর গ্রহণ করবেন। তাঁর আরও একটা ইচ্ছা, তিনি ওতিলের মতো রূপবতী মেয়ের সঙ্গে সহকারীর বিয়ে দিয়ে তাকে সংসারী করে তুলবেন। এই বিয়ের ব্যাপারে শার্লোতের সম্পত্তির অভাব হবে না-একথা তিনি একরকম ধরেই নিয়েছিলেন।
স্থপতি চলে গেলে একদিন শার্লোতে গাঁয়ের সব ছেলেদের সহকারীর সামনে ডাকল। তাদের শৃঙ্খলাবোধ শেখবার জন্য রোজ বাগানবাড়ির অফিস ঘরে তাদের ডাকা হতো। তাদের যে পোশাক বিলি করা হতো তাই পরে তারা সারবন্দিভাবে আসত। তারা গাঁয়ের পথঘাট ও পাক সর্ব পরিচ্ছন্ন রাখত এবং সব সময় গাঁয়ের মধ্যে শৃঙ্খলা রক্ষা করে চলত। ওতিলে ভার নিয়েছিল গাঁয়ের মেয়েদের সংঘবন্ধ করে তাদের সূচিশিল্প ও কিছু কুটিরশিল্পের কাজ শেখাবার। ওতিলে সহকারীকে বলল, আমি কিন্তু এইসব মেয়ের কোনও পোশাক বিলি করি না। ওদের প্রত্যেকের পোশাক আলাদা।
সহকারী প্রতিটি ছেলেকে অল্প দু-চার কথা বলে বোঝাল। তারপর বলল, আমি তোমার এই কাজকে সমর্থন করি। স্কুলের ছেলেদের একই জাতীয় ও একই রঙের। পোশাক পরার প্রয়োজনীয়তা আছে। এতে তাদের সাম্যবোধ ও ঐক্যভাব জাগে। এক সামরিক শৃঙ্খলাবোধ ও আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হয়ে ওঠে তাদের মন। কিন্তু মেয়েদের তা প্রয়োজন হয় না। মেয়েরা সকলে এক কাজ করলেও তাদের স্বাতন্ত্র্যবোধ ও ব্যক্তি চেতনা খুবই প্রখর। তারা কন্যারূপে স্ত্রীরূপে ও মাতারূপে যখন যেভাবেই থাকুক না কেন, যে কাজই করুক না, মনে মনে তারা একক ও স্বতন্ত্র রয়ে যায়। কোনও নারীর সঙ্গে অন্য কোনও নারীর সর্বতোভাবে কখনই মিল হয় না। এই স্বাতন্ত্র্যবোধকে প্রথম। থেকে বিলুপ্ত করে না তার মধ্যে তাদের সার্থক হয়ে ওঠার সুযোগ ও শিক্ষা দিতে হবে।
সহকারী শার্লোতেকে বলল, ছেলের শিক্ষা দেবার সময় বেশি কথা না বলে তাদের থেকে কাজ আদায় করে নিতে হবে। তারা কিভাবে কতখানি কোনও বিষয় বুঝতে পারল সেটা তীক্ষ্ণভাবে লক্ষ্য করতে হবে। তবে এ বিষয়ে ওতিলের বুদ্ধিমত্তাকে স্বীকার না করে পারল না সে।
শার্লোতে এটাই চাইছিল। তার বহু দিনের গোপন ইচ্ছাটা অনুকূল ঘটনার ঘাতপ্রতিঘাতে ক্রমশ এগিয়ে চলেছিল পুরণের পথে। এডওয়ার্ডের অনুপস্থিতির সুযোগে ওতিলের মনটাকে এডওয়ার্ডের কাছ থেকে ধীরে ধীরে অনেকখানি সরিয়ে আনতে পেরেছিল স্থপতি তার বিচিত্র শিল্পকর্ম ও শিল্পপ্রতিভার মাধ্যমে। এবার সেই মন স্থপতির অবর্তমানে দুর্বারবেগে আকৃষ্ট হলো সহকারীর দিকে।
তাই সহকারী একদিন কথায় কথায় ওতিলেকে বলল, তুমি বোর্ডিং স্কুলে ফিরে গিয়ে তোমার পড়াটা শেষ করে ফেলো। তোমার সহজাত বুদ্ধিমত্তা আছে। তার সঙ্গে শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা চাই। অল্পের জন্য এটাকে অপূর্ণ রেখো না।
ওতিলে একবারও প্রতিবাদ করল না। শার্লোতে একথায় খুশি হলো। সে এটাই চাইছিল। এতে দুদিকই বজায় থাকবে। সে নিজে যদি ওতিলেকে জোর করে বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দিত তাহলে ও এডওয়াড দুহজনেই তার উপর রাগ করত, তাকে ভুল বুঝত। কিন্তু সহকারী নিজে এ প্রস্তাব করায় এবং ওতিলে তা সঙ্গে সঙ্গে মেনে নেওয়ায় শার্লোতের কোনও দায়িত্ব রইল না এ ব্যাপারে। অথচ শার্লোতের উদ্দেশ্যটাও এতেই সিদ্ধ হবে। অর্থাৎ এতিলে বোর্ডিং স্কুলে গিয়ে সহকারীর আরও ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসবে। তার প্রতি আরও বেশি করে আসক্ত ও শ্রদ্ধাশীল হবে। আর তখন হেডমিস্ট্রেসের চেষ্টায় ওদের বিয়েটা সহজেই হয়ে যাবে। ওতিলে স্বেচ্ছায় কাউকে বিয়ে করলে এডওয়ার্ডের তাতে কিছুই বলার থাকবে না।
