তবে এই ঝড়ের প্রকোপে কিছুটা কষ্ট পেলেও একটা উপকার এর থেকে পেয়েছে শার্লোতে। সে লুনিয়ানেকে বুঝতে পেরে আগের থেকে আরও অনেক নিবিড়ভাবে। সে এখন বড় হয়েছে। তার পছন্দ অপছন্দ, খেয়াল খুশি, মনের গতিপ্রকৃতি এত কাছে থেকে এমন করে জানার দরকার ছিল তার।
শুধু লুসিয়ানে নয়, সে যাকে বিয়ে করতে চলেছে, যে হবে তার সারা জীবনের সঙ্গী তাকেও এই সুযোগে খুব ভালো করে জানতে পারল শার্লোতে। লুসিয়ানের বয়স কম। সে যেন তার প্রথম প্রেমের নায়ক নির্বাচনে ভুল করেনি, তার নির্বাচন যে তার জীবনের পক্ষে এমন কিছু অশুভ হবে না। এটা মা হিসাবে তার জানা দরকার ছিল। লুসিয়ানের ভাবী স্বামী ব্যারন যুবকটিতে ভালোই লাগল শার্লোতের। ধনী অভিজাত বংশের ছেলে। প্রচুর বিষয় সম্পত্তির মালিক। পড়াশুনা খুব একটা করেনি। তবু তার রুচিবোধ উন্নত ও মার্জিত। তার আচরণ ভদ্র ও সৌজন্যমূলক। সুতরাং তার উপর। স্বচ্ছন্দে তার মেয়ের সব ভার সারা জীবনের জন্য ছেড়ে দিতে পারে শার্লোতে।
লুসিয়ানে চলে যাবার পর তার ব্যাপারে মনে একটা আঘাত পেল শার্লোতে। কোনও এক প্রতিবেশীর বাড়িতে পরোপকারের ঝেকে এমন সব বাড়াবাড়ি করে গেছে। যা সত্যিই লজ্জা ও দুঃখের কথা। স্থানীয় কোনও এক অভিজাত পরিবারের একটি অল্পবয়সী মেয়ের মাথাটা কোনও এক ঘটনার পর থেকে খারাপ হয়ে যায়। মেয়েটি বছর কতক আগে ঘটনাক্রমে তার ছোট ভাই-এর মৃত্যুর কারণ হয়ে পড়ে। সেই থেকে তার একটা ধারণা জন্মায় সমাজের লোক তাকে তার মৃত্যুর জন্য দায়ী করছে। অথচ এটা শুধূ তার মনের ভয় মাত্র। এই কাল্পনিক ভয় তার এত বেড়ে গেছে যে সে কোনও সভা বা অনুষ্ঠানে যেত না। বাড়িতে অতিথিদের সামনেও বার হতো না। একটা আধো অন্ধকার ঘরের মধ্যে চুপচাপ সব সময় বসে থাকত মেয়েটি।
লুসিয়ানে সব কিছু শুনে বলল মেয়েটিকে সে ভালো করে তুলবে। স্বামী ও বিষাদগ্রস্ত মানুষদের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতে পারার এক বিরল কৃতিত্ব এর আগে দেখাতে পারায় লুসিয়ানের আত্মবিশ্বাস ক্রমে এক উগ্র আকার ধারণ করে। সে জেদ ধরে মেয়েটিকে সে ভালো করে তুলবেই। তার অপ্রকৃস্থিত মন প্রকৃতিস্থ করে তুলবে। এই বলে একদিন লুসিয়ানে মেয়েটির ঘরে গিয়ে নানাভাবে তার মন জয় করে ফেলে। মেয়েটি লুসিয়ানের কথায় ঘর থেকে বাইরে ভোজসভায় এসে হাজির হয়। এতে তাড়াহুড়ো না করে লুসিয়ানে যদি মেয়েটিকে ধীরে ধীরে ভালো করে তোলার চেষ্টা করত, প্রথমেই এত লোকের সঙ্গে বার না করে একে একে কিছু কিছু লোকের সামনে বার করে মেয়েটির মনের ভয় দূর করার চেষ্টা করত তাহলে সে অবশ্যই সফল হতো। তা না করে হঠাৎ সকলের সামনে মেয়েটিকে বার করে ভুল করল লুসিয়ানে। তাছাড়া সেই ভোজসভায় লোকজনদের মেয়েটি সম্বন্ধে সব কথা বুঝিয়ে বলে সাবধান করে দেয়নি।
ফলে মেয়েটি ভোজসভায় আসার সঙ্গে সঙ্গে সকলে তার পানে চাইতে লাগল কৌতূহলী হয়ে। অনেকে তার পানে সন্দেহজনকভাবে তাকিয়ে নিজেদের মেধ্য ফিসফিস করে কথা বলতে লাগল। ফলে মেয়েটির সেই কাল্পনিক ভয়টি বাস্তবে পরিণত হলো। মেয়েটি হঠাৎ তীব্র চিঙ্কারে ফেটে পড়ল। সে ছুটতে ছুটতে তার ঘরের মধ্যে চলে গেল। এই সময় ওতিলেও সেখানে ছিল। সে লজ্জায় পড়ে যায় লুসিয়ানের কাণ্ড দেখে। ওতিলে অবশ্য তৎক্ষণাৎ মেয়েটিকে ঘরে নিয়ে গিয়ে তার সেবা করতে থাকে। কিন্তু সেই থেকে মেয়েটির অবস্থা খারাপের দিকে যেতে থাকে। তার বাড়ির লোকজন বিব্রত হয়ে তাকে হাসপাতালে পাঠাবার ব্যবস্থা করতে থাকে। একথা শোনার পর মেয়ের এই অশোভন আচরণে সত্যিই দুঃখিত হয় শার্লোতে।
এদিকে ওতিলেও সেদিন স্থপতির ব্যাপারে কিছুটা দুঃখিত হয়। এদিন লুসিয়ানে তার ছবিগুলো দেখতে চাইলে তিলে স্থপতিকে তা আনার জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু স্থপতি তা আনেনি।
ওরা সবাই চলে গেলে কথাটা একদিন তুলল ওতিলে। ও তখন ভেবেছিল ওরা সেই সময় তার ছবি দেখার ব্যাপারে ঠিকমতো মনোযোগ দেবে না। তাই তখন আনেনি। যাই হোক, ওতিলে এতে অসন্তুষ্ট হয়েছে জেনে নিজের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাইল স্থপতি।
স্থপতি জানত তার যাবার দিন ঘনিয়ে এসেছে। তবু তার ওতিলেকে ছেড়ে যেতে মন চাইছিল না। স্বল্পভাষিণী ওতিলের বিষাদগম্ভীর মুখ আর অচঞ্চল ব্যক্তিত্বের এমন একটা মোহপ্রসারী আবেদন আছে যার মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিল স্থপতি। যাবার আগে সে একটা অনুষ্ঠান করে ওতিলের সঙ্গে তার সম্পর্কে একটি মুহূর্তকে অবিস্মরণীয় করে রাখতে চাইল।
স্থপতি ঠিক করল সে ক্রিস্টমাস ঈভ বা খ্রিস্টের জন্মোৎসব নিয়ে এক মূক অভিনয়ের অনুষ্ঠান করবে। ওতিলে হবে প্রসূতি মাতা, এক স্বাস্থ্যবান শিশু তার কোলে সদ্যজাত শিশুর মতো শোভা পাবে আর তাদের চারপাশে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকবে কিছু রাখাল বালক।
যথাসময়ে যবনিকা তুললে দেখা গেল শিশুটি ঘুমিয়ে গেছে আর তাকে কোলে নিয়ে নিথর নিস্পন্দ হয়ে বসে আছে ওতিলে। স্বয়ং ঈশ্বরের মাতারূপে সত্যিই মানিয়েছিল তাকে। স্থপতি আলোকসম্পাতের কাছ করছিল। ওতিলের মুখে ঠিক সেই সময়ে যে স্বর্গীয় সুষমা ফুটে উঠেছিল তা কোনও চিত্রকর ফুটিয়ে তুলতে পারে না।
