ওতিলে একদিন কথায় কথায় ব্যারনকে জানাল তারা এতদিন জানত না স্থপতি চলে যাচ্ছে তাদের বাড়ি ছেড়ে। কারণ এখানে পরিকল্পনার কাজ আপাতত বন্ধ থাকবে। তাই শার্লোতে তার জন্য অন্য জায়গায় কাজের চেষ্টা করছিল।
দেখতে দেখতে দারুণ শীত পড়ে গেল। মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়। পথ-ঘাট কাদায় ভরে যায়। বাইরে বেরোনো মুস্কিল হয়ে পড়ে। এমন সময় এ বাড়ির সবচেয়ে সম্মানিত অতিথি কাউন্টপত্নী এসে হাজির হলেন হঠাৎ একদিন।
লুসিয়ানে কথায় কথায় জানতে পারল কাউন্ট নাচগান ভালোবাসেন। একথা জানতে পারার সঙ্গে সঙ্গে সেদিন সন্ধ্যায় বাড়িতে এক গানের আসরের অনুষ্ঠান করল লুসিয়ানে। সে গিটার সহযোগে গান করল। গিটারটা অন্য একজন বাজাল। কিন্তু কাউন্টের সে গান ভালো লাগল না। তখন আবৃত্তি করল লুসিয়ানে। কিন্তু তাতেও মুগ্ধ করতে পারল না বিশেষ কাউন্টকে।
অবশেষে কাউন্ট এক সম্পূর্ণ নূতন ধরনের এক অভিনয়ের জন্য পরামর্শ দিলেন। তাদের। কাউন্ট লুসিয়ানকে ডেকে বললেন, তোমাদের বাড়িতে কত রকমের লোক রয়েছে। তোমার নিজেরও বেশ অভিনয় প্রতিভা রয়েছে। একটা কাজ করো, ভ্যান ডাইকের একটি বিখ্যাত ছবি আছে। সেই ছবিতে যতগুলো চরিত্র আছে সেই চরিত্রগুলো মূক অভিনয়ের দ্বারা জীবন্ত করে তুলতে পার। ছবিতে যে যেভাবে যে ভঙ্গিমায় অবস্থান করছে তোমরাও তাই করবে। ছবিতে চিত্রিত আর ভঙ্গিমাগুলো নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলবে তোমরা।
ছবিটি ভালোভাবে দেখল ওরা। তারপর যার যা ভুমিকা সব বিতরণ করে দেওয়া হলো। ছবিতে আছে কোনও এক মধ্যবয়সী অন্ধ রাজা সিংহাসনে বসে আছে। তার পিছনে রানি দাঁড়িয়ে আছে। রাজার পাশে বাঁদিকে আছে তার সেনাপতি। এছাড়া আছে রানির কিছু সহচরী। রানি একটা টাকার থলে থেকে কিছু মুদ্রা এক ভিখিরীকে দান করতে যাচ্ছে আর এক বৃদ্ধ সহচরী তাকে তা করতে নিষেধ করছে। বলতে চাইছে অনেক দেওয়া হয়েছে। আর না। আর এক সহচরী রানির দেওয়া ভিক্ষা ভিখারীকে দান করছে। ভিখারীটি আছে কিছু দূরে একধারে।
একজন মধ্যবয়সী সুদর্শন ব্যক্তি ওদের দলেই ছিল। তাকে দেওয়া হলো রাজার ভূমিকা। লুসিয়ানে হলো রানি। স্থপতি অবতীর্ণ হলো রাজার পাশে দণ্ডায়মান সেনাপতির ভূমিকায়। বাকী ভূমিকাগুলো ভাগ করে দেওয়া হলো অন্যদের।
স্থপতি কাউন্টের নির্দেশতো মঞ্চসজ্জা আর আলোকসম্পাতের দায়িত্ব নিল। অবশেষে একটি সন্ধ্যায় অনুষ্ঠানটি সুসম্পন্ন হলো। সকলের অভিনয়ই ভালো হলো। লুসিয়নের সাজসজ্জা ও অভিনয় খুব ভাল হলো। তাকে রানি হিসাবে বেশ মানিয়েছিল। স্বভাবত চঞ্চল প্রকৃতির লুসিয়ানে প্রায় সব সময়ই ছটফট করে। এইজন্য গান বা আবৃত্তিতে বিশেষ সার্থকতা অর্জন করতে পারে না। কিন্তু এই মূক অভিনয়ে যে স্থৈর্য ও ধৈর্যের পরিচয় দেয় তা সত্যিই তার আকর্ষণকে বাড়িতে তোলে। অভিনয় মূক হলেও লুসিয়ানের দয়া-মায়া উদারতা ও দানশীলতা প্রভৃতি গুণ ও অন্তরবৃত্তিগুলো যেন এক নীরব ভাষাময়তায় সোচ্চার হয়ে ওঠে একসঙ্গে। তার অন্তরের সব সুষমা মূর্ত হয়ে ওঠে প্রায় তার সুসজ্জিত অঙ্গের মধ্যে। মুখের হাবভাবের মধ্যে।
কাউন্ট খুশি হয় আর এক জায়গায় এই অভিনয়ের অনুষ্ঠান করার কথা বললেন। অভিনয় দেখে শুধু কাউন্ট নয়, উপস্থিত সকলেই খুশি। ছবির নির্জীব মানুষ জীবন্ত হয়ে উঠল অভিনয়ের গুণে। অথচ কারও মুখে কথা নেই। মানুষের নীরব অঙ্গভঙ্গি এমন সুন্দরভাবে বাজয় হয়ে উঠতে পারে না দেখলে তা বোঝা যায় না।
এবার ব্যারন যাবার জন্য প্রস্তুত হতে লাগল তাদের দলবল নিয়ে। স্থাপতিকে বলে দিল, নতুন বছর শুরু হলেই সে যেন ব্যারনের বাড়িতে চলে যায়।
ওতিলেকে কোনও ভূমিকা দেওয়া হয়নি। হয়ত লুসিয়ানের কোনও ইচ্ছা ছিল না এতে। অথচ ওতিলের আকর্ষণ তাদের দলের সবার চাইতে বেশি। লুসিয়ানের থেকেও বেশি। স্বভাবতঃই লুসিয়ানের থেকে স্থির ধীর বলে তার শান্ত স্বাভাবিক সৌন্দর্য আরও বেশি দেখায়।
ওদের অভিনয় আর পাঁচজন দর্শকের মতো ওতিলেও দেখেছিল। তার পাঁচজনের মতোই ওদের অভিনয়ের প্রশংসা করেছিল। তারপর রাত্রিতে শোবার আগে অন্য দিনকার মতো ডায়েরি লিখেছিল ওতিলে। আজকাল তিলে তার ডায়েরিতে নিজের কোনও কথা বা দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার কথা কিছু লেখে না। লেখে শুধু সাধারণভাবে মানবজীবন সম্পর্কে তার মনোভাব বা অভিজ্ঞতার কিছু কথা। সেদিন ওতিলে তার ডায়েরিতে লিখল :
কেউ যখন আমাদের বাড়িতে আসে তখন তার চরিত্র সম্বন্ধে কিছুই জানা যায় না। তাকে বুঝতে হলে জানতে হলে তার কাছে আমাদের যেতে হবে।
একমাত্র শিল্পের মাধ্যমেই মানুষ যেমন জগত্তাকে এড়িয়ে চলতে পারে তেমনি শিল্পের মাধ্যমেই জগতের সঙ্গে খুব বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠবে। খুব বেশি সুখ বা দুঃখের মুহূর্তে এই শিল্পীদের প্রয়োজন হবে আমাদের জীবনে।
বিংশ পরিচ্ছেদ
অবশেষে ওরা চলে গেল। সারা বাড়িটা জুড়ে কয়েক মাস ধরে যেন একটা ঝড় বয়ে গেল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হুল্লোড়, নাচগান, লোকজনের ভিড় লেগেই থাকত, সে ঝড়ের প্রকোপটা সবচেয়ে বেশি সহ্য করতে হয়েছে বাড়ির গৃহিণী শার্লোতেকে। অবশ্য ওতিলোকেও খাটতে কম হয়নি। তবু সে শুধু খেটেই খালাস পেয়েছে, কোনও চিন্তা-ভাবনা করতে হয়নি। এতগুলো সম্মানিত অতিথিদের আদর আপ্যায়নের যথাযথ ব্যবস্থা সব শার্লোতেকেই করতে হয়েছে।
