দিনের শেষে ডায়েরি লেখার একটা বাতিক হয়েছে ওতিলের। এ বাতিক আগে ছিল না। এডওয়ার্ড যাবার পর এই বাতিকে তাকে পেয়েছে। এইদিন সে তার ডায়েরিতে লিখল :
আমরা ভবিষ্যতের পানে তাকাই, কারণ আমরা ভেবে থাকি ইতস্তত প্রবহমান। ঘটনাস্রোতগুলো এদিকে-সেদিকে বইতে বইতে আমাদের হয়ত বা উদ্দেশ্য পূরনের পথে নিয়ে যাবে একদিন। আমরা কোনও সমাবেশে বা অনুষ্ঠানে যেতে ভালোবাসি কারণ আমরা ভাবি এত লোকের মাঝে নিশ্চয় আমরা একজন বন্ধুকে পেয়ে যাব।
অপরের কাছে অন্তরের দ্বার মুক্ত করে দিতে সবাই পারে। এটা সহজ কাজ। কিন্তু অপরের আস্থা অর্জন করতে হলে শিক্ষাদীক্ষা ও মার্জিত রুচির দরকার হয়। বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন যুক্তিবাদীরা প্রায় সবকিছুকেই তুচ্ছ ও হাস্যাস্পদ ভাবে। কিন্তু যারা প্রকৃত জ্ঞানী তারা কোনও কিছুকেই তুচ্ছ ভাবেন না। কোনও এক বয়স্ক লোকের যুবতী মেয়েদের প্রতি বেশ আগ্রহ ছিল। তা দেখে একজন সমালোচনা করে তার এই কাজের। তখন সে বলে, যুবতী মেয়ের ঘনিষ্ঠ সাহচর্যের মাধ্যমে আমি আবার হারানো যৌবনকে ফিরে পেতে পারি আর এটাই সবাই চায়। কোনও প্রেম কখনও দোষের নয়। কিন্তু সেই প্রেমাবেগ বা প্রেমাসক্তি যখন অতিমাত্রায় বেড়ে ওঠে তখনি তা দোষ বা গুণের ব্যাপার হয়ে ওঠে। আমাদের প্রেম হচ্ছে সেই আশ্চর্য ফেনিক্স পাখির মতো। আমাদের এক প্রেমের বস্তু পুড়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে তার ছাই থেকে আর একজন গজিয়ে ওঠে।
ঊনবিংশ পরিচ্ছেদ
লুসিয়ানের আসার অল্প কিছুদিনের মধ্যে সারা অঞ্চলে বেশ নাম করে ফেলল। মানুষকে তার প্রতি আকৃষ্ট বা আসক্ত করার অদ্ভুত একটা ক্ষমতা ছিল তার। আভিজাত্যবোধের কোনও সীমারেখার দ্বারা কখনও নিয়ন্ত্রত হতো না লুসিয়ানে। ছোট বড় নির্বিশেষে যে কোনও মানুষের সঙ্গে সে সহজভাবে যেচে কথা বলত। ভালো লেগে গেলে তার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করত। আবার কউকে কোনও কারণে খারাপ লাগলে তাও মুখের উপরে বলে দিত। অথবা টিপ্পনি কাটত তার উপর।
লুসিয়ানের একটা গুণ ছিল। সেটা হলো তার দানশীলতা। আর একজন সহচর বা সহচরীর হাতে সব সময় টাকার একটা থলে থাকত। যে কোনও জায়গায় যে কোনও মানুষকে কিছু দেবার ইচ্ছা জাগলেই তৎক্ষণাৎ হুকুম করত লুসিয়ানে এবং তার হুকুমমতো সেই টাকা তাকে দিতে হতো। কেউ কিছু তার কাছে চাইলে বড় একটা বিমুখ হতো না। একদিন এক জায়গায় এক বৃদ্ধাকে শীতে কষ্ট পেতে দেখে একটা দামী শাল তার গায়ে নিজের হাতে জড়িয়ে দিল। সে এমন আন্তরিকতার সঙ্গে তা দিল যে বৃদ্ধা কোনও প্রতিবাদ করার অবকাশ পেল না। না চাইতে অযাচিতভাবে সে তা দিল।
একটি বাড়িতে এক যুবক যুদ্ধে গিয়ে একটি হাত হারায়। সে বড় ঘরের ছেলে। কিন্তু কোনও জায়গায় বা ভোজসভাতে গেলেই সবাই তার কাটা হাতটির কথা জিজ্ঞাসা করত বলে সে কোথাও যেত না। লজ্জাবোধ করত পাঁচজনের কাছে যেতে। সে তাই বিষণ্ণ হয়ে চুপচাপ বাড়িতে বসে থাকত। জীবন ও জগতের প্রতি একে একে সব আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল সে। এমন সময় একদিন ঘটনাক্রমে তার কথা জানতে পেরে তার সঙ্গে আলাপ করল লুসিয়ানে। সে তাকে জোর করে একটি ভোজসভায় নিয়ে গেল। তাকে যত্ন করে পাশে বসাল। নিজের হাতে তার খাবার ঠিক করে দিল যাতে খেতে কোনও অসুবিধা না হয়। ছেলেটি অবাক হয়ে গেল তার প্রতি লুসিয়ানের সদয় ব্যবহার দেখে। যাকে কেউ দেখতে পারে না, যে একরকম সকলের নিকট অবাঞ্ছিত তার প্রতি লুসিয়ানের আগ্রহ দেখে সবাই তার প্রশংসা করতে লাগল। এমনকি তার প্রেমিক ও তার ভাবী স্বামীও এর জন্য কোনওরূপ ঈর্ষাবোধ না করে খুশি হলো। এদিকে যুবকটিও নূতন করে বাঁচার আনন্দ খুঁজে পেল এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উৎসবে যেতে শুরু করল।
কিন্তু লুসিয়ানের এত গুণের মাঝে একটা দোষ ছিল। তা হলো ওতিলের প্রতি অহেতুক বিরাগ। ওতিলের প্রতি তার এই মনোভাবের অবশ্য কারণ ছিল। সেটা তার স্বভাবগত। কারণ ওতিলের স্বভাবটা ছিল লুসিয়ানের ঠিক বিপরীত। লুসিয়ানে যতখানি বহির্মুখী ছিল ওতিলে ছিল ঠিক ততখানি অন্তর্মুখী। ওতিলে সব সময় ঘর সংসারের কাজকর্ম নিয়ে থাকত, কোথাও কোনও অনুষ্ঠানে যেতে চাইত না দেখে ভীষণ রেগে যেত লুসিয়ানে। এজন্য সময়ে-অসময়ে কথায় কথায় ওতিলেকে আঘাত দিতে ছাড়ত না লুসিয়ানে। স্থপতির প্রতি তার বিশেষ আগ্রহের কারণও ছিল ওতিলে। লুসিয়ানে বাড়িতে আসার পর থেকে লক্ষ্য করে স্থপতির প্রতি ওতিলের এক সশ্রদ্ধ আসক্তি আছে। স্থপতির কাজকর্মের প্রশংসার পঞ্চমুখ ওতিলে। তাই ওতিলের কাছ থেকে কৌশলে স্থপতিকে সরিয়ে আনার জন্যই সে স্থাপতির প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখাতে থাকে ওতিলের সামনে।
কিন্তু লুসিয়ানে জানত ওতিলে স্থপতিকে পছন্দ করলেও ভালোবাসত না। ওতিলে শুধু একজনকেই ভালোবাসত। সে হলো এডওয়ার্ড। তার অন্তরের প্রেমের আসনটিতে তখনও ছিল এডওয়ার্ডের একাধিপত্য।
এদিকে লুসিয়ানের ভাবী স্বামী স্থপতির সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে উঠল। স্থপতি সম্বন্ধে তিলে যা যা জানত তা সব বলল তার কাছে। লুসিয়ানের ভাবী স্বামী ব্যারন যুবকটির সহজাত এক শিল্পানুরাগ ছিল। স্থাপতি নিজে একজন শিল্পী বলে তার সঙ্গে সহজেই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল অল্পদিনের মধ্যে। বিশেষ করে ছবি সংগ্রহের ব্যাপারে। কালানুক্রিমকতা সম্বন্ধে স্থপতির সঙ্গে আলোচনা করে অনেক কিছু জানতে পেরেছিল। ব্যারন। সে একবার লুসিয়ানের কাছে প্রস্তাবও করল যে তাদের বাড়ি সাজাবার জন্য স্থপতিকে একবার নিয়ে যাবে। লুসিয়ানেও খুশি হয়ে মত দিল তাতে।
