লুসিয়ানে সবচেয়ে আনন্দ পায় ঘোড়ায় চড়ে। তার ভাবি স্বামীর অনেক ভালো ভালো ঘোড়া আছে। সে তাই যখন-তখন যে কোনওদিন ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতে যায়। ঝড়-বৃষ্টি, রোদ বা ভালো-মন্দ আবহাওয়ার কোনও বাছবিচার করে না।
লুসিয়ানে বড় হঠকারী। যখন যেটা চাইবে তা তার চাই। যখন যেখানে যাবে বলবে, যে কোনও মুহাতেই সেখানে চলে যাবে সে। যেখানে ঘোড়ায় চেপে যাওয়া যায় না, সেখানে ঘোড়া থামিয়ে হেঁটে যাবে। অবস্থা বা পোশাক-পরিচ্ছেদের কথা সে মোটেই গ্রাহ্য করে না। তার ফাই-ফরমাশ খাটতে হিমসিম খেয়ে যেতে লাগল বাড়ির ঝিরা।
লুসিয়ানাকে দেখে মনে হতে লাগল সে যেন বিরাট পুচ্ছবিশিষ্ট জ্বলন্ত ধূমকেতু। সে যেখানে যায় তার দলবল যায় তার সঙ্গে। এদিকে শার্লোতেও এত বড় ঘরে ও ভালো বরে মেয়ের বিয়ে দেবার গৌরবে গৌরববোধ না করে পারল না। সে তাই তার ভাবী কুটুম্বদের যথাসাধ্য আপ্যায়িত করে তাদের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করতে লাগল। শিকার, মাছধরা, বাগানের কাজকর্ম দেখাশোনা করা প্রভৃতি বিভিন্নভাবে তাদের প্রীত করার ব্যবস্থা হলো।
লুসিয়ানে ঘরের ভিতর বসে থাকতে ভালোবাসে না। সে বেড়াতে যেতে ভালোবাসে। শুধু প্রকৃতি ও জীবন্ত মানুষদের সে ভালোবাসে। তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে চায়। তাই স্থানীয় প্রতিবেশীদের বাড়ি শেষ করে দূর অঞ্চলে সে কখনও ঘোড়ায় চেপে, কখনও বা গাড়িতে করে সদলবলে বেড়াতে যেতে শুরু করল। ফলে যাদের বাড়ি যেত লাগল তারাও প্রতিদানে বেড়াতে আসতে লাগল। এইভাবে বাড়িতে অতিথিদের আসা-যাওয়ার ধুম পড়ে গেল।
ওতিলে কিন্তু কোথাও যায় না। সে সব সময় শার্লোতের পাশে থেকে ঘর সংসারের কাজে তাকে সাহায্য করে যায়।
লুসিয়ানের একটা ঝোঁক ছিল সমাজের অভিজাত লোকদের প্রতি। তার সঙ্গে যারা এসেছিল তারা সকলেই অভিজাত সামন্ত শ্রেণীর। তাদের জন্মদিন পালন করে ও তাদের সম্মানার্থে নানা প্রীতিভোজের ব্যবস্থা করে তাদের প্রীত করার চেষ্টা করছিল সে। কিন্তু জ্ঞান ও বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিদের কোনও পরামর্শ সে গ্রহণ করত না।
এমন সময় হঠাৎ একদিন স্থপতির উপর চোখ পড়ল খেয়ালী লুসিয়ানের। স্থপতির সুন্দর বলিষ্ঠ চেহারা, কালো চুল, স্বচ্ছ দৃষ্টি, সপ্রতিভ চোখ-মুখ এবং স্বল্পভাষিতা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। যা কিছু প্রশ্ন করা হয় স্থপতিকে সে চটপট তার চমৎকার উত্তর দেয়।
লুসিয়ানের অনেক অদ্ভুত খেয়ালের মধ্যে একটা হলো পোশাক বদলানো। দিনের মধ্যে সে চারবার পোশাক বদলায়। সে ভালো অভিনয় করতেও পারে। বিভিন্ন ছদ্মবেশও ধারণ করতে পারে। মাঝে মাঝে কখনও ছেলে বা চাষি মেয়ের পোশাক পরে লোককে অবাক করে দেয়। কখনও বা বৃদ্ধার পোশাক করে। অথচ তাতে তার মুখের উজ্জ্বল তারুণ্য আরও ভালো করে ফুটে ওঠে।
লুসিয়ানের সাঙ্গপাঙ্গ ও ফাইফরমাশ খাটার লোকের অভাব ছিল না। সে যখন বাড়িতে গান করত বা অভিনয় করে অতিথিদের আনন্দ দিত তখন একটি যুবক তার সঙ্গে পিয়ানো বাজাত; সে ভালোই বাজাতে পারত। কারণ সে লুসিয়ানের নাচ-গান বা অভিনয়ের গতি-প্রকৃতি ভালোই জানত। হঠাৎ একদিন তাদের বাড়ির স্থপতি যে একজন গুণী শিল্পী তা আবিষ্কার করে বসল।
একদিন তার পিয়ানো বাদককে ডেকে শবযাত্রার করুণ সুর বাজাতে বলল আর নিজে এক বিধবা রানির বেশ ধারণ করে শবযাত্রার আগে আগে ধীর গতিতে যাবার
ভূমিকাটা সুন্দরভাবে দেখাল। তাকে ঠিক বিধবা রানির মতোই মানাচ্ছিল।
হঠাৎ লুসিয়ানে তার এক সঙ্গীকে স্থপতিকে ডেকে আনার কথা বলল। বাড়ির সবাই তার অভিনয় দেখার জন্য জড়ো হয়েছিল। শুধু স্থপতি আসেনি।
স্থপতি আসার সঙ্গে সঙ্গে লুসিয়ানে তার সামনে এক ব্ল্যাকবোর্ডে একটা সুন্দর স্মৃতিস্তম্ভের ছবি আঁকার জন্য অনুরোধ করল। প্রথমে বেশ কিছুটা কুণ্ঠাবোধ করছিল স্থপতি। পরে তার অনুরোধ আর জেদের বশবর্তী হয়ে সে ঘরের মাঝখানে গিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে কতকগুলো রেখার আঁচড় কাটতে কাটতে একটা সুন্দর স্মৃতিস্তম্ভ এঁকে ফেলল। সবাই তা দেখে প্রশংসা করতে লাগল।
এরপর স্বাভাবিকভাবেই উপস্থিত দর্শকদের সপ্রশংস মুগ্ধ দৃষ্টি দুইভাগে ভাগ হয়ে গেল। একদল দেখতে লাগল বিধবা রানির ভূমিকায় অবতীর্ণা লুসিয়ানাকে আর একদল দেখতে লাগল কৃতি শিল্পী স্থপতিকে।
অনুষ্ঠান শেষে লুসিয়ানের প্রেমিক ও ভাবী স্বামী ব্যারন যুবকটি আলাপ করল স্থপতির সঙ্গে। বলল, আপনি তাড়াতাড়ি এঁকেছেন, তবু আপনার হাত ভালো। আমি আপনার এই ছবি একটা রেখে দেব। আপনি আমাকে এঁকে দেবেন।
স্থপতি বলল, আমার আরও ছবি আছে যেগুলো যত্ন করে আঁকা।
ওতিলেও পাশে দাঁড়িয়েছিল। ওতিলে বলল, হ্যাঁ উনি চার্চের নতুন বাড়িতে সব ছবি ও সাজসজ্জার কাজ করেছেন।
ওদের কথার মধ্যে হঠাৎ লুসিয়ানে এসে হাজির হলো।
লুসিয়ানে হুকুম করল স্থপতিকে, তোমার যত ভালো ছবি আছে সব এখনি নিয়ে এসে দেখাও।
স্থপতি বলল, এখন না, অন্য সময়ে দেখাব।
লুসিয়ানে বলল, কোনও কথা নয়, রানির হুকুম।
ওতিলে ফিসফিস করে স্থপতিকে বলল, ঠিক আছে তাই নিয়ে এস।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও চলে গেল স্থপতি। তবে কিছু ছবি আনল না।
এদিকে লুসিয়ানের মাথায় হঠাৎ একটা খেয়াল এসে জুটল। তার নাকি একটা পোষা বাঁদর আছে। সেটা আর চাকর কুঁড়েমি করে আনেনি। সে তার মায়ের কাছে গিয়ে বলল, একটা লোক পাঠিয়ে বাঁদরটাকে আনাও। ওর একটা ছবি আঁকিয়ে নেব স্থপতিকে দিয়ে। শার্লোতে লাইব্রেরি ঘর থেকে নানারকম বাঁদরের ছবির একটা বই আনিয়ে দিল লুসিয়ানকে। লুসিয়ানে আপাতত শান্ত হয়ে তাই পর পর আনন্দের সঙ্গে দেখতে লাগল। এদিকে নৈশভোজের ডাক পড়তে সব চাপা পড়ে গেল।
