অবশ্য দ্বীপ অভিমুখে চলতে থাকলে বোটটা মিস করবে তাদেরকে। তারা ভাসতে ভাসতে এখন অনেক দূর চলে এসেছে।
হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বোটটাকে ডাকতে শুরু করলো স্যাম ও রেমি। তবে বাতাসের গর্জনে তাদের কণ্ঠস্বর অতোটা দূরে যেতে পারছে না।
অসহায়ভাবে ওভাবেই কয়েকমিনিট বোটটার দিকে তাকিয়ে রইলো ওরা। তারপর দেখলো হুট করেই বোটটা দ্বীপ অভিমুখ থেকে সরে গেছে। দ্বীপের দিক থেকে ঘুরে এখন এগিয়ে আসছে তাদের দিকে।
আবারো ডাকতে শুরু করলো স্যাম ও রেমি। গলার স্বর ভেঙে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ডেকেই গেলো। অনন্তকাল ধরে ডাকার পরে যেন অবশেষে তাদের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছে বোটটা। চোখ ধাঁধানো আলোতে প্রায় অন্ধ হয়ে যাওয়ার অবস্থা ওদের। আলো সইতেই দেখলো যে প্রাচীন, জং ধরা, পেট মোটা একটা বোট এগিয়ে আসছে তাদের দিকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের পাশে থামলো বোটটা। ওপর থেকে তাদের দিকে দড়িতে বাধা লাইফ প্রিজার্ভার ছুঁড়ে দিলো কেউ। কে ছুঁড়েছে সেটা নিয়ে না ভেবে প্রথম লাইফ প্রিজার্ভারটা খাবলে ধরে রেমিকে দিয়ে দিলো। রেমি নিরাপদভাবে ওপরে উঠেছে দেখার পর নিজে খাবলে ধরলো অন্য প্রিজার্ভারটা। কেউ একজন টেনে তুলছে তাকে।
ওপরে উঠতেই দেখলো এন্টোনিও তাকিয়ে আছে তার দিকে। সেই টেনে তুলেছে তাদেরকে।
ধন্যবাদ, স্যাম বলল।
তরুণ ছেলেটা মুচকি হেসে বলল, ধন্যবাদ আমাকে না, আমার চাচাকে দিন। বলে হাল ধরে রাখা ধূসর চুলের লোকটার দিকে ইশারা করলো এন্টোনিও। ভিতরে চলুন।
পথ দেখিয়ে তাদেরকে কেবিনে নিয়ে গেলো স্যাম। তাদেরকে দেখে তরুণ একটা লোকের হাতে হাল ছেড়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে এলো এন্টোনিওর চাচা।
এন্টোনিও লোকটার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, ইনি আমার চাচা। হেনরিকে সালাযার।
লোকটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে স্যাম বলল, আপনাকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষাও জানা নেই আমাদের।
হেনরিকেও হাত মিলাযলো তাদের সাথে। তারপর পর্তুগিজ ভাষায় কিছু বলে মৃদু ধাক্কা দিলো এন্টোনিওকে।
লোকটার কথা শুনেই হাসি ফুটে উঠলো এন্টোনিওর মুখে। স্যাম ও রেমিকে কম্বল দিতে দিতে বলল, চাচা বলছেন, যদি তিনি না এখানে না আসতেন, তাহলে আমাকে আমার প্রথম বড়ো ভাড়াটা হারাতে হতো। তারপর আমাকে সাহায্য করা লাগতো তাঁর। তখন আরো মহাবিপদে পড়া লাগতো চাচাকে। হাহাহা।
এন্টোনিওর হাস্যরসপূর্ণ কথা শুনে মানসিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে ওরা। রেমি তো প্রায় জড়িয়েই ধরতে চেয়েছিলো ছেলেটাকে। তখনই টের পেলো যে এখনো শরীর ভিজে আছে তার। তাই বলল, তোমার কো আজীবন ঋণী হয়ে থাকবো আমরা।
কিভাবে বুঝলে যে আমাদের খোঁজা লাগবে? স্যাম জানতে চাইলো। দ্বীপের এতো কাছে থাকবো তাই বা বুঝলে কিভাবে? আমাদের তো আগামীকালের আগে ফিরে যাওয়ার কথা ছিলো না।
সকালে আপনারা যাদের সাথে করে গলফিনহোতে উঠেছিলেন, তাদেরকে চিনতাম না আমি। ক্যাপ্টেন ডেলগাড়োকেও চোখে পড়েনি। তাই চাচাকে গিয়ে জানাই এটা। তখন চাচা বলল, ক্যাপ্টেনের কখনোই ঝড়ের আগে আগে আপনাদেরকে নিয়ে বেরুনোর কথা না। সন্দেহ জাগলো চাচার। তাই খুঁজতে বের হওয়া। আর চাচা এদিকের পানিতেই মাছ ধরে। এখানের সব কিছুই হাতের উল্টোপিঠের মতো চিনেন তিনি। স্নেক আইল্যান্ডে পৌঁছুতেই পানির স্রোত দেখে চাচা বুঝে ফেলে যে আপনারা কোথায় আছেন।
****
পরদিন ভোর সকালে এসে বন্দরে পৌঁছালো ওরা। রাতে বোটে তারা দুজনই খুব ভালোভাবে ঘুমিয়েছে। বন্দরে পৌঁছেই চলে গেলো হেনরিকের বাড়িতে। আটলান্টিকের তীরবর্তী দুই বেডরুমের বাংলোতে বসে পুলিশের কাজ শেষের অপেক্ষা করছে এখন। বিকালের দিকে তাদের ডাইভিংর সরঞ্জামগুলো নিয়ে ফিরে এলো পুলিশের লোকেরা। আপাতত এগুলোই খুঁজে বের করতে পেরেছে ওরা। সাথে জানালো যে তারাগলফিনহোকেও খুঁজে পেয়েছে, পানিতে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিলো বোটটা। এরপর পুলিশকে স্টেটমেন্ট দিয়ে সব কাজ শেষ হতে হতে প্রায় সন্ধ্যার মতো লেগে গেলো ওদের। সন্ধ্যায় এন্টোনিওকে ছেড়ে দিতে চাইলেও, এন্টোনিওই জোরাজুরি করলো যে সে ই তাদেরকে সাও পাওলোর হোটেলে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। সন্ধ্যায় ড্রাইভ করতে কোনো সমস্যা হবে না তার।
তুমি আর তোমার চাচা আমাদের জীবন বাঁচিয়েছো, সাও পাওলোর দিকে যাওয়ার পথে এন্টোনিওকে বলল স্যাম। ছেলেটা আসলেই ভালো গাড়ি চালাতে জানে। তোমাদের এই ঋণ আসলেই কখনোই আমাদের পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব না। তবে তোমার চাচা কোথায় থাকে তা এখন জানি আমরা। বাসায় ফিরেই তোমাদের দুজনের জন্য কিছু পাঠানোর চেষ্টা করবো আমরা।
আগের রাতেই এটা নিয়ে রেমির সাথে আলোচনা করেছে স্যাম। এন্টোনিওকে একটা বৃত্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার চিন্তা করেছে ও। এতে করে ছেলেটার বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল স্কুলের খরচটা মিটে যাবে। আর তার চাচাকে দিবে একটা নতুন বোট, সাথে সাথে তার কাজিনের জন্যও একটা শিক্ষাবৃত্তি দিবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গাড়ি থেকে নেমে রেমি ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমরা কখনোই ভুলবো না তোমাকে, এন্টোনিও। শীঘ্রই আবার যোগাযোগ করবো তোমার সাথে।
****
হোটেল রুমে টেবিলের সামনে বসে আছে স্যাম ও রেমি। কেউই কোনো কথা বলছে না। স্যাম জানে এখন তাদের আলোচনা করা উচিৎ, বিশেষ করে তাদের দলে থাকা কেউ একজনের পরিকল্পনা ফাঁস করার ব্যাপারটা নিয়ে। তবে এটা নিয়ে রেমিকে চাপ দেওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই তার।
