দ্য সলোমন কার্স

 ০১. গোয়াডালক্যানেল, সলোমন আইল্যাণ্ড, ১১৭০ এ.ডি.

 

বিশ্বের এক নম্বর অ্যাডভেঞ্চার লেখক ক্লাইভ কাসলার-এর — দ্য সলোমন কার্স
সহযোগী লেখক : রাসেল ব্লেক

রূপান্তর: সাঈম শামস্

অনুবাদকে উৎসর্গ

আফসানা আক্তার বিন্দু
প্রায় চার বছরের বন্ধুত্বের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি,
“সব মেয়ে খারাপ নয়” এই বাক্যটিকে সঠিক প্রমাণ করেছ তুমি।

.

পাঠকদের উদ্দেশে কিছু কথা

প্রথমেই ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমার অনুবাদের উপর ভরসা রেখে ক্লাইভ কাসলার-এর দ্য সলোমন কার্স সংগ্রহ করার জন্যে। যারা আমার অনূদিত ব্ল্যাক অর্ডার বা শক্ ট্রিটমেন্ট পড়েছেন তারা ইতিমধ্যে জানেন আমি কেমন অনুবাদ করি।

ব্ল্যাক অর্ডার ও শক্ ট্রিটমেন্ট-এর ভাবানুবাদ যেভাবে পাঠকদেরকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছিল এবার দ্য সলোমন কার্স সেই সম্ভষ্টির মাত্রাকে অতিক্রম করতে পারবে আমার বিশ্বাস।

দ্য সলোমন কার্স ট্রেজার হান্টিং থ্রিলার নভেল। অর্থাৎ, গুপ্তধন উদ্ধার সম্পর্কিত রোমাঞ্চ উপন্যাস। কাহিনি সংক্ষেপ যেহেতু পেছনের কভারে দেয়া আছে। আমি বরং এখানে পাঠকদেরকে এই বইয়ের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে একটু ধারণা দিচ্ছি।

বইটির প্রথম অংশে বেশ সময় নিয়ে টুকরো টুকরো দৃশ্যের সাহায্যে কাহিনির গাঁথুনি শুরু হয়েছে, পাশাপাশি পাঠককে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন চরিত্রের সাথে। অতএব, প্রথম অংশ একটু ধীর গতিতে এগিয়েছে। তারপর দৌড়, একটু বিশ্রাম, আবার দৌড়, আবার একটু বিশ্রাম; এভাবে চক্রাকারে এগিয়েছে উপন্যাসের কাহিনি। শেষ অংশে গিয়ে আর বিশ্রাম নেই। শুধু দৌড়! একদম নাভিশ্বাস তুলে তারপর পাঠকদের রেহাই দিয়েছেন ক্লাইভ কাসলার।

বইটি অনুবাদ করার জন্য আমাকে দিয়েছিলেন সম্মানিত প্রকাশক রিয়াজ খান। তার পছন্দের বই। পড়তে গিয়ে আমারও পছন্দ হয়েছে। আর অনুবাদ করে তো এখন প্রেমেই পড়ে গেছি।

পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানচ্ছি যে, এবার প্রথমবারের মতো নিজেই নিজের বইয়ের প্রুফ দেখে প্রয়োজনীয় সংশোধন করেছি। হয়তো তারপরও শতভাগ নিখুঁত করতে পারিনি তবে বানান বিভ্রাটে পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে বলে আমার বিশ্বাস।

আশা করছি, দ্য সলোমন কার্স পাঠকদের ভাল লাগবে। পাঠকবৃন্দ, অনেক কথা হলো, আর দেরি না করে এবার ফারগো দম্পতির সাথে গুপ্তধন উদ্ধার অভিযানে যোগ দিন! শুভ কামনা রইল।

-সাঈম শামস
উত্তরা, ঢাকা

.

.

প্রস্তাবনা

গোয়াডালক্যানেল, সলোমন আইল্যান্ড, এক সপ্তাহ আগে

জীবন বাঁচাতে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে প্রাণপণ দৌড়াচ্ছে আলভো। ছুটতে ছুটতে একটু থামল ও। রাস্তা খুঁজছে। ঘাম গড়াচ্ছে কপাল বেয়ে। গাছের ডালপালার খোঁচা লেগে ওর এখানে ওখানে ছড়ে গেছে, রক্ত ঝরছে জখম থেকে। পেছন থেকে আওয়াজ ভেসে আসতেই ব্যথাকে পাত্তা না দিয়ে আরও জোরে ছুটল ও।

জলধারা বয়ে যাচ্ছে। জঙ্গলের আরও ভেতরে কিংবা সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে। এই ধারা।

আওয়াজ শুনতে পেল ও।

কুকুর।

খুব বেশি পিছিয়ে নেই ওগুলো।

আলভোকে এগোতেই হবে। যারা ধাওয়া করছে ও যদি তাদের হাতে ধরা পড়ে তাহলে তার পরিণাম হবে মরে যাওয়ার চেয়েও জঘন্য।

নগ্ন পায়ে পানি মাড়িয়ে এগোতে শুরু করল আলভো। চোখা পাথরে খোঁচা লেগে ওর পা কেটে গেল, ব্যথা পেলেও থামল না বেচারা। ওপারে ওকে যেতেই হবে। পানি মাড়িয়ে ওপারে গেলে হয়তো কুকুরগুলো অনুসরণ করতে পারবে না।

চতুরতা নয় স্রেফ সহজাত প্রবৃত্তি খাঁটিয়ে এগোচ্ছে আলডো। ওর বয়স মাত্র ১৭ বছর। কিন্তু আজ যদি ধরা পড়েই যায় তাহলে কিশোর নয়, একজন পুরুষের মতো মরবে ও।

এই ভাবনাটা ওকে আরও শক্তি যোগাল। তাদের হারাতে হবে নয়তো নিজে মরতে হবে। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

পেছনে ডালপালার মচমচানি শুনে আরও গতি বাড়াল আলডো। শব্দটা খুব কাছেই হয়েছে। ওকে আরও দ্রুত ছুটতে হবে। যদি বাঁচতে চায় তাহলে যেভাবেই হোক ধাওয়াকারীদের সাথে দূরত্ব বাড়াতে হবে ওকে।

গোয়াডালক্যানেলের স্থানীয় বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও আলতো কখনও দ্বীপের এই অংশে আসেনি। শুধু আলডো নয়, কেউ-ই আসেনি এখানে। ফলে দ্বীপের এই অংশ সম্পর্কে ওর বিশেষ কোনো জ্ঞান নেই। তাই কোনো কৌশল অবলম্বন করে নিজের জন্য বাড়তি সুবিধাও করতে পারছে না। আলভোর বর্তমান অবস্থা একটা বেকায়দায় পড়া ইঁদুরের মতো। দিশাহারা ও আতঙ্কিত।

পেছন থেকে আওয়াজগুলো আরও কাছে চলে আসছে।

এই ঘোর বিপদে আলডো কীভাবে জড়িয়ে গেল? ওর বিশ্বাসই হতে চাইছে না, এই রাতের অন্ধকারে ও জীবন বাঁচানোর জন্য দৌড়াচ্ছে। ডান পাশে একটা মোটা বাশ উদয় হলো। এক মুহূর্তের জন্য আলডো ভাবল বাশটাকে এড়িয়ে যাবে কিন্তু পারল না।

বাশটা আলভোর ডান পাশে আঘাত করেছে। পাজরের কাছে ব্যথা অনুভব করল বেচারা। তবুও জখমকে পাত্তা দিল না। ওকে সামনে এগোতে

কিন্তু যাবে কোথায়? পেছন থেকে ধেয়ে আসা ব্যক্তিদের এড়িয়ে আলডো কোথায় যাবে? নিরাপদ জায়গা আছে? এই দ্বীপটা বেশ ছোট। ও চাইলে পুরো ঘটনাটাকে একটা দুঃস্বপ্ন ধরে নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারে। কিন্তু বাড়িতে পৌঁছুনোর আগেই তো আলডো ধরা পড়ে যাবে। বাকিদের মতো গায়েব করে দেয়া হবে ওকে। কাউকে কিছু বলারও সুযোগ পাবে না।

বিজলি চমকাল আকাশে। স্বর্গ থেকে যেন বৃষ্টি নামতে শুরু করল। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগোতে এগোতে হাসি ফুটল আলভোর ঠোঁটে। বৃষ্টির কারণে কুকুরগুলো হয়তো ওকে ঠিকঠাকভাবে অনুসরণ করতে পারবে না।

আকাশের এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত ছড়িয়ে গেল বিজলির রেখা। ঝলসে উঠল আকাশ। বাঁ পাশে ভারি পাতায় ঢাকা একটা পথ দেখতে পেল ও। মুহূর্তের মধ্যে আলভো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। জঙ্গলের মাটি বৃষ্টির পানিতে ভিজে গেছে। পানির পাশ ধরে এগোচ্ছে আলডো। কিন্তু ওর কানে এলো কুকুরগুলো ঠিক ওর পিছু পিছুই আসছে। আলডো আর কুকুরগুলোর মাঝে দূরত্ব কম থাকায় এরকমটা হয়েছে।

কুকুরগুলোকে পেছন থেকে খসিয়ে দেয়ার আশা আর করা যাচ্ছে না। দ্রুত এগোতে হবে- ভাবল আলডো। অন্ধের মতো ছুটছে ও, রক্ত ঝরছে পা থেকে।

হঠাৎ পা হড়কে পড়ে গেল আলছো। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ওকে নিচে টেনে নিয়ে গেল। ঢাল বেয়ে নিচে গড়াতে গড়াতে গতি কমাতে চাইল আলডো। আচমকা একটা গাছের গুঁড়ির সাথে আটকে ওর গতি থেমে গেল।

নিজেকে সামলে নেয়ার পর আলো আবিষ্কার করল ওর মাথা আর আঙুলে রক্ত লেগে রয়েছে। ডুবন্ত ব্যক্তির মতো বাতাস ফুসফুসে ভরার জন্য হাসফাস করছে ও। নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে জ্ঞান হারানো ঠেকাতে চেষ্টা করছে আলডো।

পাজর আর বাঁ হাতে তীব্র ব্যথা। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে দেখল ওর হাড় ভেঙ্গে গেছে। কপাল ভাল, পায়ের হাড় ভাঙ্গেনি। ব্যথার কষ্ট আর বৈরি আবহাওয়া ভুলে চারিদিকে চোখ বুলাল ও। প্রায় অন্ধকার সব। উপর থেকে গড়িয়ে পড়ার পর ওর দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে গেছে। ঝাপসা দৃষ্টিতে একটা পথ ওর চোখে পড়ল। সেদিকে এগোল ও।

নিজের হৃদপিণ্ডের আওয়াজ আলভোর কানে ড্রামের মতো বাজছে। সহ্য ক্ষমতার সর্বোচ্চ সীমায় চলে এসেছে ও। প্রতিবার শ্বাস নেয়ার সময় তীব্র ব্যথা হচ্ছে ভাঙ্গা পাজরে। এক কিনারে সরে যেতেই পেছন থেকে আসা আওয়াজ কমতে শুরু করল। অবশেষে ওর মনে হলো, হয়তো এ-যাত্রায় বেঁচে যেতে পারবে।

হঠাৎ গাছের গুঁড়ির সাথে হোঁচট খেয়ে ভূপাতিত হলো আলভোর আছড়ে পড়তেই আর্তনাদ করে উঠল বেচারা। পানি গড়িয়ে পড়ল ওর চোখ দিয়ে। ওর সামনে থেকে পুরো দুনিয়া মুছে গেল।

জ্ঞান হারিয়েছে।

কয়েক মিনিট পর যখন জ্ঞান ফিরল, আলভো দেখল কুকুরের নাক ওর মুখের সামনে গন্ধ শুঁকছে। একজনের কথা শুনতে পেল ও। কথার শেষ অংশটুকু শুনে আলডো নিশ্চিত হলো ওর জীবনের এখানেই সমাপ্তি। আর কখনও কোনো কথা শোনা হবে না ওর।

‘তুই জানিস না, এই দ্বীপ থেকে পালানো তোর কম্ম নয়?’

মুখের সাথে মগজের সমন্বয় ঘটিয়ে কিছু একটা বলার আগেই আলডোর কপাল বরাবর একটা বুট ধেয়ে এলো। ও কোনো বাধা, আর্জি কিংবা অভিশাপ কিছুই দিতে পারল না। লাথি খেয়ে চোখের সামনে তারা জ্বলতে দেখল আলডো। তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে ওর। বাধা দিতে চাইল, কিন্তু ওর হাত-পাগুলো যেন সীসার মতো ভারি হয়ে গেছে।

আলডো ভাবল, কোথাও একটা গড়বড় হয়েছে। ভুল বোঝাবুঝি কিংবা ভুল হয়েছে কোথাও। ভাবতে ভাবতে আবার ধেয়ে এলো বুট। এবার আগের চেয়ে জোরে আঘাত করল সেটা। লাখির জোর বেশি হওয়ায় মড়াৎ করে আলভোর ঘাড় ভেঙ্গে গেল। বেরিয়ে গেল প্রাণবায়ু। মুখের উপর বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ছে। কিন্তু আলডো আর এখন এসব কিছুই অনুভব করতে পারছে না। অন্য দুনিয়ায় পাড়ি জমিয়েছে সে।

.

০১.

গোয়াডালক্যানেল, সলোমন আইল্যাণ্ড, ১১৭০ এ.ডি.

শান্ত সাগরের বুক থেকে সবেমাত্র সূর্য উঠতে শুরু করেছে। বনের ভেতর দিয়ে এগোচ্ছে দ্বীপের বাসিন্দারা। ফিসফিস করছে সবাই। সমুদ্রের ঠিক উপরেই এক নতুন শহর বানানো হয়েছে। সেটাই দেখতে যাচ্ছে এরা।

সবার সামনে রয়েছেন প্রধান পুরোহিত। এখন বেশ গরম পড়েছে কিন্তু তিনি সেটাকে তোয়াক্কা না করে রংচঙে গাউন পরে এসেছেন। ইতিমধ্যে ঘাম দেখা দিয়েছে তার চেহারায়। অনেকে গোয়াডালক্যানেলের পশ্চিম অংশে নির্মিত নতুন প্রাসাদে তীর্থযাত্রা সেরে ফেললেও প্রধান পুরোহিত সবেমাত্র নিজের দলবল নিয়ে এগোচ্ছেন। পেছনে তাকালেন পুরোহিত। তার চেহারায় সন্তুষ্টি ফুটে উঠল। এই যাত্রার জন্য তিনি রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ লোকদেরকে সাথে নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই আছে যারা এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে কিছুদিন হলো পার্শ্ববর্তী দ্বীপে এসে উঠেছিল। আজকের এই অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়ে রাখা হয়েছে পাক্কা এক সপ্তাহ আগে। এক সপ্তাহ, সবার প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট সময়।

জঙ্গলের ডালপালা ভেদ করে ভোরের রূপোলি আলো উঁকি দিচ্ছে। ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সারিবদ্ধ ভাবে এগোচ্ছে সবাই। এই দ্বীপটা বেশ বৈচিত্রময়। গোয়াডালক্যানেলের স্থানীয় উপজাতিরা সাগরের পাড় থেকে ৩০০ ফুটের ভেতরে বাস করে। দ্বীপের গভীরে যেতে চায় না ওরা। অনেক দৈত্য দানবের কাহিনি প্রচলিত আছে দ্বীপকে কেন্দ্র করে। সেগুলোর কিছু বাস্তব আর কিছু কল্পিত। দ্বীপের বিভিন্ন ভূগর্ভস্থ গুহাতে আছে দৈতাকার জন্তু, মানুষের চেয়ে দ্বিগুণ আকৃতির ভয়ঙ্কর দানব। অসতর্ক, বেখেয়ালি মানুষের রক্ত পান করে তৃষ্ণা মেটানোর জন্য ওঁত পেতে রয়েছে ওগুলো। কে দ্বীপের ভেতরে গিয়ে নিজের প্রাণ খোয়াতে চাইবে? আর জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু যখন সাগর থেকেই পাওয়া যাচ্ছে তখন ঝুঁকি নিয়ে দ্বীপের ভেতরে যাওয়ার তো কোনো দরকার নেই।

পুরোহিত একটু থামলেন। সামনে যেন এক অলৌকিক দৃশ্য দেখতে পাচ্ছেন তিনি। প্রাসাদ দেখা যাচ্ছে! সমুদ্রের ঠিক যেখানে আগে শুধু পানি দেখা যেত সেখানে এখন মানুষ নির্মিত ইমারত গড়ে উঠেছে। হাত বাড়িয়ে পেছনের লোকদের এই অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখালেন। প্রার্থনার সুরে রাজার নাম জপলেন পুরোহিত। ইমারত দেখে মনে হচ্ছে, রাজা যেন সরাসরি স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে এসেছেন। একজন সাধারণ মানুষ থেকে নিজের জীবদ্দশাতেই কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছেন এই রাজা।

রাজা লক-এর এই অর্জন তার নিজের অন্যান্য অর্জনকে নিষ্প্রভ করে দিয়েছে। অনুষ্ঠানের পর এই প্রাসাদকে রাজকীয় বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার করা হবে।

দ্বীপের পুরোহিত এই ইমারতকে রাজা লক-এর ঐশ্বরিক শক্তির নিদর্শন হিসেবে ধরে নিলেন। রাজার হাজার হাজার শ্রমিক প্রায় এক যুগ সময় ব্যয় করে এটা নির্মাণ করেছে। দ্বীপ থেকে পাথর বয়ে নিয়ে গেছে সমুদ্রে। অনেক পরিশ্রম করেছে। এরকম নির্মাণশৈলী এরআগে কেউ কখনও দেখেনি। মহামান্য রাজা তার উপদেষ্টাদের বলেছেন, এই ইমারত নির্মাণের মাধ্যমে এক নতুন যুগের শুভ সূচনা ঘটল।

সবাই রাজার এই বক্তব্যের সাধে সম্পূর্ণ একমত। রাজা লক এই দ্বীপকে সাধারণ থেকে এক সম্পদশালী রাজ্যে পরিণত করেছেন। প্রজাদের মাঝে অঢেল সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছেন তিনি। মূল্যবান রত্ন আর সোনার খনি খুঁড়ে দ্বীপের চেহারা বদলে দিয়েছেন। অন্যান্য দ্বীপ ও অঞ্চলের সাথে ব্যবসায়ের নতুন দিগন্ত উন্মাচিত হয়েছে তার হাত ধরে।

কয়েক বছরের মাঝে দ্বীপের বাসিন্দারা লক্ষ্য করল তারা বেশ ধনী হয়ে উঠেছে। সূদূর জাপান থেকেও ব্যবসায়ীরা এসে সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান রত্নের বিনিময়ে বিভিন্ন পণ্য দিয়ে যায়। তবে সোনার চাহিদা ছিল একদম তুঙ্গে। দ্বীপের বাসিন্দারা পাহাড়ে মূল্যবান ধাতুর খনি খুঁড়তে শুরু করল। নিশ্চিন্তে কাজ করত সবাই, কারণ ওরা জানে রাজা লক ওদের উপর দৃষ্টি রেখেছেন।

পুরোহিতের অনুসারীরা তার পিছু পিছু এসে পাশের জায়গাগুলো ভরাট করে দাঁড়াল। সবাই অবিশ্বাস নিয়ে পাহাড় থেকে ইমারত দেখছে। উপজাতির এক সর্দার পুরোহিতের কাছে গিয়ে ইমারতের পাশের একটা জায়গা নির্দেশ করে দেখাল। ওখানে পাথর দিয়ে নির্মিত এক মন্দির থেকে কয়েকজন ব্যক্তিকে বেরোতে দেখা যাচ্ছে।

‘উনি কি রাজা লক? ওখানকার সবচেয়ে লম্বা লোকটার দিকে নির্দেশ করে জানতে চাইল সর্দার।

‘হ্যাঁ, উনিই।’ পুরোহিত জবাব দিলেন। রাজার পরনে থাকা বিশেষ টিউনিকটা (জোব্বা ধরনের জামা) বিভিন্ন মূল্যবান রত্ন ও সোনায় মোড়ানো হওয়ায় সূর্যের আলো লেগে চকমক চকমক করছে।

‘মন্দিরটা চমৎকার,’ বলল সর্দার। ভবিষ্যত্বাণী অনুযায়ী আমাদের পথচলার ১০ লাখ বছরের শুরুটা হয়েছিল এই মন্দিরের মাধ্যমে।

এটা সর্বস্বীকৃত যে, রাজা লকের হাত ধরে দ্বীপ স্বর্ণযুগে প্রবেশ করেছে। একটা সময় আসবে যখন এই রাজ্য হবে পুরো অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র ও শক্তির উৎস। সবকিছুকে হারিয়ে দাপট দেখাবে গোয়াডালক্যানেল। ভবিষ্যত্বাণী অনুযায়ী সেই দাপট ২৫ প্রজন্ম ধরে চলবে। ভবিষ্যৎবাণীতে একজন বিশেষ ব্যক্তির’র কথা বলা আছে। যার অনেক জাদুময় ক্ষমতা থাকবে। এখানকার সবাই বিশ্বাস করে রাজা লক হলেন সেই বিশেষ ব্যক্তি। এই দ্বীপ থেকে এত সোনা ভোলা হচ্ছে, এটা শুধুমাত্র তার জন্যই সম্ভব হয়েছে। পৃথিবী যেন ভেতরে থাকা সব সম্পদ তার হাতে ঢেলে দিয়ে হালকা হতে চাইছে, বশ্যতা স্বীকার করেছে নতুন মনিবের কাছে।

মাথা নাড়ল সর্দার। রাজা লক কোনো সাধারণ ব্যক্তি নন, এটা নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ নেই। সর্দারের মনে একবার সংশয় জাগল, ইমারতের পেছনে থাকা সাগর যদি পুরোটা ডুবিয়ে দেয়? ভাসিয়ে নিয়ে যায়? কিন্তু তখনও সে জানে না নিজের দ্বীপে ফেরার সময় অলৌকিক খবর নিয়ে ফিরবে সে।

হঠাৎ কিচির-মিচির আওয়াজ তুলে এক ঝাঁক পাখি আকাশে ডানা মেলল। পাখিদের ডাকাডাকিতে খান খান হয়ে গেল ভোরের নীরবতা। পুরোহিত হতভম্ব হয়ে চারিদিকে চোখ বুলালেন, কী হচ্ছে বুঝে উঠতে পারছেন না। মাটি কাঁপতে শুরু করল এবার। কম্পনের সাথে যোগ হলো চাপা গর্জন। পুরোহিতের গলায় শ্বাস আটকে যাওয়ার দশা। পায়ের তলা মাটি এখন এমন আচরণ করছে যেন এটা একটা জাহাজের ডেক, আর জাহাজটা এখন ঝড়ের কবলে পড়ে নাকানি-চুবানি খাচ্ছে। নিজেকে স্থির রাখার জন্য পাশে থাকা এক গাছের দিকে হাত বাড়ালেন পুরোহিত।

পায়ের তলার মাটি চিড়ে দু’ফাঁক হয়ে যেতেই এক লোক চিৎকার করে উঠল। পরমুহূর্তে পড়ে গেল ফাটলের ভেতর। আরও ফাটল তৈরি হতেই তার আশেপাশের লোকজন সব ছিটকে সরে গেল এদিক-ওদিক। পুরো দুনিয়া যেন দুলছে। হাঁটু গেড়ে বসলেন পুরোহিত, প্রার্থনা করতে গিয়েও সদ্য নির্মিত ইমারতের দিকে চোখ পড়তেই সেটা তার ঠোঁটের মাঝে আটকে গেল।

একটু আগে যেখানে মন্দির আর জৌলুসপূর্ণ প্রাসাদ ছিল সেটা এখন নেই! সাগরের পানি উঠে এসে প্রাসাদকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে গেছে। প্রকৃতির উপর দিয়ে যে রাজা পণ্ডিতি ফলিয়ে এত বছর সময় ব্যয় করে জিনিসটা নির্মাণ করেছিল এখন ইমারত ও এর নির্মাতা কারওই কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। দশ বছর ধরে বানানো প্রাসাদকে এক মুহূর্তের ভূমিকম্প স্রেফ গায়েব করে দিয়েছে। গিলে নিয়েছে পুরো প্রাসাদ।

মুহূর্তের মধ্যে শুরু হওয়া প্রলয় মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল। আর কোনো তাণ্ডব নেই। পৃথিবী এখন আর দুলছে না। তবে সদ্য তৈরি হওয়া ফাটল থেকে হিস হিস আওয়াজ আর ভূমিকম্পের ফলে আহত ব্যক্তিদের গোঙানি শোনা যাচ্ছে এখনও। যারা বেঁচে আছে সবাই হাঁটু গেড়ে বসল। পুরোহিতের নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করছে। আতঙ্কিত চোখে সাগরের উপর দিয়ে চোখ বোলালেন পুরোহিত। জোর খাঁটিয়ে নিজেকে দাঁড় করালেন।

‘দৌড়াও সবাই! উঁচু জায়গায় আশ্রয় নাও!’ চিৎকার করে নির্দেশ দিয়েই তিনি নিজেও কম্পিত পায়ে দৌড়াতে শুরু করলেন। যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে সরতে হবে। পূর্বপুরুষদের কাছে এরকম জলোচ্ছ্বাসের গল্প শুনেছেন তিনি। যখন পৃথিবী আর সাগরের দেবতারা প্রভাব বিস্তারের জন্য যুদ্ধ করতে শুরু করে তখন এরকম দূর্যোগ দেখা দেয়। পুরোহিতের চিন্তা হচ্ছে সাগর একটু আগে যে রূপ দেখিয়ে নতুন প্রাসাদকে গ্রাস করে নিয়েছে সামনে আরও ভয়ঙ্কর রূপধারণ করে আঘাত হানতে পারে।

নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটছে সবাই কিন্তু খুব কম লোকই সফল হলো। সুনামি যখন দ্বীপে আঘাত করল তখন জলরাশির উচ্চতা ১০০ ফুট। দ্বীপের পাড়ে থাকা পাথরগুলোকে দ্বীপের এক মাইল ভেতরে নিয়ে গেল সুনামি। ফেরার সময় সব ধুয়ে মুছে নিয়ে গেল। যেন সব চেটেপুটে পরিষ্কার করে নিয়ে গেলেন সমুদ্রের দেবতা!

সে-রাতে সাগরপাড় থেকে যত দূরে সম্ভব সরে গিয়ে জীবিত ব্যক্তিদের নিয়ে ক্যাম্পফায়ার করে গোল হয়ে বসলেন পুরোহিত। সাগরকে আর তারা ভাল চোখে দেখতে পারছে না। সাগর আর বন্ধু নয়।

‘দিন শেষ,’ বললেন পুরোহিত। আমাদের রাজা দেবতাদেরকে রাগিয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়া এই ঘটনার আর কোনো ব্যাখ্যা নেই। প্রকৃতির উপর দিয়ে হাত ঘোরানোর জন্য এই শাস্তি হলো আমাদের। এখন আমরা আমাদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব এবং আগের মতো সুখ-শান্তি ফিরে চাইব।

উপস্থিত সবাই মাথা নাড়ল। ওদের রাজা নিজেকে দেবতাদের কাতারে ফেলেছিলেন। আর তিনি তার বেয়াদবির শাস্তিও পেয়েছেন। অহংকার করলে পাপ হয়। সেই পাপের শাস্তি পেয়েছেন তিনি। তাঁর নির্মিত ইমারতসহ সাগরের বুকে বিলীন হয়ে গেছেন। রাজা লক-এর কোনো নাম-নিশানাও নেই এখন। যেন তিনি কখনও এখানে ছিলেনই না!

পরের দিনগুলোতে জীবিত ব্যক্তিরা দেবতাদের এরকম নৃশংস বিচার নিয়ে ফিসফিস করে আলাপ করল। তিন রাত পর পুরোহিত এক সভা ডাকলেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হলো রাজা ও তাঁর রাজ্যের নাম আর কখনও যেন উচ্চারিত না হয়। তাঁর সেই মন্দির, ইমারত কোনো কিছু নিয়েই যেন আর কথা না হয়, সব ভুলে যেতে হবে। তার যাবতীয় কর্ম ভুলে, তার অস্তিত্বকে মুছে দিলে হয়তো দেবতাদের কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়া যাবে।

যেখানে ইমারত নির্মাণ করা হয়েছিল সেই স্থানকে অভিশপ্ত ঘোষণা করা হলো। দিন যেতে যেতে মানুষ একসময় ভুলে গেল ঠিক কী কারণে সাগরের ওই অংশকে অভিশপ্ত বলা হয়েছিল। দ্বীপের স্বর্ণযুগ শেষ হয়ে শুরু হলো অন্ধকার যুগ। সেই ঘটনার পর দ্বীপে নানান অসুখ-বিসুখের প্রকোপ দেখা দিতে শুরু করেছিল। এত বছর ধরে দ্বীপের যে সুনাম তৈরি হয়েছিল সেটা পরিণত হলো দুর্নামে।

মাঝে মাঝে রাজার নাম অভিশাপের মন্ত্রে শোনা যায়। সেই লাখ লাখ বছরঅলা ভবিষ্যত্বাণীর কোনো মূল্যই নেই এখন। কয়েক প্রজন্মের মধ্যে রাজা লক-এর স্থান হলো নিষিদ্ধ গল্পে। যে গল্পগুলো শুধু ফিসফিস করেই শোনানো হয়। আরও কয়েক প্রজন্ম পর রাজা লক-এর ঘটনা স্রেফ লোককাহিনিতে পরিণত হলো। তরুণরা আর তার কাহিনিকে পাত্তা দেয় না। অতীতের ভয়ঙ্কর কাহিনি শোনার সময় নেই তাদের।

.

০২.

সলোমন সাগর, ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখ, ১৯৪৩ সাল

প্রবল বাতাস সাগরের পানিতে সাদা ফেনার সৃষ্টি করেছে। সেই ফেনা কেটে এগোচ্ছে জাপানিজ ডেস্ট্রয়ার কোনামি। বুগেইনভিল আইল্যাণ্ডের দক্ষিণ-পূর্ব দিক দিয়ে এগোচ্ছে জাহাজ। রাতের আঁধার চারিদিকে অথচ জাহাজে কোনো আলো জ্বালানো হয়নি। অন্ধকারের ভেতর সাগরের বড় বড় ঢেউ মোকাবেলা করে জাহাজ এগোচ্ছে। চল্লিশ-পঞ্চাশ ফুট উঁচু ঢেউ এসে জাহাজের সামনের অংশে আঘাত করতেই আর্তনাদ করে উঠছে ইঞ্জিন।

জাহাজের অবস্থা ভাল নয়। গোয়াডালক্যানেল থেকে সর্বশেষ সৈন্যদেরকে সরিয়ে নিয়ে স্বাভাবিক কোর্স থেকে অনেকখানি সরে গিয়ে চলছে কোনামি।

এই ইয়াগোমো-ক্লাস ডেস্ট্রয়ারের কার্যকরী ওয়াটারলাইন (জাহাজের যেটুকু অংশ পানিতে ডুবে থাকে) ও মসৃণ ইঞ্জিনিয়ারিঙের বদৌলতে ঘণ্টায় ৩৫ নট গতিতে এগোনোর ক্ষমতা রাখে। কিন্তু আজ তিন ভাগের এক ভাগ গতিতে এগোচ্ছে। খারাপ আবহাওয়ার কারণে কোনামি স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারছে না। কচ্ছপের মতো ধীরগতিতে এগোতে হচ্ছে।

হঠাৎ করে গোয়াডালক্যানেল থেকে সৈন্য সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ এসেছে। ওখানে অনেক পরিশ্রম ও সীমিত খাবার পাওয়ায় রোগা-পাতলা হয়ে গেছে সৈন্যরা। তার উপর এখন এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় তারা একদম কাহিল হয়ে পড়েছে। জাহাজের এক নাবিক সৈন্যদের কাছে পানযোগ্য পানি নিয়ে গেল। এই খারাপ পরিস্থিতিতেও যতদূর সম্ভব সৈন্যদেরকে আরাম দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সৈন্যদের পোশাকের অবস্থা শোচনীয়! একদম ন্যাকড়ার মতো হয়ে গেছে। খাবার না পেয়ে শরীরের অবস্থা খুব খারাপ।

ব্রিজে দাঁড়িয়ে আছেন ডেস্ট্রয়ারের ক্যাপ্টেন হাসিমোটো। সাগরের ঢেউগুলোতে তিনি কোনো ছন্দ খুঁজে পাচ্ছেন না। বিক্ষিপ্ত ঢেউগুলোর সাথে মোকাবেলা করে কোর্সে থাকার জন্য লড়ছে কোনামি। সাগরের এই উত্তাল অংশ এড়িয়ে যেতে পারতেন ক্যাপ্টেন কিন্তু গেলেন না। তাকে কড়া শিডিউল মানতে হবে। কোথাও কোনো কারণে সময় নষ্ট করা চলবে না। কোনামি উত্তর দিকে এগোচ্ছে, গন্তব্য- জাপান।

এই ডেস্ট্রয়ারকে একটা টপ সিক্রেট মিশন দিয়ে রাতের অন্ধকারে পাঠানো হয়েছে। দ্বীপ থেকে সৈন্য সরানোর পাশাপাশি সাথে একজন অফিসারকেও জাহাজে তুলতে হয়েছে। এই অফিসার নাকি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই অফিসার ও তার এলিট বাহিনিও কোনামি-তে অবস্থান করছে এখন। তবে অফিসারের বাকি সৈন্যরা তাদের নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করার জন্য গোয়াডালক্যানেল থেকে বুগেইনভিল আইল্যাণ্ডে যাত্রা করেছে।

হাসিমোটো অবশ্য জানেন না এই অফিসার কী এমন মহামান্য ব্যক্তি যে তাঁর যাতায়াতের জন্য একটা আস্ত ডেস্ট্রয়ার প্রয়োজন হলো! বিষয়টা নিয়ে ক্যাপ্টেনের কোনো মাথাব্যথা নেই। নির্দেশ পালন করাই তার কাজ। যদিও অধিকাংশ সময় নির্দেশগুলোকে স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে অদ্ভুত লাগে। টোকিও থেকে এই জাপানিজ ডেস্ট্রয়ারের কমাণ্ডার হিসেবে তাঁকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। দায়িত্ব পালন করাটাই হাসিমোটোর কাছে মুখ্য বিষয়। তার এখন একটাই চিন্তা দায়িত্ব পালন করে ভালয় ভালয় কখন নিস্তার পাবে।

হঠাৎ কোত্থেকে যেন একটা ঢেউ উদয় হয়ে জাহাজের পেছনের অংশে সজোরে আঘাত হানল। কেঁপে উঠল পুরো ডেস্ট্রয়ার। হাসিমোটো নিজের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য কনসোল আকড়ে ধরলেন। ভ্রু কুঁচকে ঝড়ো আবহাওয়ার দিকে তাকালেন তিনি। অবস্থা ভাল নয়। যে নির্দেশ দিতে তিনি ঘৃণা করেন সেটাই দিলেন এখন।

‘গতি দশ নটে নামাও, মৃদু গর্জন করলেন ক্যাপ্টেন’। কথা বলতে বলতে তার চেহারায় চিন্তার রেখা গভীরভাবে ফুটে উঠল।

‘জো হুকুম, স্যার’। হেলমসৃম্যান (জাহাজের কাণ্ডারি) সাড়া দিল।

তারা দুজনই দেখতে পেলেন জাহাজের সামনে পানির বিশাল ঢেউ তৈরি হয়ে এগিয়ে আসছে। দেখতে দেখতে জাহাজের সামনের অংশে আছড়ে পড়ল ঢেউ। পুরো ঢেউ জাহাজের উপর চড়াও হতেই ডানদিকে বিপদজনকভাবে জাহাজ হেলে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই কোনামি তার ভারসাম্য ফিরে পেয়ে আবার এগোতে শুরু করল বিক্ষুব্ধ সাগরের বুক চিড়ে।

সাগরের এমন বৈরি রূপ ক্যাপ্টেন হাসিমোটোর কাছে নতুন নয়। এরআগে অনেক জঘন্য ও বিপদসংকুল আবহাওয়ার ভেতর দিয়েও তিনি তার জাহাজকে বের করে নিতে সফল হয়েছেন। দু’দুটো টাইফুন মোকাবেলা করার অভিজ্ঞতা আছে তার। এছাড়াও অন্যান্য দুর্যোগ তো আছেই। সবকিছুকে হার মানিয়ে বেঁচে ফিরেছেন তিনি। কিন্তু আজ রাতের বিষয়টা ভিন্ন। আজকের ঝড় তার বিগত দিনের সকল দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে হার মানিয়ে দিতে চাচ্ছে।

সকাল হলে বিপদ আরও বাড়বে। হয়তো কোনো প্লেন তার ডেস্ট্রয়ারের দিকে টর্পেডো ছুঁড়ে মারবে। নিরাপত্তার চাদর হিসেবে কাজ করছে রাতের অন্ধকার। দিনের আলোকে সাধারণত বন্ধু ভাবা হলেও ক্যাপ্টেন হাসিমোটোর সাক্ষাৎ যম সেটা। ক্যাপ্টেন হিসেবে অনেক অভিজ্ঞতা থাকলেও যুদ্ধক্ষেত্রে জাহাজ চালানোর ব্যাপারে হাসিমোটোর অভিজ্ঞতা অল্পই। দিনের আলো ফুটলে হয়তো তার যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা আর সমৃদ্ধ হবার সুযোগ পাবে না।

হাসিমোটো জানেন, বিভিন্ন দিক থেকে তিনি অন্যান্যদের তুলনায় একজন দক্ষ ক্যাপ্টেন কিন্তু আজ রাতে সেই খ্যাতির কোনো মূল্য নেই। সাগরের বৈরি বাতাস আর দৈতাকার ঢেউ কারো খ্যাতির পরোয়া করে না। আচ্ছা, জাপান যদি যুদ্ধে হেরে যায় তাহলে কি হাসিমোটোর চাকরি চলে যাবে? যদি তা-ই হয়, তাহলে মৃত্যুর আগপর্যন্ত নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে বীরের মতো মরতে চান হাসিমোটো। নিজের পদমর্যাদা ও পরিবারের নাম যেন সমুন্নত থাকে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি আছে তার। তিনি সহকর্মী ক্যাপ্টেনদের মতো শক্ত হাতে কোর্স অনুসরণ করবেন। সামুরাইরা কখনও রণে ভঙ্গ দেয় না।

যে আর্মি অফিসারকে তারা দ্বীপ থেকে উদ্ধার করে জাহাজে তুলেছেন নীচ থেকে সেই অফিসার ব্রিজে উঠে এলেন। তার চেহারা পাংশুবর্ণ ও বিবর্ণ হলেও হাঁটা-চলায় এখনও মিলিটারি ভাব বজায় আছে। হাসিমোটোর দিকে মাথা নেড়ে মাপা দৃষ্টি মেলে সাগরের দিকে তাকালেন অফিসার।

‘আমাদের গতি কমেছে?’ অফিসারের কর্কশ কণ্ঠ শুনে মনে হলো গলায় শিরিস কাগজ ডলা হয়েছে।

“হ্যাঁ। দ্রুত এগোতে গিয়ে ডুবে মরার চেয়ে সাবধানে এগোনো ভাল।

আপত্তিসূচক ঘোঘোত করলেন অফিসার। আলোকিত ইন্সট্রুমেন্টগুলো পর্যবেক্ষণ করে বললেন, রাডারে কিছু দেখা যাচ্ছে নাকি?

মাথা নাড়লেন হাসিমোটা। জাহাজের সামনে আরেকটা ঢেউ হামলে পড়তে দেখে নিজেকে তৈরি রাখলেন ক্যাপ্টেন। আড়চোখে আর্মি অফিসারের চেহারা দেখে নিলেন হাসিমোটো। অফিসারের চেহারায় দৃঢ়-সংকল্প আর ক্লান্তি ছাড়াও আর একটা কী যেন আছে। চোখের গভীরে কিছু একটা আছে। সেই ‘কিছু একটা ভাল কিছু নয়। তাই হাসিমোটোর দুশ্চিন্তা হলো! অফিসারের চোখগুলো দেখতে হাসিমোটোর ছোটবেলায় দেখা অনি নামের এক দানবের ছবির মতো। এরকম ছেলেমানুষী ভাবনা মন থেকে সরিয়ে দিলেন ক্যাপ্টেন। এখন তিনি আর সেই সাত বছর বয়সী ছোট্ট হাসিমোটো নন। কল্পিত দানব নয়, যুদ্ধের শুরু থেকে বাস্তব জীবনে অনেক মানুষাকৃতির দানব দেখেছেন তিনি। অতীতের কাল্পনিক দানবে বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই।‘

‘অফিসারকে জিজ্ঞাস করতে যাবেন আপনার জন্য কী করতে পারি?” ঠিক তখনই জাহাজ ভয়াবহভাবে ঝাঁকি খেল। অ্যালার্ম বাজতেই ব্রিজে যারা ছিল চিৎকার করে উঠল সবাই।

কী হচ্ছে? জানতে চাইলেন অফিসার।

“আমি জানি না’। এই কথা উচ্চারণ করতে ক্যাপ্টেন খুব ভয় পান কিন্তু তবুও তাকে উচ্চারণ করতেই হলো।

‘আমরা কি কোনো কিছুকে ধাক্কা দিয়েছি?’

ইস্ততত করলেন হাসিমোটো। ধাক্কা দেয়ার মতো কিছু নেই। আমরা যেখানে আছি এখানকার গভীরতা প্রায় ৯ হাজার ফিট।’ একজন জুনিয়র অফিসারকে এগিয়ে আসতে দেখে থামলেন ক্যাপ্টেন। ফ্যাকাশে চেহারা নিয়ে জুনিয়র অফিসার ভয়াবহ রিপোর্ট দিল তাঁকে। হাসিমোটো মাথা নেড়ে সংক্ষিপ্তভাবে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে আর্মি অফিসারের দিকে ফিরলেন। ‘দুঃখের সাথে বলতে বাধ্য হচ্ছি, যে-কোন খারাপ পরিস্থিতির জন্য আমাদেরকে এখন তৈরি হতে হবে। আপনি নীচে চলে যান। প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেগুলো পালন করুন।

কী?

‘রিপোর্ট পেয়েছি, জাহাজের কাঠামোর মেরামতকৃত এক অংশ ফেটে গেছে। আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করব কিন্তু পাম্প কতটা পানি সরাতে পারবে সেটা এখুনি বলা যাচ্ছে না। যদি অবস্থা সুবিধের না হয় আমাদেরকে এই জাহাজ পরিত্যাক্ত ঘোষণা করতে হবে।’

অফিসারের চেহারা মরা মানুষের মতো সাদা হয়ে গেল। এই আবহাওয়ার মধ্যে?’ কাঁচের ভেতর দিয়ে বাইরের ঝড়ের দিকে তাকালেন তিনি।

‘সেটা আমরা খুব শীঘ্রই জানতে পারব। আশা করছি, ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ আমাদের নিয়ন্ত্রনে থাকবে। ক্যাপ্টেন অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিলেন। এখন দয়া করে আমাকে আমার কাজ করতে দিন।’

মুখ হাঁড়ি করে মাথা নাড়লেন অফিসার। নীচে নামার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে পা দিয়েছেন কি দেননি এমন সময় আরেকটা বড় ঢেউ এসে জাহাজের বাম পাশে আঘাত করল।

হাসিমোটো তার ক্রুদেরকে সম্ভাব্য সবধরনের পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য নির্দেশ দিচ্ছেন। ওদিকে হেলমসম্যান জাহাজকে ঠিক পথে পরিচালনা করতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জয় হলো সমদের। কালো ঢেউগুলো একের পর এক হামলে পড়তে লাগল জাহাজের ওপর। ব্রিজে থাকা শেষ লাইটাও অবশেষে নিভে গেল। ডেস্ট্রয়ারের ভারি স্টিলের কাঠামো এখন একটা নোঙ্গরে পরিণত হয়েছে। সাগরের তলদেশের দিকে ছুটছে সেটা। স্ত্রী ইউঁকি আর এক বছর বয়সী ছেলের কথা মনে পড়ল ক্যাপ্টেনের। ছেলেকে চোখের সামনে যুবক হয়ে ওঠা দেখা হলো না তার। খুব একটা সময়ও কাটাতে পারেননি ছেলের সাথে।

তবে তারচেয়ে বড় বিষয় ক্যাপ্টেনকে লজ্জা দিল। মিশনে ব্যর্থতা। নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য কাপুরুষের মতো চেষ্টা করার চেয়ে মিশনে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় জাহাজসহ বীরের মতো মৃত্যুবরণ করা অনেক ভাল।

তিন ঘণ্টা পর সাগর একদম শান্ত হয়ে গেল। ঝড় উত্তর দিকে সরে গেছে। তবে ইতিমধ্যে ৪০০ ফুট দীর্ঘ একটা জাহাজকে গিলে নিয়েছে সাগর। কোনো চিহ্ন পর্যন্ত রাখেনি। কোনামি-র এই যাত্রার কোনো রেকর্ড রাখা ছিল না, এর সাথে সঙ্গ দেয়ার জন্য ছিল না কোনো জাহাজও। এর ডুবে যাওয়ার কোনো অফিসিয়াল রেকর্ড থাকবে না। সবকিছু মুছে ফেলা হবে। গোপন যা কিছু ছিল ডেস্ট্রয়ার কোনামি সবকিছু নিয়ে সাগরের তলায় চলে গেছে।

মিত্রপক্ষের জাহাজ মাত্র চারজনকে উদ্ধার করতে পেরেছিল। বাকিদের ইহলীলা সাঙ্গ করছে ঝড় ও হাঙ্গররা। জাহাজের কমাণ্ডে থাকা ব্যক্তি জাপানিজ জাহাজ নিয়ে কোনো আগ্রহই দেখালেন না। স্বাভাবিক কোর্সের বাইরে এসে এই জলপথে জাহাজটা কী করছিল কিছুই জানতে চাইলেন না তিনি। উদ্ধারকৃত ব্যক্তিরাও চুপচাপ রইল। যুদ্ধে তাদের অংশ শেষ। মান-সম্মানের কিছু বাকি নেই এই চারজনের। তাদের বেঁচে যাওয়া মরণের চেয়েও খারাপ।

.

০৩.

গোয়াডালক্যানেল, সলোমন আইল্যান্ড, বর্তমান সময়

তিনটে ছোট ছোট নৌকো পাম গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে যেন সাগরের ঢেউয়ের ধাক্কায় ওগুলো হারিয়ে না যায়। নৌকোগুলোর চারিদিকে সমুদ্রের নীল ঘিরে রয়েছে। অবশ্য বিকেলের সূর্যের আলোতে পানিতে রূপোলী ছটা পড়েছে এখন। স্যাম ফারগো আর রেমি ফারগো একটা পাম গাছের ছায়ায় বসে আছে। পাম গাছের পাতাগুলো দুলছে হালকা বাতাসে। ম্যানিকিউর (হাতের নখ কাটা, পালিশকৃত) করা হাত তুলে সূর্যের আলো থেকে নিজের চোখ বাঁচিয়ে ডাইভারদের (যারা পানিতে ডুব দেয়, ডুবুরি) কার্যক্রম দেখছে ও। সমুদ্রপাড় থেকে ২৭০ ফুট দূরের পানিতে চতুর্থ একটা নৌকোর কাছে রয়েছে ডাইভাররা।

স্যাম নিজের হালকা বাদামি চুলগুলোতে আঙুল চালিয়ে ওর স্ত্রীর দিকে তাকাল। রেমির মুখের মেকআপ বাসি হয়ে গেলেও লালচে দীর্ঘ চুল আর মসৃণ তুক ঠিকই সূর্যের আলোতে উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। জীবন সঙ্গীনির অ্যাথলেটিক দেহের দিকে তাকাল স্যাম, এক হাত বাড়িয়ে দিল স্ত্রীর পানে। হেসে ওর হাতটা ধরল রেমি। প্রত্নতাত্ত্বিক গুপ্তধনের জন্য অগণিত অভিযানে বেরিয়েছে দু’জন। এতগুলো দিন কেটে যাওয়ার পরও ওরা এখনও একসাথে আছে। যেটা ওদের দুজনের মধ্যকার শক্তিশালী বন্ধনের পরিচয় দেয়।

‘এই বিচে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে, স্যাম,’ চোখ বন্ধ করে বলল রেমি।

‘ভালই তো। যাও অনুমতি দিলাম। এই বিচ তোমার!’ স্যাম সম্মতি দিল।

‘কিন্তু যদি এখানে আরেকটু উন্নত ব্যবস্থা…’।

‘কিংবা একটা ভাল ডাইভ শপ থাকত।

হুম, ভাল হতো তাহলে। পায়ের গোড়ালি থেকে রেমি হিল খুলে ফেলল।

এই গোয়াডালক্যানেলে আসার ব্যাপারে রাজি হওয়ার আগে ওদের ধারণা ছিল না এখানে এসে এরকম উষ্ণ পানি আর নীল আকাশের দেখা পাবে।

প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়স্ক এক লম্বা ব্যক্তি বালুময় বিচ থেকে এগিয়ে এলো ওদের দিকে। রোদে পুড়ে তার চেহারা লাল হয়ে গেছে। বাজপাখির ঠোঁটের মতো চোখা নাকে স্টিলের রিমঅলা চশমা পরা। প্রতি পদক্ষেপে তার হাইকিং বুটের পেছন থেকে বালুর মেঘ তৈরি হচ্ছে। কয়েকজন দ্বীপবাসী রয়েছে ওখানে, ভাইভারদের কাণ্ডকীর্তি দেখছে আর নিজেদের ব্যক্তিগত কৌতুকে হাসাহাসি করছে। দ্বীপবাসীদের পাশ দিয়ে আসার সময় বিচের উপর তার লম্বা। ছায়া পড়ল। আগন্তুকের দিকে তাকাল স্যাম। নিজের বলিযুক্ত হ্যাণ্ডসাম চেহারায় সেঁতে হাসি দিল।

‘এবার বলো লিওনিড়, কাহিনি কী? জানতে চাইল স্যাম।

‘এটা দ্বীপের অন্যান্য জিনিসের মতো নয়, লিওনিডের উচ্চারণে হালকা রাশিয়ান টান আছে। দেখলে মনে হয় মানুষের বানানো। কিন্তু ফোনে আমি যেমনটা বলেছিলাম, মানুষের বানানো হওয়া অসম্ভব। পানির ৮০ ফুট নিচে রয়েছে ওটা।

‘তাহলে তুমি বোধহয় আটলান্টিস খুঁজে পেয়েছ!’ স্যামের দীর্ঘদিনের বন্ধুর সাথে মশকরা করল রেমি। যদিও মিথ অনুযায়ী আটলান্টিস যেখানে থাকার কথা সেখান থেকে এই জায়গা প্রায় ৫ হাজার মাইল দূরে।

লিওনিড ভ্রু কুঁচকাল। কোনো বিষয়ে একমত হতে না পারলে লিওনিড় এভাবে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে থাকে। মস্কো থেকে তিন বছরের ছুটি নিয়েছে লিও। পুরো নাম: লিওনিড় ভাইয়েভ। হারানো সভ্যতা খোঁজার জন্য ছুটি পেয়ে পুরো পৃথিবী চষে বেড়াতে নেমেও বেচারা খুশি ছিল না। তবে ফারগো ফাউণ্ডেশন থেকে অনুদান পাওয়ার পর অবস্থা বদলেছে।

লিও যখন স্যাম আর রেমিকে ফোন করে জানায় এই দ্বীপে ডুবে যাওয়া কিছু একটা পাওয়া গেছে তখন ওরা লিও’র এই অনুসন্ধানে যোগ দিতে একটুও দ্বিধা করেনি। প্রায় অর্ধেক পৃথিবী পাড়ি দিয়ে সলোমন আইল্যাণ্ডে হাজির হয়ে গেছে। আজ সকালে পৌঁছেছে ওরা। ডাইভিং গিয়ারগুলো আসতে দেরি হবে, হয়তো আগামীকাল পাওয়া যাবে ওগুলো। এই ফাঁকে লিও’র দেয়া বিভিন্ন তথ্য পড়ে আর বিচের সৌন্দর্য দেখে সময় কাটাচ্ছে ফারগো দম্পতি।

দু সপ্তাহ আগে গোয়াডালক্যানেলে আসা এক হতবুদ্ধ শিক্ষিকা তাঁর অস্ট্রেলিয়াবাসী সাবেক মহিলা প্রফেসরকে ফোন করে একটা অদ্ভুত গল্প শোনান। শিক্ষিকার স্বামী ও ছেলে তাদের নতুন ফিস ফাইণ্ডারে (যে যন্ত্র দিয়ে মাছের উপস্থিতি শনাক্ত করা যায়) অস্বাভাবিক রিডিং পেয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ান প্রফেসর নিজের ক্লাস নিয়ে ব্যস্ত থাকা শিক্ষিকাকে লিওনিডের কাছে পাঠিয়ে দেন। লিওনিড আর সেই অস্ট্রেলিয়ান প্রফেসর একই ভার্সিটিতে কাজ করেন।

ফোনে ফোনে অনেক আলাপ-আলোচনার পর অনিচ্ছুক লিওনিড অবশেষে এখানে এসে বিষয়টা সরজমিনে দেখার সিদ্ধান্ত নেয়। গত কয়েকদিনে ডাইভাররা তাকে যে তথ্যগুলো দিয়েছে সেগুলো শুনে লিওনিড নিজেই হতভম্ব হয়ে গেছে। জেলেরা ভেবেছিল ওটা হয়তো যুদ্ধের সময়কার কোনো ধ্বংসস্তূপ, কিন্তু তাদের ধারণা ভুল। ফিস ফাইণ্ডারে সর্বপ্রথম এমন কিছু ধরা পড়ে যেটাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি… দেখে মনে হয়েছে ওটা সাগরের তলায় মানুষ নির্মিত কোনো অবকাঠামো।

সুবিধে করতে না পেরে সাহায্য চেয়ে হাত বাড়ায় লিওনিড। লিওনিড একজন একাডেমিক, কিন্তু ডাইভার নয়। সে বুঝতে পেরেছিল এই বিষয়ের সুরাহা করার জন্য বাড়তি সাহায্য লাগবে। যেহেতু ফারগোরা ওকে অনুদান দিয়েছে তার উপর অনেকদিনের বন্ধুত্বও আছে তাই সরাসরি ফারগো দম্পতিকেই প্রস্তাব দিয়েছিল লিও। ফোনে কথাবার্তা পাকা করে স্যাম ও রেমি গোয়াডালক্যানেলে চলে এসেছে।

‘পানির নিচে যে ক্যামেরা ব্যবহার করেছ ওটাকে একটু ঘষে মেজে নিলেও পারতে, গত দিনে তোলা একটা ঘোলা ছবি দেখতে দেখতে বলল স্যাম। আর এই কাগজে প্রিন্ট করেছ কেন? ফটো পেপার নেই? কাগজ দেখে মনে হচ্ছে পত্রিকার কাগজের উপর ওয়াইন ফেলে ভিজিয়েছে কেউ।

‘শুকরিয়া করো এখানে রঙ্গীন প্রিন্টার পাওয়া গেছে। তোমরা হয়তো ভুলে গেছ এটা গোয়াডালক্যানেল। কোনো বিলাসী রিসোর্ট নয়।’ বলল লিও। ‘এবার বলো ছবি দেখে কী মনে হচ্ছে?

‘কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। এটা যেকোন কিছুই হতে পারে। পানির নিচে ডাইভ না দেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে আমাদের। রিপোর্টের হাল দেখে কেউ যদি বলে এটা ডায়েবেটিস রোগীর রিপোর্ট তাতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।’

মায়ের রাগী মুখ দেখা যাচ্ছে নাকি? সাবলীলভাবে জানতে চাইল রেমি।

লিওনিড ফারগো দম্পতিদের দিকে এমনভাবে তাকাল যেন ওরা দুজন কোনো জারে ভরা কীট! এই গরমেও তোমাদের রসবোধ কমেনি দেখে বেজায় আনন্দিত হলাম!’

মজা নাও, লিওনিড়। আমরা যেখানে আছি এটাকে তো স্বর্গ বলা চলে। আর হ্যাঁ, তুমি যে কেসটা দিয়েছ এরকম রহস্যই আমরা পছন্দ করি। আমরা এর শেষ দেখব, সমস্যা নেই।’ বলল স্যাম। তুমি একটু আগে চেহারায় যে ভাব ফুটিয়ে তুলেছিলে আমার মা রেগে গেলেও এতটা অসন্তোষ প্রকাশ করেন না। ডাইভারদের দিকে তাকাল ও। তুমি শিওর, ওদের কারও কাছ থেকে আমি একটা গিয়ার ধার নিতে পারব না?

মাথা নাড়ল লিও। আমি ইতিমধ্যে চেয়ে দেখেছি। কিন্তু নিজেদের জিনিসের ব্যাপারে এরা সাংঘাতিক রকমের কিপটে। শহরে গেলে আমরা কিছু গিয়ার নিয়ে আসতে পারব।’ এখন আইল্যাণ্ডে পুরো মৌসুম চলছে, তাই প্রয়োজনীয় গিয়ারের বেশ সংকট। যা স্টকে ছিল তার বেশিরভাগই স্থানীয় টুর কোম্পানীরা বুক করে রেখেছে।

‘ঠিক আছে।

‘আমি যাই, গিয়ে দেখি ডাইভাররা এবার কী পেল,’ হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের ভ্রুতে জমা ঘাম মুছতে মুছতে বলল লিও।

ওরা দেখল লিও বিচ ধরে চলে যাচ্ছে। খাকি প্যান্ট আর ট্রপিক্যাল লম্বা হাতার শার্ট পরনে থাকা সারসের মতো ঠ্যাঙা দেখাচ্ছে ওকে। স্যামের দিকে ঝুঁকল রেমি। বিষয়টা নিয়ে কী ভাবছ?’ | স্যাম মাথা নাড়ল। আমার কাছে কোনো সূত্র নেই। আরও কিছু না জানা পর্যন্ত কিছু বলব না। তবে বিষয়টা ইন্টারেস্টিং।

‘আমার কাছে একটা বিষয় অদ্ভুত লাগছে। বিচের এত কাছে থাকা সত্ত্বেও এই জিনিসটা আরও আগে আবিষ্কৃত হলো না কেন।

বিচে এখন লোকজন কম। স্যাম বিচের উপর চোখ বুলিয়ে বলল, “এখানে কি খুব বেশি মানুষ আসা-যাওয়া করে?’

রেমি মাথা নাড়ল। একটু আগে বিষয়টা নিয়ে আমরা একমত হয়েছিলাম কিন্তু।’ মাথার লালচে চুল ঝাঁকি দিল রেমি। স্যাম খেয়াল করল রেমির ত্বক ইতিমধ্যে রোদের কারণে তামাটে বর্ণ ধারণ করেছে। স্ত্রীর শুয়ে থাকা শরীরে আরেকবার চোখ বুলিয়ে কাছাকাছি হলো ও।

ওরা দেখল লিও দ্বীপবাসীদেরকে হাঁক ছেড়ে বলছে ওকে যেন একটা ছোট নৌকো দেয়া হয়। তাহলে ও সেটাতে চড়ে ডাইভারদের কাছে যেতে পারবে। গাঢ় রঙের টি-শার্ট পরা একজন ছোটখাটো লোক এসে স্টিমারের মোটর চালু করার জন্য স্টার্টার কর্ড ধরে বেশ জোরেশোরে দু’বার টান মারল। তিনবারের বার জ্যান্ত হয়ে উঠল পুরোনো মোটর। লিও ওটাতে চড়ে ডুবুরিদের নৌকোর দিকে রওনা হলো।

বিচের অন্যদিকে তাকাল রেমি। ওখানে কয়েকজন দ্বীপবাসী অলসভাবে ঝিমোচ্ছে।

‘তবে যা-ই বলো, জায়গাটা বেশ নিরিবিলি, সুন্দর, এটা মানতেই হবে। নীল আকাশ, উষ্ণ পানি, মিষ্টি বাতাস… আর কী চাই বলো?

আবার সেঁতো হাসি দিল স্যাম। ঠাণ্ডা বিয়ার চাই।

তোমার মন তো ওটাই চাইবে।

‘শুধু এটাই নয়, আরও আছে।

রেমি হেসে উঠল। ঠিক আছে আজ রাতে ওরকম দু’একটা জিনিস চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।’

কয়েক মিনিট পর লিও’র স্টিমার ফিরে এলো। বেচারার মুখ একেবারে বাংলার পাঁচ হয়ে আছে। খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে ওকে। ডাইভাররা বলছে জলজ জিনিসের স্তূপ দিয়ে অনেকাংশ ঢাকা পড়লেও জিনিসটাকে কোনো স্ট্রাকচার (অবকাঠামো, ইমারত) বলে মনে হচ্ছে।

চোখ সরু করল রেমি। স্ট্রাকচার? কীরকম স্ট্রাকচার?

‘ওরা ঠিক নিশ্চিত নয়। তবে দেখে নাকি মনে হয়েছে কোনো ভবনের ধ্বংসাবশেষ।

‘ইন্টারেস্টিং। ভেরি ইন্টারেস্টিং। দিগন্তে জমা ঝড়ো মেঘের দিকে তাকিয়ে বলল স্যাম।

‘ওগুলো অনেক প্রাচীন কিছু হবে,’ লিও নৌকোর দিকে তাকাল। এখানকার লোকজন প্রচণ্ডরকমের কুসংস্কারে বিশ্বাসী, যত্তসব!

রেমি ভ্রূ কুঁচকে জানতে চাইল, ‘হঠাৎ এ-কথা?

স্থানীয় টিমের প্রধান খুব জালাচ্ছে। সে ওখানে আর ডাইভ করতে চায় না। তার প্রপিতামহ নাকি এই বিচকে নিয়ে একটা গল্প শুনিয়ে গেছে। এখানে জুজুর ভয়সহ হাবিজাবি কী যেন আছে বলল। আসল কথা হলো, শয়তানটা আমার কাছ থেকে আরও পয়সা খসাতে চাচ্ছে। বাটপারি আরকী।

‘তুমি তাকে কী বলেছ?

‘যদি টাকা চায় তাহলে আজকের ডাইভিং তাকে শেষ করতে হবে। সে নিচ থেকে কী দেখে আসছে সেটার উপর আমার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে তাকে আবার ভাড়া করব কি করব না। আমি তাকে কোনো ভয়-ভীতি দেখাতে যাব না। কাজের জন্য পারিশ্রমিক দিচ্ছি। ওতেই চুপ হয়ে গেছে।

রাশিয়ান বন্ধুকে পর্যবেক্ষণ করল স্যাম! ‘লিও, আমাদের বাজেটের অর্থ খরচের ক্ষেত্রে তোমার মিতব্যয়ীতা দেখে ভাল লাগল। কিন্তু এখানে তো এই লোকগুলোই শেষ ভরসা, তাই না? যদি তুমি তাদেরকে দিয়ে কাজ না করাও তাহলে বিকল্প কোনো রাস্তা খোলা আছে?’

‘আমার নিজস্ব লোকজন আনতে হবে এখানে।

‘তাদের সবার নিজস্ব গিয়ার আছে?’

‘অবশ্যই,’ মুখে জোর দিয়ে বললেও লিওনিডের চেহারার অভিব্যক্তিতে অতটা আত্মবিশ্বাস দেখা গেল না।

‘নিচে যদি ধ্বংসস্তূপ থেকে থাকে তাহলে আমাদের কোনো এক্সপিডিশন শিপ (অভিযান পরিচালনার জন্য বিশেষ জাহাজ) যোগাড় করার চেষ্টা করা উচিত, ঠিক? জাহাজ পেলে আমরা লম্বা সময় ধরে ওটার সুবিধে পাব। প্রস্তাব রাখল রেমি। এই ক্ষেত্রে তোমার পরিচিত কেউ আছে?’

স্যাম একটু ভাবল। কারও কথা মনে পড়ছে না… লিও?’

মাথা নাড়ল রাশিয়ান। জিজ্ঞাস করে দেখতে হবে।’

‘সেলমাকে ফোন করি। ও খুঁজে দেবে।’

মাথা নাড়ল রেমি। কপাল খারাপ। এখানে ধারে কাছে তো কোনো সেলফোন নেটওয়ার্কের টাওয়ার নেই।’

স্যাম হাসল। কোনো সমস্যা নেই। স্যাট (স্যাটেলাইট) ফোন নিয়ে এসেছি। বলতে বলতে ব্যাকপ্যাকে হাত দিয়ে একটা পুরোনো কিন্তু নির্ভরযোগ্য স্যাটেলাইট ফোন বের করল। ফোনটা চালু করে সময় দেখল স্যাম। আশা করা যায় সেলমা এখন ফোন ধরবে।’

শরীরের ভার এক পা থেকে আরেক পায়ে চাপাল লিও। ফোনের মিষ্টি রিং শুনতে শুনতে স্যাম ওয়াটার লাইন নিয়ে ভাবল! এদিকে লিও দ্বীপবাসীদের এক দলের দিকে পা বাড়িয়েছে। কয়েক সেকেণ্ড পর সেলমার সজীব কণ্ঠ ভেসে এলো ফোনে।

‘হ্যালো?’

‘সেলমা! বলো তো আমি কে?’ বলল স্যাম।

‘কালেকশন এজেন্সী?

‘এই সেরেছে! স্যান ডিয়াগোর কী খবর?

‘দুইদিন আগে এখান থেকে যাওয়ার সময় যেরকম অবস্থা দেখে গেছ এখনও তেমনি আছে। তবে জোলটান আরেকটা ১০০ পাউণ্ডের মাংস ভাজা খেয়ে নিয়েছে আর ল্যাজলো এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে পাগল বানিয়ে দিচ্ছে আমাকে।’

‘তাহলে তো তুমি খুব ব্যস্ত। আচ্ছা, শোনো, প্রাথমিক ডাইভিঙে আমরা এখানে কিছু একটা খুঁজে পেয়েছি। একটা শিপ লাগবে। শিপে সবকিছু থাকা চাই। সোনার, ডাইভিং গিয়ার, ম্যাগনোমিটার… কাজের সবকিছু চাই। এরকম একটা জাহাজ খুঁজে দিতে পারবে?

‘অবশ্যই পারব। সবকিছু নির্ভর করছে টাকা আর সময়ের ওপর। কখন লাগবে আর কতদিনের জন্য লাগবে?

‘তার কোনো ঠিক নেই। এখন বলো কবে দিতে পারবে তুমি।

আবার সেই অসীম সময়ের শিডিউল।

সময়টা অসীম হলেও বোরিং নয়, সেলমা।

‘তা তো বটেই। আমি দেখছি বিষয়টা। তোমরা হয়তো অস্ট্রেলিয়া কিংবা নিউজিল্যাণ্ডের বাইরে আছে।’

মাথা নাড়ল স্যাম। “ঠিকই ধরেছ। আচ্ছা, প্রাচীন সভ্যতা সম্পর্কে তুমি কোনো সাহায্য করতে পারবে?

‘অবশ্যই। তোমার ই-মেইল আগে দেখি। তারপর যা সম্ভব আমি জানাচ্ছি।

‘সেটাই ভাল হবে। শিপ খোঁজার ব্যাপারে শুভ কামনা রইল।

‘বাজেট?

বরাবরের মতোই। তার মানে বাজেটের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। ফারগো ফাউণ্ডেশনের এত টাকা আছে যে দশ প্রজন্ম ধরেও খরচ করে শেষ করতে পারবে না। এছাড়াও প্রতিদিনই স্যামের বিভিন্ন আবিষ্কারের বুদ্ধিবৃত্তিক পোর্টফোলিও মেধাস্বত্ত্ব থেকে অর্থ এসে যোগ হচ্ছে। তাই নিজেদের অভিযানে খরচের ব্যাপারে ওদের কোনো মাথাব্যথা নেই।

উপযুক্ত লোক পাওয়ার পর আমি ফোন করব।

“ওকে, সেলমা, থ্যাঙ্কস। আর হ্যাঁ, আমাদের হয়ে প্রাণী দুটোর খেয়াল রেখো’ জোলটান হলো এক বিরাটাকার জার্মান শেপার্ড কুকুরের নাম। ওটাকে রেমি হাঙ্গেরির এক অভিযানের সময় পোষ্য হিসেবে নিয়ে এসেছে।

‘নিজের আঙুল হারানোর জন্য এরচেয়ে উপযুক্ত কাজ আর হতে পারে না।’ খোঁচা মারল সেলমা। জোলটান সেলমাকে পছন্দ করে। ফারগো দম্পতি বাইরে বেরোলেই সেলমার সাথে লেগে থাকে ও। নিজের সন্তানের মতো করে আগলে রাখে। সেলমার নিজের কোনো সন্তান নেই। জোলটানকে প্রশয় দিতে দিতে মাথায় তুলে ফেলে সেলমা।

স্যাম ফোন রেখে ব্যাটারি ইনডিকেটর দেখল। অনেক চার্জ আছে। রেমি কাছে গিয়ে টুপ করে বসল ও।’সেলমাকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছি।’

‘ভাল। লিওনিডকে ছোট করে বলছি না। কিন্তু ছোট নৌকো আর ওয়েট স্যুট এই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। রেমি বলল।

“ঠিকই বলেছ। কিন্তু ওর যুক্তিটাও তো দেখতে হবে। কী পেয়েছে সেটা না জেনে কীভাবে বড় আয়োজন করবে বেচারা? ওর ধারণা ছিল এটা হয়তো কোনো ভূপাতিত প্লেন কিংবা ওইরকম কিছু একটা হবে। এটা ভুলে গেলে চলবে না যুদ্ধের সময় গোয়াডাক্যানেল অনেক ব্যস্ত একটা জায়গা ছিল। অনেক ধ্বংসাবশেষ আছে এর আশেপাশে।

রেমি মাথা নাড়ল। তারমধ্যে কিছু জিনিস এরকমও আছে যেগুলোকে এখনও বিস্ফোরিত হবার ক্ষমতা রাখে।

‘ঠিক তোমার মতো।

স্বামীর পটানো কথায় কোনো পাত্তাই দিল না রেমি। ডাইভ বোটের দিকে তাকাল ও। কী মনে হয় তোমার?

‘পানির ৮০ ফুট নিচে মানুষ নির্মিত ইমারত? বলতে পারছি না। মাথার উপরে হাত তুলে দু’দিকে প্রসারিত করে টানটান করল স্যাম। রেমির দিকে তাকিয়ে বলল, কিন্তু খুব শীঘ্রই আমরা জানতে পারব।’

নিজের চুলে হাত বুলিয়ে রেমি স্যামকে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু বলতে পারল না। কারণ বিচের নিরিবিলি পরিবেশ এক রক্তহিম করা চিল্কারে চুরমার হয়ে গেছে।

.

০৪.

উঠে দাঁড়িয়ে এগোল স্যাম, ওর পিছু পিছু রেমিও রওনা হলো। পানির কাছে কুঞ্জবন রয়েছে। রক্তহিম করা চিৎকারটা এসেছে ওখান থেকেই। যদিও চিৎকার নেই এখন। চিৎকারের বদলে এখন ব্যথার আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। হাত বাড়িয়ে রেমিকে থামাল স্যাম। ঝোঁপের ভেতর থেকে কোনো এক সরীসৃপের বিরাটাকার লেজ বেরিয়ে রয়েছে।

বুদবুদের আওয়াজ আর পানির থপথপানির আওয়াজ এলো কুঞ্জবনের ভেতর থেকে। লেজটা একদম চুপ করে আছে। ওদের পেছনে লিও’র বুটের আওয়াজ শোনা গেল। কয়েকজন দ্বীপবাসীও এসেছে তার সাথে। তাদের মধ্যে দু’জনের হাতে ম্যাচেটি (ল্যাটিন আমেরিকার দা’) আর একজনের হাতে কুড়াল শোভা পাচ্ছে।

যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ আবার আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দিল। ঝোঁপ পেরিয়ে সামনে এগোল স্যাম। নোনাজলের বিরাটাকার পুরুষ কুমীর দেখতে পেল ও। ওটার মাথায় কুড়াল দিয়ে আঘাতের তিনটা জখম দেখা যাচ্ছে। মৃত। দ্বীপের এক স্থানীয় বাসিন্দা পড়ে রয়েছে পাশে। তার ডান পা গুরুত্বরভাবে কুমীর কামড়ে দিয়েছে। ভয়াবহ অবস্থা। ওখান থেকে পাঁচ ফুট দূরে আরেকজন দ্বীপবাসী দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার হাতে একটা কুড়াল, রীতিমতো কাঁপছে সে। ভয়, বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেছে তার চোখ দুটো।

আহত ব্যক্তির উরুর কাছ থেকে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হচ্ছে। কোমর থেকে বেল্ট খুলে নিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে হাঁটু গেড়ে বসল স্যাম। লোকটার উরুর উপরে শক্ত করে বেঁধে দিল বেল্টটা। রেমি ওদের কাছে এগিয়ে গেলো।

গুঙিয়ে উঠে জ্ঞান হারাল লোকটি।

‘ওকে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া সম্ভব না হলে বাঁচানো যাবে না। টান টান গলায় বলল স্যাম।

রেমি লিও’র দিকে তাকাল। চলো ওকে নিয়ে একটা ট্রাকে তুলি। প্রতিটা সেকেণ্ড এখন মূল্যবান।’ বলল রেমি।

লিও বিস্ফোরিত নয়নে মৃত কুমীরটাকে দেখছে। রক্ত সরে গেছে ওর মুখ থেকে।

‘চলো, লিও। রেমি একটু কড়া কণ্ঠে তাগাদা দিল।

রেমির ধমক খেয়ে ঘুরল রাশিয়ান। ওর কয়েক ফুট দূরে দাঁড়ানো দ্বীপবাসীদের দিকে তাকিয়ে বলল, এই লোকটাকে তুলে নিয়ে ল্যাণ্ড রোভারে রাখতে। কিন্তু কেউ নড়ল না। অগত্যা স্যাম নিজেই আহত লোকটিকে পাঁজকালো করে তুলে নিল।

‘সর সামনে থেকে!’ রেমি ওকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলো। দুজনে মিলে ধরাধরি করে ল্যাণ্ড রোভারে তুলল ওরা, গাড়িটা মেইন রোডের কাছে পার্ক করা ছিল এতক্ষণ।

লোকটাকে পেছনের সিটে বসাল ওরা স্যাম লিও’র দিকে ফিরল। লিও তখন এক স্থানীয় লোকের সাথে তর্কে ব্যস্ত। গাড়ি ভাল চালাতে জানে কে? উপস্থিত সবাই মাথা নাড়ল। কেউ জানে না।

স্বামী-স্ত্রী তাকাল একে অপরের দিকে। যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে। এক হাত বাড়িয়ে দিল স্যাম। খুব ভাল কথা! চাবি লাগবে আমার। বুঝলাম না এই লোকগুলোর সমস্যাটা কী! তোমাদের এক বন্ধু মারা যাচ্ছে আর তোমরা একটু সাহায্য পর্যন্ত করছ না? এখানে হাসপাতাল কোথায়? আমাদেরকে রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যাবে কে?

নিজের পকেটে হাত ঢোকাল লিও, কিছু একটা খুঁজছে। নিজেদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু করে দিয়েছে দ্বীপবাসীরা। এমন সময় সদ্য কৈশোর শেষ করা এক ছোকরা সামনে এলো। আমি যামু। উনি আমার চাচা বেনজি। ছেলেটার ইংরেজী উচ্চারণের সাথে আঞ্চলিকতার টান আছে।

নাম কী তোমার?’ যাত্রীর সিটে বসতে বসতে রেমি জিজ্ঞেস করল।

রিকি।

স্যাম ড্রাইভার সিটে বসে পড়েছে। দরজার পাশে এসে লিও ওর হাতে চাবি ধরিয়ে দিল। আমি হলুদ ট্রাকটা নিয়ে তোমাদের পিছু পিছু আসছি।

‘ঠিক আছে। রিকির দিকে তাকাল স্যাম। চাচার পাশে উঠে বসো। সিট বেল্ট বাঁধতে ভুলো না। আচ্ছা, এখান থেকে হাসপাতালে যেতে কতক্ষণ লাগতে পারে?

৪৫ মিনিট লাগব…’ রিকি নিশ্চিত নয়।

ভ্রু কুঁচকাল স্যাম। শক্ত হয়ে বসো সবাই। দেখি ১৫ মিনিটে যেতে পারি কিনা।

ইঞ্জিন চালু করে গিয়ার দিল স্যাম। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে প্যাসেজের মতো সরু আর এবরোথেবড়ো খানিকটা রাস্তা পেরিয়ে তারপর পাকা রাস্তায় উঠবে ওরা। কিন্তু জরুরী মুহূর্তে এসে মনে হলো এই সরু রাস্তা বুঝি আর শেষ হবে না। পাকা রাস্তায় উঠতেই গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল স্যাম। রাস্তার বাঁকে পৌঁছেও গতি কমাল না। স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে বাঁক পার হলো ল্যাণ্ড রোভার। বিপদজনক গতিতে মোড় ঘুরতে দিয়ে টায়ারগুলো প্রতিবাদ করলেও স্যাম পাত্তা দিল না।

শক্ত করে সিটের হাতল ধরে আছে রেমি। এত শক্ত করে ধরেছে যে ওর আঙুলগুলো সাদা দেখাচ্ছে এখন। আমরা যদি দূর্ঘটনায় পড়ি তারপর আমাদেরকেই যদি হাসাপাতালে নেয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হয় তাহলে কিন্তু এই আহত ব্যক্তি খুব একটা উপকার হবে না।

‘চিন্তা কোরো না। ফেরারি (বিশ্ববিখ্যাত গাড়ির নাম) চালিয়ে অভ্যস্ত আমি।’

আরেকটা মোড়ে এসে আবার আর্তনাদ করে উঠল চারটে টায়ার। স্যাম ইঞ্জিনে লাগাম দিয়ে গতি কমিয়ে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হাতের মুঠোয় রাখল। স্ত্রীর দিকে এক পলক তাকিয়ে কাঁধ ঝাঁকাল ও। এবার গতি একটু কমিয়ে চালাচ্ছে। তারপরও এরকম ভারি গাড়ির জন্য এই গতিও কম নয়।

রেমি ঘাড় ফিরিয়ে আহত ব্যক্তির দিকে তাকাল। প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে সে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। উরুর উপরে বাঁধা স্যামের বেল্টটাকে শক্ত করে ধরে আছে রিকি। ওর চেহারায় আতঙ্কের ছাপ। রিকি চোখ মেলে রেমি দিকে তাকাল। ঢোঁক গিলল রিকি। ভয়ে, আতঙ্কে বেচারা গলা শুকিয়ে গেছে।

‘আপনের কি মনে অয়, চাচা বাঁচব? রিকি প্রশ্ন করল।

‘আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। এখানকার হাসপাতালটা কেমন? কতখানি আধুনিক? জানতে চাইল রেমি।

রিকি মাথা নাড়ল। মনে অয় ভালই। আমি ওই হাসপাতাল ছাড়া অন্য কুনো হাসপাতাল দেহি নাই। তাই তুলনা করবার পারতাছি না।’

‘অনেক আহত ব্যক্তি যায় ওখানে?

‘মনে অয়। দ্বিধা নিয়ে বলল রিকি।

সোজা রাস্তা পাওয়ায় গতি বাড়িয়ে দিল স্যাম, কাঁধের উপর দিয়ে বলল, ‘এখানে কি অনেক কুমীর আক্রমণ করে?

রিকি শ্রাগ করল। করে মাঝে মইধ্যে। তয় অধিকাংশ সময় লোকজন গায়েব হয়া যায়। কুমীর অগো লয়্যা গেছে কিনা কওয়া কঠিন।

ছেলেটির দিকে তাকাল রেমি। ওখানকার কেউ ওনাকে সাহায্য করল না কেন?

রিকি ভ্রু কুঁচকে তাকাল। কুসংস্কার। সবাই কয় ওই জায়গা নাকি অভিশপ্ত। কহন কী করতে হইব কেউ ঠিকমতো বুইঝা উঠবার পারে না।’

‘অভিশপ্ত?’ রেমি প্রশ্ন করল।

‘এক বুইড়া ডাইভার কইছিল, গুজব আছে জায়গাডা ভালা না। অশুভ কিছু আছে। একটু আগে কইলাম না, সবাই অভিশাপরে ডরায়। চাচার দিকে তাকাল রিকি। অন্তত আমার তাই মনে অয়।’

কুমীরটা কিন্তু বিশাল। কমপক্ষে ২ হাজার পাউণ্ড তো হবেই।’ বলল স্যাম। কুসংস্কার-টুসংস্কার কিছু না। ক্ষুধার্ত কুমীর আর অসতর্ক মানুষ। এই হলো কাহিনি।

লিও’র কি এখন লোকবল পেতে সমস্যা হবে?’ রিমি জানতে চাইল।

অন্যদিকে তাকাল রিকি। কয়েকটা ডলারের লাইগ্যা কেউ নিজের জীবন কুরবানি দিবার চাইব না।’

রিয়ারভিউ মিররে রেমির অভিব্যক্তি দেখল স্যাম।

না, আমার মনে হয় না তারা ওমন করবে। তবে লিওনিডের অনুসন্ধান বেশ বড় রকমের ঝাঁকি খেয়েছে এটা সত্য। এই অঞ্চলে যেহেতু কুমীর আছে সেহেতু রাইফেলেরও ব্যবস্থা থাকার কথা। এখানে কারও রাইফেল নেই, আমি সেটা বিশ্বাস করতে পারছি না।

মাথা নাড়ল রিকি। বন্দুক রাখার নিয়ম নাই এইখানে। অস্ট্রেলিয়ান মিলিটারিরা চইল্যা যাওনের পর থেইক্যা বন্দুক রাখা নিষেধ করা হইছে।

কুমীরের তো তাহলে পোয়া বারো! রেমি বলল।

দ্বীপের পশ্চিম অংশ ঘুরে এখন পুব দিকে এগোচ্ছে ওরা। ওদিকে হনিয়ারা শহরে এখানকার একমাত্র হাসপাতাল অবস্থিত। ওরা যখন গাড়ি নিয়ে ইমার্জেন্সি অংশে প্রবেশ ততক্ষণে ২৫ মিনিট পার হয়ে গেছে। রিকির চাচার অবস্থা খুবই করুণ। গাড়ি থেকে নেমে সাহায্যের জন্য ছুটল রিকি। একটু পর দু’জন দ্বীপবাসী আর একজন স্মার্ট নারী এসে হাজির হলো। মহিলার পরনে সবুজ রঙের মেডিক্যাল ইউনিফর্ম।

মহিলা যখন গাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে তখন রেমি তাকে ভাল করে খেয়াল করল। দেখতে দ্বীপের বাসিন্দা বলে মনে হলেও তার চুলের স্টাইলটা ভিন্ন। দ্বীপের অন্যান্য মহিলাদের চেয়ে আলাদা। তার হাঁটা-চলার ধরন দৃষ্টিআকর্ষণ করতে বাধ্য। পরিষ্কার বোঝা যায়, এই নারী এখানকার উঁচুস্তরে রয়েছে। পদমর্যাদায় বড় হলেও মহিলার বয়স খুব একটা বেশি হবে না। তরুণীই বলা যায়, ত্বক একদম মসৃণ। আহত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে জখমের দিকে নজর দেয়ার আগে রেমি আর স্যামের দিকে তাকাল সে।

কতক্ষণ আগের ঘটনা? জানতে চাইল মহিলা। তার ইংরেজি উচ্চারণে অস্ট্রেলিয়ান টান রয়েছে।

‘আধা ঘণ্টা। দ্বীপের পূর্ব পাশে কুমীর আক্রমণ করেছিল। জানাল রেমি।

আক্রান্ত পা দেখে নিয়ে দ্রুত নির্দেশ দিল মহিলা। ধরাধরি করে বেনজির আহত দেহকে স্ট্রেচারে ভোলা হলো। তবে সেটার অবস্থাও ভাল নয়। এখানকার চিকিৎসা সেবার ব্যাপারে স্যাম ও রেমির সন্দেহ তাহলে সত্যি প্রমাণিত হলো।

ওদের দুজনের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে মুখ খুললেন মহিলা। চিন্তার কিছু নেই। হাসপাতালের ভেতরে থাকা যন্ত্রপাতিগুলো এরচেয়ে ভাল অবস্থায় আছে। হাত বাড়ি দিল সে। আমি ডা. ভ্যানা। এখানকার চিফ মেডিক্যাল অফিসার।’ রেমি ও স্যাম দুজনই হাত মেলাল তার সাথে।

‘স্যাম ফারগো, রেমি ফারগো,’ দু’জনের পরিচয় একসাথে দিল স্যাম।

ডা. ভ্যানা একটু সময় নিয়ে ফারগো দম্পতিকে পর্যবেক্ষণ করল। এখন মাফ করবেন। জরুরী কাজ আছে। আপনার ততক্ষণ ইমার্জেন্সি রুমে অপেক্ষা করতে পারেন। একটা বেঞ্চ আর দশ বছর আগের টাইমস আছে। একটা কথা না বললেই নয়, রক্ত পড়া বন্ধ করার জন্য আপনাদের পদক্ষেপটা সুন্দর ছিল।’

স্যাম কিংবা রেমি কিছু বলার আগেই হাসপাতাল ভবনের ভেতরে চলে গেল ভ্যানা। স্যাম গাড়ির সিটে লেগে থাকা রক্তের দিকে তাকাল। এরপর ওর চোখ পড়ল নিজের পোশাকের উপর। শুকনো রক্ত লেগে রয়েছে। এই দ্বীপে এসেছে মাত্র কয়েক ঘন্টা হলো। ইতিমধ্যে একজন মৃত্যু পথযাত্রীর প্রাণ রক্ষা করতে হয়েছে ওদের।

সলোমন আইল্যাণ্ডে ওদের অনুসন্ধানের শুরুতেই এরকম পরিস্থিতি অশুভ কিছুর ইঙ্গিত করছে।

.

০৫.

কয়েক মিনিট পর লিও’র ট্রাক এসে পৌঁছুল। ট্রাক থেকে নেমে ড্রাইভারকে হাত দিয়ে ইশারা করল লিও। মেইন রোডে ধূলো উড়িয়ে চলে গেল ট্রাক। কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে সে স্যামের দিকে এগিয়ে এলো।

‘মারা যায়নি তো?’

‘অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। স্যাম জবাব দিল। খুব বেশি সময় ওকে হাসপাতালে থাকতে হবে না, এটা নিশ্চিত।

‘বেচারা। কী ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গেল।’

‘আমার বিশ্বাস হয় না, এখানে কুমীর আছে এ-ব্যাপারে তোমাকে কেউ সর্তক করেনি।’ বলল রেমি।

করেছিল। ম্যাচেটি আর কুড়াল তো সেজন্যই হাতের কাছে ছিল সবার।

লিওর দিকে তাকাল স্যাম। দুটো একে-৪৭ থাকলে আরও ভাল হতো।’

‘বিশ্বাস করো, দোস্ত, যদি এই দ্বীপে সেটার ব্যবস্থা করা যেত তাহলে আমি নিশ্চয়ই রাখতাম।

‘তোমার ক্রুরা কোথায়?

‘সাগরে। সব গোছগাছ করে গিয়ার আর নৌকো নিয়ে ওরা চলে যাচ্ছে। আমার সাথে আর কেউ কাজ করতে চায় না। যা বুঝতে পারছি, তাদের বন্ধুর এই দূর্ঘটনার জন্য ওরা আমাকে দায়ী করছে।’ থামল লিও। জানোয়ারটা সাইজ দেখছ? ট্রাকের চেয়েও লম্বা!

‘ওটার পরিবারও আছে নিশ্চয়ই। স্যাম বলল।

মাথা নাড়ল রেমি। হুম। তোমার বন্ধুরা একটা কুমীরকে কুপিয়ে মেরে ফেলেছে। খবর আছে তোমার।

‘আমি কিছু করিনি!

স্যাম আর রেমি দু’জনই তিক্ত হাসি দিল। ওটা আমাদেরকে শুনিয়ে লাভ নেই। কুমীরদের বোলা।’

ভবনের ভেতরে ঢুকল ওরা। বাইরে থেকে দেখতে যেরকম মনে হয়েছিল ভেতরেও একই অবস্থা। ইমার্জেন্সি লাউঞ্জ একটা আয়তাকার রুম। নোংরা পরিবেশ। কয়েকজন আহত ব্যক্তি সারি করে রাখা বেঞ্চের উপর বসে সেবার অপেক্ষায় আছে। রুমে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা খুবই করুণ। রিকি একটু দূরে ফাঁকা জায়গায় বসে আছে। ওরা সেদিকে গিয়ে ওর পাশে বসল। মাথার উপরে ফ্যান ঘুরছে ঠিকই কিন্তু ভেতরের মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রার বিরুদ্ধে ওটা নিতান্তই নস্যি। কয়েক মিনিট ঘাম ঝরানোর পর উঠে দাঁড়াল রেমি। আমি বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করি।’

স্যাম ও লিও ওর পিছু পিছু উঠল। আমরাও আসছি তোমার সাথে। একা একা ভাল লাগবে না তোমার!

রেমি রিকির দিকে ফিরল। কোনো খবর পেলে আমাদেরকে জানিয়ো, হুম?

‘আইচ্ছা।’ এই গরমেও রিকি নির্বিকার। ‘ডা. ভ্যানা খুব ভালা ডাক্তার। চাচার সমস্যা হইব না।

কপাল ভাল বলতে হবে।’ ভ্রূ থেকে ঘাম মুছতে মুছতে ধলল রেমি।

কাছে বসা এক বৃদ্ধ লোক কেশে উঠল। শব্দ শুনে বোঝা গেল কাশিতে কফ আছে। রেমির হাত ধরে বাইরে বেরিয়ে এলো স্যাম। বাইরের তাপমাত্রাও কম নয়। তবে ভেতরে বসে সেদ্ধ হওয়ার চেয়ে বাইরে থাকাই আরামদায়ক। কাছেই একটা ছাউনি দেখতে পেল ওরা। স্যাম নিজের শার্ট দেখল।

‘হোটেলে গিয়ে জামা-কাপড় বদলে এলে মন্দ হয় না। রেমি দিকে তাকাল ও ‘চলো, চট করে ঘুরে আসি?’

রেমি ল্যাণ্ড রোভারের দিকে তাকাল। যদি গাড়ি ধোয়ার ব্যবস্থা করতে পারো তাহলে আমি রাজি।’

মাথা নাড়ল লিও। আমি তোমাদেরকে লিফট দেব। এখানে দাঁড়িয়ে সেদ্ধ হওয়ার কোনো মানেই হয় না।’

ওরা গাড়িতে উঠল, ড্রাইভারের সিটে বসল স্যাম। সাগরপাড় থেকে তুফান গতিতে হাসপাতালে আসার পর এখন লিও’র সাবধানী গতির ড্রাইভিংকে কচ্ছপের গতি বলে মনে হচ্ছে। রাস্তায় চলাচলরত অন্যান্য যানবাহন দেখে লিও যারপরনাই বিরক্ত। ওর চেহারা দেখে মনে হলো কেউ ওকে নিম পাতার তেতো রস খাইয়ে দিয়েছে।

‘আমাদের কাজকর্ম এখন বন্ধ-ই বলা যায়,’ বলল লিও। এই ঘটনার পর ক্রুরা আর কাজে যোগ দেবে বলে মনে হয় না।’

‘ওদের সাথে তোমার কথা হয়েছে?

মাত্র দু’জন কাজে ফিরতে রাজি।’

“আর নৌকা?’

‘নৌকার ক্যাপ্টেনদের কেউ-ই এখন আর কাজ করতে চায় না। কপাল খারাপ।

কপাল খারাপ বেনজির, নিজের শার্ট দেখতে দেখতে রেমি বলল। আমি কল্পনাও করতে পারছি না তার এখন কেমন লাগছে।

‘তার কপাল ভাল, তোমরা দুজন ওখানে ছিলে। বাকিদের আশায় যদি আমরা অপেক্ষা করতাম তাহলে সে মারা যেত।’ বলল লিও।

‘রিকি বলল, এটা নাকি এখানকার মানুষের স্বভাব। এই দ্বীপে কোনোকিছুই দ্রুত নয়।’

কুমীর বাদে।’

হোটেলে পৌঁছে স্টাফ ও অন্যান্য অতিথিদের ভীত-সন্ত্রস্ত চাহনি এড়িয়ে রুমে চলে গেল ওরা। চটপট গোসল সেরে কাপড় বদলে আবার হাসপাতালে যাওয়ার জন্য ওরা তৈরি হলো। এসি করা লবিতে লিও ওদের জন্য অপেক্ষা করছে। ওর হাতে কয়েকটা ছবি। পানির নিচের দৃশ্য আছে ওগুলোতে। স্যাম আর রেমি এসে লিও’র দু’পাশে বসল।

‘এই ছবিটা দেখ, ব্যাকগ্রাউণ্ডে আরেকটা স্ট্রাকচার চোখে পড়বে। ডাইভ টিমের প্রধান যে ছিল, তার ধারণা নিচে এরকম আরও ছয়টা আছে কিংবা বেশিও হতে পারে। একটা ছবি দেখিয়ে বলল লিও।

‘যদি তার কথা সত্যি হয় তাহলে এটা একটা উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হবে। জিনিসটা এতই প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ যে কারও মনে পর্যন্ত নেই। তবে স্ট্রাকচারগুলোর অবস্থান যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং।’ রেমি বলল।

‘তা তো অবশ্যই, কোনো প্রাকৃতিক দূর্যোগ হয়েছিল বোধহয়।’ বলল স্যাম। এই অঞ্চলে ভূমিকম্পের রেকর্ড আছে। হতে পারে ভূমিকম্পের ফলে ওগুলো পানির তলায় চলে গেছে।

‘হুম। কিন্তু আমার কাছে আরও ইন্টারেস্টিং লেগেছে এটার নির্মাণ। পাথর দিয়ে বানানো। এই অঞ্চলে তো পাথুরে ভবন সম্পর্কিত কোনো ইতিহাস নেই। অতীতের ব্যাপারে খুব গুরুত্বপূর্ণ সূত্র এই স্ট্রাকচার। সেই অতীত সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই নেই। লিও জানাল।

এই স্ট্রাকচারের ব্যাপারে কোনো রেকর্ড নেই, বিষয়টা অস্বাভাবিক নয়? রেমি জানতে চাইল।

ছবিগুলো নামিয়ে রাখল লিও। আমার কাছে অস্বাভাবিক নয়। এই অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর বসবাস ছিল। মৌখিক সংস্কৃতি ছিল সবার। দ্বীপে প্রায় ৭০ টি ভাষার প্রচলন আছে। হতে পারে এই স্ট্রাকচারের ব্যাপারে যারা জানতে তাদের কেউ আর বেঁচে নেই। চিন্তা করে দেখ, কত বড় ভূমিকম্প হলে সাগরপাড়ের অতখানি অংশকে ধসিয়ে দিয়ে পানির তলায় পাঠিয়ে দিতে পারে।’

স্যামের মাথায় ভিন্ন ধারণা ঘুরছে। তাহলে ধরে নিতে হবে ওগুলো সাগরপাড়ে নির্মিত ছিল?

প্রশ্নবোধক দৃষ্টিকে ওর দিকে তাকাল রেমি। তো? তুমি কি ভিন্ন কিছু ভাবছ?’

নান মাডোল সম্পর্কে শুনেছ কখন?

না।

“তিনি কোরাল শৈলশিরার (শৈলশিরাকে ইংরেজিতে রিফ বলে। পানির কিঞ্চিৎ উপরে কিংবা নিচে থাকে) উপরে পাথর দিয়ে দ্বীপ তৈরি করেছিলেন। ভেনিসেও এরকম চেষ্টা করা হয়েছিল। সেটা অবশ্য কয়েকটি আন্তঃসংযোগ খালের উপর।’ ব্যাখ্যা করল স্যাম।

লিও ওর দিকে তাকাল। যদি এটা রিফ বা ল্যাগুন (উপহ্রদ) এর উপর নির্মাণ করা হয়ে থাকে তাহলে সমুদ্রের তলায় ডুবে থাকার সহজ ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব। বড় ভূমিকম্পে শৈলশিরা ধসে পড়লেই…’

‘একদম ঠিক। তবে নিচে ডাইভ দেয়ার আগপর্যন্ত এই হচ্ছে আমার ধারণা। সেলমা আমাদের জন্য রিসার্চ শিপ পাঠিয়ে দিলে আমরা এ-ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানতে পারব।’

হোটেল লবির ঠাণ্ডা পরিবেশ থেকে বাইরের গরম আবহাওয়ায় বেরোল ওরা। হাসপাতালের দিকে রওনা হলো। আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে।

লিও এখানে রয়েছে প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেল। তাই গোয়াডালক্যানেলের আবহাওয়ার মতিগতি ওর এতদিনে বোঝা হয়ে গেছে। নির্বিকারভাবে আকাশের দিকে তাকাল ও। গাড়ির ভেতরে কসাইখানার মতো দূর্গন্ধ। এক মুদি দোকানের পাশে কার-ওয়াশ (গাড়ি ধোয়ার দোকান/গ্যারেজ) দেখতে পেয়ে গাড়ি দাঁড় করাল লিও। এটা কোনো আধুনিক কার-ওয়াশ নয়। এখানে বালতিতে করে পানি এনে গাড়ি ধোয়া হয়। কার-ওয়াশে কর্মরত ছেলেরা হাসতে হাসতে কাজ করছে। ওদের গায়ে কোনো শার্ট নেই, পা-ও নগ্ন।

কিন্তু গাড়ির ভেতরে চোখ পড়তেই ওদের হাসি থেমে গেল। বেনজির রক্ত দেখতে পেয়েছে ওরা। গাড়ি ধোয়ার আধঘণ্টা রেমি, স্যাম আর লিও এক বটগাছের ছায়ায় বসে কাটাল। ওরা দেখল ছেলেগুলো বেশ অস্বস্তির সাথে গাড়ি ধোয়ার কাজ করছে।

হঠাৎ একটা পুলিশের গাড়ি উপস্থিত হলো। দু’জন অফিসার এলো ওদের তিনজনের দিকে। কুমীরের আক্রমণের ব্যাপারে জিজ্ঞাসবাদ করার পর হাসপাতালে রেডিওতে যোগাযোগ করল তারা। সবকিছু চেক করে, নিশ্চিত হয়ে বিদেয় হলো।

পুলিশ চলে যাওয়ায় যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল লিও। দূরে কোথাও মেঘ ডাকার আওয়াজ শুনে আকাশে জমা কালো মেঘের দিকে তাকাল।

শব্দ শুনে মনে হচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি কাছে আসছে,’ মন্তব্য করল লিও।

বৃষ্টি হলে পানি ঘোলা হয়ে যাবে। কালকে পানিতে ডাইভ দেয়ার পর আমরা হয়তো নিচে দূরের কিছু ঠিকভাবে দেখতে পাব না। স্যাম বলল। আশা করি, তুমি সাথে আছে।’

‘সাগর পাড়ের অত বড় কুমীর কি তোমার চোখে পড়েনি? জানতে চাইল রেমি।

‘পড়েছে। এখন আমরা জানি কুমীর কোথায় থাকে।

‘তুমি সিরিয়াস তো?’।

“আচ্ছা, জীবনে যদি একটু উত্তেজনা-ই না থাকে তাহলে আর মজা কোথায়?

ভ্রু কুঁচকাল রেমি। শব্দটা উত্তেজনা” নয়। “নিরাপত্তা” কিংবা “দীর্ঘ” হবে।’

স্যাম হাত তুলে আকাশ দেখাল। “ওই দেখ, আকাশের চেহারা। চলো, তাড়াতাড়ি হাসপাতালে যাই। আংকেল বেনজির খোঁজ-খবর নিয়ে কিছু ডাইভিং গিয়ারের খোঁজে বেরোতে হবে। আমি বিষয়টাকে কাছ থেকে দেখতে চাই, সেজন্যই তো এখানে এসেছি। কুমীরের আক্রমণ হয়েছে বিচে। তারমানে সাগরের কোথাও আমরা নিরাপদ নই।

সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল স্যাম। কিন্তু নৌকা পাওয়া কঠিন হবে। আজ যেটাকে ভাড়া করেছিলাম সেটা আর কালকে আসবে না।’

‘আমাদেরকে হাসপাতালে নামিয়ে দেয়ার পর তুমি বিভিন্ন জায়গায় নৌকার খোঁজ করবে। যদি খোঁজ পাও হোটেলে মেসেজ দিয়ো।’ স্যাম বলল।

‘আর একটা কথা। কুমীরের আত্মীয়দের কথা মাথায় রেখে .৫০ ক্যালিবারের মেশিন গান যোগাড় করতে পারো কিনা দেখো।’ বলল রেমি।

লিও ওদেরকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছুতে পৌঁছুতে মেঘের গর্জন আরও কাছে চলে এলো। বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করার আগে কোনমতে ভেতরে ঢুকল ওরা। একেকটা ফোঁটা সাইজে গলফ বলের সমান। ওয়েটিং এরিয়ার ধাতব ছাদের উপর ধুমাধুম পড়ছে ওগুলো। ওয়েটিং রুমে চোখ বন্ধ করে রিকি বসে আছে, একদম চুপচাপ। লোজনের পরিমাণ এখন কিছুটা কম। কাশিঅলা বৃদ্ধ, ভাঙ্গা হাত নিয়ে এক শ্রমিক আর হাতে গভীর ক্ষত নিয়ে এক জেলে এখনও সেবার অপেক্ষায় বসে আছে।

রিকির পাশের বেঞ্চে গিয়ে বসল ওরা। রিকি নড়ে উঠলে চোখ খুলল। ওর দিকে তাকিয়ে হাসল রেমি। রিকিও ভদ্রতা করে হাসল।

‘কোনো খবর আছে? জানতে চাইল রেমি।

রিকি মাথা নাড়ল। নাহ। মাত্র কয়েক ঘণ্টা হইছে। এত তাড়তাড়ি কোনো খবর পামু বইলা আমি আশা করি নাই।’

সম্ভবত রিকির আংকেলের এক পা কাটা পড়বে। ওরকম ভয়ঙ্কর আক্রমণের পর বেঁচে থাকা রীতিমতো অলৌকিক ব্যাপার। সে-হিসেবে একটা পা হারানো খুব বড় কিছু নয়। দেখা যাক, কী হয়?

আরও এক ঘণ্টা চলে গেল। ইমার্জেন্সি রুম থেকে বেরিয়ে এলো ডা. ভ্যানা। তার পরনে এখনও সার্জিক্যাল স্ক্রাব রয়েছে। রিকি উঠে দাঁড়াল। স্যাম আর রেমিও যোগ দিল ওর সাথে।

‘সুখবর হলো, রোগী এখন আশংকামুক্ত। আমরা যথেষ্ট রক্তের ব্যবস্থা করতে পেরেছিলাম। রক্তক্ষরণের বিষয়টা সামাল দেয়া গেছে। বাকিটা আগামী ২৪ ঘণ্টার উপর নির্ভর করছে। তবে এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো দূর্ঘটনার মানসিক ধাক্কা আর ইনফেকশন। রোগীর শরীরের অবস্থা ভাল, বয়সেও তরুণ তারপরও কোনো কিছু নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

আর পা?’ রিকি নরম সুরে জানতে চাইল।

কুমীরের দাঁতের কামড়ে হাড়গুলো শত শত টুকরো হয়ে গেছে। তার জায়গায় আমি হলে আমারও পা-ও কেটে ফেলতে হতো। দুঃখিত, পা-টা কাটতে হয়েছে।’

তাকে দেখতে পারি? জানতে চাইল রিকি।

ডা. ভ্যানা মাথা নাড়ল। তাকে কিছুটা সময় দিই আমরা, হুম? বিকেলে দেখা করা যাবে। স্যাম ও রেমির দিকে ফিরল ডাক্তার। আক্রমণের সময় আপনার অত কাছে ছিলেন কেন? কুমীররা সাধারণত টুরিস্ট বিচ থেকে দূরে থাকে।

‘আমরা তার সাথে দ্বীপের অপর পাশে ছিলাম। ওপাশে লোকজন তুলনামূলক কম। বলল স্যাম। তবে খুব একটা খোলাসা করল না। লিও’র অভিযানের বিষয়টা এখানে বলা ঠিক হবে না। কথা বাতাসের আগে চলে। তার উপর যদি শোনে পানির নিচে ইমারত আছে তাহলে তো কথাই নেই!

‘আপনারা এই দ্বীপে কী করছেন?

‘একটা প্রজেক্টে এক বন্ধুকে সাহায্য করছি।’ স্যাম জবাব দিল।

‘প্রজেক্ট?

‘আর্কিওলজি (প্রত্নতত্ত্ব)।

“ওহ। আপনারা আমেরিকান, তাই না?

‘কেন আমাদের উচ্চারণ শুনে তা-ই মনে হচ্ছে?’ রেমি প্রশ্ন করল।

“আসলে এখানকার বেশিরভাগ টুরিস্টরা আসে অস্ট্রেলিয়া কিংবা নিউজিল্যাণ্ড থেকে। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন অনেক আমেরিকান দেখেছি কিন্তু এখন আর অতটা চোখে পড়ে না। কয়েক বছর আগেও অনেক সাবেক সৈনিকরা এসে তাঁদের যুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্থান দেখতেন, শ্রদ্ধা জানাতেন। কিন্তু এখন তারাও আর আসেন না।’

“আচ্ছা, আপনিও তাহলে দ্বীপের বাসিন্দা?’ রেমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করল। ডা. ভ্যানার উচ্চারণে কোনো আঞ্চলিকতার রেশ নেই।

‘দশ বছর পর্যন্ত আমি এখানেই ছিলাম। তারপর আমার পরিবার সিডনি চলে যায়। ওখানকার স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর কোনো একসময় আমার স্থানীয় উচ্চারণ মুছে গেছে। হাসল ভ্যানা। কিন্তু একটা কথা আছে, শুনেছেন বোধহয়… “দ্বীপের বাসিন্দাকে দ্বীপের বাইরে নেয়া গেলেও তার বুক থেকে দ্বীপ নেয়া যায় না।” গ্রাজুয়েশন শেষ করার পর আমি আমার মাতৃভূমিতে এসে সেবা করতে চেয়েছিলাম। তাই ৯ বছর আগে আবার এই দ্বীপে ফিরে আসি।’

‘দারুণ।’ বলল স্যাম।

‘এখানে আমার বর্তমান প্রজেক্ট হলো, একাধিক গ্রাম্য ক্লিনিক খোলার জন্য অনুদান সংগ্রহ করা। দেখে মনে হতে পারে দ্বীপটা ছোট। কিন্তু যখন আপনার কোনো দূর্ঘটনা হবে কিংবা কোথাও কেটে-ছড়ে যাবে তখন দেখবেন পথ আর শেষ হতে চাইছে না। তাছাড়া বিভিন্ন রোগের টিকা এখানে সহজলভ্য নয়। আমাদের এখানকার সরকার ব্যবস্থা সবসময় নাজুক। কোনো স্থিতিশীলতা নেই। তাই যা করার ব্যক্তিগত উদ্যোগেই করতে হয়।’

‘দারুণ উদ্যোগ।’ স্যাম প্রশংসা করল। এ-ব্যাপারে আমাদেরকে আরও কিছু জানাতে পারেন?

‘কেন? অনুদান দেবেন?’ একটু খোঁচা মেরে বলল ভ্যানা।

এবার রেমি এগিয়ে এলো। আমরা একটা ফাউণ্ডেশন চালাই। ফাউণ্ডেশন থেকে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দাঁতব্য প্রতিষ্ঠানে অনুদান দেয়া হয়।

পরপর দু’বার চোখের পলক ফেলল ভ্যানা। তারপর অপ্রস্তুতভাবে হাসল। ইয়ে, তাহলে তো আপনাদেরকে অবশ্যই আমার সাথে ডিনার করতে হবে। এখানে আছেন ক’দিন?

শ্রাগ করল রেমি। এখনও ঠিক করিনি।’

স্যাম মুচকি হাসি দিয়ে বলল, “দ্বীপ থেকে আমারদেরকে যতদিন না বের করে দেয়া হচ্ছে!

হেসে উঠল সবাই। ভ্যানা মাথা নাড়ল। আপনারা সম্প্রতি যা করে দেখিয়েছেন সেটাকে বীরত্ব বললেও কম বলা হবে। সত্যি! আজ সন্ধ্যায় যদি হাতে কাজ না থাকে তাহলে চলুন একসাথে ডিনার করি। আমার সাথে এক সহকর্মী থাকবেন। আপনাদের প্রজেক্ট নিয়ে সে কথা বলতে আগ্রহী হবে, আমি নিশ্চিত। আমাদের এখানে আর্কিওলজিস্টটরা খুব একটা আসেন না। আর হ্যাঁ, আমার ক্লিনিক সম্পর্কে অবশ্যই বলব।

স্যামের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করল রেমি। আমরা অযাচিত অতিথি হয়ে যাব না? আপনি নিশ্চিত?

“একদম, ভ্যানা বলল। সত্যি বলতে, এখানে টানা কাজ করতে করতে আমি বিরক্ত হয়ে গেছি। নতুন মুখদের সাথে বসে নতুন নতুন গল্প শুনতে ভাল লাগবে। তবে একটা কথা বলে রাখা হলো, আমার এই দাওয়াতের পেছনে কিন্তু শতভাগ স্বার্থ কাজ করছে।

‘সমস্যা নেই।’ স্যাম বলল। আমরা তাহলে আপনার সাথে এখানে দেখা করব?’

যদি চান। থামল ভ্যানা। কী যেন ভাবছে। কিংবা আমি-ই আপনাদের কাছে চলে আসতে পারি। প্রথমে বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হব তারপর পোশাক বদলে চলে আসব, অবশ্য বৃষ্টি থাকলে ভিন্ন কথা। আপনারা যেন কোন হোটেলে উঠেছেন?’

ভ্যানাকে হোটেলের ঠিকানা দিল স্যাম। রাত আটটায় হোটেলের লবিতে দেখা করবে বলে ঠিক করল। আরও একমিনিট রিকির সাথে থাকল ভ্যানা। আংকেল বেনজির শারীরিক অবস্থা ওকে বুঝিয়ে বলল। তারপর ভাঙ্গা হাত নিয়ে আসা শ্রমিকটিকে পরীক্ষা করে চলে গেল ভেতরে।

০৬. ডা. ভ্যানার মেসেজ

০৬.

ডা. ভ্যানা কোনো মেসেজ দিয়ে গেছে কিনা সেটা দেখতে হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কে খোঁজ নিল স্যাম ও রেমি। ক্লার্ক ওদেরকে একটা মেসেজ স্লিপ ধরিয়ে দিল।

কাজ হয়েছে দেখা যায়, নোটটা পড়তে পড়তে বলল স্যাম। লিও আগামীকাল সকাল ছ’টায় আমাদেরকে নিতে আসবে।’

‘কুমীর ভর্তি জলাভূমিতে ডাইভ দিতে আমার কেমন যেন লাগছে,’ রেমি বলল।

ভুল বললে ওটা জলাভূমি নয় আর কুমীর তো মাত্র একটা ছিল।’

‘আচ্ছা, পানির নিচে যদি কুমীর আক্রমণ করে তাহলে ঠিক কী উপায়ে আত্মরক্ষা করতে হয়? হাঙ্গর থেকে বাঁচার জন্য যে-রকম কায়দা ব্যবহার করা হয় সেরকম নাকি?

“চিন্তার কিছু নেই! কুমীর থেকে বাঁচার কায়দা আমার জানা আছে।’

‘ভাল। তো তোমাকে যখন একটা কুমীর আক্রমণ করবে তখন কী করবে শুনি?

এটা কোনো ব্যাপার হলো!’ স্যাম বলল। আমি দ্রুতগতিতে সাঁতার কাটতে পারি।

কুমীরের চেয়ে দ্রুত সাঁতার কাটাতে পার না নিণ্ডয়ই?’

‘তা ঠিক। কিন্তু যা পারি তাতেই যথেষ্ট। হাসল স্যাম। গতিতে তোমাকে হারাতে পারলেই চলবে।

পাল্টা হাসি দিল রেমি। ফাজিল।

‘নোনাপানির কুমীররা কম নড়াচড়া করে। সে-হিসেবে আমরা যেখানে ডাইভ দিতে যাচ্ছি সেখানে ওদের হানা দেয়ার সম্ভাবনা নেই। নিরাপদ থাকব আমরা। তারপরও চোখ-কান খোলা রাখব। সাবধানের মার নেই।’

‘প্রার্থনা করি, কেউ কুমীরদেরকে গিয়ে বলে আসুক, ওরা যেন আমাদের ডাইভিং এরিয়ায় হাজির না হয়।’

কাদায় মাখামাখি হয়ে যাওয়া একটা সিলভার মিতসুবিশি নিয়ে হাজির হলো ডাক্তার ভ্যানা। স্যাম আর রেমি পেছনের সিটে গিয়ে বসে সিটবেল্ট বেধে নিল। সন্ধ্যা নামছে। বৃষ্টি থেমে গেলেও রাস্তার অনেক জায়গায় পানি জমে আছে এখনও। খানা-খন্দ দেখে খুব সাবধানে ডা. ভ্যান গাড়ি চালাচ্ছে।

‘আশা করি, আপনারা সামুদ্রিক খাবার পছন্দ করেন। এই দ্বীপে খুব ভাল পাওয়া যায় ওগুলো! একদম তরতাজা টাটকা, যদিও সৌন্দর্যের বিচারে একটু ঘাটতে আছে। তবে বিশ বছর ধরে এখানে সামুদ্রিক খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। ভাল তো হবেই।’

‘একদম, রেমি বলল। সামুদ্রিক খাবার আমার পছন্দ।

‘আমারও। একমত হলো স্যাম।

রেস্টুরেন্টের বাইরের কাঠের দেয়ালের রং নীল। তবে সময়ের বিবর্তনে সেটা ঝাপসা নীল হয়ে গেছে। দরজার উপরে সাদামাটা হস্তাক্ষরে রেস্টুরেন্টের নাম লেখা: Eleanor’s.

‘এটার মালিক একজন মহিলা। তাঁর হাতে জাদু আছে! দারুণ সব রেসিপি করে। যা তৈরি করে সবই ভাল। কোনোটাতেই আপনাদের অরুচি হবে না। ভ্যানা ওদেরকে নিশ্চিত করল।

বাইরের মতো ভেতরেও একই দশা। একদম সাদামাটা। তবে রান্নাঘর থেকে দারুণ সুঘ্রাণ ভেসে আসছে। স্থানীয় লোকজন খাবার খাচ্ছে ডাইনিং এরিয়ায়। পেছনের দিকে থাকা এক টেবিলের দিকে এগোল ভ্যানা। কয়লার মতো কালো দেখতে একজন হৃষ্টপুষ্ট লোক স্যুট-টাই পরে বসে রয়েছে। ভ্যানাদেরকে দেখে হাসল সে। ওরা এগিয়ে আসতেই উঠে দাঁড়াল স্যুট পরা ব্যক্তিটি। সে এতই লম্বা যে আর একটু হলেই রেস্টুরেন্টের ছাদে গিয়ে তার মাথা ঠেকতো। ভ্যানা পরিচয় করিয়ে দিল।

‘স্যাম ফারগো ও রেমি ফারগো… ও হচ্ছে অরউন ম্যানচেস্টার। অরউন। এখানকার একজন খাঁটি সেলিব্রেটি। আমাদের সংসদে টিকে যাওয়া কয়েকজন সদস্যের মাঝে ও একজন।

‘ধন্যবাদ, ভ্যানা। খুব ভাল বলতে পারো তুমি। তোমার তো সরকারের হয়ে কাজ করা উচিত। ভাল করতে পারবে।’ বলল ম্যানচেস্টার। তার কণ্ঠস্বর বেশ ভরাট। তবে রসিক বলে মনে হলো। “Halo olkata,” স্থানীয় ভাষায় অভিবাদন জানাল সে। তার সাথে রেমি হাত মিলালো। ম্যানচেস্টারের হাত রেমির হাতের চেয়ে সাইজে দ্বিগুণ বড়। স্যামও হাত মিলালো। খেয়াল করল অরউন তার হাতের ব্যাপারে বেশ সচেতন। অতিথিদের হাতে যাতে বাড়তি চাপ না পড়ে সেদিকে সতর্কতা অবলম্বন করছে।

‘হয়েছে। এত বিনয় তোমাকে মানায় না, অরউন। তুমি সলোমন আইল্যান্ডের আইকন ব্যক্তিত্ব। বলল ভ্যানা।

‘আমার ভাগ্যটা ভাল। ম্যানচেস্টার মাপা হাসিতে জবাব দিল। ভাল ডাক্তাররা সবকিছু বাড়িয়ে বলে। আমি এমন একটা পেশায় জড়িত যেটায় কেউ আসতে চায় না। তাই আমার কাজে তেমন প্রতিযোগী নেই, প্রতিযোগিতাও নেই।’

ভ্যানার মতো ম্যানচেস্টারের ইংরেজি উচ্চারণও সুন্দর। বোঝা গেল সে ও অস্ট্রেলিয়ান শিক্ষাব্যবস্থার অধীনে পড়ালেখা করেছে। টেবিলের চারপাশে বসল সবাই। ওয়েটার হাজির, হাতে কোনো মেনু নেই। পটপট করে মেনু বলে গেল সে। কিছু বুঝতে না পেরে হতভম্ব হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাল স্যাম ও রেমি।

বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতে ভ্যানা এগিয়ে এলো। যদি আপনারা বিয়ার নিতে চান তাহলে এখানকার সলব্রিউ ভাল হবে। এক বন্ধুর কাছে শুনেছি ড্রিঙ্কসকে ঠাণ্ডা রাখার বিশেষ ব্যবস্থা আছে এদের। আর এখানে কিন্তু ভাল সোডাও পাওয়া যায়।

একটা কোলা চাইল রেমি! ম্যানচেস্টার আর স্যাম বিয়ার অর্ডার করল। স্রেফ এক বোতল পানি নিল ভ্যানা, বলল সোডার সাথে ক্যাফেইন আর চিনি খেলে ওর সারারাত ঘুম হবে না। এই দ্বীপের প্রায় কোনো মেয়েই অ্যালকোহল পান করে না। আমাকে এখন যদি কেউ দেখে এখানে বসে অ্যালকোহল খেয়েছি তাহলে পুরো দ্বীপে কানাঘুষা শুরু হয়ে যাবে।’ ভ্যানা বলল। অস্ট্রেলিয়ায় এসব খেতাম। এখানে মিস করি। ঠাণ্ডা বিয়ার আর ভাল ওয়াইন।

‘আপনাকে হিংসা করতে পারছি না, ওয়েটার ড্রিঙ্কসের বোতল আর চারটা এক পৃষ্ঠার মেনু দিয়ে যাওয়ার পর বলল স্যাম।

‘কপাল ভাল, এই নিয়ম পুরুষদের উপর প্রযোজ্য নয়। চিয়ার্স! ম্যানচেস্টার বোতল তুলে টোস্ট করল। বোতলে বোতলে ঠুকে চুমুক দিল স্যাম। বলল, “ভাল তো। এটা নিয়মিত খাওয়া যেতে পারে।

‘কোনো বিয়ারই স্যামের খারাপ লাগে না।’ রেমি মেনু পড়তে পড়তে বলল। মেনু আপনিই ঠিক করুন, নাকি?

‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’ বলল ভ্যানা। মাথা নেড়ে ম্যানচেস্টার সম্মতি দিল।

পাশের টেবিলের দিকে তাকাল স্যাম। স্থানীয় লোকজন হাত দিয়ে মাছ খাচ্ছে। ম্যানচেস্টার বিষয়টা খেয়াল করে হাসল। হাত দিয়ে খাওয়া এখানকার প্রচলিত রীতি। চিন্তার কিছু নেই। আমাদের টেবিলের সবাই কাঁটা চামচ আর ছুরি ব্যবহার করেই খাবে।

৪ টা টাটকা মাহি মাহি ডিস অর্ডার করল ওরা। ওয়েটার মেনুগুলো নিয়ে ফিরে গেল।

‘আপনারা এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে কাজ করতে এসেছেন, তাই?’ ওয়েটার যাওয়ার পর বলল ভ্যানা।

রেমি মাথা নাড়ল। এক বন্ধুকে সাহায্য করছি।

‘গোয়ালক্যানেলে এসেছেন কবে?’ ম্যানচেস্টার প্রশ্ন করল।

আজ সকালে।

‘প্রথম দিনেই কাহিনি হয়েছে, অরউন। কুমীরের কামড় খাওয়া এক লোককে নিয়ে হাসাপাতালে এসেছিলেন ওরা। সেখানেই পরিচয় হয় আমাদের।’

‘ও খোদা! সত্যি? নাকি মজা করছ?’ বলল ম্যানচেস্টার। সত্যি সত্যি অবাক হয়েছে।

মজা হলে তো ভালই হত। কিন্তু এটাই সত্য।’ স্যাম জানাল। কুমীরকে মেরে ফেলা হয়েছে ঠিকই কিন্তু অনেক রক্ত ঝরেছে লোকটার।

‘মর্মান্তিক। আমি দুঃখিত, দ্বীপে এসেই আপনাদেরকে এরকম একটা পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে। আমরা সাধারণত চেষ্টা করি কুমীর আর অ্যাটনীরা যেন পর্যটকদের কাছ থেকে দূরে থাকে। অন্তত শুরুতে সেরকমটাই করা হতো। এরকম আক্রমণ হলে তো পর্যটন ব্যবসা লাটে উঠবে।’ থামল সে। অ্যাটনী আর কুমীরের মধ্যে পার্থক্য নেই। তবে ভাল অ্যাটনীরা বন্ধুর মতো আচরণ করে।

হেসে উঠল সবাই। ম্যানচেস্টার বলে চলেছে, তাহলে আজকের দিনে দুটো খারাপ ঘটনা ঘটল। এক, কুমীরের আক্রমণ। দুই, রাজনীতিবিদের সাথে ডিনার।

ভ্যানা হাসল। “হোক রাজনীতিবিদ। কিন্তু তুমি তো ভাল রাজনীতিবিদ, তাই না?’ স্যামের দিকে তাকাল ও। অরউন নিজেও একজন অ্যাটনী। তাহলে আপনারা পাচ্ছেন একের ভেতর তিন! হাত বাড়িয়ে ম্যানচেস্টারের হাত চাপড়ে দিল ভ্যানা।

বিয়ারের বোতল শেষ করে ফেলেছে ম্যানচেস্টার। সেজন্য আরেক বোতল খাব। স্যামের দিকে তাকাল সে। মাত্র অর্ধেক বোতল শেষ হয়েছে ওর। ওয়েটারকে ২ আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করল অরউন। স্থানীয় হওয়ায় পিপাসা বেশি, আরকী। স্যামকে দেখে নিল সে। সামনে ঝুঁকে বলল, আক্রমণটা খুব বেশি ভয়াবহ ছিল?

নাক গলালো ভ্যানা। বেঁচে যাবে, তবে একটা পা কাটা পড়েছে। লোকটির ভাতিজা বলল কুমীরটা নাকি ২০ ফুট লম্বা ছিল। সে হিসেবে ভিকটিম কিন্তু ভাগ্যবান। কুমীর যে তাকে দু’টুকরো করে ফেলেনি এটাই অনেক।

আরেক রাউণ্ড বিয়ার চলে এলো। স্যামের দিকে তাকিয়ে হাসল ম্যানচেস্টার। এই গরমের মধ্যে আপনাকে দ্রুত ড্রিঙ্কস করা শিখতে হবে নইলে ড্রিঙ্কস-ই গরম হয়ে যাবে।

হাসল স্যাম। একটা বালতিতে কিছু বরফের ব্যবস্থা করা গেলে ভাল হত। এমনিতেই আমার ওজন কম তার ওপর কালকে ডাইভ করতে নামৰ। কড়া ড্রিঙ্কস করলে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

‘ডাইভ করবেন? পানি নিচে? দারুণ তো। কাহিনি কী? ভ্যানা আর্কিওলজি নিয়ে কী যেন বলল? জানতে চাইল ম্যানচেস্টার। টাটকা বিয়ারের বোতল থেকে বড় করে একটা চুমুক দিল। হাত নেড়ে ওয়েটারকে ডাকল সে। কানে কানে কিছু একটা বলে দিয়ে আবার স্যামের দিকে ফিরল। বুঝলাম না আর্কিওলজির সাথে পানির নিচে ডুব দেয়ার কী সম্পর্ক? অবশ্য কোনোকিছু ডুবে গিয়ে থাকলে ভিন্ন কথা…’।

‘আমাদের বন্ধু ব্যতিক্রমধর্মী কিছু একটা খুঁজে পেয়ে সেটা কী দেখার জন্য আমাদেরকে ডেকে এনেছে।

‘তাই? তাহলে আপনারা প্রত্নতত্ত্ববিদ? আর্কিওলজিস্ট?

‘আমরা আর্কিওলজি ভালবাসি।

‘বেশ বেশ। আমার কখনও এরকম পেশায় জড়িত হওয়ার সৌভাগ্য হয়ে ওঠেনি। রেমির প্রশংসা করল ম্যানচেস্টার।

‘পৃথিবী বদলাচ্ছে। চমকের শেষ নেই, ওর হাতে থাকা বিয়ারের বোতলটা টোস্ট করার জন্য তুলল। রাজনীতিবিদকে ভিন্ন প্রসঙ্গে আনার চেষ্টা আরকী।

‘আচ্ছা, সেই ব্যতিক্রমধর্মী” জিনিসটা কী?’ ভ্যানা জানতে চাইল।

‘সেটা জানি না। আমরা এখানে এসেই তো কুমীরের কাহিনিতে জড়িয়ে পড়লাম। জানাল রেমি।

‘যুদ্ধের সময়কার বাতিল কিছু হতে পারে কি? এখানে তো ওসবের অভাব হওয়ার কথা নয়। ম্যানচেস্টার বলল।

হতে পারে।’ বলল স্যাম।

বরফ বোঝাই বালতি নিয়ে ওয়েটার হাজির হলো। ওতে একটা বিয়ারের বোতল রাখল স্যাম। ম্যানচেস্টার ইতিমধ্যে তার প্রথম বোতল শেষ করেছে। দ্বিতীয় বোতলের জন্য ইশারা করল সে।

‘আমাদের ব্যাপারে তো অনেক কথা হলো, প্রসঙ্গ পরিবর্তন করার জন্য বলল স্যাম। এবার ক্লিনিক সম্পর্কে কিছু শুনতে চাই।’

ভ্যানা ওর দিকে ঘুরল। পরিকল্পনাটা অনেক পুরানো। প্রথমদিকে ক্লিনিক করার বিষয়টা আমি সরকারের উপর ছেড়ে দিয়ে রেখেছিলাম কিন্তু সরকার জনগণের টাকা চুষে খেতেই ব্যস্ত। তাই বাধ্য হয়ে নিজেকে নামতে হলো। এখানকার বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়ত অথচ কোনো সেবা পেত না। চিকিৎসা করলে বাঁচানো যেত এরকম অনেক মানুষ মারা গেছে। খুব বেশি কিছু যে প্রয়োজন তা-ও নয়। স্রেফ হালকা কিছু সেবা। তাতেই প্রাণ বেঁচে যেত অনেকের। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে এরকম পরিস্থিতি মেনে নেয়া যায় না। কোনোভাবেই নয়। আমাদের জ্ঞান আছে, শুধু অর্থ প্রয়োজন। আর সেই অর্থ দিয়ে আমাদের সম্মানিত দাতাগণ তাদের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।’

বাহ্ বেশ। আপনারা কী ইতিমধ্যে অনেক দাতা পেয়েছেন?’ রেমি জানতে চাইল।

বিয়ারের তৃতীয় বোতল সাবাড় করে হেসে উঠল ম্যানচেস্টার। প্রত্যেকটা ওষুধ প্রস্তুককারক কোম্পানীর কাছে গিয়ে অনুরোধ করেছিল ও। বিনিময়ে লজ্জা পেয়েছে।’

‘ওখানেই শেষ নয়, ওরউইন। আসল বিষয় হলো, আমাদের এখানকার লোকজনের ব্যাপারে কেউ কোনো তোয়াক্কা করে না। বড় বড় কোম্পানীগুলো চাইলেই কলমের একটা খোঁচায় আমাদের এখানকার অনেক সমস্যার সমাধান করে দিতে পারতো কিন্তু দেয়নি। কারণ আমাদের এই দ্বীপ সেভাবে জনপ্রিয় নয়। পৃথিবীর এক কোণায় পড়ে রয়েছি আমরা। কেউ আমাদের কথা জানে না। তারপরও যা পেয়েছি ওতেই শুকরিয়া। নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল।

‘আপনাদের এখনও আরও কত অর্থ প্রয়োজন?

‘প্রথম বছরের জন্য আমার টার্গেট ৫ লাখ মার্কিন ডলার। দ্বিতীয় বছরে ২০ লাখ। তারপর থেকে প্রতি বছর ২০ লাখ মার্কিন ডলার করে চাই। প্রথম বছরের টাকা কিছু ভবন আর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করব। মাথা নাড়ল ভ্যানা। কোম্পানীগুলো দাঁত সাদা করার পেস্টের বিজ্ঞাপন দিতে এরচেয়েও বেশি খরচ করে। কিন্তু আমাদেরকে টাকা দিতে চায় না। দ্বীপটা আকর্ষণীয় হলে ঠিকই দিত। তারপরও আমি এপর্যন্ত প্রথম বছরের জন্য দেড় লাখ আর দ্বিতীয় বছরের জন্য ৫০ হাজার ম্যানেজ করতে পেরেছি।’

স্যামের দিকে তাকাল রেমি। স্যামের ঠোঁটে হালকা হাসি দেখা যাচ্ছে। ‘আমরা বিষয়টা বিবেচনায় রাখলাম। আপনাদের কোনো রূপরেখা আছে?  বাজেট লেখা আছে কোনো?’

“অবশ্যই। পুরোটাই প্রেজেন্টেশন আকারে রেডি আছে।

‘আমরা কি একটা কপি পেতে পারি? রেমি প্রশ্ন করল।

অবশ্যই। আপনাদেরকে একটা কপি দিতে পারলে আমিও খুশি হব। আপনারা তাহলে সত্যিই এখানকার ক্লিনিকের জন্য দান করতে আগ্রহী? জানতে চাইল ভ্যানা। ওর কণ্ঠস্বরে চাপা উত্তেজনা।

স্যাম বিয়ার খাওয়া শেষ করেছে। কথা দিচ্ছি না। আগে দেখি, তারপর বলব।

মাছের ডিশ হাজির। খাবারের উপর প্রথম হামলা করল ম্যানচেস্টার। ওর হামলে পড়া দেখে যে-কেউই বুঝতে পারবে এই লোক বেজায় ভোজন রসিক। কোনো খাবারে এর অরুচি নেই। মাছ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ কোনো কথা বলল না। সবাই চুপ। খাওয়া শেষে পেছনে হেলান দিল স্যাম। ‘দারুণ তো। মাছগুলোকে বোধহয় মাত্র ধরে এনেছে। একদম টাটকা।

মাথা নেড়ে সায় দিল ভ্যানা। কয়েক ঘণ্টা আগে হয়তো এনেছে। সৌভাগ্যবশত এখানে প্রচুর সামুদ্রিক খাবার পাওয়া যায়। কোনো কমতি নেই। এই একটা দিকে আমরা ভাগ্যবান।

এখানে অনেক খনিজ পদার্থও আছে। কিন্তু উপযুক্ত প্রযুক্তি ও লোকবলের অভাবে আমরা ওগুলোকে মাটির নিচ থেকে তুলতে পারছি না। তিক্ত কণ্ঠে বলল ম্যানচেস্টার।

‘তাই?’ স্যাম প্রশ্ন করল। কীরকম খনিজ পদার্থ আছে?’

‘তেল, ভাই। তেল। কত তেল চাই আপনার? তাছাড়া সোনা, পান্না, রুবিসহ আরও অনেক কিছুই আছে। সৌদির চুতিয়া বাদশাগুলোর চেয়েও আমরা ধনী হতে পারতাম। কিন্তু কপাল দোষে আমরা নিজেরাই নিজেদের পেছনে বাঁশ দেয়ার জন্য ছুটে মরছি।’

‘এই তো ভাষণ শুরু হলো।’ মন্তব্য করল ভ্যানা। ওয়েটার এসে ইতিমধ্যে টেবিল থেকে প্লেটগুলো সরিয়ে ফেলেছে।

ইতিহাস বলে, আমাদের এখানে বিদেশিরা এসে ইচ্ছেমতো লুটপাট করে গেছে। আচ্ছা, আপনি আমাদের ইতিহাস কতখানি জানেন?’ ম্যানচেস্টার বলল।

‘বেশি কিছু না।’ জবাব দিল স্যাম।

‘অনেক বছর আমরা ব্রিটিশদের অধীনে ছিলাম। তারপর জাপানীরা দ্বীপের দখল নিয়ে নিয়েছিল। তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে আবার ব্রিটিশদের হাতে গিয়ে পড়েছিলাম আমরা। ফুটবলের মতো একবার এদিক তো আরেকবার ওদিক… এভাবে আমাদেরকে লাখানো হয়েছিল। কোনো স্বকীয়তা, সার্বভৌমত্ব ছিল না। সবসময় কারও না কারও অধীনে ছিলাম।’ ফাটা হাসি দিল ম্যানচেস্টার। ভাগ্যের ফের দেখুন… কাড়ি কাড়ি প্রাকৃতিক সম্পদের উপর বসে থেকেও আমরা সবাই গরীব। এরকম করুণ কাহিনি আপনি দুনিয়ার আর কোথাও পাবেন না।’

হাঁপ ছাড়ল ভ্যানা। এই একই ভাষণ ও এরআগে বহুবার শুনেছে। এরপর ও সোনার খনি নিয়ে কথা বলবে, আমি জানি।

‘আচ্ছা, তাহলে এখানে এখনও সোনা আছে? জানতে চাইল রেমি।

‘অবশ্যই আছে। কিন্তু এখানকার লোকদের হাবভাবে সেটা মনেই হচ্ছে না, তাই তো? আর ভ্যানা তো ইতিমধ্যে আমাদের সরকার ব্যবস্থার বেহাল দশা সম্পর্কে বলেই দিয়েছে। জনগণ সন্তষ্ট না হওয়ায় নিয়মিত সরকার পরিবর্তন হয়। তাই রাজনীতিবিদদের মূল লক্ষ্য থাকে কীভাবে মেরে কেটে নিজের পকেট বোঝাই করবে। এটাকে একধরনের দুষ্ট চক্র বলতে পারেন। তবে একমাত্র আমিই টানা ২০ বছর যাবত টিকে আছি।’

ম্যানচেস্টারের দিকে তাকাল ভ্যানা। এখানে যদি একজন ভাল মানুষ থেকে থাকে তাহলে সেটা অরউন। আমাদের গোয়াডালক্যানেলে অনেক রকম সমস্যা আছে ঠিকই, কিন্তু এখানকার জনগণের মনটা বড়।

বিয়ারের বোতল খালি করল ম্যানচেস্টার। কুমীরও বড়। ওদের একটা ব্যবস্থা করা দরকার।’

আলোচনার গতি কমে গেছে। একদম মোক্ষম সময়ে ভ্যানা উপযুক্ত প্রসঙ্গ টানল। কিছু বিষয় স্বীকার করে নেয়া দরকার। আমি আপনাদের দুজনের কাছে পুরোপুরি সৎ থাকতে চাই।’ নিচু স্বরে বলল সে।

‘তাই?’ ভ্রূ উঁচু করে রেমি প্রশ্ন করল।

‘হ্যাঁ। ঘাটাঘাটি করার অভ্যাস আছে আমার। পোশাক বদলাতে বাসায় গিয়ে স্যাম আর রেমি ফারগো লিখে গুগলে সার্চ করেছিলাম। বুঝতেই তো পারছেন আপনাদের ব্যাপারে কী কী জেনেছি।

স্যামকে অপ্রস্তুত দেখাল। ইন্টারনেটে যা পড়া হয় তার সবকিছু বিশ্বাস করা যায় না।

হয়তো।’ ম্যানচেস্টারের দিকে তাকাল ভ্যানা। অরউন, তুমি কিন্তু এখন সেলিব্রিটিদের সাথে বসে আছ! স্যাম আর রেমি হলেন স্বনামধন্য ট্রেজার হান্টার। গুপ্তধন খুঁজে বের করার কাজে ওনাদের অনেক সুনাম আছে।’

ম্যানচেস্টারের মুখ দেখে মনে হলো কেউ বোধহয় ওর মুখে পাথর ছুঁড়ে মেরেছে। ট্রেজার হান্টার?

মিডিয়ার কাজই এই। সবকিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি। বিনয় দেখাল রেমি। ‘আমরা সৌভাগ্যবান বেশকিছু উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারের সন্ধান বের করতে সক্ষম হয়েছি। প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক অনেক প্রজেক্ট পরবর্তীতে বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনের হদিস পাইয়ে দিয়েছে। তবে ট্রেজার হান্টার মানে এই না যে, আমরা গুপ্তধন উদ্ধার করে নিজেরা নিয়ে নিই। যা কিছু উদ্ধার করা হয় সব বুঝিয়ে দেয়া হয় উপযুক্ত মালিককে, যাতে সেগুলো বিভিন্ন দাঁতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করা যায় ও তাদের অবস্থান পরিবর্তন হয়।

‘একদম ঠিক। কিন্তু পত্রিকায় অনেক কিছু বানিয়ে বানিয়ে লেখে। ওদেরও তো পেট চালাতে হবে নাকি!’ স্যাম বলল।

‘বুঝেছি, ফারগো দম্পতি গুপ্তধন উদ্ধারের পাশাপাশি অনেক বিনয়ী। বলল ভ্যানা। অরউন, ইনারা স্বামী-স্ত্রী মিলে যত গুপ্তধন উদ্ধার করেছেন পৃথিবীর আর কেউ অতটুকু, করতে পারেনি। অথচ এদের সরল কথাবার্তা শুনে কিছু বোঝার উপায় নেই।

স্যাম হাত নাড়ল। দুনিয়ার লোকজন এসব গুপ্তধনের পেছনে ছোটার চেয়ে আরও ভাল কাজ করছে। এসব করা খুব একটা কাজের কাজ নয়।’

‘আচ্ছা, আপনারা যেন কোথায় ডাইভ করতে যাচ্ছেন বললেন?’ প্রশ্ন করল ম্যানচেস্টার। তার বলার ধরন পুরোপুরি ভদ্র ও সভ্য কিন্তু তারপরও একটু শীতলভাব টের পাওয়া গেল।

সুন্দর করে হাসি দিল রেমি। আমরা এখনও জায়গায় নাম বলিনি। আসলে এটা আমাদের বন্ধুর প্রজেক্ট। তাই বেশিকিছু বলা সম্ভব নয়। তবে আমি আপনাকে এতটুকু নিশ্চিত করতে পারি এই প্রজেক্টের সাথে গুপ্তধনের কোনো সম্পর্ক নেই।

ম্যানচেস্টারের চোখ সরু হয়ে গেল। দ্বীপটা অনেক ছোট, বুঝলেন। আমি নিশ্চিত ইতিমধ্যে সবাই কুমীরের ঘটনাটা জেনে গেছে। এখানে গোপন বিষয় বেশিক্ষণ গোপন থাকে না।

তা হতে পারে। কিন্তু বন্ধুর ইচ্ছের প্রতি সম্মান দেখানোটাও আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমাদের বন্ধু একজন প্রফেসর, এই বিষয়গুলো ওর কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বুঝিয়ে বলল রেমি।

ম্যানচেস্টার মাথা নাড়ল। বুঝতে পেরেছি। ভাবলাম, প্রজেক্টের ব্যাপারে আমি আপনাদের হয়তো কোনো কাজে আসব। অনুমতি-টনুমতির ব্যাপারে কিংবা অন্য কোনো কিছুতে…’।

হাই তুলল রেমি। ভ্যানা রেমির ইশারা বুঝতে পেরে ওয়েটারকে বিল আনতে ইশারা করল। ওয়েটার বিল আনতেই সেটাকে চট করে হাতে তুলে নিল স্যাম। ভ্যানা চেকটা নিতে যাচ্ছিল কিন্তু স্যাম ওর আগেই নিয়ে ফেলেছে। প্লিজ, আজকে ডিনারের বিলটা আমাদেরকে দিতে দিন। শেষ কবে এত সুস্বাদু মাছ খেয়েছি মনে করতে পারছি না। বিল দিয়ে তৃপ্তির ষোলকলা পূর্ণ করতে চাই।’

ভ্যানার চোখ দুটো চকচক করে উঠল, হাসল সে। বাহ্। খুব ভাল। আশা করা যায়, এভাবে আপনি আমাদের এখানকার মানুষদের জন্যও কিছু করবেন।’

‘ধুর! যদি জানতাম বিলটা অন্য কেউ দেবে তাহলে আরও কয়েক বোতল বিয়ার খেতাম!’ অট্টহাসি দিল ম্যানচেস্টার।

ডিনার শেষে স্যাম ও রেমিকে হোটেলে নামিয়ে দিল ভ্যানা। ক্লিনিকের প্ল্যান ই-মেইল করে পাঠাবে বলে কথা দিল। ফারগো দম্পতির কাছ থেকে বিদেয় নিয়ে রওনা হলো হাসপাতালের দিকে। ওখানে ওর অসুস্থ রোগীরা সেবার অপেক্ষায় রয়েছে।

ম্যানচেস্টার একটা চিজ, কি বলো?’ বলল স্যাম।

তা আর বলতে। আচ্ছা, তাকে রাগী দেখাচ্ছিল, তাই না? ঠাণ্ডা রাগ।

হু, তবে আমি তাকে দোষ দিতে পারছি না। লোকটা অনেক চাপে থাকে। এক পা এগোয় তো পরিস্থিতি তাকে দুই পা পিছিয়ে দেয়।

‘যদি সে সবকিছু সত্য বলে থাকে তাহলে তোমার সহানুভূতি ঠিক আছে। তবে আমার সাথে সে যেভাবে কথা বলছিল তাতে কিন্তু ওরকমটা মনে হয়নি।

.

০৭.

স্যাম ও রেমিকে গাড়িতে তুলে নিল লিও। গাড়ির পেছনের অংশে দুটো ডাইভিং সট আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস রয়েছে। লিও-কে দেখে মনে হচ্ছে গতরাতে খুব ধকল গিয়েছে ওর উপর দিয়ে। দুই দিনের খোঁচা খোঁচা দাড়িতে লবণ, ময়লায় মাখামাখি আর চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে।

‘গুড মর্নিং, বন্ধু,’ লিওর উপর নজর বুলিয়ে বলল স্যাম! কী অবস্থা?

লিও ফাটা হাসি দিল। আর বোলো না।’

‘ক্রু যোগাড় করতে পেরেছ?

সাগরের পাড়ে না যাওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছে না। গতকালের চেয়ে আজ দ্বিগুণ পারিশ্রমিক দিতে হবে ওদের। আশা করা যায়, আসবে।

হাতঘড়ি দেখল স্যাম। ব্যাকপ্যাক থেকে স্যাটেলাইট ফোন বের করল। দু’বার রিং হওয়ার পর ফোন ধরল সেলমা।

‘গুড মর্নিং, সেলমা।

‘আফটারনুন। এখানে বিকেল। ৬ ঘন্টার পার্থক্য আছে। অবশ্য আরও সঠিক করে বলতে গেলে তোমরা এগিয়ে আছে। তাহলে পার্থক্য দাঁড়াচ্ছে ১৮ ঘন্টার।

‘একদম ঠিক বলেছ। আচ্ছা, কোনো জাহাজের খোঁজ পেলে?

‘আমাদের ভাগ্য ভাল। অস্ট্রেলিয়া থেকে একটা জাহাজ আসছে। অবশ্য কয়েকদিনের মধ্যে ওটা আর ওখানে থাকতে পারবে না। আবহাওয়া সুবিধের নয়। আর হ্যাঁ, সত্যি কথা বলতে ওটা জাহাজ নয়। ১০০ ফুট দীর্ঘ অভিযানমূলক ইয়ট। গতি সর্বসাকুল্যে ১২ নট।

‘দারুণ খবর।

‘ওটা গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে রিসার্চ করছিল। যে ইন্সটিটিউট ইয়টটার মালিক তাদেরকে বলে তোমাদের কাজের জন্য একটা সাইড ট্রিপের ব্যবস্থা করেছি।

‘হু, সাইড ট্রিপ বটে।

‘আচ্ছা, গোয়াডালক্যানেলে তোমাদের দিনকাল কেমন যাচ্ছে? আমি তো শুনেছি জায়গাটা নাকি খুবই সুন্দর।

স্যাম ওকে কুমীরের আক্রমণের ঘটনা বলল। সব শুনে কিছুক্ষণের জন্য চুপ রইল সেলমা।

‘ভয়াবহ ঘটনা। তোমরা এখনও ওখানে কী করছ? নিরাপদ কোথাও চলে যাচ্ছ না কেন?

‘আমি রেমিকে প্রতিনিয়ত বোঝানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি, আমাকে এসব থেকে রেহাই দাও। এবার অবসর নিই। কিন্তু সে কী আর আমার কথা শোনে!’ বলতে বলতে রিয়ারভিউ আয়না দিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকাল স্যাম। দেখল, রেমি আপত্তিসূচক মাথা নাড়ছে।

‘ইয়ট তোমাদের ওখানে পৌঁছতে আরও তিন-চারদিন লাগতে পারে। ততদিন পর্যন্ত নিজেদেরকে নিরাপদে রাখো আর অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকো। ভুলেও কুমীরদের ধারে কাছে যেয়ো না। কুমীর তো আছেই, আমি জেনেছি গ্রেট হোয়াইট শার্কও আছে ওখানে।

‘জেনে খুশি হলাম। আমাদের জন্য দেয়া কোরো।’

ফোন রাখল স্যাম। রেমি ওর দিকে ঝুঁকল। কী বলল, সেলমা?’

বলল, রেমি যেন শার্ক পানচিং (ঘুষি) চর্চা করে।

রেমির চোখ বড় বড় হয়ে গেল। না!’

‘হা! সেলমা এই এরিয়া নিয়ে গবেষনা করেছে। কুমীরের পাশাপাশি হাঙরও আছে এখানে।

‘তারপরও আমরা আজ পানিতে নামব?”

শ্রাগ করল স্যাম। কেউ তো আর চিরদিন বাঁচে না।’

লিও’র দিকে তাকাল রেমি। আবার বলো তো শুনি, কেন আমরা এত পথ পাড়ি দিয়ে এখানে আসতে রাজি হয়েছিলাম?’

বন্ধুর হয়ে স্যাম জবাব দেয়ার চেষ্টা করল। বৈজ্ঞানিক বিষয়ে আগ্রহ, বন্ধুত্ব, নতুন কিছু আবিষ্কার করার রোমাঞ্চ, জ্ঞান আহোরণ ইত্যাদি।

‘ক্লান্তি ও বিরক্তি। এটা বলতে ভুলে গেছ।’ বলল লিও। হেসে উঠল সবাই।

তুমি জানো, ওয়েট স্যুট পরে পানিতে নামলে হাঙরের চোখে আমাদেরকে সীল (একধরনের সামুদ্রিক প্রাণী)-এর মতো দেখাবে? রেমি বলল।

দাঁত বের করে হাসল স্যাম। আমি তো শুনেছি ওয়েট স্যুট খেতে খুব একটা সুস্বাদু নয়। হাঙররা ওয়েট স্যুট এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে।’

হাঙর নয়। তুমি ভোদরের কথা বলছ।’ সংশোধন করে দিল রেমি।

‘ওহ, আমি বারবার গুলিয়ে ফেলি। তাহলে পানিতে নেমে ভোদরের মতো অভিনয় করতে হবে। তাহলে হয়তো হাঙর এড়িয়ে যাবে আমাদের।

‘পানিতে কুমীর খুব একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় না। সমুদ্র কিংবা নদীর পাড়ে কুমীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে পারে।’

‘যেমনটা বেনজির ক্ষেত্রে হয়েছে। বেচারা।’

সাগর পাড়ে ওরা পৌঁছে দেখল নতুন একটা ট্রাক পার্ক করে রাখা আছে। পাম গাছের ছায়ায় অপেক্ষা করছে তিনজন। ওদের গাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। কাছেই একটা নৌকো অলসভঙ্গিতে ভাসছে পানিতে। রোদ পোহাচ্ছে।

চারদিকে ভাল করে চোখ বুলিয়ে নিল স্যাম ও রেমি। দেখে নিল আশেপাশে কোনো কুমীর ঘাপটি মেরে আছে কিনা। কুমীরের দেখা না পেয়ে ওয়েট স্যুট পরে নিল ওরা দু’জন। নৌকোয় উঠল। নৌকোর ইঞ্জিনের অনেক বয়স হয়েছে। একবার কেশে নিয়ে চালু হল ইঞ্জিন। ক্যাপ্টেনকে দিক নির্দেশনা দিচ্ছে লিও, ওর হাতে একটা জিপিএস রয়েছে।

জায়গামতো পৌঁছুনোর পর ক্যাপ্টেন গতি বন্ধ করে স্রেফ ইঞ্জিন চালু করে রাখল। ওদিকে স্যাম ও রেমি ওদের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সেরে নিচ্ছে। লিও হাসিমুখে মাস্ক, রেগুলেটর ইত্যাদি এগিয়ে দিয়ে ওদেরকে সাহায্য করল।

‘পানির তলা এখান থেকে প্রায় ৮০ ফুট নিচে। সবকিছু বেশ পরিষ্কার দেখতে পাবার কথা, ডাইভাররা তো সেরকমটাই জানিয়েছে। তাছাড়া সমুদ্রের পানি এমনিতেও বেশ টলটলে।’

রেগুলেটর বের করল স্যাম। কিন্তু গতকাল ঝড় হয়েছে। বিষয়টা মনে রাখতে হবে। দেখা যাক… কী আছে কপালে।

পিঠ পেছনে দিয়ে নৌকো থেকে ডাইভ দিল রেমি। স্যাম একটা ধাতব ডাইভ মই বেয়ে পানিতে নামল। পানিতে নেমে শুকরিয়া জ্ঞাপন করল স্যাম। পানির তাপমাত্রা বেশ আরামদায়ক। পানির গভীরে ডুব দিল ও। রেমিকে দেখতে পেল, দশ ফুট দূরে রয়েছে, অপেক্ষা করছে ওর জন্য। ওরা দুজন একে অপরকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে থাম্বস আপ জানাল। ধীরে ধীরে আরও গভীরে যাত্রা করল ওরা। একদম তলায় কী আছে সেটা ওদের বর্তমান অবস্থান থেকে দেখা যাচ্ছে না বললেই চলে।

৫০ ফুট নিচে নেমে রেমির কাঁধে টোকা দিল স্যাম। সমুদ্রের তলায় বিশালাকার কিছুর আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ওদিকে এগোেনোর পর ওরা নিশ্চিত হলো জিনিসটা মানুষের তৈরি। ধ্বংসাবশেষের গায়ে বিভিন্ন সামুদ্রিক শৈবাল জড়িয়ে রয়েছে, তবে আকার-আকৃতি খুব একটা বিকৃত হয়ে যায়নি। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, এটা কোনো একটা ইমারতের অংশ।

ইমারতের একদম কাছে পৌঁছুনোর পর পায়ের সাথে লাগানো ডাইভিং নাইফ বের করল স্যাম। রেমি দেখল স্যাম ধীরে ধীরে সব জলজ লতাপাতা আর শৈবালের জঞ্জাল কেটে পরিষ্কার করছে। কাজ সেরে কিছুক্ষণ পর স্যাম পিছিয়ে এলো যাতে রেমি দেখতে পারে।

দুই ব্লকের জোড়মুখ এটা।

হঠাৎ সমুদ্রের তলদেশের কাছ দিয়ে কিছু একটা সাঁতরে গেল। চুপ হয়ে গেল ফারগো দম্পতি। স্যাম তাকিয়ে দেখল ওটা একটা বড় হাঙর। গ্রেট হোয়াইট শার্কের মতো দৈত্যাকার না হলেও যথেষ্ট বড়। প্রায় নয় ফুট দীর্ঘ।

ওদের দুজনকে মাঝখানে রেখে কয়েক পাক ঘুরল হাঙরটা। কিন্তু আগ্রহী হওয়ার মতে কিছু না পেয়ে অন্যদিকে চলে গেল। মাস্কের ভেতরে রেমির চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। হাঙরকে চলে যেতে দেখে স্যাম নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি ও হৃদপিণ্ডে স্পন্দন দু’টোকেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারল। এখানে ওরা কতটা ঝুঁকির মধ্যে আছে সেটা প্রমাণ হিসেবে এইমাত্র ঘটে যাওয়া ঘটনাই যথেষ্ট। ধ্বংসাবশেষের ভেতর দিয়ে দ্রুত চোখ বুলিয়ে উপরে উঠতে শুরু করল ওরা। সাঁতরে উপরে ওঠার সময় নির্দিষ্ট স্থানে এসে থামল, দ্রুত উপরে উঠলে ডিকমপ্রেশনে আক্রান্ত হতে হবে। অনাহুত কোনো অতিথি উদয় হয় কিনা সেটা দেখতে চোখ খোলা রেখে সজাগ থাকল ওরা।

ওয়েট স্যুটসহ যাবতীয় সরঞ্জাম খুলে ফেলল নৌকোয় উঠে।

“কী অবস্থা?’ প্রশ্ন করল লিও।

‘নিশ্চিত করে বলা যায়, দালান-কোঠা টাইপের কিছু একটা হবে। তবে বেশ পুরানো।’

মাত্র একবার দেখেই কীভাবে এতটা জোর দিয়ে বলছ?

ব্লকের গঠনশৈলী ব্যাখ্যা করল রেমি। সব শুনে লিও মাথা নাড়ল। তাহলে তোমরা একদম নিশ্চিত?

‘আমরা কিন্তু এরকমটাই সন্দেহ করেছিলাম।

‘তুমি ডাইভ দেবে না?’ স্যাম লিওকে প্রশ্ন করল।

মাথা নাড়ল রাশিয়ান। কখনও শিখিনি।’

‘ডাইভিঙের উপর শর্ট কোর্স সেরে নেয়া উচিত তোমার। পানির নিচে চলা এরকম অভিযানে যদি তুমি স্বশরীরে পানিতে না নামো তাহলে তো তোমার অভিযান অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।’

‘আমার যা বয়স হয়েছে… নতুন কি আর শিখতে পারব?

‘বোকারাম! আমরা একজন ট্রে খুঁজে বের করব। তারপর দেখবে শিখতে পার কি না। তাছাড়া সামনের কয়েকদিন কী নিয়ে ব্যস্ত তুমি?

লিও ঠিক ভরসা পাচ্ছে না। তুমি নিশ্চিত? আমি তো এটাকে, নিজের শরীরে দেখাল লিও, ফিট রাখিনি।’

‘এটা তেমন কঠিন কিছু না। স্রেফ ভেসে ভেসে সঁতরে যাওয়া। জ্যাকুস কসটিউ তোমার চেয়ে দ্বিগুণ বয়সে এসেও এসব করেছেন। এত আমতা আমতা করলে চলে! একটু সাহসী হও।’ বন্ধুকে খোঁচা মারল স্যাম।

নৌকো ওদেরকে পাড়ে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। বেনজিকে যেখানে কুমীরটা আক্রমণ করেছিল সেদিকে তাকাল রেমি। স্যামকে বলল

কুমীরের কী খবর?’ রেমির কণ্ঠস্বর বেশ নিচু।

স্থানীয়রা বোধহয় ভয়কে জয় করে এখান থেকে কুমীরগুলোকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ভয়ে লুকিয়ে থেকে আর কতদিন চলা যায়। বলল লিও। এবার ক্যাপ্টেনের দিকে ফিরল। কালকে আসতে পারবেন?

ক্যাপ্টেন আর ক্রুরা নিজেদের মধ্যে দুশ্চিন্তামাখা দৃষ্টি বিনিময় করল। তারপর বলল, না। এই জায়গায় ভালা না।

‘আরে, কী যে বলেন! কিছুই হবে না। কত সহজে অর্থ উপার্জন করতে পারবেন ভেবে দেখেছেন?!

ভ্রু কুঁচকাল ক্যাপ্টেন। ট্যাকা দিয়া আপনেরা এইহানে কুনো সুবিদা করবার পারবেন না। আমি আর কক্ষনও আমু না এইহানে। এই জায়গাড়া অভিশপ্ত। যদি নিজেগো ভালা চান তো এইহান থিক্কা চইল্যা যান। আর কক্ষনও ফিরা আইয়েন না। আর যদি থাকবার চান তত থাকেন। খোদা আপেগো দেইখ্যা রাখুক।’

কর্কশ হাসি দিল লিও। কী যে বলেন! অভিশপ্ত? এসব বলে কী আর আমাদেরকে ভয় দেখানো যায়!

শীতল দৃষ্টিতে ক্যাপ্টেন লিও’র দিকে তাকাল। আপনে যা করতে কইছিলেন করছি, কিন্তু আর করমু না। আমাগো মজুরী দিয়া দেন। বাড়িত চইল্যা যাই। আপনেরা নিজেগো জীবন নিয়ে জুয়া খেলবেন, ভালা কথা। কিন্তু আমি খেলম না।’

নাটকীয় কথাবার্তা। মন্তব্য করল লিও। কয়েকটা বিল বের করে ক্যাপ্টেন হাতে দিল। আমাদের মধ্যে কী কথা হয়েছিল মনে রাখবেন। কাউকে এই ব্যাপারে কিছুই বলবেন না। আরেকটা অতিরিক্ত বিল দিল সে।

আমি কাউরেই কইতাম না। আর কইলেও কেউ নিজের কপাল ফাটাইতে এইখানে আইব না। বেনজির কী অবস্থা হইছে আমি শুনছি। অভিশাপের লাইগ্যা ওর এক পাও কাড়া পড়ছে। একটু থামল ক্যাপ্টেন। এইডা তো ক্যাবল শুরু। সামনে আরও হইব।’

ক্যাপ্টেন ও তার ক্রু’রা তাদের ট্রাক নিয়ে বিদেয় হলো।

স্যামের দিকে তাকাল রেমি। লোকটার চেহারা খেয়াল করেছ? খুব ভয় পেয়েছে বেচারা।

স্থানীয় কুসংস্কার। মাম্বো জাম্বো। যতসব ফালতু। স্যাম তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দিল।

‘সে এই জায়গা সম্পর্কে আগে থেকেই জানে। হয়তো তার মাধ্যমে আমরা চলমান গুজব সম্পর্কে জানতে পারব।’ বলল রেমি।

‘ওসব শুনে কি খুব একটা লাভ আছে? পাড় থেকে একটু দূরেই প্রাচীন কোনো ভবনের ধ্বংসাবশেষ ডুবে রয়েছে। কেউ এটা সম্পর্কে জানতো না পর্যন্ত। অথচ আমরা ঠিকই আবিষ্কার করেছি। তাদের ওসব বাচ্চা ভোলানো ভূতের গল্পে কে বিশ্বাস করে? লিও বেশ ক্ষিপ্ত।

তবে লিও, এসব লোককাহিনিতে কিন্তু কিছু সত্য উপকরণও থাকে। মন্তব্য করল স্যাম। আশেপাশে একটু খোঁজ নিয়ে দেখলে ক্ষতি কী?

‘বেশ, তোমরা যদি তোমাদের সময় নষ্ট করতে চাও, করো। আমি বরং আগামী তিনদিনের মধ্যে স্কুবা ডাইভিং শিখব।

.

০৮.

লা জল্ল্যা, ক্যালিফোর্নিয়া

সামনের দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে কম্পিউটার স্ক্রিন থেকে চোখ সরাল সেলমা। ওর দুই সহকারী এসেছে হয়তো। পিট ও ওয়েন্ডি। লাঞ্চ করতে বাইরে গিয়েছিল ওরা। কিন্তু রুমে ভিন্ন একজনকে ঢুকতে দেখে জোলটান গরগর আওয়াজ করল। সেলমা হাত দিয়ে শান্ত করল জোলটানকে। আগন্তুকের নাম; ল্যাজলো।

পেশায় শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ায়। নিয়মিত আসে এখানে। সেলমা সন্দেহ করল এই ব্যক্তির হাতে এখন কোনো কাজ নেই তাই গল্প করে সময় কাটাতে আসছে। এরআগে লাওস অভিযানে গিয়েছিল ল্যাজলো। কিন্তু সেখান থেকে কোনো গুপ্তধন উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। গুপ্তধন না পেয়ে ল্যাজলো খুব বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিল কিন্তু কুখ্যাত জলদস্য ক্যাপ্টেন কিডের হাতে লেখা একটা কাগজ পেয়ে নিজেকে সামলে নিয়েছে। ক্যাপ্টেন কিডের কাগজে সবকিছু কোডে লেখা।

‘সেলমা, কী আর বলব। আজকের এই সুন্দর দিনে তোমাকে যা অসাধারণ লাগছে। আর জোলটান, তুমি তো মোটাসোটা হ্যান্ডসাম। একদম ঠিকঠাক। বলল ল্যাজলো।

‘জোলটান মোটেও মোটা নয়,’ সেলমা আপত্তি করল। মাথা ঘুরিয়ে ল্যাজলোকে পর্যবেক্ষন করল জোলটান। তারপর বসে পড়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। ল্যাজলোর প্রতি তার এখন কোনো আগ্রহ নেই।

‘এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে? আমি তো আদর করে বলেছি। সেলমার কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকাল সে। কী নিয়ে কাজ করছ?

সেলমা মনিটরের পাওয়ার বাটনে চাপ দিল। তোমার ভাল লাগতে পারে এরকম কিছু করছি না, নিশ্চিত।

‘তা কী আর বলা যায়! যদি তুমি পাশে থাকো তাহলে যে-কোন বিষয়ই আমার অনেক ভাল লাগে।’

অভিযান থেকে ফেরার পর ল্যাজলো দিনের পর দিন মাত্রা বাড়িয়ে বাড়িয়ে ফ্লার্ট করেই যাচ্ছে।

‘তোমার যে বয়স তাতে কোনো বিষয়ের প্রতি আগ্রহ না থাকাটাই স্বাভাবিক।’ বলল সেলমা। তা এখানে এলে কী মনে করে?’

ভাবলাম আমি হয়তো তোমাকে সাহায্য করতে পারব। বলো, কোনো কাজ আছে? যেটাতে আমি তোমাকে হেল্প করতে পারি? কোনো জটিল সাইফার, কোড? কোনো ধাঁধা?’

‘ক্যাপ্টেন কিডের কাজ কতদূর এগোল? কোডের অর্থ উদ্ধার হয়েছে? জেনে-শুনে খোঁচা মারল সেলমা।

কাজ করছি। কাগজটা যার কাছে ছিল তার ধারণা জলদস্যুদের কোনো হারানো গুপ্তধন সম্পর্কে বলা আছে ওতে। কিন্তু সেরকম মনে হয় না।

এরকম বাড়িয়ে বলেই তো অনেকে সাধারণ একটা জিনিসকে অনেক উচ্চমূল্যে বিক্রি করে থাকে।

‘রাইট। সেজন্য আমি এ-ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নিতে চাই। যদি ওই লোকের কথা সত্য হয় তাহলে তো কেল্লাফতে। অনেক লাভ হবে।

সেলমা মাথা নাড়ল। এসব করতে গিয়ে আসল চাকরি হারিয়ে না আবার।

হুঁ। এটা আমার আসল চাকরির চেয়েও বেশি মজার। অন্য দিকে তাকাল ল্যাজলো। আচ্ছা, আমাদের ফারগো দম্পতির কী খবর? কোথায় তারা?

সলোমন আইল্যান্ডের বিভিন্ন ডকুমেন্ট দেখাল সেলমা। আমি ওদের জন্য এই এরিয়া নিয়ে রিসার্চ করছি। আগ্নেয়গিরি, ভূমিকম্প, জলোচ্ছাস… সবই আছে ওখানকার ইতিহাসে। ফারগোরা ওখানে যাওয়ার আগে আমি নামটাও পর্যন্ত জানতাম না।’

হুম। ইন্টারেস্টিং। পৃথিবীতে এরকম অনেক জায়গা আছে যেগুলো এখনও সেভাবে পরিভ্রমণ করা হয়নি। এটাও সেরকম একটা জায়গা হবে।

“হ্যা…’

‘ফারগোরা তো গুপ্তধন উদ্ধারে পটু। সবার চোখের সামনে দিয়ে গুপ্তধন উদ্ধার করতে পারাটা কিন্তু বেশ রোমাঞ্চকর।’

‘কিন্তু এই জায়গাটা কিন্তু তারা আবিষ্কার করেনি। ওদের বন্ধু লিওনিডের আবিষ্কার এটা। ওরা স্রেফ সাহায্য করতে গেছে।

“লিওনিড, এহ? আইরিশ নাম।’

ল্যাজ-লো, ওর নাম ভেঙে উচ্চারণ করল সেলমা। শুনেই কোনোকিছু সম্পর্কে মন্তব্য করা উচিত নয়। ফারগোদের প্রথম নিয়ম এটা। নিয়মটা খুব গুরুত্ত্বপূর্ণ। সেলমা ল্যাজলোকে ইশারায় সাবধান করল।

তারমানে ওই লোক রাশিয়ান নয়?

ছোট্ট করে হাসল সেলমা। আমি কি তোমাকে অন্য কোনকিছুতে সাহায্য করতে পারি?

ল্যাজলো উঠে দাঁড়াল। সেলমার ইঙ্গিত বুঝতে পেরেছে। না, না। আমি তো তোমাকে সাহায্য করার জন্য এসেছিলাম। যা-ই হোক, ভাল থাকো, সেলমা। আর হ্যাঁ, যে-কোন কাজে আমার দক্ষতার প্রয়োজন হলে জাস্ট আমাকে ফোন দিলেই হবে। আমি হাজির হয়ে যাব।’

‘অনেক ধন্যবাদ। তবে আজকে হয়তো আর লাগবে না।’

‘সমস্যা নেই।

বিদেয় হলো ল্যাজলো। সেলমা এই ব্যক্তিকে মোটেও পছন্দ করে না। তাই কোন কাজে সাহায্য চাওয়ার প্রশ্নই আসে না। মনিটরের পাওয়ার বাটন অন করল সেলমা। ওকে নড়তে দেখে জোলটান ওর পায়ের কাছে এগিয়ে এলো। প্রাণীটার বিশালাকার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিল ও।

.

০৯.

গোয়াডালক্যানেল, সলোমন আইল্যান্ড

লিও’র সাথে হোটেলে সকালের নাস্তা সেরে নিল স্যাম ও রেমি। বেচারা আগামীকালের জন্য আরেকটা নৌকো খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে গেছে। কুমীরের ঘটনা এখন দ্বীপের সবার মুখে মুখে। তাই কেউ আর লিও’র সাথে কাজ করার সাহস পাচ্ছে না। লিও অনেক বাড়তি অর্থ প্রস্তাব করেছিল, তাতেও কাজ হয়নি।

‘দেখো, লিও, স্যাম বলল। তাড়াহুড়ো করে ডাইভ দিয়ে আমরা কিন্তু খুব বেশিকিছু উদ্ধার করতে পারব না। তারচে’ বরং রিসার্চ শিপের জন্য অপেক্ষা করি। ওতে প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি থাকবে, লোকবলও পাব। পানির নিচের জিনিসটা মানুষ-নির্মিত। প্রথম ডাইভে যা দেখে এসেছি, ওতেই যথেষ্ট।

তুমি এই সুযোগে ডাইভিং শিখে ফেলল,’ বলল রেমি। হয়তো ডাইভিঙে আনন্দ খুঁজে পাবে।’

‘তাতে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।’ কফিতে চুমুক দিল লিও।

‘এত হতাশ হওয়ার কিছু নেই, বন্ধু। পানিতে নামতে পারছি না তো কী হয়েছে? আমরা এখানকার লোককাহিনি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করব। পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া শহর নিয়ে কোনো গল্প না থেকে পারেই না।’

‘গুড লাক। আমি তো স্থানীয়দের সাথে কথাই বলতে পারি না। সব ব্যাটা মুখ সেলাই করে বসে থাকে।’

‘আমার সুন্দরী বউকে দিয়ে করার কাজটা।

‘ভাল। আমি আসলে মানুষদের সাথে খুব একটা মানিয়ে নিতে পারি না।

তাই আমরা এখন আলাদা হয়ে যাব। তুমি স্কুবা ডাইভিং শিখবে আর আমরা এখানকার বিভিন্ন লোকদের কাছ থেকে কথা আদায় করার চেষ্টা করব।’ বলল রেমি। “ঠিক আছে?

‘আমাকে পানিতে নামতে হবে…এই অংশটুকু ছাড়া বাকিসব ঠিক আছে।

হাসপাতালের দিকে পায়ে হেঁটে রওনা হলো স্যাম ও রেমি। ওরা যখন পৌঁছুল, সকালের সূর্য তখন কেবল হাসপাতাল ভবনের গায়ে লাগতে শুরু করেছে। ভ্যানার খোঁজ করল ওরা। ইমার্জেন্সি দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলো ভ্যানা। তাকে দেখে খুব খুশি মনে হচ্ছে।

‘বাহ, কি দারুণ সারপ্রাইজ। আপনারা এত তাড়াতাড়ি আসবেন ভাবিনি।

কাছ দিয়েই যাচ্ছিলাম, ভাবলাম…’ বলল স্যাম।

‘খাবার প্লেট সাইজের শহরে আপনি যেখানেই যাবেন সেখান থেকেই। সবকিছু কাছে বলে মনে হবে।

‘রোগীর কী অবস্থা?’ রেমি প্রশ্ন করল।

‘অবস্থা স্বাভাবিক তবে এখুনি কারও সাথে দেখা করতে দেয়া সম্ভব নয়। সিডেটিভ দিয়ে রাখা হয়েছে। দুঃখিত। তবে আমি তাকে বলব, আপনারা এসেছিলেন।

‘ধন্যবাদ। আসলে আমরা তো তাকে চিনিও না। সে হয়তো বুঝতেও পারবে না আমরা কারা?’ বলল রেমি।

“ঠিক আছে, আমি বলব, যারা আপনার জীবন বাঁচিয়েছিল তারা দেখতে এসেছিল আপনাকে।

“থ্যাঙ্ক ইউ।

আপনাদের কাছ থেকে অনুদান পাওয়ার আশায় আছি। এতটুকু খে করতেই পারি।’ মজা করল ভ্যানা।

‘আপনি গতরাতে বলেছিলেন, সাহায্য করবেন আমাদের। আমি যদি এখন সাহায্য চাই কিছু মনে করবেন? স্যাম বলল।

“অবশ্যই নয়। বলুন, কী করতে পারি?

‘প্রথমত, কথা এ-কান ও-কান হতে দেয়া যাবে না। চারিদিকে তাকিয়ে বলল রেমি।

‘আমার ঠোঁটে তালা-চাবি মারা থাকবে।

‘আমরা এখানে যেটা নিয়ে রিসার্চ করছি… দেখা যাচ্ছে ওটা কোনো তলিয়ে যাওয়া শহরের অংশবিশেষ।’

দু’বার চোখের পলক ফেলল ভ্যানা। কী?

সমুদ্রের পাড়ে থাকা কোনো প্রাচীন শহর।’

‘গোয়াডালক্যানেলে? আপনারা মজা করছেন।

স্যাম মাথা নাড়ল। না, করছি না। আমরা জানতে চাই এরকম জিনিস নিয়ে কোনো লোককাহিনি আছে কিনা। আমার বিশ্বাস, আছে। এক বয়স্ক ক্যাপ্টেন “অভিশাপ” নিয়ে কী যেন বলল। আমরা এর পেছনের কাহিনি জানতে চাই।’

রোগীদের বসার জায়গা এখন ফাঁকা। ভ্যানা ওখানে বসে ওদের দুজনের দিকে এমনভাবে তাকাল যেন ওরা ভিন্ন কোনো গ্রহের বাসিন্দা। আমি এখানে জন্মেছি। কিন্তু কখনও পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া অভিশপ্ত শহরের ব্যাপারে কিছু শুনিনি। সাইন্স ফিকশনের মতো শোনল বিষয়টা। দুঃখিত, মাইন্ড করবেন না।’

না, করিনি। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও কিছু করার নেই। আমরা কিন্তু এবারই প্রথম এরকম লোককাহিনি নিয়ে কাজ করছি না। এরআগেও আমরা এসবের মুখোমুখি হয়েছি এবং দেখেছি এসব লোককাহিনি অনেকসময় একদম সত্য কাহিনিতে পরিণত হয়। রেমি বুঝিয়ে বলল।

‘আসলে আমি আপনাদের কথাকে অবিশ্বাস করছি না। কিন্তু বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে আমার… এখানে পানির নিচে ভবনের ধ্বংসাবশেষ। সলোমনদের ইতিহাসের কোথাও উল্লেখ নেই যে তারা ভাল নির্মাতা ছিল। দ্বীপের চারিদিকে দেখুন। কী মনে হয়? প্রাচীনকালে এদের পূর্বপুরুষরা ভাল নির্মাতা হওয়ার কোনো নজির দেখতে পাচ্ছেন? অথচ পানির নিচে আস্ত শহর ডুবে রয়েছে…’।

‘আসলে “শহর” বললে বেশি বলা হয়। তবে কমপ্লেক্স ভবন” বলা যেতে পারে।’ বলল স্যাম। আচ্ছা, আপনি এমন কাউকে জানেন যিনি আমাদের প্রশ্নের দিতে পারবে? বয়স্ক কেউ? যিনি এখানকার প্রাচীন রীতিনীতি ও লোককাহিনি সম্পর্কে জানে?

ডা. ভ্যানা মাথা নাড়ল। হয়তো অরউন জানে। এই এলাকার লোকদের সাথে ওর বেশি ওঠাবসা আছে। রাজনীতিবিদ বলে কথা! তবে আমার পরিচিত এরকম কেউ আছে বলে মনে পড়ছে না।

ভ্রু কুঁচকাল স্যাম। দ্বীপে আগত বিদেশিদের উনি খুব একটা পছন্দ করেন বলে মনে হলো না। বিশেষ করে যেসব বিদেশি লোক এসে এখান থেকে স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করে তাদেরকে তো উনার পছন্দই হয় না বোধহয়।

না, অরউনকে ভুল বুঝবেন না। আপনারা সাহায্য চাইলে ও সাহায্য করবে, দেখবেন।

‘আমরা চাচ্ছি, বিষয়টা যাতে অনেক লোকের কানে না যায়। রেমি সতর্ক করে দিল।

‘আপনারা যদি সত্যি সত্যি সিরিয়াস অভিযান পরিচালনা করতে চান তাহলে কিন্তু সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। আর সেই অনুমতির ব্যবস্থা করে দিতে পারবে অরউন। আপনারা যদি সরকারকে নিশ্চিত করে তথ্য না দেন তাহলে কীসের ভিত্তিকে সরকার আপনাদেরকে অনুমতি দেবে? সরকারের সাথে যাবতীয় লেনদেনের ব্যাপারে অরউন-ই আপনাদের শ্রেষ্ঠ খুঁটি। ওকে দরকার হবে আপনাদের।

‘আসলে আমরা বিস্তারিত কিছু এখনও জেনে উঠতে পারিনি। এখুনি সরকারকে অফিসিয়ালি কিছু জানানোটা কেমন হয়।’

‘আচ্ছা, বলুন, অনুমতি নিয়ে কাজ করা ভাল নাকি পরে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে “দুঃখিত” বলা ভাল? ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই জেনে গেছেন দ্বীপের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু হলে দ্বীপের বাসিন্দারা স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে। আপনাদের জায়গায় আমি হলে শুরু থেকে সকল অনুমতি নিয়ে রাখতাম।’

স্যাম মাথা নাড়ল। ভাল পরামর্শ দিয়েছেন। অরউন সাহেবের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারবেন?

‘আমি এখুনি ফোন দিচ্ছি। একটু অপেক্ষা করুন।

হাসাপাতালের পেছনের অংশে চলে গেল ভ্যানা। স্যাম রেমির দিকে ঝুঁকল। আমাদের আবিষ্কারের ব্যাপারে কোনোকিছু শেয়ার না করতে পারলে ভাল হতো।’

‘হুম। কিন্তু না জানিয়েও উপায় নেই। এই দ্বীপে যেসব ইকুইপমেন্ট পাওয়া যায় সেগুলো দিয়ে কিন্তু বেশি কিছু করা সম্ভব না। ওরা হয়তো ডাইভ দিয়ে এতটুকু নিশ্চিত হতে পারবে পানির নিচে থাকা ইমারতটা মানুষ নির্মিত, এ-পর্যন্তই। এতে তো কোনো ক্ষতি দেখি না।’

তারপরও…’

‘পানির নিচে যা আছে সেটাকে তো আর কেউ তুলে নিয়ে যেতে পারছে না। আর এরমধ্যে আমাদের রিসার্চ শিপও চলে আসবে। তাছাড়া স্থানীয় লোকজন কুসংস্কারের ভয়ে আধামরা। ওরা কোনো উঁকি-ঝুঁকি মারবে বলে মনে হয় না।’

হাসিমুখ নিয়ে ফিরল ভ্যানা। যদি আপনারা ওর অফিসে যান তাহলে অরউন আজ দেখা করতে পারবে। এই হলো অফিসের ঠিকানা, ভ্যানা একটা বিজনেস কার্ডের পেছনে হাতে লিখে ঠিকানাটা স্যামকে দিল।

‘অসংখ্য ধন্যবাদ।’ বলল রেমি।

‘মাই প্লেজার। আপনাদের রহস্যের জন্য শুভ কামনা রইল। কী বৈচিত্রময় আপনাদের জীবন!

‘অনেক তাড়াহুড়ো আর অপেক্ষাও আছে আমাদের জীবনে!’ স্যাম বলল।

মূল সড়কের পাশে থাকা সুন্দর ভবনগুলোর একটা হচ্ছে ম্যানচেস্টারের অফিস। দোতলা ভবনের গায়ে যে রং করা আছে সেটার হাল দেখে মনে হচ্ছে সর্বশেষ ১০ বছর আগে রং করা হয়েছে ভবনটা। এক সুন্দরী নারী এসে ওদের দুজনকে ভবনের পেছনের অংশে নিয়ে গেল। সেখানে ম্যানচেস্টার স্যুট পরে বড়সড় একটা গাড়ি সাইজের টেবিলের পেছনে বসে অপেক্ষা করছে।

বসুন, আপনারা। ভ্যানা তো ফোনে পরিষ্কার করে কিছু বললই না। শুধু বলল, আপনারা নাকি কোন অ্যাডভেঞ্চারে আছেন… একটু সাহায্য লাগবে?

‘সাহায্য লাগবে ঠিক আছে কিন্তু অ্যাডভেঞ্চারের বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই।’ বলল রেমি।

পানির নিচে থাকা ইমারতের ব্যাপারে স্যাম সব বলল। সবগুনে চোখ বড় বড় হয়ে গেল ম্যানচেস্টারের। কথা শুনে ম্যানচেস্টার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। জানালার পাশে গিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকাল সে।

‘গল্প তো ভালই। এ থেকে আসলে কী পাওয়া যাবে সে-ব্যাপারে আমি কিছু ঠাওর করে উঠতে পারছি না।’ ইতস্তত করল ম্যানচেস্টার। আপনারা আমাকে কী করতে বলছেন?

‘কিছু সাহায্য লাগবে? এই ইমারতের কোনো প্রমাণাদি আছে নিশ্চয়ই। কোনো ঐতিহাসিক দলিল? কিংবা কম করে হলেও কোনো লোককাহিনি।

হয়তো আছে। কিন্তু আমাদের এখানে কোনো লিখিত ইতিহাস নেই। তাই খুব বেশি কিছু পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। আমি নিজেও সেরকম কিছু শুনিনি।

হয়তো বয়স্ক কেউ পুরানো গল্প কিংবা লোককাহিনি সম্পর্কে ভাল বলতে পারবে?’

চিন্তিত হয়ে পড়ল ম্যানচেস্টার। কয়েকজন বুড়ো আছে যারা হয়তো সাহায্য করতে পারবে। কিন্তু ওদের কোনো থাকার ঠিক নেই। শহরে ওরা থাকতে চায় না। গ্রামের কোথাও গিয়ে আছে হয়তো।

‘আপনি কোনো ঠিকানা দিতে পারবেন?’

ম্যানচেস্টার হাসল। ওদেরকে একটা ই-মেইল করতে পারলে ভাল হতো। কিন্তু সেটা তো সম্ভব না। আমি বরং আপনাদেরকে দিক-নির্দেশনা দিতে পারি। সাথে একটা নোট দিয়ে দেব। ওরা হয়তো লেখা পড়তে জানে না কিন্তু কাগজের মুল্য ঠিকই বুঝবে।

‘তাহলে তো দারুণ হয়। স্যাম বলল। আরেকটা বিষয়। অভিযান চালানোর জন্য সরকারের অনুমতির বিষয়টা…’।

‘ওটা নিয়ে ভাবতে হবে। এমপি হওয়ার পর থেকে আমি আজপর্যন্ত কখনও এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি। তাই বুঝতে পারছি না কোন পদ্ধতি কিংবা আইন অনুসরণ করলে ভাল হবে। এ-ব্যাপারে আদৌ কোনো আইন আছে কিনা সে-ব্যাপারেও আমি নিশ্চিত নই।’

‘আইন না থাকাতে ভাল দিকও আছে তেমনি খারাপ দিকও আছে।’ বলল রেমি।

হ্যাঁ। আমি বিষয়টা বুঝতে পেরেছি। আজকে অন্যান্য এমপিদের সাথে লাঞ্চে বসে এই বিষয়ে আলোচনা করব। দেখি, তারা কী বলে। আচ্ছা, আপনারা তো কোনো খনিজ পদার্থ তুলবেন না? জাস্ট পানির নিচে ডুব দিয়ে অনুসন্ধান চালাবেন, তাই তো?’

‘একদম। আমরা যদি অনুসন্ধানে কোনোকিছু পাই সেটার মালিক সলোমন আইল্যাণ্ডের বাসিন্দারা। আমরা স্রেফ আগ্রহী হয়ে ডাইভ দিচ্ছি। কোনো লোভের বিষয় নেই এখানে।

“ঠিক আছে। তাহলে আপনারা বিনা মজুরীতে কাজ করছেন। আমাদের ইতিহাসের ব্যাপারে ক্যাটালগ তৈরিতে সাহায্য করছেন, তাই তো?’

‘হ্যাঁ, এভাবে বললেই ভাল হয়। স্যাম সায় দিল।

হাসল ম্যানচেস্টার। বেশ। অনুমতির ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছি না। তবে আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। ওর কণ্ঠে দ্বিধা।

‘আমরাও অতটুকুই চেয়েছি আপনার কাছ থেকে।

‘বয়স্ক লোকদের মধ্যে দুজনের কথা মনে পড়ছে এখন। একজন মিনু তে থাকে… দ্বীপের পূর্ব অংশে। আরেকজন থাকে অনেক দূরে… আওলা গ্রামের পুবে… নদীর পাশে। কোন গাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন আপনারা?’

স্যাম ও রেমি পরস্পরের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করল। একটা গাড়ি ভাড়া করে নেব।’

‘একটা এসইউভি নেবেন। ভাল টায়ার, ফোর-হুঁইল ড্রাইভ যেন থাকে। দরকার পড়বে।’

‘কোথায় পাওয়া যাবে?

নিজের চেয়ারে গিয়ে বসল ম্যানচেস্টার। সলোমন আইল্যান্ডের সরকারি কাগজে প্রয়োজনীয় নোট আর অন্য একটা সাধারণ কাগজে কয়েকটা নাম আর ঠিকানা লিখল। লেখা শেষে কাগজ দুটো রেমিকে দিল সে।

রুবোর বয়স প্রায় ১০০। তিনি আওলা গ্রামের দিকে থাকেন। কুসংস্কার আছে, তিনি নাকি একজন শ্যামান… কবিরাজ। আর টম এই দ্বীপের সবার খোঁজ রাখে। হয়তো সে ইতিমধ্যে জেনে গেছে আপনারা তার মতো কারও খোঁজ করছেন।’ হাসতে হাসতে বলল ম্যানচেস্টার। এদের দুজনই একটু-আধটু ইংরেজি জানে। তাই আপনাদের কোনো দোভাষী প্রয়োজন পড়বে না। আর গাড়ির জন্য ঠিকানা দিয়ে দিয়েছি। যার ঠিকানা দিয়েছি সে বেশ সং… ওর গাড়িগুলোও মন্দ না। ওকে গিয়ে বলবেন আমি পাঠিয়েছি। তাহলে আপনাদের ভাল খাতির করবে।

কথা শেষে ওরা তিনজন উঠে দাঁড়াল। বাইরে বেরিয়ে এসে কাগজে চোখ বুলাল স্যাম।

‘অ্যাডভেঞ্চার আর কাকে বলে! একদম অঁজপাড়া গাঁয়ে যেতে হবে এবার!

রেমি শ্রাগ করল। আপাতত এরচেয়ে ভাল কোনো রাস্তা আমাদের সামনে খোলা নেই।

‘রাইট। কিন্তু যদি কিছু গড়বড় হয়…?”

রেমি থামল। কতবার বলেছি তোমাকে…’

‘ওই… সরি… মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেছে। আর হবে না।

বলেই তো ফেলেছ। এখন আর সরি বলে লাভ আছে?”

.

১০.

কার রেন্ট কোম্পানির মালিক দেখতে নাদুসনুদুশ বুদ্ধের মতো। প্রতিটা বাক্য বলা শেষে হেসে ওঠা তার মুদ্রাদোষ। একটা রূপোলি নিশান এক্সটেরা দেখাল সে। তবে গাড়ির তুলনা ভাড়াটা বেশি চাইল।

প্রচণ্ড বৃষ্টি নামতে শুরু করল স্যাম ও রেমি গাড়িতে ওঠার পর। ড্রাইভিং সিটে স্যাম বসে আছে। ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে এগোচ্ছে ওরা। কয়েক মিনিটের মধ্যে ওরা শহর ছাড়িয়ে গ্রাম্য অঞ্চলে প্রবেশ করল। হেন্ডারসন ফিল্ড ও যুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনী কর্তৃক নির্মিত আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টের পাশ দিয়ে এগোল ওদের গাড়ি। এরপর রাস্তার দু’পাশে গভীর বন দেখা দিল। আকাশ থেকে অঝরো বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির পরিমাণ এতই বেশি যে নিশানের ওয়াইপার গাড়ির সামনের কাঁচ থেকে পানি মুছে কুলিয়ে উঠতে পারছে না।

এভাবে কয়েক মাইল যাওয়ার পর বৃষ্টি থেমে গেল। হঠাৎ করে শুরু হয়েছিল, হঠাৎ করেই থেমে গেল। মেঘ সরে গিয়ে সূর্য দেখা দিল আকাশে।

এই এলাকার একটা দিক ভাল,’ বলল স্যাম। ওদিকে রেমি গাড়ির এসি চালু করার জন্য নব হাতড়াচ্ছে।

কী সেটা?

যদি আবহাওয়া সুবিধের না হয় তাহলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। কারণ এখানকার আবহাওয়া একটু পর পর বদলে যায়।

‘ঠিক বলেছ! যখন গরম পড়ে তো পড়েই আর যখন বৃষ্টি নামে তখন একেবারে ভাসিয়ে দেয়। এরকম আবহাওয়ায় আমার চুলের বারোটা বাজবে।’

‘এখানকার কাজ শেষ হয়ে যাক। তারপর তুমি যেখানে যেতে চাইবে আমি সেখানেই নিয়ে যাব। রিও, মিলান, স্পা, স্যালুন, শপিং…. যেখানে তুমি চাইবে।’

‘আচ্ছা, এখানকার কাজে ফাঁকি দিয়ে সরাসরি ঘুরতে যাওয়ার কোনো উপায় আছে?

‘না। আমরা তো এখানেও ঘুরছি, তাই না?’ স্যাম হাসল।

রাস্তার পাশে থাকা একটা ছোট্ট চিহ্ন জানান দিল ওরা ব্রিজ দিয়ে অ্যালিগেটর রিভার পার হচ্ছে। স্যামের দিকে তাকাল রেমি। এখানে ইন্টারেস্টিং জিনিসের অভাব নেই।

হুম, তবে অ্যালিগেটর কিন্তু কুমীর থেকে আলাদা। অ্যাটিগেটরের মুখ তুলনামূলক কম লম্বা ও কিছুটা ভোতা হয়।

‘আলাদা হোক কিন্তু দুটোর স্বভাব একই। মানুষ খায়।’

‘তা ঠিক।

চলতে চলতে আরেকটা ব্রিজের কাছে চলে এসেছে ওরা। এই ব্রিজটা অনেক সরু। ওদের নিশান গাড়ির জন্য পর্যাপ্ত জায়গা হওয়াই কঠিন। ব্রিজের পাশে লেখা রয়েছে “গোল্ড রিজ।” লেখাটার পর দক্ষিণ দিকে তীর চিহ্ন আঁকা।

‘কোনো খনি হবে হয়তো। বলল রেমি।

‘যদি তুমি চাও তাহলে ফেরার পথে একবার দেখে যাব। আমাদের হাতে যথেষ্ট সময় আছে।’

‘ঠিক আছে। আগে আজকে যে কাজের জন্য এসেছি সেটার কতদূর কী হয় দেখি। তারপর দেখা যাবে।

‘ওকে। ম্যাডামের যা মর্জি।

ম্বিনু-তে পৌঁছে ওরা যে গ্রামটাকে দেখল সেখানে হাতেগোনা কয়েকটা ঘর ছাড়া আর তেমন কিছুই নেই। ছোট্ট একটা বাজারের পাশে থামল ওরা। গাড়ি থেকে নামতেই পোকামাকড় আর তীব্র গরম ওদের উপর হামলে পড়ল। কয়েকজন গ্রামবাসী রাস্তার পাশে থাকা গাছের ছায়ার নিচে বসে আছে, আগ্রহ নিয়ে দেখছে ওদেরকে। ম্যানচেস্টারের দেয়া নাম-ঠিকানা লেখা কাগজটা হাতে নিয়ে এগোল স্যাম।

‘টম নামের একজনের কাছে এসেছি আমরা। এখানেই থাকে। একটু সাহায্য করবেন?’ মুখে হাসি নিয়ে স্যাম জিজ্ঞাস করল।

গ্রামবাসীরা ভাল করে স্যামকে দেখে নিয়ে বিজাতীয় ভাষায় বলল কী যেন। স্যাম ও রেমি দু’জনের কেউ-ই এই ভাষা বোঝে না। ওরা কিছু বুঝতে পারছে না টের পেয়ে হেসে উঠল গ্রামবাসীরা।

রেমি সামনে এগোল। আপনারা কেউ টমকে চেনেন?

আবার গুঞ্জন শুরু হল গ্রামবাসীদের মধ্যে। এবার আরও জোরে হাসল তারা। স্যামের দিকে রেমি ফিরল। অবস্থা দেখেছ?

যতদূর মনে পড়ে এই দ্বীপের অফিসিয়াল ভাষা হলো ইংরেজি। কিন্তু খুব কম লোকই ইংরেজি জানে।

‘আমাদের সামনে এখন যারা আছে তারা সেই “কম লোকের মধ্যে নেই।

গ্রামবাসীদের দিকে হাত নেড়ে সরে গেল ওরা। গ্রামবাসীরা পাল্টা হাত নাড়ল। বাজারের ভেতরে ঢুকল ফারগো দম্পতি। ওদের কপাল ভাল বলতে হবে। প্রাচীন এক ক্যাশ রেজিস্টারে বসা দশাসই সাইজের এক মহিলাকে পাওয়া গেল, সে একটু-আধটু ইংরেজি বলতে পারে।

‘টম? হি বাই দ্য চার্চ। ডাউন দ্য রোড। অশুদ্ধ ইংরেজি বলল মহিলা।

‘চার্চ? স্যাম প্রশ্ন করল।

‘হ, পিছন দিকে।

‘আচ্ছা, টমের বাসাটা ঠিক কোথায়?

‘চিহ্ন খোঁজেন… পাইবেন।

‘চিহ্নটা কী?

‘Skink

‘সরি, বুঝতে পারিনি।’

Skink,’ হামাগুড়ি দেয়ার অভিনয় করে দেখাল মহিলা।

‘ওহ।

ওরা গাড়িতে গিয়ে বসল। গাড়ি নিয়ে দুই-তিনবার চক্কর দেয়ার পর কাদায় মেখে যাওয়া একটা চিহ্ন চোখে পড়ল ওদের। টিকটিকি।

মহিলা কী বলছিল? কিঙ্ক?’ স্যাম প্রশ্ন করল।

‘স্কিঙ্ক। একটা s ছিল। অন্তত উচ্চারণ শুনে তো তা-ই মনে হলো।’ স্বামীকে শুধরে দিল রেমি।

চিহ্ন পার হয়ে ৩০০ ফুট এগোল ওরা। গাছের ছায়ার নিচে একটা জীর্ণ বাড়ি দেখা যাচ্ছে। ৬০ শতকের জং ধরা টয়োটা সেডান পার্ক করা আছে। বাড়ির পাশে। ওদের গাড়ি দেখতে পেয়ে এক বয়স্ক লোক গাঢ় রঙের টি-শার্ট পরতে শুরু করল। গাড়ি থেকে নামল ফারগো দম্পতি। বয়স্ক লোকটার পরনে এখন টি-শার্ট আর শর্টস রয়েছে। তাকিয়ে আছে ওদের দিকে।

টম?

‘আমি।’ হাসল লোকটা। লোকটার গায়ের রং কালো, দাঁতগুলো হলুদ। হাসার সময় হলুদ দাঁতগুলো গাড়ির হেডলাইটের মতো জ্বলে উঠল যেন।

‘আমরা অরউন ম্যানচেস্টারের বন্ধু।’

‘ওই চোরের বন্ধু? ওরে দিয়া কোনো ভালা কাজ হয় না।’ হাসতে হাসতে বলল টম। কন, আমি আপনাগো লাইগ্যা কী করবার পারি? Skink লইবেন? কোলে থাকা একটা সবুজ টিকটিকি উঁচু করে ধরে দেখাল সে।

রেমি আর একটু হলেই কয়েক হাত পিছিয়ে আসতো কিন্তু অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিল। স্কিঙ্ক প্রায় দুই ফুট লম্বা। মাথাটা ত্রিভুজাকৃতির, চোখ কালো।

না। আমরা কিছু পুরানো গল্প জানতে চাই। অরউন বললেন, আপনি হয়তো আমাদেরকে সাহায্য করতে পারবেন। মিষ্টি হাসি হেসে বলল রেমি।

‘ও আইচ্ছা। আপনেরা কিছু খাইবেন? পানি? সোডা? আমার স্টকে খুব বেশি কিছু নাই। তারপরও মোটামুটি খাতির-যত্ন করবার পারমু।’

মাথা নাড়ল স্যাম। না, ঠিক আছে। আমাদের কিছু লাগবে না।

‘আইচ্ছা, আহেন, বহেন। তারপর কন, কীসের গল্প শুনবার চান?

বাড়ির সামনে থাকা কাঠের বেঞ্চে বসল ওরা। স্যাম গলা পরিষ্কার করল। সাগরের অভিশপ্ত পাড় নিয়ে কিছু জানেন?

টমের চোখ সরু হয়ে গেল। অভিশপ্ত পাড়?

‘জি। এক নৌকার ক্যাপ্টেনের মুখে তো সে-রকমই শুনলাম।

এরাম পুরান ফাউল জিনিস লইয়্যা আপনারা মাথা ঘামাইতাছেন ক্যান?

‘আমরা আসলে এই দ্বীপের লোকদের লোককাহিনি ও প্রচলিত গল্প সম্পর্কে জানতে আগ্রহী।

দূরে দৃষ্টি মেলল টম। মাফ কইরেন। আমি আপনাগো কোনো সাহায্য করবার পারতাছি না।’

‘আপনি সৈকতের সাথে সম্পর্কযুক্ত কোনো গল্প জানেন না?’ প্রশ্ন করল রেমি।

টম মাথা নাড়ল। আপনেরা হুদাই আপনাগো সময় নষ্ট করছেন।

‘খুবই লজ্জাজনক হালো বিষয়টা। আমরা কিন্তু ওখানে একলোকের জীবন বাঁচিয়েছি। কুমীর আক্রমণ করেছিল তাকে। বলল স্যাম। ভাবল, এতে হয়তো লোকটা মুখ খুলবে।

কিন্তু টম কোনো আগ্রহই দেখাল না। হ, হুঁশ কম হইলে কুমীরের কামড় খাইতে হয়। এইহানকার কুমীরগুলান খুব ভয়ঙ্কর। আরও মেলা কিছু আছে। সাবধান না হইলে ওইগুলা থেইক্যা বিপদ হইবার পারে।’

‘তাই নাকি? রেমি বলল।

‘হু, তাই। হেইডা ছাড়াও যেইখানে সেইখানে আজাইরা নাক গলাইলেও বিপদ হইবার পারে।’

‘যেমন?

‘ধরেন, অভিশপ্ত সাগর। তারপর ধরেন গিয়া… গুহা। কণ্ঠ খাদে নামিয়ে নরম করল টম। জায়ান্ট (রূপকথায় বর্ণিত বিশালাকার দানব বা বিরাকাটার মানুষ)-এর কাছ থেইক্যা দূরে থাকাই ভালা।’

‘দুঃখিত। কী বললেন? জায়ান্ট স্যাম প্রশ্ন করল।

মাথা নাড়ল টম। হ। পাহাড়ে অনেক আছে ওইগুলা। শুনেন, নিজের চড়কায় ত্যাল দেন, ওইডাই ভালা হইব। এইখানে আইছেন, ঘুরে-ফিরেন, মস্তি করেন। ভালা থাকেন।

‘আপনি বললেন, এখানে জায়ান্ট আছে?’ স্যাম আবার প্রশ্ন করল।

হ, আছে। তয় এখন একটু কমছে।

‘আপনি কি বড় সাইজের মানুষ বোঝাচ্ছেন?’ কথা পরিষ্কার করতে চাইল। রেমি। কথার মোড় ঘুরে যাওয়ায় অবাক হয়েছে।

না। মানুষ না। জায়ান্ট। বিশাল সাইজের। অরা গুহায় থাকে আর ধইরা ধইরা মানুষ খায়। এইখানকার মোটামুটি সবাই অগো কথা জানে। দেহাও যায়।’

‘এগুলো তো সব লোককাহিনি, তাই না?

‘যা খুশি নাম দেন, সমস্যা নাই। আমি আপনাগো সাবধান কইরা দিলাম, যাতে বিপদে না পড়েন। আপনারা অরউনের বন্ধু। আমি চাই না আপনাগো জায়ান্ট খায়া ফালাক।

স্যাম হাসল। আপনি সত্যি সত্যি জায়ান্টে বিশ্বাসী?

‘আবার জিগায়। আমি নিজের চোখে দেখছিও। আপনার চাইতে আরও দুইগুণ বড়। সারা শরীরে লোমে ভরা। আপনের বন্ধুরে যে কুমীর কামড়াইছে। ওইটার চেয়েও এরা ভয়ঙ্কর। এটুকু বলে টম থামল। ওর আর এ-নিয়ে কথা বলার আগ্রহ নেই মনে হচ্ছে। স্যাম ও রেমি আরও কিছু জানার জন্য চাপাচাপি করল কিন্তু কোনো লাভ হলো না। টম যেসব জবাব দিল সবই কোনো না কোনো ধাঁধা কিংবা হেঁয়ালীমূলক।

জায়ান্ট ছাড়া আর কী সম্পর্কে আমাদের জানা থাকা উচিত, বলুন তো শুনি। সুন্দর হাসি হেসে স্যাম প্রশ্ন করল।

‘হাসেন। যত খুশি মশকরা করেন এইসব নিয়া। এইখানে অনেক আজিব আজিব জিনিস হয়, বুঝছেন? মানুষ উধাও হয়া যায়। কোনো কারণ ছাড়াই ব্যারাম হয়। পাহাড়ের উপরে কেউ যায় না, বিষাক্ত সব। এই দ্বীপ বদলাইয়া যাইতাছে। জায়ান্ট হইল অনেকগুলা বিপদের মইদ্যে একটা। ওইরম জিনিস আমি জীবনেও দেখি নাই। খুব ভয়ঙ্কর।

‘লোকজন কি সাগরের পাড় নিয়েও এরকম ভাবে? বিষাক্ত? অভিশপ্ত? নরমভাবে রেমি প্রশ্ন করল।

‘আমি কোনো সাগরের পাড় চিনি নাহ।

‘পুরানো দিনের কোনো গল্প আছে? কোনো শহর তলিয়ে গেছে… এরকম কিছু?

কোলে থাকা স্কিঙ্কের মাথায় হাত বুলাল টম। আপনেরা এইবার ফাউ জিনিস নিয়া কথা বলছেন।

‘না। আমি হারানো শহর নিয়ে কিছু একটা শুনেছি।

‘আমি শুনি নাই। আইজকা প্রথম শুনলাম। বলল টম। তার কণ্ঠে সতর্কতা।

আরও কয়েক মিনিট প্রশ্ন-উত্তরের পর টম জানাল সে ক্লান্ত। ফারগো দম্পতি বিষয়টা বুঝতে পারল। গাড়ির দিকে এগোল ওরা।

ইঞ্জিন চালু করে রেমির দিকে তাকাল স্যাম। তার কথাগুলো বিশ্বাস হয়েছে তোমার?

‘কোনটা? জায়ান্ট? নাকি সাগর সম্পর্কে কিছু জানে না, সেটা?

‘দুটোই। আমি তার চোখ দেখেছি। সে যা জানে আমাদেরকে ততটা জানায়নি। আমার তো মনে হয়, জায়ান্টের কথা বলে আমাদেরকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছে।’

‘বিভ্রান্ত করতে পেরেছে। এরকম উদ্ভট জিনিস আমি এই প্রথম শুনলাম। কিন্তু সে কিন্তু অবলীলায় বলেছে সব।

‘আমার ধারণা, এসবই টুরিস্ট ভুলানোর ধান্দা। জায়ান্ট-টায়ান্ট কিছু। নেই।’

‘তার বলার ধরণ কিন্তু ভাল ছিল। প্রতি পদে পদে বিপদ আর লোকজন গায়েব হওয়ার বিষয়টার উপস্থাপনাভঙ্গিটা দারুণ। কী মনে হয় তোমার?

‘সত্যি বলতে আমার কোনো ধারণা নেই। আমি শুধু এটুকু বুঝতে পেরেছি, এসব থেকে আমরা অভিশপ্ত সাগরের কোনো তথ্য পাচ্ছি না। টম আসলে আমাদেরকে ভয় দেখিয়েছে যাতে আমরা আর প্রশ্ন না করি।’

পশ্চিম আকাশে মেঘ গুড়গুড় শব্দে ডেকে উঠল। “প্লিজ, আর না।’ বলল রেমি।

‘আরেক বুড়োর কাছে যাব? হয়তো টমের চেয়ে বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করবে।’

‘আবার যদি বৃষ্টি নামে তাহলে কিন্তু কাদায় রাস্তার অবস্থা জঘন্য হবে।

‘তা তো হবেই। আমি বলি কি, যা আছে কপালে। চলো।’

‘আমি জানতাম, তুমি এটাই বলবে।’ বলল রেমি। ঠিক আছে। চলো। তবে পরে কিন্তু আমাকে দোষ দিতে পারবে না। আমি কিন্তু সতর্ক করেছি, হুঁ।

১৫ মিনিটের মধ্যে নীল আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেল। প্রচণ্ড বৃষ্টিতে রাস্তার বেহাল দশা। মাইলখানেক যাওয়ার পর দেখা গেল রাস্তা আর চেনাই যাচ্ছে না। পুরো রাস্তা বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে। হার স্বীকার করল স্যাম। গাড়ি ঘুরিয়ে হোটেলের দিকে রওনা হলো। অনেক কষ্টে হোটেলে এসে পৌঁছুল ওরা।

বৃষ্টি এখনও থামেনি। হোটেলে ঢুকে দেখল ডেস্ক ক্লার্ক ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। রেমি গেল ক্লার্কের কাছে। দুটো মেসেজ দিল ক্লার্ক। একটা লিও’র আরেকটা ম্যানচেস্টারের। লিও জানিয়েছে, ডাইভিঙের প্রথম ক্লাস ছিল আজ। বিকেলে হাতেকলমে ডাইভিং শিখতে পানিতে নামছে। আরেকটা মেসেজে ওদের দুজনকে ডিনারের দাওয়াত দিয়েছে ম্যানচেস্টার।

যাবে? রুমে যেতে যেতে স্যাম ওর স্ত্রীকে প্রশ্ন করল।

‘অবশ্যই। কেন যাব না? দেখি রাজনীতিবিদ সাহেব জায়ান্ট সম্পর্কে কী বলেন।

‘আমার তো মনে হয় সবই বাচ্চা ভোলানো কাহিনি।’

হতে পারে। তবে যত যা-ই বলল। টমের সাথে কথাবার্তা পুরোপুরি শেষ হয়নি আমাদের। তার কথা শুনে মনে হলো সে আসলেই এসবে বিশ্বাস করে।

তার যে বয়স। এই বয়সে কোনটা হ্যালুসিনেশন আর কোনটা বাস্তব সেটা আলাদা করা কঠিন। কত বয়স হবে তার? আশি?

বলা মুশকিল। আমার কাছে অবশ্য অতটা বয়স্ক মনে হয়নি।

সমুদ্রের পাশে অন্য একটা রেস্টুরেন্টে ম্যানচেস্টারের সাথে দেখা করল ওরা। আগের রেস্টুরেন্টের চেয়ে এটা তুলনামূলক উন্নতমানের। টেবিলের উপরে একটা খালি বোতল দেখে বোঝা গেল স্যাম ও রেমি এখানে আসার আগেই ম্যানচেস্টার ইতিমধ্যে এক রাউন্ড বিয়ার সাবাড় করেছে।

‘দুঃখিত। আজকের আবহাওয়াটা সুবিধের নয়। আশা করা যায়, কালকের আবহাওয়া ভাল হবে। ম্যানচেস্টার এমনভাবে কথাটা বলল যেন এরকম আবহাওয়ার জন্য সে নিজেই দায়ী।

না, ঠিক আছে, সমস্যা নেই। আপনি যে দু’জনের কথা বলেছিলেন আমরা তাদের একজনের সাথে দেখা করেছি।’ বলল রেমি।

ভাল তো? কার সাথে দেখা করলেন?

‘টম।

‘সে একখান চিজ, তাই না? ওর কাছ থেকে কোনো কাজের কথা বের করতে পেরেছেন?

“তিনি স্রেফ জায়ান্টের গল্প শুনিয়েছেন।

‘ওহ, হ্যাঁ। জায়ান্ট। এখানকার বহুল প্রচলিত গল্প! কেউ না কেউ এমন কাউকে চেনে যে জায়ান্ট দেখেছে কিন্তু যখন একটু গভীরে গিয়ে সত্যতা খতিয়ে দেখতে যাবেন, তখন দেখবেন সবাই বাইন মাছের মতো পিছলাতে শুরু করবে।’

টম বললেন, তিনি নাকি জায়ান্ট নিজের চোখে দেখেছেন।

‘অবশ্যই দেখেছে। মানে আমি বলতে চাচ্ছি, সে অবশ্যই কিছু একটা দেখে সেটাকে জায়ান্ট ভেবে বসে আছে। রেইন ফরেস্টের ভেতরের কোনো ছায়া কিংবা কোনো ঝাপসা কিছু… দেখলে দেখুক। ক্ষতি তো নেই। কিন্তু সে কি আপনাদের পানির নিচে পাওয়া ধ্বংসাবশেষের ব্যাপারে কোনো তথ্য দিতে পেরেছে?

মাথা নাড়ল স্যাম। দূভার্গ্যবশত, না। তিনি মানুষের গায়েব হয়ে যাওয়া নিয়ে কথা বলেছেন। তার ভাষ্য, মানুষখেকো জায়ান্টের কারণেই মানুষ গায়েব হচ্ছে।’

ওয়েটারকে আরও দুই বোতল বিয়ার আনার জন্য ইশারা করল ম্যানচেস্টার, তারপর রেমির দিকে তাকাল। আপনি কী নেবেন?

‘আমি পানি নেব। গরমে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিচ্ছে।

ম্যানচেস্টার রেমির জন্য ওয়েটারকে এক বোতল পানির অর্ডার দিল। ‘তাহলে পাহাড় জুড়ে মানুষখেকো জায়ান্টদের বসবাস, তাই তো? আমি সেই ছোটবেলা থেকে এসব গল্প শুনে আসছি। মজাই লাগে শুনতে। অবাক হয়ে ভাবি, এসব গল্পের শুরুটা হয়েছিল কীভাবে। আশেপাশের অন্যান্য দ্বীপগুলোর গল্পের চেয়ে আমাদের দ্বীপের গল্পগুলো কিন্তু বেশ আলাদা।

ওয়েটার বিয়ার ও পানির বোতল নিয়ে আসার পর ম্যানচেস্টার ওদের তিনজনের জন্য সামুদ্রিক খাবার অর্ডার করল। কিন্তু ম্যানচেস্টার যে পরিমাণ খাবার অর্ডার করেছে তা দিয়ে দশজন মানুষের পেট ভরে যাবে। খাওয়ার পুরো সময়টা চুপচাপ রইল ওরা। ম্যানচেস্টার গপাগপ খাবার সাবাড় করে ফেলল। খাওয়া শেষে সোনার খনির কথা তুলল স্যাম।

‘গতরাতে আপনি খনির কথা বলেছিলেন। কতদিন আগে চালু ছিল ওটা?

বিগত ১২ বছর ধরে বিভিন্ন সময় চালু হয়েছে… বন্ধ হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে খনিতে কোনো কাজকর্ম চলেনি।’

‘গোয়াডালক্যানেলের সাথে সোনার কোনো সম্পর্ক আছে বলে শুনিনি কখনও।

‘অনেক আমেরিকানই বিষয়টা জানে না। তারা শুধু এই দ্বীপের কথা জানে, কারণ ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিদের বিরুদ্ধে এই দ্বীপকে ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু সোনা হলো আমাদের মূল সম্পদ। সোনার কারণেই কিন্তু এই দ্বীপের নাম সলোমন আইল্যান্ড রাখা হয়েছিল।’

তাই?’ প্রশ্ন করল রেমি।

‘হ্যাঁ। স্প্যানিশরা যখন ষোড়শ শতাব্দীতে এখানে আসে তখন তারা মাটানিকো নদীর মুখে সোনা পেয়েছিল। তাদের নেতার নাম ছিল অ্যালভারো ডি ম্যানডেনা ডি নেই। সেই নেতা তখন ঘোষণা করলেন এই এলাকা থেকেই হয়তো বাইবেলে বর্ণিত রাজা সলোমন তার বিখ্যাত সোনা পেয়েছিলেন। সেই ধারণার উপর ভিত্তি করে নেইরা এই দ্বীপের নাম দিলেন সলোমন আইল্যান্ড। তিনি একজন সাধারণ ভ্রমণকারী ছিলেন। ভূগোল সম্পর্কে তার ধারণা কম থাকতেই পারে।

মজা তো।’ বলল রেমি। আসলে কখনও কখনও কাল্পনিক কাহিনির চেয়েও বাস্তব সত্য অনেক বেশি আশ্চর্যজনক হয়।’

স্যাম সামনে ঝুঁকল। আচ্ছা, মূল প্রসঙ্গে আসি। টমের গল্পের ব্যাপারে আপনার কী মত?’

‘মানুষ গায়েব হয়, এটা সত্য। আর দিনকে দিন গায়েব হওয়ার পরিমাণ বাড়ছে মনে হয়। কিন্তু আমি সেটার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত নই। কোনো দুর্ঘটনা, ডুবে যাওয়া, কুমীর… এগুলোর মধ্যে যে-কোন কারণেই মানুষ গায়েব হতে পারে। আমরা নিয়মিত রিপোটিং করছি যাতে মানুষ উধাও হওয়ার যথাযথ কারণটা খুঁজে বের করতে পারি। বিষয়টা অনেকটা মহামারীর মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ২০ জন করে গায়েব হয়। তবে সে-হিসেবে এত কম মানুষ খেয়ে জায়ান্টরা কত-ই-বা ক্যালরি পায়? মাঝে মাঝে ভাবি, এত কম ক্যালরিতে ওদের চলে?’

‘আপনি নিশ্চয়ই জায়ান্টের গল্পে বিশ্বাস করেন না?’ রেমি প্রশ্ন করল।

‘টম মানুষ হিসেবে ভাল। তবে আমি বাস্তব দুনিয়ার থাকতে পছন্দ করি… যতটুকু সম্ভব আরকী। রূপকথার যাবতীয় বিষয় আমি অন্যদের উপর ছেড়ে দিয়েছি। ওসব নিয়ে আমার আগ্রহ নেই।’

দ্বীপের কিছু অংশকে তিনি অভিশপ্ত” বলেছেন। কারণ কী?

কী হতে পারে? হয়তো ওখানে কুমীরের আনাগোনা বেশি, তাই। আসলে প্রত্যেকটা অভিশাপঅলা কাহিনির পেছনে যুক্তিযুক্ত বাস্তব কারণ থাকে। সেটা বোঝার জন্য রকেট সাইন্স জানার প্রয়োজন পড়ে না।

আচ্ছা। আমরা আগামীকাল রুবো’র সাথে দেখা করার পর সোনার খনি দেখতে পাব বলে ঠিক করেছি।’

‘আশা করি, রুবো এখনও পরলোক গমন করেনি। আর সোনার খনিতে আসলে দেখার মতো কিছু নেই। বন্যার কারণে খনি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তারপরে আর ভোলা হয়নি।’

‘আমাদের হাতে অনেক অবসর সময় আছে। তাই এটা-সেটা দেখব। আচ্ছা, জায়ান্টরা যে গুহাগুলোতে থাকে… সেগুলো কোথায়?’

‘পাহাড়ের উপরে,’ অস্পষ্টভাবে বলল ম্যানচেস্টার। কিন্তু ওখানে যাওয়ার জন্য কোনো ভাল রাস্তা নেই। খুব একটা নির্ভরযোগ্য নয় ওদিকটা। আপনারা কোন দুঃখে ওদিকে যেতে চাচ্ছেন, আমার মাথায় ধরছে না। সময় কাটানোর কত উপায় আছে। ডাইভিং, মাছ ধরা,…’।

ম্যানচেস্টারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হোটেলের দিকে ফিরল ফারগো দম্পতি।

‘টমের গল্প শুনে ম্যানচেস্টার খুশি হয়নি বলে মনে হলো, তাই না? স্ত্রীকে বলল স্যাম।

হুম। হয়নি। তবে ম্যানচেস্টারের মধ্যে অন্য একটা ব্যাপার আছে। সেটা কী, আমাকে প্রশ্ন কোরো না কিন্তু। ‘ও আচ্ছা, তুমিও টের পেয়েছ? আমি ভাবলাম, শুধু আমার চোখেই পড়েছে বিষয়টা।

১১. সমভূমি থেকে পাহাড়ের দিকে

১১.

একটা ট্রাক সমভূমি থেকে পাহাড়ের দিকে যাত্রা করেছে। খাড়া রাস্তা ধরে উপরে উঠতে গিয়ে অনেক পরিশ্রম করতে হচ্ছে ওটার ইঞ্জিনকে। চালু করা রেডিওর সাথে তাল মিলিয়ে ড্রাইভার গুনগুন করছে। তার সঙ্গী ঘুমুচ্ছে পাশের সিটে। পরনে খাকি পোশাক। তবে পোশাকটা ময়লা। অনেক কাজ করেছে আজ।

ওরা দুজনই অস্ট্রেলিয়ান। বিগত ৬ মাস ধরে গোয়াডালক্যানেলে রয়েছে। ২০০৬ সালের দাঙ্গার পর থেকে এখানে বিভিন্ন সময় সাহায্য সহযোগিতার জন্য বিদেশিরা আসছে। ওরা হচ্ছে সেরকম বিদেশি ব্যক্তি। তবে ইদানিং ওদের দিনকাল একঘেঁয়েমিতে কাটে। গত কয়েক বছর ধরে এখানে কোনো বড়ধরনের বিপদ-আপদ হচ্ছে না। তাই ওদের ডিউটিও হালকা।

বিপদজনক মোড়ে এসে সাবধানতা অবলম্বন করল ড্রাইভার। ওপাশ থেকে হুট করে হেডলাইটবিহীন গাড়ি উদয় হতে পারে। সাবধান হওয়া ভাল। তার উপর এখন সন্ধ্যা নেমেছে। দিনের আলো নেই বললেই চলে। এই পথে চলাচলরত গাড়িগুলোর ব্রেক আর নিরাপত্তার কোনো মা-বাপ নেই। কখন কোন গাড়ি বিগড়ে গিয়ে দূর্ঘটনা ঘটাবে তা কেউ জানে না। তাছাড়া বিভিন্ন প্রাণী, ভেঙ্গে পড়া গাছ, ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়া গাড়ি… ইত্যাদি ঝামেলা তো আছেই। তাই সবমিলিয়ে মোড় পার হওয়ার সময় সাবধানতা অবলম্বনের কোনো বিকল্প নেই।

‘ধ্যাৎ! এরা রাস্তার মাঝে কী করছে?’ একটা তীক্ষ্ণ বাঁক পেরিয়ে এসে নিজেই নিজেকে বলল ড্রাইভার। সামনের রাস্তার ঠিক মাঝখানে একটা ভ্যান দাঁড়িয়ে রয়েছে। ইমার্জেন্সি লাইট জ্বলছে ওটাতে। আলফ্রেড, ওঠো।

আলফ্রেড উঠে হাত দিয়ে চোখ-মুখ ডলল। ট্রাকের গতি কমে গেছে। সামনের রাস্তা বন্ধ। ওদের ট্রাকের পক্ষে ভ্যানটাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

‘খুউব চমৎকার, সাইমন। এবার ঘণ্টাখানেক এখানে বসে বসে খই ভাজা যাবে!

ড্রাইভার ট্রাকটাকে দাঁড় করিয়ে ভ্যানের পেছন দিকে নজর দিল। আশা করছি, ড্রাইভারটা যেন এখানেই থাকে। যদি সে সাহায্য চাওয়ার জন্য দূরে কোথায় গিয়ে থাকে তাহলে আমাদের বাশ!

‘চলো, চেক করে দেখি।’

দরজা খুলে ট্রাক থেকে নামল ওরা। ট্রাকের হেডলাইট জ্বালানো, ইঞ্জিনও চালু। ড্রাইভিং সিটের দিকে এগোল সাইমন। ফাঁকা। “ড্রাইভার নেই” এই কথাটা সঙ্গী আলফ্রেডকে বলতে যাবে ঠিক তখনই পাশের ঝোঁপ থেকে চারটে কালো অবয়ব বেরিয়ে এলো। তাদের হাতে ম্যাচেটি। সন্ধ্যার আধো আলোতেও ওগুলোর ফলা ঝলসে উঠল।

স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াবশত আক্রমণ ঠেকানোর জন্য নিজের হাতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করল সাইমন। কিন্তু ম্যাচেটির কাছে ওর হাতের রক্ত-মাংস তো কিছুই নয়। ওদিকে ঘাড়ে কোপ খেয়ে আলফ্রেড ইতিমধ্যে ভূপাতিত হয়েছে। বেচারা মরে গেছে সেটা পরিষ্কার বোঝা যাওয়ার পরও আরও কয়েকটা কোপ দিল আততায়ীরা।

মাথার খুলিতে ধারাল কোপ খেয়ে সাইমনের দুনিয়া যেন শব্দ-শূন্য হয়ে গেল। মাটিতে পড়ে গিয়ে ও দেখল ওর খুনি দাঁত বের করে ত্রুর হাসি হাসছে। একটা কণ্ঠ ঝোঁপের ভেতর থেকে হাঁক ছাড়ল।

যথেষ্ট হয়েছে। এখন ট্রাকটাকে রাস্তা থেকে সরা আর লাশ দুটোকে ঝোঁপের ভেতরে লুকিয়ে রাখ, যাতে কেউ এগুলো খুঁজে না পায়। এখানে অনেক জন্তু-জানোয়ার আছে। লাশ দুটোর ব্যবস্থা ওরাই ভাল করতে পারবে।

আততায়ীরা একে অন্যের দিকে তাকাল। ওদের জীর্ণ পোশাকগুলো গরম রক্তে মাখামাখি হয়ে গেছে। ৫ মিনিটের মধ্যে দৃশ্যপট থেকে লাশ সরিয়ে ফেলল ওরা। ঘটনাস্থল পরিষ্কার করে ফেলল। এখানে কোনো খুননাখুনি হয়েছে তার আর কোনো প্রমাণই রইল না।

‘কাজ শেষ। এবার তোরা কেটে পড়। সমুদ্রে গিয়ে নিজেদেরকে পরিষ্কার করে নিবি। পোশাকে, শরীরে আর অস্ত্রে কোথাও যেন রক্ত লেগে না থাকে। আর মনে রাখিস, কাউকে কিছু বলবি না। যদি একটা শব্দও বলেছিস, তাহলে আমি তোদের জিহ্বা কেটে ফেলব।

সবাই লোকটার কথা বিশ্বাস করল। কারণ, ওরা জানে এই লোক যা বলে সেটা করেও দেখায়। মাথা নেড়ে আততায়ীরা ভ্যানে উঠে বসল। চটপট ইঞ্জিন চালু হয়ে রওনা হয়ে গেল গন্তব্যের উদ্দেশে। ঘটনাস্থলে এখন শুরু সেই নির্দেশদাতা একা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে এইমাত্র খুন হয়ে যাওয়া জায়গাটাকে আবার পরীক্ষা করল সে। হাসল। সবকিছু একদম প্ল্যান অনুযায়ী হচ্ছে। এখন একটা কন্টাক পেপার নিয়ে তাতে লিখতে হবে, বিদ্রোহীরা সব বিদেশি কোম্পানীদেরকে দ্বীপ ছেড়ে চলে যেতে বলেছে, নইলে এরকম আরও বিদেশি খুনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

চারপাশের জঙ্গল একদম নিশ্চুপ। তবে নিশাচর প্রাণীরা তাদের আজ রাতের ফ্রি ডিনার খাওয়ার জন্য ঠিকই তৈরি হয়ে নিচ্ছে। ঝোঁপ থেকে প্রায় ৬০ ফুট দূরে একটা কালো এসইউভি-তে চড়ল লোকটা। দু’টো অস্ট্রেলিয়ান লাশ আর ট্রাক ফেলে চলে গেল সে। দ্বীপে আরও দুটো খুন হলো আজ। স্রেফ এখানকার ক্ষমতা দখলের জন্য।

.

১২.

পরদিন সকালে স্যাম ও রেমি হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হলো। এবার ডা. ভ্যানা ওদেরকে ঢুকতে দিল হাসপাতালের ভেতরে। বেনজির সাথে দেখা করল ওরা। জীবন বাঁচানোর জন্য বেনজি ফারগো দম্পতিকে অনেক ধন্যবাদ জানাল, যদিও তার ইংরেজি বুঝতে খুব কষ্ট হলো ওদের। বেনজির সাথে ওদের কোনো পূর্ব-পরিচয় না থাকায় বাড়তি কোনো কথা বলার সুযোগ রইল না। তবে বেনজিকে ফারগো দম্পতি নিশ্চিত করল হাসপাতালের যাবতীয় বিল লিওনিড দিয়ে দেবে, সে যেন কোনো দুশ্চিন্তা না করে। কয়েক মিনিট পর ওরা ভ্যানার সাথে বেনজির রুম থেকে বেরিয়ে এলো।

‘আজকে আপনাদের প্ল্যান কী?’ জানতে চাইল ডাক্তার।

স্থানীয় লোকজনদের আমরা গোয়াডালক্যানেলের লোককাহিনি সম্পর্কে জিজ্ঞাস করব। তারপর খনি দেখতে যেতে পারি।’ বলল রেমি।

‘আচ্ছা। তবে সাবধান থাকবেন। শহরের বাইরে কিন্তু রাস্তার অবস্থা খুব একটা ভাল নয়। আর জঙ্গলে কী থাকতে পারে না পারে তা তো ইতিমধ্যে শুনেছেন। কুমীর কিন্তু এখানকার অনেকগুলো বিপদের মধ্যে একটা মাত্র। এরকম আরও অনেক বিপদ মানুষের জন্য ওঁত পেতে আছে।’

হ্যাঁ, ম্যানচেস্টার আমাদেরকে জায়ান্টের ব্যাপারেও বলেছেন। স্যাম বলল।

হাসল ভ্যানা। তবে বোঝা গেল হাসিটা মেকি। এখানে বিভিন্ন রকম গল্প প্রচলিত আছে। মানুষজন অনেক কিছুতে বিশ্বাস করে।

এরকম গ্রাম্য বিচ্ছিন্ন জনপদের কাছ থেকে এরচেয়ে বেশি আর কী আশা করা যায়, বলুন? বলল স্যাম। আমরা ভিন্নধর্মী সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করি তারপরও বিষয়টা যেন কেমন কেমন…

‘আমি সেই ছোট্টবেলা থেকে জায়ান্টের গল্প শুনে আসছি। কিন্তু পাত্তা দেইনি। এই লোককাহিনিগুলোকে আমি ধর্মের মতো মনে করি। বিশ্বাস করলে আছে, না করলে নেই। মানুষ সেটাই ভাবে, যা তারা ভাবতে চায়। ভ্যানা বলল।

কিন্তু তিনি হুটহাট মানুষ গায়েব হওয়ার বিষয়েও বললেন আমাদের। ইদানীং নাকি মানুষ গায়েব হওয়ার পরিমাণ আরও বেড়েছে। জানাল রেমি।

‘গুজব শুনেছি পাহাড়ে নাকি এখনও বেসামরিক বাহিনি আছে। আমার মনে হয় এগুলো তাদের কাজ। জায়ান্ট-টায়ান্ট কিছু না।

বেসামরিক বাহিনি?

‘অস্ট্রেলিয়ান সেনাবাহিনির তরফ থেকে দ্বীপে শান্তি বজায় রাখার জন্য আমর্ড টাস্ক ফোর্স পাঠানো হয়েছিল। স্থানীয় লোকজন তাদেরকে স্বাগত জানালেও কিছু স্থানীয় আছে যারা এটাকে তাদের জন্মভূমিতে বিদেশিদের অনৈতিক হস্তক্ষেপ বলে মনে করে। দ্বন্দটা এখানেই। এদেরকে বেসামরিক বাহিনি না বলে জঙ্গি বলা ভাল।’

‘তাহলে তো গুহার ওদিকে ঘুরতে যাওয়াটা সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ? স্যাম প্রশ্ন করল।

মাথা নাড়ল ভ্যানা। যদিও সেটা জায়ান্টের জন্য নয়। কিন্তু যা-ই আক্রমণ করুক না কেন। যদি জীবন-ই না বাঁচে তাহলে জায়ান্ট হলেই কী আর জঙ্গি হলেই কী? কোনো পার্থক্য আছে, বলুন?

স্যামের দিকে তাকাল রেমি। ওনার কথায় যুক্তি আছে কিন্তু।

‘তা ঠিক। আচ্ছা, ডা. আপনাকে ধন্যবাদ বেনজি’র সাথে আমাদের দেখা করিয়ে দেয়ার জন্য। ভ্যানাকে বলল স্যাম। বেচারার সাথে যে দূর্ঘটনা ঘটে গেছে সেটা খুবই বেদনাদায়ক।

হুম, সতর্ক থাকবেন যাতে ওরকম ঘটনা আপনাদের সাথে না ঘটে। এই দ্বীপ বেশ বুনো প্রকৃতির। কুমীর ছাড়াও আরও অনেক জানোয়ার আছে এখানে।

‘মনে থাকবে। সতর্ক করে দেয়ার জন্য আবারও ধন্যবাদ।

পার্কিং লটে রাখা নিশান গাড়ির দিকে এগোল ওরা। সূর্য ইতিমধ্যে খুব নিষ্ঠার সাথে তার প্রচণ্ড তাপ বিকিরণ করতে শুরু করে দিয়েছে। পুবদিকে রওনা হলো ফারগো দম্পতি। গতকাল যে রাস্তায় গিয়ে বৃষ্টির পানির কারণে ফিরে যেতে হয়েছিল আজ সেখানে পানি নেই তবে পুরো রাস্তা কাদায় মাখামাখি হয়ে আছে।

গাড়িকে ফোর-হুঁইল ড্রাইভ অপশনে নিলো স্যাম। ঝাঁকির সাথে ব্যাপক দুলুনি খেয়ে ওদের নিশান এগিয়ে চলল। মনে হলো ওরা গাড়িতে নয় কোন থিম পার্কের রাইডে চড়েছে। রাস্তার দু’পাশে জঙ্গল থাকায় অনেকখানি সূর্যের আলো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এখন।

‘এত ঝক্কির রাস্তা পাড়ি দিয়ে যাচ্ছি অথচ রুববা বেঁচে আছে কিনা সেটাই জানি না আমরা।’ রেমি বলল।

‘বাঁচা-মরার কোনো ঠিক-ঠিকানা আছে, বলো? তুমি কেন এসব ভাবছ? তোমার অ্যাডভেঞ্চারধর্মী চিন্তাধারার কী হয়েছে? অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে চিন্তা করলেও তো পারো।

‘অ্যাডভেঞ্চারসহ অন্যান্য সুন্দর অনুভূতিগুলোকে আমি এক মাইল পেছনে রেখে এসেছি।’

খুব খারাপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা।’

হু, ঝাঁকির দমকে সকালের নাস্তা বোধহয় হজমই হয়ে গেল।

আধাঘণ্টা পর তীক্ষ্ণ বাঁক পেরিয়ে একটা লম্বা বটগাছের দেখা পেল ওরা। বটগাছের নিচে গ্রাম্য ধাঁচের একটা কুঁড়েঘর দেখা যাচ্ছে। পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে, এখানে বিদ্যুৎ কিংবা টেলিফোনের লাইন কোনটাই নেই। গাড়ি থামতেই স্যামের দিকে তাকাল রেমি।

‘হাহ। আর তুমি বলো হোটেলটা ফালতু, তাই না। তাহলে এটা কী?

‘জীবনে যে আর কত চমক দেখতে হবে কে জানে।

“দেখো কাউকে পাওয়া যায় কিনা।

হুম, দেখছি।’

‘আমি বরং গাড়িতেই থাকি। বাইরে তো খুব গরম। গরমে যদি তুমি অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে আমি সাহায্য করব। দু’জন একসাথে অসুস্থ হওয়ার কী দরকার?

‘বাহ! তুমি আমার কত যত্ন নাও! তুমি অনেক ভাল। অথচ আমি ভেবেছি, এসির বাতাস খাওয়ার জন্য গাড়িতে থাকতে চাইছে…’।

‘একে এসি বলে? গরম বাতাস ছাড়া কী বেরোচ্ছে এসি থেকে, শুনি?

“আচ্ছা, তুমি গাড়িতে থাকো। আমি গিয়ে কথা বলে আসছি। তোমার চোখে কাউকে পড়েছে? কুঁড়েঘরের দিকে বলল স্যাম।

নড়াচড়া দেখতে পেয়েছি বলে মনে হলো। তবে সেটা কুমীরও হতে পারে আবার স্কিঙ্কও হতে পারে। অতএব, সাবধানে যেয়ো।

‘তোমার কথা শুনে… কী বলব… খুব স্বস্তি পেলাম!”

‘তোমাকে স্বস্তি দেয়াটাই তো আমার কাজ!

গাড়ির দরজা খুলে কুঁড়েঘরের দিকে এগোল স্যাম। ঘরের কয়েক ফুট দূরে থাকা অবস্থায় একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ভেতর থেকে। ভাষাটা স্যাম না বুঝলেও বলার ধরনে ও ঠিকই বুঝেছে ওটা একটা সতর্কবাণী। থেমে দাঁড়াল স্যাম।

‘আমি রুবো’র সাথে দেখা করতে এসেছি। ধীরে ধীরে বলল ও। রু বো,’ স্যাম নামটা আবার উচ্চারণ করল। আপনি ইংরেজি জানেন?

নিশানের ইঞ্জিন চালু করা রয়েছে। ইঞ্জিনের মৃদু গুঞ্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। সব চুপচাপ।

কুঁড়েঘরের দরজায় একটা অবয়ব হাজির হলো। বৃদ্ধ লোক, হালকা পাতলা গড়ন, চামড়া কুঁচকে গেছে। ঘরের ছায়ায় থেকে স্যামকে পর্যবেক্ষণ করল বৃদ্ধ। বলল, আমি অল্প ইংরেজি কইবার পারি! কী চান আপনে?’

‘আমি অরউন ম্যানেচেস্টারের বন্ধু। রুবো’র সাথে দেখা করতে এসেছি।’

‘আমি কানে কম শুনি না। প্রথমে একবার কইছেন, তহনি শুনছি। কী জইন্যে আইছেন সেইটা কন।

কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাস করব। এখানকার লোককাহিনির ব্যাপারে।

ঘরের ছায়া থেকে বের হলো বৃদ্ধ। সন্দেহ নিয়ে স্যামের দিকে তাকাল। ‘প্রশ্ন জিগানোর জইন্যে বহুত দূর চইল্যা আইছেন।

বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ।’

বিরক্তি প্রকাশ করে বৃদ্ধ ঘোঁতঘোত করল। আমি রুবো।

‘আমি স্যাম। স্যাম ফারগো।’ হাত মেলালোর জন্য হাস বাড়িয়ে দিলো ও। কিন্তু রুবো হাতের দিকে এমনভাবে তাকালো যেন স্যামের হাতটা খুবই নোংরা। অস্বস্তিবোধ করল স্যাম। ভাবল, হয়তো কোনো স্থানীয় রীতি ভঙ্গ করে ফেলেছে। ওকে অস্বস্তিতে পড়তে দেখে দাঁতবিহীন মাঢ়ি বের করে হাসল বৃদ্ধ।

‘চিন্তার কিছু নাই, বুছছেন? আমার এরাম হাত মিলাননা পছন্দ না। এইডা কোনো রীতি না কিন্তু। খালি আমারই পছন্দ হয় না বিষয়।’ বলল রুবো। বইবেন না?’ ঘরের দেয়ালের পাশে থাকা একটা গাছের গুঁড়ি দেখাল সে। কপাল ভাল গুঁড়িটা ছায়ায় আছে।

ধন্যবাদ।’

বসার পর স্যামের পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে নিল বৃদ্ধ।

‘কী চান বইল্যা ফালান?’

‘পুরানো দিনের কথা জানতে চাই। পুরানো গল্প। অরউন বললেন আপনি অন্য সবার চেয়ে পুরানো গল্প ভাল জানেন।

রুবো মাথা নাড়ল। হইবার পারে। অনেক গল্প জানি আমি।

‘অভিশাপ সম্পর্কিত গল্প শুনতে চাই। কিংবা কোনো তলিয়ে যাওয়া শহরের গল্প।

রুবো’র চোখ সরু হয়ে গেল। ডুইবা যাওয়া শহর? অভিশাপ।

মাথা নেড়ে সায় দিল স্যাম। দ্বীপের ওইপাশের সৈকত নাকি অভিশপ্ত?

‘আপনে শহর নিয়া প্রশ্ন করলেন ক্যান?

‘দ্বীপে কে যেন অনুসন্ধান চালাচ্ছে। লোকমুখে শুনলাম সে নাকি পানির নিচে ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেয়েছে।

দূরে তাকাল রুবো। দূরে নদীর বাদামী পানি বয়ে যাচ্ছে। নিজেকে সামলে নিয়ে স্যামের দিকে ফিরল সে। চেহারা কঠিন।

‘পুরাইন্না গল্প। এক রাজা আছিল। দেবতাগো রাগায়া দিছিল সেই রাজা। সাগরের মইধ্যে মন্দির বানাইছিল। কিন্তু বড় বড় ঢেউ আইয়া সব ডুবাইয়া দিছে। তারপর থেইক্যা ওই জায়গা অভিশপ্ত।

কবেকার ঘটনা এটা?

হাড্ডিসার কাঁধ ঝাঁকাল বৃদ্ধ। বহুত পুরাইন্ন্যা কাহিনি। সাদা চামড়ার লোকগুলান তহনও এইহানে আহে নাই।

স্যাম আরও কিছু শোনার জন্য অপেক্ষা করল। কিন্তু রুবো বিস্তারিত কিছু জানাতে পারল না। আধামিনিট চুপচাপ থাকার পর হাসার চেষ্টা করল স্যাম। এতটুকুই?

মাথা নাড়ল রুবো। শুকনো আঙুল তাক করল গাড়ির দিকে। ওইডা ক্যাডা?

“ওহ, দুঃখিত। বলা হয়নি। ও আমার স্ত্রী। ইশারা করে রেমিকে এদিকে আসতে বলল স্যাম। রেমি গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে এলো।

একদম কাছে না আসা পর্যন্ত রেমি’র দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বৃদ্ধ।

‘রেমি, ইনি হচ্ছেন, রুবো। আমাকে একটা লোককাহিনি শুনাচ্ছিলেন। এক রাজা সমুদ্রে মন্দির বানিয়েছিল কিন্তু তারপর সেটা তলিয়ে যায়। দেবতারা ক্ষীপ্ত হয়েছিল রাজার উপর।

‘আপনার সাথে দেখা হয়ে ভাল লাগল। বলল রেমি। বৃদ্ধকে মিষ্টি হাসি উপহার দিল ও। দুর্বল শরীর নিয়ে রুবো উঠে দাঁড়াল। রেমির একটা হাত টেনে নিয়ে হ্যান্ডশেক করল সে। স্যাম কিছু বলল না। হাজার হোক, সব নিয়মেরই ব্যতিক্রম থাকে।

বইসো, রেমিকে বলল রুবো। রেমি তাকে আরেকটা হাসি উপহার দিল। স্যামের পাশে বসল রেমি। স্যাম গলা খাকরি দিল।

‘আমাদের ধ্বংসাবশেষের কথাই বলছেন উনি, তাই না?

‘হ্যাঁ। রুবো পুরো গল্পটা জানেন। বিষয়টা দারুণ।

রুবো মুখ খুলল। আমি অনেক গল্প জানি।

‘অবশ্যই জানেন। আর আপনার ইংরেজি যথেষ্ট ভাল। এরকম ইংরেজি কীভাবে শিখেছেন?

‘যুদ্দের সময় আমি আংকেল স্যাম-রে সাহায্য করছিলাম। তহন শিখছি।’

‘তাই? তখন অনেক কঠিন সময় গেছে, তাই না?’ বলল রেমি।

রুবো মাথা নাড়ল। কঠিন দিন আছিল তহন। বহুত লোক মইরা গেছিল। জাপানি গো আমি ঘেন্না করি।

দ্বীপের ক্ষতি করেছিল জাপানিরা?’

কয়েকড়া জাপানি করছিল। তার মইদ্যে একজন আছিল চরম খারাপ। কর্নেল।

কী করেছিল সে?’ স্যাম জানতে চাইল।

‘খারাপ কাম করছিল। আমাগোর বহুত লোক মারছিল কর্নেল। লুকায়া লুকায়া গুবেষণা করত।

একটু কাছে এগিয়ে এলো রেমি? কী? গবেষণা?’

রুবো অন্যদিকে তাকাল। মেড।

‘মেড? মানে, মেডিক্যাল?

মাথা নাড়ল রুবো। হ। সাদা চামড়ার লোক লইয়্যা গুবেষণা করত। তয় হেই লোকগুলান আমেরিকান আছিল না।’

স্যাম রেমির দিকে তাকাল। শ্বেতাঙ্গদের নিয়ে এখানে গবেষণা করত জাপানিরা। কিন্তু কোন জাতির শ্বেতাঙ্গ ছিল তারা? আন্দাজ করতে পারো?

রুবোর দিকে ফিরল ফারগো দম্পতি। আচ্ছা, এই ঘটনা আমরা এরআগে কখনও শুনতে পাইনি। কেন?

রুবো শ্রাগ করল। কইবার পারি না। কেউ হয়তো বিষয়ডা ঘারায় নাই।

তাহলে আপনি বলছেন জাপানিরা এখানে যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত ছিল? কিন্তু বিষয়টা এভাবে চাপা থাকতে পারে, সেটা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।’ বলল রেমি।

রুবো শূন্য দৃষ্টিতে রেমি’র দিকে তাকাল। চাপা? চাপা মারার কথা কইতাছেন নাকি? বুঝবার পারলাম না।

‘দুঃখিত। “চাপা” বলতে আমি ঘটনা চাপা পড়ে থাকার কথা বলেছি। আপনি চাপা মারছেন সেটা বলিনি।

‘রাজার কাহিনিতে আসি। আপনি আমাদেরকে পুরো গল্পটা শোনাতে পারেন?’ স্যাম উৎসাহ দিল।

শ্রাগ করল রুবো। কইলাম না, বহুত পুরাইন্ন্যা কাহিনি। বেশি কিছু কওয়ার নাই। রাজা মন্দির বানাইছিল। দেবতারা খেইপা গিয়া মন্দির ডুবায়া দিছে। তারপর থেইক্যা জায়গা অভিশপ্ত। কেউ আর ওইদিকে যাইবার চায় না।

‘শেষ?

হ।

স্যাম দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আর জায়ান্ট? জায়ান্টদের নিয়ে কোনো লোককাহিনি নেই?

রুবোর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। জায়ান্ট সত্য সত্যই আছে। আগে বহুত আছিল। এহন একটু কমছে। তয় আছে।

‘আপনি কীভাবে জানেন? দেখেছেন কখনও?

না দেহি নাই। তয় আমি এরাম বহুত লোকরে চিনি। হ্যারা দেখছে।

‘নিজের চোখে না দেখে এভাবে বিশ্বাস করাটা অদ্ভুত না? বিষয়টা তো ভূত দেখার মতো হয়ে গেল। অনেক মানুষ বিশ্বাস করে, ভূত আছে। কিন্তু…’ রুবোর চেহারার অভিব্যক্তি দেখে স্যাম থেমে গেল।

‘ভূতরা সত্য সত্যই আছে।’

‘তাহলে আমি বিশ্বাস করেন বাস্তবে গুহায় জায়ান্টরা বাস করে?’ বলল রেমি।

‘আমি কহনও যাই নাই। গুহায় বদ আত্মা থাকে। জাপানি অফিসারগুলান ওই জায়গায় শুবেষণা করত। বহুত ভূত আছে ওইহানে। সবগুলান খেপা। জায়ান্টও আছে। গুহা ভালা না।’

স্ত্রীর সাথে দৃষ্টি বিনিময় করল স্যাম। রুবো গুহা, জাপানি; দুটোর একটাকেও পছন্দ করে না। আর সে রাজার গল্পটাও বিস্তারিত জানে না, তাই বিরক্ত হচ্ছে।

স্যামের কানের কাছে মাথা নিল রেমি। শুনতে পেয়েছ?

না তো৷ কী?

রুবো অন্যদিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে। ফারগো দম্পতির দিকে খেয়াল নেই তার।

‘রাস্তার ওদিকে ইঞ্জিনের আওয়াজ পেলাম মনে হলো।

স্যাম মাথা নাড়ল। আমি শুনতে পাইনি।’ রুবোর দিকে ফিরল ও। ‘রাজার কাহিনিটা কী সবাই জানে? খুব পরিচিত কাহিনি এটা?

মাথা নাড়ল বৃদ্ধ। আগের দিনের গল্প এহন কেউ আর করে-টরে না।’

হঠাৎ নদীর ওদিক থেকে ডাল ভাঙ্গার আওয়াজ এলো। ঝট করে রেমি তাকাল ওদিকে। স্যাম ও রেমি ঝোঁপের দিকে তাকিয়ে শব্দের উৎস খুঁজল কিন্তু কিছুই পেল না। আরও শব্দ শোনার জন্য কান খাড়া করে রইল ওরা। কিন্তু সব একদম চুপচাপ। প্রাকৃতিক কিছু আওয়াজ ছাড়া অস্বাভাবিক কোনো আওয়াজ শোনা গেল না। রুবো’র হাবভাব দেখে মনে হলো তিনি কোনো শব্দ শুনতে পাননি। কয়েক মিনিট পরও যখন আর কোনো শব্দ পাওয়া গেল না তখন ফারগো দম্পতি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

তলিয়ে যাওয়া শহরের ব্যাপারে বৃদ্ধ লোকটিকে আরও কিছু প্রশ্ন করল রেমি। কিন্তু নতুন কিছু জানা গেল না। অবশেষে রেমি আর স্যাম যখন ওখান থেকে উঠল বৃদ্ধ তখনও নির্বিকার। সে উঠে দাঁড়াল না কিংবা ওদেরকে কিছু বললও না।

কিছু না বললে খারাপ দেখায়। তাই রেমি মুখ খুলল। “ঠিক আছে, রুবো। দ্বীপের ইতিহাস জানানোর জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমরা অনেক উপকৃত হয়েছি।’

নিজের পায়ের দিকে লজ্জাবনত মুখে তাকিয়ে রইল রুবো। ম্যালা দিন পর নতুন মানুষ গো লগে কতা কইলাম। আমারও ভালা লাগছে।’

ভাড়া করা নিশান গাড়ির দিকে ফিরল ওরা। গাড়ির দরজা খুলতেই ভেতরের ঠাণ্ডা বাতাস ওদের গায়ে এসে স্বস্তির পরশ বুলিয়ে দিল। গাড়ির ইঞ্জিন এসিকে চালু রেখেছিল এতক্ষণ। সিটবেল্ট বেঁধে স্যামের দিকে তাকাল রেমি। কী বুঝলে?

‘আরেকটা ধাঁধা পেলাম। যতদূর বুঝতে পারছি, প্রাকৃতিক দূর্যোগের ফলে রাজার সেই নিমার্ণশৈলী পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। আর সে দূর্যোগকে ইনি দেবতাদের রাগ হিসেবে আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন। অভিশাপের কারণটা বুঝতে পারলাম এখন। ঘটনা বিস্তারিত মানুষের মনে না থাকলেও লোককাহিনির মূল অংশটুকু ঠিকই মনে আছে।

‘এসব তথ্য জানতে পারলে লিও বেশ খুশি-ই হবে।

‘তুমি হয়তো খেয়াল করোনি। লিও কোনোকিছুতে সহজে খুশি হয় না। কখনই না।’

কুঁড়েঘরের দিকে তাকাল রেমি। রুবোকে দেখে মনে হলো, তার বয়স প্রায় ১০০ বছর।

‘হ্যাঁ। যুদ্ধের সময় যদি সে মিত্রবাহিনিকে সাহায্য করে থাকে তাহলে তো ওরকম বয়স হতেই পারে।’

তবে জাপানি কর্নেলের গবেষণার বিষয়টা কীরকম গা ছমছমে একটা ব্যাপার। আমার বিশ্বাস হতে চাইছে না, এরকম একটা ঘটনার কথা ইতিহাসে লেখা নেই?!

‘এই দ্বীপটা অনেক ছোট। ইতিহাসে অনেক ছোট ছোট বিষয় সেভাবে উল্লেখ নেই।’

‘হুম।

‘খেয়াল করেছ? তোমার সৌন্দর্যের ধার রুবোকেও জখম করেছে! বেচারার যা প্রতিক্রিয়া দেখলাম! মুচকি হেসে গিয়ার বদল করল স্যাম। ‘এখন কোথায় যাবে? সোনার খনি দেখবে নাকি শহরে ফিরবে?’

‘বের হয়েছি যখন, তাহলে খনিটা দেখেই যাই। অভিযোগ করছি না, জাস্ট বলছি… এরকম রাস্তা দিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার চেয়ে হোটেলের রুমে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকাটা অনেক আরামদায়ক।

বুঝলাম। তাহলে সোনার খনিতে যাচ্ছি আমরা?

হুম, চলো।

***

গ্রাম্য রাস্তা পেরিয়ে পাকা রাস্তায় উঠে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল ওরা। গ্রামের জঘন্য রাস্তা পেয়োনোর সময়টুকু ওদের কাছে অনেক দীর্ঘ বলে মনে হয়েছে। পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে চলার সময় বারবার গাড়ির আয়না দিয়ে পেছনে চোখ রাখল স্যাম।

‘এখানে শুধু আমরাই ড্রাইভ করছি না। আরও কেউ আছে বলল ও।

‘আমার মনে হচ্ছে এই গাড়ির আওয়াজ আমি রুবো’র বাসায় শুনেছিলাম। শহরের বাইরে এসে আমার গাড়ি বাদে এই প্রথম কোনো যানবাহনের দেখা পেলাম আমরা।

‘একদিক দিয়ে বিষয়টা স্বস্তির। আমাদের গাড়ি নষ্ট হয়ে গেলে সাহায্যের জন্য ২০ মাইল দূরে যেতে হবে না।’

‘তুমি একরম বাজে চিন্তা-ভাবনা করো কেন?

“ওহ, দুঃখিত। কী বলব, মনে চিন্তা চলে আসে।

একটা উপহ্রদকে পাশ কাটাল ওরা। হ্রদের সাথে ছোট্ট একটা গ্রাম ছিল। তারপর পরিত্যাক্ত কুঁড়েঘরঅলা এক শহরে এসে পৌঁছুল ওরা।

ভূতুড়ে শহর?’ প্রশ্ন করল রেমি।

হুম, খনি বন্ধ। তাই এই অবস্থা। এখানে থাকার জন্য অন্য কোনো জীবিকার উৎস নেই বলে মনে হচ্ছে।

.

দক্ষিণ দিকে এগোল ওরা। পাহাড়ের একপাশের চূড়োয় পৌঁছে সামনে তাকিয়ে একটা দৃশ্য দেখতে পেল। মনে হলো, বিশাল কোনো হাতের সাহায্যে পাহাড়ের চুডোর জঙ্গলকে কেটে ন্যাড়া বানিয়ে দিয়েছে। একটা ভাঙ্গা সিকিউরিটি গেইট দেখা যাচ্ছে এখানে। গেইটের পেছনে থাকা ভবন একদম খালি। ভবনের কাঁচগুলো ভাঙ্গা।

‘কী বুঝতে পারছ, স্যাম? রেমি প্রশ্ন করল।

‘বুঝতে পারছি, এখানে আমরাই প্রথম পর্যটক নই। এরআগেও কেউ এসেছিল।

‘কিন্তু এটা তো ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এখানে এভাবে গেইট ভেঙ্গে অনুপ্রবেশ করাটা কেমন কাজ হলো?’

‘হয়তো খনি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর গেইটটা কেউ ভেঙ্গেছে। কিন্তু কেন ভেঙ্গেছে সেটা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। আমাদের ওসব নিয়ে দুশ্চিন্তা না করলেও হবে। আমরা গেইট ভাঙ্গিনি, কাঁচও ভাঙ্গিনি। কিছু চুরিও করতে আসিনি এখানে।

‘ধরা পড়লে এই ব্যাখ্যাগুলো পুলিশকে দিয়ো।’

‘এই অজো পাড়াগাঁয়ে পুলিশ আসবে বলে মনে হয় না।

‘তোমার কাছে এটাকে ভাল বলে মনে হচ্ছে?

স্যাম কোনো জবাব না দিয়ে নিশানটাকে একদম মূল প্রসেসিং প্ল্যানের কাছে নিয়ে গেল। এখানে অনেকগুলো পরিত্যাক্ত ট্রাক রয়েছে।

‘কেউ-ই নেই এখানে? বিষয়টা রহস্যজনক লাগছে না?’ বলল স্যাম। ওর কণ্ঠস্বর নিচু। গাড়ি থেকে নামবে নাকি এগোব?’

‘এগোও।’

প্ল্যানের শেষ মাথায় পৌঁছুনোর পর গাড়ি থেকে নেমে চারপাশ দেখতে রাজি হলো রেমি। গাড়ি থেমে নামমাত্র ওদের উপর উত্তপ্ত গরম বাতাস হামলে পড়ল।

রেমি স্যামের দিকে ফিরল। দেখে মনে হচ্ছে, পাহাড়ের চূড়া কেটে এই খনি বানানো হয়েছে। আমি এরআগে কোথাও এরকম দৃশ্য দেখিনি। কাজটা করে এখানকার প্রকৃতিকে ধ্বংস করা হয়েছে।

চারপাশ ঘুরে এসে পরিত্যাক্ত ট্রাকগুলোর কাছে এসে দাঁড়াল ওরা! ওদের গাড়িটা এখানেই পার্ক করে রাখা আছে। গাড়িতে উঠল ফারগো দম্পতি।

রেমি বলল, এখানে এসে কীরকম দৃশ্য দেখতে পারি সেটা আগেভাগে মনে ঠিক করে রাখিনি ঠিকই… কিন্তু যা দেখলাম… এসব আশা করিনি।’

শহরের দিকে রওনা হলো ওরা। গাড়ির এসি’র ঠাণ্ডা বাতাসের পরশ পেয়ে রেমি চোখ বুজল। কিন্তু স্যাম ওকে আরাম করতে দিল না।

আমাদের সাথে সঙ্গী জুটেছে।

সোজা হয়ে উঠে বসল রেমি। চোখ মেলল। তো?’

‘সে আমাদেরকে তাড়া দিচ্ছে না, আবার পাশ কাটিয়ে চলেও যাচ্ছে না।’

প্যাসেঞ্জার সাইডের আয়না দিয়ে পেছনের ট্রাকটাকে দেখল রেমি। একটু আস্তে চালাও। ট্রাকটাকে যেতে দেই। আমাদের কোনো তাড়া নেই।’

নিশানের গতি কমাল স্যাম। গাড়ির কাঁচ নামিয়ে হাত বের করে ট্রাককে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সিগন্যাল দিল। ট্রাকের সামনের অংশ এসে ওদের গাড়ির পেছনে ধাক্কা মারার ঠিক আগমুহূর্তে ট্রাকের বিশাল ইঞ্জিনের গর্জন শুনতে পেল ওরা। গ্যাস প্যাডেল ঠেসে ধরল স্যাম। গাড়ির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করল।

‘শক্ত করে ধরে থাকো।’ রিয়ারভিউ মিরর দিয়ে পেছনের ট্রাকটাকে দেখল ও। যদিও গাড়ির পেছনের কাঁচ কাদায় প্রায় ঢাকা পড়ে গেছে, ট্রাকের অবয়ব দেখা যাচ্ছে তবুও। এবার সামনের রাস্তার দিকে মনোযোগ দিল স্যাম। স্পিডোমিটারের উপর চোখ বুলাল। ওর একটাই ইচ্ছা, এই নিশান গাড়িকে যত বেশি সম্ভব গতিতে তুলে তীক্ষ্ণ বাকগুলো পার হবে।

ওদিকে ট্রাকের গতিও বেড়ে গেছে। মনে হচ্ছে, ট্রাকটা বোধহয় ওদের সামনে যেতে চায়। কিন্তু স্যাম সেটা হতে দিল না। স্টিয়ারিং হুইল ঘুরিয়ে ট্রাকের সামনে এগোনোর জায়গাটুকু নিশান দিয়ে ব্লক করে দিল। সেই সাথে গতি বজায় রাখার জন্য গ্যাড প্যাডেলেও চাপ দিয়ে রেখেছে। মনে মনে আশা করল, ওদের ছোট গাড়িটা দানবাকৃতির ট্রাকের সাথে গতির দৌড়ে এগিয়ে থাকবে।

বিভিন্ন বাঁক পেরিয়ে এসে সামনে সোজা রাস্তার দেখা পেল স্যাম। নিশানের গতি সর্বোচ্চতে তুলতে কোনো কার্পণ্য করল না। ওর দেখাদেখি ট্রাকের বিশাল ইঞ্জিনও তার গতি বাড়িয়ে দিল। নিশান আর ট্রাকের মধ্যেকার দূরত্ব কমে যাচ্ছে।

হঠাৎ সামনে একটা তীক্ষ্ণ বাঁক হাজির হওয়ায় বেকে পা দিল স্যাম। নিশান ব্রেক চেপে গতি কমালেও পেছনের ট্রাক তার গতি কমাল না। সজোরে এসে আঘাত করল নিশানের পেছনের অংশে। ট্রাকের বেমক্কা ধাক্কা খেয়ে নিশান নিয়ন্ত্রণ হারাল। স্যাম গাড়ির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার জন্য স্টিয়ারিং হুইল নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ করছে। ট্রাক আরেকটা ধাক্কা দিতেই দুই পা গাড়ির ড্যাশবোর্ডে সাথে চেপে ধরে সিটের সাথে নিজেকে আটকে রাখার চেষ্টা করল রেমি। এবারের ধাক্কাটা নিশান আর কোনোভাবেই হজম করতে পারল না। ডিগবাজি খেয়ে পাহাড়ী রাস্তা থেকে ছিটকে চলে গেল নদীর দিকে।

.

১৩.

গাড়ির আঘাতপ্রাপ্ত হুড থেকে হিস হিস শব্দে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। শরীর থেকে সিট বেল্ট খুলতে স্যামকে বেশ কসরত করতে হলো। ওদের নিশান নদীতে আছড়ে পড়েছে। ভাঙ্গা জানালা দিয়ে পানি ঢুকছে ভেতরে। রেমিও নিজের সিট বেল্ট খুলে ফেলল। গাড়ির ভেতরে অনবরত পানি ঢুকছে। ডুবে যাচ্ছে ওরা।

তুমি ঠিক আছো? বিস্ফোরিত এয়ার ব্যাগকে একপাশে সরিয়ে স্ত্রীকে প্রশ্ন করল স্যাম।

রেমি মাথা নাড়ল। একটু ব্যথা পেয়েছি।’

নিজের হাত-পায়ের দিকে তাকাল স্যাম। প্রায় তলিয়ে যাওয়া গাড়ির কেবিনে চোখ বুলাল। কীভাবে বের হতে চাও?

‘আমার জানালা দিয়ে বের হব।’

‘ওকে।’

আর একটু পরেই গাড়ির পুরোটা পানিতে তলিয়ে যাবে। জানালায় বেশ খানিকটা ফাঁকা অংশ আছে। সেই অংশ দিয়ে প্রথমে বাইরে বেরোল রেমি। তারপর স্যাম বের হলো। রেমি গাড়ি থেকে বের হলেও গাড়ির ঠিক পাশেই অপেক্ষা করছে। হঠাৎ একটা গুলি এসে নদীর পানিতে মুখ গুজল। গুলি করার আওয়াজটাও শুনতে পেল ওরা। রাস্তার ওদিক থেকে গুলি করা হয়েছে। গাড়ি থেকে সরে নদীর গভীরে গেল ফারগো দম্পতি। এবার আরেকটা গুলি এসে গাড়ির ছাদ ফুটো করল। নদীর স্রোত ওদের দুজনকে নিচের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই নদীর গভীরতা মাত্র ৬ ফুট কিন্তু বৃষ্টির পানিতে এখন গভীরতা বেড়েছে।

‘মাথা নিচু করে যতদূর সম্ভব পাড় থেকে দূরে সরে যাও। আড়াল নাও, জলদি! রেমিকে উদ্দেশ্য করে বলল স্যাম।

যাচ্ছি।

নদীর স্রোতের অনেক আওয়াজ। রেমির জবাবটা স্যাম কোনমতে শুনতে পেল।

সামনের নদীর গতিপথ সরু হয়ে যাওয়ার ফলে স্রোতের গতি বেড়ে গেছে। ফলে ওরাও এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। নদীর এই অংশের দু’পাশে অনেক ধারালো পাথর আছে। বিপদ হতে পারে ভেবে স্যাম রেমিকে নিয়ে আবার পাড়ের দিকে এগোতে শুরু করল। পাড়ে পৌঁছে ফুসফুস ভরে শ্বাস নিল ওরা। পানিতে সাঁতরে হাঁপিয়ে উঠেছে।

আরও গুলির শব্দ শোনার জন্য কান খাড়া রাখল স্যাম। ঘটনাস্থল থেকে এখন কয়েক শ ফুটে দূরে আছে ওরা। আক্রমণকারীদের হাতে যদি পিস্তল থাকে তাহলে সেটার রেঞ্জ এতদূর আসবে না। সেক্ষেত্রে চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু যদি স্কোপঅলা রাইফেল থাকে তাহলে ওরা এখনও বিপদমুক্ত নয়।

‘অথচ এরআগে শুনেছিলাম এই দ্বীপে নাকি কোনো অস্ত্র, বন্দুক নেই। ফিসফিস করে বলল রেমি।

‘আসলে অস্ত্র-আইন শুধু সেইসব নাগরিকদের জন্য যারা আইন মেনে চলে। আমাদেরকে যে-বা যারা আক্রমণ করেছে তারা সেই সভ্য নাগরিকদের কাতারে নেই বলে ধরে নিচ্ছি।’

নদীর বাঁকে কারও নড়াচড়া দেখল ওরা। মাথা নিচু করল ফারগো দম্পতি। দু’জন স্থানীয় লোককে দেখা যাচ্ছে। একজনের হাতে রিভলবার। এখান থেকে প্রায় ৩০০ ফুটে দূরে তারা। এখনও স্যাম ও রেমি দেখতে পায়নি।

স্যাম স্ত্রীকে ফিসফিস করে বলল, ‘পাশের ঝোপে চলল। ওপাশ থেকে ওরা দেখতে পাবে না।

ঝোঁপের ভেতরে আড়াল নিল ওরা। দেখল লোক দু’জন নদীর পাড় ধরে ধীরে ধীরে দক্ষিণ দিকে চলে যাচ্ছে। স্যাম আর রেমি নদীর দু’পাশেই কড়া নজর রাখছে। কোন পাশে কে ওঁত পেতে আছে বলা যায় না। আক্রমণকারী দু’জন আরও কিছুক্ষণ হাঁটাহাটি করে যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে ফিরে গেল। ওরা দৃষ্টিসীমার বাইরে যাওয়ার পর হাঁপ ছাড়ল রেমি। তবে স্যাম ও রেমি কেউ-ই আড়াল থেকে বেরোল না। হয়তো লোক দুটো ব্যাকআপ আনতে গেছে। একটু পর আবার হাজির হবে।

১০ মিনিট অপেক্ষা করল ওরা। কোনো শব্দ শোনার কান টান করে রেখেছে। কিন্তু অস্বাভাবিক কিছুই শুনতে পেল না।

মনে হচ্ছে ওরা চলে গেছে। রেমি ফিসফিস করে বলল।

‘ঠিক। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো এই “ওরা” টা কারা?

হয়তো খনির সাথে জড়িত কেউ হবে। কিংবা বেসামরিক লোক। ম্যানচেস্টার হয়তো এদের কথা বলেই আমাদেরকে সতর্ক করেছিল।

‘হতে পারে। কিন্তু সে তো বলেছিল ওরা নাকি দ্বীপের মাঝখানে থাকে, গুহার ওদিকে।

রেমি নদীর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। বুঝতে পারছি না। আমাদেরকে কেউ কেন রাস্তা থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে চাচ্ছে কিংবা গুলি করে মারতে চাচ্ছে। তারা মিলিশিয়া কিংবা বেসামরিক লোক… যা-ই হোক না কেন… আমরা তাদের কী ক্ষতি করেছি?

চমৎকার প্রশ্ন করেছ।

‘আমরা ২-১ জন বয়স্ক ব্যক্তির কাছ থেকে প্রচলিত লোককাহিনি শুনতে চেয়েছি, ব্যস।

‘জায়ান্টের ব্যাপারে জানতে চেয়েছিলাম আমরা। সেটা ভুলে যেয়ো না। নদীর বাঁকের সর্বশেষ যে স্থানে লোক দুটোকে দেখা গিয়েছিল সেদিকে তাকাল স্যাম। দেখে নিল ভাল করে। মনে হয় কেউ নেই। নিজের ভেজা কাপড়ের দিকে তাকাল। এখানকার আবহাওয়াকে এখন “ভাল” বলতে ইচ্ছে করছে। যা গরম, এই ভেজা পোশাক কয়েক মিনিটের মধ্যে শুকিয়ে যাবে।

‘তা ঠিক। কিন্তু এখান থেকে মেইন রোড তো প্রায় ৬-৭ মাইল দূরে। সে-খেয়াল আছে?

‘আছে, আছে। পায়ে হেঁটে যাওয়াটাই বোধহয় নিরাপদ হবে, কী বলো? নদী সাঁতরে তো যাওয়া ঠিক হবে না। কে যেন বলল, এখানকার অধিকাংশ নদীতেই নাকি কুমীর আছে।’

‘আবার নেগেটিভ চিন্তা?”

‘ওহ, দুঃখিত। এখানকার কোনো নদী-ই কুমীরবিহীন নয়।

হাসল রেমি। এবার কথাটা একটু কম নেগেটিভ শোনাল। দাঁড়াতে গিয়ে টলে উঠল ও। ঘাড় কাত করল।

‘জোরে লেগেছে কোথাও?’

একটু লেগেছে। যারা গাড়ির এয়ার ব্যাগ আর সিট বেল্ট আবিষ্কার করেছিল খোদা তাদেরকে শান্তি দান করুক।’

পেছনে দুমড়ে যাওয়া গাড়ির দিকে তাকাল স্যাম। কপাল ভাল, আমি অতিরিক্ত ইস্যুরেন্স করিয়েছিলাম। আশা করা যায়, ওটা দিয়ে ক্ষয়-ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যাবে।

হয়তো। রেমি নিজের গালে হাত দিল। ফুলে গেছে।

‘এখান থেকে ফেরার দুটো রাস্তা আছে। এক- নদী। দুই- রোড। কোনদিক দিয়ে এগোলে ভাল হবে? অস্ত্রধারীদের মোকাবেলা করে রোড দিয়ে যাবে? নাকি নদীতে নেমে ২০ ফুট কুমীরের সাথে লড়বে? প্রশ্ন করল স্যাম।

তৃতীয় কেন উপায় নেই?

তিক্ত হাসি দিয়ে স্যাম মাথা নাড়ল। নেই।

বয়ে যাওয়া নদীর দিকে তাকাল রেমি। আমি যদি আক্রমণকারী হতাম তাহলে যেখান থেকে আমরা গায়েব হয়েছি ঠিক ওখান থেকে এপর্যন্ত তন্ন তন্ন করে খুঁজে চষে ফেলতাম। ওরাও অনেকটা সেরকম-ই করেছে।

‘ঠিক বলেছ। একটু পরে স্রোত কমে এলে নদীর গভীরতাও কমবে। আমরা তখন নদী পার হয়ে কোনো রাস্তা খুঁজতে পারব।’ বলল স্যাম।

‘পথ তুমি দেখাবে। আর হ্যাঁ, কুমীরের কথা আবার ভুয়ে যেয়ো না।’

“থ্যাঙ্কস। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম!’

ধীরে ধীরে নদী পার হতে শুরু করল ওরা। নদীর পানি একদম পরিষ্কার। কোমর পর্যন্ত পানিতে নেমেও ওরা পা দেখতে পাচ্ছে।

ওপারে পৌঁছে ভেঁজা কাপড় শুকানোর জন্য অপেক্ষা করল ফারগো দম্পতি। তারপর ১৫ মিনিট হেঁটে সৈকতে ফেরার রাস্তায় পৌঁছুল ওরা। দুই ঘণ্টা পর একটা পিকআপ-এর দেখা মিলল। পিকআপটা হাফ লোডেড়। ড্রাইভার রাস্তার মাঝখানে দু’জন আমেরিকানকে দেখেও কোনো অবাক হলো না। কারণ দ্বীপে হরহামেশাই বিদেশি পর্যটকরা আসে। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। ফারগো দম্পতি পিকআপের পেছনে উঠে লিফট নিল।

গাড়িতে ওঠার পর স্যামের কাঁধে মাথা রাখল রেমি।

‘তোমার ঘাড়ের কী অবস্থা? স্যাম জানতে চাইল।

একটা ম্যাসাজ করাতে পারলে খুব উপকার হতো।

‘শহরে গিয়ে দেখি তোমাকে কোনো স্পা সেলুনে ঢুকিয়ে দিতে পারি কিনা।

হুম। যা অবস্থা করে এখানকার লোকজন। ম্যাসাজ সেলুন ভাল ব্যবসা করে নিশ্চয়ই।

ম্যাসাজ নেয়ার আগে লম্বা সময় গোসল করে নিলে বোধহয় ভাল লাগবে।

‘তুমি গোসল করার কথা বলে অন্য কিছু বোঝাতে চাচ্ছ না তো?”

“আরে, না, না। কী বলো। আমি একদম সাদা মনে কথাটা বলেছি, রেমি। খোদর কসম!

স্বামীর আরও ঘনিষ্ঠ হলো রেমি। তাকাল স্বামীর দিকে। এসব বলেই তো শুরু করে প্রতিবার।

হনিয়ারা-র কাছাকাছি চলে আসতেই চুপ হলে গেল স্যাম।

কী করবে এখন?’

‘পুলিশের কাছে যাব। এই ঘটনার রিপোর্ট দেব ওখানে।

“ঠিক আছে। তাহলে ড্রাইভারকে বলল, আমাদেরকে যাতে পুলিশ স্টেশনে নামিয়ে দেয়। কিংবা সেটা সম্ভব না হলে অন্ততপক্ষে যেন বলে দেয় পুলিশ স্টেশনটা কোথায়।

ড্রাইভারের পেছনে থাকা ছোট্ট জানালায় নক করল স্যাম। চমকে উঠে ড্রাইভার কষে ব্রেক করল। হঠাৎ ব্রেক করায় স্যাম ও রেমি ধাক্কা খেল পিকআপের গায়ে।

‘আমাদেরকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যেতে পারবেন? ইংরেজি বলল স্যাম।

ড্রাইভার ইংরেজি না বুঝলেও “পুলিশ” শব্দটা ঠিকই বুঝতে পেরেছে। মাথা নাড়ল সে। পারবে। পিকআপ আবার চলতে শুরু করল।

‘আশা করছি, পুলিশরা শুধু সমাবেদনা জানিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যাবে না। সম্ভবত ওটা একটা ডজ ট্রাক ছিল। সবকিছু এত দ্রুত হয়ে গেল যে নিশ্চিতভাবে বলতেও পারছি না। খেয়াল-ই করতে পারিনি ঠিকভাবে।

পুলিশ স্টেশনের ওয়েটিং রুমে বসে আছে ওরা। এক সার্জেন্ট এসে রিপোর্ট লিখতে শুরু করল। ফারগো দম্পতিকে বেশ বিনয়ীভাবে প্রশ্ন করছে। সে। পুলিশ স্টেশনে এক ঘণ্টা কাটানো পর স্যাম ও রেমি বুঝতে পারল এখানকার পুলিশ বেশ সচেতন। ব্যবহারও ভাল। এরকম একটা দৃর্ঘটনা দ্বীপে ঘটতে পারে এটা তারা আশা করেনি। অফিসার খুব সুন্দর করে বিষয়টা ওদেরকে বুঝিয়ে বলল।

‘এই দ্বীপের যত রেজিস্টার্ড ট্রাক আছে সবগুলো চেক করব আমরা। তবে ওতে অনেক সময় লাগবে। কিন্তু ড্রাইভার যদি ভূয়া হয়ে থাকে, যদি লাইসেন্সপ্রাপ্ত না হয় তাহলে হয়তো তাকে আমরা কখনও খুঁজে পাব না।’

‘ওরা কিন্তু আমাদের উপর গুলি চালিয়ে ছিল। বিষয়টা গুরুত্বর। আক্সিডেন্টের পর আমরা দুজনকে দেখতে পেয়েছি। আমাদেরকে খুঁজছিল তারা।

হ্যাঁ। আপনারদের দেয়া বর্ণনা আমি রিপোর্টে লিখে রেখেছি। দু’জন পুরুষ। স্থানীয় বাসিন্দা। উচ্চতা মাঝারি। বিশেষ কোনো চিহ্ন নেই। জিন্সের হাফ প্যান্ট আর টি-শার্ট পরা ছিল। একজনের পরনে বাদামী টি-শার্ট, আরেকজন ফ্যাকাশে নীল।’ বলল অফিসার। কিন্তু সমস্যা হলো আপনাদের এই বর্ণনা সাথে দ্বীপের প্রায় অর্ধেক লোকের মিল পাওয়া যাবে। যা-ই হোক, আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করব।’ অফিসার মাথা নাড়ল। আপনাদের ভাড়া করা গাড়িটা থেকেও অনেককিছু জানা যাবে বলে আশা করছি। আপনাদেরকে যে ধাক্কা মারা হয়েছিল সেটার প্রমাণ নিশ্চয়ই আছে গাড়িতে। গুলিও হয়েছে বললেন। তাহলে তো গাড়িতে গুলির গর্ত থাকার কথা।

‘হ্যাঁ, আছে। সায় দিল রেমি।

‘তো আপনারা এই দ্বীপে কী জন্যে এসেছেন?

ছুটি কাটাতে এসেছি। স্যাম যতটুকু সম্ভব সত্য কথা বলল।

এখানকার কারও সাথে ঝগড়া হয়েছে? কোনো মতের অমিল কিংবা বিতর্ক?”

না। এখানকার সবাই তো বেশ ভাল। রেমি উত্তর দিল।

‘তাহলে আপনারা বলছেন, আপনাদেরকে খুন করতে পারে এরকম কাউকে আপনারা জানেন না।

না। আসলে সেটার কোনো মানেই হয় না।’ এবার স্যাম বলল।

স্যামের দিকে শক্ত দৃষ্টিতে তাকাল অফিসার। তবে কেউ না কেউ তো অবশ্যই আছে। মিস্টার ফারগো, এই দ্বীপে এরকম ঘটনা হয় না বললেই চলে। আমাদের দ্বীপের লোকজন সবাই শান্তি প্রিয়। এখানে সন্ত্রাসীদের কোনো ছাড় দেয়া হয় না। বিশেষ করে বিদেশি অতিথিদের সাথে এরকম আচরণ তো কোনোভাবেই বরদাস্ত যায় না।’

অফিসারের কথার ধরন শুনে বোঝা গেল বিষয়টা সে স্রেফ পর্যটকদের উপর আক্রমণ হিসেবে দেখছে না। এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে। অবশ্য স্যাম আর কথা বাড়াল না। থানার কাজ শেষে পায়ে হেঁটে হোটলের দিকে রওনা হলো ওরা।

বরাবরের মতো এবারও ফ্রন্ট ডেস্কের স্টাফ ওদের দিকে ভয় মাখা দৃষ্টি নিয়ে তাকাল। হোটেল থেকে বেরিয়ে ওরা যখনই আবার ফিরে আসে প্রতিবারই কোনো না কোনো কাহিনি হয়, আর ওদের চেহারা আর পোশাকেও সেটার ছাপ পড়ে।

‘আমরা তো এখানে কালার হয়ে গেলাম। মিনমিন করে বলল রেমি। ‘এরপর তুমি যদি বাইরে কোথাও যাও, আমি আর যাচ্ছি না।’

স্যাম স্টাফের দিকে তাকিয়ে হাসি দিল। রেমিকে চুপিচুপি বলল, ‘পরেরবার যখন আমি বাইরে যেতে চাইব, তখন তুমি আমার মাথায় ইট দিয়ে বাড়ি মেরে থামিয়ে দিয়ো!

.

১৪.

স্যাম সেলমার সাথে ফোনে কথা বলছে। সেলমা’র কণ্ঠে উত্তেজনা। কল করেছ দেখে খুব খুশি হয়েছি। তবে তোমার নিশ্চয়ই কোনো অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা আছে। এই এক্ষুনি আমি তোমাকে ফোন করতে যাচ্ছিলামতোমাদের কাজের জন্য খোঁজ-খবর নিয়ে যা যা পেয়েছি সেগুলো পাঠাতে চাই। তবে তার আগে একটু বর্ণনা দেব।’

বলল, আমি শুনছি।’

‘তোমার কথামতো সলোমন আইল্যান্ড নিয়ে ইন্টারনেটে খোঁজ শুরু করি। কিন্তু ইন্টারনেটে তেমন কোনো তথ্য নেই বললেই চলে।

‘তারপরও তুমি থেমে যাওনি?’

অবশ্যই না। ইন্টারনেট ঘেঁটে ক্লান্ত হয়ে ভাবলাম এমন ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করতে হবে যারা গোয়াডালক্যানেল-এর ইতিহাস সম্পর্কে জানে। খোঁজ নিয়ে দেখি দ্বীপের অনেকেই বিভিন্ন সময় অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে গিয়ে বাস করেছে। কারণ, দ্বীপের নিকটবর্তী এই দুটো দেশই বেশ উন্নত।

‘ঠিক…’ স্যাম বেশ ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে। এসব ভণিতা শেষ করে সেলমা কখন আসল কথা বলবে।

‘সিডনিতে আমার কিছু বন্ধু আছে। তাদের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম ওই দ্বীপের ইতিহাস সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জ্ঞান রাখেন এক ভার্সিটির নৃতত্ত্ব বিভাগের প্রফেসর। নাম: ড, সিলভিস্টার রোজ। প্রফেসরকে ফোন করলাম আমি। কথা বললাম অনেকক্ষণ। অমায়িক ব্যক্তি।

‘খুব ভাল করেছ।’ বলল স্যাম। মনে মনে আশা করল, সেলমা যেন খুব দ্রুত মূল প্রসঙ্গে কথা বলে।

‘প্রফেসর সাহেব বিগত কয়েক বছর যাবত দ্বীপটাকে নিয়ে গবেষণা করছেন। দ্বীপের সংস্কৃতি, বাসিন্দাদের স্বভাব, লোককাহিনি সংগ্রহ করে আসছেন। তাকে ডুবে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ আর অভিশপ্ত সৈকত নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি কোনো জবাব দেননি। তবে বলেছিলেন, লগ-বুক দেখে জানাবেন। তো গতকাল প্রফেসর আমাকে নিজেই ফোন করে জানালেন, যা খুঁজছিলেন সেটা পেয়েছেন এবং সেগুলো পাঠিয়েও দিয়েছেন আমার কাছে।

তুমি পেয়েছ সেগুলো?

হ্যাঁ। তোমাকে পড়ে শোনাতে চাই।’

স্যাম চোখ বন্ধ করল। তাহলে তো খুব ভাল হয়।

ঠিক আছে, পড়ছি। “… এখানকার একটা গল্প নিয়ে আলোচনা করা একদম নিষিদ্ধ। কিন্তু নিষিদ্ধ হলে যেটা হয় গোপনে গোপনে সবাই সেই গল্প নিয়ে আলোচনা করত। আলোচনা হতো বলেই গল্পটা নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এখনও টিকে আছে। নইলে অনেক আগেই কালের গভীরে হারিয়ে যেত। গল্পটা আমি শুনেছিলাম গোয়াডালক্যানেলের এক কবিরাজের মুখে। স্থানীয় এক সর্দার আমাকে তাঁর সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। ১৯৯৭ সালে তিনি মারা যাওয়ার আগপর্যন্ত বছরে একবার হলেও আমি আর সেই কবিরাজ দেখা করতাম। গতবছর যখন দেখা হয়েছিল তখন একরাতে গল্পটা বলেছিলেন তিনি।”

সেলমা একটু থেমে গলা পরিষ্কার করে নিল। অনেক বছর আগের কথা। শ্বেতাঙ্গরা এই দ্বীপে আসার আগে… তখন দ্বীপ জুড়ে সব স্থানীয় লোকজন বসবাস করত। একজন রাজা ছিল তাদের। তবে সে কোনো সাধারণ রাজা ছিল না। জাদু জানত। সাগর, আকাশ ও ধরণীর দেবতাদের নির্দেশ দিতে পারতো সে। দ্বীপের বাসিন্দাদেরকে নিয়ে এক শক্তিশালী জাতি গড়েছিল। যুদ্ধের ময়দানে তার শক্তির জন্য সবাই পেত, তেমনি প্রজাদের প্রতি উদার মানসিকতার জন্য ভালওবাসত সবাই। রাজার নাম ছিল লক। তাঁর জীবদ্দশায় এই নাম খুব বিখ্যাত ছিল।”

ইন্টারেস্টিং।

‘গল্প তো কেবল শুরু। “একপর্যায়ে রাজা ঘোষণা দিয়েছিল আলিশান ইমারত তৈরি করা হবে। যেরমকটা এরআগে কেউ কখনও দেখেনি। শ্রমিকদের অনেক বছর পরিশ্রমের মাধ্যমে পাথরের সাহায্যে সাগরে একটা ইমারত নির্মিত হলো। রাজা তো আছে। এবার একটা রাণী দরকার। দ্বীপের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করল রাজা। পাত্রীও সম্ভ্রান্ত ঘরের। দ্বীপের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী সর্দারের মেয়ে। কথিত আছে, রাণী খুব সুন্দরী ছিল। ফলে রাজা নিয়ম করে দিয়েছিল কেউ যেন রাণীর দিকে সরাসরি চোখ তুলে না তাকায়। বলা হয়ে থাকে সেখান থেকেই এই দ্বীপের মেয়েদের দিকে সরাসরি চোখ তুলে না তাকানোর রীতি চালু হয়েছে।”

‘আর ভেবেছিলাম লজ্জার কারণে সরাসরি তাকানো হয় না।

‘উঁহু, তা নয়। “ইমারত নির্মাণ শেষ হওয়ার পর একদিন সকালে বেশ ঘটা করে দ্বীপের সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সপ্তাহব্যপী আনন্দ উৎসব করার উদ্দেশে। এরআগে কয়েক মাস ব্যপী বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও বনিকদের কাছ থেকে উপটৌকন সংগ্রহ করেছিল রাজা। যাবতীয় সোনা-দানা, মূল্যবান রতু সব নতুন ইমারতের কোষাগারে রাখা হয়েছিল। রাজা এসব রত্ন প্রদর্শন করছিল সকালের সূর্য উদয়ের সময়। পাশে ছিল তাঁর প্রধান পুরোহিত ও সুন্দরী স্ত্রী। কথিত আছে, দেবতারা রাজার এরকম অহংকার প্রদর্শনে ক্ষিপ্ত হয়ে ভূমিকম্প ঘটান। ওরকম মারাত্মক ভূমিকম্প এরআগে দ্বীপের বাসিন্দারা কখনও দেখেনি। ভূমিকম্পে দ্বীপের অনেক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি রাজার আলিশান ইমারতও সাগরে তলিয়ে যায়। যারা ইমারত দেখতে এসেছিল তাদের অধিকাংশ নিখোঁজ হওয়ার পর অল্প কয়েকজন প্রাণে বাঁচতে পেরেছিল তখন। এই ভূমিকম্পের পর তারা অনুধাবন করল, রাজার অত্যাধিক বাড়াবাড়ির কারণেই এরকম দূর্যোগ দেখা দিয়েছে। প্রাপ্য শাস্তি পেয়েছে রাজা। তাই এরকম রাজার নাম দ্বীপবাসীরা আর কখনও উচ্চারণ করবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। তাঁর নির্মিত ইমারত, মন্দির কোনোকিছুই নিয়ে কোনো কথা বলা চলবে না। সেইসাথে সাগরের ওই অংশকে অভিশপ্ত বলে ঘোষণা করা হয়।” লেখাটা এখানেই শেষ।

‘তাহলে সলোমন আইল্যান্ডের এরকম রীতিনীতি সরাসরি ওই ভূমিকম্পের ফল?

‘সেরকমটাই তো দেখছি। কিন্তু আমি আটকে গেছি একটা বিষয়ে। সেটা হলো, ধন-রতুগুলো দেবতাদের ক্ষীপ্ত হওয়ার একটা মূল কারণ। যেটার পরিষ্কার মানে দাঁড়াচ্ছে, ওই সম্পদগুলোকেও আর ছুঁয়ে দেখার সাহস করেনি।

‘গুপ্তধন। এরকম চ্যালেঞ্জ নিতে আমি কখনওই পিছ পা হইনি। কিন্তু কথা হচ্ছে, এই লোককাহিনির সত্যতা কতটুকু? আদৌ কি কিছু পাওয়া যাবে?

‘প্রফেসর এ-ব্যাপারে আর কিছু জানাতে পারেননি। কারণ পুরো বিষয়টা নিষিদ্ধ জ্ঞান। কবিরাজ তাকে এসব গোপন রাখার শর্তে জানিয়েছিলেন। তাই প্রফেসরের পক্ষে দ্বীপের অন্য কাউকে আর এ-ব্যাপারে জিজ্ঞাস করা সম্ভব হয়নি। প্রায় ১ যুগ ধরে ওখানে যাতায়াত ছিল প্রফেসরের। ওখানকার লোকজনদের সাথে একটা পারস্পরিক বোঝাঁপড়া আর বিশ্বস্ততার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তিনি সম্পর্কটাকে নষ্ট করতে চাননি। কিন্তু গোপন কথা এক কান থেকে দুকান হওয়া মানেই সেটা আর গোপন না থাকা। কবিরাজ হয়তো এভাবে অন্য কাউকেও গল্পটা শুনিয়েছিলেন। আর তিনি নিজেও হয়তো শুনেছিলেন কারও কাছ থেকে। তোমরা যদি ওখানকার লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও এ-ব্যাপারে কিছু জানতে না পারো তাহলে বুঝতে পারবে দ্বীপের বর্তমান প্রজন্ম এই গল্পের ব্যাপারে অজ্ঞ। যারা জানতো তারা মারা গেছে। তাই নতুন প্রজন্ম হয়তো গল্পটা জানে না। কিংবা অতীত জানার ব্যাপারে হয়তো তাদের আগ্রহও নেই।

আপনমনে মাথা নাড়ল স্যাম। হ্যাঁ। যুদ্ধের পর এই দ্বীপে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমাদের প্রধান সমস্যা হলো এখানকার লোকজন ইংরেজি বলতে পারে না। যারা বলতে পারে তারা সংখ্যায় খুব কম। শহরের দিকে থাকে তারা। এসব লোককাহিনি তারা জানে না। তাই আমাদের সীমাবদ্ধতা অনেক বেশি।

‘আচ্ছা, আমি যতটুকু জানতে পেরেছি ততটুকু তোমাকে জানিয়ে দিলাম। তবে প্রফেসর বলেছেন, তুমি যদি তাকে ফোন করো তাহলে উনি আরও কিছু তথ্য জানাবেন। আমি তোমাকে তার নাম্বার আর কিছু কিছু কাগজ স্ক্যান করে পাঠাচ্ছি।’

‘ঠিক আছে। কিন্তু তোমার কী মনে হয়, তাঁর সাথে কথা বলে কোনো লাভ হবে?

‘যতদূর বুঝেছি, তিনি যা জানতেন সব ইতিমধ্যে বলে দিয়েছেন। নতুন করে হয়তো আর কিছু জানাতে পারবেন না। মূলত তোমার সাথে কথা বলতে চাওয়ার পিছনে তার একাডেমিক স্বার্থ আছে। গোয়াডালক্যানেলের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেবেন হয়তো। আমি অবশ্য তাকে এখনও রাজার সেই ইমারতের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার বিষয়টা খোলাসা করে বলিনি।’

‘খুব ভাল করেছ। কথা চেপে রাখতে তোমার জুড়ি নেই।

‘এটা তো আমার কাজের মধ্যে পড়ে, তাই না? কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রফেসরের ই-মেইল অ্যাড্রেস তোমার ইনবক্সে পেয়ে যাবে। আর কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে আমাকে ফোন কোরো। একটু ইতস্তত করল সেলমা। তোমাদের এই অভিযান দ্রুত শেষ হলে আমি খুশি হই। সাবধানে থেকো।’

সম্প্রতি ওদের উপরে হয়ে যাওয়া হামলার কথাটা সেলমাকে জানাবেন না বলে ভাবল স্যাম। কিন্তু বিষয়টা নিজের মাঝে চেপে না রেখে অন্য কাউকে জানানোটা হয়তো নিজের জন্যই মঙ্গল বলে ভাবল ও। ই, আজকের দিন পর্যন্ত সব বেশ ভালই চলছিল।’

‘তো আজ কী হয়েছে?

আমাদেরকে রাস্তা থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে গুলি চালিয়েছিল কারা যেন। এছাড়া দ্বীপটা মন্দ নয়’

সেলমা গম্ভীর হয়ে গেল। তুমি মজা করছ।

সত্য ঘটনা সবসময় কাল্পনিক গল্পের চেয়েও বেশি বৈচিত্রময় হয়।

‘তোমাদের পেছনে কারা লেগেছে?

‘তা জানি না।’

হু। এ-ব্যাপারে আমি কোনো সাহায্য করতে পারি?

‘না মনে হয়। তবে স্টেট ডিপার্টমেন্টকে বিষয়টা জানিয়ে রাখতে পারো। আমরা আবার গুম-টুম হয়ে যাই কিনা!”

খুব সুন্দর চিন্তা-ভাবনা তোমার!

যা-ই হোক, সেলমা। আমাদেরকে নিয়ে দুশ্চিন্তা কোরো না। বরাবরের মতো এবারও আমরা সব ম্যানেজ করে নেব। এখান থেকে নতুন কিছু জানতে পারলে ফোন দেব তোমাকে।’

স্যাম ফোন রাখতেই ওর দিকে তাকাল রেমি। সেলমা তথ্য যোগাড় করতে পেরেছে তাহলে?

‘ওকে কোনোবার ব্যর্থ হতে দেখেছ?”

“হুম, হয়েছে। এবার বলল, ও কী কী বলল।

স্ত্রীকে সব খুলে বলল স্যাম।

‘আমরা শুধু বন্ধুকে সাহায্য করতে এসেছিলাম। এখন দেখা যাচ্ছে গুপ্তধনও পাওয়া যেতে পারে। আমাদের কপালটাই এরকম। তাই না?

‘গুপ্তধনের বিষয়টা সত্য নাকি মিথ্যা, কে জানে। আর হাজার বছরের পুরানো গুপ্তধনের বর্তমানে কী হাল হয়ে আছে তা তো বলা যাচ্ছে না। হয়তো দেখা যাবে, সেগুলো স্রেফ জঞ্জালে পরিণত হয়েছে এতদিনে।

তুমি সোনা আর অন্যান্য রত্নে কথা বলেছ। ওগুলোর তো এখনও অনেক চাহিদা আছে। এখানে এসে কিন্তু একটা সুন্দর পাথর পর্যন্ত আমাদের চোখে পড়েনি। আমি বলি কি, আমরা অফিসিয়ালি এই অভিযানকে ট্রেজার হান্টিং অভিযান হিসেবে নিই। যাকে যাকে জানানো দরকার জানাই।’

স্যাম রত্ন উদ্ধারের বিষয়টাকে অতটা গুরুত্ব দিল না। অবশ্যই। লিওকে সব জানাব।

‘আর তারপর আমরা যদি গুপ্তধন খুঁজে পাই তাহলে সেগুলো হস্তান্তর করব স্থানীয় সরকারের কাছে। ঘাড় ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকাল রেমি। আউ!

‘চলো, ডাক্তারের কাছে যাই।

‘হাসপাতালে যেতে হবে না।’

“মিসেস ফারগো ম্যাডাম, ভুলে যাবেন না আপনি ট্রাকের ধাক্কা খেয়ে গাড়ি নিয়ে নদীতে আছড়ে পড়েছিলেন। কপট রাগ দেখাল স্যাম।

রেমি শ্রাগ করল। উফ! আচ্ছা, বাবা, যাব। কিন্তু কোনো ইনজেকশন নেব না কিন্তু! আগেই বলে দিলাম!

‘সম্ভব হলে তোমার ইচ্ছা অবশ্যই পূরণ করব। কিন্তু না হলে কী আর করা।

“বিশ্বাসঘাতক একটা!

.

১৫.

‘তেমন কিছুই হয়নি। স্রেফ রগে টান লেগেছে। আপনার দৃষ্টিশক্তিরও কোনো পরিবর্তন হয়নি। গুরুত্বর কোনো আঘাতের লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। সবদিক থেকেই বেশ সুস্থ আছেন।’ রেমিকে চেকআপ করে জানাল ডা. ভ্যানা।

ভাল খবর।’ স্যাম বলল।

তবে হুটহাট নড়াচড়া করা যাবে না। চট করে এদিক-ওদিক মাথা ঘোরালে ঘাড়ের ব্যথা আরও বাড়বে। অবশ্য আপনি চাইলে আমি একটা কলারের ব্যবস্থা করে দিতে পারি। গলায় পেঁচিয়ে পরে থাকবেন। সুবিধে হবে।’

ভ্রু কুঁচকাল রেমি। ওই জিনিস আমার মোটেও পছন্দ নয়।’

আসলে কলার গলায় পরতে কারও ভাল লাগে না। যা-ই হোক, পরবেন কি পরবেন না সেটা সম্পূর্ণ আপনার মর্জি। না পরলেও কোনো সমস্যা নেই। মারা যাবেন না। তবে সাবধানে থাকবেন। আপনার ভাগ্য ভাল। ওইরকম একটা দূর্ঘটনার পরও বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন। তার উপর গুলিও চালানো হয়েছিল। অথচ আপনার তেমন কিছু হয়নি। সামান্য একটু আঘাত পেয়েছেন মাত্র। স্যামের দিকে তাকাল ও। আর আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে, আপনার কিছুই হয়নি।’

‘এয়ার ব্যাগগুলো ঠিকঠাকভাবে কাজ করেছিল বলে কিছু হয়নি। বলল স্যাম।

হুম। আচ্ছা, আপনাদের উপর কেন হামলা হয়েছে, সে-ব্যাপারে পুলিশ কোনো সম্ভাব্য কারণ বলেছে?

স্যাম মাথা নাড়ল। না, তেমন কিছু তো বলল না।

যাক, বেশি হতাশ হয়ে পড়বেন না। আমাদের দ্বীপটা কিন্তু বেশ সুন্দর। কিন্তু আপনাদের সামনে শুধু খারাপ দিকগুলোই বেশি পড়ছে। বিষয়টা ব্যক্তিগতভাবে নেবেন না।’

‘হ্যাঁ। কিন্তু আমি একটা বিষয় বুঝতে পারছি না, আমাদেরকেই কেন টার্গেট করা হলো? রেমি এতক্ষণ হাসপাতালের বেডে শুয়েছিল, এখন উঠে বসল।

‘সেটা জানার কোনো উপায় নেই। গুজব আছে পাহাড়ে নাকি অস্ত্রধারী বিদ্রোহীরা থাকে। হয়তো আপনারা তাদের কোনো পরিকল্পনা কিংবা কাজে বাগড়া দিয়ে ফেলেছেন। অথবা এমন কিছু দেখে ফেলেছেন যেটা দেখা ঠিক হয়নি।’

‘যেমন? জানতে চাইল স্যাম।

‘আমার কোনো ধারণা নেই। আমি জাস্ট কিছু ধারণার কথা বললাম। এরআগে আমি এরকম কোনো হামলার কথা শুনিনি। তাই স্রেফ অনুমান নির্ভর কথা বলছি। কেন যেন মানুষ এরকম আক্রমণাত্বক কাজ করে?’ ভ্যানা একটু ইতস্তত করল। আমি এক মহিলার চিকিৎসা করেছিলাম। তার স্বামী ম্যাচেটি দিয়ে কুঁপিয়েছিল তাকে। কোনো কারণ ছাড়াই। মহিলাটা আমাকে বলেছিল, এভাবে কোপানোর কোনো সঠিক কারণ নেই। হয়তো মহিলা এমনকিছু বলেছিল কিংবা করেছিল যেটা খেপিয়ে দিয়েছিল লোকটাকে। ঈশ্বরের কৃপায় মহিলাটা বেচে গিয়েছিল। ওই ঘটনার পর থেকে তার স্বামীকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। সে নাকি পাহাড়ে চলে গেছে। এমনও হতে পারে সেই লোকটাই আপনাদের উপর হামলা করেছে! কে জানে!?

‘আচ্ছা, দ্বীপের বাসিন্দাদের মধ্যে কতজনের গাড়ি আছে?’ রেমি জানতে চাইল।

‘তা তো বলতে পারছি না। এখানকার জনসংখ্যা ১ লক্ষেরও কম। জনসংখ্যার বেশিরভাগই হনিয়ারা-তে বাস করে। আমার মনে হয়, আনুমানিক ৫ হাজার গাড়ি আছে দ্বীপে।

‘তাহলে ওই ট্রাকটাকে খুঁজে বের করাটা তো খুব কঠিন কিছু নয়।

‘তাত্ত্বিকভাবে বিচার করলে আপনার কথা ঠিক। কিন্তু অধিকাংশ ট্রাক গ্রাম্য এলাকায় থাকে। পুলিশ ১ সপ্তাহ ধরে সময় ব্যয় করে একটা ট্রাককে খুঁজে বের করবে বলে মনে হয় না। আবার করলে করতেও পারে। পুলিশ স্টেশন থেকে কি আপনাদেরকে নিশ্চিত করে কিছু বলেছে?

তিক্ত হাসি দিল স্যাম। না, সেভাবে কিছু বলেনি।’

‘তাহলে তো জবাব পেয়েই গেছেন। আমি দুঃখিত। কিন্তু এখানে থাকতে হলে আপনাকে আশা করা ছাড়তে হবে। কোনোকিছুতেই আশা রাখবেন না। ভাল থাকবেন।

স্যাম ও রেমি দরজার দিকে এগোল। আচ্ছা। আর হ্যাঁ, আমাকে চেকআপ করার জন্য ধন্যবাদ।’

ডা. ভ্যানা হাসল। খুব শীঘ্রই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবেন বলে আশা করছি। আপনাদের দু’জনের উপর দিয়েই বেশ ধকল গেছে। কয়েকদিন বিশ্রাম করা উচিত। আপনাদের কী পরিকল্পনা?

‘যেখান থেকে গাড়িটা ভাড়া নিয়েছিলাম সেখানে গিয়ে দূর্ঘটনার ব্যাপারে ব্যাখ্যা দেব। মালিকের গাড়ি এখন আধুনিক শিল্পকর্মে পরিণত হয়ে গেছে কিনা!’ বলল স্যাম।

‘আচ্ছা, বেশ। যা-ই করুন, বিশ্রাম নেয়ার চেষ্টা করবেন। এখানে সুন্দর সৈকত আছে। আয়েশ করুন।

সাথে কুমীরও আছে।

শহরে নেই বললেই চলে। আমি তো বারান্দায় ককটেল ড্রিঙ্ক নিয়ে বসে সূর্যাস্ত দেখি।

***

প্রখর রোদের ভেতর দিয়ে হেঁটে হেঁটে কার রেন্টাল অফিসে গেল ওরা। গাড়ির মালিককে সবকিছু বুঝিয়ে বলল। মালিককে দেখে মনে হলো সে বোধহয় কেঁদেই ফেলবে। বেচারা তার নিশানের এই হাল দেখে খুব কষ্ট পেয়েছে। ফারগো দম্পতি তার কাছ থেকে আরেকটা গাড়ি ভাড়া নেয়ার সাহস করল না। হোটেলে ফেরার আগে পুলিশ রিপোর্টের একটা কপি মালিককে দিল ওরা।

মেইন রোড়ে ওঠার পর রেমির দিকে ঝুঁকল স্যাম। ফিসফিস করে বলল। ‘পেছনে তাকিয়ো না। আমার মনে হয়, আমাদেরকে ফলো করা হচ্ছে।

‘আমার ঘাড়ের যা অবস্থা তাতে আমার পক্ষে পেছনে তাকানো সম্ভবও নয়। কে ফলো করছে?

‘অপরিচিত। সেডানে চড়ে আসছে এক লোক। বিষয়টা আমার চোখে পড়েছে কারণ আমাদের সাথে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে গাড়িটা।’

‘প্রতিবার আমার বাইরে বেরোলেই কোনো না কোনো অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটবেই। তুমি নিশ্চিত, আমাদেরকে ফলো করা হচ্ছে?

‘এক মিনিটের মধ্যেই বুঝতে পারব।’

হাঁটার গতি কমিয়ে দিল ওরা। আশা করল, সেডানও সেটার গতি কমিয়ে দেবে। কিন্তু দিল না। শ্রাগ করল স্যাম। একটু সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়েছি বোধহয়।

‘একটু?

‘রাস্তায় ট্রাকের ধাক্কা আর গুলির মুখ থেকে ফিরে আসার পর এরকমটা হতেই পারে।

হয়েছে। তোমার ধারণা ভুল হয়েছে। খুশি হয়েছি।’

পেছনে তাকাল স্যাম। পথচারীরা সূর্যের হাত থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন ভবনের ছায়ার নিচ দিয়ে পথ চলছে। কেউ ফলো করছে না ওদের। যে যার মতো চলছে।

হোটেলে ফিরে দেখল লিও ওদের জন্য অপেক্ষা করছে লবিতে। ওরা তিনজন পুল বার-এ গেল। সমুদ্র দেখতে দেখতে কথা বলা যাবে। লিও বয়স্ক লোকদের মতো হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে নিজের স্কুবা ডাইভিঙের ট্রেনিঙের ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করল ও। এত কঠিন ট্রেনিঙে লিও খুব বিরক্ত।

সাঁতরে পাক দিতে বলেছে আমাকে। তাও আবার ২০ পাক! আমার ধৈর্যশক্তি পরীক্ষা করতে চায়। ২ পাক দিয়েই আমার অবস্থা কাহিল। ১০ পাক দেয়ার পর মনে হলো আমার শরীর থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।

কিন্তু ২০ পাক তো ঠিকই দিয়েছ।’ বলল রেমি।

‘তোমার মুখে কী হয়েছে? অবশেষে লিও’র চোখে বিষয়টা পড়েছে। ‘কেমন যেন ফোলা ফোলা লাগছে।’

‘ওহ, তোমাকে এখনও বলিনি? কে যেন আমাদের গাড়িকে ধাক্কা মেরে পাহাড় থেকে ফেলে দিয়ে গুলি চালিয়েছিল। স্যাম বলল। রেমি মাথায় একটু ব্যথা পেয়েছে। নদীর স্রোত ঠেলে আমরা পালিয়ে এসেছি।’

লিও এমন একটা ভাব করল যেন ওরা দু’জন পাগল। আরে নাহ। ঠিক করে বলল, কী হয়েছে?

হাসল রেমি। আমি উল্টাপাল্টা বকছিলাম। স্যাম আমাকে মেরে এই হাল করেছে।’

লিও মাথা নাড়ল। তোমাদের দুজনের যে কী হয়েছে কিছুই বুঝতে পারছি না।

“লিও, আমাদেরকে সত্যি সত্যি ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কে বা কারা কাজটা করেছে আমরা সেটা জানি না। আজকে সকালে ঘটেছে এসব।

ওদের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে লিও। মশকরার চিহ্ন খুঁজছে। কিন্তু ফারগো দম্পতির চোখে কোনো ইয়ার্কির চিহ্ন দেখতে পেল না। ‘বিশ্বাস হচ্ছে না।

‘আমি জানি। এই মাত্র পুলিশ স্টেশন আর হাসপাতালে কাজ সেরে এলাম। তবে খারাপ খবরের পাশাপাশি ভাল খবরও আছে। সেটা হলো, ধ্বংসাবশেষের কোথাও গুপ্তধন থাকতে পারে।

‘বলো কী? জানলে কীভাবে?

লিও-কে সব খুলে বলল স্যাম। কিন্তু লিও-কে মোটেও উত্তেজিত মনে হলো না। বরং আরও হতাশ লাগছে।

‘তারমানে, ওটা রাজার বাড়ি? অভিশাপের সাথে এবার গুপ্তধনও যোগ হলো?’

‘তোমার বলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে, এটা খারাপ খবর।’

এতে বিষয়টা আরও জটিল হয়ে গেল। আমার তো মনে হয় এজন্যই তোমাদের উপর হামলা হয়েছে। কবিরাজ ছাড়াও অনেকেই জানতো গল্পটা। গুপ্তধনের বিষয়টা নিশ্চয়ই তারাও জানে। হতে পারে অন্য কেউ এটার পেছনে লেগেছে। ডাইভার থেকে শুরু করে ক্যাপ্টেন যারাই ধ্বংসাবশেষ সম্পর্কে জেনেছে… তাদের মধ্যে থেকে কেউ হয়তো বড় কিছু প্ল্যান করে বসে আছে।

স্যামের দিকে তাকাল রেমি। লিও ঠিকই বলেছে। এখানকার অধিকাংশ লোকই গরীব। এরকম গুপ্তধন পেলে তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যাবে।

‘ঠিক। কিন্তু আমরা তো নিশ্চিতভাবে জানি না আদৌ গুপ্তধন আছে কিনা। কিংবা ঠিক কোথায় আছে। তাছাড়া ভুলে গেলে চলবে না, ৮০ ফুট পানির নিচে রয়েছে ওগুলো। আর পানিতে কুমীর আর হাঙর দুটোরই অবাধ চলাচল। গুপ্তধন কোথায় আছে সেটার হদিস বের করার আগেই আমাদেরকে এখান থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করাটা বোকামি নয়?’ বলল স্যাম।

রেমি মাথা নাড়ল। তুমি বিষয়টাকে জাতিগত বিদ্বেষ হিসেবে দেখছ। কিন্তু আমার মনে হয় আমরা কোনো কিছুতে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছি কিংবা দাঁড়াতে যাচ্ছি। হতে পারে সেটা স্মাগলিং, ড্রাগস কিংবা অন্য কোনোকিছু। সব ধাঁধার উত্তর আমরা পাচ্ছি না। কারণ অনেক কিছু এখনও আমাদের কাছে অজানা রয়ে গেছে।’

মাথা নাড়ল স্যাম। আমরা বউ সবসময় ঠিক কথাটাই বলে। এবারও বলল।

তাহলে আমাদের কী হবে? আমরা এখন কী করব?’ লিও জানতে চাইল।

‘চোখ-কান খোলা রাখা ছাড়া কিছু করার দেখছি না। শিপটা না আসা পর্যন্ত ডাইভও দিতে পারছি না আমরা।’ বলল স্যাম।

‘অপরিচিত লোকদের আমার পছন্দ নয়। তার উপর যারা গুলি করে তাদের তো আরও অপছন্দ।

‘আমিও তোমার সাথে একমত, বন্ধু। কিন্তু আপাতত আমাদের আর কিছু করার নেই। অপরিচিতদের পরিচয় বের করার পেছনে সময় নষ্ট না করে আমরা বরং সম্ভাব্য গুপ্তধন সম্পর্কে আমাদের অর্জিত জ্ঞানকে ভাল ভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করি। আমার মনে হয়, এখানে ডাইভ দিতে এখন বিশেষজ্ঞ ডাইভার প্রয়োজন। কারণ বিস্তর অনুসন্ধানের জন্য জাহাজে থাকা ডাইভার যথেষ্ট নয়। একদম পেশাদার ডাইভার দরকার আমাদের, যাদের বেশ অভিজ্ঞতা আছে।’

লিও মাথা নাড়ল। ওরকম লোকজনকে চেন বলে মনে হচ্ছে?’

হাসল স্যাম। না, ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় নেই সেভাবে। যাদের সাথে পরিচয় আছে তারা সবাই যে যার ব্যক্তিগত প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত। তবে তোক যোগাড় হয়ে যাবে। সেলমাকে বলব। ও সব ম্যানেজ করে দিতে পারবে।’

রেমি স্যামের একটা হাত তুলে নিল। সবসময় স্যাম কোনো না কোনো দারুণ আইডিয়া বের করে। আমিও স্যামের সাথে একমত। এখানে বিশেষজ্ঞ ডাইভার নিয়ে নামা উচিত।’

‘শিপ আসবে কবে?’ লিও প্রশ্ন করল।

কাল সন্ধ্যায়।

‘তাহলে আগামী ২৪ ঘণ্টা নিজেদেরকে নিরাপদে রাখো। খুন হয়ে যেয়ে। এদিকে আমি স্কুবা ডাইভিরে নির্যাতন সহ্য করতে থাকি। কোর্সটা শেষ করতে হবে।’

রেমি হাসল। ভাল বুদ্ধি।

বিশেষ করে “খুন হয়ে যেয়ো না” অংশটুকু শুনতে দারুণ লেগেছে।’ সায় দিল স্যাম।

‘আঁজোপাড়া গায়ে আর যাচ্ছি না।’ রেমি সাফ সাফ জানিয়ে দিল।

‘হুম। এখানে প্রতিদিন আমাদের সাথে কোনো না কোনো অঘটন ঘটেই।’

‘আর কালকে নতুন একটা দিন আসছে। অর্থাৎ, আবার নতুন কোনো অঘটন।

‘কিন্তু হিসেব করে দেখলাম, আজকেই দুটো অঘটন ঘটে গেছে। ট্রাকের ধাক্কা খেয়ে পাহাড় থেকে নদীতে পড়া আর গুলিবর্ষণ। সেহিসেবে আশা করা যায়, কালকে কোনো অঘটন ঘটবে না।

‘আগে দেখি কী হয়। তারপর তোমার কথা বিশ্বাস করব।’

১৬. সিডনি, অস্ট্রেলিয়া

১৬.

সিডনি, অস্ট্রেলিয়া

কনফারেন্স রুমে নিজের এক্সিকিউটিভ চেয়ারে বসে আছে জেফরি গ্রিমস। রুমে থাকা অন্যান্য ব্যক্তিদের দিকে তাকাল সে। সবাই চিন্তিত। টানা তৃতীয়বারের মতো তার কোম্পানী লোকসান গুনতে যাচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্য জগতের এক উজ্জ্বল নাম জেফরি গ্রিমস। উচ্চমাত্রার ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসায়ে বাজিমাত করার জন্য সে বহুল পরিচিত। কিন্তু বর্তমান অর্থনীতির সাথে পাল্লা দিয়ে কোম্পানীকে লাভের মুখ দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরাও এখন আর তার কোম্পানীতে টাকা দিতে ভরসা পাচ্ছে না।

দুই বছর আগেও অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি বেশ স্বাস্থ্যবান ছিল। বাতাসে টাকা উড়ত। প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার যোগ হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ান অর্থনীতিতে। কিন্তু গ্রিমস তখন ভুল সিদ্ধান্তের কারণে পিছিয়ে পড়ল। খনি আর পেট্রোলিয়াম সেক্টরে টাকা বিনিয়োগ করে লাল বাতি জ্বলে গেল তার ব্যবসায়।

কোম্পানী এখন বিভিন্ন ঋণে জর্জরিত। অস্ট্রেলিয়ার বিজনেস কিং জেফরি গ্রিমস এখন টিকে থাকার জন্য ধুকছে।

নিজের ব্যাকব্রাশ করা চুলে আঙুল চালাল গ্রিমস। আচ্ছা, আমরা কিছু অপ্রয়োজনীয় জিনিস অন্য কোম্পানীর কাছে বিক্রি করতে পারি না? অন্তত যেটুকু ক্ষতি হয়েছে সেটুকু হয়তো পুষিয়ে যেত।

প্রধান ফাইন্যানশিয়াল অফিসার কার্টিস পার্কার মাথা নাড়ল। ব্যালান্স শিটে কোনো কিছুর ট্রান্সফারের হদিস পেলে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ আমাদের উপর হামলে পড়বে। তারা জানতে চাইবে জিনিসগুলো কোথায় গেল। অনেক ঝামেলা হবে তখন। এবারের লোকসানটা আমাদেরকে সহ্য করে নিতে হবে। আশা করা যায়, পরেরবার আমরা লাভের মুখ দেখব।’

গ্রিমস ভ্রু কুঁচকাল। তাহলে ধুঁকতে থাকা কোনো প্রজেক্টের গতি কমিয়ে কিংবা বাড়িয়ে দিলে কেমন হয়? কিংবা অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির দোহাই দিয়ে কোনো লুকোচুরি না করেও তো অন্য কোম্পানীর কাছে আমাদের অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো বিক্রি করে দিতে পারি? যদিও জিনিগুলোর প্রকৃত মূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি করে দিতে হবে। তারপরও বর্তমান পরিস্থিতির স্বার্থে…’

হাসল পার্কার। না, আমরা সেটা পারি না। আমরা ওয়াল স্ট্রিট ব্যাংক নই। ওসব খেলা আমাদের মানায় না। সবাই আশা করে আমরা আমাদের কাজে সৎ থাকব।’

গ্রিমস টবিলে কলম ঠুকল। বেশ। স্টকে কী পরিমাণ ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে? অবস্থা যত জঘন্যই হোক আমি জানতে চাই।’

‘১৫%, তবে আগামী ১ সপ্তাহের মাঝে লোকসান পুষিয়ে যাবে। আমি কিছু ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ করেছি। তারা আমাদের সাথে আকর্ষণীয় রেটে ব্যবসা করতে রাজি হয়েছে। এতে আমাদের দু’পক্ষেরই লাভ হবে।’ স্প্রেডশিটের উপর নজর বুলাল পার্কার। কিন্তু সমস্যা হবে ঋণশোধ করতে গিয়ে। সবার ঋণ একসাথে শোধ করার মতো অবস্থায় নেই আমরা। ধীরে ধীরে টাকা আসবে। কিন্তু পাওনাদাররা কেউ-ই সিরিয়ালে পিছে থাকতে চাইবে না। সবাই চাইবে নিজের পাওনাটা সবার আগে বুঝে নিতে।’

এক সুন্দরী তরুণী কনফারেন্স রুমে মাথা ঢুকিয়ে গ্রিমসের দিকে তাকাল।

বল, ডেব?’ প্রশ্ন করল গ্রিমস।

আপনার প্রাইভেট লাইনে ফোন এসেছে। কলার জানালেন, বিষয়টা জরুরী… আপনি কি কলটা আশা করছিলেন?

গ্রিমসের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। হ্যাঁ, হ্যাঁ। রুমের উপরে চোখ বুলাল সে। জেন্টেলম্যান, আমি একটু আসছি, ওকে?’ কেউ তাকে কোনো সাড়া দিল না। রুম থেকে বেরিয়ে ডেবের পিছু পিছু এগোল গ্রিমস। ডেব মেয়েটা বেশ লম্বা। ওর হাঁটার গতি দেখে মনে হলো লম্বা লম্বা পা ফেলে যেন হাঁটছে না, জগিং করছে!

‘লাইন নাম্বার দুই। গ্রিমসকে নিজের অফিস রুমে ঢুকতে দেখে বলল ডেব। গ্রিমস মাথা নেড়ে অফিস রুমে ঢুকে দরজা আটকিয়ে দিল। এক্সিকিউটিভ চেয়ারে বসে ফোনটা কানে ধরল সে।

‘হ্যালো। গ্রিমস বলল।

যে ফোন করেছে তার কণ্ঠস্বর একদম সমতল, পুরুষ নাকি নারী বোঝ যাচ্ছে না, কোনো একটা সফটওয়্যারের মাধ্যমে নিজের কণ্ঠকে আড়াল করে রেখেছে। গ্রিমস যতবার এই রহস্যময় কলারের সাথে কথা বলেছে সবসময় একই অবস্থা।

‘আমাদের দ্বন্দের তীব্রতার বৃদ্ধির প্রথম পদক্ষেপ নেয়া হয়ে গেছে। দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ান আর সলোমন পত্রিকাগুলোতে এইড কর্মীদের নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে আর্টিকেল প্রকাশিত হবে। সাথে থাকবে মিলিশিয়াদের দাবী দাওয়াগুলো।

‘যাক, অবশেষে কিছু ভাল খবর পাওয়া গেল। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পর সবকিছুর সমাধান করবেন কীভাবে? ভেবে রেখেছেন?

‘দূর্ভাগ্যবশতঃ কর্মীরা সেটা করতে পারবে না। তবে এখানে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বেড়ে যাবে। পরিস্থিতি ঠিক করার ব্যাপারে আমরা চিন্তিত নই। সেটা সরকার বুঝবে। কিন্তু আমরা খুব ভাল করেই জানি এই সরকারের কিছু করার ক্ষমতা নেই।’

তাতে কাজ হবে?

‘সেটা সময়ই বলে দেবে।

‘আমার ধারণা, এই কৌশল কাজ না করলে সেক্ষেত্রে আপনি বিকল্প কোনো পরিকল্পনা করে রেখেছেন।

‘অবশ্যই রেখেছি। কিন্তু সেটার ব্যাপারে জানতে চাইবেন না।’

“ঠিক আছে, চাইব না। যা করতে হয় করুন।

করব। তবে আপনি টাকা দিতে ভুলবেন না যেন। আমি অপেক্ষায় আছি।’

‘ধরে নিন, পেয়ে গেছেন।

ওপাশ থেকে ফোন রেখে দিল। নিজের হাতে থাকা ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল গ্রিমস। এরকম চুক্তি এরআগে সে কখনও করেনি। অস্বস্তি হচ্ছে আবার উৎফুল্লও লাগছে ওর। ১ বছর আগে কলার তাকে ফোন করে একটা প্রস্তাব দেয়: কিছু অনৈতিক কাজে সহায়তা করলে সলোমন আইল্যান্ডের পরবর্তী সকল ইজারার দায়িত্ব গ্রিমসের কোম্পানীকে দেয়া হবে। তেল, গ্যাস, খনিজ পদার্থ যা খুশি উত্তোলন করার সুবিধা পাবে।

গ্রিমস প্রথমে ভেবেছিল কেউ ফাঁকা বুলি ছাড়ছে। কিন্তু ওপাশের বক্তা যখন সোনার খনি বন্ধ করে দেয়ার শপথ করল তখন একটু নড়েচড়ে বসেছিল গ্রিমস। লোকটি তার কথা রেখেছিল। বর্ষা মৌসুমে বন্যার পানিতে খনিতে পানি ঢুকে পড়ায় সত্যি সত্যি বন্ধ হয়ে গেল সোনার খনি। কারণ এরকম বিপর্যয় এড়ানোর জন্য খনিতে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল সেগুলো ঠিকভাবে কাজ করেনি কিংবা করতে দেয়া হয়নি।

এঘটনার পরপরই সরকার দ্বীপে বিদেশি অপারেটরদের যাবতীয় প্রজেক্ট বন্ধ করে দেয়। যার ফলে বন্ধ হয়ে যায় সোনার খনির সম্ভাবনাময় দরজা।

এসবের পর কলারের প্রতি আস্থা আসে গ্রিমসের। সে তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে এপর্যন্ত মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়েছে। সলোমন আইল্যান্ড কোম্পানীকে বিদেশি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য ডলারগুলো খরচ করেছে গ্রিমস।

প্ল্যানটা একদম ডাল-ভাত। বিদ্রোহী দলকে অর্থ সহায়তা দিয়ে দ্বীপে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে বর্তমান সরকারকে উৎখাতের পর নতুন সরকার স্থাপন করা। তারপর সেই সরকারের কাছ প্রচুর ব্যবসায়িক সুযোগ সুবিধা নিয়ে দ্বীপে চুটিয়ে ব্যবসা করা।

পরিকল্পনাটা যদি ঠিকভাবে কাজ করে তাহলে শত শত মিলিয়ন ডলার মূল্যের তেল আসতে যাচ্ছে গ্রিমসের হাতে। ডলারের বন্যা বয়ে যাবে।

তবে সব বড় বড় প্রজেক্টের মতো এই প্রজেক্টেও “পাঠা বলি দিতে হচ্ছে। যেখানে শত শত মিলিয়ন ডলারের ব্যাপারে সেখানে কয়েকজন এইড কর্মী আর দ্বীপের স্থানীয় লোকদের মৃত্যু কিছুই নয়। জীবনে বড় কিছু হতে গেলে “নরম” হলে চলে না। যেখানে টাকার অংক যত বড় সেখানে নোংরামি তত বেশি।

দ্বীপে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ওখানকার অবস্থা যা-ই হোক তাতে গ্রিমসের কিছু আসে যায় না। সে স্রেফ তার ব্যবসায়িক স্বার্থের দিকে নজর রাখছে। হাজার হোক, সে একজন ব্যবসায়ী।

নিজের অফিস রুমের চারদিকে নজর বুলাল গ্রিমস। বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ও সেলিব্রেটিদের সাথে ভোলা ছবি শোভা পাচ্ছে দেয়ালে। ব্যবসায়ী সংগঠন থেকে বিভিন্ন পুরষ্কার ও ক্রেস্টও আছে। একদম শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করে এই অবস্থানে এসেছে গ্রিমস। এত সম্পদ এত ঐশ্বর্য কখনও সৎ পথে উপার্জন করা সম্ভব নয়। বিপুল সম্পদের মালিক হতে হলে অবশ্যই বাকা পথ অবলম্বন করতে হয়। সিডনি হারবারের দিকে তাকিয়ে সন্তুষ্টির হাসি হাসল গ্রিমস। রাস্তার সাধারণ লোক আর তার মধ্যে পার্থক্য এতটুকুই… দৃষ্টিভঙ্গি আর সাহস। যেখানে সুযোগ উঁকি দিয়েছে সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়তে গ্রিমস কখনও দ্বিধা করেনি। অথচ সাধারণ লোকরা ঝুঁকির কথা ভেবে ইতস্তত করে সময় নষ্ট করে।

কজিতে পরা দামী প্লাটিনাম ঘড়িতে সময় দেখল গ্রিমস। মানুষ-জন মরছে তাতে সে কোনো অনুশোচনাবোধ করল না। প্রতিদিন পৃথিবীতে কতজনই তো মারা যাচ্ছে। দিন শেষে লাভটাই আসল।

এটাই ব্যবসা।

.

১৭.

গোয়াডালক্যানেল, সলোমন আইল্যান্ড

স্যাটেলাইট ফোনটা চালু করে মেসেজ চেক করল স্যাম। সেলমা মেসেজ পাঠিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান রিসার্চ শিপ ডারউইন আজ দুপুরের মধ্যে হনিয়ারা পোর্টে ভিড়বে। স্যাম সময় চেক করে ক্যালিফোর্নিয়ায় মেসেজ পাঠিয়ে সেলমাকে জানাল শিপটা যখন আসবে তখন উপস্থিত থাকবে ওরা।

গতকাল সন্ধ্যায় পুলিশ হোটেল এসেছিল। স্যাম ও রেমিকে আরও কিছু জিজ্ঞাসাবাদের পর আশ্বাস দিয়ে গেছে, অপরাধীদেরকে ধরা হবে। যদিও স্যামের বর্তমান চিন্তা জুড়ে সমুদ্রের নিচে থাকা ধ্বংসাবশেষ ঘুরপাক খাচ্ছে। কতখানি সফল হতে পারবে কে জানে।

কী দেখছ?’ রেমি প্রশ্ন করল। পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল স্যামকে।

‘কিছু না, নিজের দুশ্চিন্তা স্ত্রীকে জানিয়ে উদ্বেগ বাড়াল না স্যাম। রিসার্চ শিপ খুব শীঘ্রি চলে আসবে।

আচ্ছা। ভাল খবর।

স্যাম স্ত্রীর দিকে ফিরল। ঘাড়ের কী অবস্থা?

যদি বল ডাইভ দিতে পারব না কিনা… উত্তর হবে- পারব।’

ওর গাল পরীক্ষা করল স্যাম। রেমির গালে এখনও আঘাতের চিহ্ন আছে। স্যাম হাসল। সকালের নাস্তা খাওয়ার জন্য তৈরি তুমি?

‘আমার হাসি-খুশি বরের সাথে?

হু। আচ্ছা, লিও’র কী অবস্থা?

‘ডাইভ নিয়ে ব্যস্ত। মুখে যত যা-ই বলুক। আমার মনে হয়, সে ভাইভিং ঠিকই উপভোগ করছে।’

‘আমারও তা-ই ধারণা। কিন্তু তুমি যে এটা বুঝতে পেরেছে সেটা যেন লিও টের না পায়।

ঠিক আছে।’

রেমিকে নিয়ে হোটেলের রেস্টুরেন্টের দিকে এগোল স্যাম। বরাবরের মতো সেই একই টেবিলে লিও বসে আছে। কফি খাচ্ছে। কিন্তু ওর মুখের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হলো ইঁদুরের বিষ মেশানো আছে কফিতে। ফারগো দম্পতিকে এগোতে দেখে হাসল লিও। ওর হাসিতে কোনো রস নেই।

‘গুড মর্নিং, বন্ধু! লিও’র পিঠে চাপড় মারল স্যাম। তোমাকে বেশ ফ্রেশ দেখাচ্ছে।

মদ গিলেছ বোধহয়, ভুল-ভাল দেখছ। যেটা খেয়েছ ওটা আমিও খেতে চাই।’ ব্যঙ্গ করল লিও।

‘আমার মনে হয় এই আইল্যান্ডের সৌন্দর্য তোমার উপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। উজ্জ্বল দেখাচ্ছে তোমাকে।’ লিও মুখোমুখি চেয়ারে বসতে বসতে বলল রেমি।

‘আচ্ছা! তুমিও খেয়েছ? তাহলে আমিও দুইবার খাব!’ লিও গজগজ করল। লিও রেগে গেলেও রেমি নিজের হাসি লুকোতে পারল না।

ভাল খবর এনেছি আমরা।’ বলল স্যাম।

‘তাই?’ লিও চোখের এক ভ্রূ উঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল।

‘ডারউইন আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এখানে এসে ভিড়বে। তারপর আমরা পুরোদমে অনুসন্ধানে নামব। কীরকম স্কুবা ডাইভিং শিখলে সেটার কারিশমা দেখানোর সুযোগ পাবে তুমি।

‘আমি বাজি ধরে বলতে পারি, লিও পানিতে মাছের মতো সাঁতার কাটতে পারবে। রেমি চাপা মারল।

মাছ না ছাই! আমি পুলে নেমে একটু-আধটু সাঁতার কাটতে পারি, এই পর্যন্তই।

‘আরেকটা সুখবর আছে। সেলমা সকালে ফোন করেছিল। বলল, চারজন সাবেক নৌ-বাহিনির ডাইভারকে পাঠাচ্ছে ও। তারা আগামীকাল এখানে এসে পৌঁছুবে।’ বলল স্যাম।

তিনজন একমত হলো শিপটা যখন পোর্টে ভিড়বে তখন ওখানে হাজির থাকবে ওরা। তবে লিও’র এখনও আর একটা ডাইভ দেয়া বাকি আছে। এই ডাইভটা শেষ করতে পারলে ও সার্টিফিকেট পাবে। কথা শেষ করে লিও পার্কিং লটের দিকে হাটা ধরল। ওর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল রেমি।

‘তোমার বন্ধু কি সবসময়-ই এরকম আজব টাইপ আচরণ করে?’ রেমি জিজ্ঞাস করল।

‘আমি ওকে যতদিন ধরে চিনি এরকমটাই দেখে আসছি। মজার বিষয় হলো ওর জীবনটা কিন্তু বোরিং নয়। যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং। কিন্তু তারপরও সে এরকম মুখ হাঁড়ি করে থাকে কেন, কে জানে।

কপাল ভাল আমি ওরকম হুতুমমার্কা মানুষকে বিয়ে করিনি।’

‘তোমাকে বিয়ে করার পর কেউ মুখে হাসি না এনে থাকতে পারতো?

দাঁত বের করে হাসল রেমি। খুব কথা শিখেছে, না?

***

হনিয়ারা পোর্ট তেল আর গ্যাসের ট্যাঙ্কে বোঝাই। বাতাসে পেট্রোলিয়ামের দূর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। নাক কুঁচকিয়ে স্যামের দিকে ঝুঁকল রেমি।

‘খুব সুন্দর জায়গা, তাই না?

‘আশা করা যায় এখানকার কেউ ম্যাচ কিংবা লাইটার জ্বালাবে না। জ্বালালেই আমরা সোজা পরপারে পৌঁছে যাব।

৫ মিনিট পর লিও হাজির হলো।

ডাইভিং কেমন হলো তোমার?’ জিজ্ঞাস করল স্যাম। লিও’র চুল এখনও ভেজা।

‘জান নিয়ে এখানে আসতে পেরেছি তো? এবার বুঝে নাও কেমন হয়েছে।’

স্যামের স্যাটেলাইট ফোনে আওয়াজ হলো। ব্যাকপ্যাক থেকে বের করল স্যাম। অপরিচিত নাম্বার।

‘হ্যালো?’ বলল ও।

‘শুভ দুপুর! স্যাম ফারগো বলছেন?’ কলারের অস্ট্রেলিয়ান উচ্চারণ এতটাই প্রকট যে ইংরেজি বোঝাই কঠিন। তার উপর বক্তার ওখানে প্রচুর বাতাস আর মোটরের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।

‘জি, বলছি।

‘আমি ক্যাপ্টেন ডেসমন্ড ফ্রান্সিস। সবাই আমাকে ডেস বলে ডাকে। আপনি যদি তৈরি থাকেন তাহলে দেখা করব আপনার সাথে।

“হ্যাঁ, আমরা হনিয়ারা পোর্টে আছি।’

চমৎকার। ১০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাব আমরা। ছোট একটা নৌকা পাঠিয়ে দেব ওটাতে চড়ে বসবেন।

তা বসব। কিন্তু আপনার জাহাজ চিনব কীভাবে?

হাসল ডেস। আমাদের জাহাজকে চেনা খুবই সহজ। টকটকে লাল হাল আর হিংস্র দেখতে জাহাজটা।’

“ঠিক আছে। আমরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছি।’

ক্যাপ্টেন ডেস ঠিকই বলেছেন। ডারউইন-এর যে চেহারা তাতে এই জাহাজকে চেনা খুব কঠিন কিছুই নয়। নিওন লাল রঙে রঞ্জিত জাহাজ। সামনের অংশে হাঙর মাছের মুখ আঁকা। মুখটা হাঁ করে রয়েছে। হলুদ রঙের দাঁতও আঁকা রয়েছে এতে। তবে দাঁতগুলো অতিমাত্রায় বড় জাহাজটা দেখে হাসল রেমি। স্যামকে কনুই দিয়ে গুতো দিল।

‘এটা কী জাহাজ ডেকে এনেছ?

‘দোষ দিতে হলে সেলমাকে দাও।

জাহাজের ডেক থেকে ক্রেন দিয়ে একটা ২০ ফুটি ছোট নৌকা নামিয়ে দেয়া হলো। নৌকাটা ফাইবারগ্লাসে তৈরি। পানি ঠেলে চটপট পোর্টে এসে ফিরল ওটা।

নৌকার পাইলটের বয়স ২০ এর একটু বেশি হবে। এলোমেলো চুল মাথায়। চুলগুলো বেশ বড়। একটা ধাতব মই দিয়ে উঁচু পোর্টের সাথে নৌকার সংযোগ স্থাপন করল সে। পোর্টে উঠে এলো। মুখে হাসি।

‘শুভ দুপুর। উঠবেন?’

‘হ্যাঁ। স্যাম জবাব দিল।

নৌকায় ওঠার পর নিজের পরিচয় দিল তরুণ।

‘আমার নাম কেন্ট। কেন্ট ওয়ারেন। আমি মূলত ডারউইন-এর ডাইভ মাস্টার। জাহাজে ওঠার পর সবার সাথে হাত মেলাব। আপাতত যাওয়া যাক। দ্রুতগতিতে পানি কেটে এগোতে শুরু করল ওরা।

ডারউইনের কাছে গিয়ে ওরা দেখল রিসার্চ শিপ হিসেবে এটা একদম প্রথম শ্রেণির জাহাজ। রুক্ষ সমুদ্রের সাথে লড়াই করে যাত্রা করার জন্য একে নির্মাণ করা হয়েছে। পানি থেকে বো অনেক উঁচুতে। পাইলট হাউজে অ্যান্টিনার ব্যবস্থা আছে। ব্রিজ থেকে লাল শার্ট পরিহিত এক ব্যক্তি ওদেরক দিকে হাত নাড়ল।

জাহাজে ওঠার পর লাল শার্ট পরা লোকটির দিকে এগোল ওরা। ইনি ক্যাপ্টেন ডেস। ক্যাপ্টেন নিজের পরিচয় দেয়ার পর বাকি ক্রুদের সাথেও পরিচয় করিয়ে দিল। তার মেট এলটন সিমস ডেকের নিচের অংশ ঘুরিয়ে দেখাল সবাইকে।

‘এগুলো অতিথিদের কেবিন। সাইটে অনুসন্ধান চলাকালীন সময়ে আপনারা জাহাজে দিন কাটাবেন নিশ্চয়ই।’ বলল সিমস। এর ইংরেজি উচ্চারণেও অস্ট্রেলিয়ান টান প্রকট। বোঝা মুশকিল।

ব্রিজের দিকে এগোল ওরা। চওড়া কনসোলের সামনে ক্যাপ্টেন ডেস দাঁড়িয়ে রয়েছে। জিপিএস ও চার্টে চোখ রেখেছে সে। লিও ও ফারগো দম্পতিকে আসতে দেখে সিমসকে দায়িত্ব দিয়ে সরল ডেস।

‘আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো?’ রেমি জানতে চাইল।

মাঝে একটু সমস্যা হয়েছিল। কোরাল সমুদ্রের ওখানে ২০ থেকে ৩০ ফুটি জাহাজ অনায়াসে পার করা গেলেও এতবড় জাহাজ নিয়ে আসা একটু ঝক্কির ব্যাপারে। যা-ই হোক, অক্ষত অবস্থায় নিয়ে আসতে পেরেছি এতেই শুকরিয়া।’ বলল ডেস।

‘আমরা তো সাইটে ডাইভ দিয়ে ধ্বংসাবশেষের ম্যাপ তৈরি করব। এই দ্বীপে পর্যাপ্ত গিয়ার নেই। আশা করি, আপনাদের জাহাজে যথেষ্ট পরিমাণ গিয়ার আছে?

ডেস মাথা নাড়ল। “আছে। কম্প্রেসর, রিব্রেদারর্স, ওয়েট স্যুট, ড্রাই স্যুট, একটা সাবমারসিবল, রোবটিক ক্যামেরা… সব।

‘বেশ। আগামীকাল আমাদের সাথে আরও কয়েকজন ডাইভার যোগ দেবে।’ বলল স্যাম। তাহলে আমরা নিজে দলবদ্ধভাবে আরও বেশি কাজ করার সুযোগ পাব।’

‘যত গুড় তত মিঠা। আচ্ছা, জাহাজটা আপনাদের কতদিন লাগবে?

বলা মুশকিল। কমপক্ষে ২ সপ্তাহ তো লাগবেই। কাজের গতির উপর নির্ভর করছে।’

‘তাহলে আমি আমার ক্রু আর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরকে বিষয়টা জানিয়ে দেই। যথেষ্ট রসদ আছে আমাদের কাছে। দ্বীপ থেকে কিছু ফল আর সবজি আনলেই হয়ে যাবে। তাছাড়া সমদে মাছের অভাব নেই। আপনাদের যতদিন প্রয়োজন হয় আমরা এখানে থাকতে পারব।’

ব্রিজের দুইপাশে থাকা বিভিন্ন সরঞ্জাম ও গিয়ার দেখাল ক্যাপ্টেন। দুই বছর আগে পুরো সেট জাহাজে স্থাপন করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় জিনিস অথচ জাহাজে নেই, এরকম হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।’ কথাগুলো বলার সময় বেশ গর্ব প্রকাশ পেল ক্যাপ্টেনের কণ্ঠে।

‘আসলেই দারুণ।’ রেমি সায় দিল।

সাইটে পৌঁছে বৃত্তাকারে ঘুরতে শুরু করল ডারউইন। কমপ্লেক্সের বাইরের কিনারায় অ্যাঙ্কর ফেলতে বলল ক্যাপ্টেন। কাছাকাছি ফেলতে হবে যাতে ডাইভ করতে সুবিধা হয় আবার একটু দূরত্বও রাখতে হবে যাতে অঙ্করের কারণে কোনো ক্ষতি না হয় নিচের ভবনগুলোর। চারজন ডাইভার অনুসন্ধানে নামার জন্য তৈরি হতে শুরু করল।

ডাইভাররা পানিতে নামার পর ব্রিজে থাকা মনিটরে চোখ রাখল সবাই। মনিটরে সবকিছু দেখা যাচ্ছে। ডাইভারদের মাথায় থাকা হেলমেটে ক্যামেরা বানো রয়েছে, রঙিন ছবি আসছে সেখান থেকে সরাসরি দেখার পাশাপাশি হার্ডডিস্কে জমা হচ্ছে ফুটেজগুলো। প্রয়োজনে পরবর্তীতে পর্যবেক্ষণ করা। যাবে। স্যাম ও রেমি যখন নেমেছিল তখনকার চেয়ে এখন পানি বেশ পরিষ্কার। হালকা আলোতে পুরো কমপ্লেক্সটাকে ভূতুড়ে লাগছে এবার।

‘ওই তো ওখানে। সবচেয়ে বড় হচ্ছে ওটা। আর ওটার চারপাশে বাকিগুলো ছড়িয়ে আছে।’ বলল লিও।

বুঝলাম। হয়তো মূল ভবনের সাথে আশেপাশেরগুলো মন্দির, সভাসদ আর চাকরদের বাসস্থান।’ রেমি বলল।

‘৪০ টা হবে? নাকি আরও বেশি?’ প্রশ্ন করল ডেস।

‘তা তো হবেই। এরআগে আমরা এতগুলো দেখতে পাইনি। পানি পরিষ্কার ছিল না। ১০০ জন থাকার ব্যবস্থা ছিল হয়তো। তবে সংখ্যাটা নির্ভর করছে প্রতি ভবনে কতজনের জায়গা ছিল তার উপর। স্যাম বলল।

‘অদ্ভুত ব্যাপার। যুদ্ধের সময়ও এটা আবিষ্কৃত হয়নি। বলল সিমস।

‘সবার মনোযোগ অন্যদিকে ছিল তখন। প্রযুক্তিও এত উন্নত ছিল না। পানির নিচে কিছু খুঁজে বের করাটা বিরাট চ্যালেঞ্জিং ছিল।’ বলল রেমি। মনিটরের দিকে তাকাল ও। গত ৭০ বছরে আমরা অনেক এগিয়ে গেছি।’

কর্মপরিকল্পনা ঠিক করেছেন আপনারা?’ ক্যাপ্টেন জানতে চাইল।

সামনে এগিয়ে এলো লিও। আমি করেছি।’ সাইটের ম্যাপ বানানোর বিষয়ে বিস্তারিত জানাল সে। স্যাম ও রেমি কয়েকবার একে অপরের দিকে তাকাল। লিও যতই মুখ হাঁড়ি করে থাকুক কাজের বেলায় সে খুবই দক্ষ। নিজের কাজটা সে খুব ভাল বোঝে। লিও’র কথাবার্তা শুনে অস্ট্রেলিয়ান ক্যাপ্টেন সন্তুষ্ট, সেটা বলাই বাহুল্য।

হঠাৎ মনিটরে দুটো হাঙর দেখা গেল। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান ডাইভাররা সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ করল না।

‘দেখেছেন?’ মনিটরে আঙুল দিয়ে নির্দেশ করে দেখাল ডেস! হাঙররা সাধারণত ডাইভারদেরকে ঘাটায় না। একটু বুদবুদ কিংবা শব্দ করলে দশবারে নয়বারই হাঙররা পালিয়ে থাকে।

বাকি একবারে কী ঘটে? লিও জানতে চাইল।

‘তখন পাওয়ারহেডের সাহায্য নিতে হয়।’ বলল ক্যাপ্টেন। পানিতে ডাইভ দিতে নামলে টিমের একজনের কাছে ওটা থাকবেই। স্পেয়ারগানের মতো দেখতে জিনিসটা।

‘জেনে খুশি হলাম। বলল লিও।

‘কিন্তু ওগুলো ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়ে না বললেই চলে।

কুমীরের ক্ষেত্রে কীরকম কাজ করবে?’ রেমি জানতে চাইল।

হাঙরের মতোই। পাওয়ারহেড কিন্তু গুলি করে না। ওটা টার্গেটকে দাহ্য গ্যাস দিয়ে বিস্ফোরিত করে। তাই ছোট্ট একটা রাউন্ড দিয়েও বিরাট প্রাণীকে কাবু করা যায়। বিষয়টা খুলে বলল ক্যাপ্টেন ডেস।

‘জিনিসটা সেদিন ব্যবহার করতে পারলে ভাল হতো।’ স্যাম আফসোস করল। ক্যাপ্টেনকে জানাল সেই ২০ ফুটি কুমীরের হামলার কথা।

তাই নাকি? ২০ ফুট? উত্তরে ওরকম পাওয়া যায় শুনেছি। কিন্তু এখানে? তো ভিকটিমের কী অবস্থা হয়েছিল?

‘এক পা হারিয়েছে।

‘আহা রে। ঠিক আছে, ডাইভারদেরকে এ-ব্যাপারে সর্তক করে দিচ্ছি। তবে অস্ট্রেলিয়ান পানিতে কাজ করার সুবাদে আমরা প্রায় সবকিছু দেখে ফেলেছি। দুনিয়ার অন্য যেকোন দেশের তুলনায় অস্ট্রেলিয়ার পানিতে মারাত্মক প্রাণী বেশি বাস করে। প্রাণীর কথা বাদ দিলাম। পাইন গাছের ফলও আপনার জীবন নিয়ে নিতে পারে। একেকটা পাইনের ওজন ১০ কেজি! ৩০ মিটার উঁচু থেকে যদি আপনার মাথায় এসে সেটা পড়ে তাহলে কী হতে পারে ভাবুন! হাসল ডেস। সামান্য গাছেই এই অবস্থা। তাহলে কী অবস্থা পানিতে?’

মাথা নাড়ল স্যাম। আমরা অস্ট্রেলিয়ায় কয়েকবার গিয়েছিলাম। দেশটা দারুণ। আমাদের ভাল লেগেছে। ঘড়ি দেখল ও। আচ্ছা, আমরা শহরে ফিরব কীভাবে?

‘আমাদের এখানে একটা হালকা নৌকা আছে। স্কিফ বলা হয় ওটাকে। সিমস আপনাদেরকে ওতে করে নামিয়ে দিয়ে আসবে।

লিও’র দিকে তাকাল স্যাম। তুমি এখানেই থাকবে?

‘থাকি, সেটাই ভাল। এখনই তো থাকার সময়।

শেষবারের মতো মনিটরের দিকে তাকাল স্যাম। ডুবে যাওয়া ভূতুড়ে শহরের অবয়ব দেখা যাচ্ছে ওতে।

তা তো অবশ্যই। ঠিক জায়গামতো রয়েছ তুমি। একদম স্পটলাইটে।

.

১৮.

পরদিন সকালে আমেরিকান ডাইভারদেরকে রিসিভ করতে এয়ারপোর্টে গেল স্যাম ও রেমি। ব্রিসবেন থেকে হনিয়ারা পর্যন্ত চার্টারড প্লেনের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে ৩০ ঘণ্টা সময় লেগেছে ডাইভারদের। ফারগো দম্পতি ভাবল ডাইভাররা অনেক ক্লান্ত থাকবে। কিন্তু ওদের ধারণা ভুল। ডাইভারদের সবাই বেশ চটপটে। কেউ-ই ক্লান্ত নয়। দলের সবচেয়ে লম্বা ব্যক্তি এগিয়ে এলো ফারগো দম্পতির দিকে। কোনো আড়ষ্টতা ছাড়াই হাত বাড়িয়ে দিল।

‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ফারগো? আপনাদের সাথে দেখা হয়ে ভাল লাগল। আমি গ্রেগ টরেস আর ও হচ্ছে রব আলডারম্যান। পাশের ব্যক্তিকে দেখিয়ে বলল সে। রব মাথা নাড়ল।

‘ধন্যবাদ। আমি স্যাম আর ও রেমি। গ্রেগ-এর সাথে হাত মেলাতে মেলাতে বলল স্যাম।

‘আর ওরা হচ্ছে স্টিভ গ্রোনিগ ও টম বেচলি। বাকি দু’জনের সাথে গ্রেগ পরিচয় করিয়ে দিল। এরা দু’জন বয়সে বেশ তরুণ। তবে এদের ৪ জনের কারও বয়সই ৩০-এর বেশি হবে না। এরা সবাই নেভি-এর সাবেক সদস্য। দেহের গড়ন দেখেই স্যাম বুঝতে পারল হাঙর পানিতে যেরকমটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে এরাও পানিতে ঠিক সেরকমটাই বোধ করবে।

কাস্টম ও ইমিগ্রেশন স্টাফরা ওদেরকে ডাইভ গিয়ার ও ড্যাফেল ব্যাগগুলো পরীক্ষা করার পর পাসপোর্টে সিল মারল। ডাইভারদেরকে দেখে মাথা নাড়ল এক স্টাফ।

‘সাবধানে থাকবেন। শহরের বাইরে না যাওয়াই ভাল, হ্যাঁ? এইড কর্মীদের সাথে কী হয়েছে সেটা জানেন বোধহয়। শহরের বাইরে যাওয়া নিরাপদ নয়।’ বলল স্টাফ।

কী হয়েছে তাদের?’ রেমি জানতে চাইল। গতকাল ওরা জানতে পেরেছে। দু’জন অস্ট্রেলিয়ান নিখোঁজ। কিন্তু বিস্তারিত কিছু এখনও পর্যন্ত জানে না।

ইন্টারনেটে সব আছে। বিদ্রোহীরা ধরেছে ওদের। স্টাফ আবার মাথা নাড়ল। খুব খারাপ ঘটনা। বিদ্রোহীরা ওদেরকে খুন করার হুমকি দিয়েছে, খুন করেই ফেলবে।’

‘এইড কর্মীদেরকে খুন করবে? তারা তো এখানে দ্বীপবাসীদের সাহায্য করার জন্য এসেছে।

‘গর্দভ বিদ্রোহীরা সেটা বোঝে না। দ্বীপের যেকোন খারাপ ঘটনার কারণে বিদেশিদেরকে দায়ী ভাবে ওরা। ওদের ভাষ্য, বিদেশিরা দ্বীপ ছেড়ে চলে যাক। যদি না যায় তাহলে কপালে দুঃখ আছে।’

‘তাই তারা নিরস্ত্র সমাজকর্মীদেরকে অপহরণ করছে? দ্বীপের অনুন্নত বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করছিল এইড কর্মীরা। আর সেই কর্মীদেরকে ওরা খুন করবে? অবিশ্বাস নিয়ে বলল রেমি।

‘ওরা তো সেরকমটাই জানিয়েছে। পাগল সব। গর্দভও।

স্যাম ডাইভারদের দিকে তাকাল। আপনারা একদম ঝড়ের মধ্যে এসে পড়েছেন বলে মনে হচ্ছে। এসব অনাকাঙ্খিত ঘটনাগুলো এতদিন ছিল না।’

‘সমস্যা নেই। আমরা আমাদের খেয়াল রাখতে পারব।’ একদম সহজ গলায় বলল গ্রেগ। স্যাম তার কথায় বিশ্বাস রাখল।

আপনারা সবসময় শিপেই থাকবেন। আশা করা যায়, স্থানীয় কোনো সমস্যা আমদের অনুসন্ধান কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।

গ্রেগ কিছু বলল না। স্রেফ কাঁধ ঝাঁকাল।

স্যাম ও রেমি অন্য একটা এজেন্সি থেকে টয়োটা ভাড়া করে এনেছে। সবাই তাতে মালপত্র লোড করে চড়ে বসল। পথে কয়েকটা চেকপোস্ট পার হলো ওরা। গাড়ি সার্চ করার পর পুলিশরাও ওদেরকে সতর্ক করে দিল যাতে শহরের বাইরে না যায়।

রেমির দিকে তাকাল স্যাম। সবাই খুব বিচলিত, তাই না?

‘তা তো হবেই। কপাল ভাল। সেদিন এইড কর্মীদের মতো হাল হয়নি আমাদের।’

পোর্টে পৌঁছে স্কিফের জন্য অপেক্ষা করল ওরা। ব্যাগ থেকে রেমি একটা রেডিও বের করে শিপের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করল।

‘শুভ সকাল, আপনাদের দু’জনকে’ বলল ক্যাপ্টেন ডেস। স্কিফে চড়ার জন্য তৈরি?

তৈরি। তবে আমরা এখানে ৬ জন আছি। আর আমাদের সাথে যে পরিমাণ গিয়ার আছে সেটা আপনার স্কিফকে ডুবিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।

‘জায়গা হয়ে যাবে।’

মূল রিসার্চ শিপে ওঠার পর নতুন অতিথিদেরকে গেস্ট রুম দেখাল সিমস। স্যাম ও রেমি যোগ দিল ক্যাপ্টেন ডেস ও লিও’র সাথে! ব্রিজে রয়েছে ওরা।

একটা ছবি পর্যবেক্ষণ করছে লিও।

‘আমাদের অনুপস্থিতিতে কিছু কাজ করেছ বলে আশা করছি।’ স্যাম বলল।

মাথা নাড়ল ডেস। দু’বার ডাইভ দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে আমরা একটা সুন্দর ম্যাপ বানিয়ে ফেলেছি। লিও ছবিগুলো দেখছেন। যাতে আমরা গোছানোভাবে প্রত্যেকটা বিল্ডিঙে কাজ করতে পারি।’

ছবিতে লিও টোকা দিল। যতটুকু দেখলাম, তাতে বুঝেছি, এটাই সবচেয়ে বড় ধ্বংসাবশেষ। এখান থেকেই আমরা শুরু করব। এর আকার অনায়াসে অন্যগুলোর চেয়ে দ্বিগুণ। বিষয়টা গুরুত্বর বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করছে।’

একটু কাছে এলো রেমি। ঠিক।’

স্যাম মাথা নাড়ল। আমরা এখন যেটার ছবি দেখছি, এর অবস্থান একদম পূর্ব অংশে।

‘এটার আকৃতি অন্যগুলোর তুলনায় ভাল। পরেরবার ডাইভ দিয়ে আমরা খুব ভাল করে পর্যবেক্ষণ করব।’ বলল লিও।

ডাইভ মাস্টার কেন্ট ঢুকল ভেতরে। শুভ সকাল, সবাইকে। এইমাত্র নতুন অতিথিদের সাথে দেখা করলাম। খুব সিরিয়াস নোক ওনারা।’

পানির নিচ থেকে তোলা ছবিগুলোকে একটু দূরে ঠেলে দিয়ে লিও উঠে দাঁড়াল। আমি আজ রাতের ভেতরে এই বড় ইমারতের উপরের দিকটা যতদূর সম্ভব পরিষ্কার করে নিতে চাই। পানিতে বেশি লোক নামলে কাজটা দ্রুত করা যাবে।’

‘একদম ঠিক বলেছেন। আমি পানির নিচে কতক্ষণ থাকতে হবে সেটার একটা হিসেব করে দেখছি। তারপর একটা রুটিন বানানো যাবে।’ বলল কেন্ট ওয়ারেন।

‘সারফেস থেকে সাপ্লাই দেয়ার মতো কয়টা এয়ার রিগ আছে আমাদের?

মাত্র দুটো। আমরা সাধারণত গভীর পানিতে থাকি তাই ওগুলো খুব একটা ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু এবার দরকার পড়বে।

‘আচ্ছা। তবে আমরা কিন্তু ইমারতগুলোর কোনো ক্ষতি করতে চাই না। পরিষ্কারের কাজটা খুব সাবধানে করতে হবে। আর সবকিছু রেকর্ড করতে হবে। যাতে পরে দেখা যায়। লিও মনে করিয়ে দিল।

অবশ্যই করা হবে।

আধাঘণ্টা পর, ডেকের কম্প্রেশর আওয়াজ করছে। ওয়ারেনের ক্রুরা নেমেছে পানিতে। কম্প্রেশরের সাহায্যে তাদেরকে বাতাস সরবরাহ করা হচ্ছে। আমেরিকা থেকে দু’জন ডাইভারও যোগ দিয়েছে তাদের সাথে। অবশ্য স্কুবা গিয়ার নিয়ে নেমেছে তারা। ধীরে ধীরে ধ্বংবাশেষের দিকে এগোচ্ছে সবাই। লিও, স্যাম, রেমি ও ক্যাপ্টেন ডেস মনিটরে ওদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে।

সব ডাইভারদের সাথে লাইট সংযুক্ত করা থাকায় ধ্বংসাবশেষ দেখতে তেমন কোনো অসুবিধে হচ্ছে না। তার উপর হাই রেজুলেশন ক্যামেরায় ধারণ করা হচ্ছে সব। দৃশ্যগুলো একদম ঝকঝকে।

সামনে এগিয়ে থাকা এক ডাইভার ভাল্ব ঘুরিয়ে হাই প্রেশার বাতাস প্রয়োগ করতে শুরু করল ইমারতের গায়ে। বিভিন্ন সামুদ্রিক জঞ্জাল পরিষ্কার হতে শুরু করল।

লিও অনেক গবেষণা করে ইমারত পরিষ্কার করার এই বুদ্ধি বের করেছে। এতে ভবনগুলোর কোনো ক্ষতি হবে না আমার কাজের কাজও হবে। ওর সাথে ক্যাপ্টেন ডেস আরও একটু বুদ্ধি যোগ করে কম্প্রেশর জুড়ে দিয়েছে। কম্প্রেশরের সাহায্যে হাই প্রেশারের বাতাস সরবরাহ করা হচ্ছে শিপ থেকে।

পানির নিচে বর্তমান দৃষ্টিসীমা মাত্র ১ ফুট। ইমারতের গা থেকে জঞ্জাল পানিতে মিশে দৃষ্টিসীমা কমিয়ে দিয়েছে। সব ডাইভার একত্রে কাজ করে কয়েক মিনিটের মধ্যে বিশাল লাইমস্টোন ব্লক পরিষ্কার করল।

আরও দু’ঘণ্টা পর যথেষ্ট পরিমাণ দেয়াল পরিষ্কার করার পর যেটা বের হলো সেটা কম করে হলেও ১০০ ফুট দীর্ঘ।

‘এ তো বিশাল। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, এরকম ভবন এই দ্বীপের বাসিন্দারা বানিয়েছিল। ফিসফিস করে বলল লিও। দ্বীপের বর্তমান অবস্থা দেখে মনেই হয় না এরকম কিছু বানানোর সামর্থ্য ছিল এদের।

মনিটর থেকে চোখ সরিয়ে রেমি ডেসের দিকে তাকাল। আপনি কি ডাইভারদের সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন?

‘হ্যাঁ, পারব।’

‘তাহলে তাদেরকে বলুন, তারা যতটুকু পরিষ্কার করেছে সেটার সবচেয়ে দূরবর্তী ডান অংশে যেন ক্যামেরা জুম করে।

মাইক্রোফোনে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিল ডেস। ক্যামেরা ডান দিকের ব্লকে জুম করার পর হাসল স্যাম ও রেমি। লিও মাথা নাড়ল। “চিহ্ন আঁকা মনে হচ্ছে। আর আমি যদি ভুল না করি তাহলে ওটা সমুদ্র দেবতার খুঁটি। রেমি বলল। আর ওদিকে দেখুন। একসারি লোকের ছবি আঁকা। বিভিন্ন বাক্স নিয়ে এগোচ্ছে তারা।

রেমির দিকে লিও বাঁকা চোখে তাকাল। ডেস তার কণ্ঠ পরিষ্কার করে বলল, ‘তাতে কী বুঝায়?

হাসল রেমি।

যদিও আমি চিহ্নগুলো পড়তে জানি না। তবে মনে হচ্ছে, এখানে একদল যোদ্ধা মন্দিরে কিছু একটা নিয়ে যাচ্ছে।

‘কিছু একটা?’ লিও বলল।

রেমি ফিসফিস করে বলল, ‘গুপ্তধন। দেবতাদের জন্য।

.

১৯.

সন্ধ্যার শেষ নাগাদ সবচেয়ে বড় ইমারতের উপরের দিকের বেশিরভাগ অংশ পরিষ্কার করা হয়ে গেল। প্ল্যান হয়েছে, রাত দশটা পর্যন্ত পানির নিচে ফ্লাডলাইট জ্বালিয়ে কাজ করা হবে। ক্লান্তি এড়াতে বদলি ডাইভার পাঠানো হবে শিপ থেকে। স্কিফে চড়ে পোর্টের দিকে রওনা হলো স্যাম ও রেমি। ওদের এখানে কোনো কাজ নেই, তাই চলে যাচ্ছে।

পোর্টে পৌঁছুনোর পরও ডারউইনের দিকে তাকিয়ে আছে স্যাম।

কী ভাবছ?’ রেমি জানতে চাইল।

‘চোখের সামনে থেকে পুরো সভ্যতা যদি কোনো চিহ্ন না রেখেই বিলীন। হয়ে যায় তাহলে কেমন লাগবে বলো তো?”

‘আমি নিশ্চিত। বড় কোনো ভূমিকম্পের ফলেই এই হাল হয়েছে। কেউ তখন খুব বেশি কিছু অনুভব করার কিংবা ভাবার সময় পায়নি।

হয়তো তোমার কথাই ঠিক। কিন্তু আমি এখন বুঝতে পারছি কেন বেঁচে যাওয়া লোকজন এই জায়গাটাকে অভিশপ্ত বলে ঘোষণা করেছে। অভিশাপ ছাড়া আর কী বলে তুমি এত বড় দুর্যোগের ব্যাখ্যা দেবে বলো?

হুম, তা ঠিক। আচ্ছা, ওখানকার চিহ্নগুলো দেখে কী বুঝলে?

সবমিলিয়ে গুপ্তধনের ব্যাপারে নির্দেশ করছে চিহ্নগুলো। আসল বিষয়টা আমরা খুব শীঘ্রি জানতে পারব।’

দ্বিধাগ্রস্ত দৃষ্টিতে স্যামের দিকে তাকাল রেমি। অনেক বড় এরিয়া পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কয়েক বছর লেগে যাবে পুরোটা পরিষ্কার করে বিস্তারিত অনুসন্ধান করতে। কোনো গুপ্তধন উদ্ধার করা হয়তো এখন আর সম্ভব নয়।

‘মিসেস ফারগো, সলোমন উপভোগ করছি ঠিকই কিন্তু এখানে কয়েক বছর থাকার কোনো খায়েশ নেই আমার। এমনকী আপনার তো সুন্দরী সাথে থাকলেও নয়, বুঝেছেন?

হুম। সবকিছু তো লিও মোটামুটি বুঝে নিয়েছে। আমরা তাহলে পুরো বিষয়টাকে এখন ওর হাতে ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে পারি?

পোর্ট থেকে রওনা হয়েছে ১০ মিনিটও হয়নি পুলিশের রোডব্লক উদয় হলো। গাড়ি থামাল স্যাম। ৬ জন পুলিশ অফিস দাঁড়িয়ে রয়েছে। ৪ জন ওদের দুজনের কাছে এসে পাসপোর্ট দেখতে চাইল। বাকি দুজন তল্লাশি করতে শুরু করল গাড়ির ভেতরে।

‘ব্যাকপ্যাকে কী আছে? স্যামের ব্যাগ দেখিয়ে প্রশ্ন করল সিনিয়র অফিসার।

‘তেমন কিছু না। একটা ফোন, ক্যান্টিন, বাড়তি শার্ট… এইতো।

‘দেখি।’

‘বাইরে ড্রাইভে বেরোনো ঠিক হয়নি আপনাদের। সার্চ শেষ করে বলল অফিসার। সাবধানে থাকবেন। এমনকী হনিয়ারাও নিরাপদ নয়। যেখানে সেখানে যা খুশি ঘটে যেতে পারে।

‘সকালে তো সবকিছু বেশ ছিল।

অফিসার চোখ সরু করল। হুম, কিন্তু এইড কর্মীদের খুনিদেরকে এখনও ধরা সম্ভব হয়নি। জনগণ অস্বস্তিতে রয়েছে। আপনাদের জায়গায় আমি হলে সোজা হোটেলে চলে যেতাম। আর বেরোতাম না।’

‘তাহলে কর্মীরা মারা গেছে? বিস্মিত হয়ে রেমি জানতে চাইল।

সায় দিয়ে মাথা নাড়ল অফিসার। সন্ধ্যায় প্রচারিত হয়েছে খবরটা। কর্মীরা সবাই নিরস্ত্র ছিল। এখানকার দুস্থ লোকজনদের সেবা করত।’

‘এখন দুস্থ পরিবারগুলোর কী হবে?

অফিসার ত্যাগ করে ভ্রু কুঁচকাল! এইড কর্মীদের মধ্যে কেউ যদি এখনও এখানে থেকে সেবা করতে চায় সেক্ষেত্রে আমরা হয়তো নিরাপত্তা দেয়ার চেষ্টা করব। তবে মনে হয় না, কেউ এখানে এরপরও থাকতে চাইবে। দুস্থদের কী হবে সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। যা-ই হোক, আপনারা দেখে-শুনে গাড়ি চালাবেন। আমাদের মতো এরকম অফিসিয়াল গাড়ি না দেখলে সেই রোডব্লকে থামবেন না। কোথাও থামার আগে নিশ্চিত হয়ে নেবেন।

রাস্তায় আরেকটা রোডব্লক পেরিয়ে হোটেলে এসে পৌঁছুল ফারগো দম্পতি। তবে পথে খেয়াল করে দেখেছে দ্বীপের বাসিন্দারা ওদের গাড়ির দিকে অসন্তুষ্ট হয়ে তাকিয়ে ছিল। যদিও কেউ কিছু বলেনি তারপরও বোঝা যাচ্ছে বিদেশিদেরকে এখানকার লোকজন আর পছন্দ করছে না। পার্কিং লটে থাকা সিকিউরিটি গার্ডের মুখ পেঁচার মতো দেখাচ্ছে। ওরা দু’জন আশংকা করছিল হোটেলের সামনে হয়তো দ্বীপবাসীদের জটলা দেখতে পাবে। কিন্তু না, নেই। হয়তো হোটেলটা থানার একদম কাছে, তাই কেউ জটলা করার সাহস করেনি।

লবিতে ঢুকতেই ফ্রন্ট ডেস্ক ক্লার্ক ওদেরকে ইশারা করল। ওরা এগিয়ে গেলে মাপা হাসি দিল মেয়েটা। জানাল, ওদের বস দেখা করতে চেয়েছে। অপেক্ষা করতে হবে।

একটু পর বস হাজির হলো। তার পরনে পরিপাটি সুট।

‘শুভ সন্ধ্যা, মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ফারগো। আমি জ্যাকব ট্রেঞ্চ। এখানকার ম্যানেজার। আশা করি, আপনারা আমাদের হোটেলটা উপভোগ করছেন।

রেমি মাথা নাড়ল। হ্যাঁ, সবকিছু সন্তোষজনক।’

‘ভাল, ভাল। নার্ভাসভঙ্গিতে নিজের জুতোর দিকে তাকাল জ্যাকব। ‘আপনাদের সাথে পরিচিত হওয়ার ইচ্ছা ছিল। তাই দেখা করলাম। সেইসাথে এখন যেটা বলব তার জন্য অগ্রীম ক্ষমা চাইছি। আমরা আমাদের অতিথিদের পরামর্শ দিচ্ছি, তারা যেন হোটেলের বাইরে না যায়। শহরের অবস্থা খুব একটা ভাল না… তাই বাইরে যাওয়া নিরাপদ নয়।

তাই নাকি? বলল স্যাম। তা এখানে কী কোনো বাড়তি নিরাপত্তা আছে?

‘এক্সট্রা সিকিউরিটি আসছে। আমাকে ভুল বুঝবেন না। বিপদের আশা করছি না আমরা। জাস্ট সতর্কতা অবলম্বন করছি। বর্তমান অস্থিতিশীল পরিবেশে সুযোগ নিয়ে যে-কেউ অনেক কিছু করে ফেলতে পারে…’ জ্যাকবের ইংরেজিতে অস্ট্রেলিয়ান টান স্পষ্ট বুঝতে কষ্ট হলেও তার দুশ্চিন্তাটা ঠিকই বোধগম্য হলো।

‘আপনি কি ভাবেন, সত্যি বিপদ হতে পারে? জানতে চাইল রেমি।

‘ভাগ্য পরীক্ষা না করতে যাওয়াটাই ভাল। আমার রেস্টুরেন্টে আসুন। এক বোতল শ্যাম্পেন খাওয়া আপনাদেরকে।

স্যামের দিকে তাকাল রেমি। উনি তো আমাকে ফ্রি শ্যাম্পেনের লোভ দেখাচ্ছেন, স্যাম।

স্যাম হাসল। মন্দ কী। এখন বলো, শ্যাম্পেনে দাওয়াতে যাবে কিনা?”

মাথা নাড়ল ট্রেঞ্চ। কয়টায় ডিনার খেতে আসছেন আমাকে বলুন। আমি সবকিছু রেডি করে রাখব।’

‘ধরুন… সাতটার দিকে।

“ঠিক আছে। আপনাদের সাথে কি কোনো গেস্ট থাকবে?

না।

কথা শেষ করে রুমের দিকে এগোল ফারগো দম্পতি। রেমির কানে ফিসফিস করল স্যাম। লবিতে একলোক পত্রিকা পড়ছিল, খেয়াল করেছ? খাকি প্যান্ট পরা। স্থানীয়।’

না। সর্তকবাণী শোনায় ব্যস্ত ছিলাম। অন্য কোনোদিকে খেয়াল করতে পারিনি।’

‘লোকটাকে দেখে মনে হলো, আমাদের ব্যাপারে বেশ আগ্রহী।

হু।

স্যাম দাঁত বের করে হাসল। অবশ্য তুমি যখন হেঁটে যাও তখন অনেক পুরুষই তোমার দিকে তাকিয়ে থাকে। এটা নতুন কিছু নয়।’

নিজের কোঁচকানো কারগো প্যান্ট আর টি-শার্টের দিকে তাকাল রেমি। ‘এই পোশাকে আমাকে খুব সুন্দরী লাগছে, তাই না?

‘আমার কাছে তো হেব্বি লাগছে।’

‘অ্যাই শোনো, মিষ্টি কথায় আমাকে তুমি বোকা বানাতে পারবে না, বুঝেছ, মিস্টার স্যাম ফারগো?

আমি অবশ্য ‘ফ্রি শ্যাম্পেন খাইয়ে বোকা বানানোর কথা ভাবছিলাম।

***

সন্ধ্যা ৭ টার একটু আগে রুম থেকে লবিতে নামল ওরা। কিন্তু সেই লোকটাকে কোথাও দেখতে পেল না। জ্যাকবের রেস্টুরেন্টের দিকে এগোল স্যাম ও রেমি।

রেস্টুরেন্টের স্টাফ বুকিং লিস্টে ওদের দুজনের নাম খুঁজে পেয়ে অমায়িক হাসি দিল। ওদের জন্য নির্ধারিত টেবিলের দিকে নিয়ে গেল সে। পুরো রেস্টুরেন্ট ভর্তি লোকজন। যেতে যেতে স্যামের হাত আঁকড়ে ধরল রেমি। অরউন ম্যানচেস্টার একটা টেবিলে বসে আছে। তার টেবিলে এক তাক কাগজপত্র আর একটা বিয়ার রাখা। রেমিকে দেখতে পেয়ে হাত নাড়ল অরউন।

‘দেখো দেখি কাণ্ড! আমাকে ফলো করছেন নাকি আপনারা? হাসতে হাসতে বলল অরউন ম্যানচেস্টার।

‘পৃথিবীটা অনেক ছোট, তাই না?’ রেমি বলল।

হয়তো অতটা ছোটও নয়। আজ রাতে অল্প কয়েকটা রেস্টুরেন্ট খোলা আছে। তা আপনাদের যদি কোনো বিশেষ পরিকল্পনা না থাকে তাহলে আমার সাথে বসুন। আশা করি, আমি আপনাদের রোমান্টিক ক্যান্ডেললাইট ডিনারে উটকো সমস্যার সৃষ্টি করছি না।

হেসে মাথা নাড়ল রেমি। না, না, তেমন কিছুই নয়। স্যাম তুমি কী বলে? ‘বসি।’ রেমির জন্য একটা চেয়ার বের করল ও।

‘আজকে রাতে আপনারা শহরের বাইরে না গেলেই ভাল হয়। ওরা দু’জন বসার পর বলল ম্যানচেস্টার। বাইরের পরিবেশ ভাল।’

‘হ্যাঁ, আমাদের ম্যানেজেরাও তা-ই বলল। দু’জন বিদেশিকে খুন হয়েছে বলে এতটা বাজে অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার কারণ কী?’ জানতে চাইল রেমি।

‘দেখুন, গোয়াডালক্যানেলের অধিকাংশ লোকজন গরীব। তবে জনসংখ্যার কিছু অংশ সচ্ছল। এখানে মাঝেমধ্যে এরকম পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এরমধ্যে একটা সংগঠন আছে যারা ঘোর বিদেশি বিদ্বেষী। বিদ্রোহীরা নিজেদের কাজ হাসিল করার জন্য এবার বিদেশিদেরকে টার্গেট করেছে। আর গরীব লোকজন সুযোগ পেলে নিজেদের খারাপ অবস্থার জন্য অন্যকে দোষারপ করে। এটাই গরীবদের স্বভাব। ম্যানচেস্টার মাথা নেড়ে জানাল।

‘এই বিষয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বেশ পরিষ্কার বলে মনে হচ্ছে। বলল স্যাম।

বিয়ারের বোতলের দিকে তাকাতেই অরউনের মনে পড়ল অর্ডার দিতে হবে। ওয়েটারকে ডেকে আরও দুটো বিয়ার অর্ডার দিল সে। রেমি নিজের জন্য একটা সোডা অর্ডার করল।

অর্ডারকৃত ড্রিঙ্কসের সাথে শ্যাম্পন দেখতে পেয়ে অবাক হলো ওরা।

‘আপনাদের স্বাভাবিক কাজকর্মে বাগড়া দেয়ার কথা বলে আমি নিজেও স্বস্তি পাচ্ছি না। কিন্তু এখানকার পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত কিছু করার নেই। রেমির দিকে তাকাল অরউন, দৃষ্টিটা এবার আগের চেয়ে নরম। ‘আমি চাই না এত সুন্দর একটা উঁটি কোনো বিপদের মুখে পড়ক।’

আমরাও সেরকমটাই শুনে আসছি। কিন্তু এখন তো অনেক দেরি হয়ে গেছে। অনেক দূর থেকে বন্ধুকে সাহায্য করতে এসেছি আমরা। প্রজেক্টটা তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের জন্যও। বলল স্যাম।

কিন্তু ম্যানচেস্টার স্যামের কথায় পাত্তাই দিল না। এখান থেকে সিডনি যেতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা লাগে। ওখানকার রেস্টুরেন্টে নাকি এই মৌসুমে খুব সুস্বাদু খাবার পাওয়া যায়।

‘আসলে ঘটনাস্থলে বিপদের আঁচ টের পেয়ে লেজ গুটিয়ে পালানোটা আমাদের স্টাইল নয়। রেমি বলল।

‘অবশ্যই সেরকম নন আপনারা। কিন্তু আমি স্রেফ একজন বন্ধু হিসেবে পরামর্শ দিচ্ছি। আসলে পরিস্থিতি খারাপ হলে মানুষের অন্ধকার দিকটা বেরিয়ে আসে। কোনোভাবে দ্বীপের অবস্থা অবনতি হলে যারা ঘাপটি মেরে আছে তারা বেরিয়ে আসবে। খারাপ পরিস্থিতে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে নেবে তখন। তাই বিপদের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে এখানে না থেকে নিরাপদ দূরত্বে থেকে এসব দেখাই মঙ্গল।

‘আপনার যুক্তি আমরা মেনে নিলাম। নিজের গ্লাস উঁচু করল রেমি। ভাল সময়ের আশায়…’

‘খাসা বলেছেন!’ ম্যানচেস্টার হাসল। কিন্তু বরবারের মতো এবারও তার হাসি চোখ ছুঁলো না।

.

২০.

সকালের নাস্তা খেতে যাওয়ার আগে রেডিওতে খবর শুনে নিল স্যাম ও রেমি। নাস্তা সেরে সৈকতের দিকে যাবে ওরা। এখানকার পর্যটকদেরকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন জায়গায় রোডব্লক ও চেকপোস্ট থাকার কারণে তাদের গন্তব্যে পৌঁছুতে দেরি হবে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী ছুটিতে থাকা এক ডজন পুলিশ অফিসারকে আবার কাজে যোগ দিতে বাধ্য করেছেন। জানিয়েছেন, তিনি সন্ত্রাসীদের সাথে কোনো পরিস্থিতিতেই সমঝোতা করবেন না।

হোটেলের লবিতে বিদেশি লোকজনে গিজগিজ করছে। দ্বীপ ছেড়ে চলে যাচ্ছে সবাই। ভিড় ঠেলে রেস্টুরেন্টের দিকে গেল ওরা।

‘এত জলদি সবাই চলে যাচ্ছে, রেমি খাবারের অর্ডার দিয়ে তারপর বলল।

‘আমি পর্যটকদেরকে দোষ দেব না। আমরা এখানে বিশেষ কারণে থাকছি। তাছাড়া শুধু হাওয়া খাওয়ার জন্য কে এই গৃহযুদ্ধের মধ্যে থাকতে চাইবে?’

‘আমাদের বিগত ছুটির দিনগুলো ভাল ছিল।’

“আরে, গোলাগুলি আর ট্রাকের ধাক্কা খাওয়া বাদ দিলে এই ছুটিটাও কিন্তু ভাল।

‘ও, তাই? কুমীরের কথা ইতিমধ্যে ভুলে গেছ?”

‘আসলে কুমীর তো আমাদেরকে আক্রমণ করেনি। তাই ওটাকে ধরিনি।’

পার্কিং লটে সবসময় একজন গার্ড থাকে। কিন্তু আজকে তিনজন দেখা যাচ্ছে। সবার হাতে লাঠি। হম্বিতম্বি ভাব ধরার চেষ্টা করছে গার্ডরা। চারপাশ মোটামুটি শান্ত। রাস্তায় অল্পকিছু গাড়ি চলছে।

‘শহরে যাওয়ার সময় হাসপাতালে নামব।’ বলল রেমি। ডা. ভ্যানার সাথে কথা বলতে হবে। গতকাল রাতে আমি তার প্রেজেন্টশন পড়েছি। বেশ ভাল। আমাদের দানের লিস্টে তাকেও যোগ করা যেতে পারে।’

‘যা ভাল বোঝো করো। ডা. ভ্যানা তাহলে রাতারাতি খবরের শিরোনাম হয়ে যাবে।’

‘তিনি যা করছেন আমি সেটাকে সমর্থন করি। নিঃস্বার্থভাবে কাজ করছেন। অথচ চাইলে অন্য কোথাও চলে গিয়ে ডাক্তারি করে এরচেয়ে অনেক বেশি উপার্জন করতে পারতেন।

‘ঠিক বলেছ। আমি যতটুকু বুঝেছি, তিনি পরিবর্তন আনতে চান। অর্থ উপার্জন তার কাছে মুখ্য নয়।’

‘আর সেজন্যই আমাদের উচিত তার ক্লিনিককে সহযোগিতা করা।

‘আমার কোনো আপত্তি নেই।

নাস্তা শেষ করে হাসপাতালের দিকে রওনা হলো ফারগো দম্পতি। রাস্তার পাশে একদল দ্বীপবাসী দাঁড়িয়ে রয়েছে। কয়েকজনের হাতে ম্যাচেটি। তাদের পাশ দিয়ে চলা গাড়িগুলোর দিকে হিংস্রদৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। স্যাম বুঝতে পারল রেমি ঘাবড়ে যাচ্ছে তাই গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল। রেমি, সরাসরি সৈকতের ওদিকে গেলেই ভাল হতো না? ডাক্তারের সাথে তো আমরা পরেও দেখা করতে পারতাম!’ বলল স্যাম।

‘এসেই পড়েছি। সন্ধ্যায় দেখা করার চেয়ে সকালে দিনের আলোতে দেখা করাটা আমার কাছে বেশি নিরাপদ বলে মনে হয়।’

হাসপাতালের পার্কিং লটে অল্পকিছু গাড়ি রয়েছে। তারমধ্যে একটা এসইউভি ডার ভ্যানার। ওদেরকে ঢুকতে দেখে নার্ভাসভঙ্গিতে এক গার্ড মাথা নাড়ল।

পাতালের ভেতরে ঢুকল ওরা। রিসিপশন কাউন্টারের পেছনে ল্যাব কোট পরিহিত একজন লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে। বেশ লম্বা দেখতে, স্থানীয়।

‘আপনাদেরকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?’ সে জানতে চাইল।

‘আমরা ডাক্তার ভ্যানার সাথে দেখা করতে চাই,’ বলল রেমি।

‘আমি ডা. বেরি। কী সমস্যা?

না, তেমন কিছু নয়, স্যাম জানাল। ওনার সাথে অন্য ব্যাপারে কথা বলতে এসেছি। সামাজিক বিষয়ে আরকী।

‘ও আচ্ছা। উনি অফিসে আছেন। এক সেকেও।

ডা, বেরি ডেকে পাঠাল ডা. ভ্যানাকে। একটু পর ভ্যানা হাজির, হাতে একটা ফোল্ডার। স্যাম ও রেমিকে দেখে হাসল ভ্যানা।

‘আপনাদেরকে দেখে সারপ্রাইজড় হয়েছি। কী ব্যাপার? সবঠিক আছে তো?’ ভ্যানা জানতে চাইল।

‘হ্যাঁ, সবঠিক আছে। আমরা দেখতে এলাম, বেনজি কেমন আছে। আর আপনার প্রজেক্টের ব্যাপারেও একটু কথা বলার ছিল।

এইমাত্র তাকে দেখে এলাম। ঘুমুচ্ছে। গতরাতে খুব ভুগেছে, বেচারা। জ্বর এসেছিল। অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছি যেন ইনফেকশন না হয়।’

‘আচ্ছা। আপনার প্রেজেন্টেশন দেখেছি। দারুণ হয়েছে। আমরা দুজনে মিলে ঠিক করেছি আপনার কাজে আমরা সাহায্য করব। আপনার প্রজেক্টের যাবতীয় অর্থ সহযোগিতা দেব আমরা।

ভ্যানার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। সত্যি? দারুণ খবর! ধন্যবাদ। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাদের…’।

হাসল স্যাম। প্রজেক্টটা ভাল। এই দ্বীপের জন্য কাজে আসবে বলে আশা করছি। এখানারকার যা অবস্থা…’

ভ্যানা’র মুখ কালো হয়ে গেল। হ্যাঁ। বর্তমান ঘটনাগুলো আমার দাতাদের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। গোলমালের বিন্দুমাত্র গন্ধ মেলে ওষুধের বড় কোম্পানীগুলো পিঠ টান দেবে। এখানে আসলে আমার কিছু করার নেই। আমি শুধু ভাল”-এর আশা করতে পারি।’

‘আপনার কি সত্যিই মনে হয় তারা সরে যাবে?’ রেমি জানতে চাইল।

‘নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। যদি দাঙ্গা বাধে, দ্বীপের লোকজন যদি নিজেরাই দিজেদের ঘর-বাড়ি পোড়ায় তাহলে কেউই এই দ্বীপের জন্য অর্থ সাহায্য দিতে চাইবে না।’

‘গুটি কয়েক লোকের বাজে কাজের জন্য পুরো দ্বীপের বাসিন্দাদেরকে বঞ্চিত করার বিষয়টা তারা বুঝবে না?

“ আসলে আমরা হলাম ছোট আলুর মতো। কোনো দাম নেই আমাদের। অধিকাংশ কোম্পানী আমাদেরকে ধর্তব্যের মধ্যেই রাখে না। এরআগেও দেখেছি, ওরা কিছু দিলে সেটা খুব অল্প পরিমাণে দেয় এবং অনেক দেরিতে দেয়। ভ্যানা মাথা নাড়ল। তার উপর এখন দ্বীপের যে পরিবেশ-পরিস্থিতি।

হুম। যাক, আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।’ বলল রেমি।

‘বিগত কয়েক মাসে এরচেয়ে ভাল খবর আর পাইনি।’ একটু ইতস্তত করল ভ্যানা। আপনাদের প্রজেক্টের কী খবর?

‘চলছে। স্যাম ছোট্ট করে জবাব দিল।

‘ডুবে যাওয়া ভবনের কথা বলেছিলেন। ওগুলোর কোনো পরিচয় পেলেন?

‘এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। স্যাম আবার সংক্ষিপ্ত জবাব দিল। সাবধানে খেলছে।

ভ্যানা ইতস্তত করছে এখনও। আচ্ছা, আপনাদের কাজে আমার কোনো সাহায্য প্রয়োজন হলে জানাবেন।

***

হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে স্যামের কানে ফিসফিস করল রেমি। ওনার সাথে খুব মেপে কথা বললে দেখলাম। হু?

‘অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিখেছি এসব বিষয় যত কম লোক জানে তত ভাল। আর সবচেয়ে বড় কথা, প্রজেক্টটা লিও’র। আমরা সেটা নিয়ে বিশদ আলোচনা করার অধিকার রাখি না।

‘জানি। কিন্তু আসল কথা না বলে তোমাকে নাচতে দেখে মজা পেয়েছি।

‘আমি সবসময় নিজেকে খুব ভাল নৃত্যশিল্পী বলে মনে করি।’

রাস্তায় উচ্ছৃঙ্খল দ্বীপবাসীরা জড়ো হয়েছে। কিছু একটা হতে পারে। স্যামের সাথে মশকরা করা বন্ধ করল রেমি। স্যাম, তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলো। অবস্থা ভাল নয়।

ড্রাইভিং সিটে বসল স্যাম। “সিটবেল্ট ভাল করে বাঁধো। সামনে যা-ই আসুক আমি কিন্তু গাড়ি থামাব না।

 ২১. অ্যাক্সিলেটরে চাপ দিতে

২১.

স্যাম পা দিয়ে অ্যাক্সিলেটরে চাপ দিতেই ইঞ্জিন গর্জে উঠল। ভিড় পাকানো লোকজন সরে গেল দুপাশে। অনবরত হর্ন বাজিয়ে স্যাম তাদেরকে সর্তক করল। লোকজনের ভীড় এড়িয়ে এগোল গাড়ি।

‘সাবধানে!’ সিটের হাতল চেপে ধরে বলল রেমি। একলোকের হাতে একটা বেজবল ব্যাট ছিল। অল্পের জন্য স্যাম সেটার আঘাত থেকে বাঁচাল গাড়িকে।

‘দেখেছ? কোনো সমস্যা নেই। স্যাম মুখে বলল ঠিকই কিন্তু কণ্ঠ শুনে ঠিকই বোঝা গেল ও নার্ভাস।

‘অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছি, স্যাম। মনে হচ্ছে, এখানকার সবাই আমাদেরকে এই দ্বীপ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছে।

‘বাজে কথা। তবে শিপে একরাত কাটালে মন্দ হয় না। এখানকার পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত আমি আর এরকম দৌড়াদৌড়ি করতে রাজি নই।’

‘আর যদি শান্ত না হয়?

‘তাহলে হয়তো আমাদেরকে আরও একটা শিপ যোগাড় করতে হবে।’

পুলিশের প্রথম রোডব্লক উদয় হলো। গতকালের চেয়ে আজ তাদের আয়োজন আরও ব্যাপক। অফিসারের সংখ্যা বেশি, সবার পরনে দাঙ্গার পোশাক। সার্চ শেষে স্যাম অফিসারকে জানাল ওরা পশ্চিম দিকে যাচ্ছে। শুনে অফিসার এমনভাবে মাথা নাড়ল যেন স্যাম ও রেমিকে আর কখনও দেখতে পাবে না।

পরের রোডব্লকটাও একই রকম। স্যাম খেয়াল করে দেখল, প্রত্যেকটা রোডব্লকে শুধু ওদের গাড়িটাই আছে।

‘একদম জনশূন্য হয়ে গেছে, তাই না?’ স্যামের মনের কথা বুঝতে পেরে বলল রেমি।

‘মনে হচ্ছে কারও ড্রাইভ করার মুড নেই।’

‘গৃহযুদ্ধের মাঝে কেউ পড়তে চাচ্ছে না।

হতে পারে। কিন্তু গাড়ি চালানোর জন্য আজকের সকালটা কিন্তু দারুণ। স্যাম বলল। রেমি খেয়াল করল জঙ্গলের পাশ দিয়ে এগোনোর সময় গাড়ির গতি অনেক বেড়ে গেছে।

পোর্টে পৌঁছে গাড়ি পার্ক করে রেডিওতে ডেস-এর সাথে যোগাযোগ করল স্যাম। কিছুক্ষণ পর তরতর করে পানি কেটে ডারউইন-এর স্কিফ এসে গেল। পাইলটের আসনে রয়েছে সিমস।

‘শুভ সকাল। দিনটা সুন্দর, তাই না?’ সিমস বলল।

‘চমৎকার।’ সায় দিল রেমি। স্বামীর সাহায্য নিয়ে স্কিফে চড়ল।

নতুন কোনো খবর আছে?’ স্কিফে চড়ে জানতে চাইল স্যাম।

সিমস স্কিফকে ঘুরিয়ে শিপের দিকে নিল। না। গতকালের মতোই চলছে সব। আপনাদের টিমের লিওনিড সবকিছু তদারকি করছেন।

কিছুক্ষণ পর ডারউইন-এর কাছে পৌঁছে গেল ওরা। দু’জন ক্রু শিপের ডেক থেকে হোস পাইপ নিয়ে কাজ করছে। পানির নিচে থাকা ডাইভারদের সাথে শ্বাস-প্রশ্বাসে যেন কোনো সমস্যা না হয় সেদিকটা দেখছে তারা।

শিপে ওঠার পর ডেস-এর সাথে দেখা হলো।

‘আপনাদেরকে দেখে ভাল লাগল!’ বলল ডেস। দ্বীপের উত্তেজনাময় পরিস্থিতির খবর শুনলাম রেডিওতে।

‘ঠিকই শুনেছেন। আমাদেরকে কমপক্ষে একটা রাত এই শিপে কাটাতে হবে।’ বলল স্যাম। লিওর দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার কী অবস্থা, বন্ধু?

মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে হাত নাড়ল লিও। কাজ এগোচ্ছে, বোঝা গেল কাজ নিয়ে সে খুব একটা সন্তুষ্ট নয়। ওকে নিয়ে পাইলটহাউজের দিকে এগোল স্যাম। বিস্তারিত জানবে।

‘চলো তো দেখি…’ বলল স্যাম।

মনিটরে দেখা গেল গতকালের পর আজ আরও বেশ কয়েকটি নতুন পাথুরে ব্লক পরিষ্কার করা হয়েছে। ইমারতে শেষ অংশে কাজ করছে ডাইভাররা। বুদবুদ আর জঞ্জালের মেঘ ভাসছে পানিতে।

অনেকখানি পরিষ্কার করে ফেলেছে, রেমি বলল। ব্লকের সাইজগুলো দেখেছ? এগুলো পর্যবেক্ষণ করে পাড়ে নিতে হলে কয়েক বছর লেগে যাবে।

‘ভিত্তির কিছু অংশও পরিষ্কার করেছি। দেখে মনে হয়েছে, দ্বীপ থেকে বড় ও ছোট পাথর এনে সেগুলোর সমন্বয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল এটা। আমার ধারণা, যখন এগুলোর নির্মাণ কাজ চলছিল তখন এখানে পানির গভীরতা ১৫ ফুটের বেশি ছিল না।’ বলল লিও।

‘তাহলে তো তখন ঝুঁকি ছিল না বললেই চলে। স্যাম মনিটরের দিকে তাকাল। এবার ভাব, কত বড় ভূমিকম্প হলে ইমারতগুলোকে প্রায় ৮০ ফুট নিচে নামানো সম্ভব?

ভূম্পিকম্পের প্রথম ধাক্কায় পুরো স্তর সরে গিয়েছিল। তারপর ছোট ছোট ধাক্কায় একদম সাগরের তলায় গিয়ে পৌঁছেছে। পুরোটাকে অনুসন্ধান করার জন্য আরও সময় পেলে তখন বিস্তারিত জানা যাবে।’

স্যাম দাঁত বের করে হাসল। তা তো অবশ্যই। ধৈর্যধারণ করা মহৎ গুণ, বুঝেছ? এসব ক্ষেত্রে কোনো কিছুই দ্রুত হয় না। আর তুমি সেটা বেশ ভাল করেই জানো।

মুখ হাঁড়ি করল লিও। জানি এবং জিনিসটা আমার খুবই অপছন্দ। তোমাদেরকে কি বলেছি আমার সি-সিকনেস হচ্ছে?

না, এখনও বলোনি।

‘আমি নিজেই জানতাম না। গতকাল রাতে ঘুমানো চেষ্টা করতে গিয়ে টের পেলাম।’

কাশি দিল ডেস। রেমি হেসে ফেলল। স্যাম অনেক চেষ্টা করে নিজের হাসি থামিয়ে রেখে বলল, যদি তুমি ডাইভ দাও তাহলে এই সি-সিকনেসের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে। তারপর দেখা যাবে, বাচ্চাদের মতো সুন্দর ঘুম হচ্ছে তোমার।’

‘মিথ্যা বলছো না তো?

না, না! একদম সত্যি। সিরিয়াসভাবে বলল স্যাম। ওর চেহারা যেন পাথরে গড়া।

পাইলটহাউজে থাকা স্পিকার জ্যান্ত হয়ে উঠল হঠাৎ। অস্ট্রেলিয়ান উচ্চারণে কথা বলছে…

ক্যাপ্টেন, আপনি ওখানে আছেন?’ ডাইভ টিমের লিডার কেট ওয়ারেন জানতে চাইল।

মাইক্রোফোনের দিকে এগোল ডেস। মুখের কাছে নিয়ে বল, হ্যাঁ, কেন্ট। বলো, কী অবস্থা?

‘আপনি হয়তো এটা এখনও দেখেননি, কিন্তু আমরা এমন কিছু পরিষ্কার করেছি যেটা টিমের প্রধানদের মধ্যে থেকে কেউ এসে দেখলে ভাল হতো।

এক ভ্রূ উঁচু করে ডেস-এর দিকে তাকাল স্যাম।

ওয়ারেন ইতস্তত করছে। আমার ভুলও হতে পারে কিন্তু মনে হচ্ছে এটা একটা প্রবেশ পথ। থামল সে। এরপর সে যা বলল সেটা শুনে ধাক্কা খেল পাইলটহাউজের সবাই। আর আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে তাহলে সম্প্রতি এই পথটাকে ব্যবহার করা হয়েছে।

.

২২.

অক্সিজেন মাস্ক পরে নিল স্যাম। রেমি’র দিকে তাকাল। ওয়েট স্যুট রয়েছে রেমি’র পরনে। দারুণ মানিয়েছে তোমাকে। স্ত্রীর ফিগারের প্রশংসা করল স্যাম।

‘উঁহু, অনেক ঢোলা মনে হচ্ছে, তবে আমি ম্যানেজ করে নিতে পারব। তুমি তৈরি?

তৈরি হয়েই আমার জন্ম!

‘চাপা কম মারো।’ রেমি নিজের রেগুলেটর পরিষ্কার করে পানিতে ডাইভ দিল। স্যামও নামল ওর পিছু পিছু।

পানির নিচে গিয়ে রেমি’র দিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সংকেত দিল স্যাম। একইভাবে রেমিও সংকেত দিল। সব ঠিক আছে। স্যাম ডান দিকে তাকিয়ে ওদিকে যাওয়ার জন্য ইশারা করল। মাথা নেড়ে তাতে সায় দিল রেমি। কয়েক মিনিট পর ওয়ারেন ও তার ডাইভ সহযোগীর সাথে গিয়ে যোগ দিল ওরা। ওদের পরনে কমার্শিয়াল ডাইভিং সট ও কিরবি মরগ্যান হেলমেট রয়েছে। দেয়ালে থাকা একটা ফাঁক দেখাল ওয়ারেন। স্যাম ওদিকে সাঁতরে এগোল।

গ্লোভ পরিহিত হাতে ফাঁকের কিনারা পরীক্ষা করল স্যাম, বৃত্তাকার দাগ দেখা যাচ্ছে। ওয়ারেনের কাছে ফিরে এলো ও। দাগের দিকে ইঙ্গিত করল। ওয়ারেন সংকেত দিল না। অর্থাৎ দাগটা ওরা তৈরি করেনি।

রেমি ও গ্রেগ টরেস রয়েছে ওদের পাশে। ডাইভ ব্যাগ থেকে একটা ফ্ল্যাশলাইট বের করে সুইচ অন করল স্যাম। রেমিও একটা ফ্ল্যাশলাইট বের করে জ্বালাল। গ্রেগ নিজের হাতঘড়িতে টোকা মেরে উপরের দিকে ইশারা করে দেখাল। অর্থাৎ, ওর অক্সিজেন শেষের দিকে ডিকম্প্রেশনের জন্য উপরে যেতে হবে। স্যাম ওকে সংকেত দিল: ঠিক আছে। সংকেত পেয়ে যাত্রা শুরু করল গ্রেগ।

স্যাম সেই ফাঁকা অংশের দিকে মনোযোগ দিল। লাইট ধরল ওদিকে। রেমিকে নিয়ে ফাঁকা অংশ দিয়ে ভেতরে ঢুকল ও। ওয়ারেন রয়ে গেল বাইরে।

ভেতরে এটা একটা প্যাসেজ। ফ্ল্যাশলাইটের আলোতে দেখা গেল করিডোরের মেঝে ফেটে গেছে। কমুকসহ অনেক সামুদ্রিক জলজ আগাছা জন্মেছে বিভিন্ন অংশে।

নিজের লাইটটা সামনের দিকে ধরল রেমি যাতে স্যাম ওকে পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিতে পারে। প্যাসেজ দিয়ে সাবধানে এগোল স্যাম। প্যাসেজটা বেশ চওড়া তাই রেমিও স্যামের পাশাপাশি এগোতে পারছে। খুব ধীরে ধীরে এগোচ্ছে ওরা।

উপরের ভাঙ্গা অংশ দিয়ে দিনের আলো প্রবেশ করেছে। প্যাসেজ শেষ হয়েছে এখানে। থামল স্যাম। ডানদিকে ঘুরল। এদিকটা অন্ধকার। মনে হলো। পানিতে কেউ কালো কালি গুলে দিয়েছে। হঠাৎ পিছু হটল স্যাম। কালো দীর্ঘ আকৃতির কী যেন ওর দিকে সঁতরে এলো। ফ্ল্যাশলাইটের আলোতে দেখা গেল ওটা একটা ইল মাছ। প্রায় ৪ ফুট লম্বা। শরীরটা তেলতেলে। রেমিকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল প্রাণীটা।

যতক্ষণ চোখের আড়াল না হলো ততক্ষণ ওটার দিকে লাইট ধরে রাখল রেমি। তারপর স্যামের দিকে ফিরল। কোনায় থাকা একটা ব্লক পরিষ্কার করল স্যাম। আরও কোন কোন জায়গা পরিষ্কার করা যেতে পারে সেগুলো ইঙ্গিত করে দেখাল।

আসলে স্যাম দেয়াল পরিষ্কার করে চিহ্ন এঁকে যাচ্ছে। ফেরার সময় যাতে পথ হারিয়ে না ফেলে।

রেমিকে পেছনে নিয়ে এগোল স্যাম! আরেকটা মোড় ঘুরতেই একটা বড় চেম্বারে এসে পড়ল ওরা! চেম্বারের একাংশ ধ্বসে গেছে। আলো ফেলে দেয়াল ও মেঝে দেখল ওরা। রেমি এখানে আরেকটা ফাঁক দেখতে পেল। এবারের ফাঁকটা মেঝেতে।

ফাঁকটার দিকে এগোল স্যাম। চারদিক দেখে নিয়ে ওটার কিনারা পর্যবেক্ষণ করল। রেমিকে দেখাল ফাঁকটার কিনারা। নড করতে গিয়ে একটু জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে ফেলল রেমি! ডাক্তার সর্তক করেছিল কিন্তু রেমি সেসব ভুলে গেছে। ঘাড়ের ব্যথাটা ওর শিরদাঁড়া পর্যন্ত পৌঁছে গেল।

স্যাম অবশ্য স্ত্রীর সমস্যাটা টের পাচ্ছে না। আলো দিয়ে ফাঁকটা পরীক্ষা। করছে ও। রেমি’র দিকে এক নজর তাকিয়ে স্যাম ফাঁকটার ভেতরে সাঁতরে চলে গেল।

ওর পিছু নিল রেমি। ব্যথাটা যেরকম হঠাৎ করে জেগে ছিল তেমনি চট করে মিলিয়ে গেল। ফাঁক গলে ছোট একটা চেম্বারে এলো ওরা। এখানকার দেয়ালেও উপরতলার মতো সামুদ্রিক আগাছা রয়েছে। সবচেয়ে কাছের দেয়ালের কাছে গিয়ে হাত দিয়ে ঘষা দিল স্যাম। সবুজ-বাদামী রঙের জঞ্জাল ছড়িয়ে পানিতে মেঘের মতো ভাসতে শুরু করল। একটা রেখা দেখা যাচ্ছে দেয়ালের গায়ে। এক ইঞ্চি পুরু। একদম উপর থেকে নিচ পর্যন্ত রয়েছে রেখাটা।

পরিষ্কার করতে করতে আরেকটা রেখা পেল স্যাম। একটার সাথে আরেকটা এসে মিলিত হয়েছে। দুই মিনিট পর ৩-৪ ফুট সেকশন স্যাম পরিষ্কার করে ফেলল। ভাল করে তাকিয়ে দেখল কিছু একটা আঁকা হয়েছে রেখার সাহায্যে।

কী যেন ঝকমক করে উঠল। দেয়ালের আরও কাছে তাকাল স্যাম। দেয়াল থেকে ওর মুখের দূরত্ব এখন মাত্র ১ ইঞ্চি। লাইট ধরতেই আবার ঝিকিয়ে উঠল জায়গাটা।

ওর পাশে রয়েছে রেমি, মেঝে পরিষ্কার করছে। আগাছার জঞ্জাল পানিতে মিশে পরিষ্কার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল রেমি। তারপর স্যামের হাতে টোকা দিল। ঘুরল স্যাম। রেমি মেঝের দিকে ইঙ্গিত করে কী যেন দেখতে বলছে। পানি এখনও ভালভাবে পরিষ্কার হয়নি। স্যাম নিজের লাইট ধরল ওদিকে।

জিনিসটা চোখে পড়তেই স্যামের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। একটা বড় ছুরি বলে মনে হচ্ছে।

ছুরিটা তুলল স্যাম। কিন্তু ওঠানোর সময় ওটার ফলার বিভিন্ন অংশ ভেঙ্গে খণ্ড খণ্ড হয়ে গেল। অবশিষ্ট যেটুকু রইল সেটাকে একটা জীর্ণ কাঠের টুকরো ছাড়া কিছু বলা যাবে না। ছুরির হাতল। কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে রেমি’র দিকে ফিরল স্যাম। রেমি রেখাগুলো দেখছে। স্ত্রীকে নিয়ে দেয়ালের আরও কাছে গেল স্যাম। ঝিকিয়ে ওঠা জিনিসটা দেখাল তাকে। রেমি ইঞ্চিখানেক গভীর রেখা ছুঁয়ে দেখল।

দেয়ালের আরও কিছু অংশ পরিষ্কার করার পর হাতঘড়ি ও এয়ার গজ চেক করল স্যাম। রেমিও করল। স্যামকে সংকেত দিল উপরে যেতে হবে। অক্সিজেন শেষ হয়ে আসছে।

ওরা ফিরছে এমন সময় মৃদু গুড় গুড় আওয়াজ করে কেঁপে উঠল পুরো ইমারত। উপরের চেম্বারের কয়েকটা বড় ব্লক স্থানচ্যুত হল। ছোট আকারের ভূমিকম্প হচ্ছে। কম্পন থামা পর্যন্ত স্থির হয়ে রইল ফারগো দম্পতি। সবকিছু স্বাভাবিক হওয়ার পর দেখা গেল কোনোকিছু পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে না। তলানিতে থাকা বালু পানিতে মিশে পানি ঘোলা করে দিয়েছে। ওরা যে ফাঁক দিয়ে এখানে এসেছিল সেদিকে তাকিয়ে দেখল ব্লক স্থানচ্যুত হওয়ার ফলে ফাঁকটা বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থাৎ, ওদের ফেরার পথ নেই।

স্যাম ফ্ল্যাশলাইট দিয়ে আশপাশ দেখল। আরেকটা রাস্তা খুঁজছে। চেম্বারের একদম অন্যপ্রান্ত বেশ অন্ধকার দেখাচ্ছে। ভূমিকম্পের আগে ওখানে হয়ত দেয়াল ছিল। নতুন ফাঁকা অংশ দেখিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে সেদিকে এগোল স্যাম। সামনে গিয়ে দেখল ওটা একটা প্যাসেজ। পুরো প্যাসেজ সামুদ্রিক আগাছা ও জঞ্জালে বোঝাই। পানিতে আগাছার বিভিন্ন অংশ মিশে সবুজ ধোয়ার মতো তৈরি করে রেখেছে। রেমি’র দিকে তাকাল স্যাম। এয়ার গজ চেক করল। রেমিও চেক করল নিজেরটা। স্যামকে সংকেত দিল: মোটামুটি।

সরু করিডর দিয়ে এগোচ্ছে দু’জন। সামনে স্যাম, পেছনে রেমি। ওদের ফ্ল্যাশলাইটগুলো কোনমতে পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সামনে মোড় পড়তেই গতি কমাল স্যাম। এখানকার মেঝেতে বিভিন্ন ধ্বংসস্তূপের টিলা। দেখা যাচ্ছে।

আবার হাতঘড়ির দিকে তাকাল স্যাম। পানির উপরে ভেসে ওঠার আগে ডিকম্প্রেশনের জন্য কিছু সময় দরকার। নইলে রক্তে জমা নাইট্রোজেনের কারণে বড়ধরনের শারীরিক ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু ওরা যে গতিতে এগোচ্ছে এভাবে এগোলে ডিকম্প্রেশনের জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া সম্ভব হবে না।

সামনে এগোল স্যাম। কিন্তু কোনো রাস্তা পেল না। একটা বড় পিলার রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে। যাওয়ার কোনো উপায় নেই। ছাদের দিকে তাকাল ও। ছোট্ট একটা ফাঁক দেখা যাচ্ছে ছাদে। ওদিকে এগোল স্যাম।

হাত দিয়ে দুই মিনিট কাজ করার পর অক্সিজেন ট্যাঙ্ক ছাড়া বের হওয়ার মতো যথেষ্ট জায়গা তৈরি করতে পারল। ট্যাঙ্ক রেখে ফাঁক গলে বেরিয়ে গেল স্যাম। নিচে রেমি অপেক্ষা করছে। ২০ সেকেণ্ড পর স্যাম ফিরে এসে রেমিকে উপরে সঁতরে আসার জন্য ইশারা করল।

স্যামের মতো রেমিও তার অক্সিজেন ট্যাঙ্ক খুলে তারপর ফাঁক গলল। ওরা এখন অন্য একটা চেম্বারে এসে পৌঁছেছে। ওরা প্রথমে যে চেম্বারে এসে ঢুকেছিল এটা আকারে সেটার চেয়ে ছোট।

চেম্বারের এক কোনার দিকে এগোল রেমি। ওর উরুতে রাখা একটা ডাইভিঙের ছুরি বের করে একটা সেকশন পরিষ্কার করল। ব্লকের আঘাতে এখানকার মেঝে ভেঙ্গে গেছে। একটু আগে ওরা যে ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে সেটার চেয়ে এখানকার ফাঁকটা আকারে বড়। রেমি ওর অক্সিজেন ট্যাঙ্ক নিয়ে ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে গেল। স্যামের ভাগ্য অতটা ভাল নয়। ট্যাঙ্ক খুলে তারপর ফাঁক পেরোতে হলো ওকে।

ওরা এখন যে অংশে এসে পৌঁছেছে এখানে সামুদ্রিক শৈবালের কোনো অভাব নেই। ফারগো দম্পতি ছুরি দিয়ে সেগুলো কেটে কেটে উপরের দিকে সাঁতরে চলল।

শেষ শৈবালটিকে কাটার পর দিনের আলোর দেখা পেল ওরা। আলোকে অনুসরণ করে সাঁতরাতে সাঁতরাতে পানির উপরের অংশে পৌঁছে গেল স্যাম ও রেমি। ওরা যেখান দিয়ে ধ্বংবশেষের ভেতরে ঢুকেছিল সেখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে এসে ভেসে উঠেছে এখন। পানির উপরের অংশ দিয়ে সাঁতরে ওদিকে এগোল স্যাম। কারণ ওয়ারেন ওখানে ওদের জন্য অপেক্ষা করছে। স্যাম ওয়ারেনের কাছে গিয়ে পানির উপরে ওঠার সংকেত দিল। সায় দিল অস্ট্রেলিয়ান।

ওয়ারেন নিজের ডিকম্প্রেশন স্টক থেকে ওদেরকে অক্সিজেন দিল। তারপরও ওরা যখন পানির উপরে এসে পৌঁছুনোর পর দেখা গেল অক্সিজেন ট্যাঙ্ক একদম খালি। পানির উপরে মাথা তুলে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল স্যাম। ওর পাশে রেমিও ভেসে উঠেছে। সাগরে হালকা ঢেউ। প্রাণ ভরে শ্বাস নিচ্ছে দু’জন। ডারউইন ওদের কাছ থেকে প্রায় ১৫০ ফুট দূরে ভেসে রয়েছে।

১০ মিনিটের মধ্যে ওরা ওদের ডাইভিং গিয়ার ছেড়ে, শরীর মুছে শর্টর্স ও টি-শার্ট পরে নিল। কোন পদ্ধতিতে এগোলে সবচেয়ে ভাল হবে সেটা নিয়ে আলোচনা সেরে পাইলট হাউজে ফিরল স্যাম ও রেমি। লিও মনিটরের সামনে বসে রয়েছে। বরাবরের মতো হাঁড়ির মতো মুখ করে রেখেছে সেটা বলাই বাহুল্য।

ওর পাশে বসে ভূমিকম্প ও কীভাবে অল্পের জন্য প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছে সেসব খুলে বলল স্যাম।

‘তোমাদের কপাল ভাল।

‘আমাদের কপাল এরকমই। দেবতাদের ধন্যবাদ। স্যাম থামল। তুমি একটা থিওরি দিয়েছিলে… ভূমিকম্পের কারণে ইমরাতগুলো ক্ষয়ে যাচ্ছে। এখন মনে হচ্ছে তোমার থিওরিটা ঠিক। একটু আগে যে ভূমিকম্প হলো ওটা কিন্তু খুব বড় ছিল না। কিন্তু আমাদেরকে বেকায়দা ফেলতে ও ইমারতের ক্ষতি করার জন্য যথেষ্ট ছিল।

‘তুমি বাকি সবাইকে পানি থেকে উঠে আসতে বলেছ কেন? জানতে চাইল লিও। ওরা তো ইমারতের বাইরে ছিল। কিছু টেরই পায়নি।

‘ওদেরকে উঠে আসতে বলেছি কারণ ভেতরে গিয়ে আমরা যা দেখে এসেছি সেটা নিয়ে আমি আলোচনা করতে চাই। আর এক আলোচনা দু’বার করাটা আমার পছন্দ নয়।’

ওয়ারেন ও ডেস ইতিমধ্যে হাজির হয়ে গেছে। ডাইভ টিমের বাকিরাও হাজির। সবাই দাঁড়িয়ে রয়েছে। স্যাম ও রেমি কী বলবে সেটা শোনার অপেক্ষায় আছে সবাই। স্যাম নিজের গলা পরিষ্কার করে নিল। রুমে থাকা সবার উপর দিয়ে ধীরে ধীরে চোখ বুলিয়ে নিয়ে লিও’র উপর এসে থামল ও।

‘একটা জিনিস পেয়েছে রেমি। যা সবকিছু বদলে দিয়েছে।

কী?

রেমি বাধা দিল। প্রথমে জানিয়ে রাখি আমরা কী পাইনি। কোনো গুপ্তধন পাইনি আমরা।’

কাঁধ ঝাঁকাল লিও। কিন্তু ভেতরে বৈঠকখানার মতো একটা বড় চেম্বার আছে। গভীর আঁজ কাটা রয়েছে সেটার দেয়ালে। পুরোটা পরিষ্কার করার আগে বলা মুশকিল কিন্তু আমি মনে করি ওই ভবনটা হলো মূল মন্দির। আর চেম্বারটা হলো রত্ন রাখার কোষাগার। অর্থাৎ, ট্রেজার ভল্ট।

‘দেয়ালের গায়ে খাজ কাটা?’ ডেসের কণ্ঠ শুনে মনে হচ্ছে সে বিষয়টা ঠিক বুঝতে পারছে না।

‘হ্যাঁ।’ বলল স্যাম। পাথরের দেয়ালের গায়ে খাজ কাটা। আমার ধারণা পুরো দেয়ালটা পরিষ্কার করলে আমরা চিত্রকর্ম দেখতে পাব। হয়তো কোনো পবিত্র স্থানের ছবি কিংবা দেবতাদের ছবি আঁকা আছে দেয়ালে।

‘এত নিশ্চিত হচ্ছ কীভাবে? জানতে চাইল লিও।

রেমি চোখের এক ভ্রু উঁচু করল। কারণ খাজগুলো সোনা দিয়ে ভরা ছিল।

‘সোনা! অনেকটা বোকার মতো উচ্চস্বরে বলে উঠল ওয়ারেন।

এবার লিও দ্বিধায় পড়ে গেছে। একটু আগেই তো তুমি বললে কোনো গুপ্তধন নেই।’

মাথা নাড়ল রেমি। ঠিকই বলেছি। খাঁজের গায়ে অল্প কিছু সোনা রয়ে গেছে। তুলে ফেলা হয়েছে বাকিটুকু। ওরা সবটুকু তুলে নিতে পারেনি।’

‘ওরা? তারমানে আমাদের আগেই কেউ মন্দিরে ঢুকেছিল? লিও জানতে চাইল।

‘ঠিক ধরেছ। দেয়ালের গায়ে সেটার প্রমাণও আছে। সোনা তোলার সময় ওরা কোনো সাবধানতা অবলম্বন কিংবা যত্নবান হওয়ার প্রয়োজনবোধ করেনি। তাই দেয়ালের গায়ে চিহ্ন ফেলে গেছে। ওখানে নিজেদের উপস্থিতি লুকোনোর কোনো চেষ্টাই করেনি তারা। বলল রেমি।

‘বুঝলাম। কিন্তু এরকম একটা জিনিসের খোঁজ পেয়েও তারা কাউকে জানাল না? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য?

‘হ্যাঁ, খটকাটা তো এখানেই। খাজ থেকে সোনা তুলতে এক দল ডাইভারদের কমপক্ষে কয়েক সপ্তাহ লেগেছে।’

লিও মাথা নাড়ল। আমি বুঝতে পারছি না। কারা আমাদেরকে হারিয়ে দিল?”

লিও’র দিকে তাকাল স্যাম। সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না… তবে রেমি একটা ক্লু পেয়েছে।’

ক্লু? ওয়ারেন প্রশ্ন করল।

“হ্যাঁ, ক্লু। নিজের ডাইভিং ব্যাগের দিকে এগোল স্যাম। ছুরির সেই হাতলটা বের করে সবার দেখার সুবিধার্থে বেশ কিছুক্ষণ সামনে ধরে রাখল। একটু কাছে এগিয়ে এসে দেখল সবাই। সবার আগে লিও প্রতিক্রিয়া জানাল।

কী এটা? কোনো বাতিল জিনিসের অংশ?

বাতিল নয়, লিও।’

‘একটা কাঠের টুকরো পেয়েছ? তাছাড়া আর কী?

হতাশা মিশ্রিত দৃষ্টিতে লিও’র দিকে তাকাল স্যাম। একজন বিজ্ঞানী হয়ে তুমি আসল প্রশ্নটাই করোনি।

কী সেটা?’ ভ্রূকুটি করল লিও।

‘স্যাম কেন পানির নিচ থেকে একটা বাতিল জিনিসের টুকরো এসে সবাইকে মিটিঙে ডাকবে?’ রেমি বলল।

দাঁত বের করে হাসল স্যাম। “ঠিক। এটাই হচ্ছে আসল প্রশ্ন।

‘এবার উত্তরটা বলো। নাকি এটাও আমাদেরকে আন্দাজ করে নিতে হবে?

স্যাম দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই জীর্ণ কাঠের টুকরোটিকে এখানে নিয়ে আসার কারণ একটাই। আমি যখন জিনিসটা তুলতে গিয়েছিলাম এই অংশটুকু ছাড়া বাকিটুকু খণ্ড খণ্ড হয়ে ভেঙ্গে গিয়েছিল। আমার মনে হচ্ছে এটা একটা ভাঙ্গা বেয়নেটের অংশ। ভাঙ্গা বলছি এই কারণে… হয়তো এই বেয়নেট ব্যবহার করে দেয়াল থেকে সোনা লুট করা হয়েছিল। তারপর লুটের কোনো একপর্যায়ে ভেঙ্গে গেছে।

‘যদি ভেঙ্গেই গিয়ে থাকে তাহলে কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন এটা বেয়নেটের? জানতে চাইল ডেস।

কাঠের টুকরোটাকে কাছে নিয়ে দেখুন। বেয়নেটের হাতলের অংশ দেখতে পাবেন।’

আর আমার মনে হয়, রেমি বলল, হয়তো এটার সাথে ২য় বিশ্ব যুদ্ধের সময় এখানে আসা সৈন্যবাহিনির বেয়নেট মিলে যাবে।’

‘এই গুপ্তধন সেই যুদ্ধের সময় তোলা হয়েছিল? ধীরে ধীরে বললেন

রেমি সায় দিয়ে মাথা নাড়ল। তবে কাজটা মিত্রবাহিনি লোক করেছে নাকি জাপানিরা করেছে সেটা এখুনি বলা যাচ্ছে না। কারণ আমি নিজে অ্যান্টিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নই। তবে খুব শীঘ্রই আমি এটার ছবি বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাব। তারপর আমরা জানতে পারব কারা এখান থেকে সোনা সরিয়েছে। যদি খাজগুলোর পুরোটা সোনায় ভর্তি হয়ে থেকে থাকে তাহলে সোনার পরিমাণ নেহাত কম নয়।

.

 ২৩.

স্যামের পাঠানো ছবিগুলো পাওয়ার দু’ঘণ্টা পর ফোন করল সেলমা। রেমি ও স্যাম ব্রিজ থেকে ডাইভারদের কাজ দেখছে। প্রথম চেম্বারে ঢুকেছে ডাইভাররা। কাজের গতি বেশ ধীর। সামুদ্রিক আগাছাগুলো পরিষ্কার করার পর অনেকক্ষণ পানিতে মেঘের মতো ভেসে থাকার ফলে কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। এভাবে দেড় ঘণ্টা কাজ করার পর ক্যাপ্টেন ডেস একটা পান্থ বসিয়ে জঞ্জালগুলো শুষে নেয়ার বুদ্ধি বের করল। পাম্ব ব্যবহার করে আলগা জঞ্জালগুলোর অধিকাংশই সরিয়ে ফেলায় গতি এলো কাজে।

‘তোমাদের ভাগ্য ভাল। বলল সেলমা ‘ মিল্টন গ্রেগরি হলেন ২য় বিশ্বযুদ্ধের অস্ত্র সম্পর্কে জানা অন্যতম জ্ঞানী ব্যক্তি। তোমার দেয়া হ্যাঁন্ডেলের ছবিটার পরিচয় বের করতে তার খুব একটা সময় লাগেনি।

তিনি কী বললেন? স্যাম জানতে চাইল।

‘জাপানিজ আর্মি। টাইপ ৩০ বেয়নেট। হয়তো আরিসাকা রাইফেলের ডগায় ছিল ওটা। এই রাইফালটা জাপানিজ সৈনরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করত।’

উনি নিশ্চিত?

‘একদম। মিত্রপক্ষের বেয়নেটের হ্যাঁণ্ডেল ভিন্ন রকমের ছিল। আরেকটা কথা: হ্যাঁন্ডেলের শেষ প্রান্তের দিকে খেয়াল করলে একটা ঝাপসা চিহ্ন দেখতে পাবে। যার নাম : আওবা।’

কী?

‘জাপানিজ রেজিমেন্টের নাম। গোয়াডালক্যানেলে পাঠানো তৃতীয় ব্যাটেলিয়ন, চতুর্থ পদাতিক রেজিমেন্ট। দ্য আওবা রেজিমেন্ট।

এই রেজিমেন্ট কবে এসেছিল?

১৯৪২ সালের সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখ।

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল স্যাম। আপনমনে মাথা নেড়ে মনিটর থেকে চোখ সরাল।

‘সেলমা, তোমাকে একটা কাজ দেব।

‘আন্দাজ করেছিলাম, দেবে।’

‘তোমার আন্দাজ সঠিক। গোয়াডালক্যানেলে জাপানিদের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চাই। কমাণ্ডে কে ছিল? কতজন সৈন্য এসেছিল এখানে? কবে এখান থেকে পালিয়ে গেছে? কীভাবে পালিয়েছে? সবকিছু জানতে চাই।

কতখানি বিস্তারিত জানতে চাও?

‘তুমি যা পাও সব আমাকে দেবে। সব তথ্যের সাথে একটা সংক্ষিপ্ত বর্ণনাও দিয়ে।

‘দেব।’

‘কতদিন লাগবে?

‘আমি পিট ও ওয়েণ্ডিকেও কাজে লাগিয়ে দিচ্ছি। কখন লাগবে তোমার?

বরাবরের মতো।

মানে, গতকাল? তাহলে গতকাল দেই?

স্যাম হাসল। তবুও একটু দেরি হয়ে যাবে!’

“ঠিক আছে। খুব শীঘ্রই পেয়ে যাবে।’

স্যামের কথা বলা দেখছিল রেমি। আমার ধারণা, জাপানিজ। ঠিক? বলল সে।

‘ স্যাম মাথা নাড়ল। হুম। কিন্তু তাদের ব্যাপারে তথ্য যোগাড় করা কঠিন হবে বলে মনে হচ্ছে।’

ইতিহাস বিজয়ীদের হাতে রচিত।

‘ঠিক বলেছ। জাপানীরা হেরেছিল ২য় বিশ্বযুদ্ধে। এনসাইক্লোপিডিয়াতে জাপানিজদের অপারেশনের রেকর্ড হয়তো নেই।

হুম। তবে ভাগ্য ভাল হলে কোনো সূত্র পেয়েও যেতে পারি।

সূর্যের আলোতে সাগরের পানি চিকচিক করছে। সেদিকে তাকিয়ে আছে স্যাম। চিন্তা করে দেখো, কীভাবে কাজটা করেছিল তারা। যুদ্ধের সময়ে দিনের পর দিন ভাইভ দিয়েছে। হরদম শত্রু বাহিনির হামলা চলছিল তখন। আদিকালের স্কুবা আর তামার তৈরি ডাইভিং হেলমেট ব্যবহার করতে হয়েছিল তাদের। অনেকটা জুল ভার্নের গল্পের মতো।

তবে যা-ই হোক, সফল হয়েছিল তারা। দেয়ালের দিকে একবার তাকালেই সেটার প্রমাণ পাওয়া যায়।

স্যাম চিন্তিতভাবে মনিটরের দিকে তাকাল। কিছু বলার নেই।’

রাত নামা পর্যন্ত কাজ করল ডাইভাররা। পাম্প ব্যবহার করে জঞ্জাল পরিষ্কার করা হলেও আশানুরূপ গতিতে কাজ এগোল না। লিও কিছুটা অস্থির হয়ে উঠল।

ডিনারে গ্যালিতে জড়ো হলো ডাইভার টিমের সবাই। টাটকা মাছ দিয়ে ডিনার সারতে সারতে হাসি-ঠাট্টায় মেতে রইল।

ক্যাপ্টেন ডেস স্থানীয় রেডিও ব্যাণ্ড টিউন করে রেখেছে। সর্বশেষ খবরা খবর জানা দরকার। রেডিও’র সংবাদ পাঠক জানাল, বিভিন্ন জায়গায় বিশৃঙ্খলা করার অপরাধে এপর্যন্ত ২০ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তবে বিদ্রোহীদের ব্যাপারে কোনো নতুন তথ্য জানা যায়নি। তাই বলা যায়, খুনের পর আপাতত ঘাপটি মেরে রয়েছে তারা।

পরদিন সকালে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার স্যাম ওর ই-মেইল চেক করল। সেলমা একটা ফাইল মেইল করেছে। ফাইলটা ডাউনলোড করে পৃষ্ঠাগুলো পড়তে শুরু করল স্যাম। ওদিকে রেমি আরেক কাপ কফিতে চুমুক দিচ্ছে। ফাইলটা পড়া শেষে রেমিকে ফাইলটার ব্যাপারে সংক্ষেপে ধারণা দিল স্যাম।

‘জাপানিরা এখানে ওদের সৈন্যদের জন্য পর্যাপ্ত রসদ পাঠাতে গিয়ে প্রচুর ভুগেছে। মূলত এজন্যই এখান থেকে কেটে পড়তে হয়েছিল তাদেরকে। জাহাজে চড়ে যেসব সৈন্যরা ফিরছিল তাদের সবাই ছিল অসুস্থ। ক্ষুধায় কাহিল। এছাড়া আমাশয় ও পুষ্টিহীনতাসহ নানান অসুখে আক্রান্ত ছিল তারা।

এই দ্বীপ কতদিন জাপানিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল?

মাত্র ৭ মাসের মতো। ১৯৪২ সালের জুন থেকে ১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। যুদ্ধের সবচেয়ে তিক্ত সময় ছিল তখন!

‘তাহলে আমাদেরকে স্রেফ ওই ৭ মাসের ব্যাপারে খোঁজ নিতে হবে। কাজ কমে গেল দেখা যায়।

না। জাপানিদের দিক থেকেও কিছু রেকর্ড আছে।

‘তা ঠিক। কিন্তু যেহেতু আমরা জানি এখানে গুপ্তধন ছিল এবং তারা সেটা তুলে নিয়েছে, এখন প্রশ্ন হলো তারপর কী হলো? যুদ্ধের পর কেন বিষয়টা সামনে এলো না?

‘আচ্ছা, নিজেকে দিয়ে হিসেব করো। যদি তুমি এরকম সোনা খুঁজে পেতে কিংবা মূল্যবান রত্ন… যা-ই হোক, কী করতে তুমি? মনে রেখো, তুমি এমন এক জায়গায় আছে যেখানে প্রতিদিন যুদ্ধ হচ্ছে। তোমার দল হেরে যাচ্ছে যুদ্ধে। খাদ্যের অভাবে ভুগছে সবাই। দলের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

‘আমি হলে ধন-রত্ন সব নিয়ে এই দ্বীপ থেকে সটকে যেতে চাইতাম।

‘ঠিক। শত্রুপক্ষ তাদের সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে আক্রমণ করছে, এরকম অবস্থায় “দ্বীপ থেকে রত্ন নিয়ে পালিয়ে যাওয়া” মুখে বলা যতটা সহজ কাজে করে দেখানো ততটাই কঠিন। ভ্রু কুঁচকে কী যেন ভাবল স্যাম। আরেকটা বিষয় আছে। যেখানে তারা ডাইভ দিয়েছিল নিশ্চয়ই একটা জাহাজকে ওখানে কয়েক সপ্তাহ নোঙর করে রাখতে হয়েছে? বিষয়টা শত্রুপক্ষের চোখে খুব সহজেই ধরা পড়ে যাওয়া কথা।

‘সেক্ষেত্রে আমরা ধরে নিতে পারি নোঙর করা জাহাজটা জাপানিদের অফিশিয়াল কোনো জাহাজ ছিল না।

স্যাম মাথা নেড়ে সায় দিল। সেটা এমন কিছু ছিল যা দেখতে সাধারণ জাহাজের মতো। যুদ্ধজাহাজ হলে বিপক্ষের আক্রমণে সাগরে ডুবে যেত জাহাজটা।

ভ্রু কুঁচকাল রেমি। পানির নিচে কোনো ডুবে যাওয়া জাহাজ নেই। তার মানে তুমি কী বলতে চাইছ? জাপানিরা গুপ্তধন পানি থেকে তুলে এখান থেকে স্রেফ গায়েব হয়ে গেছে?

স্যাম মাথা নাড়ল। হতে পারে। প্রতিপক্ষ খুব কড়া পাহারা দিচ্ছিল সেসময়। সৈন্যদের জন্য দ্বীপে রসদ পর্যন্ত আসতে পারছিল না তখন। অবশ্য তারা যে জাহাজই ব্যবহার করে থাকুক সেটা যদি ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে কিংবা যদি সার্চ হয় তাহলে সব শেষ। এত বড় ক্ষতি পোষানোর কোনো উপায় ছিল না জাপানিদের। তাই লুটে নেয়া গুপ্তধন নিয়ে উন্মুক্ত সমুদ্রে যাত্রা করাটা খুব বেশি ঝুঁকি ছিল তাদের জন্য।

তাহলে?

মাথা খাটাও। তোমার কাছে গুপ্তধন আছে, ক্ষুধায় ভুগছ। ওদিকে দ্বীপে শত্রুপক্ষ চলে এসেছে। কোনো জাহাজকে আসতে দিচ্ছে না তোমাদের কাছে। সাগরের পাড় জুড়ে জাপানিজ জাহাজ আর নৌকোর ধ্বংসস্তূপে মাখামাখি। দিনের বেলায় সাগরে কড়া পাহারা চলছে। তাহলে তুমি কী করতে?

রেমি একমুহূর্ত ভাবল। সাবমেরিন!

‘হ্যাঁ। একটা সম্ভাব্য উপায় হতে পারে। কিন্তু ওতে খুব ঝুঁকি থাকে। পরিকল্পনা মাফিক কিছু না হলে, কোথাও বাড়তি সময় লেগে গেলে সব গড়বড় হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া পাড়ের কাছে সাবমেরিন আনা খুব কঠিন। তবে রাতে সম্ভব। কিন্তু পাড়ে তো বিভিন্ন জাহাজ ডুবে রয়েছে। তাদের সাথে সংঘর্ষ এড়ানোটা প্রায় অসম্ভব।’

তাহলে আমি নিরাপদ সময় পাওয়ার আগপর্যন্ত গুপ্তধনগুলো লুকিয়ে রাখতাম।’

‘আচ্ছা, মানলাম। কিন্তু কীভাবে? প্রতিপক্ষ তো হাল ছাড়বে না। তুমি যতই দেশপ্রেমিক হও না কেন, প্রকৃত সত্য হলো, জাপান এই দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ কখনই আজীবন ধরে রাখতে পারবে না।’

‘তাহলে… তাহলে আমি একটু বড় সুযোগের অপেক্ষায় থাকতাম। সুযোগ বুঝে কেটে পড়তাম এখান থেকে।

‘হলো না। দ্বীপে সৈনিকদের কার্যবিধির ধারাবাহিকতার দিকে খেয়াল করলে দেখা যায় মাত্র একটা উপায় ছিল এখান থেকে প্রাণ হাতে নিয়ে ফেরার।

কী সেটা…?

‘চুড়ান্ত পলায়নের সময়। কোনো এক কারণে প্রতিপক্ষ জাপানিদেরকে সেই পিছু হটার সময় বাধা দেয়নি। একপ্রকার বিনা চ্যালেঞ্জে দ্বীপ ছেড়েছিল জাপানি সৈন্যরা।

‘প্রতিপক্ষ কেন বাধা দিল না?’

“আমি যতদূর জানি, প্রতিপক্ষ ভেবেছিল সামনে বড় কোনো আক্রমণ হতে যাচ্ছে। তাই সমস্ত নৌ-বহর কোরাল সমুদ্রে অবস্থান নিয়েছিল তখন। জাপানিজদেরকে উন্মুক্ত সমুদ্রে যাওয়ার সুযোগ দিয়ে গিনিপিগ বানিয়েছিল। কেউ আক্রমণ করে কিনা সেটা দেখার জন্য।’

‘তোমার জ্ঞান আমার পছন্দ হলো না। এরচেয়ে আমার সাবমেরিন তত্ত্বই ভাল।”

‘জানি। কিন্তু সলোমনের এদিকে জাপানিজ সাবমেরিন ছিল না বললেই চলে। অন্তত আমাদের জানা নেই। নিজের চোয়ালে হাত বুলাল স্যাম, মাথা নাড়ল। এছাড়া জাপানিজ সাবমেরিনে মাল রাখার মতো জায়গা খুব কম ছিল।’

বুঝলাম।

স্যাম দাঁত বের করে হাসল। ধরা যাক, পানির নিচে থাকা ইমারতগুলোর খোঁজ পেতে বেশকিছু সময় লেগেছিল জাপানিদের। তবে ইমারতগুলো দেখা ও গুপ্তধন উদ্ধার করার জন্য বেশ ভাল পরিমাণ সময় ছিল তাদের হাতে। আমরা এখন যে পরিমাণ সামুদ্রিক জঞ্জাল সাফ করছি, এটা তাদের মোকাবেলা করতে হয়নি। তাদের কাজ তুলনামূলক দ্রুত এগিয়েছিল। দেয়াল থেকে সোনা আর মূল কোষাগার থেকে কী তুলে নিয়েছিল কে জানে। আমরা জেনেছি বেয়নেটটা যে সৈন্যবাহিনির তারা দ্বীপে এসেছিল সেপ্টেম্বরে। ধরলাম, ১ মাসের মধ্যে তারা গুপ্তধন লুটে নেয়ার কাজ সেরেছিল। তাহলে ততদিনে অক্টোবর মাস গড়িয়েছে। পুরোদমে যুদ্ধ চলছে তখন। দু’পক্ষের অনেক জাহাজ ধ্বংস হয়ে গেছে। এবার ভাবো, তখনকার সময়কে দ্বীপ থেকে গুপ্তধন সরানোর জন্য উপযুক্ত সময় বলে মনে হচ্ছে কি?

গলা পরিষ্কার করল রেমি। হয়তো না। কিন্তু অনেক কিন্তু আছে এখানে।

‘আমি জানি। কিন্তু সময়কালটা দেখো। চূড়ান্ত পলায়নের সময়টা ছাড়া অন্য কোনোসময় দ্বীপ থেকে সটকে পড়াটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়।’

রেমি ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। একমত। তবে তোমার আগের পয়েন্টটা ভাল ছিল। যদি গুপ্তধন উদ্ধার হয়েই থাকে তাহলে অতদিন লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। গুপ্তধনের ঘটনা প্রচার পেল না কেন? গোপন জিনিস বেশিদিন গোপন থাকে না। আমার ধারণা, যুদ্ধে জাপানিদের অনেক খরচ হয়েছিল। এই গুপ্তধন বিক্রি করে সেটা পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করার কথা তাদের।

‘আমি সেলমাকে বলেছি, জাপানিদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আমাকে যেন দেয়। পলায়নের সময় কোন কোন জাহাজ সেটার দায়িত্বে ছিল, যুদ্ধের পর জাপানিদের সম্পদ বিক্রির রেকর্ড ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেক কাজ করতে হবে সেলমাকে। কিন্তু সেলমা এরকম চ্যালেঞ্জ নিতেই পছন্দ করে। আমাদেরকে এসব তথ্য যদি কেউ সরবরাহ করতে পারে তাহলে সে হলো সেলমা।’

ডেকে গেল স্যাম ও রেমি। ডাইভাররা তাদের ডাইভিঙের প্রস্তুতি নিচ্ছে। হঠাৎ কীসের ঝলকানি থেকে চোখকে বাঁচানোর জন্য হাত দিয়ে রেমি চোখ আড়াল করল। স্যাম লিও’র সাথে আস্তে আস্তে কথা বলছিল। রেমিকে এভাবে হাত উঁচু করতে দেখে বলল, কী হয়েছে?

রেমি মাথা নাড়ল। হয়তো কিছুই নয়। আমাদের গাড়ির ওখান থেকে কীসের ঝলকানি দেখতে পেলাম।

‘সূর্যের আলো গিয়ে গাড়ির কাঁচে পড়েছে বোধহয়। বলল রেমি।

ডেসের দিকে তাকাল স্যাম। ক্যাপ্টেন ডেস হাতে মগ নিয়ে কফি খাচ্ছে। ‘আপনার কাছে বাইনোকুলার টাইপের কিছু আছে?

সায় দিয়ে মাথা নাড়ল ডেস! পাইলটহাউজ থেকে একটা ওয়াটারপ্রুফ বুশনেল নিয়ে এলো।

বুশনেলের লেন্স দিয়ে পাড়ে তাকাল স্যাম। ডেসের হাতে জিনিসটা ফিরিয়ে দিয়ে বলল, আমাকে একটু পাড়ে যেতে হবে। লিফট পাব?’

ডেস মাথা নাড়ল। অবশ্যই। আমি নিজে আপনাকে লিফট দেব, চলুন।

রেমি’র দিকে ফিরল স্যাম। আমি এখুনি আসছি।’

‘আমিও তোমার সাথে যেতাম। কিন্তু যাব না।’ রেমি নিজের ঘাড় ডলতে উলতে বলল।

‘তুমি ঠিক আছে তো?

ঠিক আছি। রাতে হয়তো বেকায়দাভাবে শুয়েছিলাম।’ রেমি বলল। কিন্তু স্যাম ও রেমি কেউ-ই কথাটা বিশ্বাস করল না।

সমুদ্রে তেমন একটা ঢেউ নেই। কয়েক মিনিটের মধ্যে পোর্টে পৌঁছে গেল স্যাম।

ওদের গাড়িটা স্যাম যেভাবে রেখে গিয়েছিল এখনও ঠিক সেভাবেই রয়েছে। গ্যাস কম্পার্টমেন্ট পরীক্ষা করল স্যাম। না, কেউ অনাহুতভাবে প্রবেশের চেষ্টা করেনি। জানালাগুলোও সব ঠিকঠাক আছে। দরজাগুলো লকড। স্যাম এখন অনেক সতর্ক। পাশের জঙ্গলে কোনো নড়াচড়া শোনা যায় কিনা সেজন্য কান খাড়া করে রাখল ও।

বাতাসের ফলে গাছের মৃদু নড়াচড়ার আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।

টয়োটা গাড়ির দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর স্কিফে চড়ল স্যাম।

তবে ও টয়োটার আশেপাশে টায়ারের টাটকা ছাপ দেখতে পেয়েছে।

রেমি’র আশংকা ভুল নয়। শিপের উপর নজর রাখছে কেউ।

.

২৪.

অরউন ম্যানচেস্টার ওয়াটারফ্রন্ট বারের পেছন দিকে বসে রয়েছে। পুরো বার এখন খালি। বারটেণ্ডার ছাড়া কেউ নেই। যখন কোনো গোপন মিটিং করার দরকার হয় তখন এখানে আসে ম্যানচেস্টার। বারটেণ্ডারকে ঘুষ দিয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখে। দ্য রাস্টি শ্রিমপার নামের এই বারটা বিগত কয়েক দশক ধরে দ্বীপে মদ পরিবেশন করে আসছে। সারাদিন বন্ধ থাকে। খোলা থাকে শুধু রাতে। অবশ্য আজকের বিষয়টা ভিন্ন।

বিয়ার খেতে খেতে ঘড়ি চেক করল ম্যানচেস্টার। ওর সহকর্মী ও বিভিন্ন কুকর্মের সঙ্গী গর্ডন রোলিন্স দেখা করবে এখানে। ব্রিটিশ সরকারের গর্ভনর হিসেবে এককালে দায়িত্ব পালন করেছিল রোলিন্স। তাই একই সাথে ক্ষমতা ও অর্থ দুটোই আছে তার।

বারের পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকল রোলিন্স। কপালের সামনে হ্যাটটা নিচু করে পরে রয়েছে। এগিয়ে এলো ম্যানচেস্টারের টেবিলের দিকে! এক আঙুল দিয়ে বারটেণ্ডারকে ইশারা করল সে। বসল চেয়ারে। একটু পর বারটেণ্ডার একটা বোম্বে স্যাফায়ার গিবসন নিয়ে এলো। বারটেণ্ডার শ্রবণ-সীমার বাইরে যাওয়ার আগপর্যন্ত ওরা কেউ কথা বলল না।

‘অরউন, বিদ্রোহীদেরকে তো মনে হয় ঈশ্বর পাঠিয়েছেন। আমি বিদেশি অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখেছি। এরকম জাতীয়করণে ওরা খুশি নয় কিন্তু কিছু করার মতো অবস্থায় নেই তাদের।

সাবধানে মাথা নাড়ল ম্যানচেস্টার। তাতে আমাদের অবস্থায় কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

‘আমি আর আপনি সলোমন আইল্যাণ্ডের সম্পত্তির দখল পাব। আকর্ষণীয় মুনাফা হবে।’

হুম। আমি এই ধারণার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি বহু বছর হলো।

‘ওভাবেই থাকুন। পর্দার আড়ালে থেকে সব কাজ সারব আমি। উপযুক্ত সময় আসার আগপর্যন্ত নিজের জনদরদী, ভালমানুষী ভাবটা ধরে থাকুন। কাজে লাগবে। আপনি দীর্ঘদিন ধরে এর বিপক্ষে নিজের বক্তব্য দিয়েছেন জনগণের সামনে। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে পড়ে যখন হার স্বীকার করে নেবেন তখন আর কারও কিছু বলার থাকবে না।

ম্যানচেস্টারের চোখ সরু হলো। আচ্ছা, আপনি কোনোভাবে এই বিদ্রোহীদের সাথে জড়িত না তো?’

শান্তভাবে ওকে পর্যবেক্ষণ করল রোলিন্স। অবশ্যই নয়। কিন্তু আমি জানি কীভাবে কোন সুযোগকে কাজে লাগাতে হয়। বিদ্রোহীদের কাজের ধারাকে আমি সমর্থন করি কি করি না সেটা বিষয় নয়। ওরা সরকারকে জাতীয়করণের ব্যাপারে আলোচনায় বসতে বলেছে, এটাই মূখ্য। ছয় মাস আগেও এসব অসম্ভব ছিল কিন্তু এখন সম্ভব হলেও হতে পারে। আর এই সুযোগে কীভাবে পকেট ভারি করা যায় সেটাই ভাবছি আমি।’

বিয়ারে চুমুক দিয়ে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকাল অরউন। বলুন, শুনছি…’

***

ডারউইন-এ ফিরে রেমিকে সব খুলে বলল স্যাম। রেমি প্রস্তাব রাখল শিপের সব ক্রুদেরকে ডেকে নিয়ে সর্তক করে দেয়া উচিত। হয়তো কোনো উৎসুক স্থানীয় বাসিন্দা পোর্টে এসে নিরীহভাবে সময় পার করছিল। হয়তো বিষয়টা গুরুত্বর কিছুই নয়। তারপরও সতর্ক থাকা দরকার।

ক্রুদেরকে ডেকে আনল স্যাম। দু’জন এইড-কর্মীর মৃত্যুর সংবাদ কুরা আগে থেকেই জানে। তাই এরকম পানিতে ভেসে থেকে, মাথায় ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হলেও ওরা ভয় পেল না।

স্যামের কথা শেষ হলে ওকে নিয়ে একপাশে সরে গেল লিও। নিচু গলায় বলল, তোমার কি মনে হয় আমাদের বিপদ হতে পারে?”

হলে ডাঙার চেয়ে কম হবে।’

‘খুব একটা ভরসা পাচ্ছি না।’

‘সবকিছুতেই ঝুঁকি থাকে। স্যাম শ্রাগ করল। আমার মনে হয় না, আমাদেরকে কেউ আক্রমণ করবে। কেউ যদি নজরদারি করে থাকে তাতে তো ক্ষতির কিছু নেই। তাছাড়া আমরা এমন এক অঞ্চলে অবস্থান করছি যেখানে বিদ্রোহীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিষয়টাকে হেলাফেলা করা যাবে না।’

পুরোটা দিন কেটে গেল ধীরে ধীরে। ডাইভাররা তাদের কাজ করছে। সন্ধ্যায় হোটেলে ফেরার সিদ্ধান্ত নিল স্যাম ও রেমি। আরেকটা রাত জাহাজে কাটানোর দরকার নেই। রেডিওতে নতুন কোনো অঘটনের ঘটনা শোনা যায়নি। হনিয়ারার পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত।

ওরা শহরে এসে দেখল গতকালের চেয়ে আজ যানবাহনের চলাচল বেশি। সবকিছু বেশ স্বাভাবিক লাগছে। আজও রাস্তায় পুলিশের দেখা মিলল। তবে তারা রিল্যাক্স করছে।

হোটেলের পার্কিং লট প্রায় ফাঁকা। তবুও সিকিউরিটি গার্ড তার দায়িত্ব পালন করছে। অতিথিগণ এখানকার অস্থিতিশীল পরিবেশে ঝুঁকি নিয়ে দিন কাটানোর চেয়ে নিরাপদে সটকে পড়াই শ্রেয় ভেবেছে। সামনের দরজার কাছে গাড়ি পার্ক করল স্যাম। আজ লবি একদম খালি। শুধু দু’জন ডেস্ক স্টাফ রয়েছে। তাদের মধ্যে একজন স্যামকে হাত দিয়ে ইশারা করে একটা চিরকূট ধরিয়ে দিল। মেসেজ। কাগজের দিকে এক পলক তাকিয়ে স্টাফকে ধন্যবাদ দিল স্যাম।

‘সেলমা ফোন করেছিল,’ বলল ও। ভাল লক্ষণ। তার মানে ও কিছু একটা পেয়েছে।’

‘আশা করা যায়।

রুমে গিয়ে স্যাম স্যাটেলাইট ফোন সাথে করে ছোট্ট বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। ২য় বার রিং হতেই ফোন ধরল সেলমা।

‘বেশ। তুমি মেসেজ পেয়েছ তাহলে সেলমা বলল।

‘অবশ্যই পেয়েছি।’

‘যুদ্ধের সময়ে জাপানিরা কোনো গুপ্তধন লটেছিল কিনা সেব্যাপারে আমি আমার বিভিন্ন সোর্সের রিপোর্ট ঘেঁটে দেখলাম। কিন্তু কিছু নেই। কিছু না। তারপর আমি খোঁজ করতে শুরু করলাম তাদের ব্যাপারে যারা বিভিন্ন গোপন বা অবৈধ ধন-রতুগুলো কিনে সংগ্রহ করে। কিন্তু তাতেও ফলাফলে কোনো পরিবর্তন এলো না। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, যদি জাপানিরা গুপ্তধন উদ্ধার করে থাকে তাহলে সেটা এখনও গোপন আছে। বলা যেতে পারে, যুদ্ধকালীন সময়ের অন্যতম বড় গোপন বিষয় এটা।’

‘খারাপ খবর।

‘জানি। তারপরও আমি আরও খোঁজ করে যাচ্ছি। সূত্রের খোঁজ করছি। যদি তোমাদের কোনো কাজে আসে…’

‘সেলমা, বেয়নেট থেকে প্রমাণিত হয়েছে জাপানিরা সেই কোষাগারে ঢুকেছিল। আর আমরা যা দেখে এসেছি… দেয়ালের গায়ের খাঁজেই যদি ওই পরিমাণ সোনা থাকে তাহলে মূল কোষাগারে না জানি কী পরিমাণ ধন-রত্ন ছিল।’

ঠিক। গোপনীয় ধন-রত্ন কেনা-বেচার ব্যাপারে খোঁজ নেয়ার পর তোমার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জাপানিদের দ্বীপ থেকে পালানোর বিষয়টা নিয়ে ঘাটতে শুরু করলাম। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখ।

তারপর?

যা যা পেয়েছি সেসব আমি তোমাকে ই-মেইল করে দেব। কিন্তু গোয়াডালক্যানেলের ওদিকে জাপানি নৌ-বাহিনির যাতায়াতের ব্যাপারে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন নৌ-যুদ্ধের রেকর্ড থাকলেও আমাদের যেটা দরকার সেটা নেই। আমাকে অনেক ঘাঁটতে হয়েছে।

‘তারমানে তুমি ইন্টারেস্টিং কিছু খুঁজে পেয়েছ?

হ্যাঁ। হয়তো এটা কিছুই নয় কিন্তু আমি জানতে পেরেছি মিত্রবাহিনির একটা জাহাজ কিছু জাপানি নাবিককে সলোমন সাগর থেকে উদ্ধার করেছিল। দিনটা হলো ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখ, সকাল বেলা। বিভিন্ন তথ্য মিলিয়ে যা দেখলাম, নাবিকদের ডেস্ট্রয়ার ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে গিয়েছিল। অধিকাংশ ক্রু মারা গিয়েছিল ডেস্ট্রয়ারের।

দাঁড়াও! আমি জাপানিদের চূড়ান্ত পলায়নের ব্যাপারে অনলাইনে পড়েছিলাম। সেখানে বলা আছে কোনো সূত্র না রেখেই গায়েব হয়ে গিয়েছিল তারা।

হয়তো। আমার প্রশ্ন হলো যুদ্ধের সময় মূল নৌ-বহরের সাথে না থেকে প্রায় ১০০ মাইল দূরে সলোমন সাগরে কোন জাহাজটা ছিল? কেন ছিল? আর জাহাজটার কোর্সও কিন্তু বুগেইনভিল আইল্যাণ্ডের দিকে ছিল না। সেলমা একটু থামল। অনলাইন থেকে এতটুকুই জানা গেছে।

‘তোমরা প্রশ্নের পেছনে যথেষ্ট যুক্তি আছে সেলমা। আচ্ছা, তাহলে ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখের গোলমাল এই একটাই?

‘হ্যাঁ। রেকর্ড তো তা-ই বলে। ডেস্ট্রয়ার ডোবার ঘটনাটা চোখের আড়ালেই চলে যেত যদি আরেকটা জাহাজ সলোমন সাগরে না থাকত। কিন্তু এই উদ্ধারকারী জাহাজের ব্যাপারে কোনো তথ্য পেলাম না।

‘আশ্চর্য।

‘হ্যাঁ। টোকিও জাহাজটার কোনো ইতিহাসই রাখেনি।

যারা বেঁচেছিল তাদের কী খবর? কেউ কোনো স্মৃতিচারণমূলক কিছু লিখে যায়নি?

না। তাদের সবাইকে আটক করে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জেল দেয়া। হয়েছিল।

‘তাহলে আমার প্রশ্নটা তো তুমি বুঝতেই পারছ…’

‘পারছি। বেঁচে যাওয়া নাবিকদের হদিস বের করার চেষ্টা করছি। তবে সময় লাগবে। জেলে যাওয়া নাবিকদের প্রত্যেকের নাম ও জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার তথ্য বের করতে হবে আমাকে। অনেকে যুদ্ধের শেষপর্যন্ত বেঁচে ছিল না। আর যারা বেঁচে ছিল তারা যদি আজও বেঁচে থাকে তাহলে থুরথুরে বুড়ো হয়ে গেছে। আর সেটা হওয়ার সম্ভবনা খুবই ক্ষীণ।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল স্যাম। তুমি বললে একটা জাহাজ ঝড়ে ডুবে গিয়েছিল। ঠিক কোথায় ডুবেছিল সেটা বের করা সম্ভব?

‘তোমার আগেই আমি এটা নিয়ে চিন্তা করেছি। মিত্রদের নৌ-বাহিনির রিপোর্ট অনুযায়ী, নাবিকদেরকে যেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল সেখান থেকে বৃত্তাকার ১৫ মাইলের মধ্যে জাহাজটা ডুবেছে। আর ঝড়ের গতি ছিল উত্তরদিকে।’ সেলমা ইতস্তত করছে। এটা ভাল খবর নয়।

“কেন?”

‘সাগরের ওই অংশের গভীরতা ১৬ থেকে ১৭ হাজার ফুট।

স্যাম যেন বুকে ধাক্কা খেল। তাহলে ওই জাহাজে যদি গুপ্তধন থেকে থাকে তাহলে সেগুলো ওখানেই থাকবে।’

‘তবে রেইজ দ্য টাইটানিক এর মতো যদি কিছু করতে চাও তাহলে ভিন্ন কথা।

নাহ, সম্ভব না। আমি এরকম খবরের আশা করিনি।’

এখানে আমার কোনো দোষ নেই কিন্তু।

‘গোয়াডালক্যানেল থেকে সৈনিক নিয়ে পালানোর সময় একটা ডেস্ট্রয়ার কেন নিরাপদ পথ ছেড়ে সমুদ্রের ওই পথ দিয়ে যাত্রা করতে গেল?’ বলল স্যাম ‘পোর্ট থেকে প্রায় ১০০ মাইল দূরে। কেন ঝড়-ঝঞ্ঝার পথ মাড়াতে গেল?

‘আমি আন্দাজ করেছিলাম তুমি এরকম প্রশ্ন করবে। ম্যাপ দেখো, অনেককিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে তাহলে।

‘কেন, সেলমা? কী আছে ওতে?

‘আমার মনে হয় না, ওটা বেজে নোঙ্গর করত। কারণ ডেস্ট্রয়ারটার কোর্স ছিল সোজা জাপানের দিকে।

.

২৫.

রাতে স্যাম ও রেমি ওদের ই-মেইলের ইনবক্স চেক করে দেখল। সেলমার কাছ থেকে একটা সংক্ষিপ্ত মেইল পেয়েছে স্যাম! ডুবে যাওয়া সেই ডেস্ট্রয়ার থেকে উদ্ধার পাওয়া একজনের খোঁজ করছে সেলমা। তার বয়স ৯০-এরও বেশি। একমাত্র সে-ই বেঁচে আছে। সময়ের ফেরে বাকিরা আর পৃথিবীতে নেই। স্যাম আশা করল আগামীকাল হয়তো সেলমা আরও বিস্তারিত তথ্য পাঠাবে। স্যাটেলাইট ফোন নিয়ে বারান্দায় গেল স্যাম! সেলমার ফোন দু’বার রিং হলো কিন্তু কেউ জবাব দিল না।

‘এখানে কী করছ?’ স্লাইডিং ডোর খুলে রেমি জানতে চাইল। হঠাৎ করে রেমি’র আওয়াজ পেয়ে স্যাম চমকে উঠেছে। ওর হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল। স্বামীর মুখভঙ্গি দেখে রেমি “সরি” বলল।

‘ব্যাপার না। হঠাৎ করে তোমার কথা শুনে চমকে গিয়েছি আরকী।

‘সেলমা?’

‘হ্যাঁ। চেষ্টা করলাম কিন্তু কেউ ফোন ধরল না।’ স্যামের হাত থেকে ফোনটা পড়ে গিয়ে বিচের বালুতে গিয়ে মুখ গুঁজেছে। সেদিকে তাকাল ও। ‘আমি এখুনি আসছি।

‘আমিও আসি?’

স্যাম হাসল। আজকের দিনের সেরা প্রস্তাব এটা!’

বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে গিয়ে বিচে গেল। বালুর উপর থেকে ফোনটা তুলল রেমি। স্যাম ওকে ফিসফিস করে বলল, “তাকিয়ো না। বিচে কয়েকজন লোককে দেখতে পাচ্ছি। নিজেদেরকে আড়াল করার খুব চেষ্টা করছে। আসছে এদিকে।

ঘাড় না ফিরিয়ে বালুর দিকে তাকাল রেমি! এইমাত্র ওদের পায়ের ছাপ পড়েছে বালুতে। আমাদের পেছনে?

হ্যাঁ।

‘তাহলে আমি সামনে থাকব।’

‘তাড়াতাড়ি হাঁটো। এই দ্বীপে এরকম সময়ে বাইরে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

রেমি’র পিছু পিছু দ্রুত এগোল স্যাম। কান খাড়া করে রাখল পেছনের আওয়াজ শোনার জন্য। ধারণা সঠিক। বালুতে দ্রুত স্যাণ্ডেল ওঠা-নামার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। স্যাম সাহস করে পেছনে তাকাল। দু’জন স্থানীয় লোক আসছে ওদের পিছু পিছু। দূরত্ব মাত্র ৩০-৪০ ফুট। খুব দ্রুত দূরত্ব কমে আসছে।’

‘রেমি দৌড়াও!’ বলল স্যাম। রেমি গ্ৰেহাউণ্ডের মতো গতি বাড়াল। দৌড়ের গতি বাড়াতে গিয়ে স্যাম টের পেল ওর জিম করার সময়টা আরও বাড়াতে হবে। হঠাৎ করে দ্রুতগতিতে এগোতে গিয়ে ফুসফুসে যেন আগুন ধরে গেছে।

হোটেলের স্টিলের দরজার কাছে পৌঁছে কি-কার্ড বের করল রেমি। কয়েক সেকেণ্ড পর স্যামও হাজির। কোনমতে কি-কার্ডটা স্ক্যান করাল মিসেস ফারগো। পেছনে তাকিয়ে দেখল লোক দুটো আর মাত্র কয়েক পা দূরে!

দরজা খুলতেই ভেতরে ঢুকে পড়ল ওরা। দরজা লাগিয়ে দিল। লবিতে থাকা এক গার্ড এগিয়ে এলো ওদের দিকে।

‘আপনেগো কুনো সমস্যা?

স্যাম ও রেমি একে অন্যের দিকে তাকাল। দু’জনই হাপাচ্ছে। মাথা নাড়ল স্যাম। না, ঠিক আছে। কিন্তু বাইরের বিচে গুণ্ডা টাইপের দু’জন লোক ছিল।

গার্ড হাতের ব্যাটন মারমুখী ভঙ্গিতে ধরে বলল। আপনাগো কিছু হয় নাই

না, হয়নি। তবে অল্পের জন্য বেঁচে গেছি।’ বলল রেমি।

‘এইহানে এইরাম টাইমে ভালা আচরণ পাইবেন না। বিশেষ কইর‍্যা রাইতে।’ গার্ড বলল। কী যেন বলল রেডিওতে। আমরা বিষয় দেখতাছি।

‘চলো, রেমি।’ স্ত্রীকে নিয়ে রুমে গেল স্যাম। বারান্দায় গিয়ে বিচের দিকে তাকাল। না, লোক দুটো নেই। শুধু তাদের পায়ের ছাপ আছে। সেটাও ধুয়ে যাচ্ছে সাগরের ঢেউয়ে।

‘চন্দ্রবিলাস করতে যাওয়াটা হয়তো ঠিক হয়নি। স্যাম বলল।

‘ফোনটা তো আনতেই হতো।

‘তা ঠিক। কিন্তু হাত থেকে পড়ে যাওয়াটাই তো অসাবধানতার পরিচয় দেয়। এই দ্বীপের অবস্থা ভাল নয়, বারবার ভুলে যাই বিষয়টা।

স্যামের বাহুতে মাথা রাখল রেমি। তাতে কী হয়েছে?

‘থাক, কিছু না।

পরদিন সকালে ওরা যখন ঘুম থেকে উঠল তখন গুঁড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। ইন্টারনেটে ঢুকল স্যাম। সেলমা আরেকটা মেসেজ পাঠিয়েছে। সিডনি থেকে ৪০ মাইল দক্ষিণের এক শহরের ঠিকানা দিয়েছে ও। সাথে এক ব্যক্তির নাম। স্যাম নাম ও ঠিকানা শব্দ করে উচ্চারণ করল যেন রেমি শুনতে পায়।

‘তোশহিরো ওয়াতানাবি, ওল্লোংগং, সাউথ ওয়ালেস। ১৮ নাম্বার রিজ গার্ডেন।

ওল্লোংগং? এটা কোনো জায়গার নাম। সত্যি?’ রেমি প্রশ্ন করল।

স্যাম মাথা নাড়ল। তাই তো দেখছি। সময় দেখল ও। অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পরবর্তী ফ্লাইট কয়টায়?

ট্রাভেল ওয়েবসাইট বের করল রেমি। দুই ঘণ্টা পর একটা ফ্লাইট আছে। ব্রিসবেন দিয়ে যাবে। কালকের আগে সরাসরি সিডনি যাওয়ার কোনো প্লেন নেই।’

তাহলে চলো একটু ঘুরে আসি।

‘দারুণ। তবে আমার নতুন পোশাক কিনতে হবে।

‘দুনিয়ার ওই এক জিনিস ছাড়া আর কিছু করার নেই নাকি? আগে চলো সকালের নাস্তা সেরে নিই।

হাতে সময় নেই। এয়ারপোর্ট চল।

আচ্ছা! তাহলে যা খাওয়ার ব্রিসবেনে গিয়ে খাব।’

‘আমরা কি এই রুম ছেড়ে দেব?’

না, রুম থাকবে। দুই দিনের জন্য কী কী লাগবে তোমার… সাথে নিয়ে নাও।’

ফ্লাইটে মাত্র অর্ধেক যাত্রী উঠেছে। ব্রিসবেনে নেমে হোটেল বুকিং ও খাওয়া-দাওয়া সেরে জেমস স্ট্রিটে গেল ওরা। শপিং করল। সত্যি বলতে শপিং যা করার রেমি-ই করল। স্যামের শপিং বলতে রেমি’র নতুন পোশাকের ব্যাপারে “ভাল লাগছে” “দারুণ মানিয়েছে” এসব বলে যাওয়া।

পরদিন সিডনি পৌঁছে সড়কপথে ওললাংগং রওনা হলো ফারগো দম্পতি। ওয়াতানাবি সাহেবের চিকিৎসা যেখানে হয়েছিল সেই নার্সিং হোমের ঠিকানা যোগাড় করে নিজের যাবতীয় শক্তি-সামর্থ্য খাঁটিয়ে ওদের দুজনের জন্য ওয়াতানাবি’র সাথে সন্ধ্যায় একটা মিটিঙের ব্যবস্থা করেছে সেলমা।

ওয়াতানাবি’র বাড়িতে এসে ওরা দেখল ইটের দোতলা বাড়ি। রাস্তার দু’পাশে সারি সারি গাছ লাগানো। কাছেই একটা হাসপাতাল আছে। বাড়িতে ঢুকতেই এক মোটাসোটা মহিলা এসে ওদের দুজনকে কার্ড রুমে বসতে দিয়ে ওয়াতানাবি-কে আনতে গেল। ৫ মিনিট পর হুইলচেয়ারে একটা রুগ্ন শরীরের জাপানিজকে নিয়ে ফিরল সে। লোকটার চুলগুলো রূপোলী। চেহারায় অনেক বলিরেখা।

‘মিস্টার ওয়াতানাবি, আমাদের সাথে দেখা করার জন্য ধন্যবাদ। ওয়াতানাবি যেহেতু অস্ট্রেলিয়ায় বেশ কয়েক বছর ধরে আছে তাই সে ইংরেজি বোঝে, এটা ধরে নিয়ে ইংরেজিতেই বলল রেমি। স্যাম আর ও দু’জন মিলে পরামর্শ করে এসেছে… অপরিচিত কারও কাছে কথা বলার সময় নারীরা আগে কথা বললে পরিস্থিতি অনুকূলে রাখতে সুবিধে হয়। প্রথমেই পুরুষ কথা বললে আবহাওয়ায় মিষ্টতা থাকে না।

ওয়াতানাবি মাথা নাড়ল। কিছু বলল না।

‘আমার স্বামী ও আমি হলাম আর্কিওলজিস্ট।’

এবারও কিছু বলল না সে। খুব মিষ্টি করে হাসি দিল রেমি। আমরা যুদ্ধের সময়কার বিষয় নিয়ে জানতে এসেছি। আপনাদেরকে যখন বন্দী করা হয়েছিল, সেই জাহাজের ব্যাপারে কিছু বলুন। অনেক দূর থেকে আপনার কথা শুনতে এসেছি আমরা।’

জাপানির চোখ সরু হলো কিন্তু এবারও সে চুপ। রেমি ভাবল, আরেকবার চেষ্টা করা যাক।

‘আপনার সাথে আরও চারজন নাবিককে উদ্ধার করা হয়েছিল শুনেছি। ঝড়ের মধ্যে সমুদ্রযাত্রা অনেক কঠিন ছিল, তাই না?

‘তিনজন নাবিক, একজন সৈনিক।’ বলল ওয়াতানাবি। তার কণ্ঠ বেশ কোমল।

‘আচ্ছা। তাহলে সবমিলিয়ে ৫ জন?

‘হ্যাঁ। ১০০ জন থেকে ৫ জন।

কাহিনিটা বলবেন আমাদেরকে? কী হয়েছিল?

কাধ ঝাঁকিয়ে চেয়ারে নড়েচড়ে বসল ওয়াতানাবি। ঝড়ের কবলে পড়ে আমাদের জাহাজটা ডুবে যায়। তার ইংরেজি উচ্চারণ বেশ ভাল। তবে একটু অস্ট্রেলিয়ান টান আছে।

‘হা, জানি। ডেস্ট্রয়ার, তাই না?

জাপানিজ মাথা নাড়ল। ওটার বয়স ছিল মাত্র ১ বছর। কিন্তু ওই এক বছরেই অনেক আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল।

তারপর?

‘সেভাবে মেরামত করা সম্ভব হয়নি। পানি ঢুকে পড়েছিল জাহাজে। পরিস্থিতি সামাল দেয়ার কোনো উপায় ছিল না। সাগরে ডুবে গেল জাহাজটা।

‘আচ্ছা। তো দ্বীপের ওদিকে কী জন্য গিয়েছিলেন?’ রেমি জানতে চাইল।

‘গোয়াডালক্যানেল থেকে সৈনিকদের তুলতে গিয়েছিলাম। আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল ওদেরকে নিয়ে টোকিও চলে যেতে হবে। অনেক দীর্ঘ যাত্রা। ঝড়টা হঠাৎ করে উদয় হয়েছিল। মেঝের দিকে তাকাল ওয়াতানাবি। ‘আমাদের অধিকাংশের জীবনের শেষ চমক ছিল ওটা।

‘আমাদেরকে সেই রাতের কথা বলুন।’ বলল রেমি। ওই ঘটনার অভিজ্ঞতা যাদের ছিল তাদের মধ্যে একমাত্র আপনিই বেচে আছেন এখনও।

ওয়াতানাবি তার দু’চোখ বন্ধ করল। খুলল একটু পর। গলা পরিষ্কার করে স্মৃতি হাতড়ে বলতে শুরু করল সে।

‘আমাদের বেজ থেকে সন্ধ্যায় রওনা দিয়েছিলাম। জানতাম, বুগেইনভিল এর ১০০ মাইলের ভেতরে আমাদের কোনো প্লেন আক্রমণ করবে না। কারণ ওইটুকু শত্রুপক্ষের রেঞ্জের বাইরে ছিল। ৩০ নট গতিতে এগোচ্ছিলাম আমরা। সাগর সে-রাতে কেমন যেন দ্বিধা-দ্বন্দে ছিল। ঝোড়ো বাতাস আসছিল পশ্চিম দিক থেকে। কে জানতো, সেই হালকা ঝোড়ো বাতাস থেকে আমাদের কপালে দুর্গতি ঘটবে। রাত সাড়ে দশটার দিকে গোয়ালক্যানেলে পৌঁছুলাম আমরা। সৈনিকদের তুলে নিয়ে ১ ঘণ্টার মধ্যে রওনা হলাম।

ওয়াতানাবিকে উৎসাহ দিয়ে মাথা নাড়ল রেমি।

‘যাত্রার দুই ঘণ্টার পর থেকে শুরু হলো সাগরের রুদ্রমূর্তি ধারণ। পাহাড় সমান উঁচু উঁচু ঢেউ আসতে শুরু করল। সাথে তুমুল বৃষ্টি আর বাতাস। অবশ্য ওর চেয়েও জঘন্য আবহাওয়ার মোকাবেলা করার অভিজ্ঞতা ছিল আমাদের। কিন্তু আগের আঘাতপ্রাপ্ত অংশের মেরামত বিকল হয়ে গেল… সমস্যাটা তৈরি হলো তখন। আমাদের হাতে করার মতো কিছুই ছিল না। কয়েকটা লাইফবোট ছিল কিন্তু সেগুলো ব্যবহার করে শান্তি পাওয়া যায়নি। কারণ, আমাদের সাথে সৈনিকরা রয়েছে। আবহাওয়ার ভয়ঙ্কর রূপের সামনে জাহাজ খুব বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি। দীর্ঘ শ্বাস ফেলল ওয়াতানাবি। অধিকাংশ সৈনিক সাঁতার জানত না। আর যারা জানত তারাও সুবিধে করতে পারেনি। এত এত পানি আর ঢেউ। ৪০, ৫০ ফুট উঁচু ঢেউ এলে আসলে কিছু করার থাকেও না। ওর মধ্যে কারও বেঁচে যাওয়াটা রীতিমতো অলৌকিক ঘটনা। ওভারলোড হয়ে লাইফবোট ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। চোখ বন্ধ করল জাপানিজ। তারপর এলো হাঙরের দল।

আপনারা তাহলে জাপান ফিরছিলেন?’ স্যাম জানতে চাইল।

হ্যাঁ। আমাদের ক্যাপ্টেনকে সেটাই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

কারণ?

ওয়াতানাবি মাথা নাড়ল। তা তো জানি না। আপনি যখন নাবিক হিসেবে কাজ করবেন যখন আপনাকে যা নির্দেশ দেয়া হবে সেটাই পালন করতে হবে।’

হাসল রেমি। আপনারা গোয়াডালক্যানেল থেকে শুধু মানুষই তুলেছিলেন?

‘হ্যাঁ।’ ভ্রু কুঁচকে গেল জাপানির। পালানোর মিশন ছিল ওটা।’

‘কোনো মাল কিংবা কারগো তোলার সম্ভাবনা ছিল আপনাদের জাহাজে?

প্রশ্নটা শুনে ওয়াতানাবি বোধহয় ধাঁধায় পড়ে গেছে। কী লাভ এনে? সৈনিকদের কাপড়-চোপড় ঘেঁড়া- ময়লা। পেটে ক্ষুধা। মুমূর্ষ অবস্থা ছিল ওদের।

‘কোনো কিছু লোড করার মতো সময় ছিল?

একটু ভেবে দেখল জাপানি না। কোনমতে সৈনিকদের তুলে নেয়া হয়েছিল।

হঠাৎ দরজা খুলে এক এশিয়ান নারী ঢুকল রুমে। তার বয়স প্রায় ৬০ বছর হবে। চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে বেশ ক্ষিপ্ত।

‘এখানে কী করছেন?’ স্যাম ও রেমি’র দিকে তাকিয়ে কৈফিয়ত দাবি করল মহিলা। এমনভাবে প্রশ্নটা করল যেন ওরা দুজন মিলে লোকটাকে এতক্ষণ পেটাচ্ছিল।

‘আমরা জাস্ট কথা বলছিলাম। ওনার অনুমতি নিয়েই। বলতে গেল রেমি। কিন্তু মহিলার কারণে থেমে যেতে হলো।

কথা? কীসের কথা? আমার বাবার সাথে কীসের কথা আপনাদের?

মহিলার দিকে তাকিয়ে চুপসে গেল ওয়াতানাবি। যুদ্ধ নিয়ে কথা বলছিলাম।’

রেমি’র দিকে তাকাল মহিলা। মাথা নাড়ল। বহুত কথা বলেছেন। এবার আসুন। ওনার শরীরের অবস্থা ভাল না। অপরিচিত লোকদেরকে সেই ভয়ঙ্কর রাতের গল্প শোনানোর কোনো দরকার নেই।’

‘দুঃখিত। আমরা জাস্ট…’ বলমে গেল স্যাম।

কিন্তু মহিলা ওকে বলার সুযোগ দিল না। আসুন! উনি ক্লান্ত। দেখেছেন বাবার চেহারা? আপনাদের সমস্যাটা কী? নুন্যতম বিবেকবোধ নেই আপনাদের? নরক থেকে কোনমতে ফিরে এসেছে বাবা। ওনাকে শান্তিতে থাকতে দিন।’

দরজার দিকে এগোল ফারগো দম্পতি। আমরা কিন্তু ক্ষতি হতে পারে এমনকিছু করিনি বা করতে চাইনি। আস্তে করে বলল রেমি।

‘আমি বড় হতে হতে দেখেছি যুদ্ধ আমার বাবাকে কী করেছে। জাপান থেকে সরে এসেছে বাবা। দেশটাকে বাবা অনেক ভালবাসত। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে আর কখনও ফিরে যায়নি। আপনারা কী জানেন? কিছু জানেন না। জাস্ট… চলে যান। অনেক হয়েছে।

রেমিকে নিয়ে স্যাম বাইরে বেরোল। ওর মুখ শক্ত হয়ে আছে।

‘উনি বোধহয় ঠিকই বলেছেন। আমরা আসলে খুব বেশি কিছু জানি না। তাই না?

‘স্যাম, আমরা কিন্তু এরকম পরিস্থিতিতে প্রায়ই পড়ি। শোনোনা, ওয়াতানাবি’র সাথে আমাদেরকে কথা বলতে হবে। উনি ছাড়া আমাদের আর কোনো রাস্তা নেই।’

‘জানি। কিন্তু তার মেয়ে তো ক্ষেপে ভূত! বুড়ো লোকটাকে বিব্রত করলাম হয়তো।

‘ওয়াতানাবি’র কোনো আপত্তি নেই কিন্তু। যত আপত্তি তার মেয়ের। বাবাকে সামলে রাখতে চায়।’

স্যাম মাথা নাড়ল। তার দিকটাও আমি বুঝি।

‘স্যাম, আমরা ভুল কিছু করিনি। ‘তা তো জানি। কিন্তু কেন এরকম মনে হচ্ছে, ভুল করেছি?

২৬. হনিয়ারা ফিরে

২৬.

পরদিন বিকেলে স্যাম ও রেমি হনিয়ারা ফিরে দেখল রাস্তাঘাট ভেজা। একটু আগে বৃষ্টি হয়েছে। হোটেলের রুমে ঢুকে রেমি খেয়াল করল এক চিলতে হাসি ঝুলছে স্যামের ঠোঁটে।

কী ব্যাপার? প্রশ্ন করল ও।

‘গাড়ি নিয়ে ড্রাইভ করার জন্য আজকের দিনটা দারুণ।

চোখ সরু করল রেমি। “ও আচ্ছা, তাই? তোমার মতলবটা কী?

‘চলো আবার রুবো’র সাথে গিয়ে কথা বলি। দ্বীপে জাপানিদের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে তিনি হয়তো আমাদেরকে কিছু জানাতে পারবেন।

জানলেও বা কী! দেড় মাইল গভীর পানির নিচ থেকে জাহাজ কীভাবে তুলবে সেটাই প্রশ্ন।

‘তা ঠিক।’ স্যাম বলল। তবে আমাদের হাতে এখন করার মতো কিছু নেই। অবশ্য শিপে গিয়ে ডাইভারদের ডাইভ করা দেখা যায় কিন্তু সেটা তো কোনো কাজের কাজ হলো না, তাই না?

‘এরআগের বার ওদিকে যাওয়ার পর ফেরার সময় কিন্তু গাড়ি ছাড়া ফিরতে হয়েছিল, মনে আছে?’

কথা দিলাম। আর রাস্তা থেকে ছিটকে যাব না।

‘গুলিও ছোঁড়া হয়েছিল কিন্তু রেমি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আমার মনে হয় এসব নিয়ে কথা বলার কোনো মানে হয় না।

‘আমাদের কিছু হবে না।’ থামল স্যাম। খুব আগ্রহের সাথে বলল, সৈকতের পাশ দিয়ে ড্রাইভ করার চেয়ে মজার আর কী হতে পারে?

হয়েছে, ফারগো, হয়েছে।’

নাদান দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকাল স্যাম।

শহর থেকে বাইরে যাওয়ার পথে একটা রোডব্লকে পড়ল ওরা। পুলিশরা এখন অনেক আয়েশ করছে। তেমন কোনো কড়াকড়ি নেই। স্রেফ রুটিন ডিউটি দিচ্ছে।

কাঁচা রাস্তা শুরু হওয়ার পর গাড়ি ঝাঁকুনি খেতে শুরু করল।

‘স্যাম যা-ই করো, আমাকে কথা দাও, আমরা যেন আটকে না পড়ি।

‘আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।

কী চেষ্টা করবে? কথা দেবে না? নাকি আটকে পড়বে না? কোনটা?

‘আশা করি, কোনোটাই নয়।’

‘তুমি আমাকে মানানোর চেষ্টা করছ না, আমরা কথার গুরুত্বও দিচ্ছ না।

রুবোর কুড়েঘরের সামনে পৌঁছুল ফারগো দম্পতি। রুবো ছায়ায় বসে নদীর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। গাড়ির শব্দ শুনে ওদের দিকে তাকাল রুবো। গাড়ি থেকে বের হয়ে রেমি হাত নাড়ল।

রুবো, আমরা আপনাকে বিরক্ত করছি না তো?

হাসল রুবো৷ না। বিরক্ত হমু ক্যান। আরও গল্প শুনাবেন?

জি।

ছায়ার গিয়ে বসল ফারগো দম্পতি। এখানে এত গরম যে ছায়ায় বসেও ঘামছে ওরা। স্যাম কখন বলতে শুরু করবে তার জন্য রেমি অপেক্ষা করছে।

রুবো, আপনি বলেছিলেন, এই দ্বীপে জাপানিরা ছিল। স্থানীয় লোকদের সাথে খারাপ ব্যবহার করত তারা।

রুবো সায় দিল মাথা নাড়ল। ‘হ। জাপানিরা কুমীরের লাগান বদ আছিল।

‘সবাই?

‘হেইডা কওয়া মুশকিল। কিন্তু ব্যাবাক কিছু যে অফিসার চালাইত… হে আস্তা জানোয়ার আছিল।’

‘তার ব্যাপারে আমাদেরকে বলতে পারবেন?

‘শয়তানডার নাম আছিল কুমা… কুমাসাকা। কর্নেল কুমাসাকা। এই নাম আমি জীবনে ভুলুম না।

‘কী করতেন তিনি?

রুবো এরআগে যা বলেছিল আজও তা-ই বলল। নতুন কিছুই জানা গেল না। তাই ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করল।

‘দ্বীপের পশ্চিম পাশে জাপানিদেরকে কিছু করতে দেখেছেন কিংবা শুনেছেন কখনও?

কীরাম?

‘অদ্ভুত কিছু। হয়তো সাগরে ডুব দিয়েছিল জাপানিরা কিংবা অন্যকিছুও হতে পারে।’

‘যুদ্ধের শ্যাষের দিকে অনেক গুলাগুলি হইছে। তাই একেবারে সঠিক কইরা কিছু কইতে পারুম না। তয় দ্বীপ ছাইড়া যাওনের আগে সাগরের পাশের এক গ্রামের অনেকজনরে ওরা খুন কইরা গেছিল।

‘তাই?

‘আমি শুনছি। দেহি নাই।

মাথা নাড়ল রেমি। বুঝতে পারছি। কী মনে হয়, রুবো? কী হয়েছিল?

‘আমি শুনছি, আমাগো অনেক লোকরে জাপানিরা মাইরা ফালাইছে। প্রথমে কামলা বানায়া কাম করাইসে পরে যাওনের সময় খুন কইরা থুইয়া গেছে।

কামলা? অর্থাৎ শ্রমিক? কী কাজে নিয়েছিল জাপানিরা?”

“জানি না।’

‘স্বাভাবিক কাজ ছিল সেটা?

রুবো মাথা নাড়ল। হেইডা কইতে পারি না। তয় কামের লিডার আছিল কুমাসাকা। মানুষরে মাইরা ফালাইয়্যা মজা পাইত ব্যাডা। আস্তা শয়তান আছিল। পাশে থাকা শুকনো পাতার উপর থুথু ফেলল রুবো। মাত্র দুইজন জান লইয়্যা বাঁচতে পারছিল। বাকি সবাইরে…’দুখী মুখে রুবো মাথা নাড়ল।

‘ওই ঘটনা থেকে লোক বেঁচে ছিল? প্রশ্ন করল স্যাম।

‘হ, একজন এখনও বাইচ্যা আছে মনে হয়। ব্যাডার কই মাছের জান।

‘সত্যি? আপনি তাকে চেনেন?’

‘একটা জায়গায় আপনে অনেকদিন থাকলে এমনেই সবাইরে চিন্না ফালাইবেন।

‘আচ্ছা, তাহলে তো আপনি জানেন তিনি কোথায়।

‘হ, জানি। ওই গ্রামেই থাকে মনে হয়। রেমি’র দিকে তাকাল ও ‘তয় এইহানকার ভাষা ছাড়া অন্য কিছু পারে না।’

‘আমাদেরকে তার কাছে নিয়ে যাবেন?’ রেমি প্রশ্ন করল।

গাড়ির দিকে তাকাল রুবো। বহুত রাস্তা।’

‘রাস্তা ভাল না?’

হাসল রুবো। আবার থুথু ফেলল। রাস্তাই নাই। আপনেগো ওই গাড়িতে চইড়া যাইবার পারবেন না।’

‘আচ্ছা, যদি বড় ট্রাক নিই তাহলে আপনি যাবেন আমাদের সাথে? আপনাকে সম্মানী দেব।’

রুবো প্রথমে স্যাম তারপর রেমি’র দিকে তাকাল। কত দিবেন?

‘সলোমন ডলারে নেবেন নাকি আমেরিকান ডলারে? স্যাম প্রশ্ন করল।

‘আমেরিকান।

‘আচ্ছা, বলুন কত হলে আপনার ন্যায্য সম্মানী হবে?

গভীরভাবে ভাবল রুবো। তারপর বলল, “১০০ আমেরিকান ডলার দিবেন।

ফারগো দম্পতি আর দর কষাকষি করতে গেল না! বেশ, দেব।’ ঘড়ি দেখল রেমি। শহর থেকে এখানে আসতে দেড় ঘণ্টা লাগে। নতুন একটা গাড়ি ভাড়া করে এখানে আসাটা বেশ তাড়াহুড়ো করে করতে হবে। আগামীকাল সকালে এসে আপনাকে নিয়ে যাব। ঠিক আছে?

ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল রুবো। দাঁতবিহীন মাঢ়ি বের করে হাসল। ১০০ ডলার।

.

২৭.

সিডনি, অস্ট্রেলিয়া

নিজের ইয়টে মুখ হাঁড়ি করে বসে আছে জেফরি গ্রিমস। তার থেকে কয়েক ফুট দূরে ইয়টের ক্যাপ্টেন দাঁড়িয়ে রয়েছে।

‘সব শালা চোর। পালিশের কী হাল! শিরিশ কাগজ দিয়ে ডলা দিলেও এরচেয়ে ভাল পালিশ করা যায়। এই চোরগুলোকে টাকা দেয়া হয় এরকম ফাঁকিবাজি করার জন্য?

‘স্যার, এরআগের কাজটাও আপনার পছন্দ ছিল না তাই আমি নতুন করে ইয়টটাকে পালিশ করিয়েছি। আপনার বন্ধুর পরামর্শ নিয়েই করেছি সব। এবার সবকিছু তো ঠিক হওয়ার কথা। বলল ক্যাপ্টেন।

‘কীসের ঠিক? দেখলেই তো মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। সিরিয়াসলি? এটা কোনো পালিশ হলো? ইয়টের পেছনের অংশে পা বাড়াল গ্রিমস। এদিকটা বেশ উজ্জ্বল ও সুন্দর করে বার্নিশ করা। যাক, চোরগুলো এই অংশের কাজ একটু ভাল করেছে। রীতিমতো অলৌকিক ঘটনা!’

হঠাৎ তার সেল ফোন বেজে উঠল। কোনো কলারের আইডি ফোন স্ক্রিনে ওঠেনি। শক্ত করে গেল গ্রিমসের পাকস্থলীর ক্যাপ্টেনকে বলল, এখন আপনি আসতে পারেন।

‘জি, স্যার।

ক্যাপ্টেন যথেষ্ট দূরের যাওয়ার আগপর্যন্ত গ্রিমস অপেক্ষা করল। হ্যাঁ, বলছি…

ফিল্টার করা যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর শোনা গেল ওপাশ থেকে। সব কাজ বেশ দ্রুত এগোচ্ছে।

গ্রিমস হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আমি তো সেরকম কোনো নমুনা দেখতে পাচ্ছি না। আপনি পাচ্ছেন?

এরআগেও বলেছি, কোনো কিছু করতে হলে সময়ের প্রয়োজন। তবে আমি স্বীকার করছি, চাপ আরও বাড়ানো দরকার।’

গ্রিমস চারদিকে তাকিয়ে দেখে নিল ওর দিকে কেউ তাকিয়ে আছে কিনা। গলা নামিয়ে বলল, হঠাৎ করে এরকম কঠিন পদক্ষেপ নেয়াটা কি খুব জরুরী ছিল?

‘সেটা ফলাফলই বলে দেবে। ইতিহাস দেখুন, বড় অর্জনগুলো রক্ত না ঝরিয়ে সম্ভব হয়নি। এই ক্ষেত্রে বাদ যাবে কেন?

‘ওরা তো নির্দোষ এইড কর্মী ছিল।’

আপনি লাভের অংকটা ভুলে যাননি।

‘অবশ্যই ভুলিনি। আমি ভাবলাম… ওটা এই ব্যাপারে সেভাবে কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না।

‘পারবে। যা হওয়ার হয়ে গেছে। সামনে আরও হবে… প্রস্তুত থাকুন। আপনার তো এসব তিতা লাগছে মনে হয়।

‘আচ্ছা, এসব করা খুবই জরুরী?’

‘জরুরী না হলে আমি কোনো কাজ করি না। আশা করছি, আপনি আমাকে বরাবরের মতো সাহায্য-সহযোগিতা করবেন?

পানিতে ভাসা ইয়টগুলোর দিকে তাকাল গ্রিমস। একেকটা দাম মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। সব বিলাসিতা। মানুষ শুধু উপরে উঠতে চায়। সবার চেয়ে উপরে সেরা জায়গাটায় থাকতে চায়। এসব বিলাসিতার মাধ্যমে অহমিকা, অহংকার আর অর্থের প্রতাপ দেখাতে চায় মানুষ। গ্রিমস কোনো কাজে পিছ পা হওয়ার লোক নয়। তবে এই প্রজেক্টের ঘটনাগুলো ওর আশানুরূপ হচ্ছে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে, হ্যাঁ। যা প্রয়োজন মনে হয় করুন। কিন্তু খোদার দোহাই লাগে, তাড়াতাড়ি করুন।

‘কাজ চলছে। এতটা অগ্রগতি এরআগে কখনও হয়নি। দ্বীপে লোকজন নেই বললেই চলে। এখন একটু ধাক্কা দরকার।

‘ধাক্কার ব্যাপারে জানতে চাইব?’

‘আপনি যতটুকু জানেন এরচেয়ে বেশি না জানাই ভাল।

ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

একটু পর ফিরল ক্যাপ্টেন। গ্রিমসের এখন ইয়টের পালিশের খুঁত ধরার মতো মানসিক অবস্থা নেই। হাত নেড়ে ক্যাপ্টেনকে সরিয়ে দিল সে। ডকে নেমে এলো। হাজার মাইল গতিতে ওর মনে চিন্তার ঝড় বইছে।

***

গোয়াডালক্যানেল, সলোমন আইল্যাণ্ড

কাদায় ভরা রাস্তা মাড়িয়ে পাহাড়ী রাস্তায় চলছে টয়োটা ল্যাণ্ড ক্রুজার। ২৫ মিনিট আগে মেইন রোড ছেড়ে এই কাঁচা রাস্তায় ঢুকেছে ওরা। রুবো আছে ওদের সাথে।

আর কতদূর?’ পেছনের সিটে বসা রুবোকে জিজ্ঞাস করল রেমি।

বুড়ো কাঁধ ঝাঁকাল। এইহানে বহুত দিনে আগে আইছিলাম।

‘তা হোক, কিন্তু দূরত্ব তো একই আছে।

‘সমস্যা নাই, তাড়াতাড়ি পৌঁছায়া যামু। রেমিকে আশ্বস্ত করল রুবো।

রেমি ইতিমধ্যে জেনেছে এই দ্বীপে “তাড়তাড়ি”র মানে আক্ষরিক অর্থে “তাড়াতাড়ি” নয়। ওটার মানে “আগামীকাল থেকে শুরু করে “অসীম” পর্যন্ত হতে পারে।

স্যাম রেমি’র দিকে তাকাল। ধৈৰ্য্য একটা মহৎ গুণ।

‘ওসব আমাকে শুনিয়ো না।’

একটা ছোট জলপ্রবাহের সামনে এসে থামল ওরা। সামনের রাস্তা দু’দিকে ভাগ হয়ে গেছে। একটা বামদিকে আরেকটা ডানদিকে।

‘কোনদিকে যাব?’ পেছন ফিরে রুবোকে প্রশ্ন করল স্যাম।

প্রশ্নটা রুবো ভেবে দেখল। মাথা নেড়ে বলল, ‘গিয়ে দেখতে হবে।’

গাড়ি থেকে নামল স্যাম ও রুবো। স্যাম বৃদ্ধকে গাড়ি থেকে নামতে সাহায্য করল। পানির ধারার সামনে গিয়ে চোখ বন্ধ করল রুবো। মাথা নাড়ল আরেকবার। স্যাম ধৈর্যসহকারে অপেক্ষা করছে। কিছুক্ষণ রুবো চোখ খুলল।

আরেকবার যহন এইহানে আইছিলাম তহন পানি আছিল না।

‘আর?

‘আমার মনে হইতাছে গ্রামডা ওই দিকে। বামদিক দেখিয়ে বলল রুবো।

কীভাবে বুঝলেন?

‘আমি কিন্তু কই নাই “আমি জানি আমি কইছি “আমার মনে হইতাছে” বুঝছেন?

তারমানে আপনি নিশ্চিত নন…’

‘ওইদিকে না পাইলে অন্যদিকে যামু, সমস্যা কী? বামে না থাকলে ডাইনে থাকব।

‘ভাল বুদ্ধি। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম আপনি জানেন গ্রামটা কোথায়।

‘জানি তো।’

কিন্তু প্রথমবারেই সরাসরি সেখানে নিয়ে যাবেন, অতটা ভালভাবে নয়।’

‘আপনেরা আমারে আনছেন কথা বুঝায়া দেয়ার লাইগ্যা। আমি তো আপনাগো গাইড না।’

বুড়োর কথার বহর দেখে শ্বাস ফেলল স্যাম। টয়োটায় ফিরে গেল।

কী খবর?’ জানতে চাইল রেমি।

কাছাকাছি চলে এসেছি। রুবো বললেন, বামদিকে যেতে হবে।’ বলল স্যাম।

৫ মিনিট চলার পর ওরা এমন এক রাস্তার সামনে এসে পৌঁছুল যেখানে কোনমতে একটা সাইকেল চলার মতো জায়গা আছে। চেহারায় বিরক্তি প্রকাশ পাওয়া সত্ত্বেও স্যাম বিনয়ের সাথে রুবোকে বলল, ‘গ্রামটা কী এখনও সামনে আছে?’

‘যাইতে থাকেন। পাহাড়ের উপরে আছে।’

সরু রাস্তার দু’পাশে থাকা গাছের ডালপালা গাড়ির গায়ে আঁচড় কাটতে শুরু করল। রেমি’র পাশের জানালায় একটা ডাল এসে জোরে গুতো দিতেই দাঁতে দাঁত চাপল রেমি। ফিসফিস করে স্যামকে বলল, এই হলো তোমার ভাল আইডিয়া, না?’

স্যাম পাল্টা জবাব দিতে যাবে ঠিক সেইসময় কিছু কুঁড়েঘর উদয় হলো ওদের সামনে।

‘দেখেছ? রুবো ঠিকই বলেছেন।’ বলল স্যাম। আমরা তাহলে এখানেই থামব? স্যাম পেছন ফিরে রুবোকে প্রশ্ন করল।

মাথা নাড়ল রুবো। তার চোখে মুখে সন্ন্যাসীদের মতো প্রশান্তি দেখা যাচ্ছে। আমরা হাঁটমু এহন।’

পায়ে হেঁটে এগোতে শুরু করল ওরা ৩ জন। কুঁড়েঘরগুলোর ভেতর থেকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে স্থানীয়রা তাকাচ্ছে।

প্রাচীন আমলের শর্টস আর রং উঠে যাওয়া টি-শার্ট পরিহিত এক বয়স্ক ভদ্রলোক তার কুঁড়েঘর থেকে বেরিয়ে এলো। রুবোকে দেখে হাসল সে। লোকটার বয়স প্রায় ৬০। চোখের ইশারায় দূরবর্তী কুঁড়েঘরে যেতে বলল রুবো তার সাথে কিছু কথা বলে জানাল, ‘ওর খুব ব্যারাম হইছে। চলেন ওইদিকে।

‘অসুখ? কথা বলা যাবে তো?”

কাঁধ ঝাঁকাল রুবো। চেষ্টা কইরা দেহি।’

সরু পথ দিয়ে পাহাড়ের উঁচু অংশে থাকা কুঁড়েঘরের দিকে এগোল ওরা। নিচের দিকের কুঁড়েঘরে থাকা লোকজন তাদের বাচ্চাদেরকে সাথে নিয়ে স্যাম ও রেমিকে অবাক দৃষ্টিতে দেখছে। এই গ্রামে অযাচিত উত্তেজনা তৈরি হয়েছে ওরা আসাতে।

এখানকার লোকজনদেরকে বেশ বন্ধুত্বপরায়ণ বলে মনে হচ্ছে। বিদ্রোহীরা যদি এদেরকে দলে টানার কথা ভেবে থাকে খুব একটা কাজ হবে না , তাই না?’ রেমিকে বলল স্যাম।

‘আশা করি, আমাদের ভাগ্য যেন ভাল হয়। অন্তত হনিয়ারা ফেরার আগপর্যন্ত।

গন্তব্যে পৌঁছুনোর পর একজন বয়স্ক ব্যক্তি বেরিয়ে এলো ওদেরকে দেখে। তার গায়ের রং তামাক বর্ণের। বারান্দা থেকে নেমে এলো সে। রুবো তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।

তার সাথে কথা বলতে শুরু করল রুবো। স্যাম ও রেমিকে দেখিয়ে হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছে। দেখে মনে হচ্ছে, লোকটাকে বোঝাচ্ছে ওরা অনেক দূর থেকে এসেছে। লোকটা মাথা নাড়ল। বিষয়টা বিবেচনা করবে। কথা শেষে রেমি’র দিকে তাকিয়ে দাঁতবিহীন মাঢ়ি দেখিয়ে লজ্জামাখা হাসি দিল রুবো।

‘কবিরাজ কইল নাউরু এহন খুব ব্যারামে পড়ছে। কথা কইতে পারব কিনা এহুনি কওয়া যাইতাছে না।’ রুবো বলল।

‘আচ্ছা, আমরা কি তাকে কিছু প্রশ্ন করতে পারি?

কবিরাজরে তাইলে আমেরিকান ডলার দেওয়ন লাগব।’

কত?

২০।’ স্ত্রীর দিকে তাকাল স্যাম। বেশ।

‘আমাগো হাতে খুব বেশি সময় নাই। নাউরু মরণের কাছাকাছি চইল্যা গ্যাছে।

স্যাম ও রেমিকে নিয়ে কুঁড়েঘরের দিকে এগোল রুবো। আপনেরা ভিত্রে বহেন। আমি ওর লগে গিয়া কথা কইয়া আসি।’

মাথা নাড়ল রেমি। সাবধানে ঢুকল অন্ধকার কুঁড়েঘরে। ওর পাশে স্যাম রয়েছে। ভেতরে থাকা ছোট্ট একটা রুম প্রবেশ করল ওরা।

.

২৮.

সূর্যের রশ্মিতে দেখা গেল ভেতরে ধূলো উড়ছে। কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ। কোনমতে নিঃশ্বাস নিচ্ছে ওরা। একটা বিছানা পাতা রয়েছে। একজন খাটো জীর্ণশীর্ণ ব্যক্তি শুয়ে আছে ওতে। তার পুরো শরীর নগ্ন সেফ পরনে একটা জীর্ণশীর্ন নেংটি। বার্ধক্য তার শরীর থেকে জীবনাশক্তি চুষে নিয়েছে। তার অবস্থা দেখে মনে হলো, এই বুঝি দেহ থেকে আত্মা উড়াল দেবে।

বয়স্ক লোকটা ওদের দিকে তাকাল। খুব কষ্ট করে শ্বাস-প্রশ্বাস চালাচ্ছে বেচারা। রুবো এগিয়ে গেল লোকটার বিছানার কাছে।

লোকটার দিকে ঝুঁকে কানে কানে বিড়বিড় করে কী যেন বলে তারপর সোজা হয়ে দাঁড়াল। কয়েক মিনিট পর কিছু শব্দ মিনমিন করে উচ্চারণ করল লোকটা।

মাথা নাড়ল রুবো, দেয়ালের পাশে থাকা বেঞ্চের দিকে ইশারা করল ফারগো দম্পতিকে। স্যাম ও রেমি গিয়ে বসল ওতে। রুবোও এগোল।

‘এইড্যা হইলো নাউরু। অয় কইল কতা কওয়ার চেষ্টা কইরা দেখবো। থামল রুবো। আপনেরা কী জানবার চান?

‘তাকে জাপানিজ কর্নেল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে দেখুন। স্থানীয় লোকদেরকে খাটানো থেকে শুরু করে গ্রামে হত্যাযজ্ঞ পর্যন্ত তার যা যা মনে আছে সব আমরা জানতে চাই।’

নাউরুকে স্থানীয় ভাষায় প্রশ্ন করল রুবো। স্যাম ও রেমি এই ভাষার একবর্ণও বুঝতে পারল না। নাউরুর সাথে কথা বলা শেষে রুবো স্যামের দিকে ফিরল।

‘অয় কইতাছে, ওইডা অনেক পুরাইন্যা কাহিনি। কেউ আর ওই কাহিনি লইয়্যা মাতা ঘামায় না। ওই সময়কার বেবাক লোক মইর‍্যা গ্যাছে। শুদু অয় বাইচ্যা আছে এহন। আরেকজন বাইচ্যা আছিল, অর চাচতো ভাই। হার নাম আছিল: কটু।’

‘জি, কিন্তু আমরা সেই কাহিনিটা শুনতে আগ্রহী। গোয়াডালক্যানেলে জাপানিরা এসে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ছিল, স্থানীয় লোকদেরকে দাস বানিয়ে রেখেছিল এই বিষয়গুলো আমরা এই প্রথম জানতে পেরেছি। তাকে বলুন, যেন শুরু থেকে সব বলে। স্থানীয় লোকদেরকে কোন কাজে লাগিয়েছিল জাপানিরা? কী উদ্দেশ্য ছিল তাদের?’ বলল স্যাম।

নরম কণ্ঠে নাউরুকে প্রশ্ন করল রুবো। উত্তর দিতে গিয়ে বিপদজনকভাবে ওঠানামা করতে শুরু করল নাউরুর বুক। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কথা বলতে বলতে নাউরু’র কণ্ঠ একসময় তেল ফুরিয়ে যাওয়া মোটরের আওয়াজের মতো ধীরে ধীরে বুজে এলো। বেচারা নাউরু তার জীবনের সর্বশক্তি দিয়ে ওদেরকে তথ্য দেয়ার চেষ্টা করছে।

নাউরুর কথা শুনে ফারগো দম্পতিদের দিকে ফিরল রুবো। ‘গোয়াডালক্যানেলের অফিসার হইয়া এক অফিছার আইছিল… কর্নেল… হ্যাঁতে গ্রাম থেইক্যা ব্যাডা লোকগো ধইরা ধইরা নিয়ে গেছিল। এইহানকার সবাই তারে ড্রাগন কইয়া ডাকত। আস্তা শয়তান আছিল, খাড়া হারামী। এইহানকার মানুষগো হুদাই খুন করছিল শয়তানডা। বেশিরবাগ জাপানিরা ভালা আছিল কিন্তু ওইডা আছিল একড়া কুত্তার বাচ্চা।

রুবো জানাল স্ত্রীদের কাছ থেকে তাদের স্বামীদেরকে ছিনিয়ে নিয়ে কাজে লাগানো হয়েছিল তখন। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত টানা খাটানো হতো তাদেরকে। এদিকে তাদের স্ত্রী, বোন, বাচ্চাদেরকে গায়েব করে দেয়া হতো। গুজব আছে পাহাড়ের গুহায় ভয়ঙ্কর এক্সপেরিমেন্ট চালাতে জাপানিরা। পুরুষদের কর্মক্ষমতা ফুরিয়ে গেলে তাদেরকে খুন করা হতো। তারপর লাশ সরিয়ে নেয়ার জন্য তাদের আত্মীয়দেরকে অস্ত্রের মুখে নিয়ে আসা হতো তখন। সেই লাশগুলোকে সৎকার করতে না দিয়ে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলতে বাধ্য করা হতো যাতে হাঙর সেগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে খেয়ে নিতে পারে।

শেষের দিকে সবচেয়ে শক্তিশালী ১০০ জন দ্বীপবাসীকে প্রায় ১ ডজন ভারি কাঠের বাক্স বহন করতে বাধ্য করেছিল জাপানিরা। এখানকার গাছ কেটে বাক্সগুলো বানানো হয়েছিল। খুব ভারি ছিল বাক্সগুলো। মাথায় তপ্ত রোদ নিয়ে পাহাড়ে যেতে হয়েছিল তাদেরকে। পুরো একদিনের সফর। খাবার বলতে দেয়া হয়েছিল কিছু পানি।

বাক্সগুলোকে পাহাড়ের গুহায় ঢোকানো হয়েছিল। কাজ শেষ হতেই কর্নেল নির্দেশ দিয়েছিল সেই ১০০ জন পুরুষকে যেন খুন করা হয়। সৌভাগ্য আর শারীরিক সক্ষমতার জোরে নাউরু আর তার চাচাতো ভাই সেই বিভীষিকা থেকে প্রাণে ফিরতে পেরেছিল সেদিন। একটা গুহায় দু’জন লুকিয়ে ছিল। কয়েকদিন লুকিয়ে থাকার পর সাহস করে বাইরে এসে দেখেছিল সবার মৃত দেহ পচে গলে একাকার।

জাপানিদের হাত থেকে বাঁচার জন্য কয়েক সপ্তাহ পাহাড়ে গা ঢাকা দিয়েছিল ওরা দুজন। পরবর্তীতে গ্রামে ফিরে দেখল পুরো গ্রাম জনশূন্য। ধীরে ধীরে জঙ্গল গিলে নিল গ্রামটাকে। একপর্যায়ে মিত্রবাহিনি দ্বীপ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলে ওরা দু’জন তাদের সাথে কাজে যোগ দিয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পাশ্ববর্তী গ্রামের মেয়েদেরকে বিয়ে করে স্থায়ী হয়েছিল ওরা।

পুরো গল্প শোনার সময়টুকু স্যাম ও রেমি নিজেদের মুখের অভিব্যক্তি যতদূর সম্ভব শান্ত-স্বাভাবিক করে রাখল। গলা পরিষ্কার করল রেমি।

‘শুনে খারাপ লাগল। যাক, তারপরও বলব উনি সৌভাগ্যবান। এখনও জীবিত রয়েছেন। একটু থামল ও। কীভাবে আসল প্রশ্ন করবে ঠিক করে নিচ্ছে। ওই বাক্সগুলোতে কী ছিল উনি জানেন?

নাউরুকে প্রশ্নটা করল রুবো। জবাবে নাউরু যেভাবে মাথা নাড়লেন তাতে বোঝা গেল তিনি উত্তরটা জানেন না।

‘গুহাটা কোথায়?

রুবো আবার নাউরুর দিকে ফিরল।

‘অয় ঠিক মতো জানে না। পাহাড়ের উপরে জায়গা। ভালা না।

“উনি কি নির্দিষ্ট করে জায়গাটার ব্যাপারে কিছু বলতে পারবেন? যাতে আমরা গুহা খুঁজে পেতে পারি? আসলে ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। প্লিজ, উনাকে আরেকবার জিজ্ঞেস করে দেখুন।

রুবো অনুরোধ রাখল। কিন্তু নাউরু কোনো জবাব দিল না। মাথা নাড়ল রুবো। অরে আর না জ্বালাই আমরা। যদি পরে কইতে চায় তাইলে সব জানবার পারবেন।

ইতস্তত করছে স্যাম ও রেমি। নাউরু যদি বাক্স আর গুহার ব্যাপারে আরও তথ্য জেনে থাকেন সেগুলো হয়তো আর কারও জানা হবে না। গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো তার সাথে মাটিচাপা পড়ে যাবে।

কুঁড়েঘর থেকে বেরিয়ে এলো ওরা। রুবো’র হাতে স্যাম ৫০ ডলার ধরিয়ে দিল। কবিরাজের জন্য…’।

ডলারগুলো পকেটে ঢোকাল রুবো। ঠিক আছে, অরে দিয়া দিমু। নিচের অংশে থাকা কুঁড়েঘরগুলোর দিকে পা বাড়াল সে।

‘রুবো এখানে দীর্ঘদিন ধরে বাস করছে। তার দুই-একটা বিষয় জানাশোনা থাকতে পারে। রেমি হাত ধরতে ধরতে স্যাম বলল।

রুবো’র পিছু পিছু এগোল ওরা। একটু ধীরে এগোচ্ছে। স্যাম, যদি নাউরু রুবোকে গুহার ব্যাপারে তথ্য দিয়ে থাকে? রুবো যদি সেটা আমাদের কাছ থেকে আড়াল করে তখন?

রুবো’র যা বয়স তাতে সে ওরকমটা করবে বলে মনে হয় না। তার কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছে সে সত্যিকার অর্থেই গুহা অপছন্দ করে। রুবো রহস্যময় বাক্সগুলো খোলার চেষ্টা করতে যাবে বলে মনে হয় না। তার উপর এখন বিদ্রোহীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সেইসাথে জায়ান্টসহ আরও কত কী আছে পাহাড়ে কে জানে!

‘আচ্ছা, বুঝলাম। কিন্তু রুবো ডলার খুব পছন্দ করে। এমনও হতে পারে, অন্য কারও কাছ থেকে বেশি ডলারে গুহার তথ্য বিক্রি করে দিল।

হুম, সেটা করতে পারে। কিন্তু বিক্রিটা করবে কার কাছে? দ্বীপটাকে খেয়াল করে দেখ। কে অনুসন্ধানে নামতে যাবে? স্থানীয় লোকদের কাছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আছে? সব তো লবডঙ্কা।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল রেমি। স্যাম বলল, তাহলে সবঠিক আছে? রুবোকে বিশ্বাস করা যায়?

‘স্যাম ফারগো, আপনার কথাই আমার শিরধার্য।

‘আহা! আমার কী সৌভাগ্য! আরও কিছু বলি তাহলে?

রেমি স্যামের রসিকতাকে পাত্তা দিল না। নাউরুর গল্প নিয়ে কথা বলতে হবে আমাদের।

রুবোকে নামিয়ে দেই, তারপর। গাড়ির কাছাকাছি এসে সতর্ক হলো স্যাম। গলা চড়াল। রুবো? আমাদেরকে পথ দেখিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে আপনি প্রস্তুত তো?

রুবো মাথা নাড়ল। চলেন, যাই গা।

দাঁত বের করে হাসল স্যাম। চলুন।

তার বাড়িতে নামিয়ে দিল তখন মধ্যদুপুর। নিজের বার্ধক্যে আক্রান্ত শরীরটাকে ধীরে ধীরে বয়ে নিয়ে গেল রুবো। তার হাঁটার ভঙ্গি দেখে মনে হলো পুরো পৃথিবীর বোঝা যেন তার কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।

‘আজকে সবার অনেক পরিশ্রম গেল। তাকে দেখতে দেখতে বলল রেমি।

‘তা ঠিক।’ স্যাম সায় দিল।

‘বেশ। এবার আমরা কমাণ্ডার আর সেই বাক্সগুলো নিয়ে আলাপ করব।”

হ্যাঁ। পাহাড় জঙ্গলে ঢাকা। কোনো ম্যাপও আঁকা নেই। তাছাড়া যুদ্ধের সময় হয়তো পুরো এলাকা শত্রুপক্ষ চষে বেরিয়েছিল। এমনও হতে পারে বাক্সগুলো আগের জায়গায় নেই। সরিয়ে নিয়েছে কেউ। আবার এও হতে পারে, পানির নিচে থাকা ইমারতের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। কোত্থেকে কীভাবে শুরু করতে পারে সে-ব্যাপারেও আমাদের কোনো ধারণা নেই। এই সমস্যাগুলো না থাকলে বলতাম, গুপ্তধন আমাদের হাতের মুঠোয়!

তাহলে এখানে আমাদের কাজ শেষ?

হেসে গিয়ার দিল স্যাম। সত্যি বলতে কেবল শুরু।

‘আমার কেন যেন মনে হচ্ছে এই ঝামেলা থেকে তুমি মজা পাচ্ছি।’

‘তোমার ধারণা ঠিক। কারণ, আমি চ্যালেঞ্জ পছন্দ করি।

পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বাদামী নদীর দিকে তাকাল রেমি। এবড়োথেবড়ো রাস্তা দিয়ে চলতে গিয়ে ওদের টয়োটা লম্ফঝম্ফ করে এগোচ্ছে।

‘গাড়ির লাফানো বন্ধ করো!

“আরে, এটাই তো মজা!”

.

২৯.

গোয়াডালক্যানেল, সলোমন আইল্যান্ড

হাঁটতে হাঁটতে কেশে উঠল লিলি। গ্রামের দক্ষিণ দিক দিয়ে বয়ে যাওয়া জলধারা ধরে এগোচ্ছে ও। লিলির বয়স মাত্র ১৪ বছর। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সে অসুস্থ। রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নতুন ওষুধ নিতে শুরু করেছিল কিন্তু হিতে বিপরীত হচ্ছে মনে হয়। তবে আজ একটু সুস্থ্য লাগায় ঘুরতে বেরিয়েছে।

লিলি’র গড়ন বরাবরই হালকা-পাতলা। তবে অসুখের কারণে ও এখন একদম পাটকাঠির মতো হয়ে গেছে। শরীর শুকিয়ে গেলেও ওর দেহের পরিবর্তনগুলো এখনও বোঝা যায়। শিশু আর নারীর মধ্যবর্তী অবস্থানে রয়েছে।

হঠাৎ পেছন থেকে ডাল ভাঙার আওয়াজ ভেসে এলো। কাছে কোথাও হবে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল লিলি। কে? কিন্তু কাউকে দেখা গেল না। লিলি অবাক হলো।

ক্যাডা রে ওইহানে?

গাছের পাতার খসখসে শব্দ ছাড়া কেউ ওর প্রশ্নের জবাব দিল না।

লিলি আবার চলতে শুরু করল। কাউকে না দেখতে পেলেও উদ্বেগে ওর পেট খিচে রয়েছে। পায়ের পরিষ্কার আওয়াজ শুনতে পেয়েছিল ও। লিলি আবার থামল। কোমরে দুহাত রেখে ঘুরে দাঁড়াল এবার। যৌবনের রেখা ফুটতে শুরু করার পর থেকেই গ্রামের ছেলে-ছোকররা ওকে জ্বালাতে শুরু করেছে। এখন হয়তো ওদেরই কেউ আসছে পিছু পিছু। ও জানে, ছেলেগুলো যদিও কোনো ক্ষতি করবে না। স্রেফ জ্বালায়। লিলি অবশ্য এসবে পটে না, পাত্তাও দেয় না। ওর মা ওকে সাবধান করে দিয়েছে, ছেলেদের অন্তরে শয়তান থাকে। লিলি ভাল করে খেয়াল করে দেখল ওর পেছনে কেউ নেই।

‘আমি শব্দ শুনছি কইলাম। আমারে মদন বানাইতে পারবি না।’ লিলি নিজে যতটা না সাহসী তারচেয়ে সাহসী গলায় বলল কথাটা। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল কিন্তু কারও দেখা নেই। ভালই ভালই চইল্যা যা কইলাম। আমি যদি তোরে ধরবার পারি তাইলে কিন্তু খবর কইর‍্যা দিমু!

নেই। কেউ নেই।

ফাইজলামি না কিন্তু। বন্ধ কর এইসব!’ বাক্যের শেষের দিকে এসে ওর কণ্ঠ একটু ভেঙে গেল। জিমি নামের এক ছেলে প্রায়ই আড়াল থেকে ওকে উপহার পাঠায়। লিলি ভাবছে এখন হয়তো জিমি আছে এখানে। বাইরে বাইরে পাত্তা না দিলেও এরকম উপহার পেতে লিলি’র অবশ্য খারাপ লাগে না।

কারও দেখা না পেয়ে আবার চলতে শুরু করল লিলি। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ একজোড়া শক্ত হাত ওর মুখ চেপে ধরল পেছন থেকে। খুব জোরে চিৎকার করল লিলি কিন্তু হাতের চাপে সেটা ফাপা আওয়াজের মতো শোনাল। নিজেকে ছাড়ানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করল ও। কিন্তু মাথার একপাশে আঘাত লাগতেই লিলি চুপসে গেল। বজ্রমুষ্ঠি গলায় চেপে বসে শ্বাসরোধ হওয়ার সময় সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল লিলি’র।

***

ফিরতি পথে ওর গতি খুবই ধীর। কারণ স্যাম ও রেমি’র গাড়ি একটা ভারি ট্রাকের পেছনে পড়েছে। ভক ভক করে দূর্গন্ধযুক্ত কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে এগোচ্ছে ট্রাকটা। নিয়মের কোনো তোয়াক্কা না করে রাস্তার মাঝ দিয়ে চলছে ধীরে ধীরে। ট্রাকটাকে ওভারটেক করতে গিয়ে পিছিয়ে এলো স্যাম। বিপরীত দিক থেকে আরেকটা গাড়ি আসছে।

অবশেষে হোটেলে পৌঁছুনোর পর সেলমাকে ফোন করল স্যাম।

‘হ্যালো! কী অবস্থা? বলল সেলমা। দ্বীপে কীরকম দিন কাটছে তোমাদের?

‘এই তো চলছে। ওদিকের হালচাল কী?

‘সব স্বাভাবিক। ডেস্ট্রয়ারের ব্যাপারে সূত্র পাওয়ার জন্য বিভিন্ন রেকর্ড ঘাটছি। কিন্তু যা বুঝতে পারছি, আর কিছু পাওয়া যাবে না।

‘হতাশ হলাম। যদি কেউ বেঁচে না ফিরত তাহলে তো কেউ জানতেই পারতো না ওই ডেস্ট্রয়ারের কোনো অস্তিত্ব ছিল কখনও।

“এরকম ঘটনা আমি এরআগে কখনও দেখিনি।’

‘বেশ, যদি তোমার হাতে সময় থাকে তাহলে আমি তোমাকে আরেকটা প্রজেক্ট দেব।’

‘নতুন প্রজেক্ট নেয়ার জন্যই আমার বেঁচে থাকা।’ সেলমা একটু রসিকতা করল।

‘জায়ান্ট আর জাপানিজদের নিয়ে বিষয়টা।

‘ইন্টারেস্টিং! বলে ফেলো।

স্যাম আপনমনে হাসল একটু। এরআগে বোধহয় এটা নিয়ে একটু বলেছিলাম তোমাকে। তবে এবার আমি সিরিয়াস। এখানার পাহাড়ে গুহা আছে আর সেখানে নাকি জায়ান্টরা থাকে। মাঝেমাঝে বেখেয়ালী লোকজনদের ধরে নিয়ে যায় জায়ান্টরা।

তারপর,

‘জানি, শুনতে হাস্যকর লাগছে কিন্তু এই লোককাহিনিটা আমার কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে অন্য কারণে। আমি পাহাড়ের গুহাগুলোর প্রতি আগ্রহী।

‘খুলে বল।

‘আমি এখানকার গুহাগুলোর একটা ম্যাপ চাই। জানি, জিনিসটা পাওয়া খুবই কঠিন। ম্যাপ না হোক একটা বর্ণনা হলেও চলবে। জায়ান্টদের গুহা দেখার খায়েশ জেগেছে আমার।

‘আচ্ছা। তাহলে সবমিলিয়ে বিষয়বস্তু মোট তিনটা। জায়ান্ট, গুহা আর জাপানিজ?’

‘হ্যাঁ। আমি চাই এসব নিয়ে তুমি খোঁজ-খবর করে যত বেশি সম্ভব তথ্য যোগাড় করে আমাকে জানাও। আর খোঁজ নিয়ে দেখো, শেষের দিকে জাপানিরা এই দ্বীপে কী কী করেছিল।’

‘জাপানিরা শেষের দিকে দ্বীপ থেকে পালিয়েছিল। ওটা তো আমরা একবার রিসার্চ করেছি, তাই না?

করেছ। কিন্তু আমি অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জাপানিদের কাজকর্মের পুরো বিবরণ খুঁজছি।’

নাউরু’র কথাগুলো জানাল স্যাম। দাস বানিয়ে রাখা, গোপন গবেষণা এসবের কোনো উল্লেখ ইতিহাসের কোথাও আছে কিনা জানতে চাই। কিংবা কোনো গুজব। কোনোকিছুই যেন বাদ না পড়ে। আমার বিশ্বাস তুমি পারবে। নাউরুর অবস্থা আশংকাজনক। যেকোনো সময় সে পরকালের ট্রেনে চড়ে বসবে। তার কাছ থেকে হয়তো আর কোনো তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে না।’

কিছুক্ষণ চুপ করে রইল সেলমা। তারপর বলল, কমাণ্ডারের নাম যেন কী বললে?

‘এখনও বলিনি। কেন?

হয়তো তেমন কিছুই না। কিন্তু গোয়াডালক্যানেলে এক কর্নেল…’

বলো, সেলমা…’

‘ডুবে যাওয়া ডেস্ট্রয়ার থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের ব্যাপারে রিসার্চ করার সময় দেখলাম ওখানে একজন উঁচু পদের অফিসারও আছে। আর্মি। দাঁড়াও, চেক করে দেখি। সম্ভবত কর্নেল হবে।’

কি-বোর্ডে ক্লিক করার শব্দ শুনতে পেল স্যাম।

হ্যাঁ। আমার ধারণাই ঠিক। কর্নেল। নাম: কুমাসাকা। চারজন নাবিকের সাথে তাকেও উদ্ধার করা হয়েছিল। সেলমা জানাল।

তাকে উদ্ধারের পর সেই জাহাজ সোজা টোকিও-তে চলে গিয়েছিল, ঠিক?

‘একদম। হতে পারে এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা…’

হতে পারে তার কারণেই জাহাজটা ঘুরপথে যাত্রা করেছিল।

কি-বোর্ডে খটাখট কী যেন টাইপ করল সেলাম। না, হলো না।’

কী?’

‘ইতিহাস বলছে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে নিউজিল্যান্দ্রে এক ক্যাম্পে মারা গিয়েছিল কুমাসাকা।

স্যাম খবরটাকে হজম করা পর্যন্ত সেলমা চুপ করে রইল। ‘সেলমা, এই লোক সম্পর্কে যত বেশি সম্ভব তথ্য সংগ্রহ করো। সেটা যত গুরুতুহীনই হোক না কেন। সার্ভিস রেকর্ড, পরিবার, শিক্ষা, কাজ.. সব।

“ঠিক আছে, করব। কিন্তু ডেস্ট্রয়ারের ব্যাপারে খোঁজ নিতে গিয়েই তো তথ্যের অভাবে ভুগছি। এই কর্নেলের ব্যাপারে কতদূর কী হবে কে জানে।

নিজের সেরাটা দিয়ে।

‘দেব।’ সেলমা একটু থামল। আচ্ছা, ল্যাজলোকে কাজে লাগাতে পারব এরকম কোনো খবর আছে তোমার কাছে? লোকটা আমাকে খুব জ্বালাচ্ছে। কয়েকদিন পর পর এসে ছোঁক ছোঁক করে। লোকটাকে কাজ দিয়ে ব্যস্ত রাখা দরকার।’

‘তোমার যদি মনে হয় কুমাসাকা’র ব্যাপারে সে সাহায্য করতে পারবে তাহলে তাকেও কাজে লাগিয়ে দাও।

না। তাকে কঠিন কিছু দিতে হবে। কোনো পাজল কিংবা ধাঁধা। জটি কিছু।’

না, সেরকম কিছু নেই। তবে বিষয়টা মাথায় রাখলাম। লাওস থেকে ফিরে আসার পরেই তার এই হাল হয়েছে?

হ্যাঁ। তবে নতুন একটা প্রজেক্টের পেছনে ইতিমধ্যে মাথা খাটাতে শুরু করেছে সে।’

কী সেটা?

‘জলদস্যুদের গুপ্তধন!

মশকরা করলে নাকি, সেলমা?’

‘কেন, আমার কণ্ঠ শুনে তাই মনে হচ্ছে নাকি?

স্যাম একটু থেমে নিরাপদ কথা বেছে নিল। “ঠিক আছে, আমি তাকে ফোন দেব। আর তুমি কর্নেলের ব্যাপারে কী কী জানতে পারলে জানিয়ো।

“ঠিক আছে।

ফোন রাখল স্যাম। এতক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিল ও। স্লাইড ডোর ঠেলে রেমি বারান্দায় ঢুকল। কে? সেলমা নাকি লিও?”

‘সেলমা। কিন্তু ভাল কোনো খবর নেই।’

‘কেউ যদি আমাদেরকে তথ্যগুলো যোগাড় করে দিতে পারে সেই ব্যক্তি হলো সেলমা। এ ছাড়া আমাদেরকে কেউ এভাবে সাহায্য করতে পারবে। প্রার্থনা করি ও যেন সফল হয়।

স্ত্রীকে চুমো খেল স্যাম। সুন্দর বলেছ।

‘সেলমা কি কাজে নেমে গেছে?

হুম।

সন্ধ্যায় লিও-কে ফোন করল স্যাম। লিও ডারউইনে রয়েছে।

‘বন্ধু, কী অবস্থা তোমাদের?’ স্যাম জানতে চাইল।

এখান থেকে সরতে পারলে বাঁচি। আর ভাল লাগে না।

‘আমার কথামতো ডাইভ দেয়ার চেষ্টা করেছিলে?

‘আমি তোমার খেলার পুতুল হব কেন?”

‘আচ্ছা বাদ দাও। অভিযান কেমন চলছে?

‘ডাইভাররা কাজ করছে। কিন্তু পুরো কমপ্লেক্স পরিষ্কার করতে কয়েক বছর লেগে যাবে। স্রেফ প্রধান ভবন পরিষ্কার করতেই লাগবে কয়েক সপ্তাহ।

কুমীর কিংবা হাঙরের দেখা পেয়েছ?

লিও এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। আরও বড় জাহাজ আনলে সেখানে অনেক বেশি যন্ত্রপাতি থাকতো। কাজ করতে সুবিধে হতো তখন।

‘দেখছি বিষয়টা। কিন্তু ডারউইনে কী সমস্যা?

‘সমস্যা নেই। কিন্তু তোক বেশি হলে কাজ দ্রুত হতো। বাকি জীবনে এখানে কাটানোর কোনো ইচ্ছা নেই আমার।

বুঝলাম। আমরা পৃথিবীর অন্যতম বিচ্ছিন্ন জায়গায় আছি এখন। বড় জাহাজের ব্যবস্থা করে হাজির করতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যাবে। তবুও দেখছি। স্যাম হাসল। লিও এই আবিষ্কারের ফলে তুমি তো জাতীয় হিরো হয়ে যাবে! হয়তো তোমার নামে এখানকার সৈকতের নামকরণ করে ফেলবে সরকার! কিছু প্ল্যান করে রাখো।’

বাদ দাও। আমার সত্যি সত্যি সি-সিকনেস হচ্ছে।

বলো কী, বন্ধু। তুমি একজন রাশিয়ান নাগরিক। তোমার রক্তে আছে বিখ্যাত যযাদ্ধাদের রক্ত। তুমি কেন এত দূর্বল হবে?

‘আমার পূর্বপুরুষরা সবাই কৃষক ছিল। বরফ ঢাকায় এলাকায় থাকতো তারা। আর জানোই তো বরফ পানির কাছে এলে গলে যায়।

আরও দু’একটা কথা বলে ফোন রাখল স্যাম। চার্জে দিল ফোনটা। রেমি বিছানায় বসে ট্যাবে ইন্টারনেট চালাচ্ছে। স্যামের দিকে তাকাল রেমি।

কী অবস্থা লিও’র?’

বলল এই জাহাজ পছন্দ হচ্ছে না। আরও বড় জাহাজ চায়।

‘ওর মুড কি বরাবরের মতো তিক্ত ছিল?

না, এখন একটু ভাল।

হাসল রেমি। আরও বড় জাহাজ আনার আইডিয়াটা কিন্তু মন্দ নয়।

‘আমি জানি সেটা। তুমি তো ইন্টারনেটে ঢুকেছ। দেখো তো, বড় জাহাজ চেয়ে সেলমাকে একটা ই-মেইল পাঠাতে পারে কিনা।

চটপট ই-মেইল করে দিল রেমি। ক্ষুধা লেগেছে?

‘তা আর বলতে।

‘হোটেলের রেস্টুরেন্টে যাওয়া যায়?

আমি ভাবছিলাম, গতরাতে যেখানে ডিনার করেছিলাম সেখানে যাব।’

‘নিরাপদ হবে?’

নিরাপদ না হওয়ার তো কোনো কারণ দেখছি না। এখান থেকে মাত্র কয়েক ব্লক দূরে। আর একটু বিপদ হলেই বা কি…?

স্বামী’র দিকে চোখ গরম করে তাকাল রেমি। দেখো, যদি কিছু হয় আমি কিন্তু জোরে চিৎকার করব।

‘এটা তো ভাবিনি!”

রাস্তায় কিছু কুকুর ছাড়া আর কেউ নেই। রেস্টুরেন্টের পার্কিং লটে ঢুকল ফারগো দম্পতি। ওখানে মাত্র ৩ টা গাড়ি পার্ক করা আছে।

কী করছ জানো বোধহয়?’ ভ্রূ কুঁচকে বলল রেমি।

‘এত দুঃচিন্তা করে যদি থেমে যাই তাহলে তো জীবনে আর কোথাও কোনোদিন যাওয়াই হবে না।’

ভেতরে ঢোকার পর ওয়েটার ওদের দিকে এমনভাবে তাকাল ওরা যেন স্পেসশীপ থেকে নেমে আসা এলিয়েন! অবশ্য পরক্ষণেই সামলে নিল নিজেকে।

‘আপনাগো যেখানে বইতে মন চায় বহেন।’ আঞ্চলিক ভাষায় বলল ওয়েটার।

টাটকা সামুদ্রিক খাবার দিয়ে ডিনার সেরে আবার পার্কিং লটের দিকে এগোলো ওরা। হালকা বাতাস বইছে এখন। গাড়ির কাছে আসতেই দাঁতে দাঁত চেপে স্যাম অভিশাপ দিল।

কী হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করল রেমি।

টায়ার পাংচার।

বল কি!?

২০ মিনিট পর ঘেমে নেয়ে উঠল স্যাম। অতিরিক্ত একটা চাকা ছিল সেটা জুড়ে দিয়েছে।

কপাল ভাল গ্রামের রাস্তায় এই কাণ্ড হয়নি। কাদার মধ্যে টায়ার বদলানোর কথা ভাবাও যায় না। রেমি বলল।

‘ঠিক বলেছ। এবার উঠে পড়ো।

গাড়ি উঠতে উঠতে রেমি বলল, ‘তোমাকে গোসল করতে হবে।’

তাই তো মনে হচ্ছে।’

ওদেরকে ঢুকতে দেখে সৌজন্য হাসি দিল সিকিউরিটি গার্ড। ডেস্ক ক্লার্কও মাপা হাসি হাসল।

‘লাইটে সমস্যা হয়েছে বোধহয়। হলওয়ে অন্ধকার দেখে বলল স্যাম।

মনে হয় পুরানো হয়ে গেছে।’

রুমের কাছাকাছি এসে স্যামকে হাত দিয়ে বাধা দিল রেমি। মাথা নেড়ে কান পেতে কী যেন শুনল। তারপর ফিসফিস করে বলল স্বামীকে, যাওয়ার সময় দরজা বন্ধ করে গিয়েছিলে না?

হা, গিয়েছিলাম।’

রেমি কয়েক সেকেণ্ড কিছু বলল না। তাহলে তো ঝামেলা হয়ে গেছে। দেখো, দরজা এখন খোলা।

.

৩০.

দরজার কিনারা ঘেষে এগোল স্যাম। আর এক পা এগোলে রুমে ঢুকতে পারবে এমন সময় একটা অবয়ব উল্কার বেগে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

‘পুলিশকে খবর দাও!’ চোরের পেছনে ছুটতে ছুটতে রেমিকে বলল স্যাম। দৌড়ে করিডর পেরিয়ে হোটেলের বাইরের দরজার কাছে গিয়ে স্যাম গতি কমাল।

পার্কিং লটের উপর চোখ বোলাতে গিয়ে চোরকে দেখতে পেল স্যাম। রাস্তা পেরিয়ে পালাচ্ছে। কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে স্যাম দূরত্বটুকু অতিক্রম করে ফেললেও চোরও কম যায় না। স্যামের সাথে চোরের দূরত্ব কমেনি। চোরের উপর নজর রেখে ও ছুটছে হঠাৎ পাশের গলি থেকে একটা সাইকেল এসে ওর বাঁ পাশে এসে ধাক্কা খেল। ব্যথায় জ্বলে গেল অংশটুকু।

সংঘর্ষের স্যাম রাস্তায় পড়ে গেছে। সাইকেলে কে ছিল সেটা ও দেখতে পেল না। কারণ সাইকেলে কোনো আলোর ব্যবস্থা নেই।

ধাক্কা সামলে নিজেকে দাঁড় করাল স্যাম। সাইকেল আরোহীও উঠে দাঁড়িয়েছে সাইকেল নিয়ে। স্যামের হাঁটু দপদপ করছে। কিন্তু ভাগ্য ভাল বলতে হবে, ওর পা সম্পূর্ণ অক্ষত আছে, কোথাও ভাঙেনি।

তবে দূরে চলে যাচ্ছে চোরটা।

স্যাম ছুটল। ছুটতে ছুটতে খেয়াল করে দেখল এখানে আশেপাশে লুকিয়ে পড়ার মতো কোনো জায়গা বা আড়াল নেই। রাস্তার শেষ মাথায় গিয়ে দেখল একটা সরু গলি, গলিতে ছোট ছোট দোকানও আছে।

একটা ছুটন্ত অবয়ব দেখার জন্য চারপাশে চোখ বুলাল স্যাম। দূরের একটা কোণা থেকে ধাতব শব্দ ভেসে এলো। চোখের পলকে সেখানে পৌঁছে গেল ও।

ময়লার ক্যান নিয়ে হুটোপুঁটি করছে একটা সাদা-কালো বিড়াল। এই বিড়ালটাই ধাতব শব্দটির জন্মদাতা। স্যামের দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকাল প্রাণীটা। কাজের সময় অপরিচিত ব্যক্তির উপস্থিতিতে সে অসন্তুষ্ট, বিব্রত।

কোনো ছুটন্ত পায়ের শব্দ শোনার আশায় কান পেতে রইল স্যাম। কিন্তু কিছুই শুনতে পেল না। এই এলাকায় এখন কাউকে দেখা যাচ্ছে না। একদম জনমানবশূন্য মনে হচ্ছে। আরও কিছুক্ষণ রাস্তার এমাথায়-ওমাথায় চাওয়া চাওয়ি করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল স্যাম।

চোর পালিয়েছে।

অগত্যা স্যাম হোটেলে ফেরার পথ ধরল। হোটেলের সামনে পুলিশের দুটো গাড়ি দাঁড় করানো আছে। নীল-লাল রঙের লাইট বিচ্ছুরিত হচ্ছে ওগুলো থেকে। শূন্য লবি পার হয়ে রুমের দিকে এগোল স্যাম।

রুমের বাইরে, দরজার পাশে রেমি দাঁড়িয়ে আছে। চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ। স্যামকে দেখতে পেয়ে একটা প্রু তুলে প্রশ্ন করল…

কী অবস্থা?

‘ভাল না। পালিয়েছে।

মাথা নেড়ে রুমের ভেতরে তাকাল রেমি। দুই অফিসার রুমের ভেতরে হাঁটাহাঁটি করছে। ছবি তোলার পাশাপাশি নোটবুকে কী যেন নোট নিচ্ছে খাটো অফিসার! বাথরুমের দরজা খোলা, কাপড় রাখার ক্লোজেট খোলা, সব কাপড় চোপড় এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মেঝেতে ও বিছানায়। অসন্তুষ্টি নিয়ে রেমিকে নিয়ে হলের দিকে পা বাড়াল স্যাম! ডেস্ক ক্লার্ক ও রাতের ম্যানেজার একটু ছায়ার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে।

ম্যানেজার সামনে এগিয়ে এলো। বিব্রত।

‘আমি খুবই দুঃখিত, স্যার। দয়া করে মাফ করবেন। এরকম ঘটনা এই হোটেলে এরআগে কখনও হয়নি।’

‘সবই আমাদের কপাল, বলল রেমি। এখানে আসার পর থেকে আমাদের সাথে এরকমই হচ্ছে।

প্রায় দেড়ঘণ্টা তদন্ত শেষে দুই পুলিশ অফিসার আবিষ্কার করল রুমে থাকা সেটা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে, রেমির ট্যাবলেটটাও চুরি গেছে তবে ওদের পাসপোট দুটো আছে এখনও। অতঃপর রুমে ঢোকার অনুমতি পেল ফারগো দম্পতি। স্যাম দেখল ওর স্যাটেলাইট ফোনটা এখনও টেবিলে চার্জ হচ্ছে। রেমিও দেখল বিষয়টা। অফিসারদের দিকে ঘুরল স্যাম।

‘স্যাট ফোর চুরি হয়নি। বিষয়টা অদ্ভুত নয়?’

লম্বা অফিসার বলল, “হয়তো ওদের মনে ভয় ছিল ফোনটাকে হয়তো ট্র্যাক করা সম্ভব।

আর পাসপোর্ট?

‘ওগুলো দিয়ে ওরা এই আইল্যাণ্ডে কী করবে?

‘বিক্রি করতে পারতো না?”

‘আপনাদের পাসপোর্ট কে কিনতে যাবে?

সত্যি বলতে, গোয়াডালক্যানেলে চুরি হয়ে যাওয়া জিনিস কেনাবেচা করার মতো কোনো মার্কেট নেই। তাই স্যামের প্রশ্ন শুনে পুলিশ অফিসার কিছুটা অবাক হয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়েছে। স্যাম আর কথা বাড়াল না।

দুই অফিসারের রিপোর্ট লেখা প্রায় শেষ। তারা দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে এমনসময় রেমি লম্বা অফিসারকে বলল, এখানকার সিকিউরিটি ক্যামেরায় হয়তো কিছু ধরা পড়েছে?

একজন পর্যটকের মুখ থেকে এরকম বুদ্ধিদীপ্ত পরামর্শ শুনে অফিসার দু’জন একটু আশ্চর্য হলো। মাথা নেড়ে সায় দিল তারা। ম্যানেজারের সাথে আমরা এ-ব্যাপারে কথা বলব।’ শেষবারের মতো রুমের দিকে তাকাল লম্বা অফিসার। মাথা নেড়ে বলল, এখানে যা হয়েছে সেটার জন্য আমরা লজ্জিত। তবে আমরা বিষয়টা খুব গুরুত্বের সাথে নিয়েছি। আশা করি, আপনাদের যা খোয়া গেছে সেগুলো উদ্ধার করতে পারব। সলোমন আইল্যাণ্ডে আপনাদের ভ্রমণ তিক্ত হওয়ায় আমি দুঃখিত।’ অফিসারের বলার ধরন দেখে মনে হলো এই অঘটনের জন্য সে নিজেকেই দায়ী ভাবছে।

‘আপনাদের উপর আমার ভরসা আছে।’ বলল স্যাম।

দুই অফিসারের সাথে ফ্রন্ট ডেকে গেল স্যাম ও রেমি। ক্লার্কের পেছনে মুখ ব্যাদান করে ম্যানেজার বসে আছে। পুলিশ যখন ম্যানেজারকে সিকিউরিটি ক্যামেরার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করল তার নজর তখন নিজের জুতোর দিকে। খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে জুতো জোড়া। তারপর ধীরে ধীরে বলল…

গত সপ্তাহ থেকে সিকিউরিটি ক্যামেরা সিস্টেম অকেজো হয়ে রয়েছে।

কী?’ চড়া গলায় বলল রেমি।

‘কী আর বলব। প্রায় ২০ বছর পুরানো ছিল ওগুলো। নষ্ট হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।

‘এটা কোনো কথা! মশকরা করছেন?

‘আমি দুঃখিত, ম্যাম। কিন্তু বিশ্বাস করুন, যা বলছি সব সত্যি।

স্ত্রীর হাত ধরল স্যাম। কিছুক্ষণ পর রেমি একটু শান্ত হলো।

যা-ই হোক, আমাদের রুমটা পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করুন। স্যাম বলল। আশা করছি, আমাদেরকে আপাতত অন্য একটা রুমের বন্দোবস্ত করে দিতে পারবেন।

‘অবশ্যই, স্যার। তৈরি হয়ে আমাকে জানাবেন। আমি আপনাদেরকে নতুন রুমে নিয়ে যাব।’

রুমের একদম কাছাকাছি গিয়ে নিচু স্বরে বলল রেমি, ‘আমি যা ভাবছি, তুমিও কি তা ভাবছ?

কী? এই চুরির ব্যাপারে?

না। এটা কোনো সাধারণ চুরি নয়।’

রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল স্যাম। এখানে হয়তো এখন পর্যটক হিসেবে একমাত্র আমরাই আছি এবং সবেচেয় ভাল রুমে আছি। তবে কাজটা হয়তো হোটেলের ভেতরের কেউ করতে পারে। কিন্তু এই চুরিতে বাড়তি কী আছে বুঝলাম না। বুঝিয়ে বললো।

ক্যামেরা কাজ না করাতে চোরের খুব সুবিধে হলো।

‘আমার মনে হচ্ছে, এখানকার ক্যামেরাগুলো কয়েক বছর ধরে অকেজো।’

সেফের দিকে এগোল রেমি। যে-ই কাজটা করে থাকুক, একদম প্রস্তুত হয়ে এসেছিল। দেখো, তালা ভেঙে ফেলেছে।

সায় দিয়ে স্যাম মাথা নাড়ল। ঠিক। কিন্তু খেয়াল করে দেখ এই তালা টিনফয়েল দিয়ে তৈরি। চোরের যদি অন্যান্য হোটেলে যদি চুরি করার অভিজ্ঞতা থেকে থাকে তাহলে এগুলোর এরকম বেহাল দশা সম্পর্কে সে খুব ভাল করেই জানে। আমার তো মনে হচ্ছে পেপসি খোলর ওপেনার দিয়ে আমি এই তালা ভাঙতে পারব।’

ঘড়ি দেখল রেমি। খুব বেশি রাত হয়নি এখনও। চোর জানতে, আমরা ডিনার করতে বাইরে বেরিয়েছি।’ একটু থামল ও। আবার দেখ, গাড়ির টায়ায় পাংচার করে দিয়ে দেরি করিয়ে দেয়া হলো আমাদের। এই বিষয়টাও কি কাকতালীয়?’

‘বোধহয় না। কিন্তু আমি নিশ্চিত করে কিছু বলতেও পারছি না। একটা শার্ট তুলে নিয়ে ভাঁজ করল স্যাম। তোমার ট্যাবলেটে কী ছিল? লিও’র অনুসন্ধান সম্পর্কিত কিছু? পাসওয়ার্ড ব্যাংকের তথ্য?

‘মোটেও না।’

তাহলে চোর ওটাতে থেকে পাবে কী? সেফে অল্প কিছু টাকা রেখে গিয়েছিলাম। মানিব্যাগটা আমার পকেটেই ছিল। তোমার পার্সও ছিল তোমার সাথে। একটা ট্যাবলেটের দাম আর কত? চাইলেই কিনে নেয়া যায়। ক্রেডিট কার্ড নিতে পারেনি, স্পর্শকাতর তথ্যও পেল না, পাসপোর্টটাও রেখে গেছে। কাঁচা চোর। তবে আমার মনে হয়, এরসাথে ওই রাতে বিচের দু’জনের কোনো সম্পর্ক আছে।

‘তাই? তাহলে বলল, চোর ভেতরে ঢুকল কীভাবে?

‘তুমি এই রুমে ঘুমের ঘোরের মাঝেও ঢুকতে পারবে।

‘স্যাম, রুমে কিন্তু কার্ড কি দিয়ে ঢুকতে হয়।”

“হুম, কিন্তু সিস্টেমটা খেয়াল করে দেখেছ? খুব উন্নত মানের সিস্টেম যখন দায়সরাভাবে স্থাপন করা হয় তখন এরকমই হয়। জঘন্য।’

‘তো?’

ভাবছি, এটা যদি চুরির চেয়েও বেশি কিছু হয়ে থাকে তাহলে কী সেটা? চোর কী পেয়েছে এখান থেকে? শুধু তোমার শখের ট্যাবলেটটা ছাড়া তেমন কিছুই নিতে পারেনি। আমরা বরং এসব নিয়ে মাথা ঘামানো বন্ধ করি। চোখ কান খোলা রেখে নিজেদের কাজে মনোযোগ দেই। সবদিক থেকে সেটাই ভাল হবে। তুমি কী বলে?

এক সেকেণ্ডের জন্য চোখ বন্ধ করল রেমি। তা ঠিক আছে। কিন্তু… আমি আর নিরাপদবোধ করছি না।’

‘সেটাই স্বাভাবিক। আমারও একই অনুভূতি হচ্ছে। কিন্তু যা হওয়ার তা তো হয়ে গেছে। এখন আর সেটা নিয়ে ভেবে কাজ নেই।

স্যাম ডেস্কে ডায়াল করে ক্লার্ককে বলল, ওরা তৈরি। একটু পর হাজির হলো ম্যানেজার। ওদেরকে হোটেলের অন্যপাশের একটা রুমে নিয়ে গেল সে। আরেকবার ক্ষমা চেয়ে চুপচাপ বিদেয় নিল। কাপড়-চোপড় গুছিয়ে স্যামের দিকে ফিরল রেমি।

‘চোরের চেহারা দেখতে পেয়েছিলে?’

‘না। তবে যতটুকু দেখতে পেয়েছি ততটুকু জানিয়েছি পুলিশকে। স্থানীয় বাসিন্দা, মাঝারি স্বাস্থ্য, দ্রুত নড়তে জানে। কালো হাফপ্যান্ট আর পোলা’র চেক শার্ট পরা ছিল। সাথে ম্যাসেঞ্জার ব্যাগ। এই তো…’

‘এই সময় বাইরে খুব বেশি লোক নেই। ভাগ্য ভাল হলে পুলিশ হয়তো তাকে বের করতে পারবে।’

ছোট্ট করে হাসল স্যাম। সবকিছুই সম্ভব। কিন্তু আমি ভাবছি আগামীকাল সকালে তোমাকে একটা নতুন ট্যাবলেট কিনে দেব।

‘এখানে ট্যাবলেট পাওয়া খুব একটা সহজ হবে না।’

‘গতকাল একটা ইলেকট্রনিক্স শপ দেখেছি। ওখানে হয়তো পেয়ে যাব। গর্জিয়াস কিছু না পেলেও মোটামুটি কাজ চালানোর মতো ট্যাবলেট পাব বলে আশা করছি।’

‘অল্পের উপর দিয়ে বিপদ কেটে গেছে। আরও জঘন্য কিছু ঘটতে পারতো।

‘ঠিক।’ স্ত্রীর দিকে তাকাল স্যাম। আজ রাতে তোমার ঘুম আসবে তো?”

‘অবশ্যই আসবে। আমার দেখভাল করার জন্য একজন শক্ত-সমর্থ পুরুষ আছে। ঘুম আসবে না কেন?

৩১. কফিতে শেষ চুমুক

৩১.

বয়েড সেভেরিন কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে তাকালেন স্ত্রীর দিকে। রান্নাঘরে বাসন-কোসন পরিষ্কার করছেন তার স্ত্রী। সকালের নাস্তাটা ভাল হয়েছে, থ্যাঙ্কস। বিয়ের পর থেকে বিগত ১৮ বছর যাবত প্রতিদিন সকালে স্ত্রীকে এই কথাটা তিনি বলে আসছেন।

‘ওয়েলকাম। আরও কফি নেবে?’ গত ১৮ বছরের মতো আজও তার স্ত্রী একই কথা বললেন।

না, অফিসে যেতে হবে। ক্লায়েন্টের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেতে হবে না? সেভেরিন একজন অ্যাটনী। তবে তার প্রধান পরিচয় হলো সে এখানকার পার্লামেন্টের একজন সম্মানিত সদস্য, এমপি। ২ বছর ধরে অনেক চেষ্টার পর তিনি এখানকার সরকারকে বোঝাতে সমর্থ হয়েছেন, সলোমন আইল্যাণ্ডের উন্নতি করতে হলে পর্যটন খাতের উপর জোর দিতে হবে। পর্যটকদের জন্য সুন্দর পরিবেশ ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করলেই সেটা সম্ভব। পর্যটন শিল্পকে সামনে এগিয়ে নিতে পারলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি দেশ বিদেশে সুনামও কুড়ানো যাবে।

এই দ্বীপের অন্যান্য শিক্ষিত বাসিন্দাদের মতো বয়েড সেভেরিনও অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা শেষ করেছেন। তার জীবনে একটাই লক্ষ্য সলোমন আইল্যাণ্ডকে একটি আন্তর্জাতিক পরিচয় দেয়া।

‘বাসায় ফিরবে কখন? মনে আছে? আজ কিন্তু টবি’র জন্মদিন।’ বয়েডের স্ত্রী মনে করিয়ে দিলেন।

“আজ তো ব্যস্ত থাকব। তুমি ওর পছন্দের গিফটগুলো কিনেছ তো?’

টবি ওদের ছেলে। বয়স ৭ বছর। ২০ মিনিট আগে স্কুলে গেছে।

‘হা কিনেছি। কিন্তু তুমি সময়মতো বাসায় আসার চেষ্টা কোরো। আমি কেক বানাব।

‘আসব।’ কফির কাপ নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকলেন এমপি। কিচেন সিঙ্কে সেটা রেখে স্ত্রীকে চুমো খেলেন। বিয়ের পর এতগুলো বছর পেরিয়ে যাবার পর আজও তার অবাক লাগে কী ভেবে তাকে বিয়ে করেছিলেন এই নারী। এরকম একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে বয়েড নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী ব্যক্তি ভাবেন। কীরকম কেক?

মচা। টবি খুব পছন্দ করে।’

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বয়েড। ছেলেটা কত দ্রুত বড় হয়ে যাচ্ছে। সময় কত দ্রুত চলে যায়, তাই না?

হুম। আর সেজন্যই তোমার উচিত তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে ওকে সময় দেয়া।’

“ঠিকই বলেছ। আমি ছটার দিকে চলে আসব।’

“ঠিক আছে। এরচেয়ে বেশি দেরি কোরো না কিন্তু। আজ ডিনার আগেভাগে সেরে ফেলব। তারপর সব গিফটের প্যাকেট খোলা হবে।

‘ওকে। মনে থাকবে।

অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে আয়নায় নিজেকে দেখছেন বয়েড। মাথার চুলগুলো ধূসর হতে শুরু করেছে, অনেক চুল উঠে গেছে, বাড়তি মেদ জমেছে শরীরে। তবে একেবারে বিশ্রী যে লাগছে তা নয়। আকর্ষণীয় নন ঠিকই কিন্তু গড়পড়তা হিসেবে চলনসই শরীর তার।

দরজা বন্ধ করে গ্যারেজের দিকে বয়েড পা বাড়ালেন। হঠাৎ পায়ের শব্দ শুনতে পেয়ে ঘাড় ফেরালেন তিনি। একটা ম্যাচেটি এসে তার খুলি ফাটিয়ে দিল। মাটিতে আছড়ে পড়ার আগেই মৃত্যু হয়েছে তার। আঘাতটা এত জোরাল ছিল যে বয়েড় কোনো চিৎকার করার ফুসরত পর্যন্ত পাননি। আততায়ী দু’জন লাশের পাশে এসে দাঁড়াল। নিশ্চিত হলো এমপি মরেছে কিনা। তারপর আরেকটা আঘাত করে চলে গেল গাছের নিচে পার্ক করা ভ্যানের দিকে। ওটার লাইসেন্স প্লেটটা কাদা দিয়ে ঢাকা।

***

অরউইন ম্যানচেস্টার সবেমাত্র অফিসে এসে পৌঁছেছে এমন সময় তার সেল ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল কলারের নাম লেখা নেই। অবশ্য এরকম কল রিসিভ করতে করতে সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

‘হ্যালো?

কথা বলা যাবে? গভর্নর জেনারেল গর্ডন নোলিলের কণ্ঠস্বরে উদ্বেগ টের পাওয়া যাচ্ছে।

‘হ্যাঁ। বলুন, আপনার জন্য কী করতে পারি?

‘অরউইন, আমরা একে অপরকে চিনি অনেকদিন হলো। আমার কাছে আপনার সত্য কথা বলা উচিত। আপনি কি এই বিদ্রোহীদের সাথে কোনোভাবে সম্পৃক্ত? পরোক্ষ সমর্থন কিংবা তথ্য সরবরাহ… এরকম কিছু?

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল অরউইন। কান থেকে ফোন সরিয়ে যন্ত্রটার দিকে তাকাল একবার তারপর আবার কানে নিল।

‘কিছু মনে করবেন না, আমি আপনার ব্যাপারেও একই কথা ভাবছিলাম।

‘আমি আমার প্রশ্নের উত্তর পাইনি।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল অরউন। না, গর্ডন। তাদের সাথে আমার কোনো যোগাযোগ কিংবা সম্পর্ক নেই। কিন্তু আপনি কি আমাকে নিশ্চিত করে বলতে পারবেন আপনিও ওদের সাথে জড়িত নন? একটু থামল ম্যানচেস্টার। ‘আচ্ছা, হঠাৎ এ-প্রশ্ন?”

‘কেন? আপনি শোনেননি?’

‘আমি কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি। ভণিতা না করে আসল কথাটা জানাবেন, প্লিজ?

‘আজ সকালে বয়েড খুন হয়েছেন। যারা কাজটা করেছে তাদেরকে এরজন্য চরম মূল্য দিতে হবে।

কী বললেন?!

ম্যানচেস্টারকে সব খুলে বললেন রোলিন্স। একটা ফোনকলের মাধ্যমে তথ্যগুলো পেয়েছেন তিনি। কথা শেষে দুজনই চুপ হয়ে গেল। কথাগুলো চুপচাপ হজম করল ম্যানচেস্টার। ওর চেহারা থেকে রক্ত সরে গেছে।

‘আপনি এসবের সাথে কোনভাবেই জড়িত নন? আবার প্রশ্ন করল ম্যানচেস্টার।

‘অরউন, কী বলতে চান?

ওদের দুজনের কথাবার্তা আর সামনে এগোল না। ফোন রেখে অনেক্ষণ অফিসের দরজার দিকে তাকিয়ে রইল ম্যানচেস্টার। ভাবছে। রোলিন্স লোকটা একেবার সাধু না হলেও খুনোখুনির মতো ব্যাপারে জড়াবেন বলে মনে হয় না। আর কথা শুনে মনে হলো, তিনি সত্যিকার অর্থেই ধাক্কা খেয়েছেন… খুব উদ্বিগ্নও বটে।

সবকিছু নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে। অরউন ভাবতে পারেনি বিদ্রোহীরা এতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে। এদিকে ফোনে কথা বলে এটা প্রমাণ হয়ে গেছে গভর্নর ও অরউন কেউ-ই কাউকে বিশ্বাস করে না।

পরিস্থিতি দিনকে দিন ঘোলাটে হয়ে উঠছে।

***

কাঁচের দরজার ভেতর দিয়ে সমুদ্র দেখছে স্যাম। সাগরের ঢেউয়ের উপর সুর্যের তীব্র আলো পড়ায় মনে হচ্ছে ঢেউ যেন আগুনে ঝলসে যাচ্ছে।

‘তুমি রেডি? স্যামের পেছন থেকে প্রশ্ন করল রেমি।

‘আমি সবসময়ই রেডি। আরেকবার পানিতে ডুব দিয়ে দেখতে চাই মন্দিরে নতুন কোনোকিছুর দেখা পাই কিনা। চাইলে তুমিও নামতে পারো আমার সাথে।

‘প্রথমে দেখতে হবে জাহাজের কী অবস্থা। খুব জরুরী না হলে আমি পানিতে নামছি না।’

‘তুমি না অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করো? তোমার মুখে এমন কথা মানায়? অ্যাডভেঞ্চারের জোশটা কোথায়?

ট্যাবলেটে। আজ নতুন একটা কেনার কথা। মনে আছে?

‘আছে। এখন খেয়ে নিই। তারপর ট্যাব কিনতে যাব। কী বলে?

‘আমি কফি খাব।

রুমের দরজা বন্ধ করে নিচের লবিতে গেল ফারগো দম্পতি। ওরা ভেবেছিল হোটেলে আর কোনো অতিথি নেই কিন্তু এখন অল্পকিছু পর্যটককে ফ্রন্ট ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। দিনের বেলা যে ম্যানেজারের ডিউটি সে এগিয়ে এলো পর্যটকদের সামনে। তার মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে আছে।

‘শুভ সকাল। রেডিওতে বলল ম্যানেজার। স্যাম ও রেমি গিয়ে শ্রোতাদের সাথে যোগ দিল।

খবর পাওয়া যাচ্ছে, এমপি বয়েড সেভেরিনকে তার বাড়ির পাশে আজ সকাল সোয়া আটটার দিকে খুন করা হয়েছে। তাকে হনিয়ারা হাসপাতালে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান ম্যাচেটি দিয়ে খুন করা হয়েছে তাকে। সেভেরিনের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না।

‘বিদ্রোহী মিলিশিয়ারা ঘটনার দায় স্বীকার করে হুমকি দিয়েছে তাদের দাবি মেনে না নেয়া হলে সামনে এরকম ঘটনা আরও ঘটতে থাকবে। আপনার ইতিমধ্যে তাদের দাবি সম্পর্কে জানেন। সলোমন আইল্যাণ্ডের যাবতীয় সম্পদ স্থানীয় দ্বীপবাসীদের নিয়ন্ত্রনে হস্তান্তর করতে হবে। কোনো বিদেশি ব্যক্তি বা কোম্পানী এখানে ব্যবসা চালাতে পারবে না। সবাইকে খুব শীঘ্রই ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হবে।

‘প্রশাসন অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত হনিয়ারার রাস্তাঘাটে মার্শাল ল জারি থাকবে। এমপি সাহেবের খুনের ঘটনাকে পুঁজি করে কেউ যাতে দাঙ্গা-হাঙ্গামা বা লুটপাট চালাতে না পারে সেদিকেও কঠোর দৃষ্টি রাখা হবে বলে সরকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

‘অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড শান্তিরক্ষী বাহিনি পাঠানোর প্রস্তাব দিলেও তাদেরকে দ্বীপে আসার অনুমতি দেয়া হবে কিনা সেটা নিয়ে ভাবছে কর্তৃপক্ষ। তবে আজকের দিনটি এক কালো দিন হিসেবে সলোমন আইল্যান্ডের ইতিহাসে লেখা থাকবে সলোমন আইল্যাণ্ডের ইতিহাসে। এক জঘন্য ঘটনার মধ্য দিয়ে দ্বীপ আজকে তার একজন যোগ্য সন্তান হারিয়েছে। বিষয়টা অত্যন্ত লজ্জাজনক।’

রেমির হাতটা নিজের হাতে নিয়ে আলতো করে চাপ দিল স্যাম। ম্যানেজার গলা পরিষ্কার করে আবার বলতে শুরু করল।

সুধীমণ্ডলী, আজ থেকে আপনাদের জন্য এখানে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হবে। তারপরও, আমি বলব কোনোকিছুই অসম্ভব নয়। আমরা কারও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারছি না।’

লবি জুড়ে পিনপতন নীরবতা। হঠাৎ এক অস্ট্রেলিয়ান মহিলা ফুঁসে উঠলেন।

‘নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না মানে? তাহলে আমরা এয়ারপোর্ট পর্যন্ত জান নিয়ে যাব কীভাবে?

ম্যানেজার বেশ বিপাকে পড়েছে। কণ্ঠস্বর যতটুকু সম্ভব মোলায়েম রেখে বলল, ‘ম্যাডাম, আমি বলতে চাচ্ছি, দ্বীপের অবস্থা ভাল নয়। এমতাবস্থায় এই হোটেলেও যেকোন অঘটন ঘটে যেতে পারে। আমরা আপনাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারছি না। এরমানে এই না, আমরা আপনাদের ব্যাপারে উদাসীন। বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করুন। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি তবে কোনো নিশ্চয়তা দিচ্ছি না।’

তারমানে আপনার আমাদেরকে দাঙ্গার মধ্যে ঠেলে দেবেন?

“দাঙ্গা নেই তো। তবে আপনারা যদি এখানে নিরাপদবোধ না করেন তাহলে অন্য কোথাও চলে যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে যাতায়াতের জন্য আমরা বাড়তি সিকিউরিটির ব্যবস্থা করে দিতে পারি। চাইলে এয়ারপোর্টেও যেতে পারেন। তবে আবারও বলছি, নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমনকি আমাদের এখানে যারা স্টাফ আছে তাদেরও নয়।

মহিলা জোরদার কিছু শুনতে চেয়েছিল কিন্তু ম্যানেজারের বক্তব্য তাকে হতাশ করেছে। পর্যটকদেরকে উদ্বিগ্ন রেখে ম্যানেজার হোটেলের পেছনের অফিসে চলে গেল। সবাই এগিয়ে গেল রিসিপশন ডেস্কে থাকা তরুণীর দিকে। তার বয়স ২৫-এর বেশি হবে না। কিন্তু তরুণী যা জবাব দিল সেটা ম্যানেজারের চেয়েও তিক্ত।

রেস্টুরেন্টে গেল স্যাম ও রেমি। একজন ওয়েটার অর্ডার নিচ্ছে। ওদের কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে ওয়েটার খাবার আনতে চলে গেল।

মাথা নাড়ল স্যাম।

এসবের কোনো মানে হয়? উপযুক্ত কারণ ছাড়া মানুষজন খুন হচ্ছে। এসব করে কোনো ফায়দা হবে না। মধ্যে থেকে দ্বীপটার বদনাম হয়ে বাকি পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।’

হতে পারে।

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আন্দোলনকারীদেরকে কেউ পাত্তা দেয় না। তাই এরকম ঘটনা ঘটিয়ে সবার দৃষ্টিআকর্ষণ করছে তারা।

তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছো এগুলো তেমন গুরুত্বর ঘটনা নয়?

‘আরে না। আমি জাস্ট বলতে চাচ্ছি খুনোখুনির ঘটনা ছাড়া দ্বীপে কিন্তু আর কিছুই হয়নি।

‘আমাদের জাহাজের উপর নজর রাখা হচ্ছিল, ভুলে গেছ?’

না, মনে আছে। কিন্তু হতে পারে সেটা স্রেফ এক কৌতূহলী দ্বীপবাসিন্দার কাজ। আমাদের গাড়িতে কিন্তু কোনো আঁচড় দেয়নি সে। কোনো ক্ষতিও করেনি।

‘আচ্ছা। লবির সেই লোকটা? তার ব্যাপারে কী বলবে?

‘সে একটু বাঁকা চোখে তাকিয়েছে বলে এতটা খারাপ ভাবছ?’

দীর্ঘশ্বাস ফেলল রেমি। আমাদের হোটেল রুমের তালা ভেঙ্গে ঢুকল। এটায় কী সাফাই দেবে, শুনি?

না, সাফাই দেব না। আমাদের রুমে ওভাবে ঢোকার অবশ্যই কোনো উদ্দেশ্য ছিল। খেয়াল করে দেখো, দ্বীপের বাসিন্দাদের আর্থিক অবস্থা খুবই শোচনীয়। তাই দারিদ্রতা ঘোচাতে হয়তো চুরি করতে ঢুকেছিল।

খাবার আসার পর চুপচাপ খেল ওরা। বিশাল ডাইনিং রুমে গোরস্থানের নীরবতা। খাওয়া শেষে বিল চুকিয়ে হোটেলে ফিরল ফারগো দম্পতি। হোটলের গেটে ম্যানেজার ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

‘আপনাদেরকে একটা দুঃসংবাদ দেয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। কী বলব, কোত্থেকে কী হয়ে গেল। শহরে দাঙ্গা বেধেছে। হনিয়ারার অর্ধেক ইতিমধ্যে পুড়ছে আগুনে। আমি ব্যক্তিগতভাবে চাচ্ছি, এখানকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আপনারা অন্য কোথাও ঘুরে আসুন।

স্যামের হাত ধরল রেমি। আপনার পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ। সকালে আমরা এটা নিয়ে আলোচনা করব। আচ্ছা, বলুন তো এখানে কোনো কম্পিউটারের দোকান আছে?

‘আছে। হাসপাতাল থেকে দেড় ব্লক দূরে। ডান পাশে। এক বিদেশি কোম্পানীর দোকান। সেজউইক। গলাকাটা দাম রাখে তবে স্টক ভাল।

‘বিদেশি কোম্পানী? তাহলেই হয়েছে। বলল স্যাম। ধন্যবাদ।’

ম্যানেজারকে হতভম্ব করে দিয়ে গাড়ি নিয়ে বেরোল ফারগো দম্পতি। ওদের গাড়ির আওয়াজ শুনে পাকিং লটে থাকা ঘুমন্ত গার্ডের ঘুম ছুটে গেল।

কিছুদূর যাওয়ার পর একটা দোতলা ভবন দেখাল রেমি। ওই যে, সেজউইক।

‘দোকানের সামনে তো অনেক লোক।

‘গাড়ি চালাতে থাকো। মনে হচ্ছে, গণ্ডগোল আছে। রেমি জনতার জটলা খেয়াল করে বলল।

সেজউইকের গেটে কয়েকজন ষণ্ডামার্কা স্থানীয় লোক ভাঙচুর করছে। ওখানে কয়েকজনের হাতে ম্যাচেটি, কারও হাতে কাউবার। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে লুট করতে এসেছে এরা।

‘ম্যানেজার বাড়িয়ে বলেনি দেখছি।’ বলল রেমি। সাইড মিররে সর্তক দৃষ্টি রেখেছে। সবাই লুট করতে এসেছে, তাই না?

হুম। আমি ভাবছি, পুলিশ কোথায়? এখান থেকে পুলিশ স্টেশনের দূরত্ব মাত্র ৬ ব্লক।

‘হয়তো তারা সকালের নাস্তা সেরে নিচ্ছে। কিংবা আরও বড় কোনো সমস্যার সমাধানে ব্যস্ত।

ব্রেক চাপল স্যাম। অবস্থা খারাপ, রেমি।’

ওদের থেকে প্রায় ৬০ ফুট সামনে কয়েকশ স্থানীয় লোক একসাথে দাঁড়িয়ে মানব ব্যরিকেড তৈরি করেছে। দুটো সেডানকে ভাঙ্গচুর করে ফেলে রেখেছে রাস্তার পাশে। ওগুলোর কাঁচ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে রাস্তায়।

গতি কমাতে বাধ্য হলো ওরা। হঠাৎ রেমি চিৎকার করে উঠল। এই সেরেছে!

একটা পাথর ছুটে এসে ওদের গাড়ির উইনশিল্ডে আঘাত করে মাকড়সার জাল তৈরি করে দিল।

.

 ৩২.

পা দিয়ে গ্যাস প্যাডেল ঠেসে ধরল স্যাম। ইতিমধ্যে আরেকটা পাথর এসে গাড়ির ছাদে পড়েছে। স্যাম দ্রুত গাড়িকে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে ঘোরাল। আর একটু হলেই উল্টে যেত গাড়িটা।

‘তুমি ঠিক আছে তো?’ রেমির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল স্যাম।

‘হ্যাঁ, ঠিক আছি। কাঁচ ছিটকে এসে গায়ে পড়লেও কোথায় কেটে-ছিড়ে যায়নি।’ রেমি জবাব দিল। এখন আমরা কী করব?

রাস্তা থেকে সরে নিরাপদ কোথাও আশ্রয় নিতে হবে।’

কাছেই হাসপাতাল। ওখানে নিশ্চয়ই গার্ড আছে?’

গাড়িকে কষে বামে ঘোরাল স্যাম। ওদের গাড়ির পিছু পিছু স্থানীয় লোকজন ছুটে আসছে। আমরা বরং শহরের একদম শেষ প্রান্তে চলে যাই। কিন্তু ওখানে যে এরকম গণ্ডগোল হচ্ছে না তারই বা নিশ্চয়তা কী?

“ঠিক। ওটা করা পাগলামি হবে।’

স্যাম মাথা নাড়ল। তাহলে হাসপাতালেই যাওয়া যাক। যতক্ষণ কোনো ব্যবস্থা না নিচ্ছে আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত ওখানেই অপেক্ষা করব। পুলিশ এলে সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে, আশা করি।

‘কিন্তু যদি পুলিশ না আসে?

‘সেটা এক নতুন সমস্যা। এখন ওটা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। এই দাঙ্গাকে স্রেফ একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ধরে নেয়াই ভাল। আমার মনে হচ্ছে, স্থানীয় গরীব বাসিন্দারা এমপি খুন হওয়ার ঘটনাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ইলেকট্রনিক্স পণ্য আর কম্পিউটার হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। আর কিছু নয়।’

‘তোমার কথাই যেন সত্যি হয়।

হাসপাতালের গেটে পৌঁছে গেছে পারগো দম্পতি। সিকিউরিটি গার্ড ওদের গাড়িকে ভেতরে ঢুকতে দিল। তারপর তার চোখে পড়ল পেছন গাড়ির পেছন পেছন স্থানীয় বাসিন্দারা মোটর বাইক ও দৌড়ে আক্রমণাত্বক ভঙ্গিতে ছুটে আসছে, তাড়াতাড়ি গেট বন্ধ করে দিল গার্ড। স্যাম ও রেমি গাড়ি থেকে নেমে ছুটে গেল হাসপাতালের ভেতরে, তাড়াহুড়োয় গাড়ির দরজাটাও লাগায়নি।

‘মেইনগেটে নিরাপত্তার জন্য বিশেষ কোনো ব্যারিকেডের ব্যবস্থা আছে? ভীত গার্ডকে জিজ্ঞেস করল স্যাম। কিন্তু গার্ড হয়তো ইংরেজি বোঝেনি। স্যাম রুমের চারপাশে তাকাল। ইমার্জেন্সি রুম এরিয়ায় কয়েকজন রোগী অপেক্ষা করছে। একটু পর ডা. ভ্যানাকে একটা রুম থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল। ফারগো দম্পতি ও গার্ডকে দেখে সে হকচকিয়ে গেছে।

স্যাম ভ্যানাকে অল্পকথায় সব বুঝিয়ে বলল। সব শোনার পর কাজে লেগে পড়ল ভ্যানা। গার্ড ও স্টাফদেরকে অর্ডার দিতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যে সবার মিলিত প্রচেষ্টায় হাসপাতালের সামনে একটা ভারি স্টিলের শাটার নামানো হলো। বড় ঝড় থেকে হাসপাতালকে বাঁচানোর জন্য বানানো হয়েছিল এই শাটার।

শাটার ফেলার কয়েক মুহূর্ত পরেই ধুমাধুম আঘাত পড়তে শুরু করল ওখানে। সিকিউরিটি গার্ড, রোগী, স্টাফ সবাই হাসপাতালের পিছনের অংশে চলে গেল। কিছুক্ষণ এভাবে চলার পর ডা. ভ্যানা ঘোষণা করল হাসপাতাল আপাতত নিরাপদ। ফোন তুলে পুলিশকে জানিয়ে দিল হাসপাতাল আক্রমণের শিকার হয়েছে।

আপনারা ভাগ্যবান, হাসপাতাল পর্যন্ত আসতে পেরেছেন। হাসপাতালের শাটারটা বেশ মজবুত। লেভেল ৫-এর হ্যারিকেন এলেও সামাল দিতে পারবে। আপনি যদি একটা গাড়ি নিয়ে ছুটে এসে শাটারে ধাক্কা দেন তবুও ওটাকে টলাতে পারবেন না। তাই বলা যায়, আপাতত আমরা নিরাপদ।

‘পুলিশ কী এসব থামাবে না?’ রেমি জানতে চাইল।

‘আশা করা যায়, থামাবে। কিন্তু সময় লাগবে। ভ্যান জবাব দিল। যা-ই হোক, রোগীরা বসে আছে। আমাকে যেতে হচ্ছে।

আবার ধড়াম করে আঘাত পড়ল শাটারের গায়ে। কিন্তু শাটার অবিচল। স্যাম গলার স্বর নিচু করে ভ্যানাকে বলল, কিছু টেবিল চেয়ার নিয়ে শাটারের কাছে রাখলে বোধহয় মন্দ হয় না। যদি শাটারটাকে ভেঙ্গে ফেলে ওগুলো ব্যারিকেড হিসেবে কাজ করবে।

ভ্যানা মাথা নাড়ল। শাটার যদি ভেঙ্গে ফেলতে পারে তাহলে এসব ছোটখাটো জিনিস দিয়ে আর কী লাভ হবে?

ডা. ভ্যানাকে এগোতে দেখে ওয়েটিং রুমের বেঞ্চে বসা থাকা এক মহিলা উঠে দাঁড়াল। ডাক্তর, আমি ম্যালাক্ষণ ধইরা আপনের লাইগ্যা বইসা আছি। আমার মাইয়াডারে খুঁইজ্জা পাইতাছি না। আমার লিলি… মাইয়াডা হারায়া গ্যাছে। কিছু একড়া করেন।

খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না মানে?’ ভ্যানা জানতে চাইল।

কাইল থিক্কা অরে পাইতাছি না। এই নিয়া এক মাসে গ্রাম থিক্কা তিন মাইয়া হারাইলো। মাইয়াড়ার অসুখ আছিল। আপনে বারবার কইয়া দিছিলেনজানি ঠিকমতো ওইষুধগুলান খায়…’।

মহিলাকে নিয়ে একটু দূরে গেল ভ্যানা। নিচু গলায় কথা বলল তার সাথে। এদিকে শাটারে এখনও আঘাত পড়ছে তবে পরিমাণটা কম। দাঙ্গাপ্রেমীরা হয়তো বুঝতে পেরেছে এখানে শক্তি খরচ করে খুব একটা লাভ হবে না। এটা হাসপাতাল, লুট করলে হয়তো কিছু ওষুধ পাওয়া যাবে। বরং ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দোকান লুট করলে বেশি লাভ হবে তারচেয়ে।

দূর থেকেই মহিলাটির কণ্ঠস্বর শোনা গেল। বেশ জোর গলায় কথা বলছে। সে, কিন্তু ডাক্তর, আমার মাইয়াড়ার অসুখ আছিল। অয় কহন ফিরব না ফিরব হেইডার লিগা অপেক্ষা করন ঠিক হইব না। আমি পারমুও না। অরে খুঁজতে হইব। ম্যালা বাচ্চা গায়েব হওয়া শুরু হইছে ইদানীং। আর এইবার আমার সোনা মাইয়া লিলি হারাইলা…’

ভ্যানা মহিলাকে কী জবাব দিল সেটা শোনা গেল না। মহিলাকে নিয়ে ট্রিটমেন্ট এরিয়ায় গেল ডাক্তার।

‘তোমার কী অবস্থা?’ রেমি’র পাশে একটা বেঞ্চে বসে স্যাম প্রশ্ন করল। সব দরজা-জানাল বন্ধ থাকায় রুমের তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে।

‘আমি ভাল আছি। কিন্তু এখানে স্বস্তি পাচ্ছি না।’

কপাল ভাল থাকলে এই বন্দিদশা খুব শীঘ্রই কেটে যাবে।

‘আমার মনে হচ্ছে কপাল ভাল নয়।’

৫ মিনিট পর মহিলাটাকে নিয়ে রুমে এলো ভ্যানা। মহিলাকে এখন বেশ শান্ত দেখাচ্ছে। উত্তেজনা প্রশমনকারী ইনজেকশন দেয়া হয়েছে হয়তো। স্যাম ও রেমি’র পাশে এসে বসল ভ্যানা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আশা করছি, খুব শীঘ্রই পুলিশ চলে আসবে।’

‘দেখা যাক। আচ্ছা, উনি ঠিক আছেন তো? মহিলার দিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন করল রেমি।

‘হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। মেয়েকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা করছে। মেয়েটার বয়স মাত্র ১৪। আমার মনে হয় ও পালিয়েছে। এখানকার মেয়েদের স্বভাবই এরকম। একটু বড় হলেই মনে রং লাগে। কোনো একটা ছেলের কাছে পটে যায়। স্কুল, পড়ালেখা, বাবা-মা’র শাসন তখন আর তাদের ভাল লাগে না। তারপর পালিয়ে যায় ছেলের হাত ধরে। ভ্যানা জানাল।

‘তাহলে মহিলা নিশ্চয়ই খুব আপসেট?’ বলল স্যাম।

‘তা ঠিক। তবে এই মুহূর্তে তারচেয়েও কঠিন সমস্যা আছে আমাদের সামনে। আমি বরং রেডিও চালু করে দেখি খবরে কী বলছে।’

ভ্যানা কাউন্টারের কাছে গিয়ে বড় রেডিও অন করে ভলিউম বাড়িয়ে দিল যাতে সবাই শুনতে পায়। রেডিও’র স্পিকার থেকে সংবাদ পাঠকের কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে।

‘আমরা রিপোর্ট পেয়েছি, ডাউনটাউনে কয়েকটি ব্লক জুড়ে লুটপাট চালাচ্ছে স্থানীয় জনগণ। এ-ব্যাপারে পুলিশ চীফের মন্তব্য চাওয়া হলে তিনি জানান, আইনভঙ্গকারীদেরকে যথাপোযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। সে-লক্ষ্যে সব পুলিশ অফিসারকে ডাকা হয়েছে। ব্রিফিং শেষে মাঠে নামছে তারা। সন্ত্রাসরোধে পুলিশ কাউকে কোনো ছাড় দেবে না।

এছাড়া প্রশাসন থেকেও খুব শীঘ্রই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

‘অন্য এক রিপোর্ট বলছে, বিদ্রোহী মিলিশিয়ারা বিভিন্ন জিনিসের লোভ দেখিয়ে দলে ভিড়াচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। দ্বীপের এই গোলযোগ রুখতে প্রধানমন্ত্রী বিদেশি নিরপত্তারক্ষীদের সাহায্য চেয়েছেন। নিরাপত্তা বাহিনির প্রথম সেনাদল আগামী ১২ ঘণ্টার মধ্যে দ্বীপে এসে পৌঁছুবে বলে জানানো হয়েছে।

খবর শুনতে শুনতে ডা. ভ্যানার মুখ কালো হয়ে গেল। তবে সংবাদ পাঠকের পরবর্তী কথাটা শুনে রীতিমতো চমকে উঠল সে।

‘আমরা সৌভাগ্যবান, আজ স্টুডিওতে একজন এমপি-কে পেয়েছি। আপনারা সবাই তাকে চেনেন ও জানেন। অনেক বছর যাবত দ্বীপের একজন একনিষ্ঠ সেবক হিসেবে কাজ করে আসছেন তিনি। আমাদের সবার সম্মানিত বন্ধু, নির্ভরতার মানুষ; অরউন ম্যানচেস্টার। মিস্টার অরউন, স্টুডিওতে আসার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

‘আপনাকেও ধন্যবাদ। স্টুডিওতে আসতে পেরে আমি আনন্দিত।

‘একজন এমপি হিসেবে দ্বীপের বর্তমান অবস্থার ব্যাপারে আপনার কী মতামত। শ্রোতাদের যদি জানাতেন…’

“দেখুন, সবার আগে আমি এই দ্বীপের একজন নাগরিক। তারপর আইন ব্যবসায়ী এবং সবশেষে এমপি। দ্বীপের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমি খুবই উদ্বিগ্ন। আমাদের দ্বীপের কর্মঠ বাসিন্দারা এরকম দাঙ্গা বাধিয়ে লুটপাট চালাচ্ছে এটা আমি মেনে নিতে পারছি না। হয়তো তারা দারিদ্রতা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় এসব করছে তারপরও এগুলো কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। ব্যক্তিগতভাবে আমি এরকম উগ্র জাতীয়তাবাদ সমর্থন করি না।

‘তার উপর বয়েড সেভেরিনের খুন। মানবতার চরমতম অবমাননা হয়েছে এই খুনের মাধ্যমে। কিছু কিছু ব্যাপারে বয়েড ও আমার মধ্যে মতের মিল না হলেও আমরা একে অপরকে শ্রদ্ধা করতাম। মতের মিল না হলে আলোচনার মাধ্যমে সব সমাধান করেছি। তার এরকম অকাল মৃত্যুতে আমি শোকাহত।

থামল ম্যানচেস্টার। তার কণ্ঠস্বর বেশ টানটান।

অরউন হয়তো আরও কিছু বলবে এটা ভেবে সংবাদ পাঠক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, “আপনারা শুনছিলেন অ্যাটর্নি ও সম্মানিত এমপি অরউন ম্যানটেস্টারের বক্তব্য। যারা এই অনুষ্ঠানটি শুনছেন তাদেরকে বলছি, আইনভঙ্গ করবেন না। সভ্য ও দায়িতুশালী নাগরিকের মতো আচরণ করুন। আমরা সলোমন আইল্যাণ্ডের বাসিন্দারা সভ্য ও বন্ধুত্বপরায়ণ, পুরো দুনিয়া যেন আমাদেরকে খারাপ না ভাবে, বিষয়টা সবাই মাথা রাখবেন।

সংবাদ শেষ করার আগে সংবাদ পাঠক জানাল দ্বীপের পরিস্থিতির ব্যাপারে সর্বশেষ খবর পাওয়া মাত্র সেটা শ্রোতাদেরকে জানানো হবে। এরপর রেডিওতে অন্যান্য সাধারণ অনুষ্ঠান শুরু হলো।

মাথা নাড়ল ভ্যানা। আমি একটা গাধী। ভেবেছিলাম অরউনের ব্যাপারে আমার ধারণা ভুল। এখন দেখছি ঠিকই ভেবেছি।

কী?’ রেমি জানতে চাইল। ম্যানচেস্টার? বুঝলাম না।’

‘আমি গতকাল অরউনের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সাথে কথা বলেছি। অরউন আমাদের সামনে যে রূপ প্রকাশ করেছে আর তার বন্ধু যা বলল দুটো চরিত্রের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। আমি কেন যেন সন্দেহ হয়েছিল এই দাঙ্গার পেছনে অরউনের হাত আছে। রেডিওতে ওর কথা শুনে নিশ্চিত হলাম। দ্বীপ থেকে বিদেশি কোম্পানীগুলো বিদেয় হলে অরউন রাতারাতি আরও ধনী বনে যাবে। জাতীয়তাবাদ অনেক বাড়তি সুবিধা দেবে ওকে। এখানকার সেরা অ্যাটর্নি অরউন ম্যানচেস্টার। অনেক লোকের সাথে চেনা-জানা আছে ওর।’

‘ডিনারে কিন্তু তাকে এরকমটা মনে হয়নি। এমনকি রেডিও’র কথাতেও সেরকম কিছু মনে হলো না। স্যাম মন্তব্য করল।

‘অরউন বাইরে এক আর ভেতরে আরেক। উকিল আর রাজনীতিবিদদের চরিত্র কেমন হয় তা নিশ্চয়ই আপনারা জানেন। অরউন ম্যানচেস্টারের পেশা ওই দুটোই। তাই তার চরিত্র সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া কঠিন। দ্বীপের সবকিছু স্থানীয়দের হাতে চলে এলে প্রথম সারির একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে অরউন প্রচুর সুবিধা পাবে। নিজের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি খাঁটিয়ে প্রচুর টাকাও কামাতে পারবে। ভিনদেশী নতুন কোম্পানির সাথে সমঝোতা করে তাদেরকে ব্যবসা করতে দেবে দ্বীপে, অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখে ধূলো দেয়ার জন্য স্থানীয় কোনো পরিচিত মুখকে কাঠের পুতুলের মতো বসাবে সেই কোম্পানীর উঁচু পদে।

‘তারমানে আমি বিশ্বাস করছেন, অরউন এসবের সাথে জড়িত?’ রেমি প্রশ্ন করল।

‘নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই। সবই আমার সন্দেহ। এবং তার পেছনে কারণও আছে। ভেবে দেখুন, দ্বীপ জুড়ে এরকম কোম্পানির দৌরাত্ব বাড়লে অর্থনৈতিক অবস্থার কেমন বেহাল দশা হতে পারে। যাবে। এখন হয়তো ৫ টা বিদেশি ছোট কোম্পানি কাজ করছে। কিন্তু জাতীয়করণের পর অরউনের হাত ধরে আরও ২০ টা কোম্পানি এসে জুটবে।

স্যাম ও রেমি একে অন্যের দিকে তাকাল। সে বিদ্রোহীদের সাথে জড়িত এর কোনো প্রমাণ আছে? নাকি সন্দেহই সব?’

উঠে দাঁড়াল ভ্যানা। অনেক বলে ফেলেছি। আর কিছু না বলাই ভাল। আচ্ছা, ভাল কথা, আপনাদের জন্য একটা ট্যাবলেটের ব্যবস্থা করে হোটেল রুমে পৌঁছে দেব। এখন একটু রোগীদের দেখভাল করতে হবে। প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে ট্রিটমেন্ট এরিয়ার দিকে পা বাড়াল ভ্যানা।

‘আমি আগেই বলেছিলাম ম্যানচেস্টারকে আমার কেমন যেন মনে হয়, স্যাম বলল। যদি ম্যানচেস্টার তার মনের বাসনার ব্যাপারে মিথ্যা বলে থাকে…’

‘তাহলে আমাদের আশংকাই সত্য হয়ে যাবে।’ বাক্যটা পূর্ণ করে দিল রেমি।’

‘কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায়। সুযোগের স্বপ্ন দেখা আর সেটাকে বাস্তবে কাজে লাগানোর মধ্যে অনেক ফারাক আছে। দ্বীপে এরকম বিদ্রোহ সষ্টি করে স্বার্থ উদ্ধার করা কম কথা নয়। আর ম্যানচেস্টারকে আমি যতদূর দেখেছি, খুনীদের সাথে তার গভীর সখ্যতা আছে বলে মনে হয় না। তোমার কী মনে হয়?

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল রেমি। বাইরে থেকে দেখে মানুষ চেনা মুশকিল। তাছাড়া যখন টাকার স্বার্থ চলে আসে তখন চেনা মানুষও অচেনার মতো আচরণ করে।’

শাটারে আরেকবার আঘাতের শব্দ পাওয়া গেল। রোগী দেখতে দেখতে শাটারের দিকে তাকাল ভ্যানা। ফারগো দম্পতি এগোল তার দিকে।

‘আমরা এখন কী করতে পারি?’ রেমি প্রশ্ন করল। হাসপাতালের ভেতরে আর কোনো নিরাপদ জায়গা আছে যেখানে আমরা লুকোতে পারব?’

মাথা নাড়ল ভ্যানা। না। হাসপাতালটা বেশ ছোট। তাছাড়া সব রুমে রোগী আছে। ঝড় থেকে বাঁচার জন্য শাটারের ব্যবস্থা আছে এই-ই বেশি। ভ্যানা সামনের দরজার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এখন প্রার্থনা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।

.

৩৩.

গরমে দরদর করে ঘামছে স্যাম। ওষুধের লিটারেচার নিয়ে রেমি নিজেকে বাতাস করছে। ভ্যানা পুলিশকে ফোন করার পর পেরিয়ে গেছে আধাঘন্টা। শাটারে শেষ আঘাত হয়েছে ১০ মিনিট আগে, তারপর আর কোনো সাড়াশব্দ যাচ্ছে না।

স্যামের দিকে ঝুঁকল রেমি। মনে হয়, হাসপাতালের সামনে থেকে ওরা সরে গেছে।

‘আমি ভাবছি, আমাদের গাড়িটা আস্ত আছে তো? স্যাম বলল। ‘ম্যানচেস্টারের কথাটা বারবার ধোচাচ্ছে। দ্বীপের বর্তমান সরকারকে সরানোর জন্যই কি এরকম দাঙ্গার সৃষ্টি করা হয়েছে? যাতে প্রমাণিত হয় বর্তমান সরকার এই দ্বীপ পরিচালনা করতে ব্যর্থ। তারপর নির্বাচন করে নতুন সরকারকে বসানো হবে হয়তো।

স্যামের সাথে রেমি যোগ করল। এবং সেই নতুন সরকার এই দ্বীপকে একদম জাতীয়করণ করে ফেলবে। ঠিক যেমনটা বিদ্রোহীরা চাচ্ছে।

হাসপাতালের পেছনের অংশ থেকে ভ্যানা এগিয়ে এলো। তার হাতে সেলফোন। ভাল খবর। পুলিশ এসে গেছে। দাঙ্গার লোকজনকে সরিয়েও দিয়েছে হাসপাতালের সামনে থেকে। আমরা এখন নিরাপদ।’ সিকিউরিটি গেটের দিকে তাকাল ভ্যানা। দাঙ্গা এরআগে অনেক হয়েছে কিন্তু হাসপাতাল কখনও আক্রমণের শিকার হয়নি। এবারই প্রথম এমন হলো।

এরজন্য বোধহয় আমরা দায়ী। আমাদেরকে ধাওয়া করেই তো ওরা এখানে এসেছিল।’

বাজে কথা। এখানে না এসে আপনাদের আর কোনো উপায় ছিল না। বাদ দিন…’হঠাৎ ভ্যানার ফোন বেজে উঠল। ফোন নিয়ে একপাশে সরে গেল ডাক্তার। কথা শেষ করে স্যামের দিকে ফিরে বলল, “শাটার তুলতে আমাকে সাহায্য করবেন, প্লিজ?

‘অবশ্যই। চলুন।

কয়েক হাজার পাউন্ড ওজনের শাটারকে বেয়ারিং মেকানিজমের সাহায্যে তুলল ওরা। শাটার তোলার পর দেখা গেল দাঙ্গার লোকজন কেউ নেই। তবে কয়েক ডজন পুলিশ কার দাঁড়িয়ে আছে। লাল-নীল আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। সেগুলো থেকে। হাসপাতালের দরজা খুলে দেয়ায় ঠাণ্ডা তাজা বাতাস এসে ঢুকল ভেতরে।

একজন অফিসার এগিয়ে এলো সামনে। উচ্চতায় বেঁটে হলেও দশাসই স্বাস্থ্য তার। এগিয়ে এসে ভ্যানাকে ছোট করে স্যালুট দিল সে।

‘সবাই ঠিক আছেন তো?’

‘হ্যাঁ। আমরা ঠিক আছি। দাঙ্গার কী হলো? জানতে চাইল ভ্যানা।

‘আমাদের গাড়ির লাইট দেখেই ওরা পালিয়েছে। তবে আপনাদেরকে একটা ভাল খবর দিতে চাই, যা দেখলাম, বিগত দিনের দাঙ্গার চেয়ে এবার দাঙ্গায় অনেক কম লোকজন অনেক জড়িত হয়েছে। অতএব, দুশ্চিন্তার কিছু নেই।

স্যামের দিকে ফিরল রেমি। স্বস্তির কথা।

স্যাম ভ্যানাকে বলল, “আমাদেরকে ভেতরে আশ্রয় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। নইলে কী যে হতো…’।

ব্যাপার না। তবে এখানকার পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখবেন। আমি আপনাদের দূর্ঘটনার সংবাদ পত্রিকায় দেখতে চাই না।’

‘অবশ্যই বিবেচনায় রাখব। রেমি জবাব দিল। তারপর ঘুরল অফিসারের দিকে। আমাদের কার রেন্টাল এজেন্সি যাওয়াটা এখন নিরাপদ হবে তো?

‘এজেন্সির নাম?’

‘আইল্যাণ্ড ড্রিমস।

‘ওটা তো ছয় ব্লক পর, তাই না? আমরা ওখানকার কোনো গণ্ডগোলের রিপোর্ট এখনও পাইনি। তবে তারপরও বলব, না যাওয়াই ভাল। আপনারা ভাগ্যের জোরে একবার বেঁচে গেছেন। বারবার সেটা নাও হতে পারে।’

রেমি’র হাত ধরল স্যাম। এসো, গাড়িটা পরিষ্কার করি।

পাথরের আঘাতে ওদের টয়োটার উইন্ডশিল্ড ভেঙ্গে গেছে। কাঁচের টুকরোতে ভরে গেছে প্যাসেঞ্জার সিট আর ড্যাশবোর্ড। এসব পরিষ্কার করার জন্য ঝড় আনতে রেমি হাসপাতালে ফিরে গেল। এইফাঁকে ব্যাকপ্যাক থেকে স্যাট ফোন বের করে সেলমাকে ফোন করল স্যাম।

‘সেলমা, কী অবস্থা? ওপাশে ফোন রিসিভ হওয়ার পর স্যাম বলল।

তোমার কর্নেল কুমাসাকা’র চরিত্র তো বেশ রঙিন। মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে গ্রাজুয়েশন শেষ করে মিলিটারিতে যোগ দিয়েছিল সে।

‘তাই নাকি? একজন বিজ্ঞানীর জন্য বিষয়টা রীতিমতো বিস্ময়ের ব্যাপার।

‘হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই। কাহিনি আরও আছে। কুমাসাকার ব্যাপারে অনুসন্ধান করে পরস্পর বিপরীতমুখী তথ্য পাচ্ছি আমি। কোনো রেকর্ড বলছে সে পদাতিক বাহিনিতে কর্মরত ছিল আবার কোনোটা বলছে সে কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট ছিল। আবার কোথাও বলা আছে সেনাবাহিনিতে পরামর্শক হিসেবে ছিল সে।’

অদ্ভুত।

‘সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, মিত্রবাহিনি তাকে মিয়েজি কর্পোরেশন-এর একজন সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করে রেখেছে।

‘এই কর্পোরেশনের নাম আমি এরআগে কখনও শুনিনি।

‘কেউই শোনেনি। এমনকি আমি এটার কোনো তথ্যও খুঁজে পাইনি এখনও।

‘আমি যে সেলমাকে চিনি সে তো এরকম ব্যর্থ হওয়ার পাত্রী নয়। একটু চুপ থেকে তারপর বলল স্যাম। ফোনের অপরপ্রান্তে থেকেও স্যাম টের পেল সেলমা হাসছে।

হুম। তাই আমি আরও গভীরে অনুসন্ধান চালালাম। প্রশাসনের ভেতরে আমার লোক আছে কাজে লাগালাম তাদের।

ভণিতা হজম করতে কষ্ট হচ্ছে, সেলমা।

‘দ্য মিয়েজি কর্পস, একটা স্পেশাল প্রজেক্টের নাম। যে প্রজেক্ট থেকে প্রাপ্ত জিনিসগুলোকে পরোক্ষযুদ্ধে ব্যবহার করা হতো। বিগত ২০০ বছরের মধ্যে বিখ্যাত কর্পোরেশনের মধ্যে একটা হলো এই মিয়েজি কর্পস,

‘পরোক্ষযুদ্ধ?’ পুনরাবৃত্তি করল স্যাম। ১৯৪২ সালের সাথে এটার কোনো সম্পর্ক আছে? মনে হয় না।’

‘ঠিক। তবে আমি জাস্ট শূন্যস্থানগুলো পূরণ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু শেষমেশ সব গিয়ে এসপিওনাজ… আর বায়োলজিক্যাল ওয়্যারফেয়ারে গিয়ে ঠেকেছে।

বেশ কিছুক্ষণ দু’জনই চুপ করে রইল।

‘তাহলে বায়োওয়েপনের ব্যাপারে যে গুজব শোনা যায় সেটার হয়তো এবার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। নিচুস্বরে বলল স্যাম।

‘আসল সমস্যার কথা তো তোমাকে এখনও বলিইনি। সেলমা বলল।

কী সেটা?

‘আমি আবিষ্কার করেছি ৭০ বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে যাওয়ার পর এখনও মিয়েজি কর্পস, ও কর্নেল কুমাসাকা’র-এর ফাইলগুলো ক্লাসিফায়েড। সম্পূর্ণ গোপনীয়। টপ সিক্রেট। তাই, উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্যই আমি যোগাড় করতে পারিনি। আমার যে লোক তথ্যগুলো দেয়… বরাবরই বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ আচারণ করে আমার সাথে। কিন্তু এবার তার কণ্ঠে আমি শীতল আগুন টের পেয়েছি।

‘এখনও টপ সিক্রেট? কেন? এতবছর গরও গোপন করে রাখার কী মানে?

‘আমি জানি না। তবে এতটুকু বলতে পারি, তোমার কর্নেল শুধু একজন সাধারণ কর্নেল ছিল না।’

‘একটা ডেস্ট্রয়ার পাঠিয়ে তাকে সোজা টোকিও নেয়াও ঘটনাতেই সেটা প্রমাণ হয়ে যায়। সেলমা, আমি জানি তুমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছ। তারপরও বলছি, তুমি যেভাবে পারো আমাকে এই কর্নেলের ব্যাপারে আরও তথ্য যোগাড় করে দাও।

‘আমার সাথে পিটার আর ওয়েণ্ডিও বিষয়টা নিয়ে কাজ করছে। বিস্তারিত তথ্য হাতে এলে তোমাকে ই-মেইল করে দেব।’ একটু ইতস্তত করল সেলমা। ‘আমি কি ঠিক পড়ছি? নিউজে দেখাচ্ছে গোয়ালক্যানেলে দাঙ্গা-হাঙ্গামা চলছে?

‘হ্যাঁ, ঘটনা সত্য। তবে আমরা ভাল আছি।’

আবার নীরবতা। “নিরাপদে থেকো। নইলে আমার এত রিসার্চ সব জলে যাবে।

থাকব সেলমা।

রেমি ইতিমধ্যে কাঁচের টুকরোগুলো পরিষ্কার করে ফেলেছে। গাড়িতে চড়ে বসল ফারগো দম্পতি। গন্তব্য: আইল্যাণ্ড ড্রিমস।

.

 ৩৪.

ওরা হোটেলে ফিরে দেখল পুরো হোটেল খা খা করছে। সিকিউরিটি গার্ডরা হাতের লাঠি ঘোরাচ্ছে নার্ভাস ভঙ্গিতে। গেটের দারোয়ানের আজ খুব একটা ব্যস্ততা নেই। বারবার গেট খুলতে হচ্ছে না। রাস্তায় যানবাহন নেই বললেই চলে। রুমে ঢুকে রীতিমতো চমকে গেল ফারগো দম্পতি। একটা নতুন ট্যাবলেট ওদের বিছানার উপর শোভা পাচ্ছে। ভ্যানা পাঠিয়েছে নিশ্চয়ই। স্যাম ও রেমি নিজেদেরকে ফ্রেশ করার কাজে দেড় ঘণ্টা কাটিয়ে দিল। তারপর অনলাইনে বসল স্যাম।

কী করব এখন? লাঞ্চ সারব নাকি ঝুঁকি নিয়ে লিওর সাথে দেখা করতে যাব?” স্যামকে প্রশ্ন করল রেমি।

লাঞ্চ করাটাই নিরাপদ হবে। আমি নিশ্চিত, আমাদেরকে ছাড়া লিও অনায়াসে ডাইভ প্রজেক্ট চালিয়ে নিতে পারবে। তোমার কী মনে হয়?

‘ঠিকই বলেছ। রেমি স্যামের কাছে বসে ওর হাতে থাকা ট্যাবলেটের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। কী দেখছ?

‘ইন্টারনেটে দেখছি এইড কর্মীদের অপহরণের ঘটনার আগে বিদ্রোহীদের কোনো কার্যকলাপের রিপোর্ট পাওয়া যায় কিনা। কিন্তু নেই।’

তার মানে কী দাঁড়াচ্ছে?

‘তার মানে এই পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে আমরা এখানে আসার পর থেকে। কাকতালীয়ভাবে আমাদের সাথে মিলে গেছে সময়টা।

‘ঠিক। কিন্তু এই বিদ্রোহীদের যদি এতটা জনপ্রিয়তা থাকে স্থানীয়দের কাছে তাহলে এদের ব্যাপারে তো কারও কিছু বলার কথা? তোমার কী মনে হয়? আমার কাছে তো পুরো বিষয়টা ঘোলাটে লাগছে।’ পেছনে হেলান দিল স্যাম, সমুদ্রের দিকে তাকাল। খনিজ পদার্থের সাথে অনেক অর্থের সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। সোনা তো বটেই, পেট্রোলিয়ামটাও কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যাপার। রেমির দিকে ফিরল স্যাম। ভাগ্য ভাল, এসব নিয়ে আমাদের সাথে ওদের কোনো লেনদেন নেই। ডুবে যাওয়া ইমারত আর গুপ্তধন নিয়েই আমাদের কারবার সীমাবদ্ধ।

হুম। দুপুরে গ্রিল করা মাহি মাহি আর আমের চাটনি হলে কেমন হয়? রেমি জানতে চাইল।

‘তুমি যখন বলেছ ভাল না হয়ে পারে?

‘সবসময় এত মেয়ে পটানো কথা পাও কোথায়? বলো তো?’ স্যামকে একটু তো দিয়ে চুমো খেল রেমি।

‘তা তো জানি না। শুধু জানি, আমার ভেতরে থাকা দুষ্টু মানুষটা চায় তুমি যেন আমার কথা শোনো।

ফাজিল!

***

কচ্ছপের গতিতে খাবার সার্ভ করা হলো ওদের রুমে। দুপুর দুটো বেজে গেল লাঞ্চ শেষ হতে হতে। লাঞ্চের পর ম্যানেজারের সাথে কথা বলল ওরা। বরাবরের মতো এবারও দ্বীপের পরিস্থিতির ব্যাপারে সতর্ক করে দিল ম্যানেজার। পার্কিং লটে এসে টয়োটাতে চড়ে বসল ফারগো দম্পতি। রওনা হলো আইল্যাণ্ড ড্রিমস-এর উদ্দেশে।

রেন্ট-এ-কারের এজেন্ট গাড়ির ক্ষয়ক্ষতি বিষয়টা বুঝতে পারল। স্যাম ক্ষতিপূরণ বাবদ কয়েকশ ডলার দিতেই একেবারে গদগদ হয়ে গেল এজেন্ট। এমনভাবে সরি-টরি বলতে শুরু করল যেন গাড়ির এই দশা হওয়ার জন্য সে নিজেই দায়ী! ফারগো দম্পতিকে গাঢ় নীল রঙের নিশান পাথফাইণ্ডারের কাছে নিয়ে গেল সে। নিশানের অবস্থা দেখে মনে হলো এই গাড়ি পুরো পৃথিবী ভ্রমণ করে ফেলেছে। ওতে চড়ে বসল ফারগো দম্পতি।

‘গাড়ির আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছে যেন গুলি বেরোচ্ছে!’ স্যাম যখন গাডির গতি বাড়াচ্ছে তখন রেমি মন্তব্য করল।

‘এই দ্বীপের জন্য এই গাড়ি-ই ঠিক আছে। দাঁত বের করে হাসল স্যাম।

হোটেলের পার্কিং লটে গাড়িটা পার্ক করার সময় স্যাট ফোন বেজে উঠল। লবিতে ঢোকার পর ফোনটা রিসিভ করল স্যাম।

‘হ্যালো?’

সেলমা ভণিতা করে কোনো সময় নষ্ট করল না। আমরা কুমাসাকার হদিস পেয়েছি। তার মেয়ে টোকিও’র সাওয়ারা-তে থাকে। মহিলার বয়স এখন ৭০-এর ঘরে। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত, কোনো সন্তান নেই।

তার সাথে যোগাযোগ করেছ?

না। ভাবলাম হয়তো তুমি নিজেই যোগাযোগ করতে পছন্দ করবে।

‘আচ্ছা। তুমি জাপানিজ ভাষা কীরকম পারো?

বুলগেরিয়ান ভাষা যতটা পারি ততটা।

হুম, বুঝেছি, পারো না। তোমার কোনো বন্ধু আছে যে আমাদেরকে এই বিষয়ে সাহায্য করতে পারবে?

‘হ্যাঁ, আছে। তুমি জাস্ট বলল আমি নিজেকে কী বলে পরিচয় দেব?

তুমি তাকে বলবে, তুমি একজন ইতিহাসবিদের সাথে যুদ্ধের সময়কার জাপানিদের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার কাজ করছ। এখন এমন একজন অফিসারের ব্যাপারে জানতে চাও যে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যাণ্ডে কারাভোগ করেছে। সেটা হলো ওই মহিলার বাবা। তাই এব্যাপারে আমরা তার সাথে কথা বলতে চাচ্ছি।’ থামল স্যাম। তুমি যদি আমাদের জন্য একটা মিটিঙের ব্যবস্থা করে দিতে পারো তাহলে আমি আর রেমি জাপানে হাজির হয়ে যেতে পারি।’

‘ওকে, বস। কিন্তু এই মহিলা বোধহয় যুদ্ধের সময় একদম বাচ্চা ছিল। তার সাথে এত পথ পাড়ি দিয়ে দেখা করে মনে হয় না খুব একটা উপকার হবে।

‘আমি জানি। কিন্তু আমাদের হাতে আর কোনো সূত্র নেই যেটা ধরে সামনে এগোনো সম্ভব। তুমি জাস্ট দেখো, তাকে আমাদের সাথে দেখা করার ব্যাপারে রাজি করাতে পারো কি না।

‘ওকে। ফোন অফ করে রেখো না কিন্তু।’ সেলমা লাইন কেটে দিল।

রুমে ঢুকে বারান্দায় গেল স্যাম। ফোন করল ডারউইনে।

ডেস ফোন রিসিভ করল। বরাবরের মতো তার কণ্ঠ বেশ উৎফুল্ল। স্যাম সাহেব! কী অবস্থা আপনার? রেডিও-তে শুনলাম দ্বীপে বেশ উত্তেজনা বিরাজ করছে?

‘ঠিকই শুনেছেন। আমরা অল্পের জন্য বেঁচে গেছি। তবে এখন সব শান্ত।’

‘সব ঠিক তো?

‘হ্যাঁ সব ঠিক। আচ্ছা, কাজের কী অবস্থা? কাল হয়তো আমাদেরকে দ্বীপ ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে হবে।

‘ঘুরে আসুন। নো প্রবলেম। আপনার বন্ধু লিওনিড সবকিছু বেশ সামলে নিচ্ছে। একটু ধীরে-সুস্থে কাজ করে। তবে দক্ষ লোক।

‘ও কি আপনার কাছে আছে?

‘দিচ্ছি, এক সেকেণ্ড ধরুন। কিছুক্ষণ পর লিও’র কণ্ঠ শোনা গেল।

‘লিও, কী অবস্থা?

‘চলছে।’ বরাবরের মতো তিক্ত কণ্ঠে বলল লিও। তুমি কি এরচেয়ে বড় একটা বড় নৌকার ব্যবস্থা করতে পারবে?

‘চেষ্টা করছি, বন্ধু। আচ্ছা, ভাল কথা, ধ্বংসাবশেষের ভেতর থেকে নতুন কিছু পেলে?

না। মূল মন্দিরের শরীর থেকে আগাছা পরিষ্কার করছি। আরও উন্নত যন্ত্রপাতি এলেও অনেকদিন লাগবে সব পরিষ্কার করতে। লিও’র কণ্ঠে কোনো উত্তেজনা নেই।

‘ঠিক আছে। অপেক্ষা করা যাক। সবুরে মেওয়া ফলে, কী বলে?

“হুম” আওয়াজ ভেসে এলো ওপাশ থেকে; দীর্ঘশ্বাস ফেলল লিও। ‘আমাকে আরও একটু বেকায়দায় ফেলতে স্বশরীরে আসবে নাকি এখানে?

না, বন্ধু। আজ পারছি না। তবে খুব শীঘ্রই আসব।’ স্যাম একটু ইতস্তত করল। আজ সকালে এখানে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। ডেস কি এখনও পাড়ের দিকে নজর রাখছেন?”

‘হ্যাঁ রাখছে। কিন্তু রিপোর্ট করার মতো কিছু নেই। শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল।

ধরে নাও, তোমরা ভাগ্যবান।’ হাসপাতালে অল্পের জন্য কীভাবে ওরা প্রাণে বেঁচেছে সেই ঘটনা লিওকে খুলে বলল স্যাম।

‘তারপরও তুমি মনে করো আমরা এখানে নিরাপদ?’ স্যামের কথা শেষ হওয়ার পর বলল লিও।

হুম। বিপদের দিকে নজর রাখলে তোমাদের কোনো সমস্যা হবে না। একটা বিচ্ছিন্ন জায়গায় আছে তোমরা। সবসময় সজাগ থাকা ভাল।

‘উগ্র লোকদের হাতে মুণ্ড খোয়ানোর আশংকার চেয়ে এখন দেখছে এই সি-সিকনেস অনেক ভাল। অবশ্য এখন আর আগের মতো ভুগছি না।

‘পানিতে ডাইভ দিচ্ছ তাই সি-সিকনেস কেটে যাচ্ছে। আরও ডাইভ দাও। দেখবে একদম ফুরফুরে লাগবে।’

‘ঠিক আছে, দেব। তুমি একটা বিশাল জাহাজের ব্যবস্থা করো।

বন্ধুর আবদার শুনে হেসে ফেলল স্যাম। একটু আগে সেলমার সাথে কথা হয়েছে। আশা করছি, বড় জাহাজের ব্যাপারে খবর পাব। খবর পেয়েই জানাব তোমাকে।

কথা শেষ করে স্যাম ফোনটা রেখেছে একমুহূর্ত না যেতেই রিং হলো আবার।

‘সেলমা! এত তাড়াতাড়ি!

‘আমরা এক বান্ধবী আছে। আধা জাপানিজ। ও আমাদের হয়ে মহিলার সাথে যোগাযোগ করেছিল। বলল, কোনো সমস্যা নেই। মহিলা বেশ ভাল ইংরেজি বলতে পারে। তোমরা জাপানে গেলেই তার সাথে দেখা করতে পারবে। মহিলার কোনো আপত্তি নেই।

‘আমরা টোকিও-তে যাব। ফোন করতে হবে তাকে?

“হ্যাঁ। তাকে বলেছি আমাদের পক্ষ থেকে ফোন করে জানানো হবে। তার নাম্বার দেব?

‘দাও।’

সেলমা নাম্বার দিল।

নাম্বারটা আবার বলে নিশ্চিত করল স্যাম। তারপর জাহাজ প্রসঙ্গ তুলল। ‘তুমি বড় কোনো রিসার্চ জাহাজের ব্যবস্থা করতে পেরেছ? এদিকে জাহাজ জাহাজ করে লিও আমাকে পাগল করে ফেলছে।’

হুম, আমি কাজ করছি। ২৬০ ফুটের জাহাজ পেয়েছি একটা। সবধরনের যন্ত্রপাতি আছে ওতে। এখন দর কষাকষি করছি এখন। আশা করছি, এক সপ্তাহের মধ্যে তোমাদের কাছে পৌঁছে যাবে। সেলমা একটা দাম বলল। এই দাম বলেছি পার্টিকে। চলবে?

‘এত দাম? ওদেরকে ঠিকভাবে বুঝিয়ে বলেছ তো, আমরা কিন্তু জাস্ট ভাড়া নিচ্ছি একেবারে কিনে নিচ্ছি না কিন্তু!’ মশকরা করল স্যাম।

ভালই মজা করতে পারো। আচ্ছা, এখন কি খুব ব্যস্ত তুমি?

স্যাম এই কণ্ঠ চেনে। সেলমা যখন বিশেষ কিছু জানতে পারে তখন ওর কণ্ঠস্বর এরকম হয়ে যায়। স্যামের সাথে শেয়ার করতে ওর যেন আর তখন তর সয় না।

‘না, ফ্রি আছি। বলল।

‘তোমার জাপানিজ কর্নেলের ইতিহাস আরও ঘেঁটে বুঝলাম কেন কেউ মিয়েজি কর্পোরেশন নিয়ে মুখ খুলতে চায় না। তুমি “ইউনিট ৭৩১”-এর নাম শুনেছ?”

না তো।

ইউনিট ৭৩১ হলো জাপানিজ আর্মির একটা দলের নাম যারা কয়েদি ও সাধারণ নাগরিকদের উপর বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট চালাত। কোনো চেতনানাশক ওষুধ না দিয়ে নিমর্ম গবেষণা চালাত তারা। কখনও জীবন্ত মানুষ পোত আবার কখনও বরফে জমাট বাধাতে। পর্যবেক্ষণ করত জীবন্ত মানুষ এভাবে মরে যেতে কত সময় লাগে। শরীরে বিষ কিংবা তরল রাসায়নিক পদার্থ ঢুকিয়েও পরীক্ষা চালিয়েছিল তারা। এমন কোনো খারাপ কাজ নেই তারা করেনি। ইউনিট ৭৩১ এর নেতৃত্বে ছিল জাপানিজ জেনারেল শিরিও ইষি।’

‘শিরিও ইষি। অদ্ভুত জাপানি নাম শুনে হাসল স্যাম।

‘ইউনিট ৭৩১ চীনে অবস্থান করেছিল প্রায় ১০ বছর। ১৫০ টা ভবন দখলে রেখেছিল তারা। যদিও বাইরে থেকে কিছু বোঝার উপায় ছিল না। পানি শোধনাগারের ছদ্মবেশ দেয়া হয়েছিল ভবনগুলোতে। বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্টের পাশাপাশি জীবাণু দিয়ে যুদ্ধ করার ব্যাপারে জড়িত ছিল ইউনিট ৭৩১। তারা জীবাণু ভর্তি বিশেষ বোম ফেলেছিল চীনা জনসাধারণের উপর। মারাত্বক প্লেগ ছড়িয়ে গিয়েছিল তখন। সোজা কথায়, জাপানিরা ইউনিট ৭৩১-কে নাৎসিদের মতো ব্যবহার করলেও বাইরের মুখোশটা ছিল মাদার তেরেসার মতো।’

‘এসব কেন আগে শুনিনি? তুমি যেসব যুদ্ধাপরাধের কথা বলছ এগুলো প্রায় ১০০ বছর আগে ঘটে গেছে। আমার জানা থাকার কথা ছিল এসব।

কাহিনিই তো এখানে। জাপানিরা হেরে যাওয়ার পর মিত্রবাহিনি ইউনিট ৭৩১-এ জড়িত থাকা বিজ্ঞানীদেরকে সাজা এড়িয়ে মুক্তি লাভের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। তার ফলে যুদ্ধ পরবর্তী জাপানে শক্তিশালী ধনী বনে গেল অনেক জঘন্য ব্যক্তিরা।’

এসবের কোনো প্রমাণ আছে?”

‘প্রমাণ বলতে কী বোঝো সেটার উপর নির্ভর করছে প্রমাণ আছে কি না। জাপানিজ সরকার বলছে, ইউনিট ৭৩১-এর ব্যাপারে তাদের কাছে কোনো নথি নেই।’

‘আজব।

‘সেটাই। জাপানিজ আইনে যুদ্ধাপরাধীদের জন্য শাস্তির বিধান আছে। কর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন ছবি ঘাটলে সেসবের প্রমাণও পাওয়া যাবে কিন্তু সরকার উদাসীন। ইউনিট ৭৩১-এর সাথে যেসব বাঘা বাঘা ওষুধ কোম্পানি জড়িত ছিল তাদের মালিকরা সব শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতা ও আইনজীবি। বুঝতেও পারছে, সরকার কেন এব্যাপারে উদাসীন।

মিত্রবাহিনি কোন আক্কেলে ওই শয়তানগুলোকে সাজা এড়িয়ে পার পেতে সাহায্য করল?

‘যুদ্ধের পর আমেরিকানরা চেয়েছিল এক্সপেরিমেন্টের যাবতীয় নথি ও ফমূলা যেন সোভিয়েতদের হাতে না যায়। তাই জাপানিদেরকে সাহায্য করে বছরের পর বছর ধরে জাপানি বিজ্ঞানীদের তৈরি সব রিসার্চের নথি বাগিয়ে নিয়েছে। সোভিয়েত ইউনিট ৭৩১-এ জড়িত সবাইকে ফাঁসি দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমেরিকা সেটা করতে দেয়নি। ১৯৮০ সালের দিকে হয়েছে এসব।

‘তোমার ধারণা সেই একই কাজ মিয়েজি কর্পোরেশনের সাথেও করা হয়েছে?”

‘সবকিছু এত গোপন করে রাখাতে তো সেটাই প্রমাণ হচ্ছে।

‘তুমি নিশ্চিত?

শতভাগ।

সেলমার সাথে কথা শেষ করে ফোন রেখে দিল স্যাম। এতক্ষণ যা যা শুনল সব জানাল রেমিকে। সবশুনে রেমি স্তম্ভিত।

‘আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। কিন্তু যেহেতু সেলমা বলেছে…’

‘আমি জানি। হয়তো এসব সত্যি। আমরা এটা নিয়ে আরও একটু রিসার্চ করতে পারি। অন্তত ইউনিট ৭৩১ নিয়ে রিসার্চ করা উচিত। সেলমা বলল, প্রায় ১০০ বছর পাওয়া হওয়ার পর এখন ইউনিট ৭৩১-এর ব্যাপারে অনেক তথ্য পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

মাথা নাড়ল রেমি। কুমাসাকা’র মেয়ের সাথে কথা বলা দরকার আমাদের। যত তাড়াতাড়ি বলা যায় তত ভাল।

‘ওকে। তুমি ফোন করবে? নাকি আমি করব?

‘আমি করব। তুমি কথা বললে সে ভয় পেতে পারে। আর আমি সেটা চাই না।’

‘তাহলে আমি কী করব?

‘টোকিও যাওয়ার ফ্লাইট বুক করো।

“ঠিক আছে, আগে ফ্লাইট শিডিউল দেখে নেই।

.

 ৩৫.

টোকিও, জাপান

সারাদিন ব্যয় করে গোয়াডালক্যানেল থেকে জাপানের নারিটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছুল ফারগো দম্পতি। সোজা পথে প্লেন এলে এত সময় লাগতো না, কিন্তু প্লেনগুলোকে অস্ট্রেলিয়া হয়ে আসতে হয়, তাই পুরো দিন চলে যায় জাপান পৌঁছুতে।

এখানে আসার আগে রেমি কুমাসাকা’র মেয়ের সাথে ফোনে কথা বলে এসেছে। মহিলার সাথে কথা বলে মনে হয়েছে সে বেশ সাবলীল ও বন্ধুত্বপূর্ণ। তবে প্রতিটা জবাব দিয়েছে খুব সতর্কভাবে।

নারিটা বিমানবন্দর থেকে সাওয়ারা’র দূরতৃটা মূল শহর টোকিও চেয়ে কম। ম্যাপের উপর চোখ বোলাল স্যাম। ট্রেনলাইন দেখা যাচ্ছে। সেলমা অবশ্য আগেই ইমেইল করে সব তথ্য দিয়ে রেখেছে, কীভাবে, কোথায় যেতে হবে। লাইনে দাঁড়ানো ট্যাক্সিগুলোর দিকে এগোল স্যাম।

‘ট্রেনে যাব না?’ রেমি প্রশ্ন করল। নাকি টিকেট কাটার সিস্টেম জানো না বলে ভয় পাচ্ছো?”

‘আমাদের হাতে সময় সীমিত। স্যাম জবাব দিল। এখন ট্রেনের খোঁজ খবর নিতে গেলে অনেক সময় চলে যাবে। তাছাড়া কোনটা লোকাল ট্রেন আর কোনটা এক্সপ্রেস ট্রেন সেটাও আমাদের জানা নেই। তাই ঝুঁকি না নিয়ে ট্যাক্সিতে যাওয়াই ভাল। এখান থেকে মাত্র ১৫ কি.মি, যেতে হবে। কঠিন কিছু নয়।’

লাইনে দাঁড়ানো প্রথম ট্যাক্সিটা এগিয়ে এলো। যাত্রী ঢোকার দরজা খুলে গেল স্বয়ংক্রিয়ভাবে। ট্যাক্সির ড্রাইভার নেমে এসে ওদের লাগেজ তুলতে সাহায্য করে আবার ডাইভিং সিটে গিয়ে বসল। একটা কাগজে পরিষ্কার করে ঠিকানা লেখা আছে। রেমি সেটা ডাইভারকে দেখাতেই ঘনঘন মাথা নাড়ল ড্রাইভার। জানাল ঠিকানাটা তার চেনা আছে। অল্প-স্বল্প ইংরেজি বলতে পারে ড্রাইভার। হলিউড সিনেমা আর ইউটিউব দেখে শিখেছে। রেমি বলল, ওদের তাড়া আছে। ড্রাইভার যেন একটু দ্রুত গাড়ি চালায়। জবাবে জাপানিজ বলল, ড্যাশবোর্ডে জিপিএস লাগানো আছে। যে রাস্তা দিয়ে যেতে সবচেয়ে কম সময় লাগবে সেই রাস্তা দিয়েই ওদেরকে নিয়ে যাবে সে।

যতক্ষণ লাগবে ভেবেছিল ওরা, ট্যাক্সি করে ঠিকানায় পৌঁছুতে তারেচে একটু বেশি সময় লাগল। প্রায় ৪৫ মিনিট লেগেছে। কাঠের তৈরি এক আবাসিক বাড়ির সামনে এসে নামল ফারগো দম্পতি। স্যাম ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দিতে চাইলে ড্রাইভার জানাল, সে তাদেরকে নিয়ে ফিরবে। যতক্ষণ সময় লাগবে তার অপেক্ষা করতে আপত্তি নেই। খুশি হয়ে স্যাম ওকে বখশিশ দিয়ে রেমিকে নিয়ে বাড়ির দরজার দিকে এগোল।

দরজায় নক করার আগেই খুলে গেল দরজা। কালো সোয়েটার পরিহিত এক মহিলা দরজা খুলে ওদের দিকে তাকিয়ে হাসি উপহার দিলেন। রেমিও পাল্টা হাসি দিল। স্যাম রেমি’র একটু পেছন পেছন এগোচ্ছে। আগেই কথা হয়েছে, এখানার যাবতীয় বিষয় রেমি’র নেতৃত্বে হবে।

‘আপনি কর্নেল কুমাসাকা’র মেয়ে?’ রেমি প্রশ্ন করল।

মহিলা মাথা নাড়লেন। হ্যাঁ। তবে আমাকে চিয়োকো বলে ডাকলেই খুশি হব। আপনি রেমি? আপনার কণ্ঠটা ফোনে শুনেছি বোধহয়। পরিচিত লাগছে।’

‘জি, আমি রেমি। আর ইনি আমার স্বামী স্যাম।

‘আপনাকে দেখে ভাল লাগল। স্যাম একটু মাথা নুইয়ে বলল।

‘ধন্যবাদ। ভেতরে আসুন। চিয়োকো ওদেরকে নিয়ে ভেতরে গেলেন।

রেমি খেয়াল করল মহিলার বাঁ পাশের গালে বেশ কিছু কাটাছেঁড়ার দাগ আছে। দাগগুলো দেখতে বেশ পুরোনো। চিয়োকোর গালে পুরো মেকআপ করা। তারপরও দাগগুলো সম্পূর্ণভাবে ঢাকা পড়েনি।

‘আমাদের সাথে দেখা করতে রাজি হওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। ভেতরে ঢোকার পর বলল রেমি।

‘ধন্যবাদ দেয়ার কিছু নেই। আপনারা আসাতে আমিও খুশি হয়েছি। কিন্তু আমার বাবার ব্যাপারে আপনাদেরকে তথ্য দিয়ে কতদূর সাহায্য করতে পারব তাতে সন্দেহ আছে। বাবার সাথে আমার ওঠাবসা হয়নি বললেই চলে। এদিকে আসুন… ভেতরের রুমে গিয়ে কথা বলি।

ফারগো দম্পতি এগোল চিয়োকো’র সাথে। রেমি লক্ষ্য করল মহিলার হাতেও গালের মত কিছু ক্ষত চিহ্ন আছে।

‘আপনারা বসুন। আমি চা করেছি। নিয়ে আসি।’ বলল চিয়োকো।

স্যাম ও রেমি বসে রইল চুপচাপ। ওদের মাথার উপরে একটা ফ্যান বনবন করে ঘুরছে। একটু পর রুমে ফিরে এলেন মহিলা। হাতে একটা ট্রে। তাতে তিনটা কাপ, একটা পট আর এক প্লেট মিষ্টি।

সবাইকে চা পরিবেশন করার পর চিয়োকো রুমের একটু ছায়া ঢাকা অংশে গিয়ে বসলেন।

‘আপনার অ্যাপায়নের জন্য ধন্যবাদ।’ কথা শুরু করল রেমি।

‘এসব তো কিছুই নয়। আপনার অনেক দূর থেকে এসেছেন।

‘তা ঠিক।’ রেমি একটু থামল। আপনি বেশ ভাল ইংরেজি বলতে পারেন।

‘আমি একটা আন্তর্জাতিক কোম্পানীতে সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেছি। আমেরিকার সাথে লেনদেন করত কোম্পানীটা। তাই ইংরেজি শিখতে হয়েছিল। তাছাড়া যে স্কুলে পড়ালেখা করেছিলাম সেখানেও ইংরেজি শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়েছিল তখন। যুদ্ধের পর ইংরেজি জানা লোকদের খুব কদর ছিল। তবে অনেক বছর হলো আর চর্চা করি না। আমার ইংরেজি হয়তো এখন বেশ দূর্বল হয়ে গেছে। কোনো ভুল-ভ্রান্তি করে ফেললে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে। দেখবেন। আলতো করে তার স্টাইল করা ধূসর চুলে হাত চালালেন চিয়োকো। আপনারা আমার বাবা’র উপর গবেষণা করছেন। আমি তো ভয় পাচ্ছি, না জানি এতদূরে এসেও প্রয়োজনীয় তথ্য না পেয়ে আপনাদেরকে খালি হাতে ফিরে যেতে হয়।

‘আসলে আমরা তার জীবনের গল্পের বিভিন্ন টুকরোগুলোকে একত্রিত করতে চাচ্ছি। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যাণ্ডে যুদ্ধের সময় তিনি জাপানি সেনাবাহিনির একজন উচ্চপদস্থ অফিসার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। যুদ্ধ চলাকালীন সময় তাকে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। জানা যায়, কারাভোগ করা অবস্থায় ক্যাম্পেই মৃত্যু হয়েছিল তার। কিন্তু কর্নেল কুমাসাকা’র ব্যাপারে বিস্তারিত কিছুই জানা যায়নি।

‘আসলে আমি নিজেও এরচেয়ে বেশি কিছু জানি না। আমার জন্ম হয় ১৯৩৯ সালে। ততদিনে দিনে যুদ্ধে চলে গেছেন। তার সাথে আমার তেমন কোনো স্মৃতি জড়িত নেই।’

কিন্তু বড় হওয়ার পর নিশ্চয়ই বাবার সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন?

চিয়োকো মাথা নাড়লেন। যুদ্ধের পর সব বিশৃঙ্খল অবস্থায় ছিল। জাপান তখন নিজেকে ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন করে গড়তে ব্যস্ত। কেউ অতীত নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ পায়নি। অবশ্য যখন কলেজে পড়তাম তখন আমি একটু খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কাজ হয়নি। কোনো রেকর্ড পাইনি বাবার নামে।

‘তার কোনো ভাই-বোন আছে? কিংবা ঘনিষ্ঠ কেউ?

হা। একটা বোন ছিল। শক্ত করে ঢোঁক গিললেন চিয়োকো। আমাকে ফুপি-ই বড় করেছিলেন। ২০ বছর আগে তিনি মারা যান। বাবার ব্যাপারে ফুপি শুধু এতটুকু বলেছিলেন, বাবা অনেক সাহসী ও সম্মানী ব্যক্তি ছিল। অনেক দেশপ্রেম ছিল তার। দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তিনি শহীদ হয়েছেন। তাছাড়া স্বামী হিসেবেও নাকি আমার মায়ের সাথে তার সম্পর্ক ভাল ছিল। আপনাদের বলা হয়নি, যুদ্ধের সময় আমার মা-ও মারা যান।

‘দুঃখিত। নরম স্বরে বলল রেমি।

‘এসব নিয়ে কথা বলতে আমার এখনও কষ্ট হয়। অথচ কতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে। আমার তখন বয়স মাত্র ৬ বছর। টোকিও-তে প্রতিনিয়ত বোম পড়ছে। কিন্তু একদিন শুরু হলো চূড়ান্ত তাণ্ডব। আবাসিক এলাকায় বোম ফেলে সব চুরমার করে দেয়া হলো।’ চিয়োকো একটু থেমে শ্বাস নিলেন। ‘মায়ের শরীরে আগুন লেগে গিয়েছিল। আমার কপাল ভাল ছিল প্রাণে বেঁচে গেছি। কিন্তু আমার মা রক্ষা পায়নি।

‘খুব ভয়াবহ ঘটনা।

‘শুধু ভাষায় সেই ভয়াবহতা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মাইলের পর মাইল সব ছাই হয়ে গিয়েছিল তখন। টোকিও-র ১০ লাখ লোক গৃহহীন হয়ে পড়েছিল, মারা পড়েছিল প্রায় ১ লাখ। কথা বলতে বলতে চিয়োকো যখন রেমি’র দিকে তাকাল তখন তার চোখ ভেজা। টাটকা দুঃখ এখনও দেখা যাচ্ছে চোখে। নিজের চোখে নরক দেখেছি আমি। সে দৃশ্য কোনোদিনও ভোলা সম্ভব নয়। যে একবার এরকম পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাবে তার পক্ষে এসবের ঘা ভুলে যাওয়া কঠিন।

‘আমি দুঃখিত চিয়োকো। ফিসফিস সান্ত্বনা দিল রেমি।

‘ওরকম যুদ্ধ আর কখনও হয়নি। ভাগ্য ভাল ছিল, তাই বেঁচে গেছি। যুদ্ধের পর এক আত্মীয়র বাসায় বড় হতে শুরু করলাম। পৃথিবীতে এক নব্য শক্তিধর দেশ হিসেবে ধীরে ধীরে জাপান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করল।

একটু সময় চুপ করে রইল রেমি। তারপর বলল, “আচ্ছা, তার কোনো ছবি বা চিঠি আছে?’

যা ছিল সব আগুনে পুড়ে গেছে। আমার ফুপির কাছে পুরানো কিছু ছবি আছে অবশ্য। ওগুলো আপনাদের কতটুকু কাজে আসবে বলতে পারছি না। ওসব বাবার তরুণ বয়সের ছবি। চিয়োকো একটু ইতস্তস্ত করলেন। ‘দেখবেন?

‘ছবিগুলো দেখতে পারলে দারুণ হয়। রেমি জবাব দিল। চিয়োকো ছবি আনতে রুম থেকে বের হলেন। কয়েক মিনিট পর ফিরলেন তিনি। হাতে একটা কার্ডবক্স। স্যাম উঠে দাঁড়িয়ে তার হাত থেকে কার্ডবক্সটা নিতে সাহায্য করল।

‘আমার আর গায়ের জোর নেই আগের মতো। সময় যেন সব শক্তি চুরি করে নিয়েছে। সময়ের সাথে সাথে আমাদের আয়ু, আশা-ভরসা, তারুণ্য সব চলে যায়।

স্যাম ও রেমি ছোট ছোট ধাতব ফ্রেমের ছবিগুলো দেখতে শুরু করল।

‘এই ছবিগুলো সবচেয়ে ভাল। এটাতে দেখতে পাবেন আমার বাবার ছেলেবেলার ছবি। তারপর ভার্সিটি থেকে পাশ করার পরের ছবি। একটা মাত্র ছবি আছে যেখানে বাবা-মা একসাথে উপস্থিত।

ছবিটা দেখল ওরা। শক্ত-সামর্থ্য এক তরুণ তার সুন্দরী বধূকে নিয়ে হাস্যজ্জ্বল মুখে ছবি উঠেছে। ছবিটা সাদাকালো কিন্তু তারুণ্যে উদ্ভাসিত।’ রেমি ফ্রেমটা ধরে দম বন্ধ করে বলল, আপনার মা তো দেখতে ভয়ঙ্কর সুন্দরী ছিলেন!

‘ঠিক বলেছেন। আমার ফুপিও সবসময় তার রূপের প্রশংসা করতেন। চিয়োকা অন্য একটা ফ্রেম কাঁপা হাতে তুলে নিয়ে তাকালেন রেমি’র দিকে। ‘এই ছবিটা আমার খুব প্রিয়। ফুপি তুলেছিল এটা। আমেরিকার সাথে যুদ্ধের আগে আরশায়ামা-তে তোলা। ওখানকার গাছগুলোতে সুন্দর সুন্দর ফুল ফোটে। সে-বছর একটু দেরিতে ফুটেছিল। একদম কনকনে শীতে আরকী। তারপর একটা সময় আছে যখন গাছ থেকে সব ফুল ঝরে যায়। তখন মনে হয় যেন গোলাপী রঙের তুষার পড়ছে।

ফারগো দম্পতি ছবিটা ভাল করে লক্ষ্য করল। কুমাসাকা’র পরনে আর্মির পোশাক। ছবিতে একটা ক্লাসিক ভাব আছে। ছবিতে কুমাসাকা’র বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর। স্যাম নিশ্চিত হলো যুদ্ধের আগেই কুমাসাকা কর্নেল পদে ছিলেন। জাপানের সাথে আমেরিকার ২য় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৯৩৭ সালে।

‘আপনার বাবার চাকরি জীবন সম্পর্কে কিছু জানেন? ইউনিট ৭৩১-এ তিনি ছিলেন কিনা কিংবা মিয়েজি কর্পোরেশনের সাথে জড়িত ছিলেন কিনা? রেমি জানতে চাইল।

‘আমি এসবের নাম এরআগে কখনও শুনিনি। একটু খুলে বললে ভাল হয়।

‘এগুলো আর্মি গ্রুপ। মেডিক্যাল রিসার্চের সাথে জড়িত ছিল।’

‘মেডিক্যাল? কিন্তু আমার বাবা তো ডাক্তার ছিলেন না।

তার মাইক্রোবায়োলজি-তে ডিগ্রি ছিল।’

‘ছিল। কিন্তু অফিসার হিসেবে চাকুরি জীবন শুরু করেছিলেন। অর্জিত ডিগ্রিকে বাস্তব জীবনে কোনে কাজে লাগাননি। আমার ফুপির মুখে শুনেছি, তখন অনেক জাপানিরা নিজেদের পড়াশোনাকে পেশাগত কাজে না লাগিয়ে আর্মিতে যোগ দিয়েছিল।

‘আর্মিতে কর্নেল কুমাসাকা’র কাজ কী ছিল? জানেন?

ফুপি বলতেন, তিনি যোগাযোগ সেকশনে ছিলেন। সত্যি বলতে, এর বাইরে আমি আর কিছু জানি না।’

স্যাম বক্সে চোখ বোলাচ্ছিল। আচ্ছা, এটা কী? একটা চামড়ার নোটবুক দেখিয়ে প্রশ্ন করল ও। নোটবুকটা অবস্থা বেশ খারাপ। আর একটু হলেই চোখ এড়িয়ে যাচ্ছিল।

‘ওহ। এটার কথাই বলতে চাচ্ছিলাম এখন। জেলে থাকা অবস্থায় আমার বাবা জার্নাল লিখতেন। আমি বেশ কয়েকবার পড়েছি। তেমন কিছু পাইনি। কারাভোগ সম্পর্কিত কয়েকটা কবিতা আছে, এইতো। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তার সাথে থাকা এক কয়েদি এটা আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। তার মুখে শুনেছি, জেলখানায় ডায়েরি রাখার অনুমতি ছিল তখন তবে সেটা নিয়মিত তদারকি করা হতো উল্টাপাল্টা কিছু লেখা হচ্ছে কিনা। তাই এই নোটবুকে তথ্য পাওয়ার মতো তেমন কিছু নেই।’

‘আমি কি নোটবুকটা দেখতে পারি? রেমি অনুমতি চাইল।

‘অবশ্যই। তবে পুরোটা কিন্তু কানজি ভাষায় লেখা।

চিয়োকো নোটবুকটা রেমির হাতে দিলেন। পৃষ্ঠাগুলো হলুদ হয়ে গেছে। বিজাতীয় অক্ষর লেখা সব পৃষ্ঠায়। রেমি বলল, আমরা কি এটার একটা কপি করতে পারি? নিশ্চয়তা দিচ্ছি, এটাকে অক্ষত অবস্থায় ফেরত দেব।

‘এখানে আসলে কিছু নেই। তারপরও যখন কপি করতে চাচ্ছেন, করুন। আমার আপত্তি নেই।’

আর আধঘণ্টা আলাপ করল ওরা! চিয়োকো যথেষ্ট মিশুক মহিলা। কিন্তু তার কাছে তথ্য না থাকায় ফারগো দম্পতি নতুন কিছু জানতে পারল না। কথা শেষে বের হলো ওরা।

‘চিয়োকো, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ’ বলল রেমি। আপনি আপনার মূল্যবান সময় আমাদের দিয়েছেন এবং দুঃখের স্মৃতিগুলো শেয়ার করেছেন। আপনার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।

চিয়োকো তার পায়ের দিকে তাকিয়ে জবাব দিলেন, “আমারও ভাল লেগেছে। আমি দুঃখিত, আপনাদেরকে তেমন কোনো তথ্য দিয়ে উপকার করতে পারলাম না।’

‘আপনি যথেষ্ট করেছেন। আবারও ধন্যবাদ। আসি। ট্যাক্সি বাইরে অপেক্ষা করছিল ওদের জন্য। তাতে চড়ে বসল ফারগো দম্পতি। রেমি ড্রাইভারের দিকে ঝুঁকে বলল, এখানে কোনো স্ক্যান ফটোকপির দোকান আছে?

৩৬. ফারগো দম্পতি

৩৬.

তিন ঘণ্টা পর চিয়োকো’র কাছে নোটবুকটা ফেরত দিয়ে এলো ফারগো দম্পতি। নারিটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে ফিরতি ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করছে ওরা। এই ফাঁকে সেলমাকে নোটবুকের স্ক্যানকপি ইমেইল করে পাঠিয়ে দিয়েছে। বলেছে, যদ্রুত সম্ভব একজন অনুবাদক যোগাড় করে পুরো নোটবুক অনুবাদ করে দিতে।

রেমি’র মনে এখনও চিয়োকো’র কষ্টের কাহিনি ঘুরপাক খাচ্ছে। মন খারাপ করে ট্যাব চালাচ্ছে ও। স্যাম স্ত্রীর চেহারা দেখে বলল, “ঠিক আছে তো?

মনে হয়।

‘খুব চিন্তা করছ, তাই না?

‘হম। আসলে বোমা পড়ার গল্পটাকে মাথা থেকে বের করতে পারছি না। চিন্তা করে দেখো, বোমা হামলার ফলে অত অল্পবয়সে মাকে হারানো। তারপর হাতে-মুখে ক্ষত…’

‘ঠিকই বলেছ। দুঃখজনক। সেল রিসার্চ করে দেখেছে, চিয়োকো নাকি কখনও বিয়ে করেননি। এমনও হতে পারে এর পেছনে ওই ক্ষতগুলোর কোনো ভূমিকা আছে। ওরকম দাগ নিয়ে বেড়ে ওঠা খুব ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা।

‘আমারও তা-ই মনে হয়।’

রেমি একটু চেপে বসল স্যামের দিকে।

ইন্টারনেটে ইন্টারেস্টিং কিছু পেলে?’ স্যাম প্রশ্ন করল।

না, যা পাচ্ছি সবই ভয়াবহ কাহিনি। এক ইতিহাস বিশারদ দাবী করেছেন, যুদ্ধের সময় জাপানিরা প্রায় ৩ কোটি মানুষকে খুন করেছিল। কী নিষ্ঠুর!’

‘বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে। বলল স্যাম। ঘড়ি দেখল। আচ্ছা, জানালার কাছে বসলে হয়তো স্যাট ফোনের জন্য ক্লিয়ার নেটওয়ার্ক পাব? কী বলে?

‘দেখো পাও কিনা।

ব্যাগ থেকে ফোন বের করে এগোল স্যাম। আধমিনিট লাগল স্যাটেলাইটের সংযোগ পেতে। তারপর ডায়াল করল সেলমা’র নাম্বারে। চতুর্থবার রিং হওয়ার সময় ফোন রিসিভ হলো।

‘গুড মর্নিং!’ বলল স্যাম।

‘তোমাকেও গুড মর্নিং!’

‘একটা ফাইল ইমেইল করেছি। পেয়েছ?

হ্যাঁ, পেয়েছি এবং কাজ শুরু করে দিয়েছি ওটা নিয়ে।

‘অনুবাদক পেয়েছ?

ল্যাজলো সাহেব ঘুরঘুর করছিল এখানে। তাকে কাজটা ধরিয়ে দিয়েছি। কানজি ভাষা বলা ও লেখা দুটোতেই তার দক্ষতা আছে। অবশ্য এই তথ্য আমি আজই জানতে পারলাম। এই মানুষটা যে আরও কত কিছু জানে! কে বলতে পারে?

“আচ্ছা, বেশ ভাল কথা। ল্যাজলো কি নোটবুক থেকে পেয়েছে কিছু?

বলল, কাজ করছে। বেচারা বোধহয় কাজের অভাবে বোর হচ্ছিল। ফাইলটা প্রিন্ট করেই নিজের অফিসে ছুট দিয়েছে। সেলমা একটু থামল। খুশির খবর আছে। বড় জাহাজ যাচ্ছে তোমাদের জন্য।

চমৎকার! কতদিন লাগবে পৌঁছুতে?

চার দিন।’

‘লিওনিড খুব খুশি হবে এবার।

‘ভাল কথা, তোমার এই বন্ধু কি সবসময় মনমরা হয়ে থাকে নাকি?”

সত্যি বলতে, ওর রসবোধ অনেক ভাল। তবে সবসময় দেখা যায় না।

বিমানবন্দরের স্পিকার থেকে ফ্লাইট সম্পর্কিত তথ্য তিনটি ভিন্ন ভাষায় দেয়া ঘোষণা ভেসে এলো। দ্রুত কথা শেষ করে ফোন রাখল স্যাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে ফারগো দম্পতি প্লেনে চড়ে বসল।

মাঝ বিকেলে হনিয়ারায় এসে পৌঁছুল ওরা। ফ্লাইট প্রায় খালি-ই ছিল বলা যায়। দ্বীপে গণ্ডগোল শুরু হওয়ায় পর্যটকরা আর ঘুরতে আসার সাহস করেনি। হোটেলও জনমানব শূন্য। ওরা হোটেলে ফিরতেই ক্লার্ক আর ম্যানেজার ওদেরকে রিসিভ করল।

মিস্টার ও মিসেস ফারগো-কে আবারও আমাদের হোটেলে স্বাগতম। বলল ম্যানেজার।

ধন্যবাদ। এখানকার পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়েছে? স্যাম প্রশ্ন করল।

‘উন্নতি বলতে সব এখন চুপচাপ। নতুন করে আর কোনো হট্টগোল বাধেনি।

ভাল লক্ষণ। তাই না?’ বলল রেমি।

‘আশা করছি, পরিস্থিতি যেন বিগড়ে না যায়। এরকম শান্ত-শিষ্ট থাকলেই আমরা খুশি।’ ম্যানেজার বলল।

কথা শেষ করে রুমে চলে গেল ওরা। স্যাট ফোন চালু করে সেলমাকে আবার স্যাম ফোন করল।

‘আমরা গোয়াডালক্যানেলে চলে এসেছি। ওদিকে কী অবস্থা?

‘একদম ভাল সময়ে ফোন দিয়েছ। ল্যাজলো আমার কাছে আছে। কথা বলবে?

‘দাও।’

ল্যাজলো’র বিট্রিশ উচ্চারণ ভেসে এলো ওপাশ থেকে। মিস্টার স্যাম! পুরো পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছেন! কী অবস্থা?

‘আর অবস্থা! এখন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ব্যাঙের মতো লাফিয়ে বেড়াচ্ছি! আপনার অনুবাদের খবর বলুন।

‘অর্ধেক করেছি। বেশ গোলমেলে জিনিস, বুঝেছেন? যা সব কঠিন কাব্য আছে এখানে। দীর্ঘ সব প্যাসেজ। অনুবাদ করতে গিয়ে একটু ভুগতে হচ্ছে।

ইন্টারেস্টিং কিছু চোখে পড়েছে?

‘পড়েছে। কেন যেন মনে হচ্ছে কবি এখানে কবিতার আড়ালে অন্য কিছু বোঝাতে চেয়েছেন। কেমন যেন একটা প্যাটার্ন পাচ্ছি।’

‘প্যাটার্ন?’

আসলে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে আমি এব্যাপারে খুব সতর্ক আছি।’

‘তাহলে আপনি মনে করছেন কবিতাগুলোর ভেতরে কোনো কোড লুকোনো আছে?

হ্যাঁ, সন্দেহ করছি আরকী। কিন্তু আমার সন্দেহ ভুলও হতে পারে। পুরোটা অনুবাদ করে শেষ করি। তারপর বুঝতে পারব। আশা করছি আজ শেষরাতের দিকে পুরোটা অনুবাদ হয়ে যাবে।

‘জানাবেন।

অবশ্যই। আর আপনারা শুধু দুঃশ্চিন্তা না করে একটু দ্বীপের আলো বাতাসও উপভোগ করুন।

‘পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ। চেষ্টা করব।’

কথা শেষ হওয়ার পর স্যামের দিকে তাকাল রেমি। কী অবস্থা?

ল্যাজলো বেশ কোমর বেঁধে কাজে নেমে পড়েছে। নোটবুকে কবিতার আড়ালে কোড লেখা আছে বলে তার ধারণা। আবার ধারণাটা ভুলও হতে পারে।’

‘দেখা যাক কী হয়।’

হাসল স্যাম। আগেই হতাশ হয়ে পড়ো না। কাজটা খুব সহজ নয়। যদি সহজ হতো তাহলে যে-কাউকে দিয়েই অনুবাদ করিয়ে নেয়া যেত। এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় অনুবাদ করতে অনেক ঝক্কি আছে।’ স্যাম সময় দেখল। ‘চলো একটু ঘুরতে বের হই।

মতলব কী তোমার?

‘আরেকবার রুবো’র সাথে দেখা করতে চাচ্ছিলাম। দেখি তার কাছ থেকে আবার ওসব কাহিনি শুনতে চাইব। দেখব এবারও সে একই কাহিনি বলে কিনা। এমনও হতে পারে, এবার তার কাছ থেকে আমরা নতুন কিছু জানতে পারব।’

***

গাড়ি নিয়ে রুবো’র বাড়ির সামনে এসে দেখল একটা পুলিশ কার আর একটা অ্যাম্বুলেন্স রাস্তা ব্লক করে দাঁড়িয়ে আছে। স্যাম ও রেমি দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গেল। তাকাল একে অপরের দিকে। গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গেল পুলিশ কারের দিকে। একজন পুলিশ অফিসার কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে সানগ্লাস।

কী হয়েছে? রুবো ঠিক আছেন তো?’ সামনে এগিয়ে বলল রেমি।

‘আমরা রুবো’র সাথে দেখা করতে এসেছি। কী হয়েছে, অফিসার?” স্যাম জানতে চাইল।

‘দূর্ঘটনা হয়েছে। মনে হচ্ছে, বেচারা পা পিছলে পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছে মাথায়।

দু’জন মেডিক্যাল কর্মী বাড়ির ভেতরে ঢুকে রুবো’র পলকা দেহকে সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে বাইরে আনল। সবাই বুঝল, যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন আর কিছু করার নেই। স্যাম ও রেমির দিকে তাকাল অফিসার। এখানে কী আর কেউ থাকতো?’

না। উনি বয়স্ক মানুষ, একাই থাকতেন। আশা করি, খুব বেশি কষ্ট পেয়ে মারা যাননি।’ রেমি বলল।

‘নিশ্চিত করে এখন কিছুই বলা যাচ্ছে না। তবে মেডিক্যালের লোকজন প্রাথমিক চেকআপ সেরে জানিয়েছে, কষ্ট পায়নি।

ধীরে ধীরে ভাড়া করা পাথফাইণ্ডারের দিকে এগোল ফারগো দম্পতি। স্যাম ড্রাইভিং সিটে বসে ইঞ্জিন চালু করতে করতে বলল, প্রায় ১০০ বছর সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার পর রুবো হঠাৎ করে মারা গেল। এতগুলো বছর তার কিছুই হলো না। অথচ আমরা জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করতেই… সব শেষ! এটা কী স্রেফ দূর্ঘটনা নাকি সন্দেহজনক কিছু আছে এর পেছনে?

‘আমাদেরকে ধাক্কা মেরে নদী ফেলে দেয়ার পর গুলি করে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। মনে আছে? আশা করি, উত্তরটা পেয়েছ।

শুকনো হাসি দিল স্যাম। হুম, পেয়েছি।

.

 ৩৭.

পরদিন সকালে সেলমা স্যামকে ফোন করল। রেমি ও স্যাম তখন হোটেলের বারান্দায় বসে কফি খাচ্ছে।

‘হ্যালো, সেলমা! ভাল খবর দাও, প্লিজ। মন খারাপ।

‘কেন? কী হয়েছে?

রুবো’র মারা যাওয়ার ঘটনা বলল স্যাম।

‘শুনে খারাপ লাগছে। অবশ্য তার অনেক বয়সও হয়েছিল। তোমরা দু’জন ভাল আছো তো?’ শান্ত স্বরে সেলমা বলল।

হুম, আছি। বলল, কেন ফোন করেছ?

‘আমার পাশে ল্যাজলো বসে আছেন। কথা বলবে।

“ঠিক আছে, দাও।

ল্যাজলো ফোন ধরেই উৎসাহী কণ্ঠে বলতে শুরু করল। হ্যাল্লো! স্যাম ব্রাদার! জাপানির নোটবুক থেকে তো জব্বর জিনিস জানতে পেরেছি!

‘তাই?”

‘কবিতাগুলো বেশ কাঁচা হাতে লেখা হলেও কোডগুলো জটিল ছিল, বুঝলেন?’

‘কোড?

“ইয়েস, ব্রাদার! আমি প্রোগ্রামের সাহায্যে কোডটা ভেঙেছি। কিন্তু তারপরও পুরোটার অর্থ ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।’

‘কোড থেকে কী পেয়েছেন, সেটা বলে ফেলুন।

মুখে বলে ঠিক বোঝানো যাবে না। আপনাকে সব ইমেইল করে দিয়েছি। চেক করে জানাবেন আপনি কিছু বুঝতে পারলেন কিনা। এদিকে আমি আরও মাথা ঘামাতে থাকি। তবে মাথাকে বোধহয় এখন বিশ্রাম দেয়াই ভাল। হয়তো নতুন করে কিছু বের করা যাবে না।

“আচ্ছা, ইমেইল দেখব। এখন মুখেই সংক্ষেপে বলুন, শুনি।

‘এখানে একটা গ্রাম, ঝরণাধারাসহ বেশ কিছু জিনিসের কথা বলা আছে। মনে হচ্ছে, কোনো দিক নির্দেশনা টাইপের কিছু আরকী। তবে দ্রাঘিমাংশ আর অক্ষাংশ দেয়া থাকলে সুবিধে হতো।’

‘তা কী করে সম্ভব? কর্নেল যখন নোটবুক লিখেছেন তখন তার কাছে কোনো জিপিএস ছিল না। তাই নিখুঁত করে কিছু লিখেও যেতে পারেননি।

‘এটা অবশ্য ঠিক বলেছেন। কর্নেল সাহেব কিন্তু মনে মনে ঠিকই চেয়েছে কেউ যাতে তার কোডটা ভাঙতে পারে। কোড যদি ভাঙা সম্ভব না হয় তাহলে লেখার কী অর্থ থাকে বলুন? তবে হ্যাঁ, আমি তো প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে কোড ভেঙেছি। তখনকার সময়ে এরকম প্রযুক্তি ছিল না। কর্নেল ব্যাটার বুদ্ধি আছে বলতে হবে। তবে আমার সাথে পারেনি, বুঝলেন?

‘জি, ল্যাজলো, আপনার মতো মেধাবী ব্যক্তিকে টিমে পেয়ে আমরা গর্বিত।

‘এখন সেলমা’র সাথে কথা বলুন। দেখুন সে কী বলে…’

‘অসংখ্য ধন্যবাদ, ল্যাজলো। দারুণ কাজ করেছেন।’

‘আশা করি, আমার দেয়া তথ্যগুলো আপনাদের ওখানে কাজে আসবে। সেলমা অবশ্য মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। ওকে বারবার জিজ্ঞাস করলাম, কাহিনি কী? কিছুই বলছে না।’

‘আসলে আমরা একটা ডুবে যাওয়া শহর খুঁজে পেয়েছি, সমুদ্রের তলায়। মনে হচ্ছে, ওখানে গুপ্তধন ছিল। কিন্তু ধারণা করা হচ্ছে, জাপানিরা দ্বীপ থেকে চলে যাওয়ার সময় গুপ্তধনগুলো ওখান থেকে সরিয়ে অন্য কোথাও লুকিয়ে রেখে গেছে। আর আপনি সেই গুপ্তধন খোঁজার ব্যাপারেই আমাদেরকে সাহায্য করছেন।’ রেমি’র দিকে তাকিয়ে হাসল ল্যাজলো। আচ্ছা, ল্যাজলো, এখন কি আপনি ওখানে কোনো কাজে ব্যস্ত আছেন?’

‘আমেরিকার কোন উপন্যাস সবচেয়ে সাহিত্যমান সম্পন্ন সেটা নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখতে বসেছিলাম তারপর হঠাৎ খেয়াল হলো… আরে! আমি তো ব্রিটিশ! আমেরিকানদের সাহিত্য দিয়ে আমার কাজ কী?! তাই সাহিত্য ছেড়ে টিভি দেখতে শুরু করেছি।

‘তাহলে এক কাজ করুন, ফ্লাইট ধরে চলে আসুন সলোমন আইল্যাণ্ড। আমাদের সাথে গুপ্তধন খুঁজবেন।’

স্যামের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল রেমি। ও খুব ভাল করেই জানে ওপাশ থেকে কী জবাব আসবে। আমি পরের ফ্লাইট ধরেই আসছি!”

তাহলে আপনার এখানে আসতে আসতে দু’দিন লেগে যাবে।

‘আমাকে ছেড়ে গুপ্তধন খুঁজতে নামবেন না কিন্তু!

“ঠিক আছে। কিন্তু এখানে আসার আগে সেলমার কাছ থেকে কুমীর আর জায়ান্ট হতে বাঁচার জন্য স্প্রে নিয়ে আসবেন। সাথে বুকে বুলেট প্রুফ ভেস্ট পরতে ভুলবেন না। এখানে দাঙ্গা চলছে কিনা।

কী বললেন?

‘শুনতে পাননি? তাহলে বাদ দিন। রেডি হয়ে রওনা হোন। এখানে ঠিক কয়টার দিকে পৌঁছুবেন আমাদেরকে আগেভাগে জানিয়ে দেবেন। আমরা আপনাকে বরণ করে নেব!’

‘আচ্ছা, জানাব।’

কথা শেষ হওয়ার পর রেমি মুখ খুলল। এখানে কি ল্যাজলোকে টেনে আনার খুব দরকার ছিল?

‘উনি ওখানে বেকার বসে আছেন। তাছাড়া নোটবুকের কোডভাঙার কাজটাও করে দিচ্ছেন খুশিমনে। সমস্যা কী?’ স্যাম রেমিকে কোডভাঙার বিষয়টা খুলে বলল।

‘তাহলে আমাদের সন্দেহ-ই সত্যি? কুমাসাকা এখানে গুপ্তধন লুকিয়ে রেখেছিল যাতে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর কোনো একসময় এখানে এসে সেটাকে নিজের দখলে নিতে পারে।

হুম।’

কিন্তু তার পরিকল্পনা বানচাল হয়ে গেছে। কিন্তু এই পর্যায়ে এসে ল্যাজলো কেন ডাকলে? আমরা তো প্রায় গুপ্তধনের কাছে চলেই গিয়েছি বলা যায়।

‘গুপ্তধন উদ্ধার অভিযানে যোগ দিলে তার মনটা ফ্রেশ হবে। উদ্দীপনা বাড়বে। তাই ডাকলাম।

‘আমি এসব কিছু জানি না। এখানকার বিদ্রোহীরা যাকে ইচ্ছে হচ্ছে মেরে ফেলছে। এরমধ্যে…’

‘সমস্যা কী? পরিস্থিতি বেশি খারাপ হলে একটা ফ্লাইট ধরে চলে যাবে। কিংবা জাহাজে চড়ে বসবে।

“ঠিক আছে, দেখা যাবে। আচ্ছা, আমরা কি আজকে জাহাজে যাচ্ছি?

‘যাওয়াটাই ভাল হবে। বেচারা লিও কী করছে কে জানে।

বারান্দা থেকে রুমে ফিরে ল্যাজলোর পাঠানো ইমেইল দেখল রেমি। মাথা নেড়ে বলল, একবার শুধু ঠিকঠাকভাবে দিকের হদিসটা বের করতে পারি, শুধু একবার। তাহলেই কাজ শেষ!

‘হুম। কিন্তু একটু খাটুনি করে গুপ্তধন খুঁজে বের না করলে আসলে মজা থাকে না।

হয়তো। কিন্তু অনেক তো হলো। আর কত? আর এই ইমেইলে যা দেখছি, কর্নেল সাহেব তো ঠিক করে লিখেও রাখেনি ঠিক কোন গ্রাম থেকে দিক ধরে এগোতে হবে।

ল্যাজলো হয়তো কিছু মিস করে গেছে। সমস্যা নেই, সে আরও একবার কোডের উপর চোখ বুলিয়ে চেক করে নেবে। তবে আমাদের একটা সূত্র আছে। কোডে বলা আছে, ঝরণাধারার পাশের এক গুহা…’

‘গুহাটা এক না হয়ে অনেকগুলোও হতে পারে। কবিতায় ছন্দ মেলানোর জন্য কবিরা কত কী-ই তো লেখে।

‘তা ঠিক। কিন্তু অনুসরণ করে এগোনোর মতো কিছু তো হাতে আছে?

হুম। ঘড়ি দেখল রেমি। পাহাড়ে অভিযানে বের হওয়ার জন্য এই দ্বীপে প্রয়োজনীয় গিয়ার পাওয়া যাবে বলে মনে হয়?

‘সাধারণ পর্যায়েরগুলো পাওয়া যেতে পারে। আমি সেলমাকে একটা লিস্ট পাঠিয়ে দেব। ল্যাজলো যখন আসবে। লিস্টের সব জিনিস সাথে নিয়ে আসবে। ব্যাস, হয়ে গেল।

***

সমুদ্রের দিকে যাওয়ার পথে আজ পুলিশের গাড়ি চোখে পড়ল মাত্র একটা। সাগরের পাড়ে কোনো গাড়ির টায়ারের দাগও নেই। আগের যে দাগটা ছিল সেটা পানিতে ধুয়ে মুছে গেছে। এদিকে নিয়মিত বৃষ্টি হয়। ওরা পৌঁছুনোর ৫ মিনিট পর ডেস ছোট নৌকা নিয়ে হাজির হয়ে গেল। ডারউইন-এর দিকে যেতে যেতে এদিককার হালচাল জানাল ওদের।

জাহাজে ওঠার পর ওদেরকে সরাসরি ব্রিজে নিয়ে গেল ডেস। ওখানে লিও মনিটরের সামনে বসে ডাইভারদের কাজ দেখছে। স্যাম ও রেমি রুমে ঢুকতেই চোখ তুলে তাকাল।

‘গুড মর্নিং! লিও’র কাছে গিয়ে বলল স্যাম।

মর্নিং? এখন তো বিকেল! লিও আপত্তি করল।

‘আছি তো সবাই পানির উপরে। সকাল আর বিকেল গুলিয়ে ফেললে দোষ কী?’ হেসে বলল রেমি। এখানকার কাজের কী অবস্থা?

‘চলছে। এই হারে চলতে থাকলে কয়েক বছর লাগবে। লিও জবাব দিল।

‘তোমার জন্য একটা ভাল খবর আছে।’ বলল স্যাম। বড় জাহাজ আসছে। খুব শীঘ্রই চলে আসবে।’ সেলমা’র পাঠানো রিসার্চশিপের ব্যাপারে স্যাম লিও-কে সব খুলে বলল। জাহাজের কথা শুনে অবশেষে হাসি ফুটল রাশিয়ানের ঠোঁটে।

‘জাহাজটা এক্ষুণি এলে ভাল হতো।’ বলল লিও।

জাহাজ আসতে থাকুক। এই ফাঁকে তোমাকে অন্য একটা কাজে লেগে পড়তে হবে’ স্যাম কোড ও ল্যাজলো’র কথা জানাল লিওকে। আমরা চাই, তুমি জাহাজ থেকে নেমে আমাদের সাথে গুপ্তধন খোঁজায় যোগ দাও। রাজা লক-এর গুপ্তধন খুঁজতে অভিযানে নামব। তুমি সাথে থাকলে দলটা পূর্ণতা পাবে।

‘শুকনো জায়গায় নামতে পারব? কবে নামব? কখন নামব?’

‘খুব জলদি। স্যান ডিয়াগো থেকে প্রয়োজনীয় গিয়ার নিয়ে এক বন্ধু আসছে। সর্বোচ্চ দু’দিন লাগবে।’ স্যাম হাসল। এই সুযোগে আমরা তোমাদের সাথে ডাইভিং করব। রেমি বারবার বলছে, তোমার ডাইভিং স্বচক্ষে দেখতে চায়। আর তুমি জানো, তোমার ভাবীকে আমি কোনোকিছুতে “না” বলতে পারি না।’

মজা পেয়ে রেমি মাথা নাড়ল। হুম। আজ রাতে আমরা এখানেই থাকব। যাতে সকালের ডাইভিংটাও দেখতে পারি। লিও, তুমি তোমার ডাইভিং দক্ষতা আমাকে দেখানোর জন্য প্রস্তুত হয়ে নাও।

চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়ল লিও। তোমরা মজা করছ? ওকে সমস্যা নেই। মজা করা ভাল।

রেমি অপেক্ষা করছে কখন লিও চোখ খুলবে। লিও চোখ খুলতেই সুন্দর একটা হাসি দিল রেমি। ডাইভিং নিয়ে আমি কখনও মজা করি না।

স্যাম কাঁধ ঝাঁকাল। বন্ধু, তোমার ভাবী-ই এখন বস। ওর কথা না শুনে উপায় নেই। চলো, পানিতে নামার জন্য প্রস্তুত হই।

.

 ৩৮.

পরদিন সকালে কুদের সাথে নাস্তা শেষ সেরে লিও-কে নিয়ে দ্বীপে ফিরল ফারগো দম্পতি। ডারউইন থেকে নামতে পেরে বেচারা খুব খুশি। পাড়ে পৌঁছে ওদের নিশান পাথফাইন্ডারের দিকে এমনভাবে দৌড় দিল যেন ফাঁসির দণ্ড থেকে মুক্তি পেয়েছে। বন্ধুর কাণ্ড দেখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে হাসল স্যাম।

‘লিও দৌড়াদৌড়ি সাবধানে করো। কুমীরের কথা ভুলে যেয়ো না। স্যাম সতর্ক করল।

গতি কমাল লিও। তাকাল স্যামের দিকে। আবারও মশকরা করলে নাকি?

না। এবার ও সিরিয়াস। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে কুমীরের শ্রবণশক্তি বেশ ভাল। কুমীরের ভয় না থাকলে আমি গান গেয়ে, হাতে তালি বাজিয়ে হাঁটতাম। স্রেফ জীবনের মায়া করি বলে চুপচাপ আছি।’ বলল রেমি।

‘হুম। বেনজি’র কথা মনে আছে? বেচারা কিন্তু একটা পায়ে হারিয়েছে। স্যাম মনে করিয়ে দিল।

লিও থেমে দাঁড়াল। আমি বুঝতে পারছি। তোমরা বলতে চাইছ, এবার আমার পা-টাও হারাতে পারে।

‘এই তো বুঝেছ। তুমি জানো? একটা পুরুষ কুমীর রেসের ঘোড়ার চেয়ে দ্রুত দৌড়াতে পারে?’ বলল রেমি। এই তথ্যটা কোথায় পড়েছিলাম, ভুলে গেছি। কিন্তু তথ্যটা সঠিক। এখানকার লোকরা পুরুষ কুমীরগুলোকে “ল্যাণ্ড ব্যারাকুড়া” নামে চেনে।’

গাড়ির কাছে পৌঁছুনোর পর বরাবরের মতো সবকিছু চেক করল স্যাম। না, নতুন কোনো টায়ারের দাগ বা পায়ের ছাপ নেই। নিশ্চিত হয়ে সবাই গাড়িতে চড়ে বসল। রওনা হলো হোটেলের দিকে।

লিও-র জন্য একটা রুম যোগাড় করতে কোনো কষ্টই করতে হলো না। দাঙ্গা-হাঙ্গামার কারণে পুরো হোটেল প্রায় ফাঁকা।

‘ল্যাজলো জানিয়েছে ও আগামীকাল সকাল ৮-১০ টার মধ্যে এখানে এসে পৌঁছুবে।’ বলল রেমি।

‘চমৎকার। তাহলে আমরা বিকেলে পাহাড় অভিযানে বেরোতে পারব। গুহা খোঁজার ব্যাপারে আমি খুব উত্তেজনাবোধ করছি।’ স্যাম মন্তব্য করল।

‘বিষয়টা খুব গোপনে করতে হবে। লিও এখানকার সাগরের কী খুঁজে পেয়েছে আর সেটার সূত্র ধরে আমরা কী খুঁজতে যাচ্ছি এসব দ্বীপের লোকজন জানতে পারলে আমাদেরকে সবসময় ঘিরে রাখবে। গুপ্তধনের লোভ কার নেই?

‘ঠিক বলেছ। এখন প্রার্থনা করছি, ল্যাজলো’র তথ্য অনুযায়ী আমরা যেন সঠিক জায়গাটাই খুঁজে বের করতে পারি। আমরা সফল হলে লিও কিন্তু রীতিমতো রকস্টার বনে যাবে। ল্যাজলো’রও ফায়দা হবে, ওর মেধার জোরেই তো এগোচ্ছে এসব।

ফায়দা হলে তো ভাল। আমি তো ভয় পাচ্ছি পরে না সব ফালুদা হয়ে যায়!

‘তা হবে না। গুপ্তধন উদ্ধার বলে কথা।

‘গুপ্তধন আমাকে শেখাতে এসো না। এখন কীভাবে কাজটায় সফল হওয়া যায় সেই চিন্তা করো।’

‘সত্যি কথা বলতে, মুখে বলা সহজ। কিন্তু মাঠে নামলে সবকিছু কেমন যেন কঠিন হয়ে যায়। বলল স্যাম।

পুরো বিকাল জুড়ে দ্বীপে যেসব গিয়ার পাওয়া যায় সেগুলো সংগ্রহ করে কাটাল ওরা তিনজন। রাবার বুট, লেড ফ্ল্যাশলাইট, শক্ত রশি ইত্যাদি টুকটাক জিনিস পাওয়া গেল হাতের কাছেই। বাকিগুলো ল্যাজলো নিয়ে আসবে। তারপর শুরু হবে অভিযান।

শহরের পরিবেশ বর্তমানে বেশ স্বাভাবিক। অস্ট্রেলিয়া থেকে নিরাপত্তারক্ষী বাহিনি এসে পৌঁছেছে। দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দারা স্বাগতম জানিয়েছে তাদেরকে। কেউ কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটায়নি।

***

পরদিন সকালে স্যাম ও রেমি একটু আগেভাগে উঠে পড়ল। ল্যাজলো আসছে আজ। দ্রুত রেডি হয়ে হনিয়ারা এয়ারপোর্টের টার্মিনালে দাঁড়াল ওরা। কয়েক মিনিট পর একজন কুলির মাথায় ভারী বোঝা চাপিয়ে তার পেছন পেছন টার্মিনাল থেকে ল্যাজলো বেরিয়ে এলো। ল্যাজলো’র পরনে খাকি শার্ট, হাফপ্যান্ট, পায়ে বুট মাথায় ক্লাসিক হেলমেট। অভিযানে যাওয়ার জন্য বেশ ভাল করে প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে।

‘যাক, আপনাদেরকে পাওয়া গেল। কাস্টমসের ব্যাটারা আমাকে এসব নিয়ে আসতে দিতে চাচ্ছিল না। শালারা বলে, কিছু জিনিস রেখে যান। মগের মুলুক নাকি?’ ফারগো দম্পতির দিকে এগোতে এগোতে বলল ল্যাজলো।

স্যাম ওর সাথে হাত মেলাল। রেমি জড়িয়ে ধরল ল্যাজলোকে।

‘আপনার সাথে এত মালপত্র দেখে মনে হচ্ছে আপনি এখানে লরেন্স ও অ্যারাবিয়ার স্থানীয় ভার্সন তৈরি করার জন্য অডিশন নিতে এসেছেন!’ স্যাম বলল।

ল্যাজলো নিজের পোশাকের দিকে তাকাল। বলেন কী? এরআগে কাউকে কোনো অভিযানে এরকম পোশাক পরে বেরোতে দেখেননি? আমার মনে হয়, এরকম পোশাক এখানকার স্থানীয়দের কাছ থেকে ভাল আচরণ পেতে সাহায্য করবে।

যাক গে, যা হওয়ার হয়েছে। সার্কাসের ক্লাউন সেজে আসেননি তাতেই আমরা খুশি। ফোঁড়ন কাটল রেমি।

এরকম খোঁচা খেয়ে ল্যাজলো মুখ শক্ত করে ফেলল। আমি আপনাদের দু’জনকে বেশ ভালই বিনোদন দিচ্ছি মনে হয়!

ল্যাজলো’র কাঁধে হাত রাখল স্যাম। এত সিরিয়াস হচ্ছেন কেন? একটু মজা করছিলাম। বাদ দিন, বলুন, ফ্লাইট কেমন উপভোগ করলেন?

‘২১ ঘণ্টার ফ্লাইট। বোরিং লেগেছে। জঘন্য। আর কী বলব? বলার ভাষা নেই।’

“যাক, এখন আপনি উপভোগ করার মতো জায়গায় চলে এসেছেন। এবার সবাই একসাথে ঘোরা যাবে, কী বলেন?’ বলল রেমি।

‘কোনো নারীর কাছ থেকে শেষ কবে ঘুরতে যাওয়ার প্রস্তাব পেয়েছিলাম মনে করতে পারছি না। অবশ্যই ঘুরব। আমার অনেক এনার্জী আছে। আচ্ছা, আমি যে কোড ভেঙে তথ্যগুলো দিলাম সেটা আপনাদের কতখানি কাজে লেগেছে?

‘এখনও পর্যন্ত যথেষ্ট কাজে এসেছে। আমরা ভাবছি, কুমাসাকা’র সেই গ্রামটা আগে খুঁজে বের করব। কিন্তু পাহাড়ে না ওঠা পর্যন্ত ওই গ্রাম খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। স্যাম জানাল।

‘আজই পাহাড় চড়তে শুরু করি, কেমন? দিনটা বেশ ভাল। আর্দ্রতা আর তাপমাত্রা দুটোই সন্তোষজনক মনে হচ্ছে। কত ডিগ্রি তাপমাত্রা এখন?

‘আমি ভেবেছিলাম আপনারা সেলসিয়াস দিয়ে তাপমাত্রা পরিমাপ করেন।’ বলল রেমি।

‘সেলসিয়াস আর ডিগ্রি-তে কী আসে যায় বলুন? গরম তো গরমই।’ ল্যাজলো বিষয়টা আমলে নিল না।

‘ভাল কথা, এখানে কিন্তু কুমীর, বিদ্রোহী বাহিনি, জায়ান্ট… ইত্যাদির আগাগোনা আছে। বিষয়টা মাথায় রাখবেন। স্যাম বলল।

‘আমি তো ভেবেছিলাম এসব আপনি মজা করে বলেন।

‘জায়ান্টের বিষয়টাকে মজা বলে ধরে রাখতে পারেন। কিন্তু বাকি সবগুলো একেবারে দিনের আলোর মত সত্যি। এখানকার খবর পড়ে আসেননি?’

সেলমা অবশ্য এগুলোর ব্যাপারে আমাকে বলেছিল। কিন্তু আমি পাত্তা দেইনি। ভেবেছিলাম, আমি যাতে এই অভিযানে যোগ দিতে না পারি সেজন্য বানিয়ে বানিয়ে বলছে। থামল ল্যাজলো। গলার স্বর নিচু করে বলল, ‘সেলমা কিন্তু আমার জন্য পাগল, বুঝলেন? আমি অবশ্য বুঝেও পাত্তা দেইনি। মজা নিচ্ছি। আমি যে আপনাকে এসব বলেছি এটা আবার সেলমা বলবেন না কিন্তু। আমি চাই না বেচারি কোনো বিব্রত পরিস্থিতিতে পড়ুক।

রেমি স্যামের দিকে তাকিয়ে চোখ পাকাল। ইশারা করল কথা বন্ধ করে পার্কিং লটে যাওয়ার জন্য।

গাড়িতে চড়ার পর দেখা গেল ল্যাজলো যে মালপত্রগুলো এনেছে তাতেই ভরে গেছে পেছনের অংশ। ল্যাজলো পেছনের সিটে কোনমতে বসার জায়গা পেয়েছে। বেচারা।

‘আশা করছি, এই সিন্দুকমার্কা গাড়ির এসিটা অন্তত ঠিকঠাক কাজ করবে।’ বলল ল্যাজলো।

“হুম, চমৎকার কাজ করবে। এই দ্বীপে এসে এপর্যন্ত তিনটা গাড়ি বদল করেছি। এটা চার নাম্বার গাড়ি। রেমি জবাব দিল।

“তাই নাকি? ওই তিন গাড়িতে কী হয়েছিল জানতে পারি?

স্যাম ও রেমি একে অন্যের দিকে তাকাল। রেমি রিয়্যার ভিউ মিররের দিকে তাকিয়ে জবাব দিল, সেটা আপনার না জানাই ভাল হবে।

“ঠিক আছে। দরকার নেই। চলুন, যাওয়া যাক।

“আচ্ছা, লিও-কে চেনেন আপনি?

না তো।

‘ওর সাথে দেখা হলে মজা পাবেন। স্বভাবে একদম আপনার বিপরীত।

‘ঠিক আছে। তাহলে তো দেখা করতে হয়।

‘ল্যাজলো, এই অভিযানে কিন্তু আপনার ভূমিকাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনি নোটবুকের কোড ভেঙে না দিলে আমাদের পক্ষে আর সামনে এগোনো সম্ভব হতো না। শেষমেশ যদি আমরা গুপ্তধন উদ্ধার করতে পারি তাহলে তার জন্য আপনিও বাহবা পাবেন।’

‘গুপ্তধন পেলে ধনী হয়ে যাব, তাই না? তাহলে নিজেকে তো এখনই ধনী ভেবে বসতে পারি, কী বলেন?’

রেমি নিজের হাসি দমিয়ে রাখতে পারল না। আপনার এই স্বভাবটা আমাদের দারুণ লাগে। সবসময় পজেটিভ চিন্তা করেন।

.

 ৩৯.

হোটেলে পৌঁছে লিও’র সাথে ল্যাজলো-কে পরিচয় করিয়ে দিল স্যাম। ভাড়া করা পাথফাইণ্ডারে চড়ে বের হলো সবাই। এদিকে আকাশে মেঘ জমে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে।

পুলিশের প্রথম রোডব্লক পার করার পর মুখ খুলল লিও, তোমরা কীভাবে শুরু করবে? ঠিক কোথা থেকে শুরু করতে হবে, জানবে কী করে?

‘আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি জাপানিরা সাগর থেকে গুপ্তধন তুলে সরিয়ে রেখেছে। এবং সেটা কোথায় সরিয়ে রেখেছে সে-ব্যাপারে আমরা সেই ঘটনার সময়কার একজন বৃদ্ধ ব্যক্তির সাথে কথা বলেছি। এসবের ভিত্তিকে আশা করছি, আমরা সেই পুরানো জনশূন্য গ্রামটাকে খুঁজে বের করতে পারব। রেমি বলল।

“আর যদি না পারো?

‘তাহলে বিষয়টা একটু কঠিন হয়ে যাবে।’ বলল স্যাম।

‘আর ভাষাগত সমস্যার কী হবে? লিও প্রশ্ন ছুড়ল। আমার যতদূর মনে পড়ে, তোমরা বলেছিলে এখানকার গ্রামের লোকজন ইংরেজি বা পিজিন কোনটাতেই কথা বলতে পারে না।’

‘তবে বয়স্ক ব্যক্তিরা ইংরেজি জানে। শুধরে দিল রেমি। বহির্বিশ্বের সাথে তাদের আহামরি কোনো লেনদেন না থাকলে এখানে পর্যটন ব্যবসা বেশ চাঙ্গা। তাই ব্যবসার খাতিরে হলেও বিদেশি ভাষা তাদের শিখতেই হয়। হয়তো পিজিন ভাষাটা ওরা শিখেছে। আমরা পিজিন না জানলেও আমাদের ল্যাজলো সাহেব কিন্তু পিজিন ভাষায় ওস্তাদ।

‘আচ্ছা, বুঝলাম। মিস্টার ল্যাজলো ঠিক কীরকম দিক নির্দেশনা নোটবুক থেকে বের করেছেন জানতে ইচ্ছে করছে।

স্যাম রিয়্যারভিউ মিরর দিয়ে ল্যাজলো’র দিকে তাকাল। আপনার সলিড স্মৃতিশক্তির একটু নমুনা দেখাবেন, প্লিজ?

‘এহেম, এহেম। ইয়ে মানে, নোটবুক থেকে যা উদ্ধার করেছি সেটা হলো… শেষ কুঁড়েঘর থেকে সূর্য উদয়ের দিক, তারপর ছাগলের মাথা হয়ে যেতে হবে শত্রু এলাকায়। ওখানে ঝরনাধারা আছে। ঝরনার ওপাশেই পথ।

‘সিরিয়াসলি? এই জিনিসের উপর ভর করে এগোচ্ছি আমরা?

কর্নেল কুমাসাকা এসব লিখেছিলেন যাতে নিজেকে জায়গাটা সম্পর্কে মনে করিয়ে দিতে পারেন। তাই তিনি বিস্তারিত লেখেননি। স্রেফ কিছু সংকেত লিখেছেন। কিন্তু আমার মনে হয়, এটাই যথেষ্ট।

হুম, খুবই যথেষ্ট। ব্যঙ্গ করল লিও। এমন একটা গ্রাম আমরা খুঁজতে যাচ্ছি যার এখন কোনো অস্তিত্বই নেই। কেউ ওখানে থাকে না। তারপর আবার খুঁজতে হবে ছাগলের মাথা! তারপর ঝরনা। এরপর পথ পাওয়া যাবে। আচ্ছা, ধরে নিলাম গ্রাম, ছাগলের মাথা, ঝরনা সব পাওয়া গেল। কিন্তু তারপর যে পথটা পাওয়া যাবে সেটা ধরে কতদূর যেতে হবে? তার উত্তর জানা আছে? হতে পারে সেটা ১০ মিটার… আবার সেটা ১০ কিলোমিটারও হতে পারে। অত রাস্তা আমাদের পক্ষে যাওয়া সম্ভব? তার উপর আছে বিদ্রোহীদের হামলার ভয়। কখন কোথায় কাকে মেরে দেবে কোনো ঠিক নেই। বুঝেছ? কী বলতে চাচ্ছি?

মেঘ গর্জন করে উঠল। একটু পর শুরু হয়ে গেল ঝুম বৃষ্টি। প্রচণ্ড বৃষ্টিপাতের ফলে দৃষ্টিসীমা নেমে এলো ২০ ফুটে।

‘এত চিন্তার কিছু নেই। তুমি হয়তো আমাদের সাথে এসেছে এক রাত কাটানোর প্রস্তুতি নিয়ে। কিন্তু আমাদেরকে প্রয়োজনে কয়েক রাতও থাকতে হতে পারে। সেজন্য প্রয়োজনীয় রসদ আছে আমাদের সাথে। একাধিক তাবুও নিয়ে যাচ্ছি। কোনো সমস্যা হবে না। স্যাম আশ্বস্ত করল।

‘পোকামাকড় তাড়ানোর জন্য স্প্রে-ও আছে। ভয় নেই।’ যোগ করল রেমি।

‘এই যে, এখন বৃষ্টিটা শুরু হলো। সবকিছু কাদায় একেবারে ঝোল ঝোল হয়ে যাবে। লিও ঘোঁতঘোত করল।

‘পাহাড়ে উঠব আমরা। কাঁদায় খুব একটা সমস্যা হবে না। আর পাহাড়ের গায়ে পানি জমেও না। অতএব, দুশ্চিন্তার কিছু নেই।… বলতে বলতে আমরা জায়গামতো চলে এসেছি। গাড়ির গতি কমাল স্যাম। রেমি, এটাই সেই রাস্তা না? এই রাস্তা ধরেই তো আমরা রুবো-কে নিয়ে এখানকার একটা গ্রামে গিয়েছিলাম?

তুমুল বৃষ্টির মধ্যে গাড়ির কাঁচের ভেতর দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখার চেষ্টা করল রেমি। জঙ্গলের মধ্যে একটা ফাঁক দেখা যাচ্ছে। হতে পারে। নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

‘বেশ। চলো, দেখা যাক আমাদের ধারণা সত্যি কিনা। এটুকু বলে স্যাম গাড়ি ঘোরাল সেদিকে। গাড়ির ছাদে গল্ফ বল সাইজের পানির ফোঁটা এসে আছড়ে পড়ছে। কাঁচা রাস্তায় ওদের নিশান পাথফাইণ্ডার নামার পর টায়ারগুলো বেশ কয়েকবার পিছলে গেল। কিন্তু মাটি আকড়ে ধরল কয়েক সেকেণ্ড পরেই।

ওরা গাড়ি নিয়ে জলধারার কাছে পৌঁছে গেল। ইতিমধ্যে বৃষ্টি থেমেছে। আগেরবার এই জলধারার সামনে এসেই রুবো দ্বিধাদ্বন্দে ভুগেছিল।

এবার আমরা কি জলধারাটুকু পার হব নাকি পাহাড় বাইতে শুরু করব?

বলো কী? অবাক হলো লিও।

‘আমার মনে হয় এবার জলধারা পার হলেই কাজ হবে।’ বলেই স্যাম গ্যাস প্যাডেলে চাপ দিল। গাড়িতে প্রচুর মালপত্র থাকায় একদম ভারি হয়ে গেছে। পানি ছিটিয়ে অগভীর জলধারাটুকু পার হয়ে গেল নিশান পাথফাইণ্ডার।

সামনে একটা গ্রাম উদয় হলো। হাঁপ ছেড়ে বাঁচল রেমি। যাক, ওরা ঠিক পথেই এগোচ্ছে। অবশ্যই এই গ্রামে মানুষজন বসবাস করে। গাড়ি থেকে নামল সবাই। কৌতূহলী গ্রামবাসীদের কেউ কেউ ওদের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। ওদেরকে নিয়ে পাহাড়ের উঁচু অংশের দিকে এগোল স্যাম। আগেরবার যে কবিরাজকে দেখে গিয়েছিল তাকে এবার প্রথম দেখাতেই চিনে ফেলল। কবিরাজ স্যামের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। হাত দিয়ে দেখাল পাহাড়ের উপরের দিকে একটা কুঁড়েঘর। আগেরবার ওরা ওখানে গিয়ে নাউরুর সাথে কথা বলেছি। স্যামও পাল্টা মাথা নাড়ল। ৫০ ডলার ধরিয়ে দিল বৃদ্ধ কবিরাজের হাতে।

‘রুবো,’ বলে স্যাম মাথা নেড়ে ইঙ্গিত করল রুবো আর বেঁচে নেই। চোখ বড় বড় হয়ে গেল কবিরাজের। ডলারগুলো নিতে ইতস্তত করলেও পরে নিজেকে সামলে নিল।

‘আপনি ইংরেজি বলতে পারেন?’ জানতে চাইল স্যাম।

কাঁধ ঝাঁকাল বৃদ্ধ। পারে না। এক তরুণ ছেলেকে ইশারা করে ডাকল সে। স্যাম তরুণটিকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল।

‘ফারি আরকী,’ জবাব দিল তরুণ। উচ্চারণে আঞ্চলিক টান।

‘আমরা একটা পুরানো গ্রাম খুঁজছি। ওই গ্রামে কেউ থাকে না। স্যাম বলল। কিন্তু তরুণের চোখ দেখে মনে হলো সে ঠিক বুঝতে পারছে না। আবার বলল স্যাম। একটা গ্রাম। নাউরু একসময় থাকতো ওখানে। ওই। গ্রামটা খুঁজে বের করতে চাই।’

এবার তরুণটি বুঝতে পেরে গ্রামের বয়স্কদের কাছে গেল। আলোচনা করল সবার সাথে। কিছুক্ষণ এর-ওর সাথে কথা বলে ফিরল স্যামের কাছে।

‘ওইখানে কিছু নাই। ভালা না জায়গাড়া।

‘আমরা জানি। কিন্তু তবুও আমাদেরকে যেতে হবে। সামনে এগিয়ে এসে বলল রেমি।

আবার বয়স্কদের কাছে গেল ছেলেটা। আরেক দফা পরামর্শ করার পর ফিরে এলো।

যাওনের লিগা রাস্তা নাই।’

‘সমস্যা হবে না। আমরা হেঁটেই যাব।’ রেমি জবাব দিল। তুমি আমাদেরকে একটু গ্রামটা দেখিয়ে দিতে পারবে?

স্যাম চট করে ২০ ডলার বের করে তরুণের সামনে ধরল। তরুণ একবার বয়স্কদের দিকে তাকিয়ে লুফে নিল নোটটা। এমনভাবে নিল যেন আর একটু দেরি হলে ওটা বাতাসে মিলিয়ে যেত।

‘এহনই যাইবেন?’ ছেলেটা জানতে চাইল।

মাথা নাড়ল স্যাম। হ্যাঁ।

গাড়ির কাছে ফিরে যাবতীয় মালপত্রগুলো ওরা চারজন ভাগ করে নিল। রওনা হলো তরুণের পেছন পেছন। গ্রামের মানুষ, তরুণটির পায়ে কোনো স্যাণ্ডেল বা জুতো নেই। ভার নিয়ে চলার এক ফাঁকে ল্যাজলো লিও’র দিকে তাকিয়ে দেখল বেহাল অবস্থা। লিও’র মুখ প্রায়ই বাংলা পাঁচ হয়ে থাকে। আর এখন বোঝা নিয়ে এগোতে গিয়ে ওটা হুতুম পেঁচার মতো হয়ে আছে। অবশ্য ফারগো দম্পতি এসব ভার বহনকে মোটেও কষ্ট হিসেবে নেয়নি। বড় বড় পা ফেলে দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে তারা।

পাক্কা এক ঘণ্টা পাহাড় বাওয়ার পর অন্য একটা পাহাড়ের পাদদেশে গিয়ে পৌঁছুল সবাই। এখানটায় পাখির কিচিরমিচির ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। সব কেমন গুমোট, চুপচাপ। একটু দূরে থাকা কিছু সাজানো পাথরের দিকে নির্দেশ করল ছেলেটা। পাথরগুলো মানুষ সাজিয়েছে সেটা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। যদিও ঝোঁপঝাড়ের কারণে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে ওগুলো দেখতে।

গাছের ছায়ায় বিশ্রামের জন্য থাম। ওরা। তরুণ ওদেরকে একটা জিনিস দেখাল।

‘টেবিল।

বিষয়টা বুঝতে পারল রেমি। এই গ্রামের বাসিন্দারা সমুদ্র থেকে মাছ ধরে শুঁটকি বানাতো। এই টেবিলেই মাছ শুকাতে দিতে তারা। পাথরের টেবিল হওয়ায় এগুলো এখনও টিকে আছে। পাশের পাহাড় থেকে পাথর কেটে এনে টেবিলগুলো বানানো হয়েছিল।

‘দেখে তো মন