ওটা আসলেই যযাডিয়াক। তবে কিছুটা পানিতে ডুবে আছে বোটটা। আরেকটু কাছে যেতেই স্যাম বুঝতে পারলো যে বোটের বাইরের মোটরটা পানির নিচে ডুবে আছে। শুধু গলুইটাই এখন ভেসে আছে পানির ওপরে।
এটাকে আসলে বোট না বলে লাইফ প্রিজার্ভার বলা যায় এখন। এটা দিয়ে তারা কোথাও যেতে পারবে না। তবে কোনো সার্চ পার্টি এলে কালো ওয়েটস্যুটের থেকে এই লাল বোটটাই ভালো দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে।
অবশ্য তাদের কপাল খারাপ। বোটের সামনের মাথাটা খাবলে ধরতেই দেখলো যে এটা বেশিক্ষণ পানিতে ভেসে থাকতে পারবে না। তাদের ওজনের ভারে পুরোপুরিই পানিতে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এখানেই থাকো, রেমিকে বলল স্যাম। আমি গিয়ে চেক করে দেখি।
মাথা ঝাঁকালো রেমি। নৌকার গলুই আঁকড়ে ধরে রেখেছে ও। স্যাম ওদিকে তার বেল্ট থেকে ফ্ল্যাশলাইটটা বের করে এবং মাস্কটা লাগিয়ে ডুব লাগালো পানিতে ভাসমান একটা বোটকে পানির নিচে ডুবানো বেশ কঠিন একটা কাজ। গুলি করার সময় ডেলগাডোর লোকেরা বেশ কয়েকটা এয়ারটিউব মিস করেছিলো। ওগুলোর কারণেই যযাডিয়াকটা এখনো পানির ওপরে ভেসে থাকতে পারছে। তবে মোটরটা আটকে নেই বোটের সাথে। বুলেট বর্ষণে নৌকা পড়ে যাওয়ার সময় তরুণ মুনো কোনোভাবে মোটরটা বোট থেকে আলগা করে ফেলতে পেরেছিলো।
স্যাম আশা করলো এতে করে হয়তো তারা আরো বেশ কিছুটা সময় ধরে ভেসে থাকতে পারবে। মাথা উঁচিয়ে রেমির কাছে এগিয়ে এসে বলল, বুলেটের ছিদ্র আছে অনেকগুলো। তবে ভেসে থাকার মতো যথেষ্ট বাতাস আছে এখনো। আশা করছি সার্চ পার্টি আসা পর্যন্ত ভেসে থাকতে পারবো আমরা।
এক মুহূর্তের জন্য কিছুই বলল না রেমি। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল, ছেলেটা আমাদের জীবন বাঁচিয়েছে।
সাময়িক সময়ের জন্য।
ঠিক তখনই কাছে পিঠেই কোথাও থেকে বজ্রাঘাতের বিকট শব্দ ভেসে আসতে শুনলো ওরা। স্যাম ধারণা করছে বজ্রটা খুব সম্ভবত দ্বীপে আঘাত করেছে। আশা করছে বজ্রপাত ঘটলে ঐ দ্বীপেই ঘটবে, পানিতে না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মুষলধারে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো পানিতে। সন্ধ্যা গড়িয়ে অন্ধকার নেমে এসেছে চারপাশে। কোনো রকমে যোডিয়াকের এক প্রান্তে আঁকড়ে ধরে রেখেছে ওরা। উত্তাল ঝড়ো বাতাস তাদেরকে প্রায় ছিটকে দিতে চাচ্ছে যেন। হুট করেই পানির নিচে মোকাবেলা করা টাইগার শার্কগুলোর কথা মনে পড়লো স্যামের। ওগুলো নিশাচর প্রাণী। রেমিকে কথাটা বলতে যাবে, তখন রেমিই বলে উঠলো, আমি ভাবছিলাম…।
রেমিকে শান্ত ও সতর্ক থাকতে দেখে স্বস্তি পেলো স্যাম। বলল, কী নিয়ে ভাবছিলে?
তোমার বলা আরামদায়ক সপ্তাহটার ব্যাপারে।
আচ্ছা?
ওটা কিছুদিন পিছিয়ে দেওয়া উচিৎ আমাদের। কী বলো তুমি?
এই মুহূর্তগুলোতেই রেমির প্রতি স্যামের ভালোবাসার পরিমাণ বিবর্ধিত হয়। তারা এখন একটা ডুবন্ত ভেলায় ধরে ঝুলছে, আর রেমি এর মধ্যেও হাস্যরস করার মতো কিছু একটা খুঁজে পেয়েছে। এই মুহূর্তে উদ্বেগ কমানোর জন্য এর চেয়ে ভালো আর কী থাকতে পারে? ভালো বলেছো। তাহলে… কাল দিন পর থেকে শুরু করা যাক সপ্তাহটা?
কাল থেকে না?
অন্ততপক্ষে মেইনল্যান্ডে ফেরা পর্যন্ত তো অপেক্ষা করা উচিৎ আমাদের। পরবর্তীতে আমরা কোথায় যাচ্ছি সেটাও জানা দরকার।
বলে দুইজনই দুইজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো কিছুক্ষণের জন্য। উদ্বেগের মাত্রাটা এখন কিছুটা হলেও কমে গেছে।
কিভাবে তারা এই বিপজ্জনক অবস্থায় পতিত হয়েছে তা নিয়ে ভাবছে স্যাম। তাদের অবস্থান ফাঁস হওয়ার আসলে একটা উপায়ই আছে। ব্রি। যদিও এই মুহূর্তে রেমির বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতার ব্যাপারটা উঠিয়ে আবারো নিজেদের মধ্যে উদ্বেগ ফিরিয়ে আনার কোনো ইচ্ছা নেই স্যাম। কিভাবে এই বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে সেটা নিয়েই ভাবা উচিৎ। তবে রেমি মনে হয় স্যামের চিন্তা ধরে ফেলতে পেরেছে। তাই বলল, আমি স্যরি।
স্যরির কিছু নেই, রেমি। আমরা একসাথেই আছি এতে, তুমি আর আমি, সবসময়ই থাকবো।
শুনে মুচকি হাসলো রেমি। অন্ধকারের কারণে স্যাম অতোটা নিশ্চিত না, তবু এটুক বুঝতে পারছে রেমির হাসিতে হালকা বেদনার ছাপ মিশে আছে। সে জানে রেমি যখন কাউকে বিশ্বাস করে, তখন ঐ মানুষটাকে মনপ্রাণ দিয়েই বিশ্বাস করে। রেমিকে এই বেদনাগ্রস্ত অবস্থায় দেখে প্রচণ্ড খারাপ লাগছে স্যামের। কিন্তু এই মুহূর্তে পরিস্থিতি বদলানোর মতো কিছু করা বা বলারও কোনো উপায় নেই তার।
বেঁচে থাকাটাই এখন মুখ্য বিষয়।
পরের কয়েক ঘণ্টা ধরেও এই কাজটাই করে গেলো তারা। যোডিয়াকটা এখন আরো ডুবে গেছে। স্যামের আশঙ্কা হচ্ছে কেউ এসে তাদের বাঁচানোর আগেই হয়তো সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যেতে হবে তাদেরকে।
তারা দুজনই ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত হয়ে আছে। ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে স্যামের। এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করেছে, তখনই তার মনে হলো যে পানিতে সে কিছু একটা দেখছে। পানির মরীচিকা খুব সম্ভবত। একটা আলো তাদের দিকে এগিয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে তার। নিশ্চিত হবার জন্য চোখ কচলাযলো স্যাম। না, ওটা কোনো মরীচিকা না। আসলেই একটা আলো জ্বলছে, এবং আস্তে আস্তে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে আলোটা।
.
১৮.
রেমি…
দেখেছি ওটা।
স্নেক আইল্যান্ডের দিকে একটা বোট এগিয়ে যাচ্ছে।
