পাথরের ধ্বসে জাহাজের ধ্বংসস্তূপের কতোটা ক্ষতি হয়েছে দেখার জন্য পিছনে ফিরে তাকালো রেমি। পানি এখন আবার পরিষ্কার হয়ে গেছে। মাথা ঘুরিয়ে আনতে যাবে ঠিক তখনই পিরিচ আকৃতির একটা গোলাকার বস্তু চোখে পড়লো তার। একটা পাথরের কাছে বালিতে পড়ে আছে বস্তুটা। চাকতির মতো বস্তুর অর্ধেকটা লুকিয়ে আছে বালির আড়ালে।
স্যামও দেখেছে ওটা। পাথরটার দিকে তাকিয়ে আছে। পাথরটায় হালকা একটু টোকা লাগলেই চাকতিটা বালির আরো ভিতরে ঢুকে যেতে পারে। রেমিকে স্তূপটার দিকে নজর রাখার ইশারা করে চাকতিটার দিকে এগিয়ে গেলো স্যাম। তারপর পাথরটায় না ছুঁয়েই চাকতির চারপাশের বালি সরাতে শুরু করলো। কিছুটা বালি সরাতেই হাতে চলে এলো চাকতিটা।
চাকতিটা রেমির হাতে তুলে দিলো স্যাম। রেমি ভেবেছিলো এটাই হয়তো ঐ মিসিং সাইফার হুইলটা। তবে ভালো করে পরীক্ষা করে দেখার পর আবারো হতাশ হতে হলো ওকে। ছোটো একটা টিনের পাত এটা।
পাতটার বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিয়ে ডাইভিং ব্যাগে ভরে নিলো ও। তারপর তাকালো ঘড়ির দিকে। আর অল্প কয়েকমিনিটের অক্সিজেন বাকি আছে তাদের। এখনই ওপরে উঠে যাওয়া দরকার। নাহলে পরে বিপদে পড়তে হবে। তাই আর দেরি না করে ওপরের দিকে উঠতে শুরু করলো ওরা।
পানির ওপরে মাথা উঠিয়েই মাউথপিসটা খুলে আনলো রেমি। স্যামের দিকে তাকিয়ে বলল, নট ব্যাড, ফার্গো।
তবে স্যামকে এতোটা আনন্দিত দেখাচ্ছে না।
কী সমস্যা আবার? জিজ্ঞেস করলো রেমি।
আমার পিছনে থাকো শুধু, বোটের দিকে ইশারা করে বলল স্যাম।
বোটের দিকে তাকাতেই দেখলো, একটা পিস্তল হাতে বোটের একপাশে ঝুলে আছে নুনো। আর পিস্তলটা তাক করে ধরে রেখেছে ঠিক তাদের দিকে।
.
১৭.
ব্যাগটা দিয়ে দিন। বোটের দিকে ভেসে যেতে থাকা স্যামের দিকে তাকিয়ে বলল তরুণ ছেলেটা। এখনই।
নুনো, স্যাম বলল। তোমার এটা করার দরকার নেই।
হ্যাঁ, দরকার আছে।
কেন?
ওটা আপনার জানার প্রয়োজন নেই। ব্যাগ হাতে তুলে দিন।
দিয়ে দিলে?
দিয়ে দিলে ধীরগতির যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর বদলে দ্রুত মৃত্যু পাবেন।
তারা তোমাকে যতো দিচ্ছে, আমরা তার থেকে দ্বিগুণ দিবো।
দ্বিধা ফুটে উঠেছে নুনোর চেহারায়। বারবার রেমি ও স্যামের দিকে তাকাচ্ছে শুধু। তারপর বলল, আপনারা বুঝতে পারছেন না। তারা ইতিমধ্যেই ক্যাপ্টেন ডেলগাডোকে মেরে ফেলেছে। আমি যদি কাজটা না করি তাহলে তারা আমার পরিবারকেও মেরে ফেলবে।
স্যামের উপদেশ উপেক্ষা করে বোটের দিকে সাঁতরে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো রেমি। তবে স্যাম তার হাত খাবলে ধরে আটকালো তাকে। তারপর নুনের দিকে তাকিয়ে বলল, তারা তোমাকেও মেরে ফেলবে। ঠাণ্ডা মাথার খুনি ওরা।
আমার পরিবারকে আটকে রেখেছে ওরা। প্লিজ… ক্ষমা করুন আমাকে। পিস্তলটা স্যামের দিকে তাক করে পর্তুগিজ ভাষার কিছু একটা বিড়বিড় করতে শুরু করলো ছেলেটা। খুব সম্ভবত কোনো প্রার্থনা পড়ছে।
এটা ভালো কোনো চিহ্ন না।
তারা এখনো আমার ওপর নজর রাখছে, নুনো বলল। আমি আপনারকে গুলি করেছি কিনা সেটা দেখছে। প্লিজ। আমি আমার পরিবারকে মারতে চাই না।
রেমি, স্যাম বলল। ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে তুমি চলে যাও এখান থেকে।
আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না, স্যাম।
না, যাবে তুমি। নুনো, রেমি নিরাপদ অবস্থানে যাওয়ার পরই আমি ব্যাগটা তোমাকে দিয়ে দিবো।
পিস্তলটা আরো সামনে বাড়িয়ে ধরলো নুনো। না! আমি আপনাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। আর আপনি, রেমির দিকে পিস্তলটা তাক করে বলল, ব্যাগটা আমার হাতে দিন, উনার হাতে না।
রেমি… এখনো রেমিকে আটকে রেখেছে ও।
এখনই! মরিয়া কণ্ঠে বলে উঠলো নুনো।
কণ্ঠস্বর বুঝাচ্ছে ছেলেটা এখন অনেকবেশি বিপজ্জনক হয়ে আছে। এই মুহূর্তে ছেলেটার রাগ আরো বাড়ানো খুবই বোকামি হয়ে যাবে। তাই অনিচ্ছাস্বত্ত্বেও রেমির হাত ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো স্যাম।
বোটটার দিকে এগিয়ে গিয়ে ব্যাগটা ওপরে তুলে ধরলো রেমি। সাথে সাথেই ব্যাগটা খাবলে ধরলো নুনো। তবে রেমি সাথে সাথেই ব্যাগটা ছেড়ে না দিয়ে বলল, নুনো, তোমার পরিবার যেন নিরাপদে থাকে এই প্রার্থনাই করবো আমি। আর তুমিও যাতে সঠিক কাজটাই করো, সেই প্রার্থনাও করবো।
বলে ব্যাগটা ছেড়ে দিলো রেমি।
সাথে সাথেই আত্মা চমকে উঠলো স্যামের। ব্যাগটা পেয়ে গেলে তাকে মারতে আর কোনো দ্বিধা থাকবে না নুনোর। বন্দুকের নলের এতো সামনে থাকা রেমির বাঁচারও কোনো সম্ভাবনা নেই।
ব্যাগটা হাতে নিয়ে খুলে ভিতরে একবার দেখে নিলো নুনো। তারপর যযাডিয়াকের মেঝেতে ব্যাগটা রেখে দিয়ে রেমির দিকে পিস্তলটা তাক করে বলল, আমি স্যরি। বলে ট্রিগার চেপে দিলো।
সাথে সাথেই পানিতে লাফিয়ে উঠে স্যামের দিকে ঘুরে গেলো রেমি। মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তার। কোনোরকমে সাঁতরে স্যামের দিকে ছুটে আসছে।
রেমি কাছে আসতেই তাকে টেনে নিজের পিছনে লুকিয়ে নিলো স্যাম। তখনই দ্বিতীয় আরেকটা গুলির শব্দ শোনা গেলো। রেমিকে পুরোপুরি নিজের পিছনে লুকিয়ে নিয়ে নুনের দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকালো স্যাম। তবে তৃতীয় কোনো শব্দ আর শোনা গেলো না। যোডিয়াকের ইঞ্জিনের ভোঁ ভোঁ শব্দ শোনা যাচ্ছে শুধু এখন। তাদেরকে পানিতে ফেলেই চলে যাচ্ছে যোডিয়াকটা।
