হয়তো ইচ্ছাকরেই জাহাজটা ডুবিয়ে দিয়েছিলো ওরা। হয়তো ভুল হাতে পড়ার কবল থেকে বাঁচানোর জন্য।
নুনোকে শেষমেশ আরো কিছু নির্দেশনা দিয়ে দুজনই তাদের ডাইভিং গিয়ারগুলো পরে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো পানিতে।
পানির গভীরে নেমে যাচ্ছে ওরা। প্রতিবারের মতো এবারও সমুদ্রের নিচের শান্ত সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছে রেমি। এর আগেও প তারা। তারপরও প্রতিবারই পানির নিচে নামলে যেন নতুন কিছু মনে হয় তার কাছে। পানির নিচের মাছগুলো তাদেরকে দেখে এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করতে শুরু করেছে। যতোই গভীরে নামছে পানির উপরিভাগের উজ্জ্বল আলোগুলোও নীল-সবুজাভ বর্ণে পরিণত হতে শুরু করেছে যেন।
পানির পঁচিশফুট গভীর নামার পর পর্দায় দেখা ধ্বংসাবশেষের স্তূপটা দেখতে পেলো রেমি। স্তূপটা প্রমাণ করছে যে এখানে এককালে একটা জাহাজ দাঁড়িয়েছিলো। সময়ের বিবর্তনে এর অনেক অংশই এখন পানির সাথে মিশে গেছে।
জাহাজের অবশিষ্টাংশে খোঁজাখুঁজি শুরু করার আগে তাদের চারপাশের পানির পরিবেশটা দেখে নিচ্ছে ওরা। ব্রাজিলের উপকুলগুলো ভয়ংকর শার্কদের আক্রমণের জন্য বেশ বিখ্যাত বলা যায়। যদিও এগুলোর বেশির ভাগই ঘটে থেকে রেসিফের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উপকূলগুলোতে। তবে তারপরও পশ্চিমে থাকা সাও পাওলো আছে এই তালিকার দুই নম্বরে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সৈকত ও মোহনার অগভীর পানিতে থাকা বদমেজাজী বুল শার্কের আক্রমণের শিকার হয় সাঁতারু এবং সাফাররা। আর উষ্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের পানিতে বিচরণ করে টাইগার শার্ক। এরা বুল শার্কের মতোই বিপজ্জনক, কিন্তু ওগুলো আকৃতিতে বেশি বড়ো। তবে রেমি আশা করছে স্নেক আইল্যান্ডের এই অগভীর পানিতে হয়তো ওগুলো থাকবে না।
আশেপাশের পানিতে বেশ কয়েকবার তাকিয়ে দেখলো ওরা। এখানকার পানিতে বেশ কিছু বারাকুড়া মাছ থাকলেও কোনো শার্ক নেই। নিশ্চিত হয়ে ধ্বংসস্তূপের ওপরের প্রান্ত থেকে খোঁজাখুঁজি শুরু করলো ওরা। খুঁজতে খুঁজতে একটু একটু করে পাথরধ্বসের গভীর দিকে এগিয়ে আসছে। সাথে সমুদ্রের তলেও তাদের মেটাল ডিটেক্টরগুলো দিয়ে খুঁজে দেখছে। যদিও তারা কেউই কোনো কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা করছে না-তারপরও সবসময়ই কিছু না কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। অবশ্য ডিটেক্টরের নিরবতা তাদের সন্দেহেরই প্রতিধ্বনি করছে যেন। জাহাজডুবির এই অবস্থান অনেক আগেই আবিষ্কৃত হয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই যে আগেও অসংখ্যবার খোঁজাখুঁজি চালানো হয়েছে এখানে। তারপরও সমুদ্রের তলদেশ প্রতিনিয়তই পানির স্রোতে পরিবর্তিত হচ্ছে। এক সম্রাতে দেখা যায় আড়ালে থাকা কোনো কিছু উন্মোচিত হয়ে গেছে, পরের স্রোতেই দেখা যায় সেটা আবার আড়াল হয়ে গেছে।
ধ্বসে পড়া নুড়িপাথরগুলো পরীক্ষা করে দেখছে ওরা। পরীক্ষা শেষে পাশে ছুঁড়ে রাখছে পাথরগুলো। বেশ কয়েকটা পরীক্ষার পর একটা অন্যরকম পাথর তুলে ধরলো স্যাম। এটা দেখতে ত্রিকোণাকার ও হলুদ এবং কোনার দিকে বেশ ধারালো। পাথরটার দিকে আলো ফেলতেই এরকম আরো কয়েকটা পাথর দেখতে পেলো রেমি। এগুলো সাধারণ কোনো নুড়িপাথর নয়, হলুদ ইটের ভাঙা টুকরো এগুলো। পরবর্তীতে আরো ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখার জন্য টুকরোটা তুলে রেমির ধরে রাখা ডাইভিং ব্যাগে ভরে রাখলো স্যাম।
আরো কিছুক্ষণ ঘাটাঘাটি করার পর রেমির কাঁধে টোকা দিয়ে ডান দিকে দেখার ইশারা করলো স্যাম। একটা ইল ঘুরাঘুরি করছে ওদিকে। পাথরের স্তূপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে হয়তো। এক মুহূর্তের জন্য রেমি মনে করেছিলো, স্যাম হয়তো তাকে পানিতে ভাইপারের বিচরণে আতঙ্কিত হওয়া নিয়ে খোঁচা দিচ্ছে। তবে পর মুহূর্তেই বুঝতে পারলো স্যাম অন্য কিছু বুঝতে চাচ্ছে। সামুদ্রিক সাপটার বেরিয়ে আসার কারণে সৃষ্ট হওয়া মেঘের মতো কাদার পটার দিকে আলো ধরে রেখেছে স্যাম। কাদাটা স্থির হয়ে যেতেই স্যামের মনোযোগর কারণটা দেখতে পেলো রেমি। হয় তাদের পাথর ছুঁড়ে ফেলার কারণে অথবা ইলটার বেরিয়ে আসার কারণে সমুদ্রের তলদেশে একটা ফাঁপা গর্তের মতো সৃষ্টি হয়েছে। গর্তটার দিকে সাঁতরে গেলো স্যাম। হাত দিয়ে কাদার ঘোলাটে ভাবটা দূর করতেই সমুদ্রের তলদেশে পড়ে থাকা জাহাজের খোলসের একটা অংশ দেখতে পেলো ওরা। ইলটা বের হয়ে আসার আগ পর্যন্ত দেখা যায়নি এটা।
এতে বুঝাই যায় যে পাথরের ধ্বস হয়তো জাহাজ ডোবার পরেই হয়েছিলো। খুব সম্ভবত জাহাজের ধ্বংসাবশেষকে আড়াল করে দিয়েছিলো।
এরমানে হলো পাথরগুলোর আড়ালে কিছু লুকিয়ে থাকলে থাকতেও পারে। রেমিকে চেক করে দেখার ইশারা দিলো স্যাম। ফাঁকা জায়গাটার ওপর মেটাল ডিটেক্টর ধরলো রেমি। প্রবেশমুখের দিকে কোনো সংকেতই পাওয়া গেলোনা যন্ত্রটা থেকে। তবে একটু ভিতরের দিকে ঢোকাতেই মৃদু একটা শব্দ শোনা গেলো। ডিটেক্টরটা স্যামের হাতে দিয়ে ফাঁকাটার দিকে আলো ফেললো ও। সমুদ্রের তলদেশে হাতড়ে দেখছে এখন। তার হাতের আলোড়নের কারণে আবারো বালিতে ঘোলাটে হয়ে গেছে পানি।
ঘোলাটে ভাবটা স্থির হওয়ার আগ মুহূর্তে কালো কিছু একটা চোখে পড়লো ওর। হাত বাড়িয়ে বালি থেকে খাবলে বের করে নিয়ে এলো বস্তুটা। জিনিসটাকে প্রথমে একটা ভারী কয়েন মনে করেছিলো ও। জিনিসটার একপাশ থেকে বেরিয়ে আসা হুকের মতো অংশটা দেখে এটাকে অনেকটা নেকলেসের লকেটের মতোও লাগছে। আরেকটু ভালো করে দেখার পর বুঝতে পারলো যে এটা সীসার সীলমোহর। বণিক জাহাজের মালামাল রক্ষা করার জন্য প্রায়ই এটা ব্যবহার করা হতো।
