নুনো মই ধরে নেমে গিয়ে তাদের মালামালগুলো রাখছে যোডিয়াকে। এগুলোর মধ্যে পোর্টেবল সাইড-স্ক্যান সোনার ইউনিটের বিশাল একটা বাক্সও আছে। সব যন্ত্রপাতি নামিয়ে রাখার পর স্যামকে নামতে সাহায্য করলো ছেলেটা। তারপর স্যাম নামতে সাহায্য করলো রেমিকে। তরুণ ছেলেটা এখনো সরাসরি তাদের চোখের দিকে তাকাতে পারছে না, তবে এখন বেশ ভদ্র আচরণ করছে তাদের সাথে। সাহায্য করতেও বেশ উদ্যমি হয়ে আছে। সব যন্ত্রপাতি ঠিকঠাক ভাবে দেখে নেওয়ার পর দ্রুতই তারা রওনা করল ইলআ দা কাইমাদা গ্রান্দের অভিমুখে। কাছাকাছি পৌঁছুতেই দ্বীপের সৌন্দর্যটা রেমির ধরা চোখে পড়লোর। অভিশপ্ত পাথুরে উপকূলটা জঙ্গলটাকে খাড়াভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। এটা যদি অন্য কোনো জায়গায় হতো, তাহলে হয়তো রেমি পাথর বেয়ে চূড়ায় উঠে যেতো ওপর দিকে পানির দৃশ্য দেখার জন্য। তবে দ্বীপে থাকা সাপগুলোর কথাও মনে আছে ওর। তার এবং সাপগুলোর মাঝখানে পানির স্তর আছে ভেবে কিছুটা স্বস্তিই পাচ্ছে এখন।
স্যাম ওদিকে সাইড-স্ক্যান সোনার ইউনিটটা সেট-আপ করছে। নুনোকে যোডিয়াকের গতি ও দিক ঠিক রাখতে বলে স্ক্যানারটা পানির পৃষ্ঠের সমতলে ধরে রেখেছে। সাথে সাথে চোখ রাখছে স্ক্যানারের মনিটরেও। এই মুহূর্তে পানি বেশ শান্তই আছে। তবে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে যা বলছে, পরবর্তীতে পানির আচরণ উত্তালও হয়ে উঠতে পারে। ডোবার জায়গাটা খুঁজে বের করাটা আসলে যন্ত্রগুলোর নির্ভুলতা এবং ভাগ্যের ওপর নির্ভর করছে। সাথে এটাও আশা করছে যেন সঠিক জাহাজটাই খুঁজে পাওয়া যায়। নাহলে আবহাওয়া পরিষ্কার হওয়ার পর আবারো একই কাজটার পুনরাবৃত্তি করতে হবে ওদেরকে।
যদি ভাগ্য ভালো হয়ে থাকে, তাহলে হয়তো তাদের কাঙ্ক্ষিত বস্তুটিও পেয়ে যেতে পারে। অবশ্য রেমি এমনটাও আশা করছে না যে প্রথম ধাক্কাতেই তারা আসল সাইফার হুইলটা পেয়ে যাবে। জাহাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে বস্তু খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকগুলো ফ্যাক্টর কাজ করে। বেশির ভাগ সময়ই জাহাজ যেখানে ডুবে সেখানেই সব কিছু পাওয়া যায় না। কিছু জিনিস দূরে ছিটকে গিয়ে পড়ে, নাহলে ডুবে যায় আরো গভীরে। আর তাছাড়া আসন সাইফার হুইলটা যে এখনো পানির নিচেই আছে এটারও নিশ্চয়তা নেই। হয়তো অনেক আগেই ওটা উদ্ধার করা হয়ে গেছে। কে জানে এখন হয়তো ওটা কোনো সংগ্রাহকের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় পড়ে আছে। হয়তো ওটার মালিক এটার আসল গুরুত্বটাও পর্যন্ত জানে না।
অবশ্য, এই মুহূর্তে তাদের কাজ হলো জাহাজের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে বের করে জাহাজটা কোন প্রকৃতির ছিলো সেটা নির্ধারণ করা। এটা ভেবেই আবারো বিষাক্ত দ্বীপটার চোখ চলে গেলো ওর। ভাবছে, ডুবন্ত জাহাজের বেঁচে থাকা মানুষগুলো হয়তো নিরাপত্তার আশায় তীরের দিকেই সাঁতরে গিয়েছিলো। কল্পনা করছে, মানুষগুলোর অনেকেই হয়তো পাথরের সাথে সংঘর্ষ ঘটার আগেই লাফিয়ে নেমে পড়েছিলো উত্তাল পানিতে, তারপর কোনোরকমে সঁতরে গিয়েছিলো ঐ দ্বীপটায়…
রেমির উদ্বেগটা ধরতে পারছে স্যাম। সোনারের পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কোনো সমস্যা?
জাহাজডুবি নিয়ে ভাবছিলাম। ভেবে দেখো, এতো কাছেই একটা তীর, হয়তো ভাববে, ওখানে গেলেই নিরাপত্তা পাওয়া যাবে…
রেমির সাথে সাথে স্যামও তাকালো দ্বীপটার দিকে। আমার মনে হয় ভাইপারের কামড় খেয়ে মরার চেয়ে ডুবে মরাকেই বেছে নিবো আমি।
আমি কোনোটাই বেছে নিবো না।
রেমির গালে ধরে মুখটা তার দিকে ঘুরিয়ে নিলো স্যাম। তোমার তীক্ষ্ণ দষ্টির সাহায্য কাজে লাগাতে পারতাম আমি।
এরপর আর দ্বীপের কথা না ভেবে স্যামের পাশে বসে সোনারের রিডিংর দিকেই মনোযোগ দিলো রেমি। পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় মনে হলো অযথাই পুরোটা দিন নষ্ট করেছে ওরা। একটা সময় বাতাসের আচরণও পালটে গেলে কিছুটা, পানিও ফোঁসফোঁস করতে শুরু করেছে। সব দেখে স্যামকে আজকের দিনের মতো ক্ষান্ত হতে বলতে যাবে, ঠিক তখনই স্যাম সোনারের পর্দার দিকে নির্দেশ করে বলল, মনে হয়, আমরা আমাদের জাহাজটা পেয়ে গেছি।
১৬. পাথরধ্বসের অবশিষ্টাংশ
১৬.
স্যাম যে জায়গাটার দিকে নির্দেশ করেছে ওটাকে দেখতে অনেকটা পাথরধ্বসের অবশিষ্টাংশ বলে মনে হচ্ছে। যদিও বহুকাল আগের এক ভূমিকম্পে পাথুরে দ্বীপের দক্ষিণ অংশ গুঁড়িয়ে মহাসাগরে তলিয়ে গিয়েছে। এটার থেকে কয়েক ফুট দূরেই আরেকটা লম্বা ও সরু পাথরের ধারা দেখা যাচ্ছে। অবশ্য ওটা এতো মসৃণ যে ওটাকে পাথরধ্বসের সৃষ্টি বলে মনে হচ্ছে না। নিশ্চিতভাবেই ওটা কোনো জাহাজের খোলসের ধ্বংসাবশেষ। জাহাজটা সরাসরি পানির নিচে ডুবে যাওয়ায় ওটা এখনো ছড়িয়েছিটিয়ে যায়নি। খুবসম্ভবত বাজেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জাহাজটা ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিলো, নয়তো কারো হাতে পড়ার কবল থেকে রক্ষার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে তলিয়ে দেওয়া হয়েছিলো।
আরো ভালোভাবে দেখার জন্য কাছে ঝুঁকলো রেমি। তোমার কি মনে হয় জাহাজ ডোবার পর পাথরধ্বস ঘটেছিলো?
হয়তো, স্যাম জবাব দিলো। যেটাই হোক, জাহাজটা নিরাপদে ঘুরিয়ে নেওয়ার মতো তেমন সুযোগ ছিলো না। ঝড়ের মধ্যে পড়লে পানির নিচের অসংখ্য পাথরের যে কোনোটাই জাহাজের ক্ষতি করতে পারে।
