দাঁত বের করে হাসলো ডেলগাড়ো। তামাক পাতা চিবুতে চিবুতে দাঁতগুলো হলুদ হয়ে লোকটার। ধারের দিকে কিছুটা জং ধরে গেছে। তবে এখনো সমুদ্রে চলার মতো শক্তি আছে এটার।
স্যাম নৌকাটার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি কি নিশ্চিত?
খুবই ভালো বোট এটা। দ্রুত গতির। আর তাছাড়া পাইরেটরাও এটাতে আক্রমণ করবে না। ভাববে হয়তো কোনো পয়সা নেই আমাদের কাছে। তাই না? বলে হেসে উঠলো ডেলগাডো।
রেমি আর স্যামও হাসছে লোকটার সাথে, তবে তাদের হাসিতে প্রাণ নেই অতোটা। জলদস্যুদের ব্যাপারে এন্টোনিওর সতর্কবাণীটা বাজছে রেমির কানে। এদিকের পানিতে পাইরেটের সংখ্যা কি অনেক বেশি?
আছে বেশ কিছু। তবে আমাদের কাছে বন্দুক আছে। আমরাই রক্ষা করবো আপনাদের। বলে তার লোকদেরকে ফার্গোদের মালপত্রগুলো বোটের উঠানোর নির্দেশ দিলো ক্যাপ্টেন ডেলগাডো। আপনারা প্রস্তুত থাকলে রওনা করে দেওয়াই ভালো। আমাদের আবার আগামীকাল বৃষ্টি শুরুর আগেই ফিরে আসতে হবে।
আবহাওয়ার সতর্কবাণী শুনে ফোন বের করে আরো একবার পূর্বাভাসটা দেখে নিলো রেমি। হালকা গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির চিহ্নটার সাথে এখন বজ্রপাতের চিহ্ন জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে পরেরদিন সন্ধ্যার আগে এই বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। এর আগ পর্যন্ত আবহাওয়ার তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। যদি আগামীকালের ভিতর তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত বস্তুটা খুঁজে না পায়, তাহলে হয়তো বৃষ্টি থামার পর আরেকবার আসতে হতে পারে।
পানিতে চলতে শুরু করার পরই আবহাওয়া ও বোট নিয়ে রেমি সমস্ত দুঃশ্চিন্তাই উবে গেছে। যানটার খোলসের হালকা ক্যাচক্যাচ শব্দ ছাড়া একদম মসৃণভাবেই স্নেক আইল্যান্ডের এগিয়ে যাচ্ছে। সাথে করে প্রায় নতুন একটা যোডিয়াকও একটা টেনে নিয়ে যাচ্ছে বোটটা। লক্ষ্যভ্রষ্ট বলেও মনে হচ্ছে না। সেলমা ক্যাপ্টেন এবং তার কুর বেশ প্রশংসা করে রেমিকে বলেছিলো যে লোকগুলো বেশ নির্ভরযোগ্য। আর তাছাড়া এন্টোনিওও বলেছিলো যে তার চাচাও নাকি গলফিনহোর ক্যাপ্টেনকে বেশ সম্মানের চোখে দেখে। এতগুলো প্রশংসা বাক্যের তো অবশ্যই কোনো কারণ আছে। যদিও ক্যাপ্টেন ডেলগাডো এবং তার চার ক্রুর তিনজনকে দেখতে জেলের মতো লাগছে না। বরং অনেকটা জলদস্যুদের মতো দেখাচ্ছে লোকগুলোকে। তাদের চতুর্থ ও সবচেয়ে তরুণ সদস্য নুনোকে দেখতে এন্টোনিওর মতো লাগছে রেমির কাছে। দুজনেরই বয়স ও শারীরিক গড়ন প্রায় একই রকমের। যদিও এই ছেলেটাকে কিছুটা উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। মাঝেমধ্যেই রেমির দিকে তাকাচ্ছে ছেলেটা, কিন্তু রেমি তার দিকে তাকালেই আবার চোখ সরিয়ে নিচ্ছে।
রেমি বুঝতে পারছে না তার উপস্থিতির কারণেই ছেলেটা এতো অস্বস্তি বোধ করছে, নাকি অন্য কোনো কারণে করছে। যাই হোক, ছেলেটার দিকে আর না তাকানোর সিদ্ধান্ত নিলো ও।
স্যামও লক্ষ্য করেছে ব্যাপারটা। রেমির পাশে এসে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, কুর সদস্যরা বেশ অদ্ভুত, তাই না?
ওরকমই লাগছে। তবে গলফিনহো যদি আমাদেরকে গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারে এবং ওখান থেকে অক্ষত অবস্থায় আবার বন্দরে ফিরিয়ে আসতে পারে, তাহলে এটা নিয়ে কোনো অভিযোগ করবো না আমি।
সন্ধ্যার দিকে দ্বীপের কাছাকাছি পৌঁছে পুরোনো ক্রু মেম্বারদের একজনের হাতে হাল ছেড়ে দিয়ে স্যাম ও রেমির দিকে এগিয়ে গেলো ক্যাপ্টেন ডেলগাডো। স্যামের পাশে গিয়ে বোটের দেয়ালে হেলান দিয়ে বলল, তো, আপনারা ঐ দ্বীপে যাচ্ছেন কী মনে করে?
জাহাজডুবির প্রমাণ খোঁজার জন্য, বলল স্যাম।
গুপ্তধন? মুচকি হেসে বলল ক্যাপ্টেন। আমি শুনেছিলাম এটাই আপনাদের বিশেষত্ব।
হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। তবে এবার গুপ্তধন খুঁজতে যাচ্ছি না। ধ্বংসাবশেষে কী কী আর্টিফ্যাক্ট আছে সেটার বিবরণ আনতে যাচ্ছি।
আপনাদের সাহস আছে বলতে হবে। আমার থেকেও বেশি, ক্যাপ্টেন বলছে দ্বীপটার দিকে তাকিয়ে। অনেক বেশি সাপ ওখানে।
আমাদেরও কপাল ভালো বলতে পারেন, স্যাম বলল। আমাদের কাজ শুধু পানিতে।
ভালো। তবে ঐ পাথরটার নিচে কয়েক পুরুষ ধরে বসে বসে খাওয়ার মতো ধনসম্পদ থাকলেও আমি কখনো ওদিকে যাবো না। সাপের কামড় খাওয়া ধনীর থেকে কাঙাল হয়ে মরা অনেক ভালো।
বলে হেসে উঠলো ডেলগাডো। লোকটার হাসি শুনে রেমির মেরুদণ্ড বরাবর শিহরণ বয়ে যাচ্ছে যেন। ঐ মুহূর্তেই রাতের খাবারের জন্য ডাক পড়ায় বেশ খুশিই হলো ও। ডিনারের সময় নুনোর পাশেই বসলো ওরা। তবে ছেলেটার সাথে আলাপ জমানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হতে হয়েছে রেমিকে। ভদ্রভাবেই রেমিকে এড়িয়ে গেছে ছেলেটা।
যাই হোক, আবহাওয়ার অবস্থা এখনো আগের মতোই আছে। খুব একটা পরিবর্তিত হয়নি। খাওয়ার পর রাতে ঘুমটাও বেশ ভালোই হয়েছে তাদের।
পরদিন একদম ভোর সকালে ঘুম থেকে উঠে পড়লো ওরা। ঘুম থেকে উঠেই স্যাম জানালো যন্ত্রপাতিগুলো একবার চেক করে দেখে ডাইভিং স্যুট পরে তাদের তৈরি হয়ে যাওয়া উচিৎ। হাল ধরার আগে ক্যাপ্টেন ডেলগাড়োও এসে দেখে গেছে তাদের। জানতে চেয়েছে তাদের কোনো সাহায্য লাগবে কিনা। সাহায্য লাগবে না জেনে তারপর আবার ফিরে গেছে হাল ধরতে।
দ্বীপের দক্ষিণ মাথা থেকে বেশ কিছুটা দূরে থাকা অবস্থাতেই নোঙ্গর ফেলে থামলো গলফিনহো। আগের দিন ক্যাপ্টেন ডেলগাড়ো একটা পাথরের কথা বলাবলি করেছিলো। ঐ পাথরটা থেকে বেশ দূরেই রয়েছে ওরা। গত কয়েক শতাব্দী ধরে অনেকগুলো জাহাজকে পানির নিচে ডুবিয়ে দেওয়ার ইতিহাস রয়েছে ঐ অভিশপ্ত পাথরটার। তারা যে জাহাজের ধ্বংসাবশেষ খুঁজতে এসেছে সেটাও এই পাথরের খোঁচাতেই তলিয়ে গিয়েছিলো। এটা ভাবতেই ভাবতেই পনেরো ফুট দৈর্ঘ্যের যোডিয়াক সি-রাইডারটারকে প্রস্তুত করতে দেখছে রেমি।
