ব্রির কী অবস্থা? জানতে চাইলে রেমি। কপাল ভালো যে স্যাম এখন তার সাথে নেই। রেমি খুব ভালো করেই জানে ব্রি কখনো তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, তবে পরিস্থিতির বিবেচনায় স্যামের ধারণাটাও অযৌক্তিক না।
ঠিকঠাকই আছে ও, সেলমা বলল। এই মুহূর্তে সে মানচিত্রের পাশে থাকা সাইফার হুইলের অর্থ বের করায় লায়লাকে সাহায্য করছে। ঐ সময়কার ইতিহাস নিয়ে বেশ ভালোই জ্ঞান আছে ওর।
শুনে ভালো লাগলো। স্যাম কি ওর ব্যাপারে কিছু বলেছে তোমাকে?
না। শুধু কেমন আছে, কী করছে এসবই জানতে চেয়েছিলো একবার।
আর কিছু না?
জবাব দিতে গিয়েও থেমে গেলো সেলমা। কয়েক সেকেন্ড থেমে থাকার পর বলল, মিসেস ফার্গো, আমার জানা প্রয়োজন এমন কোনো কিছু ঘটেছে কি?
না। তবে একটা উপকার করো আমার। ব্রির ওপর চোখ রেখো। ওকে? স্যাম… তাকে নিয়ে কিছুটা সন্দেহে আছে।
ওকে, মিসেস ফার্গো। নজর রাখবো ওর ওপর।
কথা বলা শেষে কানেকশন কেটে দিলো রেমি। স্যামকে সে কখনোই উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া কারো ওপর অভিযোগ আনতে দেখেনি। এমন না যে সে ব্রিকে অপরাধী বলেছে। রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশের ক্যাপ্টেন বলার পরই ধারণাটার দিকে ইঙ্গিত করেছে শুধু। যদিও রেমি প্রায় নিশ্চিত যে শত্রুদের সাথে তার বন্ধু চক্রান্তের নকশা আঁকছে না, কিন্তু সন্দেহের বীজ একবার বপন হয়ে যাওয়ায় সেটা সহজে দূরও করতে পারছে না মন থেকে। আসলেই তো বেশ কয়েকবার মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে আসতে হয়েছে তাদের।
ব্রির ব্যাপারে যদি তার ধারণাটা ভুল হয়ে থাকে, তাহলে এতে করে সে এবং স্যাম দুজনই বিপদে পড়বে। এই ঝুঁকিটা নেওয়ার সুযোগ নেই তার হাতে। তাই সেলফোনটা তুলে আবারো সেলমাকে কল করে বলল, কোথায় আছো তুমি? প্রাইভেট কথা ছিলো কিছু।
অফিসেই আছি। হ্যাঁ, বলুন। দাঁড়ান, দরজাটা আটকে দিয়ে আসি। তারপর এক মুহূর্ত পর সেলমা ফিরে এসে বলল, কোনো ঝামেলা?
কথাটা বির ব্যাপারে, বলে ব্রিকে নিয়ে স্যামের সন্দেহের কারণটা খুলে বলল রেমি। ব্যক্তিগতভাবে, আমি এটাকে সত্য মনে করছি না। তবে স্যামের ধারণাও কিন্তু অযৌক্তিক না। এমন অনেক ঘটনাই ঘটেছে, যেগুলোর কোনো ব্যাখ্যা নেই। স্যামের ধারণা ভুল হয়ে থাকলে, আমি চাই না ব্রি তা জেনে দুঃখ পাক। আর যদি সত্যি হয়ে থাকে…।
বুঝেছি, মিসেস ফার্গো। ব্রি এখন পর্যন্ত অস্বাভাবিক কিছু করেনি, তবে এখন থেকে নিশ্চিতভাবেই তার ওপর ভালো করে নজর রাখবো আমি।
সেলমাকে স্যামের সন্দেহের ব্যাপারে সব খুলে বলার পর নিজেকে এখন অনেকটা চাপমুক্ত মনে হচ্ছে রেমির। কাঁধে বিশাল বোঝা হয়ে চেপেছিলো ব্যাপারটা। এখন খুব সহজেই যাত্রার পরবর্তী অংশ নিয়ে পরিকল্পনায় মনস্থির করতে পারছে ও। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো যাত্রার ব্যাপারে একটা খসড়াও সাজিয়ে ফেলেছে। এরই মধ্যে স্যাম তাকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে যে, হোটেলে ফিরে আসছে ও।
আরো প্রায় ঘণ্টাখানেক পর হোটেলে ফিরে এলো স্যাম। হাতে করে উজ্জ্বল সূর্যমুখী ফুলের একটা তোড়া নিয়ে এসেছে। শুনেছি হলুদ ফুলের সাথে যাত্রা শুরু করলে নাকি যাত্রা বেশ ভালো হয়।
তাই?
তাই তো মনে হচ্ছে। এটা হয় এই হলুদ ফুল নয়তো বেগুনি মণিটার কারণে ভালো হবে। আর সত্যি বলতে চমৎকার একটা মেয়ের জন্য একমাত্র এটাই খুঁজে পেয়েছি আমি। যে মেয়েটা কিনা নিজে থেকেই সব কাজ করে, সাথে সাথে এক স্বামীকেও সামলায় যে কিনা যখন-তখন নির্বোধ কিছু বুদ্ধি দিয়ে বসে।
ফুলগুলো হাতে নিয়ে টেবিলে রেখে দিলো রেমি। তারপর হাত দিয়ে স্যামকে আলতোভাবে জড়িয়ে ধরে বলল, নির্বোধ না, তুমি সবসময়ই বুদ্ধিমান, ফার্গো।
এরমানে আমাকে ক্ষমা করা হয়েছে?
জবাবে শুধু তাকে চুমু খেলো রেমি। তারপর পিছিয়ে গিয়ে স্যামের দিকে তাকিয়ে বলল, এখন কি এটা বলার মতো সঠিক সময় যে, ব্রির ব্যাপারে তোমার সন্দেহের ব্যাপারটা আমি সেলমাকে জানিয়ে রেখেছি?
তারমানে তুমি বলছো আমি সঠিক ছিলাম?
আমি শুধু বলছি, তোমার সন্দেহটায় যথেষ্ট যুক্তি আছে। যুক্তি আছে বলেই তাকে জানিয়ে রেখেছি। তবে এরমানে কিন্তু এই না যে সবাই আমাদেরকে মৃত ভাবুক জাতীয় কিছু চাচ্ছি আমি।
মানে দাঁড়ালো, পুরোপুরি সঠিক না হলেও প্রায় সঠিক ছিলাম আমি? দ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো স্যাম। তার ঠোঁটের কোণে মদ হাসি ফুটে আছে।
ফার্গো, বেশি চাপাচাপি করো না।
****
সান্তোস বন্দরে যাওয়ার জন্য গাড়ি ভাড়া করে নিলো রেমি। ওখানে গিয়েই গলফিনহোর ক্যাপ্টেন এবং ক্রুদের সাথে দেখা করবে ওরা। যাত্রার জন্য ভোর সকালেই হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লো। আকাশটা সিঁদুরের মতো লালচে হয়ে আছে, সাথে মিশে আছে একধরনের নীলচে-সবুজাভ আভা।
সকালের লাল আকাশ। মানে নাবিকদের সতর্ক হওয়া উচিৎ।
আকাশটা দেখেই পুরোনো এই প্রবাদটা মনে পড়ে গেলো রেমির। যদিও আবহাওয়ার পূর্বাভাস বেশ কয়েকবার চেক করে দেখেছে ও। পূর্বাভাসে বলছে পরেরদিন সন্ধ্যার দিকে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়তে পারে। এর আগ পর্যন্ত দুঃশ্চিন্তা করার মতো কিছু নেই।
গাড়িটা তাদের হোটেলের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। নিচে নেমে দেখে ড্রাইভার গাড়ির ফ্রন্ট ফেডারে ঠেস দিয়ে তার ফোনে কিছু একটা দেখছে। ড্রাইভারের বয়স খুব বেশি না। কৈশোর পেরুনো এক যুবক মাত্র। কালো চুলের ছেলেটা বেশ লম্বা ও হ্যাংলা পাতলা। তাদেরকে গাড়ির এগিয়ে আসতে দেখেই তাড়াতাড়ি করে ফোনটা পকেটে ঠেলে দিলো ছেলেটা। বলল, মি. অ্যান্ড মিসেস ফার্গো?
