হাতে বেশি সময় নেই আমার। তারা যেকোনো সময় ফিরে আসতে পারে, আর আমার ব্যাটারিতেও খুব বেশি চার্জ নেই।
আপনি কোথায় এখন?
কোনো ধারণাই নেই এই ব্যাপারে। শুধু এটুকু জানি যে নটিংহ্যামের কাছাকাছি কোথাও আছি। কোনোরকমে একহাতের বাঁধন চুটিয়ে আমাকে পাহারা দেওয়া লোকটার পকেট থেকে আমার ফোনটা বের করেছি। তারা চার চেম্বার নিয়ে কী যেন বলাবলি করছিলো। আমি বলেছি যে তারা হয়তো চার গুহাকে বুঝাচ্ছে। যদি তারা জায়গাটা খুঁজে পায়, তাহলে ওখানেই যাব আমরা।
চার গুহা? স্যাম বলল।
তাদের আসার শব্দ শুনতে পাচ্ছি, ফিসফিসিয়ে বলল নাইজেল। প্রফেসর অলড্রিজের কাছে চলে যান আপনারা। বলে কল কেটে দিলো নাইজেল।
কিছুক্ষণ ওভাবেই শূন্যদৃষ্টিতে ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইলো স্যাম। তারপর ট্যাবলেটের পর্দায় ভেসে থাকা সেলমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, শুনেছো কথাগুলো?
প্রতিটা শব্দই শুনেছি, বলল সেলমা। তার কণ্ঠের সাথে কম্পিউটার কীবোর্ডের খুটখুট শব্দও ভেসে আসছে। নটিংহ্যাম ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসর অলড্রিজ নামের একজন আছেন।
শুনে লাযলোর দিকে তাকালো স্যাম। নাইজেলের বলা চার গুহাই কি তোমার বলা চার চেম্বার?
হতে পারে। নেকড়ের ডেরা বলতে শেরউড ফরেস্টে রবিন হুডের লুকিয়ে থাকা গুহাগুলোকেও নির্দেশ করা হতে পারে, বলল লাযলো।
সাথে সেলমা যোগ করলো, প্রফেসর অলড্রিজের একটা কন্টাক্ট নাম্বার পেয়েছি আমি। দেখি তার সাথে আপনাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতে পারি কিনা।
পারফেক্ট, বলল রেমি। এখনই কল করো তাকে।
****
ইতিহাস বিভাগের অফিসেই প্রফেসর সেড্রিক অলড্রিজের সাথে দেখা করলো ওরা। লোকটার বয়স ষাটের কোঠার শেষ দিকে প্রায়, চুলগুলোও পেঁকে সাদা হয়ে গেছে।
প্রফেসরের সাথে সৌজন্যতা বিনিময় চেয়ারে বসেই কাজের কথায় নেমে পড়লো স্যাম। আশা করছি আমার প্রশ্নটা উদ্ভট শোনাবে না, তবে কেউ কি আপনার কাছে কিং জন এবং তার সম্পদের ব্যাপারে জানার জন্য কখনো যোগাযোগ করেছিলো?
না, উদ্ভট শোনাচ্ছে না, বললেন প্রফেসর অলড্রিজ। অনেক বছর আগে একবার একজন আমাকে এটার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছিলো। আমার এক সাবেক ছাত্র, নাইজেল রিজওয়েল। কিংস লিনে থাকে। আমার কাছে জানতে চাইছিলো, কিং জনের সম্পদগুলো জলাশয়ে ডুবে যাওয়ার গল্পটার কি গুজব হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা। শত্রুদের হাত থেকে সম্পদ বাঁচানো এবং এমন কিছুর কোনো ঘটনা আছে কিনা। জানি না সে কেন জানতে চেয়েছিলো। খুব সম্ভবই বই-টই লেখার জন্য হবে হয়তো। তবে এরপর আর কখনো ওর সাথে কথা হয়নি আমার।
প্রফেসর খুব সম্ভবত নাইজেল মজ ক্রাওলির গবেষণা চুরি যাওয়ার ব্যাপারে কিছু জানে না। যাই হোক, এটা নিয়ে এখন কথা তুলেও কোনো লাভ হবে না। তাই রেমি বলল, আপনার উত্তর কী ছিলো?
আমি জানি আমি সংখ্যালঘুদের দলে আছি, বললেন প্রফেসর। তবে থাকবই না বা কেন? আমিই তো প্রথমে স্বীকার করেছি যে ইতিহাসের ব্যাপারের সব কিছুই জানি না আমরা। একেক ইতিহাসবিদের ভাষায় ইতিহাস একেকরকম। তাদের থেকে টুকরো টুকরো অংশ সংগ্রহ করেই আমাদের জানা ইতিহাসের গল্পগুলো তৈরি হয়েছে। মাঝেমধ্যে ভাগ্য ভালো হলে, প্রকৃত ইতিহাস জানার সৌভাগ্য হয় আমাদের। তবে এমন প্রকৃত ইতিহাস পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এই কিং জনের ব্যাপারটাই ধরুন। আমরা শুধু রাজার মৃত্যুর ব্যাপারটাই নিশ্চিতভাবে জানি। কিন্তু তিনি আসলেই আমাশয়ে মরেছিলেন, নাকি অন্য কোনো কারণে-তবে সম্পূর্ণ নিশ্চিত ভাবে কিন্তু না। আমরা এটুক জানি যে অসুস্থতার কারণে ভ্রমণকারীদের দল থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এরপরের ঘটনাগুলো আসলে চলে আসা গল্পগুলোর ওপর ভিত্তি করে ধরে নেওয়া হয়েছে। হয়তো সম্পদগুলো চুরি গিয়েছিলো রাজার থেকে এবং এরপর কারো সন্দেহ না জাগানোর জন্যই জলাশয়ে হারিয়ে যাওয়ার গল্পটা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ কি এটাকে অযৌক্তিক বলতে পারবে? বলে এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেলেন প্রফেসর সাক্ষীর পরিমাণ কম থাকলে, চাহিদামতো যে কোনো গল্পই ছড়িয়ে দেওয়া যায়।
তাহলে ধরে নিচ্ছি গুজব গুলো সত্য, বলল স্যাম। অর্থাৎ রাজার সম্পদটা কখনোই জলাশয়ে হারায়নি… অর্ধেক বলেই থেমে গেলো ও। কথাটায় প্রফেসর প্রতিক্রিয়াটা দেখতে চাচ্ছে।
আপনি নাইজেলের থিউরিকে ইঙ্গিত করছেন?
হ্যাঁ।
এমনটা হলে তো এটা হবে শতাব্দীর সবচেয়ে সেরা ঐতিহাসিক আবিষ্কার, বলে হালকা ত্যাগ করলেন প্রফেসর। প্রত্নতত্ত্ববিদদের স্বপ্ন এটা।
প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো রেমি। আপনার স্বপ্ন না?
আমার? প্রফেসরও হেসে বলছেন। আমি কখনো এটা নিয়ে অতোটা ভাবিনি। আমার আগ্রহ শুধু আমার ক্লাসে থাকা শিক্ষার্থীদের ঘিরেই। ইতিহাস শুনে তাদের প্রতিক্রিয়া দেখা, তাদের থেকে ইতিহাসের বিষয়ে থিউরি শোনাটা বেশি ভালো লাগে আমার। তবে আমার মনে হয় আপনারা আমাকে কথা বলতে আসেননি। যদি ভুল না শুনে থাকি, আপনারা বর্তমানে উলফস হেডের সূত্রপাত বা আমরা যাকে রবিন হুড নামে জানি, তার সম্পর্কে তথ্য জানতে এসেছেন। কিছু কিছু ইতিহাসবিদের মতে কিং জন আর রবিন হুড একই সময়ের অধিবাসি ছিলো। আবার অনেকের মতে, রবিন হুড আর কিং জনের সময়কালের মধ্যে কয়েকশো বছর আগে-পরের ব্যবধান ছিলো। আমার সহকর্মী প্রফেসর ওয়েন্ড অবসরে যাওয়ার পর রবিন হুডের ইতিহাসটা আমার সিলেবাসে যুক্ত করে নিয়েছি। এটা আমার জনপ্রিয় ক্লাসগুলোর একটা। আর শিক্ষার্থীরাও মধ্যযুগের ইতিহাস নিয়ে বেশ আগ্রহী, তারা প্রায়ই রবিন হুডকে বিভিন্ন দৃশ্যপট কল্পনা করে ইতিহাসের সুধা পান করে।
