এগিয়ে চলল ওরা। গুহার আরও গভীরে একটা সরু প্যাসেজে চলে এলো সবাই। এখানকার দেয়ালে ওর ফ্ল্যাশলাইটের আলোতে নীল-সাদা রঙ খেলা করছে। সবার সামনে আছে ল্যাজলো। হঠাৎ থামল সে।
কী হলো, মিস্টার ল্যাজলো? ছোট্ট করে প্রশ্ন করল রেমি।
‘এখানে আরও অনেক লাশ দেখতে পাচ্ছি। সে জবাব দিল।
আগেরটার চেয়ে এই চেম্বার আকারে ছোট হলেও এখানে লাশের সংখ্যা বেশি। লাশ না বলে কঙ্কাল বলা ভাল। কম করে হলেও ত্রিশটা আছে। সবগুলো কঙ্কালের মাঢ়ি উন্মুক্ত। ওগুলোর দাঁত দেখে মনে হচ্ছে বিদ্রূপ হাসি দিয়ে স্বাগত জানাচ্ছে অভিযাত্রী দলকে।
রীতিমতো নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে দেখছি।’ বলল রেমি।
‘এগুলোর আকার দেখো। লিও বিড়বিড় করল।
মাথা নাড়ল স্যাম। সবগুলো বাচ্চাদের কঙ্কাল। পরীক্ষা করল স্যাম। ‘কিন্তু মারা যাওয়ার সময় এদের হাত বাঁধা ছিল না।’
কিন্তু কয়েকজনের হাতে ছিল। একপাশের দেয়ালের কাছে থাকা তিনটা কঙ্কাল দেখে বলল ল্যাজলো। আগের মতো প্লাস্টিকের বাঁধন এখানে। হাত দুটো পেছন করে বাধা ছিল।’
‘কিন্তু এদেরকে কীভাবে খুন করা হয়েছিল তার কোনো চিহ্ন নেই। স্যাম মন্তব্য করল। হয়তো বড় কোনো বিপর্যয় হয়েছিল এখানে। তারপর বোধহয় স্থানীয়রা গণকবর দিয়েছে?
‘তাহলে এদের হাতে বাঁধন কেন?’ প্রশ্ন ছুড়ল রেমি।
‘এখানে কয়েকটা জুতো আছে। আধুনিক জুতো। স্যাম বলল।
‘ধরলাম, বিদ্রোহীরা এই কাজ করেছে। কিন্তু আমার মাথায় ঢুকছে না, বিদ্রোহীরা কেন বাচ্চাদেরকে খুন করবে?’ কোনো মোটিভ পাচ্ছি না।’ বলল ল্যাজলো।
গুহার গভীরে আরও সরু অংশের দিকে পা বাড়াল স্যাম। এটা দেখো। ডাকল সে।
সবাই এগিয়ে গিয়ে দেখল আরেকটা কঙ্কাল। অবশ্য এটা এখনও পুরোপুরি কঙ্কাল হয়নি। জায়গায় জায়গায় এখনও পচন ধরা মাংস দেখা যাচ্ছে। পাজরের ওখানটায় কিলবিল করছে বিভিন্ন পোকা।
‘এটা অল্পদিনের’ পোকা দেখে ঘেন্না লাগছে রেমি’র তাই ঠোঁট চেপে বলল কথাটা।
হুম, এটা সম্ভবত প্রাপ্তবয়স্ক কারও লাশ। তবে প্রাপ্তবয়স্ক না হলেও অন্যান্য কঙ্কালগুলোর চেয়ে এর বয়স বেশি সেটা নিশ্চিত। লাশের সাইজ দেখে বলল স্যাম। কিন্তু ঘাড় খেয়াল করে দেখো। ওটা ভেঙ্গে গেছে। আমার মনেহয় ঘাড় ভেঙ্গে মারা গেছে। বাঁ হাত আর পায়ের গোড়ালী দেখো, এগুলোও ভাঙ্গা।
স্যাম ফ্লাশলাইট নিয়ে গুহার আরও ভেতরে ঢুকল। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ওর মুখ থেকে। রেমি ওর পিছু পিছু গিয়ে দৃশ্যটা দেখে স্যামের হাত ধরল। ইতিমধ্যে ল্যাজলো আর লিও-ও চলে এসেছে।
‘সর্বনাশ!’ বলল ল্যাজলো।
সামনে আরও কম করে হলেও ১০০ টা কঙ্কাল পড়ে আছে। ওরা সাবধানে এগোল সেদিকে। এবার ওদেরকে পথ দেখাচ্ছে স্যাম। একটা খুলি পরীক্ষা করতে শুরু করল ও। এটার বয়স বেশি মনে হচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্ক কারো হবে। বেশ বড়। মাথায় গুলি লেগে মৃত্যু হয়েছিল। খুলিতে আঘাতের দাগ দেখা যাচ্ছে।’
‘এটাতেও একই অবস্থা। রেমি জানাল।
‘এই বাচ্চার কঙ্কালটা দেখুন,’ বা পাশ থেকে বলল ল্যাজলো। এর দুই। পা ভাঙ্গা।
‘ওটা কী?’ একটা কঙ্কালের দিকে লাইট তাক করে রেমি প্রশ্ন করল। স্যামও তাকাল সেদিকে।
‘মনে হচ্ছে, হাতকড়া। মরিচা ধরে তো চেনাই যাচ্ছে না। অনেক পুরানো। সম্ভবত যুদ্ধের সময়কার জিনিস।
‘আর কঙ্কালগুলো সে-সময় খুন হওয়া গ্রামবাসীর? ল্যাজলো জানতে চাইল।
‘সন্দেহ আছে।’ বলল স্যাম। নাউরুর ভাষ্যমতে, তখন যে যেখানে মারা গিয়েছিল সেখান থেকে আর কেউ সরিয়ে সত্ত্বার করার সুযোগ পায়নি। আর জাপানিরা কষ্ট করে লাশগুলো এত ভেতরে আনবে না সেটা নিশ্চিত। এখানে অন্য কাহিনি আছে।
‘তাহলে মেডিক্যাল এক্সপেরিমেন্টের সময় যারা আহত হয়েছিল এগুলো কি তাদের কঙ্কাল?’ রেমি বলল।
“ হতে পারে। কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল স্যাম। গুহার ভেতরে নতুন আরেকটা প্যাসেজ শুরু হয়ে সেটা আরও ভেতরে চলে গেছে। স্যাম সেদিকে এগোল। কয়েক মিনিট পর ফিরে এলো দলের কাছে।
‘সামনে আর কিছু নেই। পথ বন্ধ। হয়তো ওপাশে গুহার আরও অংশ আছে কিন্তু এখান দিয়ে আর সেদিকে যাওয়া সম্ভব না।
‘আমরা যদি যেতে না পারি তাহলে নিশ্চয়ই জাপানিরাও যেতে পারেনি। অন্য পথ ধরতে হবে। কিন্তু ভয়ঙ্কর বিষয়টা হলো, এই কঙ্কালগুলোর সাথে গুপ্তধনের কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে কীসের সম্পর্ক আছে?’ বলল রেমি।
‘আপাতত আমাদের হাতে উত্তর নেই। বরং আরও বেশ কয়েকটা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। রহস্যের সমাধান না হয়ে রহস্য আরও বাড়ছে। স্যাম জানাল।
‘সবকিছুর উত্তর বের করতে হবে।’
‘আমি তোমার সাথে একমত।
ল্যাজলো তাকাল স্যামের দিকে। এই কঙ্কালগুলোকে যুদ্ধের আমলের ধরে নিতাম। কিন্তু বাচ্চাদেরগুলোই বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। আমি ভাবছি, জায়ান্টের গল্পগুলো সত্য কিনা! আপনি বলে ছিলেন না, গ্রামে গল্প প্রচলিত আছে জায়ান্টরা গ্রামবাসীদেরকে ধরে এনে খায়?
রেমি ল্যাজলো’র দিকে তাকাল। ‘মিস্টার ল্যাজলো, জায়ান্ট বলে কিছু নেই। কী যে বলেন না!
‘ঠিক। কিন্তু তারপরও অপশন হিসেবে বললাম আরকী। বলা হয়, যা রটে তার কিছু তো ঘটে! যাক গে, এমনও হতে পারে এই কঙ্কালের পেছনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু সৈনিকদের হাত আছে যারা যুদ্ধের পরও অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেনি। কোন এক সিনেমায় যেন এরকম কাহিনি দেখেছিলাম। এখন ঠিক মনে করতে পারছি না। সেই সিনেমায় দেখানো হয়েছিল, বিচ্ছিন্ন এলাকায় থাকায় যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও তাদের কাছে কোনো বার্তা আসেনি। তাই তারা যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিল! কেউ থামতে বলেনি। তারা থামেওনি।’
